Category Archives: বিবাহ ও তালাক

তালাকের প্রকারভেদ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র ও দৃঢ় বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে মানব জীবনে সব সম্পর্ক সবসময় একইভাবে স্থায়ী হয় না। কখনো কখনো দাম্পত্য জীবনে এমন জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, একসাথে বসবাস করা দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ইসলাম সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে তালাকের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তালাক এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হলেও প্রয়োজনে বৈধ। তাই ইসলাম তালাককে সীমাহীন স্বাধীনতা হিসেবে দেয়নি; বরং এর প্রকৃতি, কার্যকারিতা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে স্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করেছে।

প্রকৃতি ও কার্যকারিতার দিক থেকে তালাককে মূলত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে—তালাক-এ-রজয়ি, তালাক-এ-বায়িন এবং তালাক-এ-খুলা। এসব শ্রেণীবিভাগ নির্ধারণ করে দেয় তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কীভাবে থাকবে এবং পুনরায় সংসার করার সুযোগ আছে কি না। অন্যদিকে, তালাক প্রদানের পদ্ধতিগত দিক থেকেও ইসলামে নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। কারণ, তালাক যেন তাৎক্ষণিক রাগ বা আবেগের বশে না হয়, বরং ভেবে-চিন্তে সঠিক নিয়মে সম্পন্ন হয়, সেটিই শরীয়তের উদ্দেশ্য। এ কারণে তালাকের চারটি প্রধান পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে—আহসান, হাসান, বিদআত এবং অশুদ্ধ পদ্ধতিতে তালাক।

এই শ্রেণীবিভাগ ও পদ্ধতিগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলাম তালাককে সহজ-সরলভাবে উৎসাহিত করেনি; বরং দাম্পত্য জীবনের মর্যাদা ও স্থিতি রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কেবল যখন সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখনই সঠিক নিয়মে তালাক দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই তালাকের বিভিন্ন প্রকার ও পদ্ধতি বোঝা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিচে তালারে ভিবিন্ন প্রকারে শ্রেণীতে ভাগ করে প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো:

প্রকৃতি এবং কার্যকারিতার ভিত্তিতে তালাকের শ্রেণীবিভাগ

ইসলামে তালাকের প্রকৃতি ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই শ্রেণীবিভাগ মূলত তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কতটুকু স্থায়ী হয় এবং সেই সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার সুযোগ আছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাক প্রধানত তিন প্রকার। এই শ্রেণীবিভাগগুলো ইসলামের মূলনীতি এবং বিবাহিত জীবনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে এই তিন প্রকার তালাক সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. তালাক-এ-রজয়ি

২. তালাক-এ-বায়িন

৩. তালাক-এ-খুলা

১. তালাক-এ-রজয়ি

‘রজয়ি’ (رجعي) শব্দের অর্থ হলো ‘প্রত্যাবর্তনযোগ্য’ বা ‘ফিরিয়ে নেওয়ার যোগ্য’। এটি আরবি ‘রুজু’ (رجوع) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ফিরে আসা’ বা ‘প্রত্যাবর্তন করা’।

তালাক-এ-রজয়ি হলো ইসলামের সবচেয়ে উদার ও মানবিক তালাক পদ্ধতি। যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক দেন, তখন সেই তালাকটি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না, বরং ইদ্দতকাল (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) পর্যন্ত স্থগিত থাকে। এই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয় না। তারা একই বাড়িতে থাকতে পারে এবং স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকেন। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী যেকোনো মুহূর্তে স্ত্রীকে মৌখিকভাবে বা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তালাকটি বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে। এই সুযোগ দেওয়ার কারণ হলো, স্বামী-স্ত্রীকে তাদের ভুল সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একটি সুযোগ দেওয়া।

এটি সুন্নাহসম্মত তালাকের প্রথম ধাপ। ইদ্দতকালে স্বামী স্ত্রীকে মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। ফিরিয়ে নিলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে যদি স্বামী ফিরিয়ে না নেন, তাহলে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাকে বাইনে সগির-এ পরিণত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

২. তালাকে বায়িন (তালাক-এ-বায়িন)

‘বায়িন’ (بائن) শব্দের অর্থ হলো ‘চূড়ান্ত’, ‘স্পষ্ট’ বা ‘সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন’। এটি আরবি ‘বানা’ (بان) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিচ্ছিন্ন হওয়া’ বা ‘আলাদা হওয়া’।

তালাক-এ-বায়িন এমন এক ধরনের তালাক যা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে যায়। এই তালাক স্বামীর ‘রুজু’ বা স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়। তালাকে বায়িন-এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা ইদ্দতকালীন সময়েও একসাথে থাকতে পারে না। যদি তারা ভবিষ্যতে আবার একসাথে জীবনযাপন করতে চায়, তবে তা শুধুমাত্র নতুন করে কাবিন ও মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহের মাধ্যমেই সম্ভব। এই তালাক সাধারণত তখন ঘটে যখন স্বামী একবারে তিন তালাক দেন (তালাক-এ-বায়েন কুবরা) অথবা যখন ইদ্দতের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন না (তালাক-এ-বায়েন সুগরা), বা খোলা তালাকের মতো পরিস্থিতিতে।

তালাকে বায়িন সাধারণত দুটি কারণে হয়ে থাকে:

১. যখন স্বামী ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেয় এবং ইদ্দত শেষ হয়ে যায়।

