Category Archives: বিবাহ ও তালাক

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২৩. স্বামীর গায়রতহীনতা

সাধারণভাবে, গায়রত হলো ইজ্জত, মর্যাদা ও নৈতিক সীমা রক্ষার চেতনাশীলতা, বিশেষ করে পরিবারের সুরক্ষা ও স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব। স্বামীর গায়রত হলো- স্ত্রীর প্রতি সম্মান, নৈতিক সীমা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করার চেতনা। গায়রত দাম্পত্য জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গায়রতের অভাব দাম্পত্য জীবনকে যে ক্ষতি হয় তা হলো-

ক. স্ত্রীর উপর সীমারক্ষা হারানো

গায়রতের অভাবে স্বামী স্ত্রীর আচরণ ও নৈতিক সীমা ঠিকমতো রক্ষা করতে পারে না। এতে স্ত্রী হয়তো পরিবার বা সমাজের প্রতি অশ্লীল বা অযাচিত আচরণ করবে, যা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে।

খ. সম্মান ও মর্যাদার অবনতি

গায়রতহীন স্বামী স্ত্রীকে তার মর্যাদা, সন্মান ও সামাজিক অবস্থান রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। এতে স্ত্রীর আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পর্কের মধ্যে ঘাটতি দেখা দেয়।

গ. বিশ্বাস ও নিরাপত্তার দুর্বলতা

স্বামী যদি গায়রতের প্রতি উদাসীন হয়, স্ত্রী আত্মবিশ্বাস হারায় এবং ঘরে নিরাপত্তা বোধ কমে যায়। এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে।

ঘ. সম্পর্কে প্রেম ও স্নেহের অবনতি

গায়রতহীনতা স্ত্রীর মনে হতাশা, অবজ্ঞা বা অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিকতা, প্রেম ও স্নেহ কমে যায়।

ঙ. সমাজ ও সন্তানদের ওপর প্রভাব

গায়রতের অভাবে স্ত্রীর আচরণে ঢিলা, পর্দাহীনতা বা সীমাহীন স্বাধীনতা দেখা দিতে পারে। শিশুরা এটি দেখে নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক সীমা ভুলভাবে শিখতে পারে, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রতিকারের উপায়

আল্লাহ তা’আলা এবং মুমিন উভয়ই ‘গায়রত’ বা আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন।  মুমিনের গায়রত হলো, যখন সে নিজের বা তার পরিবারের সম্মান ও মর্যাদার ওপর কোনো আঘাত আসে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের পর্দাহীনতা বা অন্যায় কাজ দেখলে তা তার কাছে অপছন্দনীয় হয়। এটি তার ঈমানের একটি অংশ। যদি স্বামী গায়রতহিণ হয় তবে পরিরাব দ্বীন ছেড়ে দিয়ে অন্য সংস্কৃতি অনুসরণ করবে। পরিবারে অশান্তি আসবে। যদি স্বামী গায়রত নিছে চলাফেরা হবে তবে দাম্পত্য জীবনে শান্তি আসতে বাধ্য।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার গাইরাত (সূক্ষ্ম আত্মমর্যাদাবোধ) আছে এবং মুমিনেরও গাইরাত আছে। আল্লাহ তা’আলা মুমিনের জন্য যা হারাম করে দিয়েছেন, সে তাতে লিপ্ত হলে আল্লাহ তা’আলার গাইরাতে আঘাত লাগে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬৮

২৪. পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা

দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে উপেক্ষা করলে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। যখন একজন সঙ্গী আরেকজনের মতামতকে গুরুত্ব দেন না, তখন ধীরে ধীরে সম্পর্কটা ভেঙে যেতে শুরু করে। পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তা হলো-

ক. বিশ্বাস ভেঙে যায়

স্বামী বা স্ত্রী যদি পরামর্শের মূল্য না দেয়, তবে অপরজন মনে করে তার মতামত অমূল্য। এতে বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং সম্পর্কে শীতলতা আসে।

খ. ভালোবাসা ও আন্তরিকতা কমে যায়

একজন যখন উপেক্ষিত হয়, তার ভেতরে অবহেলার কষ্ট জমে। ভালোবাসা ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপ নিতে পারে।

গ. ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়ে

পরিবার একটি দল। একজনের সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করলে ভুল বাড়ে এবং তার প্রভাব সংসারে পড়ে।

ঘ. অহংকার ও একনায়কতন্ত্র জন্ম নেয়

যখন স্বামী বা স্ত্রী কাউকে গুরুত্ব দেয় না, তখন পরিবারে একনায়কতন্ত্র তৈরি হয়। এতে অপরজন বিদ্বেষ অনুভব করে এবং সম্পর্ক দূরত্বে গড়িয়ে যায়।

ঙ. শিশুদের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়

শিশুরা দেখে শিখে। যদি তারা দেখে মা-বাবা একে অপরের মতামতকে উপেক্ষা করে, তারাও ভবিষ্যতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করবে।

চ. ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বৃদ্ধি

যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত (যেমন – আর্থিক পরিকল্পনা, সন্তানের ভবিষ্যৎ বা বাড়ি কেনা) নেওয়ার ক্ষেত্রে দুজনের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন একা সিদ্ধান্ত নেন, তখন ভুল করার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই ভুল সিদ্ধান্তের ফল পুরো পরিবারকে ভোগ করতে হয় এবং এর দায়ভার দুজনের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।

প্রতিকারের উপায় :

পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা একটি দাম্পত্য সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সম্পর্কে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্মান, এবং যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। তাই প্রতিকাজে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪  وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে। সুরা শুরা : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, অতঃপর তারা যদি পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুধ ছাড়াতে চায়, তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না। সুরা বাকারা : ২৩৩

ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করা মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য। যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের পারিবারিক বিষয়গুলো, যেমন – সন্তানের শিক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা বা কোনো বড় সিদ্ধান্ত, পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করেন, তখন তারা মূলত আল্লাহর নির্দেশই পালন করেন। এতে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। যার ফলে দাম্পত্য জীবনে কোন প্রকারে ভুল বুঝাবুঝি থাকবে না।

২৫. প্রতিটি ঝগড়ায় জিততে চাওয়ার প্রবণতা

প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস। এটি সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট করে দেয় এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসা ও সম্মানকে বিষাক্ত করে তোলে। প্রতিটি ঝগড়ায় জিততে চাওয়ার প্রবণতা দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি করে তা হলো-

ক. বিশ্বাসের অভাব ও মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি

যখন কোনো একজন সঙ্গী সব সময় জেতার মানসিকতা নিয়ে ঝগড়া করেন, তখন অপরজনের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে, তার মতামত বা অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার অভাব তৈরি হয়।

খ. ভালোবাসা ও সহমর্মিতা হারিয়ে যায়

দাম্পত্য জীবন হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহানুভূতির উপর দাঁড়ানো। কিন্তু যদি সব সময় একজন প্রমাণ করতে চায় যে সে-ই ঠিক, তবে অন্যজন অপমানিত ও অবহেলিত বোধ করে। এতে ভালোবাসার জায়গায় ক্ষোভ জন্মায়।

গ. পরস্পরের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়

প্রতিটি বিষয়কে তর্কে পরিণত করলে সঙ্গীর মনে হয় যে তার কথা কোনো গুরুত্ব পায় না। এতে আস্থা ও ভরসা নষ্ট হয়ে যায়।

ঘ. শান্তির পরিবেশ নষ্ট হয়

বাড়ি হওয়া উচিত শান্তি ও প্রশান্তির স্থান। কিন্তু প্রতিটি ঝগড়াকে জয়-পরাজয়ের লড়াই বানালে ঘরে ঝগড়া, দুঃখ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

ঙ. অহংকার ও জিদ বাড়ে

“আমি হারব না” এই মানসিকতা আসলে অহংকারের প্রতিফলন। এটি দাম্পত্য সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি বিনয়, ক্ষমা আর মমতা কমিয়ে দেয়।

চ. সমস্যা সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়

আসল সমস্যার সমাধান না হয়ে কে জিতল আর কে হারল—এই বিষয়টাই বড় হয়ে যায়। ফলে দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায় এবং সম্পর্ক দুর্বল হতে থাকে।

প্রতিকারের উপায় :

প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা দাম্পত্য সম্পর্ককে একটি প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত করে, যেখানে ভালোবাসার কোনো স্থান থাকে না। এর ফলে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং সুস্থ যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়। তাই প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা বাদ দিয় ঠকার প্রবণতা গ্রহণ করতে হবে।

আবূ উমামা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের যিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের যিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার। সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮০০, দারিমি : ২৭২২

২৬. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ আসলে কিভাবে

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ আসলে তা দাম্পত্য জীবনকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই তৃতীয় পক্ষ একজন বন্ধু, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, অথবা এমনকি অন্য একজন ব্যক্তি হতে পারে যার সাথে স্বামী বা স্ত্রী মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় পক্ষ দাম্পত্য জীবনকে যে সকল ক্ষতির শিকার হয় তা হলো-

ক. বিশ্বাস ও সততার অভাব :

দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। তৃতীয় পক্ষের আগমনে এই বিশ্বাস ভেঙে যায়। যখন একজন সঙ্গী অনুভব করেন যে তার স্বামী বা স্ত্রী অন্য কারো প্রতি বেশি মনোযোগ বা আবেগ দিচ্ছেন, তখন সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ফলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।

খ. যোগাযোগের দুর্বলতা: যখন তৃতীয় পক্ষ আসে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি ও খোলামেলা যোগাযোগ কমে যায়। তারা একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতি, চাহিদা এবং সমস্যা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেন। এর পরিবর্তে, তারা তৃতীয় পক্ষের সাথে তাদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করেন, যা তাদের নিজেদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

গ. মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব: তৃতীয় পক্ষের প্রভাবের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক এবং শারীরিক দূরত্ব বেড়ে যায়। তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন এবং একে অপরের সাথে সময় কাটানো বা আবেগ ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে দাম্পত্য সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।

ঘ. পারিবারিক কলহ ও অশান্তি: তৃতীয় পক্ষের কারণে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ এবং কলহ বৃদ্ধি পায়। ছোটখাটো বিষয় নিয়েও বড় ধরনের ঝগড়া হতে পারে, যা পুরো পরিবারের শান্তি নষ্ট করে দেয়। যদি সন্তান থাকে, তাহলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামী-স্ত্রীর উচিত সব সমস্যার বিষয়ে একে অপরের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা। নিজেদের মধ্যে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং কেন এমনটা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানতে চাওয়া জরুরি। যদি নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না হয়, তাহলে দুই জনের পরিবারের বয়স্ক একজনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে তিনি স্বামী-স্ত্রীকে তাদের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে বুঝতে এবং সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন।

২৭. অন্যের সামনে অপমান করা

অন্যের সামনে সঙ্গীকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এটি শুধু একটি সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। যখন একজন সঙ্গী অন্যের সামনে তার পার্টনারকে অপমান করেন, তখন এটি তাদের মধ্যেকার বিশ্বাস, সম্মান এবং নিরাপত্তাবোধকে নষ্ট করে দেয়।

যেভাবে অপমান দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে

১. বিশ্বাস ভঙ্গ:

দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন পার্টনার অন্যকে সবার সামনে অপমান করেন, তখন অপমানিত ব্যক্তি অনুভব করেন যে তার সঙ্গী তার প্রতি বিশ্বস্ত নন। এই ঘটনার ফলে বিশ্বাসে ফাটল ধরে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার দুর্বল হয়ে যায়।

২. আত্মসম্মানে আঘাত

: প্রকাশ্যে অপমান করলে অপমানিত ব্যক্তির আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি তাদের নিজেদের সম্পর্কে খারাপ অনুভূতি তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে তারা নিজেদেরকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই মানসিক আঘাত তাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৩. সম্পর্কের দূরত্ব বৃদ্ধি:

অপমানজনক ঘটনা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে। যে ব্যক্তি অপমানিত হন, তিনি তার সঙ্গীর থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। তারা একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, যার ফলে সম্পর্কের মধ্যে নীরবতা এবং বিচ্ছিন্নতা বেড়ে যায়।

৪. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি:

যখন একজন সঙ্গী অন্যদের সামনে তার পার্টনারকে অপমান করেন, তখন শুধু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানও ক্ষুণ্ন হয়। এর ফলে তারা অন্যদের সামনে নিজেদেরকে বিব্রত বোধ করেন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া এড়িয়ে চলেন।

প্রতিকারের উপায় :

যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে প্রথমেই খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি। যিনি অপমান করেছেন, তার উচিত তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না বলে অঙ্গীকার করা। আর যিনি অপমানিত হয়েছেন, তার উচিত তার অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সমস্যাটি নিয়ে কথা বলা। যদি নিজেদের মধ্যে সমাধান সম্ভব না হয়, তবে একজন পেশাদার কাউন্সিলরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।

১৯৭৭। আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজি ; ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০

২৮. একে অপরকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া

একে অপরকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি প্রধান কারণ। যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের কর্মব্যস্ততা বা অন্যান্য কারণে একে অপরের থেকে দূরে সরে যান, তখন সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। এটি ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয় এবং একসময় তা ভেঙেও যেতে পারে। পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার কারণে যা ঘটতে পারে তা হলো-

ক. অভাবে ভুল বোঝাবুঝি : সম্পর্কের ভিত্তি হলো খোলাখুলি যোগাযোগ। যখন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটান না, তখন তাদের মধ্যেকার কথোপকথন কমে যায়। তারা একে অপরের জীবনের ছোট ছোট বিষয়, অনুভূতি, বা সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন না। এই যোগাযোগের অভাবে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, যা দূরত্ব তৈরি করে।

খ. মানসিক দূরত্ব:

নিয়মিত একসঙ্গে সময় কাটানো মানসিক নৈকট্য বজায় রাখার জন্য জরুরি। যখন এই সময় কমে যায়, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। তারা একে অপরের কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, যার ফলে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্ব বোধ তৈরি হয়।

গ. আকর্ষণ কমে যাওয়া:

একসঙ্গে সময় না দিলে শারীরিক এবং মানসিক আকর্ষণ দুটোই কমে যায়। সম্পর্কটি তখন শুধু একটি দায়িত্বে পরিণত হয়, যেখানে ভালোবাসা বা আবেগ থাকে না। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি চলে আসে এবং একে অপরের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।

ঘ. তৃতীয় পক্ষের আগমন: যদি সম্পর্কের মধ্যে পর্যাপ্ত সময় এবং মনোযোগের অভাব থাকে, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণ করতে একজন সঙ্গী বাইরের কারো দিকে ঝুঁকতে পারেন। এটি একজন বন্ধু, সহকর্মী বা অন্য কেউ হতে পারে যার সাথে তারা নিজেদের মনের কথা ভাগ করে নেন। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে তৃতীয় পক্ষের আগমন ঘটে, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

ঙ. বিশ্বাসে ফাটল: একে অপরকে সময় না দেওয়া এবং তার ফলস্বরূপ যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা ধীরে ধীরে সম্পর্কের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। একজন সঙ্গী হয়তো ভাবেন যে অন্যজন তাকে এড়িয়ে চলছেন, বা তার জীবনে অন্য কেউ এসেছে। এই ধরনের সন্দেহ এবং অবিশ্বাস সম্পর্কের ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।

প্রতিকারের উপায়

দাম্পত্য জীবনকে বাঁচাতে হলে একে অপরের জন্য সময় বের করা খুব জরুরি। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, নিয়মিত ঘুরতে যাওয়া, অথবা শুধু বসে গল্প করা, এই ছোট ছোট বিষয়গুলো সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে প্রাণ ফেরাতে পারে। কাজের চাপ যতই থাকুক না কেন, সম্পর্কের জন্য সময়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, তখন আমি তাঁকে পেছনে ফেলে দিলাম। পরে যখন শরীরে কিছুটা মেদ হলো, তখন আবার তাঁর সাথে দৌড়ালাম, তিনি আমাকে পেছনে ফেলে দিলেন। তিনি হেসে বললেন: এ দৌড় সেই দৌড়ের বদলা।” সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮, মুসনাদ আহমদ : ২৬২৭৭

২৯. শারীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

শারীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়। এই সমস্যাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। সময়ের সাথে সাথে শারীরিক আকর্ষণ কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু একে উপেক্ষা করলে তা সম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

শারীরিক আকর্ষণ শুধু সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠন নিয়ে নয়, বরং এটি আবেগ, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এই আকর্ষণ কমে গেলে সম্পর্কের মধ্যে থাকা আবেগগুলোও দুর্বল হয়ে যায়। একসময় যে স্পর্শ, চুম্বন বা আলিঙ্গন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল, তা এখন যান্ত্রিক বা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। এর ফলস্বরূপ দাম্পত্য জীবনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, যা ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ এবং কলহের জন্ম দেয়।

প্রতিকারের উপায়

রীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়। এই সমস্যাটা খুব সাধারণ হলেও এর সমাধান করা সম্ভব। শারীরিক আকর্ষণ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং মানসিক সংযোগ এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর নির্ভরশীল। নিজের বাহ্যিক চেহারার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন, নিজেদের পছন্দের পোশাক পরুন। এটি শুধু আপনার পার্টনারের জন্য নয়, নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও সাহায্য করে। যখন আপনি নিজেকে আকর্ষণীয় মনে করবেন, তখন আপনার পার্টনারও আপনাকে আকর্ষণীয় দেখবে। দৈনন্দিন জীবনে স্পর্শ এবং আলিঙ্গনকে গুরুত্ব দিন। এই সাধারণ কাজগুলো সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা ধরে রাখে এবং বোঝায় যে আপনারা একে অপরের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। দাম্পত্য জীবনে শারীরিক আকর্ষণ ধরে রাখা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যদি এই সম্পর্ককে সজীব রাখার চেষ্টা করেন, তবে তা অবশ্যই সম্ভব।

৩০. স্ত্রী স্বামীর কাছে অন্য মহিলার দেহের বর্ণনা দিলে কিভাবে দাম্পত্য নষ্ট হয়?

স্ত্রী যখন অন্য কোনো নারীর দেহের বর্ণনা স্বামীর কাছে দেয়, তখন তা দাম্পত্য জীবনের জন্য ক্ষতিকর হবেই। এর কারনে দাম্পত্য জীবনের জন্য  যে ক্ষতি হবে তা হলো-

ক. দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষতির কারণ

মানসিক তুলনা ও কল্পনা: যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীর মুখে অন্য নারীর শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা শোনেন, তখন তার মনে সেই নারীর একটি চিত্র তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্বামী অজান্তেই নিজের স্ত্রীর সাথে সেই নারীকে তুলনা করতে শুরু করতে পারেন। এই তুলনা দাম্পত্য সম্পর্কে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি করে।

খ সন্দেহ ও অবিশ্বাস:

এই ধরনের বর্ণনা থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে। স্বামী ভাবতে পারেন যে, স্ত্রী কেন অন্য নারীর প্রশংসা করছেন বা তার সৌন্দর্যের প্রতি এতটা মনোযোগ দিচ্ছেন। এর ফলে, সম্পর্কে সন্দেহ ও অস্বস্তি সৃষ্টি হতে পারে।

ঘ. আকর্ষণ ও ফিতনার ঝুঁকি :

ইসলামে ফিতনা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। অন্য নারীর বর্ণনা শোনার কারণে স্বামীর মনে তার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বা ফিতনার সৃষ্টি হতে পারে, যা সম্পর্কের পবিত্রতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। এই বর্ণনা এক ধরনের প্রলোভন হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক ভালোবাসাকে রক্ষা করার জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা দেয়। তাই, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরনের আলোচনা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন নারী যেন তার দেখা অন্য নারীর দেহের বর্ণনা নিজ স্বামীর নিকট এমনভাবে না দেয়, যেন সে তাকে (ঐ নারীকে) চাক্ষুস দেখতে পাচ্ছে। সহিহ বুখারি : ৫২৪০, ৫২৪১

৩১. নিয়মিত অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পরিধান করে থাকলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

স্বামীর বা স্ত্রীর সব সময় অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পোশাক পরিধান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি নীরব বিষের মতো। এর ফলে ধীরে ধীরে আকর্ষণ ও ভালোবাসা কমে যেতে থাকে। দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ। যখন একজন সঙ্গী নিজেকে পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেন না, তখন অপরজনের মনে তার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ে, যা শারীরিক ঘনিষ্ঠতাকেও প্রভাবিত করে। একসময় এই অভ্যাস পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন সঙ্গী যদি অপরজনকে দেখে মনে করে যে তার নিজের প্রতি কোনো যত্ন নেই, তবে এটি তাদের সম্পর্কের প্রতিও উদাসীনতা সৃষ্টি করে। পরিচ্ছন্নতা একটি সম্পর্কের জন্য শুধু স্বাস্থ্যবিধিসম্মত দিকই নয়, বরং এটি পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং যত্নেরও প্রতিফলন। তাই সব সময় অপরিচ্ছন্ন থাকা ধীরে ধীরে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য ও মধুরতাকে নষ্ট করে দেয়।

৩২. অতীতকে টেনে আনার ফলে

অতীতকে টেনে আনা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের বর্তমান সম্পর্কের সমস্যাগুলো সমাধানের পরিবর্তে পুরোনো ভুল বা ঘটনা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তখন তা সম্পর্কের মধ্যে বিষাক্ততা সৃষ্টি করে। অতীতকে নিয়ে কথা বলা হয়তো কোনো সমস্যার সমাধান করে না, বরং এটি শুধুমাত্র নতুন করে ঝগড়ার জন্ম দেয়।

যখন একজন সঙ্গী অতীতের কোনো ভুল নিয়ে বারবার খোঁচা দেন, তখন অপর সঙ্গীর মনে ক্ষোভ এবং রাগ জন্ম নেয়। এটি বিশ্বাস এবং ভালোবাসাকে দুর্বল করে দেয়। সম্পর্ক তখন সামনে এগোতে পারে না, কারণ তারা সব সময় পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এর ফলে বর্তমানের ছোটখাটো সমস্যাগুলোও বড় হয়ে দেখা দেয়।

প্রতিকারের উপায় : অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না। ক্ষমা এবং সহনশীলতা তখন অর্থহীন হয়ে যায়, কারণ পুরোনো ক্ষতগুলো বারবার তাজা করা হয়। তাই অতীতকে ক্ষমা করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব এখানে ফুটে উঠেছে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮

৩৩. চরিত্রের ত্রুটির কারনে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

চরিত্রের ত্রুটি বলতে সাধারণত নৈতিক স্খলন, যেমন – পরকীয়া, অসৎ জীবনযাপন বা অন্য ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন সঙ্গী তার নৈতিকতা লঙ্ঘন করেন, তখন সেই বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে সম্পর্কটা শুধু কাগজে-কলমেই টিকে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের প্রাণ থাকে না। পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্ক শুধু শারীরিক নয়, বরং এটি অপর সঙ্গীকে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয়। অপমান, কষ্ট এবং বঞ্চনার এই অনুভূতি সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে।

৩৪. মিথ্যা বলা কারনে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

মিথ্যা হলো সম্পর্কের জন্য একটি নীরব বিষ। যখন একজন সঙ্গী বারবার মিথ্যা বলেন, তখন অন্যজনের মনে তার প্রতি আস্থা কমে যায়। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তখন স্বাভাবিক আলাপচারিতাতেও সন্দেহ ঢুকে পড়ে, যার ফলে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ থাকে না। বারবার মিথ্যা বলা ও তা লুকানোর চেষ্টা দুজনের ওপরই মানসিক চাপ তৈরি করে। যে মিথ্যা বলছে, সে সব সময় ধরা পড়ার ভয়ে থাকে, আর যাকে মিথ্যা বলা হচ্ছে, সে সব সময় সন্দেহে ভোগে। এই চাপ ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদর্শে সুখী দাম্পত্য জীবন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে দাম্পত্য জীবন কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহ প্রদত্ত এক পবিত্র সম্পর্ক, যা রহমত, ভালোবাসা ও প্রশান্তির উৎস। একজন মুসলিমের জীবনকে পূর্ণতা দিতে এই সম্পর্কের ভূমিকা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবন সকল মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, আর তাঁর দাম্পত্য জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাঁর প্রতিটি কর্ম, আচরণ ও সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি সুখী ও সুন্দর সংসার গড়ে তোলা যায়। রাসুল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কেবল একজন স্বামী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং সঙ্গী। এই মহান আদর্শ অনুসরণ করে একজন মুমিন তার দাম্পত্য জীবনকে মধুর ও আনন্দময় করে তুলতে পারেন।

ক. পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মান

স্ত্রীর মর্যাদা ও মান বোঝা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীর অনুভূতি ও চাহিদার প্রতি সদা যত্নশীল ছিলেন। তিনি তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না, যা আমাদের শেখায় যে ছোটখাটো বিষয়ে স্ত্রীর কষ্ট দেওয়া উচিত নয় এবং তার পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মুমিন স্বামী যদি স্ত্রীর কথা শুনে তাকে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা দেখায়, তবে ঘর-সংসারে শান্তি বজায় থাকে।

খ. ভালোবাসা ও আনন্দের প্রকাশ

দাম্পত্য সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখতে ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করা অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, হালকা ঠাট্টা-মশকরা করতেন এবং একসাথে আনন্দ উপভোগ করতেন। এ ধরনের খোলামেলা ও আনন্দময় সময় দাম্পত্য বন্ধনকে শক্তিশালী করে। তিনি স্ত্রীকে সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতেন, যা ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে। এই ধরনের ছোট ছোট আন্তরিক আচরণ ঘরে স্নেহ ও প্রেমের পরিবেশ তৈরি করে। তিনি সফরেও স্ত্রীকে সঙ্গে নিতেন এবং বাইরে যাওয়ার আগে স্ত্রীকে চুম্বন করতেন, যা ভালোবাসার গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।

গ. সহযোগিতা ও সহানুভূতি

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী। তিনি নিজের হাতে ঘরের কাজ করতেন, কাপড় সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন এবং স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করতেন। এটি পুরুষদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, ঘরের কাজ কেবল নারীদের দায়িত্ব নয়, বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যম। স্ত্রীর অসুস্থতা, দুঃখ বা সমস্যার সময় তিনি তাদের পাশে থাকতেন। কষ্টের সময় সান্ত্বনা দিতেন এবং তাদের জন্য উপহার কিনে দিতেন। একজন মুমিন স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের প্রতি এই সহানুভূতি ও সহযোগিতা বজায় রাখে, তবে সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পায়।

ঘ. আত্মিক ও মানসিক বন্ধন

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এমনকি তিনি স্ত্রীর চুল আঁচড়ে দিতেন, কোলের উপর মাথা রেখে ঘুমাতেন এবং স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। এসব ছোটখাটো কিন্তু আন্তরিক আচরণ সম্পর্কের মধ্যে গভীর আত্মিক ও মানসিক বন্ধন তৈরি করে। তিনি বাড়িতে প্রবেশের আগে মিসওয়াক করতেন, যা পরিচ্ছন্নতা ও আন্তরিকতার প্রতীক। স্ত্রীদের সাথে অবসর সময় কাটানো এবং একাধিকবার সহবাসের পর একবার গোসল করা, এসব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আচারগুলো পরিবারে শান্তি ও আন্তরিকতা বজায় রাখে।

ঙ. সমতা ও ন্যায্যতা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একাধিক স্ত্রীর সাথে সমতা বজায় রাখতেন। তিনি সকলের প্রতি সমান মনোযোগ ও সময় দিতেন, যা একাধিক বিবাহকারী মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি একজন আদর্শ পরিবারপ্রেমিক ছিলেন, যিনি তার পরিবারের সকল সদস্যের চাহিদা এবং অধিকারের প্রতি সর্বদা সচেতন ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দাম্পত্য জীবন আমাদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল আল্লাহর রাসূলই ছিলেন না, বরং একজন আদর্শ স্বামী ও পরিবারপ্রেমিকও ছিলেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা জানতে পারি, কিভাবে একজন মুসলিম স্বামী ও স্ত্রী সুখী ও সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারে। অতএব, একজন মুমিন যদি এই নীতি অনুসরণ করে—স্ত্রীর মর্যাদা বোঝা, আনন্দ ভাগাভাগি করা, সহানুভূতি দেখানো, সমতা বজায় রাখা ও মধুর আচরণ করা—তাহলে সে সহজেই সুখী দাম্পত্য অর্জন করতে পারে। দাম্পত্য কেবল শারীরিক সম্পর্ক নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক বন্ধনও। তাই সংসারে প্রেম, সম্মান ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে যে কোনো মুসলিম দম্পতি সুখী ও পরিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারবে। নিচে সরাসরি সহিহ হাদিসে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

০১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর মান অধিমান বুঝার চেষ্টা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ’’আমি জানি কখন তুমি আমার প্রতি খুশী থাক এবং কখন রাগান্বিত হও।’’ আমি বললাম, কী করে আপনি তা বুঝতে সক্ষম হন? তিনি বললেন, তুমি প্রসন্ন থাকলে বল, না! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রব-এর কসম! কিন্তু তুমি আমার প্রতি নারাজ থাকলে বল, না! ইব্রাহীম (’আ.)-এর রব-এর কসম! শুনে আমি বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! সে ক্ষেত্রে শুধু আপনার নাম উচ্চারণ করা থেকেই বিরত থাকি। সহিহ বুখারি : ৫২২৮, ৬০৭৮

০২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিজোগিতা করতেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম, তখনো মোটা তাজা হইনি। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, তখন তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, অত:পর আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম ও আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা হলাম ও ভারী হলাম, ও তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনে অগ্রসর হল: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন: আজকের জয় সেই দিনের প্রতিশোধ”। মুসনাদ আহমাদ : ২৬২৭৭, সুনানে নাসায়ি : ৮৯৩৮. ইমাম বায়হাকি : ৮৬২৫

৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের প্রসংশা করতেন

খাদীজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রশংসা করা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁকে সব সময় স্মরণ করতেন। একবার আয়েশা (রা.) খাদীজা (রা.) সম্পর্কে কিছু বললে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কোনো স্ত্রী দেননি। সে আমার ওপর ঈমান এনেছে যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছে; সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা বলেছে; সে আমাকে তার ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে যখন মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছে; এবং আল্লাহ আমাকে তার মাধ্যমেই সন্তান দিয়েছেন, যখন অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে দেননি। মুসনাদে আহমাদ : ২৪৮৬৪, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : 6857

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর মর্যাদা নারীদের উপর এমন যেমন সারীদের মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর। সহিহ বুখারি : ৩৭৭০, ৪৫১৯, ৫৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৪৪৬, আহমাদ : ১৩৭৮৭

০৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আবসর সময় কাটাতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাত শেষ করতেন, তখন স্বীয় স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কোন একজনের নিকট গমন করতেন। একদিন তিনি স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং সাধারণতঃ যে সময় কাটান তার চেয়ে বেশি সময় কাটালেন। সহিহ বুখারি : ৫২১৬

০৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে চুমু দিয়ে ঘরের বাহির বের হতেন

আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুমো দিলেন, অতঃপর সালাত আদায়ের জন্য বের হলেন, কিন্তু অযু করলেন না। ’উরওয়াহ বলেনঃ আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, ’সেই স্ত্রী আপনি নন কি? ফলে তিনি হেসে দিলেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫০২

০৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর চুল আচড়ে দিতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমি হায়েয অবস্থায় আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথা আঁচড়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ২৯৫, সহিহ মুসলিম : ৩০২

নবী সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে থাকাবস্থায় আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন আর আমি তা আঁচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি যখন ই‘তিকাফে থাকতেন তখন (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না। সহিহ বুখারি : ২০২৯, ২০৩৩, ২০৩৪, ২০৪১, ২০৪৫

০৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে প্রবেশের আগে মিসওয়াক করতেন

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বাইরে থেকে এসে) বাড়িতে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৩

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি পছন্দ করি যে, আমি আমার স্ত্রীর জন্য সুন্দর সাজসজ্জা করি, যেমন আমি চাই যে, আমার স্ত্রীও আমার জন্য সাজসজ্জা করুক। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘নারীদের জন্য তাদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের উপরও রয়েছে নারীদের অধিকার, স্বীকৃত রীতিনীতি অনুযায়ী।’ সূরা বাকারা : ২২৮। ইমাম ইবন আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ : ১২৪৭০

০৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতেন

আসওয়াদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। আর সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন। সহিহ বুখারি  :৬৭৬, ৫৩৬৩, ৬০৩৯

উরওয়াহ বলেন, আয়েশা (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ঘরে কাজ করতেন?’ তিনি বললেন, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোহাতেন এবং নিজের খেদমত নিজেই করতেন। অন্যনা্য পুরুষরা যেমন নিজেদের বাড়ীতে কাজ করে, অনুরূপ তিনিও তাঁর কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং জুতো সিলাই করতেন। হাদিস সম্ভার : ২৫৯০, আদাবুল মুফরাদ : ২১৫, সহীহুল জামে : ৯০৬৮

আয়েশা (রা.) বলেন: নবী ﷺ তাঁর জুতা মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং ঘরে কাজ করতেন, যেমন তোমাদের কেউ ঘরে কাজ করে।” মুসনাদ আহমাদ : ২৪৯০৩

৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে কুরাআন তিলওয়াত করতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম।

 করেছেন এ সম্পর্কিত ০২ টি হাদিস দিন। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১, সুনানে নাসায়ি : ২৭১, মুসনাদ আহমাদ : ২৪৩৮৪

১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিকবার সঙ্গমে একবার গোসল করতেন

আনাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীদের নিকট গেলেন এবং একবারই গোসল করলেন। সুনানে আবু দাউদ : ২১৮, সুনানে নাসায়ি : ২৬৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৫৮৯,  দারিমী : ৭৫৯) ও

১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করতেন

‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র (কাদাহ) হতে (পানি নিয়ে) গোসল করতাম। সেই পাত্রকে ফারাক বলা হতো। সহিহ বুখারি : ২৫০, ২৬১, ২৬৩, ২৭৩, ২৯৯, ৫৯৫৬, ৭৩৩৯, সহিহ মুসলিম : ৩১৯, আহমাদ : ২৫৮৯৪

১২. স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করেছে, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করা

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবশিষ্টটুকু প্রদান করলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও পাত্রের সে স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন। তবে যুহায়র কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে “পান করার” উল্লেখ নেই।  সহিহ মুসলিম : ৩০০

১৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সুন্দর নামে ডাকতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর স্ত্রীর সাথে মজার ছলে কথা বলতেন

আয়েশা (রাঃ) যখন ছোট ছিলেন, তখন কাপড়ের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তার মধ্যে ০২ টি ঘোড়া ছিল, যার দু’টি ডানা ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, ’এটা কী?’ আয়েশা বললেন, ’ঘোড়া।’ তিনি বললেন,

فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ قَالَتْ أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلاً لَهَا أَجْنِحَةٌ قَالَتْ فَضَحِكَ حَتّٰـى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ

ঘোড়ার আবার দু’টি ডানা?’ আয়েশা বললেন, ’আপনি কি শুনেননি, সুলাইমান (নবী)র ডানা-ওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং সে হাসিতে তাঁর চোয়ালের দাঁত দেখা গেল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৭, মিশকাত  : ৩২৬৫, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৮৬৪, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে হালকা ঠাট্টা-মশকরা করেতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা সাওদা বিনতে যামআ’ আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায় এলো। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও আমার মাঝখানে বসে গেলেন। তাঁর ০২ টি পা আমার কোলে, আর ০২ টি পা সাওদার কোলে ছিল। আমি তার (সাওদার) জন্য ’খাযীরা’ (গোশ্ত ছোট ছোট করে কেটে তাতে আটা মিশিয়ে রান্না করা খাবার) তৈরী করলাম। অতঃপর তাকে খেতে বললে সে খেতে অস্বীকার করল। আমি বললাম, ’তুমি অবশ্যই খাবে, নচেৎ আমি তোমার মুখে তা লেপে দেব।’ সে অস্বীকার করলে আমি প্লেট থেকে সামান্য পরিমাণ নিয়ে তার মুখে লেপে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোল থেকে স্বীয় পা সরিয়ে নিলেন, যাতে সে আমার কাছ থেকে বদলা নিতে পারে। অতঃপর আমি প্লেট থেকে আরো কিছু নিয়ে আমার মুখে লেপে নিলাম। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন। ইত্যবসরে উমার (রাঃ) উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, ’হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার! হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার!’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা উঠে তোমাদের মুখ ধুয়ে নাও, আমার মনে হয় উমার প্রবেশ না করে ছাড়বে না। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৮, নাসাঈ কুবরা : ৮৯১৭, সহীহাহ : ৩১৩১, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন খাবারের দোষ ধরতেন না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাবারের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করেননি। ভাল লাগলে তিনি খেতেন এবং খারাপ লাগলে রেখে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৫৬৩, ৫৪০৯, সহিহ মুসলিম : ৫৫০৪, হাদিস সম্ভার : ২৫৯৩

১৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সফর করতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের মনস্থ করলে স্ত্রীগণের মধ্যে কুরআর ব্যবস্থা করতেন। যার নাম আসত তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হতেন। এছাড়া প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একদিন এক রাত নির্দিষ্ট করে দিতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) নিজের দিন ও রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। সহিহ বুখারি : ২৫৯৩, ২৬৩৭, ২৬৬১, ২৬৮৮, ২৮৭৯, ৪০২৫, ৪১৪১, ৪৬৯০, ৪৭৪৯, ৪৭৫০, ৪৭৫৭, ৫২১২, ৬৬৬২, ৬৬৭৯, ৭৩৬৯, ৭৩৭০,৭৫০০, ৭৫৪৫

১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আনন্দ উপভোগ করতেন

উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হাবশীরা তাদের বর্শা নিয়ে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে পর্দা করে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন এবং আমি সেই খেলা দেখছিলাম। যতক্ষণ আমার ভাল লাগছিল ততক্ষণ আমি দেখছিলাম। এরপর আমি স্বেচ্ছায় সে স্থান ত্যাগ করলাম। সুতরাং তোমরা অনুমান করতে পার কোন্ বয়সের মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা

আমর ইবনু ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যাতুস্ সালাসিল যুদ্ধের সেনাপতি করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ’আয়িশাহ্। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা (আবূ বকর)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, ’উমার ইবনু খাত্তাব অতঃপর আরো কয়েকজনের নাম করলেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৬২, ৪৩৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৮৪, আহমাদ : ১৭৮৫৭

১৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমাতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১

২০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে খেলা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

২১. সূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক স্ত্রীর সাথে সমতা রেখে চলতেন

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী ’আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন স্ত্রীদের মধ্যে লটারী করতেন। লটারীতে যার নাম উঠতো তিনি তাকেই সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য পালাক্রমে রাত ও দিন ভাগ করে নিতেন। তবে যাম’আহর কন্যা সাওদাহ (রাযি.) তার পালার দিনটি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দিয়ে দেন। সুনানে আবু দাউদ : ২১৩৮

২২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতায় তার স্ত্রীর সুরা নাস ও ফালাক পড়ে ফু দিতেন

আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থ হতেন, তখন তিনি নিজের উপর সূরা নাস-ফালাক পাঠ করতেন এবং ফুঁক দিতেন। অতঃপর যখন তাঁর পীড়া প্রকট হয়ে যায়, তখন আমি তাঁর উপর এসব পড়তাম আর বরকতের আশায় তাঁর হাত দিয়ে তাঁকে বুলিয়ে দিতাম। সহহি বুখারি : ৪৪৩৯, ৫০১৬, সহীহ মুসলিম : ২১৯২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৯০২, সহীহাহ : ২৭৭৫, সহিহ ইবনে হিব্বান স: ২৯৫২

২৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর অবর্তমানে তার বান্ধবিদের উপহার পাঠান

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ (রাঃ)-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন। খাদীজাহ (রাঃ)-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদেশ করেন। কোন দিন বকরী যবহ হলে খাদীজাহ (রাঃ)-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মত গোশ্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৯১৬, ৩৮১৭, ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

২৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর পছন্দের গুরুত্ব দিতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

২৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের দুঃখে সান্ত্বনা দিতেন

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, সাফিয়্যাহ (রাযিঃ)-এর কানে পৌছে যে, হাফসাহ (রাযিঃ) তাকে ইয়াহুদীর মেয়ে বলে ঠাট্টা করেছেন। তাই তিনি কাঁদছিলেন। তার ক্ৰন্দনরত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি বললেনঃ তোমাকে কিসে কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, হাফসাহ আমাকে ইয়াহূদীর মেয়ে বলে তিরস্কার করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অবশ্যই তুমি একজন নবীর কন্য, তোমার চাচা অবশ্যই একজন নবী এবং তুমি একজন নবীর সহধর্মিণী। অতএব কিভাবে হাফসাহ তোমার উপরে অহংকার করতে পারে? তারপর তিনি বললেনঃ হে হাফসাহ আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৬৪, মিশকাত : ৬১৮৩

২৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর জন্য উপহার কিনে দিতেন

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বাজারে গিয়েছিলেন এবং দুটি জুতা কিনলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো সাওদা (রাঃ)-কে দিলেন।” মুসনাদে আহমাদ : ২৬৬৯৩

২৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন

…….উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তা হলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা এত হেয় হবো? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনিই আমার সাহায্যকারী।’ আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা‘বা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। ‘উমার (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, ‘হে আবূ বকর। তিনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন?’ আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তবে কেন এখন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে! নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন।’ আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তার তাওয়াফ করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে একথা কি তিনি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘তবে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।’ যুহরী (রহ.) বলেন যে, ‘উমার (রাঃ) বলেছেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফ্ফারা হিসেবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবাদেরকে বললেন, ‘তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল।’ রাবী বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল তিনবার তা বলার পরও কেউ উঠলেন না।’ তাদের কাউকে উঠতে না দেখে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর নিকট এসে লোকদের এই আচরণের কথা বলেন। উম্মু সালামাহ (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।’ সেই অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়ালেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন…….। সহিহ বুখারি : ২৭৩১ বিশাল হাদিসের প্রয়োজনীয় অংশ।

নোট : এই ঘটনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মে সালামা (রাঃ)-এর পরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর মতামতকে কতটা সম্মান করতেন। এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে, যেখানে সাহাবিরাও দ্বিধায় ছিলেন, উম্মে সালামা (রাঃ)-এর বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ সংকট সমাধান করেছিল।

২৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি এতটুকু অভিমান করিনি, যতটুকু খাদীজা (রা)-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা অধিক সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যবেহ করে মাংসের পরিমান বিবেচনায় হাড়-মাংসকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদিজা (রাঃ) এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোন সময় অভিমানের সুরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতাম, (আপনার অবস্থা দৃষ্টে) মনে হয়, খাদীজা (রাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন নারী নেই। প্রতি উত্তরে তিনি বলতেন, হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তান জন্মেছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

নোট : মৃত্যুর পরও খাদীজা (রা)-এর প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত ছিল।

২৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর কষ্টের সময় সান্তনা দিতেন

আয়িশা (রাঃ) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো জানাযা পড়ে বাকী’ (গোরস্থান) থেকে আমার নিকট এলেন। তখন আমার মাথায় ছিল যন্ত্রণা। আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা গেল! তিনি বললেন, বরং আমার মাথাও গেল! (হে আয়েশা!) তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও এবং আমি তোমাকে গোসল দিই, কাফনাই, অতঃপর তোমার উপর জানাযা পড়ে তোমাকে দাফন করি, তাহলে এতে তোমার নোকসান আছে কি? ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, ইবনে হিব্বান : ৬৫৮৬, দারাকুত্বনী : ১৯২, বাইহাক্বী : ৬৯০৪, ইরওয়াহ : ৭০০

ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলকে সামনে রেখে নির্ধারিত। পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ (contraception) বিষয়টিও মুসলিম সমাজে আলোচ্য হয়ে থাকে। অনেকেই এ ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা না জানার কারণে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তাই আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী আমরা তিনটি অংশে বিষয়টি ব্যাখ্যা করব।

১. ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম সন্তান জন্মদানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহা নিয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন-

لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنْ یَّشَآءُ  اِنَاثًا وَّ یَهَبُ  لِمَنْ  یَّشَآءُ   الذُّکُوْرَ ﴿ۙ۴۹﴾اَوْ یُزَوِّجُهُمْ ذُکْرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجْعَلُ مَنْ  یَّشَآءُ  عَقِیْمًا ؕ اِنَّہٗ  عَلِیْمٌ  قَدِیْرٌ ﴿۵۰﴾

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। সুরা আশ-শূরা : ৪৯-৫০

এ থেকে বোঝা যায়, সন্তান দান বা না দান করা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে।

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আযলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রত্যেক পানিতে সন্তান জন্ম হয় না। আর আল্লাহ তা’আলা যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন কোনো কিছুই তা প্রতিরাধ করার ক্ষমতা রাখে না। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৮, মিশকাত : ৩১৮৭, আহমাদ : ১১৪৬২, সহীহ আল জামি : ৩১০।

সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি স্ত্রীসহবাসের সময় ’আযল করি। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এটা কর? উত্তরে সে বলল, আমি তার সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় এটা করি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এতে যদি কোনো প্রকার ক্ষতি হতো তাহলে পারস্যবাসী (ইরান) ও রোমকগণও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সহিহ মুসলিম : ১৪৪৩, মিশকাত : ৩১৮৮, আহমাদ : ২১৭৭০

উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং অধিক সন্তান দানকারিনী নারীকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, মিশকাত : ৩০৯৭, সুনানে নাসায়ি : ৫৩৭৯

তবে ইসলামে মানুষকে কিছু বিষয়ে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন—চিকিৎসা গ্রহণ করা, খাদ্য গ্রহণ করা, নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি। এর ভিত্তিতে আলেমগণ বলেন, সন্তান জন্মদানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বা বিরতি নেওয়ার অনুমতি শরীয়তে কিছু শর্তসাপেক্ষে বৈধ হতে পারে।

কিন্তু স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট করা (যেমন—স্টেরিলাইজেশন, নর-নারীর প্রজনন অঙ্গ কেটে ফেলা বা স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ করা) সাধারণ অবস্থায় হারাম। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন এবং বংশধারা বন্ধ করে দেওয়ার সমান, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

২. আজল ও জন্মনিয়ন্ত্রণ

“আজল” (العزل) অর্থ হলো সহবাসের সময় বীর্যপাতের আগে পুরুষাঙ্গ বের করে নেওয়া, যাতে বীর্য স্ত্রীর গর্ভে না পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম নবিজির ﷺ যুগে এ কাজ করতেন।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’আযল করতাম। সে সময় কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল। সহিহ বুখারি : ৫২০৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৪০

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী মুসত্বালিক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম এবং এ যুদ্ধে আমরা অনেক ’আরাবীয় নারী বন্দীনীরূপে করায়ত্ত করি। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন নারীবিহীন থাকায় অস্বস্থিবোধ করছিলাম, ফলে আমরা নারী সঙ্গমের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমরা ’আযল করা পছন্দ করলাম এবং আমরা পরস্পরের মধ্যে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে সমুপস্থিত থাকতে তাঁকে জিজ্ঞেস না করে এরূপ করা কি ঠিক হবে? অতঃপর আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা ’আযল করবে না এমনটি নয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত (সৃষ্টিজীব পৃথিবীতে) যা হওয়ার আছে, তা অবশ্যই সৃষ্টি হবে। সহিহ বুখারী : ৪১৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৭২, মিশকাত : ৩১৮৬, আহমাদ : ১১৬৪৭।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, আজল মুলত সন্তান জন্মদানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি ছিল, যা নবিজি ﷺ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেননি। তবে তিনি এটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা শতভাগ কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেননি।

আজলের সাথে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির একটি মৌলিক মিল রয়েছে—দুটিই গর্ভধারণ ঠেকানোর প্রচেষ্টা। পার্থক্য হলো, আজল কেবল স্বাভাবিক যৌন মিলনের সময়কার একটি সাময়িক কৌশল, আর আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ নানা রকম হতে পারে—গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট, ইনজেকশন, কন্ডম, কপার-টি, ইত্যাদি।

আযল ও জন্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে পার্থক্য :

বৈশিষ্ট্যআযল (ঐতিহ্যবাহী কৌশল)আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
পদ্ধতিসহবাসের সময় পুরুষাঙ্গ বাইরে বের করে বীর্যপাত করা।কনডম, পিল, ইনজেকশন, আইইউডি (IUD), স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ ইত্যাদি।
কার্যকারিতাকম কার্যকর, গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা থাকে।তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।
শরয়ী বিধানশর্ত সাপেক্ষে জায়েজ (স্বামীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন)।সাময়িক ব্যবস্থা শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ; স্থায়ী ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তবে জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে বৈধ।
রাসূল (সাঃ)-এর যুগেপ্রচলিত ছিল এবং রাসূল (সাঃ) সরাসরি নিষেধ করেননি।প্রচলিত ছিল না।

অতএব, বলা যায় আজলও এক ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ, তবে এটি প্রাচীন পদ্ধতি। আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ তার বিকল্প ও সম্প্রসারিত রূপ। তবে একটি সহিহ হাদিসে আজল করাকেও হত্যা বলা হয়েছে।

জুযামাহ্ বিনতু ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কিছু সংখ্যক লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলছিলেন যে, আমি ’গীলাহ’ (স্তন্যদায়িনী নারীর সাথে সহবাস করা।) হতে নিষেধ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম; কিন্তু যখন পারস্য (ইরান) এবং রোমবাসীদের ব্যাপারে জানতে পারলাম যে, তারা (সন্তানের আশঙ্কায়) গীলাহ্ করে অথচ এটা তাদের কোনো প্রকার ক্ষতির কারণ নেই। অতঃপর লোকেরা তাঁকে ’আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা পরোক্ষভাবে জীবন্ত কন্যা পুঁতে দেয়া (সমাধিস্থ করা), যে সম্পর্কে কুরআন মাজীদের আয়াত আছে- ’’যখন জীবন্ত পুঁতে দেয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’’ সূরা তাকভীর  ৮-৯। সহিহ মুসলিম : ১৪৪২, আবূ দাঊদ : ৩৮৮২, নাসায়ী : ৩৩২৬, তিরমিযী : ২০৭৭, মিশকাত : ৩১৮৯, আহমাদ : ২৭০৩৪, দারিমী : ২৬৬৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪১৯৬, সহীহ আল জামি : ৫১৪৫।

আলেমগণ এ হাদিস ও জাবির (রাঃ) এর হাদিস দুটি সমন্বয় করে বলেন যে, যদিও রাসূল (সাঃ) আযলকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেননি, তবে তিনি এটিকে উৎসাহিতও করেননি; বরং সতর্ক করেছেন। তাঁর এই সতর্কবাণী থেকে বোঝা যায়, আযল মূলত মাকরুহ (অনুত্তম), তবে কিছু বৈধ কারণে স্ত্রী ও স্বামীর পারস্পরিক সম্মতিতে এটি সাময়িকভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩. ইসলামের দৃষ্টিতে কখন জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয আর কখন নাজায়েয?

জায়েয হওয়ার শর্ত

ইসলামী ফিকহের আলোকে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে বৈধ বলে গণ্য হয়। নিম্নলিখিত শর্ত ও উদ্দেশ্যে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েয বা বৈধ:

ক. মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে:

যদি মা শারীরিকভাবে দুর্বল হন অথবা অসুস্থতার কারণে গর্ভধারণ করলে তার স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতি বা জীবননাশের আশঙ্কা থাকে।

দলিল: রাসূল (সাঃ)-এর যুগে দাসীর গর্ভধারণে স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা একটি বৈধ কারণ ছিল (যা আধুনিক যুগে স্ত্রীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। এছাড়া ইসলামে ক্ষতিকর বিষয় এড়িয়ে চলার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেন,

“আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর তোমাদের দ্বীনে কোনো ক্ষতিকর বিষয় রাখেননি।” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)

খ. দুই সন্তানের মাঝে ব্যবধানের জন্য (Spacing):

যদি সদ্য ভূমিষ্ঠ দুগ্ধপোষ্য সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বা মায়ের যত্নের সুবিধার জন্য এক বা দুই বছর সন্তানদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিরতি (ব্যবধান) রাখার উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে তা জায়েয। তবে এর উদ্দেশ্য হবে পরিকল্পনা, সন্তান সীমিত করা নয়।

দলিল: সাহাবিরা আযল করতেন স্তন্যদানকারী শিশুর (غيلة) ক্ষতি এড়ানোর জন্য। যদিও পরে রাসূল (সাঃ) জানান যে এতে সামান্যই ক্ষতি হয়, তবে সাময়িক বিরতির ধারণাটি এতে প্রতিফলিত হয়।

গ. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে:

সাময়িক পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকা আবশ্যক। আযল বা অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করার সময় স্ত্রীর অনুমতি জরুরি। (ইবনু কুদামা, আল-মুগনি)

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি দাসী আছে, আমি তার সাথে ’আযল’ করে থাকি। আমি তার গর্ভবতী হওয়া পছন্দ করি না। আর আমি তাই (সঙ্গম) ইচ্ছা রাখি যা অন্যান্য পুরুষেরা (দাসীর সাথে) ইচ্ছা রাখে। ইয়াহুদীরা বলে থাকে, ’আযল’ নাকি গোপন হত্যা। তার কথা শুনে তিনি বললেনঃ ইয়াহুদীরা মিথ্যা বলেছে। যদি মহান আল্লাহ কোনো প্রাণীকে সৃষ্টি করা নির্ধারিত করেন তবে তা রোধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৭১

অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয নয়।

ঘ. স্থায়ীভাবে বংশধারা বন্ধ না করা

জন্মনিয়ন্ত্রণ সাময়িক হলে অনুমোদিত, কিন্তু স্থায়ীভাবে বন্ধ করা শরীয়তে নাজায়েয, বিশেষ কোনো চরম চিকিৎসাগত কারণে ছাড়া।

নাজায়েয বা হারাম হওয়ার কারণ

ক. আল্লাহর রিজিক নিয়ে সন্দেহ করা

ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অধিক সন্তান লাভে উৎসাহিত করা এবং আল্লাহ্‌র দেওয়া রিযিকের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা। জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে এই মৌলিক নীতির লঙ্ঘন হয় বলে আলেমরা সাধারণত একে নিরুৎসাহিত করেন। রিযিকের মালিক আল্লাহ্‌: ইসলাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি সন্তানের রিযিক (জীবিকা) আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিত। দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানকে হত্যা করা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُہُمۡ وَاِیَّاکُمۡ ؕ اِنَّ قَتۡلَہُمۡ کَانَ خِطۡاً کَبِیۡرًا

অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিয্ক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। সুরা আল-ইসরা : ৩১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দারিদ্র্যের ভয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা বা সন্তান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা হারাম বা মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি আল্লাহ্‌র রিযিকের ওয়াদার উপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে।

খ. স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদান বন্ধ করা

আল্লাহ্‌র সৃষ্টিতে পরিবর্তন: স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন- টিউবেকটমি বা ভ্যাসেকটমি) গ্রহণ করাকে কিছু আলেম আল্লাহ্‌র সৃষ্টি কাঠামোতে পরিবর্তন (তাগয়ীরুল খালক) হিসেবে গণ্য করেছেন, যা শয়তানের কাজ বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

وَّلَاُضِلَّنَّہُمۡ وَلَاُمَنِّیَنَّہُمۡ وَلَاٰمُرَنَّہُمۡ فَلَیُبَتِّکُنَّ اٰذَانَ الۡاَنۡعَامِ وَلَاٰمُرَنَّہُمۡ فَلَیُغَیِّرُنَّ خَلۡقَ اللّٰہِ ؕ  وَمَنۡ یَّتَّخِذِ الشَّیۡطٰنَ وَلِیًّا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ فَقَدۡ خَسِرَ خُسۡرَانًا مُّبِیۡنًا ؕ

‘আর অবশ্যই আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, মিথ্যা আশ্বাস দেব এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ দেব, ফলে তারা পশুর কান ছিদ্র করবে এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ করব, ফলে অবশ্যই তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবে’। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা তো স্পষ্টই ক্ষতিগ্রস্ত হল। সূরা নিসা : ১১৯

স্থায়ী বন্ধ্যাকরণকে অনেক আলেম এই পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, তবে কিছু আলেম বিশেষ স্বাস্থ্যগত কারণে এটিকে বৈধ বলেছেন। যেমন—বন্ধ্যাকরণ (Sterilization), টিউব কেটে ফেলা ইত্যাদি। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিতে স্থায়ী পরিবর্তন এবং মানবজাতির বংশধারা কেটে দেওয়া।

গ. স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ

ইসলাম দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ঘ. কোনো হারাম বা ক্ষতিকর উপায়ে গর্ভনিরোধ

যদি পদ্ধতিটি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয় অথবা শরীয়তবিরোধী হয়, তবে তা হারাম গণ্য হবে।

উপসংহার : ইসলামে সন্তান দান বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মূলনীতি হলো ভারসাম্য। সন্তান আল্লাহর নিয়ামত, তাই কেবল দারিদ্র্য বা ভোগবাদী কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে বৈধ কারণ,  স্ত্রীর স্বাস্থ্য, সন্তান পালনে সময় প্রয়োজন, কিংবা চিকিৎসাগত ঝুঁকি থাকলে—সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুমতি রয়েছে। আজল ছিল সাহাবাদের যুগের জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি, যা নবিজি ﷺ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেননি। তাই আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণও একইভাবে কিছু শর্তসাপেক্ষে জায়েয।  কিন্তু স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ, আল্লাহর রিজিক নিয়ে সন্দেহ, অথবা হারাম উপায়ে গর্ভনিরোধ ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না।

দাম্পত্য জীবনের বিধান ও যোগ্যতা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দাম্পত্য জীবন হলো একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে একটি পবিত্র এবং আইনসম্মত বন্ধন, যা ইসলামে বিবাহ (নিকাহ) নামে পরিচিত। এই সম্পর্ক কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নেয়ামত এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস। ইসলামে দাম্পত্য জীবনকে শুধুমাত্র সামাজিক সম্পর্ক বা শারীরিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে একটি ইবাদত, রহমত ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তা’আলা দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা রূম : ২১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দাম্পানত্য জীবনের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রশান্তি ও শান্তি অর্জন।  স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য মানসিক আশ্রয়স্থল এবং ভরসার জায়গা। আল্লাহ এই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া এমনভাবে স্থাপন করেছেন, যা দুনিয়ার অন্য কোনো সম্পর্কে পাওয়া যায় না।

বিবাহের বিধান

ইসলামে বিবাহের হুকুম (আহকাম) ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার কারণে পরিবর্তিত হয়। আলেমগণ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিচে সংক্ষেপে প্রতিটি হুকুম, তার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরছি—

১. বিবাহ করা ওয়াজিব

যখন কোনো ব্যক্তি জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম হয় এবং সে আশঙ্কা করে যে ব্যভিচার (যিনা) করে ফেলবে, তখন তার জন্য বিবাহ ওয়াজিব।

আল্লাহ বলেন—

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সূরা আন-নূর ২৪:৩২

আয়াতে আল্লাহ অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎ দাস-দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা মুসলিম সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে। কাজেউ যারা জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম তাদের বিবাহ কার ওয়াজিব বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন-

وَلۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ

আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সুরা নূর : ৩৩

আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।” এখানে সংযম বলতে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই বোঝানো হয়নি, বরং এর দ্বারা দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মনকে খারাপ চিন্তা থেকে দূরে রাখাও বোঝানো হয়েছে। এটি একটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ, ইসলামে কেবল বাহ্যিক আমলই নয়, বরং মনের পবিত্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এই সংযম অবলম্বন করা ফরজ, যাতে তারা কোনোভাবেই যিনা বা ব্যভিচারের মতো গুরুতর পাপে জড়িয়ে না পড়ে।

আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬,  সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

ব্যাখ্যা : এখানে নবী ﷺ স্পষ্ট করেছেন, যদি দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা না যায় তবে বিয়ে করা অপরিহার্য।

২. বিবাহ করা সুন্নাহ

যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, কিন্তু ব্যভিচারের আশঙ্কা নেই—তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সুন্নাহ বা মু’আক্কাদাহ সুন্নাহ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪

নবী ﷺ বিবাহকে নিজের সুন্নাহ বলেছেন, তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যভিচারের ভয় না থাকে তবে এটি সুন্নাহ।

৩. বিবাহ মুস্তাহাব

যখন কেউ ব্যভিচারের ভয় পায় না, আবার বিবাহ না করলে কোনো ক্ষতির শঙ্কাও নেই, তবে বিবাহ করলে দ্বীন পালন, আত্মীয়তার বন্ধন ও সন্তান উৎপাদনের সুযোগ হয়। এ ক্ষেত্রে বিবাহ মুস্তাহাব।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, সহিহ ইবন হিব্বান : ৪০৩১

এখানে সন্তান উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই কেউ যদি ব্যভিচারের আশঙ্কা না রেখেও বিবাহ করে, তবে এটি মুস্তাহাব। যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, তার জন্য বিবাহ করা মুস্তাহাব। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই।

৪. বিবাহ করা হারাম

যখন কোনো ব্যক্তি জানে যে, সে স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না বা স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ক্ষতি করবে, অথবা বিবাহের উদ্দেশ্য হারাম কাজে ব্যবহার করা (তালাক দিয়ে কষ্ট দেয়া, ধোঁকা দেয়া) তাহলে তার জন্য বিবাহ হারাম।

যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। ফিক্বহুস সুন্নাহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩১

অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনছাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ

আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময় দেবে তার মাধ্যমে তারা উভয়ে মুক্ত হয়ে গেলে তাতে কোনো পাপ নেই। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। সূরা বাকারা : ২২৯

খায়সামাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার কোষাধ্যক্ষ আসলেন। তিনি বললেন, তুমি কি গোলামদের খাবারের ব্যবস্থা করেছো? তিনি বললেন, না! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাদের খাবার দিয়ে আসো। বর্ণনাকার বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাদের ভরণ-পোষণ করা, ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য তা না করে আটকে রাখাই কোন ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সহিহ মুসলিম : ৯৯৬

 যে ব্যক্তি স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না, তার বিয়ে করা হারাম, কারণ এটি জুলুম ও গুনাহর কারণ।

দাম্পত্য জীবন শুরু যোগ্যতা

আমর ইবনুল আহ্ওয়াস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বিদায় হাজ্জে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করেন এবং ওয়াজ-নসীহত করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তোমরা নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ শুনে নাও। কেননা তারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ আছে। এর অধিক তাদের উপর তোমাদের কর্তৃত্ব নাই যে, তারা যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, সত্যিই যদি তারা তাই করে, তবে তোমরা তাদেরকে পৃথক বিছানায় রাখবে এবং আহত হয় না এরূপ হালকা মারধর করবে। অতঃপর তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের উপর আর বাড়াবাড়ি করো না। স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের উপরও তাদের অধিকার আছে। তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের শয্যা তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদের দ্বারা মাড়াবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদেরকে তোমাদের ঘরে প্রবেশানুমতি দিবে না। সাবধান! তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তাদের ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সজ্জার ব্যাপারে তোমরা তাদের প্রতি শোভনীয় আচরণ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫১, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ : ১৯৯৭-২০২০

সুতরাং, ইসলামে দাম্পত্য জীবন হলো একটি পবিত্র বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবার গঠিত হয় এবং সমাজ নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। যেমন-

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ২৮৫

দাম্পত্য জীবন শুরু করার শর্ত :

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দাম্পত্য জীবন শুরু করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরং এটি ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, আর্থসামাজিক এবং ধর্মীয় প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। ইসলামে বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ঈমানকে পূর্ণতা দেওয়া, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করা এবং একটি সুস্থ ও শান্তিময় পরিবার গঠন করা। তাই যখন কোনো ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করে, তখনই তার জন্য বিয়ে করা উত্তম। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবন শুরু করার উপযুক্ত হওয়ার কিছু শর্ত আলোচনা করা হলো-

১. শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা :

বিয়ের জন্য শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَابۡتَلُوا الۡیَتٰمٰی حَتّٰۤی اِذَا بَلَغُوا النِّکَاحَ ۚ فَاِنۡ اٰنَسۡتُمۡ مِّنۡہُمۡ رُشۡدًا فَادۡفَعُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ اَمۡوَالَہُمۡ ۚ

আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে পরীক্ষা কর যতক্ষণ না তারা বিবাহের বয়সে পৌঁছে। সুতরাং যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা নিসা : ৬

আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বিয়ের জন্য শুধু শারীরিক নয়, মানসিক পরিপক্কতা বা বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, পিতৃহীন শিশুদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে তাদের পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা করতে হবে যে তারা বিবাহের উপযুক্ত হয়েছে কিনা এবং তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা এসেছে কিনা। এটি কেবল বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা যাচাই করার নির্দেশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে একটি গুরুতর দায়িত্ব, যার জন্য শুধুমাত্র শারীরিক বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, বরং জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকা আবশ্যক। তাই ইসলামে বিয়ের জন্য বয়স নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতি ও পরিপক্কতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই পরিপক্কতা অর্জনের পর একজন ব্যক্তি একটি সুখী ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন শুরু করতে পারে।

২. বালেগ বা প্রপ্ত বয়স হওয়া

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতার অন্যতম লক্ষণ হলো বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া। বালেগ হওয়ার বিষয়টি ব্যক্তির জন্য শরিয়তের সকল বিধিবিধান সালাত, সাওম, হজ, যাকাত ইত্যাদি আবশ্যিক করে তোলে। বালেগ হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে, যা ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শরীয়তের দৃষ্টিতে বালেগ হওয়ার কয়েকটি সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। বালেগ হওয়ার শারীরিক লক্ষণগুলো হলো-

ক. সস্বপ্নদোষ হওয়া

ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই বয়ঃপ্রাপ্তির অন্যতম লক্ষণ হলো স্বপ্নদোষ। ঘুমের মধ্যে এটি হলে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে বলে ধরা হয়। স্বপ্নদোষ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই বালেগ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, (২) অসুস্থ (পাগল) ব্যক্তি, যতক্ষণ না আরোগ্য লাভ করে এবং (৩) অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না বালেগ হয়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৯৮

খ. মাসিক স্রাব হওয়া

মেয়েদের ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হওয়া প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, একজন নারী শারীরিকভাবে সন্তান ধারণের জন্য সক্ষম হয়েছেন এবং তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ ফাতিমা বিনতু আবূ হুবায়শ (রাঃ) আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমি কখনও পবিত্র হই না। এমতাবস্থায় আমি কি সালাত ছেড়ে দেব? আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ হলো এক ধরনের বিশেষ রক্ত, হায়েযের রক্ত নয়। যখন তোমার হায়েয শুরু হয় তখন তুমি সালাত ছেড়ে দাও। আর হায়েয শেষ হলে রক্ত ধুয়ে সালাত আদায় কর। সহিহ বুখারি : ৩০৬

গ. সন্তান ধারণের সক্ষমতা :

একজন নারীর যখন সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা তৈরি হয়, তখন তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হিসেবে গণ্য হন। সাধারণত ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এই সক্ষমতা প্রকাশ পায়। এটি বয়ঃপ্রাপ্তির একটি প্রধান শারীরিক লক্ষণ।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৩

ঘ. শুক্লসদৃশ আঠালো পদার্থ নির্গত হওয়া :

পুরুষদের ক্ষেত্রে, উত্তেজনার ফলে বীর্যপাত হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হওয়ার একটি লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। এটি একজন পুরুষের শারীরিক ও যৌন পরিপক্কতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

উম্মু সালামাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উম্মু সুলায়ম (রাযি.) এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’হ্যাঁ, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।’ তখন উম্মু সালামাহ (লজ্জায়) তার মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! মহিলাদেরও স্বপ্নদোষ হয় কি?’ তিনি বললেন, ’হ্যাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক! (তা না হলে) তাদের সন্তান তাদের আকৃতি পায় কীভাবে? সহিহ বুখারি : ১৩০, ২৮২, ৩৩২৮, ৬০৯১, ৬১২১; মুসলিম : ৩১৩, আহমাদ : ২৬৬৭৫

ঙ. গোপনাঙ্গের আশেপাশে চুল বৃদ্ধি পাওয়া

গোপনাঙ্গের আশেপাশে চুল গজানো বালেগ হওয়ার শরিয়ত নির্ধারিত চিহ্ন। রাসূল ﷺ খাইবার যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে ছোট ছেলে-মেয়ে আলাদা করার সময় নির্দেশ দিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চিহিৃত করেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন –

ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ فِي بَنِي قُرَيْظَةَ ‏”‏ لاَ يُقْتَلُ مِنْهُم مَنْ لَمْ يُنْبِتْ ‏”‏ ‏.‏ فَاسْتَحْيَا النَّاسُ حَتَّى بَعَثُوا إِلَيْهِ، فَنَظَرَ إِلَى الْعَانَةِ فَتَرَكَهُ، وَمَنْ أَنْبَتَ قَتَلَهُ ‏.‏

 নবী ﷺ বনু কুরাইজা সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের মধ্যে থেকে তাকে হত্যা করা হবে না, যার (জননাঙ্গে) চুল গজায়নি।’ তখন লোকজন লজ্জাবোধ করল, এমনকি তারা তার (সাদ ইবনে মু’আযের) কাছে লোক পাঠাল। অতঃপর তিনি তার লজ্জাস্থান দেখলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। আর যার (চুল) গজায়নি, তাকে হত্যা করলেন। সহিহব বুখারি : ২৫৪১

এই হাদিসটি বনু কুরাইজা গোত্রের ঘটনা সম্পর্কিত। যুদ্ধের পর তাদের বিচার করা হয়। রাসূল ﷺ নির্দেশ দেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক (যাদের জননাঙ্গে লোম গজায়নি) ছেলেদের হত্যা করা হবে না, শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের (যাদের লোম গজিয়েছে) হত্যা করা হবে। এই হাদিসটি ইসলামী আইনে বালক বালেগ হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান শারীরিক লক্ষণ হিসেবে জননাঙ্গে লোম গজানোকে প্রমাণ করে। এটি নির্ধারণ করে যে, একজন ব্যক্তি কখন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আইনের আওতায় আসবে।

চ. বয়সের ভিত্তিতে বালেগ নির্ধারণ

যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে উপরের কোনো লক্ষণই প্রকাশ না পায়, তাহলে বয়সের ভিত্তিতে বালেগ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হবে। অধিকাংশ ফিকহবিদদের মতে, ১৫ বছর বয়সে উপনীত হলে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই বালেগ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যদি এর আগে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়। এই মতের পক্ষে দলিল হলো ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিস।

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট তাকে (ইবনু উমরকে) পেশ করলেন, তখন তিনি চৌদ্দ বছরের বালক। (ইবনু ‘উমার বলেন) তখন তিনি আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে পেশ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি পনের বছরের যুবক। নাফি‘ (রহ.) বলেন, আমি খলীফা ‘উমার ইবনু ‘আবদুল ‘আযীযের নিকট গিয়ে এ হাদীস শুনালাম। তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা। অতঃপর তিনি তাঁর গভর্নরদেরকে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে, (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স পনের হয়েছে তাদের জন্য যেন ভাতা নির্দিষ্ট করেন। সহিহ বুখারি : ২৬৬৪, ৪০৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৬৮

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহাবীদের মধ্যে যারা ১৫ বছর বয়সে উপনীত হতেন, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হতো। ইসলামী শরীয়তে বালেগ হওয়ার জন্য প্রথমে শারীরিক লক্ষণগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যদি সেগুলো প্রকাশ পায়, তাহলে সে বয়সেই ব্যক্তি বালেগ হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তাহলে সর্বসম্মত মত অনুযায়ী ১৫ বছর বয়সে উপনীত হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এই বয়সের পর থেকে সকল ইসলামী বিধান পালন করা তার ওপর বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

৩. আর্থিক সক্ষমতা :

ইসলামে বিয়ে শুধু একটি ধর্মীয় চুক্তি নয়, এটি একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বন্ধনও। যদিও ইসলামে বিয়ের জন্য বিশাল ধন-সম্পদের শর্ত নেই, তবে জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। একজন পুরুষের জন্য বিয়ের আগে এমন আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করা উচিত যাতে সে তার স্ত্রী এবং ভবিষ্যতের সন্তানদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, এবং শিক্ষা। আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে, যা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য বাধা। তাই, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করা অপরিহার্য কারণ এটি একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫

তবে মোটামুটি ভরন পোষণের ব্যবস্থা থাকলে আল্লাহ উপর ভরষা করে বিবাহ করলে তিনি প্রাচুর্যে ভবে দিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সুরা নুর : ৩২

৪. বিবাহ সম্পর্কে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা :

স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে একটি পরিবারকে ইসলামের পথে পরিচালনা করা সহজ হয় এবং দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়। ইসলামে বিবাহকে শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি একটি দ্বীনি দায়িত্ব। বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশান্তি এবং পরস্পরের ভালোবাসা। এই প্রশান্তি ও ভালোবাসা তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। আর এই সচেতনতা আসে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। একজন মুসলিম হিসেবে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত এই অধিকার ও দায়িত্বগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। যেমন-

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলমান হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম তারাই তোমাদের মধ্যে অতি উত্তম। সুনানে তিরমিজি : ১১৬২, সহীহাহ : ২৮৪

এই হাদিসটি একজন মুসলিম পুরুষের জন্য স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে। উত্তম আচরণ তখনই করা সম্ভব, যখন সে তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। একইভাবে, স্ত্রীরও তার স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও সম্মান দেখানো উচিত।

বিবাহিত জীবনের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো একটি প্রজন্মকে ইসলামের পথে পরিচালনা করা। সন্তান জন্মদানের পর তাদের সঠিক শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রীর উপর বর্তায়। যদি দম্পতি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ হয় তাহলে সন্তান কিভাবে ইসলামের জ্ঞান পাবে। সুতরাং, বিবাহকে সফল ও অর্থবহ করতে হলে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা অপরিহার্য। এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করে না, বরং একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠনেও সাহায্য করে।

পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি শরীয়তে পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, বিবাহ শুধু দুটি মানুষের মধ্যে একটি চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা একটি নতুন পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে। এই নির্বাচনের উপর একটি পরিবারের সুখ-শান্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্ভর করে। ইসলামে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা একজন মুসলিমকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মীয় গুণাবলীকে (দ্বীনদারী) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। যদিও দ্বীনদারী প্রধান শর্ত, তবে এর পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করা উচিত। তার মধ্যে অন্যতম হলো- সচ্চরিত্র, আখলাক, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ও আর্থিক সক্ষমতা। যদিও ইসলামি শরীয়তে  বিশাল ধন-সম্পদ শর্ত নয়, তবে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়।

ইসলামে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। এটি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পরিবার এবং সমাজের কল্যাণের সাথে জড়িত। সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি পরিবার সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। ইসলাম এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যা মেনে চললে একটি পরিবারে সুখ, শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।

১. পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করার প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো ঈমান

বর্তমান যুগে অনেক অজ্ঞ মুসলিম মুশরিক নারীকে বিবাহ করছে। বিশেষ করে যারা ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি জ্ঞান রাখেন না, তারা ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ। তারা মনে করে যে ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধি-নিষেধের কোনো স্থান নেই। কিন্তু এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সাবেক প্রধান মন্ত্রী হাসিনা ছেলে একজন খ্রীষ্টান মেয়ে বিবাহ করেছেন। সংবিধার বিশে রচয়িতা ও বিশিষ্ট আইনজীবি ড. কামালের মেয়ে একজন ইহুদি ছেলেকে বিবাহ করেছেন। বিষিষ্ট নাট্য অভনেতা ফেদৌসি মজুমদান, বিবাহ করেছেন মুশরিক রামেন্দ্র মজুমদার কে। এ কাজ ইসলাম সম্পূর্ণ হারাম।

কাজেই পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনে সময় প্রথম ও প্রধান  শর্ত হলো তাকে ঈমানদার হতে হবে। যদি কোন ইহুদী, খ্রীষ্টান বা মুশরিক ঈমানের স্বীকৃতি দেয় তবে তাকে বিবাহ করার কোন অসুবিধা নাই।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ  وَلَاَمَۃٌ مُّؤۡمِنَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکَۃٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ ۚ  وَلَا تُنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ  وَلَعَبۡدٌ مُّؤۡمِنٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَکُمۡ

আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে এবং মুমিন দাসী মুশরিক নারীর চেয়ে নিশ্চয় উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। সূরা বাকারা : ২২১

এই আয়াত থেকে এটি স্পষ্ট যে, পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ঈমান। সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান—এগুলো কখনোই ঈমানের ওপর অগ্রাধিকার পেতে পারে না। যদি কোনো অমুসলিম ব্যক্তি (ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিক) আন্তরিকভাবে ইসলামের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে ঈমান আনে, তবে তাকে বিবাহ করা জায়েয।

২. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে দ্বীনদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া

এটি পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান শর্ত। একজন ধার্মিক জীবনসঙ্গী তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সাহায্য করবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সহিহ মুসলিম : ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ী ৩২৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৮, মিশকাত : ৩০৭৪,  আহমাদ : ৯৫২১, ৯৫২৬,  ইরওয়া : ১৭৮৩, সহীহ আল জামি : ৩০০৩

নবীজি (সাঃ) এই চারটি গুণের কথা উল্লেখ করার পর স্পষ্টভাবে বলেছেন, “সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে, নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে অন্য সব গুণের চেয়ে ধর্মীয় জ্ঞান এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যই একজন জীবনসঙ্গীর সবচেয়ে মূল্যবান বৈশিষ্ট্য।

অন্যান্য গুণ, যেমন সম্পদ, বংশ বা সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। সম্পদ ফুরিয়ে যেতে পারে, বংশমর্যাদা সবসময় সুখ নিশ্চিত করে না, এবং সৌন্দর্য সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা হলো এমন একটি গুণ যা জীবনের সব পরিস্থিতিতে স্থির থাকে এবং একটি পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। একজন ধার্মিক জীবনসঙ্গী ভালো ও মন্দ উভয় সময়েই আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে এবং পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করবে।

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الدُّنْيَا كُلُّهَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَة الصَّالِحَة»

“দুনিয়া পুরোটাই হলো ভোগের সামগ্রী, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম ভোগের সামগ্রী হলো নেককার নারী।”

সহিহ মুসলিম ১৪৬৭, মিশকাত : ৫০৮৩, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩২, আহমাদ : ৬৫৬৭, সহীহ আল জামি :  ৩৪১৩

হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

যখন তোমাদের নিকট কেউ বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়, তখন দীনদারী ও সচ্চরিত্রের মূল্যায়ন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কর। যদি তোমার তা না কর, তাহলে দুনিয়াতে বড় রকমের ফিতনা-বিশৃঙ্খলা জন্ম দেবে। মিশকাত : ৩০৯০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৭, ইরওয়া ১৮৬৮

সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সোনা-রূপা (মূল্যবান সম্পদ) পুঞ্জীভূত করে রাখার সমালোচনায় কুরআনের আয়াত নাযিল হলে সাহাবায়ে কিরাম বলেন, তাহলে আমরা কোন্ সম্পদ ধরে রাখবো? ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি তা জেনে তোমাদের বলে দিবো। অতঃপর তিনি তার উটকে দ্রুত হাঁকিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ পেয়ে গেলেন। আমিও তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল আমরা কোন্ সম্পদ সঞ্চয় করবো? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেই যেন অর্জন করে কৃতজ্ঞ অন্তর, যিকিরকারী জিহ্বা এবং আখেরাতের কাজে তাকে সহায়তাকারী ঈমানদার স্ত্রী। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৫৬, সুনানে তিরমিজি : ৩০৯৪, রওযা ১৭৯

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ গোটা দুনিয়াই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার মধ্যে পুণ্যবতী স্ত্রীলোকের চেয়ে অধিক উত্তম কোন সম্পদ নাই।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৫

বিয়ে শুধু পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। সম্পদ, বংশ বা সৌন্দর্য আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং নেককার পরিবারের ভিত্তি হলো দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা। তাই, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় এই গুণটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা শুধু পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নয়, পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ। যদিও পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারীর গুরুত্ব তুলে ধরেছে, এর মূল শিক্ষা পাত্র-পাত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

মেয়ের অভিভাবকের জন্য এটি একটি বিশাল দায়িত্ব যে, তারা তাদের মেয়ের জন্য এমন একজন জীবনসঙ্গী খুঁজে বের করবেন যিনি তার ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। কারণ, একজন দ্বীনদার পাত্র তার স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং তাকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। সে তার পরিবারকে আল্লাহর ভয় এবং ভালোবাসা দিয়ে পরিচালিত করবে, যা একটি সুখী এবং শান্তিময় জীবনের ভিত্তি। একজন দ্বীনদার পাত্র শুধুমাত্র বাহ্যিক সম্পদ, সৌন্দর্য বা বংশমর্যাদার ওপর নির্ভর করে না। বরং সে তার স্ত্রীকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখে। সে স্ত্রীকে সম্মান করে এবং তার সাথে উত্তম আচরণ করে। এছাড়া, একজন ধার্মিক স্বামী তার সন্তানদের সৎ ও ধর্মভীরু হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আদর্শ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে, যে পাত্রের মধ্যে দ্বীনদারী নেই, তার সম্পদ বা বংশমর্যাদা যতই থাকুক না কেন, সে যেকোনো সময় বিপথে যেতে পারে এবং তার স্ত্রীর ওপর অবিচার করতে পারে। এমন সম্পর্ক শুধুমাত্র পার্থিব জীবনেই নয়, পরকালেও ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতএব, হাদিসের শিক্ষানুসারে, মেয়ের বা মেয়ের অভিভাবকের উচিত জাগতিক ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলোর চেয়ে একজন দ্বীনদার পাত্রের ধার্মিকতা, সততা এবং উত্তম চরিত্রের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, এর মাধ্যমেই একটি পরিবার দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করতে পারে।

৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সচ্চরিত্র ও নৈতিকতা দেখতে হবে

দ্বীনদারীর পাশাপাশি উত্তম চরিত্র থাকা অপরিহার্য। একজন উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি তার জীবনসঙ্গীর সাথে দয়া ও সম্মানের সাথে আচরণ করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যে ব্যক্তির দীনদারী ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সাথে বিয়ে দাও। তা যদি না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি : ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

৪. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করতে হবে

বংশের পবিত্রতা ও সামাজিক মর্যাদা দেখে বিবাহ করা উচিত, কারণ এর মাধ্যমে পরিবারের নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত হয়।

’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ করো এবং সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৮, সহীহাহ : ১০৬৭

৫. পাত্রী নির্বাচনে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনায় নিতে হবে

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেন, না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেন, এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০

৫. পাত্রী নির্বাচনে অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

انْكِحُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ

তোমরা বিবাহ করো আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গৌরব করবো। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৩,

৬. পাত্র নির্বাচনে ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা থাকা দরকার

পুরুষের জন্য বিবাহের আগে ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা জরুরি, কারণ তাকে পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

তবে মোটামুটি ভরন পোষণের ব্যবস্থা থাকলে আল্লাহ উপর ভরষা করে বিবাহ করলে তিনি প্রাচুর্যে ভবে দিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সুরা নুর : ৩২

৭. কুমারীত্ব নারীকে বিবাহ করা উত্তম

ইসলামে কুমারী নারীকে বিবাহ করাকে উৎসাহিত করা হয়, কারণ তারা সাধারণত স্বামীর প্রতি বেশি অনুগত ও প্রেমময়ী হয়।

আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ

তোমাদের কুমারী মেয়ে বিবাহ করা উচিত। কেননা তারা মিষ্টিমুখী, নির্মল জরায়ুধারী এবং অল্পতেই তুষ্ট হয়। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬১, মিশকাত : ৩০৯২, সহীহাহ : ৬২৩, সহীহ আল জামি : ৪০৫৩।

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে ফেরার সময়) যখন আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন সদ্যবিবাহিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বিবাহ করেছ! উত্তরে বললাম, জী হ্যাঁ। (পুনরায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বিধবা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমিও তার সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে এবং সেও তোমার সাথে মন খুলে আমোদ-প্রমোদ করত।

জাবির(রাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা যখন মদীনায় পৌঁছলাম, তখন আমরা নিজ ঘরে প্রবেশে উদ্যত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ থাম! রাত (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা কর (এখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো না), আমরা রাতে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করব। কেননা স্ত্রী তার অবিন্যস্ত চুল আঁচড়ে (পরিপাটি হতে) নিতে পারে এবং স্বামী বিচ্ছিন্না (প্রবাসী স্বামীর) নারী ক্ষুর ব্যবহার করে অবসর হয় (অর্থাৎ- নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করে নিতে পারে)। সহিহ বুখারী : ৫২৪৭, ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫,  মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।

৮. পাত্রী নির্বাচনে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

উট আরোহণকারিণীদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী কুরায়শ বংশের নারীগণ, তারা শৈশবকালে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা হয় এবং স্বামীর ধন-সম্পদের উত্তম রক্ষনাবেক্ষণকারিণী হয়। সহিহ বুখারি : ৫০৮২, সহিহ মুসলিম : ২৫২৭, মিশকাত : ৩২০৪ সহীহাহ্ ১০৫২, সহীহ আল জামি‘ ৩৩২৯।

৯. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ধার্মিক পুরুষের জন্য ধার্মিক নারী হতে হবে

আপনি যদি একজন ভালো জীবনসঙ্গী চান, তাহলে আপনাকে প্রথমে নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিবাহের জন্য পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের আগে নিজেদের চরিত্রকে উন্নত করা উচিত। কারণ, আপনার চরিত্র যেমন হবে, আপনার জীবনসঙ্গীর চরিত্রও তেমনই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সম্পদ, সৌন্দর্য বা বংশমর্যাদার চেয়েও ধর্মীয় জ্ঞান, সততা এবং নৈতিক গুণাবলীকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, এই গুণগুলোই একজন মানুষকে “সচ্চরিত্র” হিসেবে তৈরি করে এবং একটি সুখী ও স্থিতিশীল সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلۡخَبِیۡثٰتُ لِلۡخَبِیۡثِیۡنَ وَالۡخَبِیۡثُوۡنَ لِلۡخَبِیۡثٰتِ ۚ  وَالطَّیِّبٰتُ لِلطَّیِّبِیۡنَ وَالطَّیِّبُوۡنَ لِلطَّیِّبٰتِ ۚ  اُولٰٓئِکَ مُبَرَّءُوۡنَ مِمَّا یَقُوۡلُوۡنَ ؕ  لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ 

দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য। আর সচ্চরিত্রা নারীরা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষরা সচ্চরিত্রা নারীদের জন্য; লোকেরা যা বলে, তারা তা থেকে মুক্ত। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিয্ক। সুরা নুর : ২৬

সূরা নূরের এই আয়াতটি আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয় যে, পাত্র-পাত্রী নির্বাচন কোনো বাহ্যিক বিষয় নয়। এটি আসলে নিজেদের ভেতরের প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকেই ভালো জীবনসঙ্গী দান করেন, যারা নিজেরা ভালো এবং পবিত্র জীবনযাপন করে। তাই, বিবাহের জন্য যোগ্য পাত্র-পাত্রী খোঁজার আগে আমাদের উচিত নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সচ্চরিত্রবান মানুষ হিসেবে তৈরি করা।

১০. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সুন্দর মুখাবয়ব ও আকর্ষণীয় রূপ-সৌন্দর্য

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন-

اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا فَفَعَلَ فَتَزَوَّجَهَا فَذَكَرَ مِنْ مُوَافَقَتِهَا

তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

১১. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ধর্মীয় শিক্ষার বা দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হলে ভালো হয়

হুমায়দ ইবনু ‘আবদুর রহমান (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি মু‘আবিয়াহ (রাযি.)-কে খুৎবায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের ‘ইল্ম দান করেন। আমি তো বিতরণকারী মাত্র, আল্লাহ্ই (জ্ঞান) দাতা। সর্বদাই এ উম্মাত কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমের উপর কায়িম থাকবে, বিরোধিতাকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ৭১, ৩১১৬, ৩৬৪১,৭৩১২, ৭৪৬০, সহিহ মুসলিম : ১০৩৭, আহমাদ : ১৬৮৪৯, ১৬৮৭৮, ১৬৯১০

১৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সুস্থতা ও শারীরিক সক্ষমতা জেনে নিতে হবে :

পাত্র-পাত্রীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, সুস্থ জীবন যাপন এবং সন্তান লালন-পালনের জন্য শারীরিক সক্ষমতা জরুরি। যদি কোনো গুরুতর রোগ থাকে, যা দাম্পত্য জীবনে বা সন্তান ধারণে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তা বিবাহের আগে জেনে নেওয়া উচিত। ইসলামে এই ধরনের বিষয়গুলো গোপন রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সঞ্চয়শীলতা, একে অপরের প্রতি সম্মান, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া খুবই জরুরি। এসব গুণগুলো দাম্পত্য জীবনকে আরও সুন্দর ও স্থিতিশীল করে তোলে। বিবাহ শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবারের বন্ধন। তাই উভয় পক্ষের পরিবারের প্রতি সম্মান দেখানো এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

১৪. যাদের সাথে বিবাহ হারাম

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের সাথে বিবাহ করা হারাম বা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এই সম্পর্কের ভিত্তি হল রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কগুলো আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمۡ اُمَّہٰتُکُمۡ وَبَنٰتُکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ وَعَمّٰتُکُمۡ وَخٰلٰتُکُمۡ وَبَنٰتُ الۡاَخِ وَبَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَاُمَّہٰتُکُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَاُمَّہٰتُ نِسَآئِکُمۡ وَرَبَآئِبُکُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِکُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ ۫  فَاِنۡ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ ۫  وَحَلَآئِلُ اَبۡنَآئِکُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِکُمۡ ۙ  وَاَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ۙ

তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা নিসা : ২৩

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম, যা আয়াতের পরবর্তী অংশে বর্ণিত আছে)।

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম, যা আয়াতের পরবর্তী অংশে বর্ণিত আছে)।

}

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো পুরুষের পক্ষে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন- কোনো রমণীকে তার ফুফুর সাথে, ফুফুকে তার ভাইয়ের মেয়ের সাথে, ভাইয়ের মেয়েকে তার ফুফুর সাথে, খালাকে তার বোনের মেয়ের সাথে অথবা বোনের মেয়েকে তার খালার সাথে; এমনিভাবে ছোট বোনকে বড় বোনের সাথে, বড় বোনকে ছোট বোনের সাথে। সুনানে তিরমিযী : ১১২৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৬৫, সুনানে নাসায়ী : ৩২৯৮, মিশকাত : ৩১৭১, দারিমী : ২২২৪, আহমাদ : ৯৫০০।

রক্তের সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম

কুরআনের সূরা নিসায় সরাসরি উল্লেখ আছে যে রক্তের সম্পর্কের কারণে বিবাহ করা হারাম। এদেরকে বলা হয় ‘মুহাররামাত’।   উপরের আয়াতের আলোক যে সকল রক্তের সম্পর্কের নারীর সাথে বিবাহ হারাম তারা হলো-

ক. মা এবং নানী-দাদী : নিজের জন্মদাত্রী মা, এবং মায়ের মা ও বাবার মা (নানী-দাদী) এর সাথে বিবাহ হারাম।

খ. মেয়ে এবং নাতনি : নিজের ঔরসের মেয়ে, ছেলের মেয়ে ও মেয়ের মেয়ে (নাতনি) এর সাথে বিবাহ হারাম।

গ. বোন : আপন বোন, সৎ বোন (পিতার বা মাতার দিক থেকে) এর সাথে বিবাহ হারাম।

ঘ. ফুফু : পিতার বোন।

ঙ. খালা : মায়ের বোন।

চ. ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি) : ভাইয়ের ঔরসের মেয়ে।

ছ. বোনের মেয়ে (ভাগ্নি): বোনের ঔরসের মেয়ে।

দুধের সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম

দুধপানের মাধ্যমে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, ইসলামে তা রক্তের সম্পর্কের মতোই গণ্য হয়। সহিহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে বলা হয়েছে, “রক্তের কারণে যাদেরকে হারাম করা হয়েছে, দুধের কারণেও তারা হারাম হবে।” অর্থাৎ, কোনো শিশু যদি কোনো মহিলার দুধ পান করে, তাহলে সেই মহিলা তার দুধ-মা এবং তার স্বামী সেই শিশুর দুধ-বাবা হয়ে যান।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বংশগত (রক্ত সম্পর্কের) কারণে ও দুধপান সম্পর্কের ভিত্তিতে সকল ক্ষেত্রে বিবাহ হারাম। সহিহ বুখারী ৫২৩৯, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৫৫, মিশকাত : ৩১৬১, দারিমী : ২২৯৫, সহীহ আল জামি : ৮০৩৩।

দুধপানের মাধ্যমে নিম্নোক্ত সম্পর্কগুলো হারাম হয়ে যায়:

দুধ-মা, এবং তার মা (দুধ-নানী-দাদী)।

দুধ-বোন, অর্থাৎ যে মেয়ে ওই একই মহিলার দুধ পান করেছে।

দুধ-মেয়ে, অর্থাৎ যে শিশুর সাথে আপনি একই মহিলার দুধ পান করেছেন।

দুধ-খালা (দুধ-মায়ের বোন)।

দুধ-ফুফু (দুধ-বাবার বোন)।

দুধ-ভাতিজি ও দুধ-ভাগ্নি।

দুধপানের মাধ্যমে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত হলো, শিশুটি দুই বছর বয়সের মধ্যে অন্তত পাঁচবার পূর্ণ তৃপ্তির সাথে দুধ পান করবে।

১. শিশুটিকে পূর্ণ তৃপ্তির সাথে অন্তত পাঁচবার দুধ পান করতে হবে।

দুধপানের মাধ্যমে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে “দুই বছর বয়সের মধ্যে অন্তত পাঁচবার পূর্ণ তৃপ্তির সাথে দুধ পান করা” – এই শর্তটি সরাসরি নিম্নোক্ত হাদিস থেকে এসেছে। এই বিষয়ে সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং শক্তিশালী দলিলটি হলো সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কুরআনে যা নাযিল হয়েছিল, তার মধ্যে এটিও ছিল যে, ‘দশবার দুধপানে হারাম সাব্যস্ত হয়’। অতঃপর তা ‘পাঁচবার দুধপানে হারাম সাব্যস্ত হয়’ দ্বারা রহিত (মানসুখ) হয়ে যায়। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মারা যান, তখন এই আয়াতগুলো (শেষোক্ত বিধান) কুরআনের তিলাওয়াতযোগ্য অংশ হিসেবেই ছিল।” সহিহ মুসলিম : ১৪৫২; সুনানে আবু দাউদ : ২০৬২; সুনানে তিরমিজি : ১১৫০

প্রথমে দুধপানের সম্পর্ক হারাম হওয়ার জন্য দশবার দুধপানের বিধান ছিল। পরবর্তীতে এই বিধানটি রহিত হয়ে যায় এবং পাঁচবার দুধপানের বিধান বহাল হয়। আয়েশা (রা.) এর বক্তব্য অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের সময় এই পাঁচবারের বিধানটি কার্যকর ছিল।

উম্মুল ফাযল (রাঃ) (’আব্বাস (রাঃ)-এর স্ত্রী) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একবার বা দু’বারের দুধপানে হারাম হয় না। সহিহ মুসলিম : ১৪৫১, ইবনু মাজাহ : ১৯৪০, মিশকাত : ৩১৬৪

আর ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, (তিনি বলেন) একবার বা দু’বার চোষণে হারাম হয় না। সহিহ মুসলিম : ১৪৫০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৬৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৩১০, সুনানে তিরমিযী : ১১৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৪১, মিশকাত : ৩১৬৫

২. দুধ পানের বয়সসীমা : অধিকাংশ ফকীহ (ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ) এবং উলামাদের মতে, এই দুধপান অবশ্যই শিশুর দুগ্ধপানের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে হতে হবে। যেমন –

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ

আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সূরা বাকারা : ২৩৩।

আবদুল্লাহ্ ইবনুযু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

ا رَضَاعَ إِلَّا مَا فَتَقَ الْأَمْعَاءَ

দুধপান (যার কারণে হারাম সাব্যস্ত হয়) কেবল সেই দুধপান, যা অন্ত্র (পাকস্থলী) ভেদ করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৪৬, ইরওয়াহ : ২১৫০

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুধ ছাড়ানোর বয়সের পূর্বে স্তনের বোটা হতে শিশুর পাকস্থলীতে দুধ না গেলে দুধপানের নিষিদ্ধতা কার্যকর হয় না। সুনানে তিরমিজি : ১১৫২, মিশকাত : ৩১৭৩, ইরওয়া : ২১৫০, সহীহ আল জামি : ৭৬৩৩।

সুতরাং, এই হাদিসগুলো একত্রিত করে উলামায়ে কিরামগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোনো শিশুর জন্য দুধের সম্পর্ক হারাম হওয়ার জন্য দুটি মৌলিক শর্ত রয়েছে:

ক. শিশুটির বয়স দুই বছরের মধ্যে হতে হবে।

খ .শিশুটিকে পূর্ণ তৃপ্তির সাথে অন্তত পাঁচবার দুধ পান করতে হবে।

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম

কোনো নারী বা পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে কিছু সম্পর্ক স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায়।

ক. স্থায়ীভাবে হারাম

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَلَا تَنۡکِحُوۡا مَا نَکَحَ اٰبَآؤُکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً وَّمَقۡتًا ؕ  وَسَآءَ سَبِیۡلًا 

আর তোমরা বিবাহ করো না নারীদের মধ্য থেকে যাদেরকে বিবাহ করেছে তোমাদের পিতৃপুরুষগণ। তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (তা ক্ষমা করা হল)। নিশ্চয় তা হল অশ্লীলতা ও ঘৃণিত বিষয় এবং নিকৃষ্ট পথ। সূরা নিসা : ২২

শ্বাশুড়ি : স্ত্রীর মা, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পন্ন হলে তার মাকে বিবাহ করা চিরতরে হারাম হয়ে যায়।

বউয়ের মেয়ে (সৎ মেয়ে): স্ত্রীর পূর্বের স্বামী থেকে জন্ম নেওয়া মেয়ে। তবে এটি হারাম হবে যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস সম্পন্ন হয়। সূরা নিসা : ২৩

পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ): নিজের পুত্রের স্ত্রী। সূরা নিসা : ২৩

পিতার স্ত্রী (সৎ মা) : পিতার কোনো স্ত্রীর সাথে বিবাহ করা হারাম, তিনি জীবিত থাকুন বা মৃত।

অন্যের স্ত্রী থাকা অবস্থায় : আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّالۡمُحۡصَنٰتُ مِنَ النِّسَآءِ

আর (হারাম করা হয়েছে) নারীদের মধ্য থেকে সধবাদেরকে। সুরা নিসা : ২৪

খ. অস্থায়ীভাবে হারাম

এই সম্পর্কগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত হারাম থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার পরিবর্তন না হয়।

একই সময়ে দুই বোনকে বিবাহ করা হারাম। এর দলিল সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৩-এ রয়েছে। “তোমাদের জন্য আরও হারাম করা হয়েছে দুই বোনকে একত্রে (স্ত্রী হিসেবে) রাখা।” কিন্তু এক বোন মৃত বরণ করা পর অন্য বোনকে বিবাহ করা জায়েয। যেমন-

সৎ মা এবং তার বোন : কোনো মহিলার সাথে বিবাহে থাকা অবস্থায় তার ফুফু বা খালাকে বিবাহ করা হারাম।  হাদিসে এসেছে-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যেন ফুফু ও তার ভাতিজীকে এবং খালা এবং তার বোনঝিকে একত্রে বিয়ে না করে। সহিহ বুখারি : ৫১০৯, ৫১১০, সহিহ মুসলিম : ১৪০৮, আহমাদ : ১০০০২

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত বংশগত, সামাজিক এবং নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য করা হয়েছে।

বিবাহের আহকামসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই এতে নামাজ, রোজা, এবং অন্যান্য ইবাদতের মতো বিয়ে-শাদীরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দুঃখজনকভাবে, আজকাল আমরা মসজিদ বা ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম মানলেও, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে প্রায়ই ইসলাম-বিরোধী কাজ করি। বিয়ের প্রথম ধাপ হলো কনে দেখা বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া।

ইসলাম বিয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটির জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। কনে দেখার ক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং দ্বীনদারী বা ধার্মিকতাকেও প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব বা কনে দেখার সময় ছেলে ও মেয়ের পক্ষ থেকে কিছু মৌলিক নীতি মেনে চলা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে পর্দা রক্ষা করে দেখা-সাক্ষাৎ করা, কনে সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অনৈসলামিক রীতি পরিহার করা।

বিয়েকে সহজ করতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই শরিয়তসম্মত নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করা অপরিহার্য। কারণ, বিয়ের শুরুটা যদি সঠিক পথে হয়, তাহলে পুরো দাম্পত্য জীবনটাই বরকতময় হয়ে ওঠে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা মেনে চলার তৌফিক দিন।

শরীয়তে বিবাহ বলতে কী বুঝায় :

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ হলো একটি সামাজিক চুক্তি, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত। এটি শুধু একটি জৈবিক প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত এবং সুন্নাহ। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। ইসলামে বিবাহকে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এবং সমাজে নৈতিকতা ও পবিত্রতা রক্ষার একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়। এটি মানবজাতির বংশবৃদ্ধির একটি বৈধ ও সম্মানজনক পদ্ধতি। পাত্র পাত্রি নির্বচনের পর বিবাহে মূল কার্যক্রম শুরু হয়। ইসলামী শরিয়তে বিয়ের মূল কার্যাক্রমের ৫ টি পর্যায়ে সংঘটিত হয়।

১. ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া

২. কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি

৩. কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকবে

৪. আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা

৫. রবের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল শর্তের চেয়ে বিয়ের শর্ত পালন করা তোমাদের অধিক কর্তব্য এজন্য যে, এর মাধ্যমেই তোমাদেরকে স্ত্রী অঙ্গ ভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। সহিহ বুখারী : ৫১৫১, সহিহ মুসলিম : ১৪১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৯, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৫৪, আহমাদ : ১৭৩০২, ইরওয়া : ১৮৯২, সহীহ আল জামি : ১৫৪৭

ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া

কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হয় তার জন্য সমীচীন হলো ওই মেয়ের অভিভাবকের মাধ্যমে তাকে পেতে চেষ্টা করা। এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিয়ে করতে চাওয়া যার কাছ থেকে এমন প্রস্তাব গ্রহণ হতে পারে। এটি বিবাহ পর্ব সূচনাকারীদের প্রাথমিক চুক্তি। এটি বিবাহের ওয়াদা এবং বিবাহের প্রথম পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপ গ্রহনের আগে নিচের আমলগুলো করা জরুরি।

১. ইস্তিখারা[MIH1]  করা :

মুসলিম নর-নারীর জীবনে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই যখন তারা বিবাহের সিদ্ধান্ত নেবেন তাদের জন্য কর্তব্য হলো ইস্তিখারা তথা আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা।

হাসান (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ইস্তিখারা করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না, আর যে পরামর্শ নেয় সে কখনো অনুতপ্ত হয় না।” মুসনাদ আহমদ : ১৭২৪৫; সিলসিলা সহিহাহ : ৬১১

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সব কাজে ইস্তিখারাহ্* শিক্ষা দিতেন। যেমন পবিত্র কুরআনের সূরাহ্ আমাদের শিখাতেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ কোন কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন ফরজ নয় এমন দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার পর এ দু’আ পড়ে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي قَالَ وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ.

প্রভু হে! আমি তোমার জ্ঞানের ওয়াসিলাতে তোমার অনুমতি কামনা করছি। তোমার কুদরতের ওয়াসিলায় শক্তি চাচ্ছি আর তোমার অপার করুণা ভিক্ষা করছি। কারণ তুমিই সর্বশক্তিমান আর আমি দুর্বল। তুমিই জ্ঞানী আর আমি অজ্ঞ এবং তুমিই সর্বজ্ঞ। প্রভু হে! তুমি যদি মনে কর যে, এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায়, ইহকালে ও পরকালে সত্বর কিংবা বিলম্বে আমার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে তা হলে আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দাও এবং তার প্রাপ্তি আমার জন্য সহজতর করে দাও। অতঃপর তুমি তাতে বারাকাত দাও। আর যদি তুমি মনে কর এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায় ইহকালে ও পরকালে আমার জন্য ক্ষতিকর হবে শীঘ্র কিংবা বিলম্বে তাহলে তুমি তাকে আমা হতে দূর করে দাও এবং আমাকে তা হতে দূরে রাখো; অতঃপর তুমি আমার জন্য যা মঙ্গলজনক তা ব্যবস্থা কর- সেটা যেখান থেকেই হোক না কেন এবং আমাকে তার প্রতি সন্তুষ্টচিত্ত করে তোল। সহিহ বুখারি : ১১৬২, ৬৩৮২, ৭৩৯০

২. আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরামর্শ করা :

বিবাহ করতে চাইলে আরেকটি করণীয় হলো বিয়ে ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ, পাত্রী ও তার পরিবার সম্পর্কে ভালো জানাশুনা রয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاعۡفُ عَنۡہُمۡ وَاسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ وَشَاوِرۡہُمۡ فِی الۡاَمۡرِ ۚ فَاِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَوَکِّلِیۡنَ

সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরার্মশ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন। সুরা আল ইমরান : ১৫৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪  وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ ۪  وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۚ

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। সুরা শুরা : ৩৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে অধিক পরিমাণে পরামর্শ করতেন।

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে তাঁর সাহাবাদের সাথে পরামর্শের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি :  ১৭১৪, বাইহাকী : ১৯২৮০।

এদিকে পরামর্শদাতার কর্তব্য বিশ্বস্ততা রক্ষা করা। তিনি যেমন তার জানা কোনো দোষ লুকাবেন না, তেমনি অসদুদ্দেশে আদতে নেই এমন কোনো দোষের কথা বানিয়েও বলবেন না। আর অবশ্যই এ পরামর্শের কথা কাউকে বলবেন না।

৩. প্রস্তাব দেওয়ার আগে একে অপরকে দেখে নেয়া উচিত

ইসলামে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, শান্তি এবং স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন করা। এই সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং এটি মানবিক আকর্ষণ ও বোঝাপড়ার ওপরও প্রতিষ্ঠিত। বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীকে দেখে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় যাতে তাদের মধ্যে প্রাথমিক বোঝাপড়া তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। জীবনসঙ্গীর চেহারা বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে স্বস্তি লাভ করে। এর ফলে বিবাহের প্রতি তার আগ্রহ ও সন্তুষ্টি বাড়ে, যা একটি সফল বৈবাহিক জীবনের জন্য খুবই জরুরি। অনেক সময় বাহ্যিক চেহারা বা শারীরিক গঠন নিয়ে মানুষের মনে কিছু ধারণা বা প্রত্যাশা থাকে। পাত্র-পাত্রী দেখে নেওয়ার মাধ্যমে এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা হতাশা এড়ানো সম্ভব হয়।

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে তাকে বলল যে, সে আনসার সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে একবার দেখেছে? সে বলল, না। তিনি বললেন, যাও! তুমি তাকে এক নযর দেখে নাও। কারণ আনসারদের চোখে কিছুটা ক্রটি আছে। সহিহ মুসলিম : ১৫২৪, মিশকাত : ৩০৯৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৬, আহমাদ : ৭৮৪২, সহীহাহ্ : ৯৫

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৮২, মিশকাত :৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি :  ৫০৬।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, সহীহাহ : ১৫১-১৫২

মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে এক মহিলাকে বিবাহ করার ব্যাপারে তাঁর সাথে আলাপ করলাম। তিনি বলেনঃ তুমি যাও এবং তাকে দেখে নাও। হয়তো তাতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালোবাসার সৃষ্টি হবে। অতএব আমি এক আনসার মহিলার নিকটে এসে তার পিতা-মাতার নিকট তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলাম এবং সাথে সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীসও তাদের অবহিত করলাম। কিন্তু মনে হলো তার পিতা-মাতা এটা অপছন্দ করলো। রাবী বলেন, মেয়েটি পর্দার আড়াল থেকে উক্ত হাদীস শুনে বললো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে পাত্রী দেখার আদেশ দিয়ে থাকলে আপনি দেখে নিন। অন্যথায় আমি আপনাকে শপথ দিচ্ছি (না দেখার জন্য)। সে যেন ব্যাপারটিকে অভিনব মনে করলো। রাবী বলেন, আমি তাকে দেখে নিলাম এবং তাকে বিবাহ করলাম। পরে মুগীরাহ (রাঃ) তার সাথে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

৪. ছবি বিনিময়ের শরয়ী বিধান

ইসলামে সাধারণত অপ্রয়োজনে বা এমনভাবে ছবি ব্যবহার করা নিরুৎসাহিত করা হয়, যা ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করতে পারে। বিয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিয়ের প্রস্তাবের জন্য নারী-পুরুষের ছবি আদান-প্রদান করাকে অনেক আলেম মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে:

ক. পর্দার লঙ্ঘন : ইসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি বিনিময় করলে তা বহু লোকের হাতে চলে যেতে পারে, যাদের কাছে ওই ছবি দেখা বৈধ নয়। এতে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয়।

খ. বাস্তবের সঙ্গে অমিল : ছবি অনেক সময় বাস্তবের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। ছবি এডিট করে বা নির্দিষ্ট কোণ থেকে তুলে কাউকে আকর্ষণীয় দেখানো হতে পারে, যা পরে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে।

গ. সম্মানের হানি : যদি কোনো কারণে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যায়, তবে ছবিগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তখন সেগুলো অপব্যবহার হওয়ার বা অসম্মানের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৫. সরাসরি দেখা ও কথা বলার গুরুত্ব-

শরিয়তের নির্দেশনা হলো, বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীকে সরাসরি দেখা। এটি হলো কনে দেখা পর্ব। এর মূল উদ্দেশ্য হলো একে অপরের চেহারা, চলাফেরা, এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা। এই দেখার সময় পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে কেবল বৈধ সম্পর্কের ভিত্তিতে পর্দার বিধান বজায় রেখে দেখা ও কথা বলার অনুমতি রয়েছে।

জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দিবে তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু যেন দেখে নেয় যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে গোপন রেখেছিলাম। অতঃপর আমি তার মাঝে এমন কিছু দেখি যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আকৃষ্ট করলো। অতঃপর আমি তাকে বিয়ে করি সুনানে আবু দাউদ : ২০৮২, মিশকাত : ৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি : ৫০৬।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে সরাসরি দেখাই হচ্ছে বিয়ের জন্য সঠিক পদক্ষেপ। সুতরাং, ছবি আদান-প্রদান করে বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন করা শরিয়তসম্মত নয়। এর পরিবর্তে পাত্র-পাত্রীর পরিবারের সম্মতিতে এবং ইসলামিক বিধান মেনে একে অপরকে সরাসরি দেখে নেওয়া উত্তম ও নিরাপদ। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সম্পর্ক মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

৬. প্রস্তাবদানকারীর সঙ্গে বাইরে নির্জনে অবস্থান করা যাবে না

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মানেই মেয়েটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে যায়নি। বিয়ের চুক্তি বা ‘আকদ’ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা সম্পূর্ণভাবে শরিয়তসম্মত স্বামী-স্ত্রী নয়। তাই এই সময়ে তাদের মধ্যে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। বিয়ের আগে নির্জন স্থান বা একা একা ঘোরাঘুরি ফিতনার (পরীক্ষা বা ফিতনা) কারণ হতে পারে এবং এটি ইসলামের পর্দার নীতির পরিপন্থী।

আজকাল অনেক অভিভাবকই এই বিষয়ে উদাসীন। তারা মনে করেন, যেহেতু বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তাই পাত্র-পাত্রীর মেলামেশা বা বাইরে যাওয়া-আসা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ধরনের মনোভাব শরিয়ত সম্মত নয়। ইসলামে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো, তাদের সন্তানদের নৈতিক ও ইসলামিক মূল্যবোধের মধ্যে বড় করা। বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের এমন অবাধ মেলামেশা নৈতিকতা ও পর্দার বিধান উভয়কেই লঙ্ঘন করে, যা পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে।

বিয়ের আগের এই সময়টুকুতে বর-কনের মধ্যে শুধু প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা ও শরিয়তসম্মত উপায়ে একে অপরকে জানার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোনোভাবেই নির্জনতা বা ব্যক্তিগত মেলামেশার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। বিবাহ পূর্ববর্তী এই ধরনের সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হলেই কেবল তারা একে অপরের জন্য বৈধ হবেন এবং তাদের জন্য মেলামেশার পথ উন্মুক্ত হবে।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ’জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রাঃ) আমাদের সামনে খুতবাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাড়িয়ে বলেনঃ হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ যমানা), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৩৬৩

৭. বিবাহের আগে যোগাযোগের সীমারেখা মানতে হবে

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এমন নারী-পুরুষ এখনও একে অপরের জন্য ‘বেগানা’ বা অপরিচিতই রয়েছেন। যতক্ষণ না তারা শরিয়তসম্মত উপায়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন, ততক্ষণ তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাই এই সময় তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়।

মূলত, এই যোগাযোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিয়ের শর্ত, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। অর্থাৎ, তাদের কথাবার্তা শুধু বিয়ের চুক্তি ও শর্তাবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এই যোগাযোগে আবেগ বা ভালোবাসা প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। আবেগপ্রবণ বা রোমান্টিক ভাষায় কথা বলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কারণ, এই ধরনের কথাবার্তা সম্পর্কের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং ফিতনার কারণ হতে পারে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যে এমন কথাবার্তা বৈধ নয়। বিয়ের আলোচনা যেহেতু একটি পারিবারিক বিষয়, তাই এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে উভয় পরিবারের, বিশেষ করে পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের সম্মতি থাকা উত্তম। এটি সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সামনে বা তাদের জ্ঞাতসারে যোগাযোগ হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কমে যায় এবং সম্পর্কটি একটি সম্মানজনক গণ্ডির মধ্যে থাকে।

৮. একজনের প্রস্তাবের ওপর অন্যজনের প্রস্তাব না দেয়া :

যে নারীর কোথাও বিয়ের কথাবার্তা চলছে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া বৈধ নয়।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রামবাসীর পক্ষে শহরবাসী কর্তৃক বিক্রয় করা হতে নিষেধ করেছেন এবং তোমরা প্রতারণামূলক দালালী করবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। কোন মহিলা যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের দাবী না করে, যাতে সে তার পাত্রে যা কিছু আছে, তা নিজেই নিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি : ২১৪০, ৫১৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৫১৫, আহমাদ : ৯৫২৩. সুনানে নাসায়ী : ৩২৪১

হ্যা, দ্বিতীয় প্রস্তাবদাতা যদি প্রথম প্রস্তাবদাতার কথা না জানেন তবে তা বৈধ। এ ক্ষেত্রে ওই নারী যদি প্রথমজনকে কথা না দিয়ে থাকেন তবে দু’জনের মধ্যে যে কাউকে গ্রহণ করতে পারবেন।

৯. ইদ্দতে থাকা নারীকে প্রস্তাব দেয়া :

বায়ান তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া হারাম। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ  عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ  وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ 

আর এতে তোমাদের কোন পাপ নেই যে, তোমরা নারীদেরকে ইশারায় যে প্রস্তাব করবে কিংবা মনে গোপন করে রাখবে। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে স্মরণ করবে। কিন্তু বিধি মোতাবেক কোন কথা বলা ছাড়া গোপনে তাদেরকে (কোন) প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। আর আল্লাহর নির্দেশ (ইদ্দত) তার সময় পূর্ণ করার পূর্বে বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। সূরা বাকারা : ২৩৫।

তবে ‘রজঈ’ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে সুস্পষ্টভাবে তো দূরের কথা আকার-ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়াও হারাম। তেমনি এ নারীর পক্ষে তালাকদাতা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রস্তাবে সাড়া দেয়াও হারাম। কেননা এখনো সে তার স্ত্রী হিসেবেই রয়েছে।

১০. এ্যাংগেজমেন্ট করা :

ইসলামে ‘এ্যাংগেজমেন্ট’ বা বাগদান অনুষ্ঠান, যেটিতে আংটি পরানোর রেওয়াজ আছে, এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আমাদের সমাজে এসেছে। ইসলামে বিয়ে পূর্ববর্তী সম্পর্ককে সহজ ও পবিত্র রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকে বিবাহের আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত, পাত্র-পাত্রী একে অপরের কাছে বেগানা বা অপরিচিতই থাকেন। তাই এই সময়ে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা শরিয়তসম্মত নয়।

এ্যাংগেজমেন্টের মাধ্যমে অনেকেই মনে করেন যে বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেল। এর ফলে বর-কনে এমনভাবে মেলামেশা শুরু করে, যেন তারা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু ইসলামে শুধুমাত্র বিবাহের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বৈধ হয়। এ্যাংগেজমেন্টের আংটি কোনোভাবেই এই আকদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না।

সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হলো, প্রস্তাবদানকারী পুরুষ নিজের হাতে কনেকে আংটি পরিয়ে দেয়। ইসলামে বেগানা নারী-পুরুষের জন্য একে অপরের শরীর স্পর্শ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেহেতু বিয়ের চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বামী-স্ত্রী নন, তাই এই ধরনের শারীরিক স্পর্শ শরিয়ত লঙ্ঘন করে।

ইসলামের বিধান হলো-

কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বা আংটি পরানোর প্রথা ছাড়াই যত দ্রুত সম্ভব বিবাহের আকদ সম্পন্ন করা উচিত। এতে শরিয়তসম্মতভাবে পাত্র-পাত্রী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন এবং এরপর তাদের পারস্পরিক মেলামেশা ও সম্পর্ক স্থাপন বৈধ হবে।

১১. উপযুক্ত পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখান না করা :

উপযুক্ত পাত্র পেলে তার প্রস্তাব নাকচ করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ.

‘যদি এমন কেউ তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তবে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। যদি তা না করো তবে পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজতা সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি :  ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে কনের জন্য একজন ওয়ালি বা অভিভাবক থাকা ফরজ বা আবশ্যক। ওয়ালি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি কনের সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ওয়ালি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।

আবূ মূসা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়েই হতে পারে না। সুনানে আবু দাউদ : ২০৮৫

তাই যে কোন নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালী বা অভিভাবক আবশ্যক। অভিভাবক উপযুক্ত হওয়ার জন্য ৬টি শর্ত আছে। যখা-

(১) আকল বা বিবেক সম্পন্ন হওয়া (পাগল হলে হবে না)

(২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া

(৩) স্বাধীন হওয়া

(৪) পুরুষ হওয়া (বিবাহের ক্ষেত্রে নারী নারীর অভিভাবক হতে পারবে না)

(৫) অভিভাবক ও যার অভিভাবক হচ্ছে উভয়ে একই দ্বীনের অনুসারী হওয়া। (কোন কাফির মুসলিম নারীর অভিভাবক হবে না

(৬) অভিভাবক হওয়ার উপযুক্ত হওয়া। (অর্থাৎ বিবাহের জন্য কুফূ বা তার কন্যার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন বা সমকক্ষ পাত্র নির্বাচন করার জ্ঞান থাকা ও বিবাহের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় সমূহ অনুধাবন জ্ঞান থাকা)

১. ইসলামে কনের ওয়ালি ছাড়া নিকাহ বৈধ নয়

বিবাহে কনের অভিভাবক বা ওয়ালীর সম্মতি আবশ্যক। এই বিষয়ে ইসলামে একাধিক হাদিস রয়েছে। এই সম্মতি ব্যতীত কোনো বিবাহ বৈধ হয় না। এ প্রশ্নের সবচেয়ে সরাসরি উত্তর দিতে পারে এমন একটি হাদিস হলো:

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১০১, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৫, আহমাদ : ১৯০২৪, ১৯২১১, ১৯২৪৭, দারেমী : ২১৮২, ২১৮৩, ইরওয়াহ : ১৮৩৯, মিশকাত : ১৩৩০,

২. কোন নারী কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবক হতে পারবে না

 আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا

কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকে বিবাহ দিবে না এবং কোন মহিলা নিজেকেও বিবাহ দিবে না। কেননা যে নারী স্বউদ্যোগে বিবাহ করে সে যেনাকারিণী।সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮২, ইরওয়াহ : ১৮৪১

৩. কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকত্বের পরিচয়

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ওয়ালি বা অভিভাবক হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি নিজের অধীনস্থ ব্যক্তির আর্থিক বা ব্যক্তিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বিবাহের ক্ষেত্রে ওয়ালি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি কনের পক্ষ থেকে বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামী আইনে সাবালিকা নারীর বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য ওয়ালির উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার অধিকার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বন্টিত হয়। এই ক্রমটি সাধারণত আত্মীয়তার নৈকট্য ও মিরাসে (উত্তরাধিকার) প্রাপ্তির ক্রমের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

ক. পিতা:

বিবাহের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার প্রথম ও প্রধান হকদার হলেন তার পিতা। কারণ, তিনি কনের নিকটতম রক্ত সম্পর্কীয় অভিভাবক এবং তার উপর সবচেয়ে বেশি স্নেহ ও অধিকার রয়েছে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ প্রায় সব ফকিহ এ বিষয়ে একমত। ইমাম শাফেঈ উল্লেখ করেছেন, “বিয়ের ক্ষেত্রে পিতার অধিকার সবচেয়ে বেশি, এমনকি তিনি যদি নাবালিকাও হন।” আল-উম্ম, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৫৫

খ. দাদা:

পিতার অনুপস্থিতিতে (যদি তিনি মৃত বা অযোগ্য হন) কনের ওয়ালি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন তার দাদা (পিতার পিতা)। দাদার স্থান পিতার পরেই কারণ তিনি মূল সম্পর্কীয় দিক থেকে দ্বিতীয় নিকটতম পুরুষ।

আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯,  আল-উম্ম, ইমাম শাফেঈ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-১৫৭

গ. ভাই:

পিতা ও দাদা উভয়ের অনুপস্থিতিতে আপন ভাই ওয়ালি হবেন। এরপর যদি আপন ভাই না থাকে, তাহলে বৈমাত্রেয় ভাই (পিতা ভিন্ন, কিন্তু মাতা এক) ওয়ালি হবেন।

ইমাম ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯, আল-উম্ম, ইমাম শাফেঈ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-১৫৭

ঘ. চাচা:

ভাইদের অনুপস্থিতিতে চাচা (পিতার আপন ভাই) ওয়ালি হবেন। চাচার অধিকার ভাইয়ের পরের স্থানে কারণ তিনি পিতার সমান্তরাল অবস্থানে থাকেন এবং সম্পর্কীয় নৈকট্যের দিক থেকে ভাইয়ের পরেই তার স্থান। : এই বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ প্রায় সব ফকিহ একমত পোষণ করেছেন। হেদায়াম প্রথম খণ্ড, পৃ-২১৫, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯

ঙ. অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়:

উপরোক্ত ওয়ালিদের অনুপস্থিতিতে, নিকটবর্তী রক্ত সম্পর্কীয় পুরুষ আত্মীয়গণ ক্রমানুসারে ওয়ালি হবেন। যেমন—চাচাতো ভাই, মামা, ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রে ফিকহবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে, মিরাসে (উত্তরাধিকার) যারা অগ্রাধিকার পান, তারাই ওয়ালি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। হেদায়াম প্রথম খণ্ড, পৃ-২১৫, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯

চ. ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক:

যদি কনের কোনো ওয়ালি না থাকে, অথবা ওয়ালি থাকা সত্ত্বেও তিনি দূরে থাকেন, বা বিবাহে বাধা দেন কিন্তু শরিয়তসম্মত কোনো কারণ না দেখাতে পারেন, তাহলে ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক কনের ওয়ালি হবেন।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,

উম্মু হাবীবাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি (’উবাইদুল্লাহ) ইবনু জাহশের স্ত্রী ছিলেন। স্বামী মারা গেলে তিনি হিজরতকারীদের সাথে হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর হাবশার বাদশা নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাকে বিয়ে দেন। তিনি (অভিভাবক ছাড়া) তাদের কাছেই অবস্থান করেন। সুনানে আব দাউদ : ২০৮৬

৪. বিবাহ কন্যার সম্মতি নেওয়া জরুরি :

কোনো নারী নিজে নিজে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন না। তার জন্য অবশ্যই একজন ওয়ালি থাকতে হবে। ওয়ালি কেবল বিবাহ সম্পন্নকারী হিসেবে কাজ করেন। ওয়ালি হতে হলে কনের মতামত নেওয়া আবশ্যিক। কনের সম্মতি ছাড়া ওয়ালি তাকে বিবাহ দিতে পারেন না।

আবূ সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, ৬৯৭০, সহহি  মুসলিম : ১৪১৯, আহমাদ : ৯৬১

খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৮, ৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯

আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ও মুজাম্মে ইবনু ইয়াযীদ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। খিযাম নামক এক ব্যক্তি তার মেয়েকে বিবাহ দেন। সে তার পিতার এই বিবাহ অপছন্দ করে। মেয়েটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে অবহিত করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতার দেয়া তার এই বিবাহ রদ করে দেন। পরে সেই মেয়ে আবূ লুবাবা ইবনু ’আবদুল মুনযির (রাঃ)-কে বিবাহ করে। মিশকাত : ১৮৭৩, সুনানে নাসায়ী ৩২৬৮, সুনানে আবূ দাউদ ২১০১, আহমাদ : ২৬২৪৬, ২৬২৫১, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৫, দারেমী : ২১৯১ ২১৯২, , ইরওয়াহ : ১৩৮০

৫. বিবাহে ওয়ালী বা অভিভাবকের বাধা

একজন উপযুক্ত যুবক যদি কোন মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় (অর্থাৎ সেই যুবক দ্বীনদারী ও চরিত্রের দিক থেকে পছন্দনীয় হয়), আর মেয়েও ঐ যুবককে পছন্দ করে, আর শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত মেয়ের অভিভাবক ঐ বিবাহে বাধা প্রদান করে তবে শরীয়তের পরিভাষায় এটাকে বলা হয়, العضل বা বিবাহে বাধা। ইবনে কুদামা, মুগনী, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-৩৬৮

 এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে-

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ اَنۡ یَّنۡکِحۡنَ اَزۡوَاجَہُنَّ اِذَا تَرَاضَوۡا بَیۡنَہُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ ذٰلِکَ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکُمۡ اَزۡکٰی لَکُمۡ وَاَطۡہَرُ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছবে তখন তোমরা তাদেরকে বাধা দিয়ো না যে, তারা তাদের স্বামীদেরকে বিয়ে করবে যদি তারা পরস্পরে তাদের মধ্যে বিধি মোতাবেক সম্মত হয়। এটা উপদেশ তাকে দেয়া হচ্ছে, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে। এটি তোমাদের জন্য অধিক শুদ্ধ ও অধিক পবিত্র। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সুরা বাকারা : ২৩২

আল হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’’তোমরা তাদেরকে আটকে রেখো না’’-এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) বলেছেন যে, উক্ত আয়াত তার সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি আমার বোনকে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেই, সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়। যখন তার ইদ্দাতকাল অতিক্রান্ত হয় তখন সেই ব্যক্তি আমার কাছে আসে এবং তাকে পুনরায় বিয়ের পয়গাম দেয়। কিন্তু আমি তাকে বলে দিই, আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম এবং তোমরা মেলামেশা করেছ এবং আমি তোমাকে মর্যাদা দিয়েছি। তারপরেও তুমি তাকে তালাক দিলে? পুনরায় তুমি তাকে চাওয়ার জন্য এসেছ? আল্লাহর কসম, সে আবারও কখনও তোমার কাছে ফিরে যাবে না। মা’কিল বলেন, সে লোকটি অবশ্য খারাপ ছিল না এবং তার স্ত্রীও তার কাছে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ’’তাদেরকে বাধা দিও না,’ (২:২৩২) এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার বোনকে তার কাছে বিয়ে দেব। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে তার সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩০

ইমাম বুখারী বলেন, যদিও এখানে বিবাহিতা নারীকে কেন্দ্র করে আয়াতটি নাযিল হয়েছে, কিন্তু এখানে কুমারী নারীও শামিল। অর্থাৎ কুমারীর জন্যও একই হুকুম।

কি করলে অভিভাবক বা বাধাপ্রদাকারী হিসেবে গণ্য হবে?