২. যখন এক বা একাধিক তালাক প্রদান করা হয়, যা সরাসরি বায়িন তালাক হিসেবে গণ্য হয় (যেমন: খোলা তালাক, লি’আনের কারণে বিচ্ছেদ)।

তালাকে বায়িনের বিধান :

তালাকে বায়িনের বিধানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. তালাকে বায়িন-এ সগির (ছোট তালাক)

এটি এমন তালাক, যা এক বা দুটি তালাকের পর সংঘটিত হয় এবং ইদ্দত শেষ হয়ে যায়। অথবা, এমন তালাক যা সরাসরি বায়িন হিসেবে গণ্য হয় (খোলা বা মুবারাতের তালাক)। এই ধরনের তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় সংসার করতে চায়, তবে তাদেরকে নতুন করে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন মোহর নির্ধারণ এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

এই ধরনের তালাক সংঘটিত হলে তা বাইনে সগীর হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী চাইলে আবার বিবাহ করতে পারবে।

২. তালাকে বায়িন-এ কবীর (বড় তালাক)

এটি তখনই ঘটে যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়, অথবা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিন তালাক সম্পন্ন করে। এই ধরনের তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। তাদের পুনরায় বিবাহ কেবল তখনই সম্ভব, যখন স্ত্রী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করবে এবং সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করার পর সে মারা যাবে অথবা তাকে তালাক দেবে। এরপর ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামী তাকে আবার বিবাহ করতে পারবে। এই প্রক্রিয়াকে হালালা বলা হয়, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও বিতর্কিত একটি প্রথা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

এই আয়াতটি বাইনে কবীরের বিধানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। যেখানে একবার তিন তালাক হলে আর সরাসরি ফিরিয়ে আনা যাবে না।

৩. খোলা তালাক (তালাক-এ-খুলা)

খোলা তালাক বা خلع হলো এমন এক ধরনের বিবাহবিচ্ছেদ, যা স্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত হয় এবং স্বামী তা গ্রহণ করে। এই ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে কিছু আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা (যেমন: মোহরানা ফিরিয়ে দেওয়া) প্রদান করে তার থেকে তালাক গ্রহণ করে। এই তালাক মূলত স্বামীর স্বেচ্ছাচারীতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য স্ত্রীর একটি অধিকার। খোলা তালাক কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন-এর অন্তর্ভুক্ত।

সংজ্ঞা: যে তালাক স্ত্রী তার স্বামীর কাছে মোহরানা বা অন্য কোনো প্রতিদানের বিনিময়ে চেয়ে নেয়, তাকে খোলা তালাক বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭, মিশকাত : ৩২৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬৩, ইরওয়া : ২০৩৬

নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’সফিয়াহ বিনতু আবূ ’উবায়দ’-এর ক্রীতদাসী হতে বর্ণনা করেন, সফিয়া (রাঃ) তাঁর স্বামী (আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রা.) হতে নিজের সমস্ত সহায়-সম্পত্তির বিনিময়ে খুলা’ (তালাক) চান। অথচ আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) এতে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি। মিশকাত : ৩২৯১, মুয়াত্তা মালিক : ১২২

বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চাওয়া হারাম

সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণী বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চায়, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। মিশকাত : ৩২৭৯, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২২৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৫৫, দারিমী : ১৩১৬, আহমাদ : ২২৪৪০, ইরওয়া : ২০৩৫, সহীহ আল জামি : ২৭০৬, সহীহ আত্ তারগীব : ২০১৮

সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ খোলা তালাক দাবিকারিণী নারীরা মুনাফিক। সুনানে তিরমিজি : ১১৮৬, সহীহাহ : ৬৩৩, মিশকাত : ৩২৯০

মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে তালাক চার প্রকারঃ-

মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে তালাক চার প্রকার হতে পারে। নিচে প্রত্যেক প্রকারের বিস্তারিত আলোচনা ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত দলিল দেওয়া হলো।

১. হারাম তালাক

ইসলামে তালাক মূলত একটি অপছন্দনীয় কাজ। কিছু বিশেষ অবস্থায় তালাক দেওয়াকে হারাম হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এই ধরনের তালাক ইসলামের নীতির বিরোধী।

১. ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া।

২. যে পবিত্র অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, সেই অবস্থায় তালাক দেওয়া।

৩. একবারে তিন তালাক দেওয়া। এই পদ্ধতিগুলো শরিয়তের স্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

কুরআনের দলিল: সূরা তালাক, আয়াত ১-এ আল্লাহ বলেন, “তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও।” এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঋতুকালীন অবস্থায় বা সহবাসের পর তালাক দেওয়া এই নির্দেশনার পরিপন্থী।

হাদিসের দলিল: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিসটি এর প্রধান দলিল। তিনি তার স্ত্রীকে ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। নবী (সা.) এই কথা শুনে অসন্তুষ্ট হন এবং তাকে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া হারাম।

২. মাকরুহ তালাক

মাকরুহ তালাক হলো সেই তালাক, যা শরীয়তসম্মত হলেও কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া বা তুচ্ছ কারণে দেওয়া হয়। এই ধরনের তালাক দেওয়া উচিত নয়, যদিও এটি কার্যকর হয়। এটি হারাম নয়, তবে অপছন্দনীয়।