(১) অভিভাবকের অধিনস্থ মেয়ে যদি নির্দিষ্টভাবে কোন যুবককে পছন্দ করে এবং পাত্রও উপযুক্ত হয়, তখন যদি অভিভাবক তার সাথে বিবাহ দিতে (শরীয়ত সম্মত) কোন কারণ ছাড়াই বা দুর্বল যুক্তিতে (যেমন, লেখাপড়া শেষ করা ইত্যাদি) অস্বীকার করে, তাহলে সে বাধাপ্রদানকারী হবে। আল মাওসুয়া আল ফেকহিয়্যা ৩৪/২৬৫

(২) অভিভাবক যদি বিবাহের প্রস্তাবকারীদের উপর অহেতুক কঠিন শর্ত আরোপ করে, যা শুনলেই তারা পলায়ন করবে এবং তা পূর্ণ করা অনেক সময় অসাধ্য হয়ে যায়, তখন সে বাধাপ্রদানকারী গণ্য হবে। ইবনে তাইমিয়া- কিতাবুল ইনসাফ ৮/৭৫

শাইখ ইবনে জাবরীন (রহঃ) বলেন, প্রস্তাবকারীর উপর কঠরোতা আরোপ করা, অথবা অপ্রয়োজনীয় অত্যধিক শর্তারোপ করা, অথবা উপযুক্ত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করা, অথবা অতিরিক্ত মোহর চাওয়া। অভিভাবক যদি এরূপ করে তবে সে বাধাপ্রদানকারী গণ্য হবে এবং সে হবে ফাসেক। তখন তার অভিভাবকত্ব বাতিল হয়ে যাবে।

বিবাহের শর্ত হলো দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকা

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে, বিবাহের অন্যতম শর্ত হলো দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকা। এই শর্তটি বিবাহকে প্রকাশ্য ও বৈধতা প্রদান করে। সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হলে তা ইসলামী আইন অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হয়। বিবাহে সাক্ষী থাকার কারণ হলো, এর মাধ্যমে বিবাহটি গোপনীয়তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করে। এটি শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি চুক্তি নয়, বরং একটি সামাজিক চুক্তি। সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে কোনো ধরনের সন্দেহ বা বিরোধ দেখা দিলে তা সহজেই মীমাংসা করা যায়।

১. সাক্ষীর সংখ্যা ও যোগ্যতা:

ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে পারে।

ক. প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) : সাক্ষী অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।

খ. মুসলিম: সাক্ষী অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। একজন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম বিবাহের সাক্ষী হতে পারবে না।

গ. ন্যায়পরায়ণ (আদিল): সাক্ষী ফাসিক (পাপী) না হয়ে আদিল (ন্যায়পরায়ণ) হওয়া উত্তম। যদিও অনেক ফিকহবিদ ফাসিকের সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য বলেছেন, তবে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী থাকা অধিক পছন্দনীয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সূরা তালাক : ২

যদিও এই আয়াতটি মূলত তালাকের ক্ষেত্রে এসেছে, তবে ফিকহবিদগণ এর সাধারণ বিধানের ভিত্তিতে বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন।

বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন। কোরআনের অন্য একটি আয়াত থেকে নারী-পুরুষের সাক্ষীর সংখ্যার বিষয়ে ফকিহগণ দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاسۡتَشۡہِدُوۡا شَہِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُوۡنَا رَجُلَیۡنِ فَرَجُلٌ وَّامۡرَاَتٰنِ مِمَّنۡ تَرۡضَوۡنَ مِنَ الشُّہَدَآءِ اَنۡ تَضِلَّ اِحۡدٰىہُمَا فَتُذَکِّرَ اِحۡدٰىہُمَا الۡاُخۡرٰی ؕ وَلَا یَاۡبَ الشُّہَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوۡا ؕ

আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী- যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। সূরা বাকারা : : ২৮২

এই আয়াতটি মূলত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে হলেও, ফিকহবিদগণ এই সাধারণ নীতিকে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্রয়োগ করেছেন।

ইমরান ইবন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَي عَدْلٍ»

“অভিভাবক (ওলি) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” ইমাম বাইহাকি, সুনান আল-কুবরা : ১৪১৪৬, ইমাম দারাকুতনি : ৩৭৩৮

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

২. ফতোয়া ও ফিকহি কিতাবের দলিল:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, বিবাহে কমপক্ষে দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে, অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে হবে। আল-হেদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২১৮

ইমাম শাফেঈ (রহ.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ অধিকাংশ ফিকহবিদ এই বিষয়ে একমত যে, সাক্ষীর উপস্থিতি বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাদের মতে, সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বাতিল। আল-মুগনি, নবম খণ্ড ৯, পৃ.-৪৬২; আল-উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-১৬১

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি শুধু একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

মহর বা দেনমোহর নির্ধারণ ও আদায়

ইসলামে, মহর বা মোহর হলো বিবাহের সময় বর কর্তৃক কনেকে প্রদত্ত একটি অপরিহার্য আর্থিক দায় বা সম্পদ। এটি কেবল একটি উপহার নয়, বরং বিয়ের চুক্তির একটি বাধ্যতামূলক অংশ, যা স্ত্রীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রতীক। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে সম্মান ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ প্রদান করা হয়। মহর নির্ধারণ ছাড়া কোনো বিবাহ পূর্ণাঙ্গ ও শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ হয় না। তবে মহর বাকি থাকলে বিবাহ বৈধ হবে। মহর নির্ধাণ বিবাহের একটি অপরিহার্য শর্ত আর মহর আদায় করা, ঋন আদায়ের মত ফরজ কাজ।

প্রাচীন আরবে কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার সময় যৌতুক বা পণ প্রথার প্রচলন ছিল, যেখানে কনের পরিবারকে অর্থ বা সম্পদ দেওয়া হতো। রাসূলুল্লাহ ﷺ নবুয়ত প্রাপ্তির পর আল্লাহ তাআলার নির্দেশে এই অন্যায় ও অসম্মানজনক যৌতুক প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেন। এর পরিবর্তে তিনি আবশ্যক দেনমোহর প্রথা চালু করেন, যা নারীদের সম্মান ও অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ব্যবস্থাটি কেবল একটি সামাজিক পরিবর্তনই ছিল না, বরং নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি বিপ্লবী পদক্ষেপও ছিল।

১. মহরের তাৎপর্য ও গুরুত্ব :

ক. স্ত্রীর অধিকার : মহর সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এর উপর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। স্ত্রী এটি নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারেন।

খসম্মানের প্রতীক :  মহর নারীকে একটি সম্মান ও মর্যাদা দিতে এবং তাকে স্বামীর কাছে একটি মূল্যবান সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়।

গ. মহর ধার্য্য ও আদায় করা ফরজ বা ওয়জিব :

মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪

এ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

স্ত্রী স্বেচ্ছায় মাফ করতে পারেন: স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় এবং খুশি মনে তার প্রাপ্য মহরের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ মহর মাফ করে দেন, তবে তা জায়েয। তবে, কোনো ধরনের চাপ বা লজ্জার কারণে মাফ করালে তা শরীয়ত সম্মত নয়।

মৃত্যু বা তালাক : যদি মহর পরিশোধের আগেই স্বামী মারা যান, তাহলে মহর তার ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার সম্পদ থেকে স্ত্রীর মহর পরিশোধ করা হবে। একইভাবে, যদি তালাক হয়, তবে স্বামী তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ মহর পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। যদি সহবাসের আগেই তালাক হয় এবং মহর নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে অর্ধেক মহর পরিশোধ করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہٖ مِنۡہُنَّ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِہٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪ 

উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন, জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল। এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মাহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। সহিহ বুখারি ৫১২৭ হাদিসের প্রথম অংশ

এ সকল কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বুঝা যায় মহর আলায় করা ওয়াজিব। তাছাড়া যে সকল বিবাহে মহর নির্ধারন ছাড়া ইজার কবুল হয়। তাদের মহরও অটোমেটিকভাবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী) ধার্য হয়ে যায়। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।

ঘ. ইচ্ছা করে মহর আদায় না করা গুরুতর পাপ : মহর পরিশোধ করার নিয়ত ছাড়া বিবাহ করলে বা পরিশোধ না করার ইচ্ছা থাকলে তা ব্যভিচারের সমতুল্য। হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে।

মাইমূন আল-কুরদী, তার পিতার সূত্রে বলেন। আমি নবী ﷺ-কে একবার, দুইবার, তিনবার নয়—বরং দশবার পর্যন্ত বলতে শুনেছি-

أَيُّمَا رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً بِمَا قَلَّ مِنَ الْمَهْرِ أَوْ كَثُرَ، لَيْسَ فِي نَفْسِهِ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلَيْهَا حَقَّهَا، خَدَعَهَا، فَمَاتَ وَلَمْ يُؤَدِّ إِلَيْهَا حَقَّهَا، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهُوَ زَانٍ

যে ব্যক্তি কোনো নারীকে সামান্য বা অধিক মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, অথচ তার মনে থাকে না যে সে তার হক আদায় করবে—তাহলে সে নারীকে প্রতারণা করল। যদি সে মারা যায় অথচ তার হক (মোহর) আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে ব্যভিচারী (যানী) হিসেবে।’ মুসনাদে আহমাদ : ১১০৬২, আল-মুজামুল আওসাত : ৬০৮৭, আল-মুজামুস সাগীর : ৯৫৩

ঙ. মহর নির্ধারণ না করে বিবাহ করা

আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট নাও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)। অর্থাত্ এ গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবটি বাদ দিলেও বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে কিন্তু মহর অটোমেটিকভাবে ধার্য হয়ে যাবে। মহর নির্দিষ্ট না থাকলেও বিবাহ বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন-

لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

তোমাদের কোন অপরাধ নেই যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এমন অবস্থায় যে, তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করনি। আর উত্তমভাবে তাদেরকে ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে এবং সংকটাপন্নের উপর তার সাধ্যানুসারে। সুকর্মশীলদের উপর এটি আবশ্যক। সূরা বাকারাহ : ২৩৬

এখানে স্পষ্ট বলা হলো, মহর নির্ধারণ না করেই বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে।আর যদি মহর একেবারেই নির্ধারণ না করা হয়ে থাকে, তাহলে সহবাস ঘটলে স্ত্রী মোহরে মিসল পাবেন।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তাকে প্রশ্ন করা হলঃ এক লোক এক মহিলাকে বিয়ের পর তার মোহর না ঠিক করে এবং তার সাথে সহবাস না করেই মৃত্যুবরণ করল, তার জন্য কি হুকুম আছে? ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, মহিলাটি তার পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের সম-পরিমাণ মোহর পাবে, তার কমও পাবে না বেশিও পাবে না। তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য সে মহিলাটি ইদ্দাত পালন করবে এবং সে (তার) ওয়ারিসের অধিকারীও হবে। তখন মাকিল ইবনু সিনান আল-আশজাঈ (রাঃ) দাড়িয়ে বললেন, আপনি যে ধরণের ফায়সালা করেছেন, আমাদের বংশের মেয়ে ওয়াশিকের কন্যা বিরওয়াআ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একই ফায়সালা করেছেন। ইবনু মাসউদ (রাঃ) এটা শুনে খুবই আনন্দিত হন। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।

এখানে মহর নির্ধারণকে উৎসাহিত করা হয়েছে, তবে শর্ত করা হয়নি যে, মহর ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না।

ফকিহদের বক্তব্য হলো-

ইবনুল হুমাম (হানাফি ফকিহ) বলেন, “মহর নির্ধারণ ছাড়াও বিবাহ সম্পন্ন হবে, তবে সহবাস বা স্বামীর মৃত্যু হলে ‘মোহরে মিসল’ ওয়াজিব হবে।” ফাতহুল কাদির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০০”

ইবন কুদামাহ (হাম্বলি ফকিহ) বলেন, “যদি মহর নির্ধারণ ছাড়াই বিবাহ হয়, তবুও তা বৈধ হবে এবং স্ত্রী ‘মোহরে মিসল’ এর অধিকারী হবেন।” “আল-মুগনি লি ইবনে কুদামাহ, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-৭৮

আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট না-ও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)।

২. মহরের প্রকারভেদ

আসলে ইসলামে মহরের কোনো নির্দিষ্ট প্রকারভেদ নেই। তবে বাস্তবে মহর আদায় ও প্রদান ব্যবস্থার ভিত্তিতে মহরকে প্রধানত দুই প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে।

ক. তাৎক্ষণিক মহর

খ. বিলম্বিত মহর

ক. তাৎক্ষণিক মহর :

তাৎক্ষণিক মহর হলো সেই মোহর, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকে নগদে বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে মোহরের ওপর অবিলম্বে অধিকার দেওয়া। এটি সাধারণত বিয়ের মজলিসেই আদায় করা হয়, অথবা এমন কোনো নির্ধারিত সময়ে, যা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়।.মহর আদায়ের নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও। সূরা নিসা : ৪

উদাহরণস্বরূপ, যদি বিয়ের চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে যে, “পুরো মোহর নগদ ২ লাখ টাকা এবং এটি বিয়ের দিনই পরিশোধ করা হবে,” তাহলে এটি তাৎক্ষণিক মহর। সাধারণত বিয়ের সময় বা বাসর রাতের আগেই এটি পরিশোধ করা উত্তম।

খ.বিলম্বিত মহর :

বিলম্বিত মহর হলো সেই মোহর, যার কিছু অংশ অথবা পুরোটা পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ কোনো ঘটনার পর পরিশোধ করার শর্ত থাকে। এই শর্তটি সাধারণত বিয়ের সময় নির্ধারণ করা হয় এবং বিবাহের চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ اَرَدۡتُّمُ اسۡتِبۡدَالَ زَوۡجٍ مَّکَانَ زَوۡجٍ ۙ وَّاٰتَیۡتُمۡ اِحۡدٰہُنَّ قِنۡطَارًا فَلَا تَاۡخُذُوۡا مِنۡہُ شَیۡئًا ؕ اَتَاۡخُذُوۡنَہٗ بُہۡتَانًا وَّاِثۡمًا مُّبِیۡنًا

আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রীকে বদলাতে চাও আর তাদের কাউকে তোমরা প্রদান করেছ প্রচুর সম্পদ, তবে তোমরা তা থেকে কোন কিছু নিও না। তোমরা কি তা নেবে অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে? সূরা আন-নিসা ৪:২০

এখানে বলা হয়েছে, বিপুল মহর দেওয়া যায়, যা অনেক সময় একসাথে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন প্রথাগতভাবে মহরের একটি অংশ বিলম্বিত থাকে। যদি চুক্তিতে নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়, হোক তা তালাকের মাধ্যমে বা স্বামীর মৃত্যুর কারণে, তখন বিলম্বিত মহর সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর পাওনা হয়ে যায় এবং তা পরিশোধ করা স্বামীর (বা তার উত্তরাধিকারীদের) ওপর ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।

মহরের পরিমাণ

ইসলামে মহরের পরিমাণের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি। এর পরিমাণ সম্পূর্ণভাবে বরের আর্থিক সামর্থ্য এবং কনের সামাজিক অবস্থান ও সম্মানের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। এটি এমন একটি বিধান যা উভয় পক্ষের জন্য সহজ করে দেয়, যাতে কোনো পক্ষই অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়ে। মহর এমন হতে পারে যা বরের পক্ষে পরিশোধ করা সহজ, আবার তা এত বেশিও হতে পারে যা তার সামর্থ্যের বাইরে নয়। এর মাধ্যমে ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে।

আবূ সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের মাহর কতো ছিলো? তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীদের মাহরের পরিমাণ ছিলো বার উকিয়া ও এক নাশ। তুমি কি জানো, নাশ কী? তাহলো অর্ধ উকিয়া। আর তাহলো পাঁচ শত দিরহামের সমান। সহিহ মুসলিম ১৪২৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৬,  সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৫, দারেমী : ২১৯৯, সহিহাহ : ১৮৩৩

উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। মিশকাত : ৩২০৪, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৫১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৮৭, দারিমী : ২২৪৬, আহমাদ : ৩৪০, ইরওয়া : ১৯২৭।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মাহর হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; তখন সে বললঃ আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি। সহিহ বুখারি : ৫১৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪২৭, সুনানে নাসায়ী ৩৩৭২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯০৭, আহমাদ : ১৩৩৭০, দারিমী : ২২৫০।

সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একজন মহিলা এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিজেকে পেশ করলেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে আমার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দিন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কাছে কী আছে? সে উত্তর দিল, আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও, তালাশ কর, কোন কিছু পাও কিনা? দেখ যদি একটি লোহার আংটিও পাও। লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, কিছুই পেলাম না এমনকি একটি লোহার আংটিও না; কিন্তু আমার এ তহবন্দখানা আছে। এর অর্ধেকাংশ তার জন্য। সাহল (রাঃ) বলেন, তার দেহে কোন চাদর ছিল না। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার তহবন্দ দিয়ে সে কী করবে? যদি তুমি এটা পর, মহিলার শরীরে কিছুই থাকবে না, আর যদি এটা সে পরে তবে তোমার শরীরে কিছুই থাকবে না। এরপর লোকটি অনেকক্ষণ বসে রইল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চলে যেতে দেখে ডাকলেন বা তাকে ডাকানো হল এবং বললেন, তুমি কুরআন কতটুকু জান? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে সূরাগুলোর উল্লেখ করল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে পরিমাণ কুরআন জান, তার বিনিময়ে তোমাকে এর সঙ্গে বিয়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ২৩১০, ২৩১১, ৫০২৯, ৫০৩০, ৫০৮৭, ৫১২১, ৫১২৬, ৫১৩২, ৫১৩৫, ৫১৪১, ৫১৪৯, ৫৮৭১, মুসলিম ১৪১৫, নাসায়ী ৩২০০, ৩২৮০, ৩৩৫৯, আবূ দাউদ ২১১১, আহমাদ ২২২৯২, ২২৩২০, ২২৩৪৩

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)-কে বিয়ে করেন, তাদের মোহর ছিল ইসলাম গ্রহণ। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-এর পূর্বে ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; যদি তুমি ইসলাম কবুল কর তবে তোমার সাথে বিয়ে হতে পারে। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ইসলাম গ্রহণ তাঁদের বিয়ের মোহর বলে গণ্য হয়। মিশকাত : ৩২০৯, সুনানে নাসায়ী ধ ৩৩৪০

মোহরে ফাতেমি :

মোহরে ফাতেমি হলো ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহের সময় যে পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, সেই পরিমাণকে বোঝানো হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মোহর ছিল ৫০০ দিরহাম রৌপ্য মুদ্রা। আধুনিক হিসাবে এই ৫০০ দিরহামের মূল্য কত, তা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এর একটি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হিসাব দেওয়া যায়।

১ দিরহাম = ২.৯৭৫ গ্রাম রূপা।

৫০০ দিরহাম = ৫০০ × ২.৯৭৫ গ্রাম = ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপা।

বর্তমান বাজারে রূপার দামের ওপর ভিত্তি করে এই ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপার মূল্য হিসাব করা হয়। এই মূল্য প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রূপার দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।

আধুনিক সমাজে সরাসরি মোহরে ফাতেমির পরিমাণে মোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এর মূল স্পিরিট বা চেতনা অনুসরণ করাকে উৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ, সামর্থ্য অনুযায়ী এমন পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা উচিত, যা কনের জন্য সম্মানজনক এবং বরের জন্য বোঝা নয়।

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪

সামর্থে বাইরে মহল নির্ধারণ ঠিক না

ইসলামে মহর ধার্য করার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা লোকলজ্জার ভয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ নির্ধারণ করাকে উৎসাহিত করা হয় না। ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো সহজ ও বরকতময় একটি সম্পর্ক স্থাপন করা, যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হয়।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«إِنَّ مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَيْسِيرَ خِطْبَتِهَا، وَتَيْسِيرَ صَدَاقِهَا، وَتَيْسِيرَ رَحِمِهَا»

“নিশ্চয়ই নারীর বরকতের লক্ষণ হলো, তার প্রস্তাব সহজ হওয়া, তার মোহর সহজ হওয়া এবং তার গর্ভধারণ সহজ হওয়া।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ : ২৪৫৯৫, ইমাম হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : ২৭০৯, ইমাম বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৮২৮৫, সহিহাহ : ২২৩৬`

উমার ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণিত, তিনি (রাঃ) বলেছেন, মহিলাদের মাহরের ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। কেননা তা যদি পার্থিব জীবনে সম্মান অথবা আল্লাহর কাছে তাক্ওয়ার প্রতীক হতো, তাহলে তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অধিক যোগ্য ও অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের মাহর বারো উকিয়ার বেশি ধার্য করেননি। কখনও অধিক মাহর স্বামীর উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মনে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, এমনকি সে বলতে থাকে, আমি তোমার জন্য পানির মশক বহনে বাধ্য হয়েছি অথবা তোমার জন্য ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েছি। (রাবী বলেন), আমি একজন বেদুইন। অতএব আমি ’’আলাকাল কিরবা’’ বা ’’আলাকাল কিরবা’’-এর অর্থ কি তা জানি না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৭, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৬, ২৮৭, দারেমী :  ২২০০, মিশকাত : ৩২০৪

অধিক মহর ধার্য করার মাধ্যমে বিবাহকে কঠিন করে তোলা হয়, যা এই হাদিসের শিক্ষার পরিপন্থী। যখন মহর অতিরিক্ত হয়, তখন তা অনেক যুবকের জন্য বিবাহকে অসম্ভব করে তোলে, যা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে।

আমের ইবনু রবীআ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ফাযারা গোত্রের এক ব্যক্তি এক জোড়া পাদুকার বিনিময়ে বিবাহ করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিবাহ অনুমোদন করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৮, সুনানে তিরমিযী : ১১১৩, আহমাদ : ১৫২৪৯, ১৫২৬৪, ইরওয়াহ : ১৯২৬।

সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেনঃ কে তাকে বিবাহ করবে? এক ব্যক্তি বললো, আমি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাকে একটি লোহার আংটি হলেও তা (মারহস্বরূপ) দাও। সে বললো, আমার কাছে কিছুই নাই। তিনি বলেনঃ তোমার কাছে কুরআনের যে অংশ আছে, তার বিনিময়ে আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম। সন সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৯.

এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে মহর কম হওয়া উত্তম। কারণ, মহর যত কম হবে, বিয়ে করা তত সহজ হবে এবং সমাজে বিবাহর প্রচলন বাড়বে। রাসূল (ﷺ) নিজে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিয়েতে কম মহর নির্ধারণ করে উম্মতকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন।

সমাজের কিছু মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে বা সামাজিক মর্যাদার কারণে এমন পরিমাণ মহর ধার্য করে যা বরের সাধ্যের বাইরে। এর ফলে হয় বরকে মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হয়, নয়তো তাকে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হয়। ইসলামে এমন অনর্থক বোঝা চাপানোকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

মহরের মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে নিরাপত্তা দেওয়া এবং বিবাহের বন্ধনকে মজবুত করা। কিন্তু যখন এটি লোক দেখানো প্রথায় পরিণত হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং তা পারিবারিক জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, অতিরিক্ত মহরের কারণে স্বামী তা পরিশোধ করতে না পেরে দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলমানের উচিত বিবাহের ক্ষেত্রে সরলতা অবলম্বন করা। মহর এমন পরিমাণ ধার্য করা উচিত যা বরের জন্য সহজ এবং যা সে সন্তুষ্টচিত্তে পরিশোধ করতে পারে। সামাজিক রীতিনীতি বা লোকলজ্জার পরিবর্তে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া   উচিত। অধিক মহর ধার্য করে বিবাহের পথ কঠিন করার চেয়ে বরং অল্প মহরে বরকতময় একটি বিবাহ করা উত্তম। এটি একটি সুস্থ ও সহজ সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বরের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

ইসলামে নিকাহ্‌ (বিবাহ) একটি ইবাদত ও চুক্তি। এ ক্ষেত্রে ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (স্বীকৃতি) শর্ত। ইজাব ও কবুল হলো ইসলামি আইন (শরিয়ত) অনুযায়ী একটি বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য দুটি শব্দ। এই দুটি শব্দ দ্বারা গঠিত মৌখিক বা লিখিত চুক্তির মাধ্যমেই একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধতা লাভ করে। এই চুক্তিটি একটি আইনি চুক্তি, যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য কিছু অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে।

ইজাব (প্রস্তাব) :

ইজাব হলো বিবাহের জন্য এক পক্ষ কর্তৃক প্রস্তাব পেশ করা। সাধারণত, পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি আসে। প্রস্তাবটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। যেমন-

পাত্রের পক্ষ থেকে : “আমি অমুকের মেয়ে অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম।”

পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বামী হিসেবে কবুল করলাম।”

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই কুমারী মেয়েরা লজ্জা করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার সম্মতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৭, ৬৯৪৬, ৬৯৭১

এখানে উল্লেখ্য, প্রস্তাবটি যে কোনো এক পক্ষ থেকে আসতে পারে, তবে তা স্পষ্ট হতে হবে। প্রস্তাবের ভাষা এমন হতে হবে, যেন তাতে কোনো অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা না থাকে।

কবুল (গ্রহণ) :

কবুল হলো অপর পক্ষ কর্তৃক সেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা। ইজাবের পর সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করা আবশ্যক। কবুল করার সময়ও ভাষা স্পষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:

পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি কবুল করলাম।”

যদি ইজাব এবং কবুলের মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান থাকে বা প্রস্তাবের মধ্যে কোনো শর্ত যুক্ত করা হয়, তাহলে বিবাহ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। তাই এই দুটি বিষয় একই মজলিসে (একই স্থানে, একই বৈঠকে) সম্পন্ন করা জরুরি।

ইজাব ও কবুলের শর্ত

একটি সঠিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়:

ক. একই মজলিস : ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে (মজলিসে) সম্পন্ন হতে হবে। আল-ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৮৭

খ. সাক্ষী : ইজাব ও কবুলের সময় কমপক্ষে দুইজন মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী হলেও চলবে। এটি বিয়ের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সূরা তালাক : ২

গ. স্পষ্ট ভাষা: প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়ই স্পষ্ট ভাষায় হতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৬৭

ইজাব ও কবুলের ধারণা সরাসরি কোরআন বা হাদিসে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা না থাকলেও, এর ভিত্তি ইসলামি ফিকাহ (আইনশাস্ত্র) এবং ইজমা (ইসলামি পণ্ডিতদের ঐক্যমত্য) থেকে এসেছে। এই নিয়মগুলো মূলত সাহাবিদের আমল এবং পরবর্তী ফকিহদের ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ইজাব ও কবুল যে নিকাহর রুকন ও শর্ত—এ ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল তুলে ধরছি।

ক. ইমাম ইবনু কুদামাহ (হাম্বলি) বলেন-

وَالنِّكَاحُ لَا يَنْعَقِدُ إِلَّا بِلَفْظِ الْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

“নিকাহ বৈধ হয় না, যতক্ষণ না ইজাব ও কবুলের উচ্চারণ হয়।” আল-কাফি, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৮)-

খ. ইমাম মারগিনানি (হানাফি) বলেন-

لَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

“নিকাহ ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।” আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮৮

গ. ইমাম নববী (শাফেয়ি) বলেন-

رُكْنُ النِّكَاحِ الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ، وَلَا يَنْعَقِدُ بِدُونِهِمَا

“নিকাহর রুকন হলো ইজাব ও কবুল। এ দু’টির ছাড়া নিকাহ বৈধ হয় না।” রাওদাতুত ত্বলিবীন, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮)

ঘ. ইমাম মালিক (মালিকি) বলেন-

لَا يَكُونُ النِّكَاحُ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَإِيجَابٍ وَقَبُولٍ

ওয়ালি, ইজাব এবং কবুল ছাড়া নিকাহ হয় না। আল-মুদাওয়ানাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫৫৫

ইজাব (প্রস্তাব)  ও কবুল (গ্রহণ) সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস-

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, যখন ’উমার (রাঃ)-এর কন্যা হাফসাহ (রাঃ) খুনায়স ইবনু হুযাইফাহ সাহমীর মৃত্যুতে বিধবা হলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী ছিলেন এবং মদিনায় ইন্তিকাল করেন। ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি ’উসমান ইবনু ’আফফান (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং হাফসাহকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিলাম; তখন তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। এরপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমার কাছে এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, যেন এখন আমি তাকে বিয়ে না করি। ’উমার (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, যদি আপনি চান তাহলে আপনার সঙ্গে ’উমারের কন্যা হাফসাহকে বিয়ে দেই। আবূ বকর (রাঃ) নীরব থাকলেন এবং প্রতি-উত্তরে আমাকে কিছুই বললেন না। এতে আমি ’উসমান (রাঃ)-এর চেয়ে অধিক অসন্তুষ্ট হলাম, তারপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন এবং হাফসাহ্কে আমি তার সঙ্গে বিয়ে দিলাম। এরপর আবূ বকর (রাঃ) আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাহকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোন উত্তর দেইনি। ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে কোন কিছুই আমাকে বিরত করেনি; এ ছাড়া যে, আমি জানি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহর বিষয় উল্লেখ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করতেন তাহলে আমি হাফসাহকে গ্রহণ করতাম। সহিহ বুখারি : ৪০০৫, ৫১২২


 [MIH1]

বিবাহের সুন্নাহ সম্মত কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিবাহের ফরজ কাজ হলো- কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকে দুইজন সাক্ষির সামনে নির্ধারিত মহরের কথা উল্লখ করে ছেলের নিটক কন্যা বিবাহের প্রস্তাব দিবেন। কন্যার ওয়ালির প্রস্তাবে সম্ততি দানের মাধ্যমে ছেলে বিবাহ সম্মত হবে। এতটুকু কাজই ফরজ। ইহার বাহিরে বিবাহে কিছু আমল বা অনুষ্ঠান করা হয় যা সুন্নাহ বা জায়েয হিসেবে ধরা হয়। নিচে এমন কতগুলো বিষয় উল্লেখ করা হলো-

১. বিবাহের খুতবা

বিবাহে খুতবা প্রদান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এটি বিবাহের একটি অংশ, যা বর-কনের জন্য বরকত ও হেদায়েত কামনা করে এবং বিবাহের গুরুত্ব সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই খুতবাকে খুতবাতুন-নিকাহ (খুতবায়ে নিকাহ) বলা হয়। বিবাহের খুতবার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রশংসা করা, রাসূল (ﷺ)-এর ওপর দরূদ পাঠ করা এবং বর-কনেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটি মূলত বিবাহের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরে।

এই খুতবার মাধ্যমে বর-কনেকে তাদের নতুন জীবনের শুরুতে আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। খুতবাটি বিবাহের গুরুত্ব, দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বিষয়ে উপস্থিত সকলকে সচেতন করে তোলে।

ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণনা করেন, পূর্বাঞ্চল থেকে দু’ব্যক্তি এসে (বিবাহে) বক্তৃতা দিল। তখন নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন কোন বক্তৃতায় যাদু আছে। সহিহ বুখারি : ৫১৪৬, ৫৭৬৭

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত খুতবাহ পড়েছেন-

’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাই। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্ট হতে এবং আমাদের কার্যকলাপের নিকৃষ্টতা হতে আশরয় চাই। আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নাই। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও তাঁর রসূল। অতঃপর…। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৩., সুনানে নাসায়ী : ৩২৭৮, আহমাদ : ২৭৪৪, ৩২৬৫, খুতবাতুল হাজাহ ৩১ নং পৃষ্ঠা।

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কল্যাণসমূহের উৎস, তাঁর সমষ্টি এবং তার সমাপ্তি দান করা হয়েছে। তিনি আমাদের সালাতের খুতবা এবং প্রয়োজনের (বিবাহের) খুতবা শিক্ষা দিয়েছেন। সালাতের খুত্বা (তাশাহ্হুদ) হলোঃ সমস্ত সম্মান, ’ইবাদাত ও পবিত্রতা আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত ও বারাকাতও। আমাদের উপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাহ্দের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দাহ্ ও তাঁর রসূল। আর বিবাহের খুতবা হলো-

’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্ট ও আমাদের কাজের নিকৃষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশরয় চাই। আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নাই। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তিনি এক এবং তাঁর কোন শরীক নাই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল’’।

এরপর তোমরা তোমাদের খুত্বার সাথে কুরআনের এ তিনটি আয়াত যোগ করবে-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوْتُنَّ  اِلَّا وَ اَنْتُمْ  مُّسْلِمُوْنَ ﴿۱۰۲﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না। সূরা আল ইমরান :  ১০২

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَ بَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِیْرًا وَّ نِسَآءً ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْ تَسَآءَلُوْنَ بِہٖ وَ الْاَرْحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلَیْکُمْ  رَقِیْبًا ﴿۱﴾

হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। সূরা নিসা : ১

یُّصْلِحْ  لَکُمْ  اَعْمَالَکُمْ وَ یَغْفِرْ لَکُمْ ذُنُوْبَکُمْ ؕ وَ مَنْ یُّطِعِ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہٗ  فَقَدْ  فَازَ  فَوْزًا عَظِیْمًا ﴿۷۱﴾  اِنَّا عَرَضْنَا الْاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ الْجِبَالِ فَاَبَیْنَ اَنْ یَّحْمِلْنَهَا وَ اَشْفَقْنَ مِنْهَا وَ حَمَلَهَا الْاِنْسَانُ ؕ اِنَّہٗ كَانَ ظَلُوْمًا جَهُوْلًا ﴿ۙ۷۲﴾

’হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের কার্যাবলি সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে। সূরা আহযাব : ৭০-৭১। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯২, সুননে তিরমিযী : ১১০৫, ১৪০৪, সুননে আবূ দাউদ : ২১১৮, আহমাদ : ৪১০৪, দারেমী : ২২০২, মিশকাত : ৩১৪৯, সহিহাহ : ১৪৮৩

২. বিবাহে ওয়ালীমা

মুসলিমদের বিবাহে ওয়ালীমা হলো একটি বিশেষ ভোজ বা বিবাহোত্তর ভোজের আয়োজন, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানাতে এবং তাদের সুখের জন্য দোয়া করতে অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে এর প্রচলন ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

ক. ওয়ালিমার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব

রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত: ওয়ালীমা রাসূল (ﷺ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। তিনি নিজে তাঁর বিবাহের সময় ওয়ালীমার আয়োজন করেছেন এবং সাহাবীদেরকেও এর জন্য উৎসাহিত করেছেন। ওয়ালীমার মাধ্যমে বিবাহকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়, যা সামাজিক সম্পর্ককে মজবুত করে এবং বিবাহকে ব্যভিচার থেকে আলাদা করে।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও এবং তাতে দফ বাজাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো- দফ বাজানো এবং শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৮, ইরওয়াহ : ১৯৯৪, মিশকাত : ৩১৫৩

এটি পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা নবদম্পতির জন্য দোয়া করেন, যা তাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত নিয়ে আসে।

খ. ওয়ালিমা করার জন্য হাদিসে উত্সাহ প্রদান করা হয়েছে

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বিয়ে করেন, তখন ওয়ালীমা করেন, কিন্তু যাইনাব (রাঃ)-এর বিয়ের সময় যে পরিমাণ ওয়ালীমার ব্যবস্থা করেছিলেন, তা অন্য কারো বেলায় করেননি। সেই ওয়ালীমা ছিল একটি ছাগল দিয়ে। সহিহ বুখারি : ৫১৬৮ ৪৭৯১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যাহ (রাঃ)-কে আযাদ করে বিয়ে করেন এবং এই আযাদ করাকেই তাঁর মাহর নির্দিষ্ট করেন এবং তার ’হায়স’(এক প্রকার সুস্বাদু হালুয়া) দ্বারা ওয়ালীমাহ’র ব্যবস্থা করেন। সহিহ বুখারি : ৫১৬৯, ৩৭১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ) মদ্বীনায় আগমন করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ ইবনু রাবী‘ আনসারীর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। সা‘দ (রাঃ) ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘আবদুর রহমান (রাঃ)-কে বললেন, আমি তোমার উদ্দেশে আমার সম্পত্তি অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিতে চাই এবং তোমাকে বিবাহ করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও। তিনি বাজার হতে মুনাফা করে নিয়ে আসলেন পনীর ও ঘি। এভাবে কিছুকাল কাটালেন। একদিন তিনি এভাবে আসলেন যে, তাঁর গায়ে বিয়ের হলুদ রংয়ের চিহ্ন লেগে আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জনৈকা আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাকে কী দিয়েছ? তিনি বললেন, খেজুরের এক আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ। তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, একটি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালীমা কর। সহিহ বুখারি : ২০৪৯, ৫১৫৩, সহহি মুসলিম : ১৪২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ ১৯০৭, সুনানে তিরমিজি : ১০৯৪, আহমাদ : ১৩৩৬৯

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ওয়ালীমা আয়োজন করার নির্দেশ স্বয়ং রাসূল (ﷺ) দিয়েছেন এবং এর জন্য খুব বেশি সম্পদশালী হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দিয়ে হলেও এর আয়োজন করা উচিত।

গ. বিত্তবান ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য করা নিকৃষ্ট কাজ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ওয়ালীমায় কেবল ধনীদেরকে দাওয়াত করা হয় এবং গরীবদেরকে দাওয়াত করা হয় না সেই ওয়ালীমা সবচেয়ে নিকৃষ্ট। যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করে না, সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে অবাধ্যতা করে। সহিহ বুখারি : ৫১৭৭, সহিহ মুসলিম : ১৪৩২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৭৪২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯১৩, আহমাদ : ৭২৭৯, দারিমী : ২১১০, ইরওয়া : ১৯৪৭, সহীহ আত্ তারগীব : ২১৫১

এই হাদিসটি ওয়ালীমার আয়োজনে সামাজিক সমতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে। ওয়ালীমা শুধু ধনী বা সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের জন্য নয়, বরং সবার জন্য হওয়া উচিত।

ঘ. দাওয়াত গ্রহণ করা জরুরি :

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাউকে ওয়ালীমার দাওয়াত করা হলে তা অবশ্যই গ্রহণ করবে। সহিহ বুখারী : ৫১৭৩, ৫১৭৯, সহিহ মুসলিম : ১৪২৯, আহমাদ : ৪৯৪৯

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বন্দীদেরকে মুক্তি দাও, দাওয়াত কবূল কর এবং রোগীদের সেবা কর। সহহি বুখারি : ৩০৪৬, ৫১৭৪

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাউকেও খাবার আয়োজনে দা’ওয়াত দিলে, সে যেন গ্রহণ করে। তবে ইচ্ছা থাকলে খাবে, অন্যথায় খাবে না। সহিহ মুসলিম : ১৪৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৭৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৫১,  মিশকাত : ৩২১৭, আহমাদ : ১৫২১৯, সহীহ আত্ তারগীব : ২১৫৫।

এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ওয়ালীমার দাওয়াত গ্রহণ করাও একটি সুন্নাত। ওয়ালীমা একটি আনন্দময় ও বরকতময় অনুষ্ঠান যা বিবাহের ঘোষণাকে পূর্ণতা দেয় এবং সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।

ঙ. বীনা দাওয়াতে খাওয়া ঠিক নয়, খাইতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে

আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারগণের মধ্যে আবূ শু’আয়ব নামক এক ব্যক্তির গোশ্ত/মাংস বিক্রেতা একজন ক্রীতদাস ছিল। সে ক্রীতদাসকে বলল, তুমি আমার জন্য পাঁচজনের অনুপাতে খাদ্য প্রস্তুত কর। আমি পাঁচজনের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও দা’ওয়াত করতে ইচ্ছুক। সুতরাং সে হিসাবে তাঁর জন্য খাবার তৈরি করা হলো। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা’ওয়াত করলেন। অতঃপর পথিমধ্যে তাঁদের (পাঁচজনের) সাথে একজন শামিল হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ শু’আয়বকে ডেকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তাকে (অতিরিক্ত লোকটিকে) অনুমতি দিতে পার, ইচ্ছা করলে না করতে পার। সে বলল, না, বরং আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সহিহ বুখারী : ৫৪৬১, সহিহ মুসলিম : ২০৩৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৯, মিশকাত : ৩২১৯, সহীহাহ : ৩৫৭৯।

চ. ওয়ালিমান অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে নব দম্পত্তির জন্য দোয় করা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ উপলক্ষে কাউকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলতেন-

«بَارَكَ اللهُ لَكُمْ وَبَارَكَ عَلَيْكُمْ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ»

’’আল্লাহ্ তোমাদের বরকত দান করুন, তোমাদের উপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের সাথে তোমাদের একত্র করুন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৯১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩০, আহমাদ ৮৭৩৩, দারেমী : ২১৭৪,

৩. বিবাহ আনন্দ প্রকাশ করা বা দফ বাজান

সাহাবীগণ (রা.) বিবাহে কবিতা আবৃত্তি ঔ  দফ বাজানোর মাধ্যমে আমোদ-প্রমোদ করতেন বলে হাদিসে প্রমান পাওয়া যায়। ইসলামে বিবাহ একটি উৎসব এবং আনন্দের বিষয়। যা প্রকাশ করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করেত হয়।

গান ও কবিতা আবৃত্তি: বিবাহের দিন বা তার পরে নারীদের জন্য হালকা বাদ্যযন্ত্র (যেমন— দফ) ব্যবহার করে কবিতা বা হামদ-নাত আবৃত্তি করা জায়েয। হাদিসে আনসারদের আমোদ-প্রমোদ প্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই ধরনের কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করে। তবে, পুরুষদের জন্য ঢোল বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা অনুমোদিত নয়।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার গোত্রের জনৈক পুরুষের সাথে জনৈকা নারীর বিয়ের পরে যখন তাকে স্বামীর নিকট ঘরে পাঠানো হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের নিকট কি কোনো (আনন্দোল্লাস উপকরণ স্বরূপ) ক্রীড়াকৌতুক ছিল না? আনসারগণ তো আমোদ-প্রমোদপ্রিয়। সহিহ :বুখারী ৫১৬২, মিশকাত : ৩১৪১, সহীহ আল জামি : ৭৯১

রুবায়ই বিনতু মু‘আওয়িয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বাসর রাতের পরদিন সকালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন এবং তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেমন আমার কাছে বসে আছ ঠিক সেভাবে আমার পাশে আমার বিছানায় এসে বসলেন। তখন কয়েকজন ছোট বালিকা দুফ্[1] বাজিয়ে বদরে নিহত শহীদ পিতাদের প্রশংসা গীতি আবৃত্তি করছিল। শেষে একটি বালিকা বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন, আগামীকল্য কী হবে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন কথা বলবে না, বরং আগে যা বলেছিলে তাই বল। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭, সুনানে তিরমিযী : ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২, আহমাদ : ২৬৪৮১, ২৬৪৮৭

 আর ‘ঈদের দিন সুদানীরা বর্শা ও ঢালের খেলা করত। আমি নিজে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম অথবা তিনি নিজেই বলেছিলেন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ, অতঃপর তিনি আমাকে তাঁর পিছনে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন যে, আমার গাল ছিল তাঁর গালের সাথে লাগান। তিনি তাদের বললেন, তোমরা যা করছিলে তা করতে থাক, হে বনূ আরফিদা। পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার দেখা কি যথেষ্ট হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, তা হলে চলে যাও। সহিহ বুখারি : ৯৫০, ৯৫২, ৯৮৮, ২৯০৮, ৩৫৩০, ৩৯৩১, ৫১৯০, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৮, সুনানে নাসায়ী : ১৫৯৭

৪. শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে বিবাহ করা

শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে মসজিদে বিবাহ সম্পাদন করা। উল্লেখ্য, সকল মাসের যে কোন দিন বিবাহ করা যায়িজ আছে।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শাও্ওয়াল মাসে বিবাহ করেছেন এবং ঐ মাসেই আমার বাসর রজনী হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণের মধ্যে আমার চেয়ে কে অধিক (তার ভালোবাসা প্রাপ্তিতে) সৌভাগ্যবতী ছিলেন? সহিহ মুসলিম :  ১৪২৩, মিশকাত : ৩১৪২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৩,  সুনানে ইবনু মাজাহ ১৯৯০, আহমাদ ২৫৭১৬।

৫. বিবাহের খবর ব্যাপকভাবে প্রচার কর

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

فَصْلُ مَا بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ الدُّفُّ وَالصَّوْتُ فِي النِّكَاحِ

হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো- দফ বাজানো এবং শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৮, ইরওয়াহ : ১৯৯৪, মিশকাত : ৩১৫৩

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও এবং তাতে দফ বাজাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫

৬. নব দম্পতিকে মুবারকবাদ জানানো।

আকীল ইবনু আবূ ত্বলিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বনু জুশম গোত্রের এক মহিলাকে বিবাহ করলে লোকেরা (মুবারকবাদ দিয়ে) বললো, সুখী হও এবং অধিক সন্তান হোক। তিনি বলেন, তোমরা এরূপ বলো না, বরং যেরূপ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তদ্রূপ বলো-

 اللّٰهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ وَبَارِكْ عَلَيْهِمْ

’’হে আল্লাহ্! তাদেরকে বরকত দান করুন এবং তাদের উপর বরকত নাযিল করুন।’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৭১, আহমাদ : ১৭৪০, ১৫৩১৩, দারেমী : ২১৭৩

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ উপলক্ষে কাউকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলতেনঃ

«بَارَكَ اللهُ لَكُمْ وَبَارَكَ عَلَيْكُمْ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ»

’’আল্লাহ্ তোমাদের বরকত দান করুন, তোমাদের উপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের সাথে তোমাদের একত্র করুন।’’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৯১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩০, আহমাদ : ৮৭৩৩, দারেমী : ২১৭৪,

বাসর রাতের সুন্নাহ সম্মত আমল

১. বাসর রাতে স্ত্রীর কপালের উপরের চুল দুআ পাঠ করা

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ স্ত্রী, খাদেম অথবা আরোহণের পশু লাভ করে তখন সে যেন তার কপালে হাত রেখে বলে-

اللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهَا وَخَيْرِ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ

হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকট এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ প্রার্থনা করি এবং যে কল্যাণ এর মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। আমি তোমার নিকট এর অনিষ্ট হতে এবং যে অনিষ্টসহ একে সৃষ্টি করা হয়েছে তা হতে আশরয় চাই’’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯১৮, বাইহাকী, সুনান কুবরা : ১৪২১১

আমর ইবনু শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ে করে অথবা কোনো দাসী ক্রয় করে তখন সে যেন বলে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ،

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর মধ্যকার কল্যাণ এবং এর মাধ্যমে কল্যাণ চাই এবং তার মধ্যে নিহিত অকল্যাণ ও তার মাধ্যমে অকল্যাণ থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।’’

আর যখন কোনো উট কিনবে তখন যেন সেটির কুঁজের উপরিভাগ ধরে অনুরূপ দু’আ করে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আবূ সাঈদের বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তার কপালের চুল ধরে বলবে। স্ত্রী এবং দাসীর ব্যাপারেও বরকতের দু’আ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৬০

২. স্বামী-স্ত্রী  উভয়ে একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করা :

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, স্ত্রী যখন স্বামীর কাছে যাবে, স্বামী তখন দাঁড়িয়ে যাবে। আর স্ত্রীও দাঁড়িয়ে যাবে তার পেছনে। অতপর তারা একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করবে এবং বলবে-

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِي أَهْلِي، وَبَارِكْ لَهُمْ فِيَّ، اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي مِنْهُمْ وَارْزُقْهُمْ مِنِّي، اللَّهُمَّ اجْمَعَ بَيْنَنَا مَا جَمَعْتَ إِلَى خَيْرٍ، وَفَرِّقْ بَيْنَنَا إِذَا فَرَّقْتَ إِلَى خَيْرٍ.

‘হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দিন আর আমার ভেতরেও বরকত দিন পরিবারের জন্য। আয় আল্লাহ, আপনি তাদের থেকে আমাকে রিযক দিন আর আমার থেকে তাদেরও রিযক দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যতদিন একত্রে রাখেন কল্যাণেই একত্র রাখুন আর আমাদের মাঝে যখন বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবেন তখন কল্যাণের পথেই বিচ্ছেদ ঘটাবেন। . তাবরানী, মুজামুল কাবীর : : ৮৯০০, মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ১৭৪৩৩

৩. বাসর রাতে সহবাস করার ইচ্ছা করলে দুআ দুআ পাঠ করা

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে-

بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏

“আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখো এবং আমাদের যে সন্তান দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।”

 অতঃপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ১৪১, ৩২৭১, ৩২৮৩, ৫১৬৫, ৬৩৮৮, ৭৩৯৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৪, সুনানে তিরমিযী ১০৯২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৬১, আহমাদ : ১৮৭০, ১৯১১, ২১৭৯, ২৫৫১, ২৫৯২, দারেমী : ২২১২, ইরওয়াহ : ২০১২

৪. সহবাসের সময় পর্দা করা।

উতবা ইবনু আব্দ আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর নিকট এসে যেন (নির্জনে মিলনে) পর্দা (গোপনীয়তা) রক্ষা করে এবং গর্দভের ন্যায় বিবস্ত্র না হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, ইরওয়া : ২০০৯

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাইনি বা তা দেখিনি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, আহমাদ ২৩৮২৩, ইরওয়া : ১৮১২, মিশকাত : ৩১২৩

৫. নিষিদ্ধ সময় ও জায়গা থেকে বিরত থাকা :

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم

যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে অথবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়।  সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করে। সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬৩৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওয়াহী নাযিল হয়- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’। সূরা বাকারা : ২২৩। তাই সামনের দিক হতে বা পিছন দিক হতে সহবাস কর; কিন্তু মলদ্বার ও ঋতুবতী হতে বিরত থাক। মিশকাত : ৩১৯১, সুনানে তিরমিযী : ২৯৮০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯২৫, আহমাদ : ২৭০৩, সহীহ আল জামি :  ১১৪১।

৬- ঘুমানোর আগে অযূ বা গোসল করা :

স্ত্রী সহবাসের পর সুন্নত হলো অযূ বা গোসল করে তবেই ঘুমানো। অবশ্য গোসল করাই উত্তম।

আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

ثَلَاثَةٌ لَا تَقْرَبُهُمُ الْمَلَائِكَةُ: جِيفَةُ الْكَافِرِ، وَالْمُتَضَمِّخُ بِالْخَلُوقِ، وَالْجُنُبُ، إِلَّا أَنْ يَتَوَضَّأَ

তিন প্রকার ব্যক্তির নিকট ফিরিশতারা আসেন না। (১) কাফিরের লাশের নিকট (জানাযায়). (২) জাফরান রঙ ব্যবহারকারী এবং (৩) নাপাক ব্যক্তির নিকট, তবে সে উযু করলে ভিন্ন কথা। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৮০

৭. বাসর রাতে স্ত্রী ঋতুবতীর হলেও যা যা অনুমতি রয়েছে

স্বামীর জন্য ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে যোনি ব্যবহার ছাড়া অন্য সব আচরণের অনুমতি রয়েছে। স্ত্রী পবিত্র হবার পর গোসল করলে তার সঙ্গে সবকিছুই বৈধ।

আনাস (রা. থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীগণ তাদের মহিলাদের হায়িয হলে তার সাথে এক সঙ্গে খাবার খেত না এবং এক ঘরে বাস করত না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন-

আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।  সূরা বাকারা : ২২২

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর। এ খবর ইয়াহুদীদের কাছে পৌছলে তারা বলল, এ লোকটি সব কাজেই কেবল আমাদের বিরোধিতা করতে চায়।

অতঃপর উসায়দ ইবনু হুযায়র (রা.) ও আব্বাদ ইবনু বিশ্বর (রা.) এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা এমন এমন বলছে। আমরা কি তাদের সাথে (হায়িয অবস্থায়) সহবাস করব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এতে আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি তাদের উপর ভীষণ রাগাম্বিত হয়েছেন। তারা (উভয়ে) বেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দুধ হাদিয়া এলো। তিনি তাদেরকে ডেকে আনার জন্যে লোক পাঠালেন। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে দুধ পান করালেন। তখন তারা বুঝল যে, তিনি তাদের উপর রাগ করেননি। সহিহ মুসলিম : ৩০২

৮. বাসর রাতের স্ত্রী সান্বিধ্যের গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

৯. বাসর রাতে বিশুদ্ধ নিয়তে স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে

নারী-পুরুষের উভয়ের উচিত বিয়ের মাধ্যমে নিজকে হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর নিয়ত করা। তাহলে উভয়ে এর দ্বারা ছাদাকার ছাওয়াব লাভ করবে।

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম : ১০০৬

বিবাহে যে কাজগুলো বর্জনীয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. মেয়ের পক্ষ থেকে ওয়ালীমার করার হুকুম

বিয়ের পর ওয়ালীমার মূল দায়িত্ব বর বা ছেলের পক্ষের। এটি অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যা বিবাহের ঘোষণা ও আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বরপক্ষের জন্য একটি নেকীর কাজ।

যখন কনে বা তার পরিবার ওয়ালীমার নামে কোনো ভোজের আয়োজন করে, তখন তা শরীয়তের ওয়ালীমা হিসেবে গণ্য হয় না, বরং এটি একটি সামাজিক প্রথা বা রেওয়াজ মাত্র। এটি নিঃসন্দেহে সুন্নাহর স্পষ্ট বিপরীত। কারণ, এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে এবং সমাজের প্রচলিত প্রথাকে দ্বীনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ইসলামের আনিত নিয়ম বাদ দিয়ে সমাজের বা বাপ দাদাদের প্রথাকে অনুসরণ করেত আল্লাহ  নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَکَذٰلِکَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ قَبۡلِکَ فِیۡ قَرۡیَۃٍ مِّنۡ نَّذِیۡرٍ اِلَّا قَالَ مُتۡرَفُوۡہَاۤ ۙ اِنَّا وَجَدۡنَاۤ اٰبَآءَنَا عَلٰۤی اُمَّۃٍ وَّاِنَّا عَلٰۤی اٰثٰرِہِمۡ مُّقۡتَدُوۡنَ

এভাবে তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখন ওর সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিরা বলত, আমরাতো আমাদের পূর্ব-পুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের অনুসারী এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। সুরা যুখরুফ : ৪৩

মুসলিমদের উচিত বিয়ের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় সামাজিক প্রথা পরিহার করা।

যদি কনে পক্ষ কেবল সাধারণ আপ্যায়ন বা অতিথি সংবর্ধনার উদ্দেশ্যে কোনো ভোজের আয়োজন করে এবং তাকে ওয়ালীমা না বলে, তবে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সমাজে এই ধরনের ভোজকেই “ওয়ালীমা” বলা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বরপক্ষের সুন্নাহসম্মত ওয়ালীমাকে বাদ দিয়ে শুধু কনেপক্ষের আয়োজনকেই প্রধান্য দেওয়া হয়।

২. ওয়ালীমার পুরস্কার নেওয়া

ইসলামে উপহার (হাদিয়া) আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। মহানবী (সা.) নিজেও হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং উপহার দিতে উৎসাহিত করতেন।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। লোকেরা তাদের হাদিয়া পাঠাবার ব্যাপারে ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর জন্য নির্ধারিত দিনের অপেক্ষা করত। এতে তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করত। সহিহ বুখারি : ২৫৭৪, ২৫৮০, ২৫৮১, ৩৭৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৪৪১, ২৪৪২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা পরস্পরকে হাদিয়া দাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়বে।” আল-আদাব আল-মুফরদ : ৫৯৪

ওয়ালীমা হলো নবদম্পতির জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানানোর একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত গ্রহীতা যদি নবদম্পতিকে কোনো উপহার দেন, তবে তা হাদিয়া হিসেবেই গণ্য হবে। এটি একটি প্রশংসনীয় কাজ, কারণ এর মাধ্যমে নতুন দম্পতির প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ–ভারতের অনেক সমাজে দেখা যায়, ওয়ালীমার দাওয়াতে যারা যায়, তারা খাবারের সাথে খুশি হয়ে টাকা বা উপহার দিয়ে যায়। ওয়ালীমার এ ধরনের উপহারের পিছনে নিচে ইসলমা বিরোধী কাজগুলো লুকিয়ে থাকে।

ক. ওয়ালীমা ইবাদত ছাড়া কোন ব্যবসা নয় :

ওয়ালীমা মূলত একতরফা খাওয়ানো। অতিথির কাছ থেকে কিছু নেওয়া ইসলামের উদ্দেশ্যের বিরোধী।

এতে ইবাদত সামাজিক লেনদেনে পরিণত হয়।

খ. উপহার প্রদান রেওয়াজে আবদ্ধ হয় :

অনেকে ভাবে, “অমুক আমাদের ওয়ালীমায় এত টাকা দিয়েছে, আমরাও তার দাওয়াতে দিতে বাধ্য।” এটি চাপ সৃষ্টি করে, অথচ ইসলাম অতিথিকে চাপ দেয়নি, বরং খেতে আসাটাই সুন্নাহ। যদি এটি একটি চক্রে পরিণত হয় (আমি তাকে দিয়েছি, তাই সে আমাকে দেবে), তবে এর পবিত্রতা নষ্ট হয়।

গ. সাদাসিধে ওয়ালীমা হারিয়ে যাওয়া :

পুরস্কার-প্রত্যাশী মনোভাব ওয়ালীমাকে আড়ম্বরপূর্ণ করে ফেলে। অথচ নবিজি ﷺ বলেছেন, সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটিই, যেখানে খরচ কম হয়। মুসনাদ আহমাদ : ২৪৫৯৫, সহিহ