ক. কোনো গুরুতর কারণ ছাড়া, যেমন: তুচ্ছ বিষয়ে মতবিরোধ বা সামান্য মনোমালিন্যের কারণে তালাক দেওয়া।

খ. যখন স্ত্রীর মধ্যে কোনো অনৈতিক বা ধর্মীয় দুর্বলতা নেই, তবুও স্বামী তাকে তালাক দিতে চায়।

হাদিসের দলিল: নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে হালাল কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ হলো তালাক।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, কোনো কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, তাই এটি মাকরুহ হিসেবে বিবেচিত হয়।

৩. মুস্তাহাব তালাক

মুস্তাহাব তালাক হলো সেই তালাক, যা কোনো বিশেষ কারণে দেওয়া হলে স্বামী একটি ভালো কাজের সওয়াব পেতে পারেন।

গ. যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলতে পারে না এবং একত্রে থাকলে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

খ. স্ত্রী যদি কোনো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয় এবং এই বিষয়ে স্বামী তাকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হন।

কুরআনের দলিল: সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২৯-এ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “…যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাদের উভয়ের জন্য তাতে কোনো দোষ নেই যে, স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীকে মুক্ত করে নেবে।” এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে এবং আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করার আশঙ্কা থাকলে তালাক দেওয়া মুস্তাহাব হতে পারে।

৪. ওয়াজিব তালাক

ওয়াজিব তালাক হলো সেই তালাক, যা দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক বা অবশ্যকরণীয় হয়ে যায়।

যদি স্বামী তার স্ত্রীকে ‘ঈলা’ করে অর্থাৎ চার মাসের জন্য তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার শপথ করে। যদি চার মাসের মধ্যে সে এই শপথ থেকে ফিরে না আসে, তবে আদালতের নির্দেশে তালাক দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যদি আদালতের নির্দেশে কোনো কারণে তালাক দেওয়ার আদেশ হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা বাক্বারাহ  :  ২২৬

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, যদি স্বামী চার মাসের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে আদালতের নির্দেশে তালাক দেওয়া হয়, যা ওয়াজিব।

পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাকের প্রকারভেদ

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন হলেও, কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে, চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে তালাকের অনুমতি রয়েছে। তবে, এই তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলামে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। এই পদ্ধতিগুলো তালাকের সিদ্ধান্তকে তাড়াহুড়ো থেকে রক্ষা করে, সম্পর্কের তিক্ততা কমিয়ে আনে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়কে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ দেয়। এই নিয়মগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক একটি অপছন্দনীয় কাজ, যা কেবল তখনই প্রয়োগ করা উচিত যখন সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাক চার প্রকার। যথা-

১. তালাকে আহসান (আহসান বা সর্বোত্তম তালাক)

২. তালাকে হাসান (হাসান বা উত্তম তালাক)

৩. তালাকে বিদআত (বিদআতি বা নব আবিস্কৃত তালাক)

৪. অশুদ্ধ পদ্ধতিতে তালাক

তালাকে আহসান (সর্বোত্তম তালাক)

তালাকে আহসান হলো তালাকের সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তালাক দিলে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সর্বোচ্চ সুযোগ থাকে।

তালাকে আহসানের পদ্ধতি :

সুন্নাতী তালাক হলো তালাক প্রদানের এমন একটি পদ্ধতি যা ইসলামের বিধান অনুযায়ী উত্তম এবং অনুমোদিত। এই পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে এসেছে। প্রথমে কুরআনের তিনটি আয়াত লক্ষ করি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

আল্লাহ তা’আলার উপরোক্ত তিনটি আয়াতের আলোকে তালাকের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। ইসলামে তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপছন্দনীয় বিষয়, যা শুধুমাত্র চরম প্রয়োজনের মুহূর্তে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হয়। কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী তালাকের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তালাকের পর সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগ থাকে এবং উভয় পক্ষের অধিকার নিশ্চিত হয়।

প্রথম ধাপ : এক তালাক প্রদান (তালাক-এ-আহসান)

প্রথমত, তালাক দিতে হবে ইদ্দতের সময়কাল বিবেচনায় রেখে। সূরা তালাকের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে।” এর অর্থ হলো, স্বামী তার স্ত্রীকে এমন অবস্থায় তালাক দেবেন যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়েছেন এবং ঐ পবিত্র অবস্থায় তাদের মধ্যে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। এই অবস্থাকে ‘তুহর’ বলা হয়। এই সময়ে স্বামী তার স্ত্রীকে শুধুমাত্র একটি তালাক (যেমন- “আমি তোমাকে তালাক দিলাম”) প্রদান করবেন।  এই তালাকের পর স্ত্রী তার ইদ্দতকাল (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) পালন করবেন। এই সময়ে তারা একই বাড়িতে বসবাস করতে পারেন, তবে স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ করবেন না। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী যেকোনো মুহূর্তে চাইলে তার স্ত্রীকে মৌখিকভাবে অথবা দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদি ইদ্দত শেষে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: ইদ্দতকালে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন

প্রথম তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতকালীন সময়ের মধ্যে স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। যদি স্বামী মনে করেন যে, তারা পুনরায় আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলতে পারবেন, তাহলে তিনি মৌখিক বা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনকে বলা হয় ‘রুজু’। যদি ইদ্দতের মধ্যে রুজু করা হয়, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। যদি ইদ্দত শেষেও স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে এবং এটি তালাকে বায়িন সগির হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ ঐ স্বামী তালাক দেওয়া স্ত্রীকে পুণরায় বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

فِي طَلَاقِ السُّنَّةِ يُطَلِّقُهَا عِنْدَ كُلِّ طُهْرٍ تَطْلِيقَةً فَإِذَا طَهُرَتْ الثَّالِثَةَ طَلَّقَهَا وَعَلَيْهَا بَعْدَ ذَلِكَ حَيْضَةٌ.

তালাক-ই-সুন্নাহতে হলো- সে (স্বামী) তাকে (স্ত্রীকে) প্রতিটি পবিত্রতার সময় (ঋতুস্রাব শেষে) একটি করে তালাক দেবে। যখন সে তৃতীয়বার পবিত্র হবে, তখন তাকে তালাক দেবে এবং এরপর সে এক হায়েজ কাল ইদ্দাত পালন করবে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০২১, ২০২০, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৯৪, ৩৩৯৫

রুকানাহ্ ইবনু ’আব্দ ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি স্বীয় স্ত্রী সুহায়মাহ্-কে নিশ্চিত তালাক দিলেন। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি অবহিত করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এক তালাকের নিয়্যাত করেছি, অন্য কিছু নয়। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি কি এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করনি? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করিনি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, রুকানাহ্ তার স্ত্রীকে উমার (রাঃ)-এর যুগে দ্বিতীয় এবং উসমান (রাঃ)-এর যুগে তৃতীয় তালাক দেন। মিশকাত : ৩২৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২০৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৫১, দারিমী : ২২৭৭

সুন্নানি তালাকের বৈশিষ্ট্য :

১. মাসিক ঋতুস্রাব শেষ হওয়ার পর পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া।

২. পবিত্র অবস্থায় শুধুমাত্র একটি তালাক উচ্চারণ করা।

৩. এক সাথে তিন তালাক না দেওয়া।

৪. শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকবে।

৫. ইদ্দতকাল গণনা করে এক বা দুই তালাক দেয়া, তৃতীয় তালাক না দেওয়া।

৬. পুনর্বিবেচনা ও সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে।

তালাকে হাসান (উত্তম তালাক)

তালাকে হাসান হলো তালাকের এমন একটি পদ্ধতি, যা তালাকে আহসানের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, তবে এটিও শরীয়তসম্মত। তালাকের উত্তম পদ্ধতি হিসেবে তালাকে হাসান-এর মূল উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীকে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিটি ধাপে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ রাখা। এটি কোনো তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়া।

তালাক-এ-হাসান পদ্ধতিটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিটি ধাপেই পবিত্রতা ও ধৈর্যের শর্ত রয়েছে।

প্রথম তালাক: এই পদ্ধতির শুরু হয় যখন স্বামী তার স্ত্রীকে প্রথমবার তালাক দেন। এই তালাক অবশ্যই এমন সময় দিতে হবে, যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র অবস্থায় রয়েছেন এবং ওই পবিত্র অবস্থায় তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এই প্রথম তালাকের পর স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবেন না, বরং তারা ইদ্দতকাল (প্রথম মাসিক চক্র শেষ হওয়া) পর্যন্ত আলাদা থাকবেন।

দ্বিতীয় তালাক: প্রথম ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ স্ত্রীর দ্বিতীয়বারের মতো পবিত্র অবস্থায় আসার পর, স্বামী তাকে দ্বিতীয়বার তালাক দেবেন। এই সময়েও তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। এই দ্বিতীয় তালাকের পরও তারা ইদ্দতকাল (দ্বিতীয় মাসিক চক্র শেষ হওয়া) পর্যন্ত আলাদা থাকবেন।

তৃতীয় তালাক : একইভাবে, তৃতীয়বারের পবিত্র অবস্থায় স্বামী তার স্ত্রীকে তৃতীয় ও চূড়ান্ত তালাক দেবেন।

এই তিনটি তালাক পৃথক পৃথক পবিত্র অবস্থায় দেওয়া হয়। যদি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের পর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু যদি স্বামী তিনবার তালাক দেন, তাহলে বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন কুবরা হিসেবে গণ্য হয়। এই ক্ষেত্রে, স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করতে হলে হিলা নামক জটিল প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে হয়।

এই পদ্ধতিটি কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলে, যা ধীরে ধীরে তালাক দেওয়ার কথা বলে এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি ধাপে সুযোগ দেয়। সূরা বাক্বারাহর ২:২২৯-২৩০ আয়াতে পর্যায়ক্রমে দুই তালাক এবং এরপর তৃতীয় তালাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি।

সারকথা : স্বামী পবিত্র অবস্থায় এবং কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে একবার তালাক দেবেন। ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকবেন এবং স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবেন না। এরপর পরবর্তী পবিত্র অবস্থায় এবং কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে স্বামী দ্বিতীয়বার তালাক দেবেন। একইভাবে তৃতীয়বারের পবিত্র অবস্থায়ও স্বামী তৃতীয়বার তালাক দেবেন। এভাবে তিনবার তালাক দেওয়া হলে বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন কুবরা হিসেবে গণ্য হয়। এ পদ্ধতির দলিল উপরে বর্ণনা করা হয়ছে। সুরা বাকারা : ২২৯-২৩০, সুরা তালাক : ০১।