ঘ. বিদআতের রূপান্তিরিত হয় :

নবিজি ﷺ এবং সাহাবাদের যুগে ওয়ালীমায় কারো থেকে টাকা-পয়সা নেওয়া হয়নি। অথচ এখন সমাজে এটি প্রচলিত। সুতরাং এটি বিদআতী রেওয়াজ।

ঙ. লোক দেখানোর প্রবণতা থাকে :

যখন উপহার দেওয়া-নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ভালোবাসা বা সহযোগিতা না হয়ে লোক দেখানো বা সামাজিক চাপ হয়, তখন তা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়।

চ. বাধ্যবাধকতা : অনেক সমাজে এটি এমনভাবে প্রচলিত হয়েছে যে, উপহার না দিলে তা অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়। ইসলামে কোনো উপহার দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। ওয়ালীমা হলো খাওয়ানোর ইবাদত, “খেয়ে উপহার নেওয়ার রেওয়াজ” নয়। ইসলামে দাওয়াতের বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করা ইবাদতের সাথে খেলা করা, তাই একে ইসলামের পরিভাষায় বলা যায়— বিদআত ও সুন্নাহ-বিরোধী রেওয়াজ।

৩. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে বেপর্দা গমন গুনাহের কাজ

ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে নারীদের বেপর্দা এবং ফ্যাশন শো-এর মতো আচরণ নিঃসন্দেহে ইসলামে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ইসলামে পর্দার বিধান শুধু একটি পোশাক নয়, বরং এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা নৈতিকতা, শালীনতা এবং পারস্পরিক সম্মান রক্ষা করে।

ইসলামে পর্দার গুরুত্ব

ইসলামে পর্দার বিধান কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।  সুরা আহযাব : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা নুর : ৩০

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

ক. বিয়ের অনুষ্ঠানে বেপর্দা ও ফ্যাশন শো-এর কুফল

বিয়ের অনুষ্ঠানে বেপর্দা হওয়া এবং ফ্যাশন শো-এর মতো আচরণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে কয়েকটি কারণে গর্হিত কাজ:

খ. আল্লাহর বিধানের লঙ্ঘন :

এটি সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহর বিধানের লঙ্ঘন। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করা একটি বড় পাপ।

গ. দৃষ্টির ফিতনা :

বিয়ের অনুষ্ঠানে যখন নারীরা আকর্ষণীয় পোশাক ও সাজে নিজেদের প্রকাশ করে, তখন তা পুরুষদের দৃষ্টির ফিতনার কারণ হয়। তাছাড়া, বেপর্দা মেলামেশা থেকে প্রেম, ব্যভিচার ও অনৈতিক সম্পর্কের পথ উন্মুক্ত হয়।  ফরে নারী পুরুষ উভয়ই গুনাহগার হয়।

ঘ. আড়ম্বর ও অপচয় :

ইসলামে বিয়েকে সহজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু বেপর্দার সঙ্গে ফ্যাশন শো-এর মতো আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করা অপচয়ের (ইসরাফ) অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে অপছন্দনীয়। আল্লাহ অহংকারী ও অপব্যয়ীদের ভালোবাসেন না।

إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

“নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়ীদের ভালোবাসেন না। সূরা আনআম : ১৪১

ঙ. অহংকার ও রিয়া :

এই ধরনের অনুষ্ঠানে অনেক সময় লোক দেখানো বা অহংকার প্রদর্শনের প্রবণতা থাকে, যা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত) এবং এটি মুসলিমদের জন্য একটি মারাত্মক নৈতিক দুর্বলতা।

এটি সরাসরি একটি হারাম কাজ। কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বেপর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে এবং তা লঙ্ঘন করা সুস্পষ্টভাবে হারাম।

সুতরাং, আমাদের দেশের অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানে যে বেপর্দার প্রচলন আছে, তা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি একটি মারাত্মক নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়। মুসলিমদের উচিত বিয়ের মতো একটি পবিত্র অনুষ্ঠানে আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা।

৪. ওয়ালীমাতে অপচয় করা এবং আভিজাত্য জাহির করা :

ওয়ালীমা একটি সুন্নত অনুষ্ঠান, এটি আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। কিন্তু ইসলাম এর মধ্যে আভিজাত্য জাহির ও অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কুরআন-হাদিসে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যেন আমরা ভোগ-বিলাস ও অপচয়ের পথে না যাই। যেমন-

ক. বিয়ের জন্য দামি দাওয়াত কার্ড ছাপা

বিয়ের দাওয়াত কার্ড মূলত খবর পৌঁছানোর একটি মাধ্যম। কিন্তু অনেকেই এই মাধ্যমকে আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেন। দামি, জাঁকজমকপূর্ণ, এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় কার্ড ছাপিয়ে অর্থ নষ্ট করা হয়, যা কোনোভাবেই ইসলামে অনুমোদিত নয়। ইসলাম সবক্ষেত্রে সরলতা এবং মিতব্যয়িতার ওপর জোর দেয়। বিয়েতে দাওয়াত কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে জানানো, সেটা যেকোনো সহজ উপায়েও হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। সূরা বনী ইসরাঈল ; :২৭

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যেকোনো ধরনের অপচয়ই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

খ. হোটেল ও কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা

বিয়েতে বিলাসবহুল হোটেল বা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা আজকাল একটি সাধারণ প্রবণতা। এতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, যা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঋণের বোঝা তৈরি করে। ইসলামে বিয়ে একটি সহজ ও বরকতময় ইবাদত। এটি এমন কোনো অনুষ্ঠান নয় যেখানে আভিজাত্য দেখাতে গিয়ে অন্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বিয়ে তার আসল উদ্দেশ্য (স্বামী-স্ত্রীর মিলন) থেকে দূরে সরে গিয়ে লোক দেখানো একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন-

“أَعْظَمُ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مَئُونَةً”

সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হলো সেটি, যাতে খরচ সবচেয়ে কম হয়। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৭৩, সুনানে বাইহাকি : ১৩৫৮৮

আমর ইবনে শো’আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পানাহার করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো যাবত না তার সাথে অপচয় বা অহংকার যুক্ত হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬০৫, আহমাদ : ৬৬৫৬, ৬৬৬৯, মিশকাত : ৪৩৮১।

এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, বিয়ের বরকত খরচের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর সহজতা ও সরলতার ওপর নির্ভর করে।

গ. শুধু বিয়ের জন্য বাহারি পোশাক কেনা

অনেকেই শুধু বিয়ের দিনের জন্য এক বা একাধিক ব্যয়বহুল পোশাক কেনেন, যা পরে আর কোনো কাজে লাগে না। এটি এক ধরনের অপচয়। ইসলামে পোশাকের ব্যাপারে মার্জিত ও শালীনতার কথা বলা হয়েছে, তবে তা অবশ্যই সামর্থ্যের মধ্যে হতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অর্থ খরচ করা এবং পরে তা ফেলে রাখা বা ব্যবহার না করা ইসলামে নিন্দনীয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন_

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ : ৩১

এই আয়াতটি খাওয়া-পরাসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে অপচয় বর্জন করার নির্দেশ দেয়।

আবূ উমামাহ সালাবাহ আল-আনসারী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ তাঁর সামনে দুনিয়াদারী সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি শুনতে পাও না, তোমরা কি শুনতে পাও না যে, পোশাক-পরিচ্ছদের নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ, পোশাক-পরিচ্ছদে নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদে বাবুগিরী প্রদর্শন না করা। সুনানে আবু  দাউদ : ৪১৬১

ঘ. খাবারে অপচয় করা

বিয়েতে সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় খাবারে। আয়োজনকারীরা অতিথিদের সংখ্যা এবং খাবারের পরিমাণ সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারায় প্রচুর খাবার নষ্ট হয়। এই অপচয় করা খাবারগুলো সমাজের অনেক দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যের উৎস হতে পারত। ইসলামে খাবার নষ্ট করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন_

وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ : ৩১

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারো লোকমা পড়ে গেলে সে যেন তা তুলে নেয়। তারপর তাতে যে আবর্জনা স্পর্শ করেছে তা যেন দূরীভূত করে এবং খাদ্যটুকু খেয়ে ফেলে। শাইতানের জন্য সেটি যেন ফেলে না রাখে। আর তার আঙ্গুল চেটে না খাওয়া পর্যন্ত সে যেন তার হাত রুমাল দিয়ে মুছে না ফেলে। কেননা সে জানে না খাদ্যের কোন অংশে বারাকাত রয়েছে। সহিহ মুসলিম : ২০৩৩

এই হাদিসটি খাবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অপচয় থেকে বিরত থাকার কথা বলে।

ঙ. বিয়ের অনুষ্ঠানে লাইটিং করা

বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বা লাইটিং করা হয়, যা মূলত আভিজাত্য ও জৌলুস দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়। এই অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জায় প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয় এবং খরচও বৃদ্ধি পায়। ইসলামে বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো সহজ ও সাবলীলভাবে একটি নতুন পরিবার গঠন, যেখানে এসব বাহ্যিক প্রদর্শনীর কোনো স্থান নেই।

শা‘বী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রহ.)-এর কাতিব (একান্ত সচিব) বলেছেন, মু‘আবিয়া (রাঃ) মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রাঃ)-এর কাছে লিখে পাঠালেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছ হতে আপনি যা শুনেছেন তার কিছু আমাকে লিখে জানান। তিনি তাঁর কাছে লিখলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন- (১) অনর্থক কথাবার্তা, (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক সওয়াল করা। সহিহ বুখারি : ১৪৭৭

চ. মেয়েরা পোশাক-আশাকের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে

বিয়েতে কনের জন্য পোশাক-আশাক, গহনা এবং অন্যান্য সাজসজ্জার পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। এই ব্যয় অনেক সময় পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। সমাজে এটি একটি অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছে যে, কনেকে যত বেশি জাঁকজমকপূর্ণ সাজানো হবে, তত তার সম্মান বাড়বে। অথচ ইসলামে নারী-পুরুষ সবার জন্যই সরলতা এবং মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

বিয়েতে অপচয় ও আভিজাত্য জাহির করা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী। এর ফলে শুধু অর্থ ও সম্পদের অপচয়ই হয় না, বরং সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপরও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত, এসব অহেতুক রীতিনীতি পরিহার করে ইসলাম নির্দেশিত পথে সহজ ও বরকতময় বিয়ের আয়োজন করা।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-

مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ أَلْبَسَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَوْبًا مِثْلَهُ زَادَ عَنْ أَبِي عَوَانَةَ ثُمَّ تُلَهَّبُ فِيهِ النَّارُ

যে ব্যক্তি খ্যাতি লাভের জন্য পোশাক পরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সেরূপ পোশাক পরাবেন, অতঃপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে। সুনানে  আবু দাউদ : ৪০২৯

ছ. অশ্লীল কিংবা প্রসিদ্ধি ও অহংকারের পোশাক পরা :

অতি টাইট, পাতলা ও গোপন সৌন্দর্যকে প্রস্ফূটিত করে এমন পোশাক পরা। বক্ষ, বাহু ও কটি দৃশ্যমান হয় এমন অপ্রচলিত ও দৃষ্টিকটু পোশাক পরে অহংকার দেখানো এবং পর পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

জ. নারীদের সুগন্ধি ব্যবহার করা :

বিবাহ অনুষ্ঠানে ইদানীং মেয়েরা বিশেষত তরুণীরা মহা উৎসাহে সেন্ট ব্যবহার করে অংশগ্রহণ করে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ ، فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ

‘যে নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে অতপর মানুষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাতে তার সুগন্ধি পায়, সে ব্যভিচারিণী। সুনানে  নাসায়ি : নাসায়ী : ৯৩৬১; আহমদ : ১৯৭২৬।

৫. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে গান বাজনা করা

পুর্বের আলোচনাতে দেখেছি বিবাহর অনুষ্ঠানে দফ জানান জায়েয। কিন্তু আমাদের সমাজে দফ নয়, সরাসরি নাজ গানের আয়োজন করা হয় তা নিশ্চয়ই হারাম। তাই দফ বাজানো জায়েয হলে আলেমগণ শর্ত সাপেক্ষে জায়েয করেছেন।

বিয়ের ওয়ালীমায় দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, যার শুধু একদিক খোলা) ব্যবহার করা জায়েয। তবে এর সাথে অশ্লীল বা অনর্থক কথা, অশ্লীল গান, এবং নারীদের বাদ্যযন্ত্র বাজানো জায়েয নয়। নিচের শর্তাবলী অনুসরণ করে দফ বাজানো জায়েয়। ওয়ালীমা অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো খাবার পরিবেশন করা, গান-বাজনা নয়।

অবশ্য কিছু আলোম গান-বাজনাকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। তারা বলেন- ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে গান-বাজনা সম্পূর্ণ হারাম। তারা এই মতের পক্ষে বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) গান-বাজনা, বিশেষ করে অশ্লীল গান-বাজনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধুমাত্র ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে নয়, বরং কোনো অনুষ্ঠানেই গান-বাজনা করা জায়েয নয়। আলেমগণ একমত যে অশ্লীল গান-বাজনা, অশ্লীল বা অনর্থক কথা, এবং অশ্লীল বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হারাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ

অর্থ : আর মানুষদেরই মধ্যে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষ কে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা (গান) খরিদ করে।  এবং তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসাবে গ্রহন করে। এ ধরনের লোকদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব৷ সুরা লুকমান : ৬

এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ‘লাহওয়াল হাদীছ’ অবলম্বন করে, সে দোজখের কঠিন শাস্তি প্রাপ্ত হবে, কাজেই তা হারাম। উক্ত আয়াত-এ বর্ণিত (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাসির বলেন- ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর অর্থ- সঙ্গীত বা গান-বাজনা। বেশীর ভাগ তাফসির কারকগণ  ‍লাহওয়াল হাদিস বলতে গানকে বুঝিয়েছেন।

প্রখ্যাত সাহাবী আ’ব্দুল্লাহ ইবনু মাসউ’দ (রা.) বলেন, “আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, (এই আয়াতে উল্লেখিত) ‘লাহুয়াল হাদীস’ (অবান্তর-কথাবার্তা) কথার অর্থ হচ্ছে গান।” ‘ইবলীসের আওয়াজ’।

তাফসিরে তাফহিমুল কুরআনে মাওলানা মউদুদী বলেন-

“লাহওয়াল হাদীস” অর্থাৎ এমন কথা যা মানুষকে আত্ম-সমাহিত করে অন্য প্রত্যেকটি জিনিস থেকে গাফিল করে দেয়। শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে এ শব্দগুলোর মধ্যে নিন্দার কোন বিষয় নেই। কিন্তু খারাপ, বাজে ও অর্থহীন কথা অর্থে শব্দটির ব্যবহার হয়। যেমন গালগল্প, পুরাকাহিনী, হাসি-ঠাট্টা, কথা-কাহিনী, গল্প, উপন্যাস, গান বাজনা এবং এ জাতীয় আরো অন্যান্য জিনিস।

আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০২০, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৬৮৮, আহমাদ : ২২৩৯৩, মিশকাত : ৪২৯২, সহীহাহ : ১৩৮-১৩৯।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে  দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৬. বিয়েতে হারাম কাজ হলেও তাতে অংশ নেয়া :

বিয়ের অনুষ্ঠানে যদি নিষিদ্ধ কিছুর আয়োজন থাকে তবে তাতে অংশ নেয়ার অনুমতি নেই।  আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল আমার নিকট এসে বলেন, গত রাতে আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু আমি প্রবেশ করিনি। কারণ ঘরের দরজায় ছবি ছিলো। ঘরের মধ্যে ছিলো ছবিযুক্ত পর্দা এবং ঘরের ভিতরে ছিলো কুকুর। সুতরাং আপনি ঘরে ঝুলানো ছবির মাথা কেটে দেয়ার আদেশ করুন, তাহলে তা গাছের আকৃতিতে পরিণত হবে। আর পর্দাটি কেটে দু’টি বালিশের ভিতরের কাপড় বানাতে আদেশ করুন এবং কুকুরটিকে বের করে দেয়ার হুকুম দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপদেশ মতো কাজ করলেন। কুকুরটি ছিলো হাসান বা হুসাইনের এবং তা তাদের খাটের নীচে শুয়ে ছিলো। তিনি সেটাকেও বের করে দেয়ার আদেশ দেন এবং তা বের করে দেয়া হলো। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আন-নাযাদ হচ্ছে কাপড় রাখার বস্তু, গদি সদৃশ। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৫৮, সুনানে তিরমিজি : ২৫০৬, সুনানে নাসায়ী : ৫৩৫১

ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুসারে, কোনো মুসলমানের এমন কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া উচিত নয় যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে-

ক. হারাম কাজ থেকে দূরে থাকা একটি ইবাদত। কোনো অনুষ্ঠানে এমন কিছু থাকলে সেখানে উপস্থিত থাকা মানে হলো সেই হারাম কাজকে সমর্থন করা। এতে পুণ্য অর্জনের সুযোগ নষ্ট হয়।

খ. রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাদিস অনুযায়ী, যে ঘরে ছবি বা মূর্তি থাকে, সেখানে রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করেন না। একইভাবে, গান-বাজনা, অশ্লীলতা বা অন্যান্য হারাম কাজ যেখানে হয়, সেখানেও আল্লাহর রহমত থাকে না।

গ. কোনো অনুষ্ঠানে হারাম কাজ থাকলে তা থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ, সেখানে উপস্থিত থাকা মানে হলো সেই হারাম কাজকে সমর্থন করা। এটি সমাজে সেই হারাম কাজকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

ঘ. একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ঈমানকে রক্ষা করা। হারাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে ঈমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ইমাম আওযায়ী (রহ.)-এর বক্তব্যটি এই নীতিরই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছেন, যে দাওয়াতে তবলা বা বাদ্যযন্ত্র থাকে, সেখানে যাওয়া যাবে না। এর অর্থ হলো, ওয়ালীমার মূল উদ্দেশ্য বরকতময় করা এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। তাই কোনো অনুষ্ঠানে যদি এমন কিছু থাকে যা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিপন্থী, তবে সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৭. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানর ভিডিও ও ছবি তোলা :

ওয়ালীমার অনুষ্ঠান ভিডিও ও ছবি তোলা বিষয়টি আধুনিক যুগের একটি মাসআলা। কুরআন-হাদিসে সরাসরি ভিডিও বা ফটোগ্রাফির উল্লেখ নেই, তবে এ বিষয়ে ইসলামি উলামারা কুরআন-সুন্নাহর মূল নীতিমালা থেকে হুকুম নির্ধারণ করেছেন।

১. কুরআনের দিক থেকে নির্দেশনা আছে মানুষ যেন অশ্লীলতা ও বেপর্দা এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা নুর : ৩০

অপ্রয়োজনীয় চিত্র বা মূর্তি ব্যবহার থেকে বারণ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই কিয়ামতের দিবসে মানুষের মধ্যে (কঠিন শাস্তি ভোগকারী হবে ছবি তৈরিকারীরা। সহিহ মুসলিম : ২১০৯

আবূ তালহাহ্ (রাযিঃ)-এর সানাদে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ফেরেশতাগণ সে গৃহে প্রবেশ করেন না, যে গৃহে কোন কুকুর অথবা কোন (প্রাণীর) ছবি থাকে। সহিহ মুসলিম : ২১০৬

৫৯৫০. মুসলিম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) মাসরূকের সাথে ইয়াসার ইবনু নুমাইরের ঘরে ছিলাম। মাসরূক ইয়াসারের ঘরের আঙিনায় কতগুলো মূর্তি দেখতে পেয়ে বললেনঃ আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে শুনেছি এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, (কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সব থেকে শক্ত শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি তৈরি করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৫০, সহিহ মুসলিম : ২১০৯, আহমাদ : ৩৫৫৮

 এ সম্পর্কে আলেমদের মতামত

পুরনো যুগে “ছবি” বলতে মূলত আঁকা ছবি বা ভাস্কর্য বোঝানো হতো। সেগুলো শিরকের মাধ্যম হওয়ায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আধুনিক যুগে ক্যামেরার ছবি/ভিডিও নিয়ে উলামাদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম বলেন, এটি “আসল ছবি আঁকার মতো” নয়, বরং প্রতিফলন (reflection), তাই প্রমাণস্বরূপ, পরিচয়ের প্রয়োজনে, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে জায়েজ। তবে যদি তা অশ্লীলতা, বেপর্দা, পুরুষ-নারীর মিশ্রণ, গায়িকা/বাদ্যযন্ত্র, অপচয় প্রভৃতির সাথে হয়, তাহলে তা স্পষ্টতই হারাম।ইসলামি শরিয়তে ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে ভিডিও ও ছবি তোলার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদের মূল কারণ হলো, ছবি ও ভিডিওর বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।

ক. শর্ত সাপেক্ষে ওয়ালীমায় ভিডিও ও ছবি তোলার জায়েয :

অধিকাংশ আধুনিক আলেম ছবি ও ভিডিওকে জায়েজ মনে করেন, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে। হাদিসের নিষেধাজ্ঞা ছিল প্রাণীর মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরির জন্য, যা পূজা বা শিরকের উদ্দেশ্যে করা হতো। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা বা ভিডিও করা সেই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। ভিডিও ও ছবি হলো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি, যা হাতে আঁকা ছবি বা মূর্তির মতো নয়। অনেক ইসলামিক কাজ, যেমন শিক্ষার জন্য, দাওয়াতের জন্য, এবং পারিবারিক স্মৃতি রক্ষার জন্য ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি এতে কোনো হারাম কাজ না থাকে, যেমন গান-বাজনা, অশ্লীল দৃশ্য ইত্যাদি, তবে তা বৈধ হতে পারে। অনেক আলোম নিচের শর্তে ছবি করার আনুমতি দিয়েছেণ অনুমোদনযোগ্য শর্তে:

১. কেবল স্মৃতিচারণ বা হালাল উদ্দেশ্যে,

২. যেখানে নারী-পুরুষের মিশ্রণ নেই,

৩. বেপর্দা, অশ্লীলতা বা অপচয়ের দৃশ্য ধারণ করা হয় না।

৪. ভিডিও পরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া যারে না

৫. অনুষ্ঠানে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র ও অশ্লীল পোশাক থাকা যাবে না।

খ. যারা ছবি ও ভিডিওকে হারাম মনে করেন:

কিছু আলেম, যারা প্রাণীর ছবি আঁকা বা মূর্তি বানানো হারাম মনে করেন, তারা ভিডিও এবং ছবি তোলাকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলেন। তাদের যুক্তি হলো- হাদিসে বর্ণিত ছবি ও মূর্তির নিষেধাজ্ঞা ভিডিও এবং ছবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভিডিওতে অনেক সময় নারীদের অনিয়ন্ত্রিতভাবে দেখানো হয়, যা পর্দার বিধানের পরিপন্থী। এগুলো সাধারণত অহংকার ও অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ওয়ালীমার অনুষ্ঠানের ভিডিওতে করা হয় তাতে হারাম গান-বাজনা, নারী অশ্লীল দৃশ্য বা কর্মকাণ্ড থাকা খুবই সাভাবিক বিষয়। এ অনুষ্ঠানে নারী ও পুরুষদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়না। তাই তাদের ছবি ও ভিডিও তোলার ফলে নারীদের পর্দা লঙ্ঘিত হয়। কোন অপ্রয়োজনীয় ছাড়াই  ছবি ও ভিডিও তোলা হয়,  এর ফলে আর্থিক অপচয় হয়।  ইসলামে অপচয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিবাহ হলো ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মুসলিম নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একটি পবিত্র চুক্তি। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও বিধি রয়েছে। এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করা অপরিহার্য। তবে, দুঃখজনকভাবে মুসলিম সমাজে বিবাহের সময় কিছু প্রচলিত প্রথা দেখা যায়, যা ইসলামের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৯. মুসলিম বিবাহে প্রচলিত কিছু কুপ্রথা

ক. পাত্রী দেখা

পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে ইসলামী নিয়ম হলো, যিনি বিবাহ করবেন, শুধু তিনিই পাত্রীকে দেখতে পারবেন। এর উদ্দেশ্য হলো, পাত্রীকে ভালোভাবে দেখে তার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। পাত্রীর চেহারা, শারীরিক গঠন এবং অন্যান্য বিষয় দেখা অনুমোদিত। তবে, যারা পাত্রীর মাহরাম নন, তাদের সামনে পাত্রীর যাওয়া জায়েজ নয়। অর্থাৎ, যিনি বিবাহ করবেন, তার সঙ্গে তার বাবা, চাচা বা অন্য পুরুষ আত্মীয়রা থাকলে পাত্রীকে তাদের সামনে পর্দা করতে হবে। অথচ আমাদের সমজে নামাহরাম পুরুষ পাত্রী দেখে থাকে যা হারাম।

উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো পুরুষ অপর (মাহরাম নয়) নারীর সাথে নিঃসঙ্গে দেখা হলেই শয়তান সেখানে তৃতীয় জন হিসেবে উপস্থিত হয়। সুনানে তিরমিজি : ১১৭১, ২১৬৫, মিশকাত : ৩১১৮

২. গায়ে হলুদের রীতি

ইসলামে গায়ে হলুদের কোনো বিধান নেই। এটি মূলত হিন্দুধর্মের একটি প্রথা, যা বর ও কনের পরিবারে আনন্দ এবং উৎসবের জন্য প্রচলিত হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, এই ধরনের প্রথা অনুসরণ করা উচিত নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী পালন করবে, অন্য ধর্মের প্রথা অনুসরণ করে নয়।

(১) গায়ে হলুদের উৎপত্তি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটি হিন্দু ধর্মের একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি, যা বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বর-কনেকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করা এবং তাদের দাম্পত্য জীবনের শুভ কামনা করা। এই ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-আচরণ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ ইসলামে সকল প্রকার কুসংস্কার এবং অন্য ধর্মের রীতিনীতি অনুসরণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী পালন করা বাধ্যতামূলক।

(২) ইসলামে অন্য ধর্মের প্রথা অনুসরণ

ইসলামে অন্য ধর্মের প্রথা ও আচার-আচরণ অনুসরণ করাকে ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য গ্রহণ) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এটি নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে-

 ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

গায়ে হলুদ যেহেতু অমুসলিমদের একটি ধর্মীয় প্রথা, তাই এটি পালন করা মুসলিমদের জন্য জায়েজ নয়।

(৩) সৌন্দর্যবর্ধনে হলুদের ব্যবহার

ব্যক্তিগতভাবে সৌন্দর্যের জন্য হলুদ ব্যবহার করা ইসলামী শরিয়তে জায়েজ। অর্থাৎ, যদি বর বা কনে নিজেরা নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হলুদ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এটি গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক বা দলগতভাবে করার প্রয়োজন নেই। তবে, এটি যেন অন্য ধর্মের রীতিনীতিকে অনুসরণ করে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে হলুদ মাখা এবং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের প্রথা অনুসরণ করা এক জিনিস নয়।

(৪) অশ্লীল পোশাক পরিধান করা

এ অনুষ্ঠানে নারীদের পর্দা না করে অশ্লীল পোশাক পরিধান করে অংশ গ্রহণ করে, যা সম্পূর্ণ হারাম।  বিবাহ একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান হলেও ইসলামে এর পবিত্রতা বজায় রাখা উচিত। নারীদের জন্য পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক।

গ. উকিল পিতা বানানো

ইসলামে বিবাহের জন্য অবশ্যই একজন অভিভাবকের (ওয়ালি) অনুমতি প্রয়োজন। যিনি মেয়ের আইনগত অভিভাবক, তিনিই এই দায়িত্ব পালন করবেন। এই দায়িত্ব সাধারণত বাবা পালন করেন। পুর্বে বিস্তারিত আ্লোচন করা হয়েছে যে, বাবার অবর্তমানে দাদা, ভাই, চাচা, বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যিনি মাহরাম, তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে উকিল বানানো শরিয়ত সম্মত নয়, কারণ এটি বিবাহের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশে অনেক অঞ্চলে বৈধ অভিভাবকে বাদ দিয়ে পরপুরুষকে উকিল পিতা বানোন হয়। যা একটি হারাম কাজ। এ বানানো উকিল পিতা পর্বরতীত ঔ নারীর সাথে পিতার মত আচরন করে। পিতার সাথে কন্যার যেমন মাহরান ঐ বানানো উকিল পিতাও তার সাথে মাহরামের মত মেলামেসা করা, যা পরিস্কার হারাম।

৭৬৬. সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। সহিহ বুখারি : ৪৩২৬, ৬৭৬৬, সহিহ মুসলিম : ৬৩, আহমাদ : ১৫৫

 ঘ. বিয়ে উপলক্ষে রব বা কনের গোসল

ইসলামে পবিত্রতা একটি মৌলিক বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। তাই প্রতিটি মুসলিমকে তার ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতার বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। গোসল হলো শরীরকে পবিত্র করার একটি অন্যতম মাধ্যম। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী গোসল করার কিছু নিয়ম রয়েছে, যা মানা বাধ্যতামূলক। এই নিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে, গোসল করার সময় সতর (শরীরের লজ্জাস্থান) ঢেকে রাখা এবং নামাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ) ব্যক্তির সামনে সতর খোলা না রাখা।

ইসলামে বিয়ের আগে বা পরে বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিক গোসলের প্রথা নেই। এটি সম্পূর্ণই একটি সামাজিক কুপ্রথা, যা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী, একজন পুরুষকে তার মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন মা, বোন, খালা ইত্যাদি) নারী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়। একইভাবে, একজন নারীকেও তার মাহরাম পুরুষ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক গোসল, যা সাধারণত পরিবার বা সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের দ্বারা পরিচালিত হয়, এর পেছনে কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই। এটি মূলত লোকালোকি ও কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে চলে আসছে। ইসলামে এমন কোনো কুপ্রথাকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি, যা শরীয়তের মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করে। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত, সকল কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতি-নীতি থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা এবং শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে চলা।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক গোসল, যেখানে নামাহরাম ব্যক্তিরা বর-কনের গোসলে অংশ নেয়, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বর্জনীয়।

ঙ. নির্দিষ্ট দিন-তারিখ দেখে বিয়ে করা

চন্দ্র বর্ষের কোন মাসে বা কোন দিনে অথবা বর/কনের জন্ম তারিখে বা তাদের পূর্ব পুরুষের মৃত্যুর তারিখে বিবাহ শাদী হওয়া অথবা যে কোন শুভ সৎ কাজ করার জন্য ইসলামী শারী’য়াতে বা ইসলামী দিন তারিখের কোন বিধি নিষেধ নেয়। ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে শুভ বা অশুভ মনে করা হয় না। আল্লাহ তা’আলা সব দিনকেই সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাই, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট দিন-তারিখ দেখে বিবাহ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেকোনো ভালো দিনে বিবাহ করা যেতে পারে, যখন উভয় পক্ষ রাজি থাকে এবং ইসলামী বিধান অনুসারে সবকিছু প্রস্তুত থাকে।

চ. হিন্দুয়ানী প্রথা

ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে সকল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মুসলিম বিবাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলাম চায় তার অনুসারীরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখুক এবং অন্য কোনো ধর্মের রীতিনীতি বা কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকুক।