এক সাথে তিন তালাকের বিধান : বিদআতি তালাক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিদআতি তালাক

বিদআত শব্দটি আরবী (البدع) শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। বিদআত (البدع) এর আবিধানিক অর্থ হল, নব আবিস্কৃত ও নব উদ্ভাবন। বিদআত এর অর্থ এমন করেও বলা যায়, পূর্বের কোন দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করা। পারিভাষিক অর্থে দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন কিছু সংযোজন করার নাম বিদআত। আর শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোন ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলীল নেই। কাওয়ায়েদ মা’রিফাতিল বিদআহ, পৃ-২৪

তালাকের ক্ষেত্রে, বিদআতি তালাক বলতে এমন পদ্ধতিকে বোঝানো হয়, যা শরিয়ত অনুমোদন করে না। এর মধ্যে প্রধানত তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:

১. ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া।

২. পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পর তালাক দেওয়া

৩. একসাথে তিন তালাক দেওয়া।

১. মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক :

কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক দেয়, তবে সেটিও বিদ‘আতী তালাক। এই তালাকও কার্যকর হয়, তবে এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। বিদ‘আতী তালাক কার্যকর হলেও এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ।

নাফি’ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ’উমার (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুমতী অবস্থায় এক তালাক দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন এবং মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুমতী হয়ে পরবর্তী পবিত্রা অবস্থা আসা পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখেন। পবিত্র অবস্থায় যদি তাকে তালাক দিতে চায় তবে সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিতে হবে। এটাই ইদ্দাত, যে সময় স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার জন্য আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। ’আবদুল্লাহকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাদের বলেনঃ তুমি যদি তাকে তিন তালাক দিয়ে দাও, তবে স্ত্রীলোকটি অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় ইবন ’উমার (রাঃ) বলতেন, ’তুমি যদি এক বা দু’ তালাক দিতে’, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকমই নির্দেশ দিয়েছেন।

সহিহ বুখারি : ৫৩৩২, ৬০৩৩, ৭১৬০, সহহি মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২, ২১৮৪, ২১৮৫

২. পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পর তালাক দেওয়া:

যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তখন সেই পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া বিদ‘আতী তালাক হিসেবে গণ্য হয়। এর কারণ হলো, শারীরিক সম্পর্কের ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে। যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে থাকেন, তাহলে ইদ্দতকাল গণনা করা জটিল হয়ে পড়ে। এছাড়া, সহবাসের পর তালাক দিলে তা পারিবারিক সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই, এই ধরনের তালাক দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।

ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি তার স্ত্রীকে তার হায়য অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। ’উমার (রাঃ) বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উত্থাপন করলে তিনি বলেনঃ তাকে বলো, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, এরপর সে চাইলে তাকে তুহর অথবা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৩, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে নাসায়ী ৩৩৮৯, ৩৩৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২,

এই হাদিসটি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় এবং শারীরিক সম্পর্কের পর তালাক দেওয়া ইসলামে অনুমোদিত নয়। এটি তালাকের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতির পরিপন্থী।

৩. একসাথে তিন তালাক দেওয়া

একসাথে তিন তালাক দেওয়া একটি বিদআতী ও হারাম কাজ। এই বিষয়ে উম্মাহর আলেমদের মধ্যে ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে যে, এটি ইসলামের বিধানসম্মত পদ্ধতি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কোনো ব্যক্তি এই হারাম কাজটি করেই ফেলে, তাহলে তার হুকুম কী হবে? এই বিষয়ে আমাদের উপমহাদেশের আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইসলামী শরীয়তে মতভেদের প্রধান কারণগুলো হলো: কোনো বিষয়ে সরাসরি দলিল না থাকা, একাধিক সঠিক দলিল বিদ্যমান থাকা, অথবা একই দলিলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। দলিল বুঝার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও মতভেদের একটি কারণ হতে পারে। এই কারণে মতভেদ করা ইসলামে জায়েজ। রাসূল (সা.)-এর যুগেও সাহাবিদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ ছিল, কিন্তু তিনি তা দূর করে দিতেন। শুধু সাহাবিরা নন, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীদের মাঝেও ফিকহি মাসআলা-মাসায়েলে মতভেদ ছিল। তবে, তাদের সবার মূল লক্ষ্য ছিল কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি মাথা নত করা। যখন তারা প্রকৃত দলিল জানতে পারতেন, তখন তাদের মধ্যকার মতভেদ বিলীন হয়ে যেত। ইমামদের মাঝেও ফিকহি বিষয়ে হাজার হাজার মতভেদ থাকলেও তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল না। কারণ, যার কাছে যে দলিল ছিল, তার আলোকে তিনি বিশুদ্ধ অভিমত প্রদান করেছেন এবং অন্যদের মতামতের প্রতিও সম্মান দেখিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে তারা ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদিসের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।

কুরআনে তালাকের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, যার প্রমাণস্বরূপ একটি সম্পূর্ণ সূরার নামকরণই করা হয়েছে ‘সূরা তালাক’। সহিহ হাদিসেও এ বিষয়ে অসংখ্য প্র্যাকটিক্যাল বর্ণনা পাওয়া যায়। এত স্পষ্টতা সত্ত্বেও, একসাথে তিন তালাকের বিষয়ে সামান্য অস্পষ্টতার কারণে মুজতাহিদ আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়ে মোট চারটি প্রসিদ্ধ মতামত রয়েছে।

একদল মুজতাহিদ বলেন, একসাথে তিন তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না। দ্বিতীয় দলের মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে নারীদের ওপর তিন তালাক বর্তাবে, তবে সহবাসহীন নারীদের ওপর এক তালাক। তৃতীয় দলের মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তালাকে বাইন কবীর হিসেবে গণ্য হবে, যদিও তালাকদাতা গুনাহগার হবেন। চতুর্থ দল বলেন, এটি এক তালাক-এ-রজয়ি হবে।

একথা বললে অন্যায় হবে না যে আমাদর উপমহাদেশের অধিকংশ লোকই হানাফি মাজহাবের অনুসারী। অর্থাৎ তারা ফিকহি মাসায়েলে একদল হানাফি আলেমদের অনুসরণ করে থাকে। দ্বিতীয় বড় হলো আহলে হাদিস বা সালাফি। উপরে বর্ণনি চারটি মতামতের মাঝে হানাফি মাজহাবের আলেমদের মতে, এক সাথে তিন তালাক দিলে, তালাকে বায়িন কবির হয়ে যাবে, তবে তালাক দাতা গুনাহগার হবেন। অপর পক্ষে আহলে হাদিস বা সালাফি আলেমদের মতে, এক সাথে তিন তালাক দিলে, এক তালাক রাজয়ি হবে।  দেখা যায় তালাকের মাসায়ের উপমহাদের দুটি বৃহত দল, হানাফি ও সালাফিদের (আহলে হাদিস) মাঝে বিরাট মতভেদ। কাজেই আমি এ চারটি মতমত থেকে দুটি মতামত তুলে ধরছি। আশা করি আল্লাহ রহমতে বইটিতে নিরপেক্ষভাবে দুই দলের দলিল উপস্থাপন কবর যাতে জ্ঞানীগণ  সঠিক মতামত বুঝে আমল করেত পারে।

এক সাথে তিন তালাক দিলে, তালাকে বায়িন কবির হয়ে যাবে।

আমাদের উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী হানাফি আলেমদের মতে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বিদআত বা হারাম হলেও তা কার্যকর হয়। তাদের মতে, এমন তালাক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ইদ্দতকালীন সময়েও কোনো ধরনের পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে না, যা এক বা দুই তালাকের ক্ষেত্রে সম্ভব। এই মতটি তালাকের বিধানকে কঠিন করে তোলে যাতে মানুষ এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। এই মতের স্বপক্ষে যে প্রধান দলিলগুলো তারা পেশ করে, তা নিচে দেওয়া হল-

১. এ কথার সমর্থনে কুরআনের দলিল :

হানাফি মাজহাবের ফকিহগণ তালাকের বিধান সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলোর সমন্বিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

এইতো গেল দুই তালাকের বিধান। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তিন তালাক প্রদানের বিধান ঘোষণা করে ইরশাদ করেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতের দ্বারা পরিস্কার প্রমণিত হয় যে, তিন তালাক প্রদান করলে তিন তালাকই পতিত হবে। প্রথম দুই তালাকের পর স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারেন, কিন্তু তৃতীয়বার তালাক দিলে (তা যেই পদ্ধতিতেই হোক না কেন) তালাকে বাইন কবীর কার্যকর হয়। একবারে তিন তালাক দেওয়া যদিও শরিয়তসম্মত পদ্ধতি নয়, কিন্তু তা উচ্চারিত হলে কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী তা কার্যকর হবে। কারণ, আল্লাহ তালাকের সংখ্যাকে দুইবারে সীমাবদ্ধ করেছেন, কিন্তু তিন তালাকের ফলাফলকে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

২. সাহাবিদের (রা.) ইজমা

ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِي أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏ فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ)-এর যুগে ও উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বললেন, ‘লোকেরা এমন এক বিষয়ে তাড়াতাড়ি করছে, যাতে তাদের জন্য ধৈর্যের অবকাশ ছিল। যদি আমরা এটি তাদের উপর কার্যকর করে দেই (তাহলে কেমন হয়)?’ এরপর তিনি তা তাদের উপর (একসাথে তিন তালাককে তিন তালাক)  কার্যকর করে দিলেন। সহি মুসলিম : ১৪৭২

উমার (রাঃ) যখন এক সাথে তিন তালাককে কার্যকর বা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তা সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা সমর্থিত হয়। এই ইজমা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান হিসেবে বিবেচিত। যদিও রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতে এক সঙ্গে তিন তালাককে এক তালাক ধরা হতো, উমার (রাঃ)-এর এই সিদ্ধান্তের পেছনে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ (মাসলাহা) ছিল।

হানাফি আলেমদের দাবি- এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সাহাবীদের ইজমা শরীয়তের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। যদিও মূল নীতি এক ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী বিধানের প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে। উমার (রাঃ)-এর এই সিদ্ধান্তকে তাকয়ীদে হুকুম (বিধানকে সীমাবদ্ধ করা) হিসেবে দেখা হয়, যা একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং যা মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তাই, হানাফি ফিকহ মোতাবেক, একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তা তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর হবে এবং স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যাবে।