ইসলামে অন্য ধর্মের আচার-আচরণ বা প্রথা অনুসরণ করাকে ‘তাশাব্বুহ’ বলা হয় এবং এটি নিষিদ্ধ।

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

বাঁশের কুলায় চন্দন, মেহদি, হলুদ, কিছু ধান-দূর্বা ঘাস কিছু কলা, সিঁদুর ও মাটির চাটি নেওয়া, বরকে পিড়িতে বসিয়ে বা সিল-পাটাই দাড় করিয়ে দই-ভাত খাওয়ান ইত্যাদি হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা। এগুলো ব্যবহার করা সরাসরি সেই ধর্মের রীতিনীতিকে অনুসরণ করা। এই ধরনের কাজ মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইসলামে যেকোনো ধরনের কুসংস্কারের স্থান নেই। বাঁশের কুলা বা সিঁদুরের মতো জিনিসগুলো প্রায়শই কোনো ধরনের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা ইসলামে শিরকের (আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার করা) অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামে সকল প্রকার ক্ষমতা ও কল্যাণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই, কোনো বস্তুকে শুভ বা অশুভ মনে করা এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রথা অনুসরণ করা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের পরিপন্থী।

ছ. ওয়ালীমাতে পটকা-আতশবাজি ফুটান

বিবাহ উৎসবে অথবা অন্য যে কোন উৎসবে পটকা-আতশবাজি ফুটান হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ সকল কাজ অবৈধ ও অপচয়।

আল্লাহু-তা’য়ালা বলেনঃ

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

“নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বানী ইসরাঈল : ২৭

জ. নামাহরাম ব্যক্তি কনেকে কোলে তুলে বহন করা।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিবাহের পর কনেকে নামাহরাম ব্যক্তির কোলে তুলে বহন করা একটি অনৈসলামিক ও অত্যন্ত আপত্তিকর কাজ। এই ধরনের প্রথা বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা এবং ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।

নামাহরাম সম্পর্ক ও ইসলামী পর্দা

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাহরাম ব্যক্তি (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন বাবা, ভাই, চাচা) ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে নামাহরাম বলা হয়। বরের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা কনের মাহরাম নন, তাদের সামনে কনের নিজেকে উন্মুক্ত রাখা বা তাদের সাথে শারীরিক স্পর্শে আসা ইসলামী পর্দার লঙ্ঘন। কনেকে কোলে তুলে বহন করা এই বিধানকে সরাসরি লঙ্ঘন করে।

বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন, যা আল্লাহর নির্দেশিত পথে সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্যে পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক। জনসমক্ষে বা মুরুব্বীদের সামনে একজন নামাহরাম ব্যক্তির দ্বারা কনেকে কোলে তুলে বহন করা চরম বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতার পরিচায়ক। ইসলামে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো স্থান নেই। ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, স্বামী এবং স্ত্রী একে অপরের জন্য হালাল। কিন্তু অন্যদের সামনে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করা অনুমোদিত নয়। বরের কোলে স্ত্রীর যাতায়াত বা অন্য কোনো নামাহরাম পুরুষের দ্বারা তাকে বহন করা— এই ধরনের প্রথাগুলো ইসলামী বিধানের সীমালঙ্ঘন করে। এগুলি মুসলিম সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিপন্থী।

সুতরাং, এই ধরনের প্রথাগুলো থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা উচিত। বিবাহকে আনন্দপূর্ণ করার জন্য অনেক হালাল উপায় আছে, তবে সেগুলো যেন কখনও ইসলামী বিধানের বাইরে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

ঝ. বিবাহ অনুষ্ঠানে খেজুর ছিটানো, কুড়ানো বা কাড়াকাড়ি করা

এ বিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কোনো সহীহ হাদীস নেই। হাদীসগুলোর সনদ অত্যন্ত যয়ীফ এবং সনদে মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিসগণ সেগুলোকে জাল বলে গণ্য করেছেন। তাবারানী, আল-আউসাত ১/৪৪; ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ‘আত ২/১৭০-১৭২; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ২/২৩; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ২/১৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৯০; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/১৬৫-১৬৬; তাহির পাটনী, পৃ. ১২৬।

বিবাহের বিধান সম্পর্কিত কিছু হাদিস :

১. নাবালিকা বিবাহ দেওয়া জায়েয :

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৩৮৯৪, ৫১৩৩

২.  শিগার বিবাহ নিষিদ্ধ।

ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিগার বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন। রাবী বলেন, শিগার বিবাহ এই যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে প্রস্তাব দিলো, তুমি আমার সাথে তোমার মেয়েকে অথবা বোনকে বিবাহ দাও এবং তার পরিবর্তে আমি আমার মেয়েকে অথবা বোনকে তোমার সাথে বিবাহ দিবো, আর এতে কোন মাহর থাকে না। সহিহ বুখারী : ৫১১২, ৬৯২০, সহিহ মুসলিম : ১৪১৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৩, সুনানে তিরমিযী ১১২৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৩৪, ৩৩৩৭, ৩৩৩৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৭৪, আহমাদ : ৪৫১২, ৪৬৭৮, ৫২৬৭, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৪, দারেমী : ২১৮০, ইরওয়াহ : ১৮৯৫

তালাকের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তালাক (اَلْطَّلَاقُ) এর বিধান

তালাক (اَلْطَّلَاقُ) একটি আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ছেড়ে দেওয়া’ বা ‘বিচ্ছিন্ন করা’। ইসলাম ধর্মানুসারে, এটি হলো স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার একটি পদ্ধতি।

ইসলামে তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর ও অপছন্দনীয় কাজ। যদিও এটি শরীয়তসম্মত, তবে আল্লাহ তায়ালার কাছে এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র ও শক্তিশালী বন্ধন, যা যথাসম্ভব টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে তালাকের সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও সতর্কবাণী রয়েছে। কারণ, তালাক শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন করে না, বরং এটি পরিবার ও সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তালাককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাম্পত্য জীবন বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللهِ الطَّلَاقُ

আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণ্য বৈধ কাজ হচ্ছে তালাক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৮, ইরওয়া : ২০৪০

দাম্পত্য সুখের জন্য তালাকের বিধান : ইসলামের প্রজ্ঞা ও দর্শন

ইসলামে তালাক (বিবাহবিচ্ছেদ) কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রজ্ঞা ও দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা’আলা দাম্পত্য জীবনকে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু যখন সেই সম্পর্ক অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং আর কোনোভাবেই এর সংস্কার সম্ভব হয় না, তখন তালাকের বিধান কার্যকর হয়। এর উদ্দেশ্য কোনো সম্পর্ককে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং একটি অস্থিতিশীল ও যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা থেকে দম্পতিকে মুক্তি দেওয়া এবং তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ করে দেওয়া। তালাকের এই বিধানের পেছনে ইসলামে যে প্রজ্ঞা ও দর্শন কাজ করে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

ক. অসহনীয় সম্পর্ক থেকে মুক্তি:

তালাকের মূল উদ্দেশ্য হলো দম্পতিকে এমন একটি সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেওয়া, যা তাদের জন্য মানসিক ও শারীরিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্ক কেবল একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে জোর করে সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা উভয়কে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা, দুঃখ এবং মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম মানুষের ওপর কোনো অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেয় না। তাই, তালাকের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা এই ধরনের বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের উভয়কে নতুন করে, শান্তিপূর্ণ জীবন শুরু করার সুযোগ দিয়েছেন।

২. সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ:

 যখন কোনো দম্পতির মধ্যে লাগাতার ঝগড়া, বিবাদ ও ঘৃণা চলতে থাকে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব কেবল তাদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা তাদের সন্তান-সন্ততি, পরিবার এবং পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে। সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশে বড় হয়। তালাকের বিধান এই ধরনের বিশৃঙ্খলাকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রেখে উভয়কে নিজ নিজ পথে ভালো থাকার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে সমাজে নতুন করে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।

৩. নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার রক্ষা:

 ইসলামে তালাকের বিধান কেবল পুরুষের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নারীর অধিকারও নিশ্চিত করে। একজন পুরুষ যেমন নির্দিষ্ট কিছু কারণে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, তেমনি একজন নারীও যদি তার স্বামীর সঙ্গে থাকা অসম্ভব মনে করে, তাহলে তার অধিকার আছে তালাক চাওয়ার। এই অধিকারকে ‘খোলা’ বলা হয়। যদি কোনো নারী তালাক না পায়, তাহলে সে কাজি বা অভিভাবকের মাধ্যমে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। ইসলাম নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই, নারীরা যাতে কোনোভাবেই তাদের স্বামীর অধীনে নিপীড়িত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্যই এই অধিকার দেওয়া হয়েছে।

তালাক যাতে না হয় তার জন্য করণীয় কাজ :

তালাক ইসলামে একটি অপছন্দনীয় হালাল কাজ হলেও, এটি যাতে সংঘটিত না হয়, সেজন্য কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কৌশল রয়েছে। সূরা নিসায় কিছু সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধান নয়, বরং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করার পরেই কেবল এটি সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিবেচিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوْنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰهُ بَعْضَهُمْ عَلٰی بَعْضٍ وَّ بِمَاۤ اَنْفَقُوْا مِنْ اَمْوَالِهِمْ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلْغَیْبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰهُ ؕ وَ الّٰتِیْ تَخَافُوْنَ نُشُوْزَهُنَّ فَعِظُوْهُنَّ وَ اهْجُرُوْهُنَّ فِی الْمَضَاجِعِ وَ اضْرِبُوْهُنَّ ۚ فَاِنْ اَطَعْنَکُمْ فَلَا تَبْغُوْا عَلَیْهِنَّ سَبِیْلًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیًّا كَبِیْرًا ﴿۳۴﴾  وَ اِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَیْنِهِمَا فَابْعَثُوْا حَكَمًا مِّنْ اَهْلِہٖ وَ حَكَمًا مِّنْ اَهْلِهَا ۚ اِنْ یُّرِیْدَاۤ  اِصْلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰهُ بَیْنَهُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیْمًا خَبِیْرًا ﴿۳۵﴾

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। সুরা নিসা : ৩৪-৩৫

সূরা নিসার এই দুটি আয়াত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি, স্বামীর দায়িত্ব এবং তালাকের আগে পারস্পরিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। এখানে আল্লাহ তাআলা পুরুষদেরকে নারীর তত্ত্বাবধায়ক বা অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর কারণ হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে:

১. আল্লাহ তাআলা পুরুষকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে কিছু ক্ষেত্রে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, যাতে তারা পরিবারের নেতৃত্ব দিতে পারে।

২. পুরুষ তার সম্পদ দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ বহন করে।

এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, সৎ ও নেককার স্ত্রীরা স্বামীর অনুগত হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করে।

তালাকের আগে করণীয় পদক্ষেপ:

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যখন মতবিরোধ বা অবাধ্যতা দেখা দেয়, তখন ইসলাম তালাকের মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কয়েকটি ধাপে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেয়।

ক. প্রথম ধাপ: সদুপদেশ দেওয়া:

স্বামী যদি স্ত্রীর অবাধ্যতা বা খারাপ আচরণ লক্ষ্য করে, তাহলে প্রথমে তাকে কোমল ভাষায়, ভালোবাসা ও ধৈর্যের সাথে বোঝানো উচিত।

খ. দ্বিতীয় ধাপ: বিছানা আলাদা করা:

যদি প্রথম ধাপে সমস্যার সমাধান না হয়, তবে দ্বিতীয় ধাপে স্বামী স্ত্রীর সাথে একই বিছানায় শয়ন ত্যাগ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে মানসিকভাবে সতর্ক করা এবং তার ভুল উপলব্ধি করতে সাহায্য করা।

গ. তৃতীয় ধাপ: মৃদু প্রহার:

যদি উপরের দুটি পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তবে আয়াতে মৃদু প্রহারের কথা বলা হয়েছে। এই প্রহারের ব্যাপারে আলেমগণ কঠোর শর্তারোপ করেছেন, যেমন- মুখে আঘাত না করা, কোনো চিহ্ন না রাখা, আঘাত যেন কষ্টদায়ক না হয় এবং এর উদ্দেশ্য যেন শুধুই সতর্ক করা হয়। এটি কোনোভাবেই নির্যাতন বা শারীরিক আঘাতের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী বা মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ। যদি এই প্রহার নির্যাতন বা কষ্টদায়ক হয়, তবে তা হারাম।

এই তিনটি ধাপের কোনো একটিতে যদি স্ত্রী তার ভুল বুঝতে পেরে স্বামীর আনুগত্য করে, তবে স্বামীর উচিত তার বিরুদ্ধে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া।

ঘ. চতুর্থ ধাপ : তালাকের পরিবর্তে মীমাংসার চেষ্টা:

যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা দেখা দেয়, অর্থাৎ উপরের সব ধাপ ব্যর্থ হয়, তখন আয়াতটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়। এই ধাপে স্বামী-স্ত্রীর উভয় পক্ষ থেকে একজন করে বিচারক বা সালিস নিযুক্ত করতে বলা হয়েছে। এই বিচারকদের দায়িত্ব হলো, নিরপেক্ষভাবে তাদের সমস্যা পর্যালোচনা করা এবং উভয়কে পুনরায় একত্র করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। যদি এই বিচারকগণ আন্তরিকভাবে মীমাংসা চান, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেবেন।

এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক কোনো সহজ বা হালকা বিষয় নয়। এটি এমন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ যা গ্রহণ করার আগে অনেকগুলো স্তর পার করতে হয় এবং সর্বাত্মকভাবে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করতে হয়। এই নিয়মগুলো অনুসরণ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে তালাক এড়ানো সম্ভব হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক টিকে থাকে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে তালাত প্রদানে হুকুম

যখন কো অবস্থায় দুজনে মাঝে মিলেমিসে থাকা সম্ভব হয় না। তখন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাকের মত অপছন্দণীয় কাজটি বেছে নিতে হয়। তালাকের বিধান মূলত একটি চূড়ান্ত সমাধান, যা কেবল তখনই প্রয়োগ করা হয় যখন আপস-মীমাংসার আর কোনো উপায় থাকে না। আল্লাহ তা’আলা তালাকের অনুমতি দিয়েছেন যাতে দম্পতিরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ এবং ঘৃণা নিয়ে জীবন ধারণ না করে বরং শান্তি ও স্বস্তির সাথে তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারে। এ কারনে মানুষের ভালোর জন্য আল্লাহ এ বিধান রেখেছেন। নিচে সরাসরি কুরআনের আলোকে তালাকের কিছু বিধান উল্লখ কররাম।

১. স্বামী তালাক দিতে পার আর স্ত্রী নিজেকে মুক্ত করতে পারে

আল্লাহ তা’আলা কু্রআনে তালাকের বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুইবার তালাক দিতে পারে। এই দুই তালাকের পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) ফিরিয়ে নিতে পারে, অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর সুন্দরভাবে (যেকোনো ধরনের ক্ষতি বা হয়রানি ছাড়া) ছেড়ে দিতে পারে। তালাকের বিনিময়ে স্ত্রীকে দেওয়া মোহর বা অন্য কোনো উপহার ফিরিয়ে নেওয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয়। তবে যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ই আশঙ্কা করে যে তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা বা বিধান মেনে চলতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী স্বামীকে কিছু সম্পদ দিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে, যাকে ‘খোলা’ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

২. একবার তালাক দিলে আর ফিরে আসা যায় না

অত:পর আল্লাহ আরও বিধান বর্ণনা করেন। কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে তিনবার তালাক দেয়, তবে সে স্ত্রী তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করে এবং সেই স্বামীর সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়। এরপর সেই দ্বিতীয় স্বামী যদি কোনো কারণে তাকে তালাক দেয় বা মারা যায়, তবেই প্রথম স্বামীর জন্য তাকে আবার বিবাহ করা বৈধ হবে। যদি তারা উভয়ে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তবে তাদের পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে কোনো পাপ হবে না। এই বিধানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি সীমারেখা। আল্লাহ এই বিধানটি তাদের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যারা জ্ঞান রাখে এবং তাঁর নির্দেশনা বুঝতে চায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

৩. ইদ্দত গণনা করে তালাক দেওয়া

আল্লাহ তা’আলা তালাকের সঠিক পদ্ধতি ও এর সাথে সম্পর্কিত বিধানাবলী বর্ণনা করেছেন। যখন কোনো মুসলমান তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, তখন তাকে অবশ্যই ‘ইদ্দত’-এর প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিতে হবে। ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়কাল, যা তালাকের পর স্ত্রীকে অতিবাহিত করতে হয়। তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম সময় হলো যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র থাকে এবং তার সাথে সহবাস করা হয়নি। এই সময় তালাক দিলে ইদ্দতের হিসাব রাখা সহজ হয়। আল্লাহকে ভয় করে এই বিধান মেনে চলতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নাবী! তোমরা যদি তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর তাহলে তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ইদ্দাতের হিসাব রেখ এবং তোমাদের রাব্ব আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিস্কার করনা এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়; এগুলি আল্লাহর বিধান। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। তুমি জাননা, হয়তো আল্লাহ এরপর কোন উপায় করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

৪. ইদ্দত ও তালাকের কিছু বিধান

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ  ذٰلِکُمۡ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۬ؕ  وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا ۙ

অতঃপর যখন তারা তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছবে, তখন তোমরা তাদের ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় রেখে দেবে অথবা ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় তাদের পরিত্যাগ করবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনে এটি দ্বারা তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। সুরা তালাক : ০২

আল্লাহ তাআলা তালাক পরবর্তী সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। যখন একজন স্ত্রী ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়) শেষ করার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে:

১. ন্যায়ানুগ পন্থায় রেখে দেওয়া:

স্বামী যদি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই ন্যায় ও সদ্ব্যবহারের সাথে ফিরিয়ে নিতে হবে। এটি কোনো প্রকার ক্ষতি বা হয়রানির উদ্দেশ্যে করা যাবে না।

২. ন্যায়ানুগ পন্থায় ছেড়ে দেওয়া:

যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই সুন্দর ও যথাযথভাবে ছেড়ে দিতে হবে। এর মানে হলো, স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার (যেমন: মোহর বা ভরণপোষণ) থেকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং তার সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না।

এই দুটি কাজের যেকোনো একটি করার সময়, আল্লাহ তাআলা দুইজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমকে সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই সাক্ষ্য কেবল আইনগত বৈধতার জন্য নয়, বরং আল্লাহর জন্য সঠিক ও সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, এই বিধানগুলো তাদের জন্য উপদেশ, যারা আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে।

আয়াতের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে: “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন।” এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি তালাকের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান মেনে চলে, আল্লাহ তাকে তার সমস্যার সমাধান ও উত্তরণের পথ সহজ করে দেন। এটি একদিকে যেমন আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের (ভরসার) শিক্ষা দেয়, তেমনি এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

তালাক প্রদানের ক্ষমতা কার?

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তালাকের অধিকার এবং নিয়মকানুন কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তালাকের চূড়ান্ত ক্ষমতা মূলত স্বামীর হাতেই থাকে। সে ইচ্ছে করলে যে কোনো সময় তালাক দিতে পারে, তবে নারীদেরও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে তাকাল প্রদানে অধিকার দেওয়া হয়েছে।  

১. তালাক প্রদানের ক্ষমতা পুরুষ

পুরুষের তালাক প্রদানের অধিকারের বিষয়টি কুরআনে একাধিক স্থানে উল্লিখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ

তালাক (ফেরতযোগ্য) দু’বার। তারপর (ইচ্ছা করলে) সুন্দরভাবে স্ত্রীকে রেখে দেওয়া অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে। সূরা বাকারা : ২২৯

কুরআনের এ আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “তালাক দুইবার। অতঃপর হয় স্ত্রীকে বিধি মোতাবেক রেখে দেবে অথবা সদ্ব্যবহারসহ তাকে বিদায় দেবে।” এই আয়াতটি সরাসরি পুরুষকে সম্বোধন করছে, কারণ তালাক প্রদানের ক্ষমতা তার হাতেই ন্যস্ত। তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দতকালীন সময়ে ফিরিয়ে নেওয়ার বা চূড়ান্তভাবে ছেড়ে দেওয়ার উভয় সিদ্ধান্তই পুরুষ গ্রহণ করে, যা প্রমাণ করে যে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা পুরুষেরই। এই বিধান ইসলামে পুরুষের দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যকে তুলে ধরে।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ سَرِّحُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ ۪  وَلَا تُمۡسِکُوۡہُنَّ ضِرَارًا لِّتَعۡتَدُوۡا ۚ  وَمَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ

আর যখন তোমরা (স্বামীরা) স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছে যাবে তখন হয়তো বিধি মোতাবেক তাদেরকে রেখে দেবে অথবা বিধি মোতাবেক তাদেরকে ছেড়ে দেবে। তবে তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। সূরা বাকারা : ২৩১

এ আয়াতে সরাসরি পুরুষদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে তালাক প্রদানের ক্ষমতা তাদেরই। আয়াতের পরের অংশে তালাকের পর স্বামীর দুটি বিকল্পের কথা বলা হয়েছে। “বিধি মোতাবেক তাদেরকে রেখে দেবে”: স্বামী চাইলে ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়কাল) শেষ হওয়ার আগেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এটি দ্বারা বোঝা যায়, তালাকের পর স্ত্রীকে পুনর্বার গ্রহণ করার সিদ্ধান্তটি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। “বিধি মোতাবেক তাদেরকে ছেড়ে দেবে”: যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নিতে চান, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তাদের বিবাহ সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্তও স্বামীরই।

কুরআন পুরুষের তালাক প্রদানে ক্ষমতা দিয়ে আরও বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَاِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ

আর যদি তারা (স্বামীরা) তালাকের দৃঢ় ইচ্ছা করে নেয় তবে নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সূরা বাকারা : ২২৭

২. নারীর তালাক প্রদানের অধিকার

যদিও তালাকের প্রধান ক্ষমতা পুরুষের, ইসলামে নারীর জন্যও সম্মানজনকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ লাভ করার পথ খোলা আছে। নারীর তালাকের অধিকার মূলত তিন ধরনের:

ক. স্ত্রী অর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে তালাক নিবে

যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর সাথে থাকতে না চায় এবং তাদের মধ্যে বনিবনা না হয়, তবে সে স্বামীকে অর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে তালাক চাইতে পারে যে তালাকে খুলা তালাক বলা হয়। খুলা হলো স্বামীর কাছ থেকে কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে স্ত্রী কর্তৃক বিবাহবিচ্ছেদ লাভ করা। এই ক্ষতিপূরণ মোহরানার অংশ হতে পারে বা অন্য কোনো সম্পত্তি হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৬. ২০৫৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬৩, ইরওয়াহ : ২০৩৬

আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহল কন্যা হাবীবা (রাঃ) সাবিত বিন কায়স বিন সামমাস (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন। সাবিত (রাঃ) ছিলেন কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট। হাবিবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ্‌র রসুল! আল্লাহ্‌র শপথ! আল্লাহর ভয় না থাকলে সাবিত যখন আমার নিকট আসে তখন অবশ্যই আমি তার মুখে থুথু নিক্ষেপ করতাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফেরত দিতে রাজি আছো? তিনি বলেন, হাঁ। রাবী বলেন, তিনি তার বাগানটি তাকে ফেরত দিলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনকে পৃথক করে দিলেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৭, সহিহ আবু দাউদ : ১৯২৯, ইরওয়াহ : ২০৩৭।

খ. তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করা।

তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করাকে তাফভীজে তালাক । বিয়ের সময় বা বিয়ের পরে স্বামী যদি স্ত্রীকে এই অধিকার দেয় যে, সে যখন ইচ্ছা নিজেকে তালাক দিতে পারবে, তবে স্ত্রী এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। এই অধিকারকে ‘তালাকে তাফভীয’ বলা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ  قُلْ  لِّاَزْوَاجِكَ اِنْ  کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ  الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا وَ زِیْنَتَهَا فَتَعَالَیْنَ اُمَتِّعْکُنَّ وَ اُسَرِّحْکُنَّ سَرَاحًا جَمِیْلًا ﴿۲۸﴾ وَ اِنْ کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہٗ وَ الدَّارَ الْاٰخِرَۃَ  فَاِنَّ اللّٰهَ  اَعَدَّ لِلْمُحْسِنٰتِ مِنْکُنَّ  اَجْرًا عَظِیْمًا ﴿۲۹﴾

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’।  আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’। সুরা আহযাব : ২৮-২৯

এই আয়াতে রাসূল (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁর স্ত্রীদেরকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী বিচ্ছেদের সুযোগ দেওয়ার জন্য। এটি প্রমাণ করে যে, স্ত্রী যদি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্বামী তাতে সম্মত হয়, তবে তা শরীয়তসম্মত। ফিকহবিদগণ এই আয়াতকে তাফউইয-এর একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দুনিয়ার সুখ শান্তি বা পরকালীন সুখ শান্তি বেছে নেয়ার) ইখতিয়ার দিলে আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই গ্রহণ করলাম। আর এতে আমাদের প্রতি কিছুই অর্থাৎ ত্বলাক (তালাক)) সাব্যস্ত হয়নি। সহিহ বুখারি : ৫২৬২, ৫২৬৩, সহহি মুসলিম : ১৪৭৭

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি নাযিল হলো, যদি তোমার আল্লাহ্‌ ও তার রসূলের সন্তুষ্টি চাও। সূরা আহযাব : ২৯। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট প্রবেশ করে বলেন, হে আয়িশা! আমি তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করবো। তুমি তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ না করে সে সম্পর্কে তাড়াহুড়া করে কিছু বলবে না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্‌র শপথ! তিনি জানতেন যে, নিশ্চয় আমার পিতা-মাতা কখনো তাঁর থেকে আমার বিচ্ছেদের পক্ষে মত দিবেন না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এরপর তিনি আমাকে এ আয়াতটি পড়ে শুনান-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَزِیۡنَتَہَا فَتَعَالَیۡنَ اُمَتِّعۡکُنَّ وَاُسَرِّحۡکُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’। সূরা আহযাব : ২৮

তখন আমি বললাম, এ সম্পর্কে আমার পিতা-মাতার সাথে আমি আর কী পরামর্শ করবো! আমি আল্লাহ্‌ ও তার রসূলকেই গ্রহণ করলাম। সহিহ বুখারি :  ৪৭৮৬,৫২৬২, ৫২৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৭৫, ১৪৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫২,  সুনানে তিরমিযী : ১১৭৯, ৩২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩২০১, ৩২০২, ৩২০৩, ৩৪৩৯, ৩৪৪১, ৩৪৪২, ৩৪৪৩, ৩৪৪৪, ৩৪৪৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২২০৩

ফিকহ কিতাবের দলিল

ইসলামী ফিকহের প্রায় সব মাযহাবের (হানাফি, শাফেঈ, মালিকি, হাম্বলি) কিতাবেই তাফউইযের বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এবং এর বৈধতা সম্পর্কে সবাই একমত।

বাদাইউস সানাই : হানাফি ফিকহের এই প্রসিদ্ধ গ্রন্থে বলা হয়েছে, স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয় এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। আলাউদ্দিন আল-কাসানী, বাদাইউস সানাই তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১২৩

আল-মুগনি : হাম্বলি ফিকহের এই গ্রন্থেও উল্লেখ আছে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে তালাক দিতে পারে। ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃ.-৩২০

এই সকল দলিল প্রমাণ করে যে, ‘তালাক-ই-তাফউইয’ শরীয়তসম্মত এবং এটি একটি বৈধ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তালাকের অধিকার পায়।

গ. পারস্পরিক সম্মতিতে তালাক

স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে সংঘটিত যে তালাক সংঘটিত হয় তাকে তালাকে মোবারত বলা হয়। এখানে উভয় পক্ষই বিবাহ সম্পর্ক থেকে মুক্তি চায়।

এই ধরনের তালাক সংঘটিত হয় যখন স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই একে অপরের প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করেন। উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। এই ক্ষেত্রে স্ত্রী কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেন না, বরং উভয়ের সম্মতিতে তালাক হয়।

এটি মূলত খোলা তালাকের মতোই, তবে খোলা তালাকের মতো এখানে স্ত্রী একাই ক্ষতিপূরণ দেন না, বরং উভয়ের মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। এর ভিত্তিও হলো খোলা তালাকের দলিল। যেমন সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২৯, যেখানে বলা হয়েছে, “…যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাদের উভয়ের জন্য তাতে কোনো দোষ নেই যে, স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীকে মুক্ত করে নেবে।” এই আয়াতটি পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের একটি পথ উন্মুক্ত করে, যা মোবারতকেও সমর্থন করে।

৩. বিচারকের মাধ্যমে তালাক:

বিচারকের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখ (فسخ) এর বিধান ইসলামে স্বীকৃত। যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একত্রে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং স্বামী তালাক দিতে বা খোলা করতে রাজি না হয়, তখন স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারে। ইসলামী শরিয়াহ আদালত বা বিচারক উভয় পক্ষের অবস্থা বিবেচনা করে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এই ধরনের বিচ্ছেদকে ফিকহের পরিভাষায় ‘ফাসখ’ বলা হয়।

পবিত্র কুরআনের এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিচারকের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَاِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَیۡنِہِمَا فَابۡعَثُوۡا حَکَمًا مِّنۡ اَہۡلِہٖ وَحَکَمًا مِّنۡ اَہۡلِہَا ۚ اِنۡ یُّرِیۡدَاۤ اِصۡلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰہُ بَیۡنَہُمَا ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا خَبِیۡرًا

আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। সুরা নিসা : ৩৫

এই আয়াতে যদিও সরাসরি ফাসখের কথা বলা হয়নি, তবে এটি পারিবারিক বিরোধ নিরসনের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব প্রমাণ করে। যদি সালিস বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান না হয়, তবে বিচারকের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটানোই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭

এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যদি স্ত্রী স্বামীর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং একত্রে থাকা সম্ভব না হয়, তবে বিচারক (এক্ষেত্রে রাসূল সা.) এর হস্তক্ষেপে বিবাহ বিচ্ছেদ বৈধ।

প্রায় সব মাযহাবের ফিকহবিদগণ বিচারকের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখের বৈধতা সম্পর্কে একমত।

বাদাই’উস সানাই : হানাফি ফিকহের এই গ্রন্থেও বলা হয়েছে যে, স্বামী যদি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকে এবং স্ত্রীর কোনো ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা না করে, তাহলে বিচারকের নির্দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর করা যায়। আলাউদ্দিন আল-কাসানী, বাদাই’উস সানাই, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৩৮

আল-মুগনি : হাম্বলি ফিকহের এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, যদি স্বামীর কোনো গুরুতর ত্রুটি থাকে (যেমন: দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকা, ভরণ-পোষণ দিতে ব্যর্থ হওয়া, গুরুতর শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি), যার ফলে স্ত্রীর জন্য জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে বিচারক তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃ.-৬৪৫

এই দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন তিক্ত হয়ে যায় যে একত্রে থাকা অসম্ভব, তবে বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ একটি বৈধ এবং ইসলামসম্মত সমাধান।