৩. একত্র তিন তালাক শুনে ইবনু আব্বাস (রা.) চুপ হয়ে যান

মুজাহিদ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রা.)-এর কাছে অবস্থান করছিলাম এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললো যে, সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি এ কথা শুনে চুপ রইলেন। তখন আমার মনে হলো, সম্ভবতঃ তিনি মহিলাটিকে পুনরায় গ্রহণের নির্দেশ দিবেন। অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদের কেউ আহম্মকের মতো কাজ করে এবং এসে বলে, হে ইবনু ’আব্বাস! হে ইবনু ’আব্বাস! অথচ আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটা সমাধানের পথ দেখিয়ে দিবেন’’। সূরা তালাক : ২। আর তুমি তো (তালাকের বিষয়ে) আল্লাহকে ভয় করোনি। সুতরাং আমি তোমার জন্য কোনো পথ দেখছি না। তুমি তোমার প্রতিপালকের নাফরমানী করেছো এবং স্ত্রীকেও হারিয়েছো। মহান আল্লাহ তো বলেছেনঃ ’’হে নবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে।’’ সুরা তালাক : ০১

ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, এ হাদীসটি হুমাইদ, আ’রাজ ও অন্যরা মুজাহিদ থেকে ইবনু ’আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও শু’বাহ, আইয়ূব, ইবনু জুরাইজ আ’মাশ প্রমুখ বর্ণনাকারীগণ সকলেই ইবনু ’আব্বাস সূত্রে হাদীস বর্ণনা করে বলেছেন যে, ইবনু  আব্বাস (রাযি.) একে একসাথে তিন তালাক হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই তিনি বলেছেন, ’তুমি তোমার স্ত্রীকে হারালে।

ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, হাম্মাদ ইবনু যায়িদ আইয়ূব থেকে ইকরিমার মাধ্যমে ইবনু ’’আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ’’যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একত্রে তিন তালাক দেয়, তা এক তালাক গণ্য হবে।’’ ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম (রহ.) আইউব থেকে ইকরিমাহ (রহ.) সূত্রে বর্ণনা করেন, উক্ত কথাটি ইবনু আব্বাসের নয়, বরং ইকরিমাহর কথা। তিনি ইবনু ’আব্বাস (রাযি.)-এর উল্লেখ করেননি এবং একে ইকরিমাহ (রহ.)-এর অভিমত গণ্য করেছেন। সহীহ। সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৭, সুনানে বায়হাকী কুবরা ; -১৪৭২০, সুনানে দারা কুতনী : ১৪৩

নোট : এ হাদিসে এ সাথে তিন তালাত গন্য হয়েছে বিধায় ইবনু আব্বাস (রা.) চুপ হয়ে গেলেন এবং বললেন তুমি স্ত্রীকে হারালে।

৪. রিফায়া (রা.) তার স্ত্রী তিন তালাক ছিয়েছিল

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রিফায়া আল কুরাযী নামে এক সাহাবীর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি রিফায়ার বিবাহিতা স্ত্রী ছিলাম, সে আমাকে তিন তালাক দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পর্ক নিঃশেষ করে দিয়েছে। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনে যাবীর -এর সাথে আমার বিবাহ হয়, কিন্তু তাঁর কাছে এই কাপড়ের আঁচলের মতো ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রিফায়ার নিকট ফিরে যেতে চাও? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তিনি বললেন, না, যে পর্যন্ত না তুমি তার স্বাদ আস্বাদন (সহবাস) কর এবং সে তোমার স্বাদ আস্বাদন করে। সহিহ বুখারী : ২৬৩৯,  সহিহ মুসলিম : ১৪৩৩, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮৩, সুনানে তিরমিযী : ১১১৮, সুনানে ইবনু মাজাহ “ ১৯৩২, আহমাদ : ২৪০৯৮, ইরওয়া : ১৮৮৭,  মিশকাত : ৩২৯৫, হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

সালাফিদের দাবি : এ হাদিসে এক মজলিসে তিন তালাকের কথা নেই। বরং সে তাকে স্বাভাবিক নিয়মে তিন তুহরে তিন তালাক দিয়েছিল বলেই বুঝতে হবে। কেননা রাসূলের যামানায় ‘বায়েন তালাক’ বলতে তিন তুহরে তালাকই বুঝাতো।

৫. একই মজলিসে তিন তালাক

 আমের আশশাবী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বললাম, আপনার তালাকের ঘটনাটি আমাকে বলুন। তিনি বলেন-

طَلَّقَنِي زَوْجِي ثَلَاثًا وَهُوَ خَارِجٌ إِلَى الْيَمَنِ فَأَجَازَ ذَلِكَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم

আমার স্বামী ইয়ামনে থাকা অবস্থায় আমাকে তিন তালাক দেয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে জায়েয গণ্য করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৪, আহমাদ : ২৭৩২৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪০৪৯, মিশকাত : ৩৩২৪

ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ আমর ইবনু হাফস্ (রা.) (তার স্বামী) অনুপস্থিতিতে তাকে বায়িন তালাক দেন। এরপর সামান্য পরিমাণ যবসহ উকীলকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। এতে তিনি ফাতিমা (রা.) তার উপর ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হন। সে  বলল, আল্লাহর কসম! তোমাকে (খোরপোষরূপে) কোন কিছু দেয়া আমাদের দায়িত্ব নয়। তখন তিনি ফাতিমা বিনত কায়স (রা.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তার নিকট সব খুলে বললেন। তিনি বললেন, তোমার জন্য তার তোমার স্বামী আবূ আমর ইবনু হাফস্ (রা.) এর দায়িত্বে কোন খোরপোষ নেই। এরপর তিনি তাকে উম্মু শারীক এর ঘরে গিয়ে ইদ্দাত পালনের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি এও বললেন, সে মহিলা (উম্মু শারীক) এমন একজন স্ত্রীলোক যার কাছে আমার সাহাবীগণ ভীড় করে থাকেন। তুমি বরং ইবনু উম্মু মাকতুম (রা.) এর বাড়িতে গিয়ে ইদ্দাত পালন করতে থাক। কেননা সে একজন অন্ধ মানুষ। সেখানে প্রয়োজনবোধে তুমি তোমার পরিধানের বস্তু খুলে রাখতে পারবে। ইদ্দাত পূর্ণ হলে তুমি আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, যখন আমার ইদ্দাত পূর্ণ হল তখন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানালাম যে, মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফইয়ান (রা.) ও আবূ জাহম (রা.) আমাকে বিবাহের পায়গাম পাঠিয়েছেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আবূ জাহম এমন লোক যে, তার কাঁধ থেকে লাঠি নামিয়ে রাখে না। আর মু’আবিয়াহ তো কপৰ্দকহীন গরীব মানুষ। তুমি উসামাহ ইবনু যায়দের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করলাম না। পরে তিনি আবার বললেন, তুমি উসামাকে বিয়ে কর। তখন আমি তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। আল্লাহ এতে (তার ঘরে) আমাকে বিরাট কল্যাণ দান করলেন। আর আমি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০, সুনানে  আবূ দাঊদ : ২২৮৪, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৫ হাদিসটি আবু দাউদ থেকে সংকরন করা হয়েছে।  

হানাফি আলেমদের দাবি এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) এক সঙ্গে তিন তালাকের কথা জানতে পারেন। আগে তিনি এক বা দুই তালাকের কথা জানতেন না। তাই তিনি ভরণ পোষনের জন্য এর নিকট অভিযোগ করেছেন। এক বা দু্‌ই তালাত দিলে স্বামী নিশ্চয়ই ভরন পোষন দিতে বাধ্য থাকত। ইবন মাজাহ এ হাদিসের শিরোনাম দিয়েছেন : যে ব্যক্তি একই মজলিসে তিন তালাক দেয়।

৬. স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে হারাম হয়ে যায়

 লায়স (রহ.) নাফি থেকে বর্ণনা করেছেন-

كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا سُئِلَ عَمَّنْ طَلَّقَ ثَلاَثًا قَالَ لَوْ طَلَّقْتَ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ فَإِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَمَرَنِي بِهٰذَا فَإِنْ طَلَّقْتَهَا ثَلاَثًا حَرُمَتْ حَتّٰى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَكَ.

ইবনু উমার (রাঃ)-কে তিন তালাক প্রদানকারী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, যদি তুমি একবার বা দু’বার দিতে! কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে সে হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে স্ত্রী তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। সহিহ বুখারি : ৫২৬৪

নোট : এ হাদিসটি অনেক হানাফি আলেরম একসাথে তিন তালাকের দলিল হিসেবে উল্লেখ করে। তখন তারা হদিসের অনুবাদে সামান্য বিকৃতি কবে। তাদের একটি ভুল বা বুকৃত অনুবাদ হলো-

নাফে (রহ.) বলেন, যখন ইবনে উমর রাঃ এর কাছে এক সাথে তিন তালাক দিলে ‎তিন তালাক পতিত হওয়া না হওয়া’ (রুজু‘করা যাবে কিনা) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো,‎ তখন তিনি বলেন-“যদি তুমি এক বা দুই তালাক দিয়ে থাকো তাহলে ‘রুজু’ [তথা স্ত্রীকে বিবাহ করা ছাড়াই ফিরিয়ে আনা] করতে পার। ‎কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকম অবস্থায় ‘রুজু’ করার আদেশ দিয়েছিলেন। ‎যদি তিন তালাক দিয়ে দাও তাহলে স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, সে তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামী গ্রহণ করা পর্যন্ত।

নোট : এ বিষয়টি সাধারণ তিন তালাত বায়িনের মাসায়েল। শুধু একসাত তিন তালাক কথাটি অতিরিক্ত যোগ করে দলিল নিজের পক্ষে নিয়েছে। মুফতি রাশেদুল ইসলাম, মুসলিম বাংলা ওয়বসাইড, প্রশ্ন নম্বর-২৬২৫৪ এর উত্তরে।

৭. জেনার কারনে এক সাথে তিন তালাক প্রদান

সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে (ব্যভিচারে) দেখতে পায় এবং সে যদি (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? (আর এরূপ যদি না করে) তবে সে (স্বামী) কি করবে (অর্থাৎ- এই ব্যভিচারের কারণে তার করণীয় কি)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম। অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪৭৪৫, ৪৭৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী :  ৩৪০২, দারিমী :  ২২৭৫, মিশকাত : ৩৩০৪। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

নোট :  এ হাদিসের আলোকে তারা দাবি করের থাকেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) একসাথে তিন তালাক দেওয়াটা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু এখানে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর বিরুদ্ধে যেনার অভিযোগ ছিল এবং লিআনের ঘটনা ছিল। লিআনের কারণে উভয়পক্ষের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। তাই পৃথকভাবে তালাক দেওয়ায় কোন প্রয়োজন হয় না। কাজেই এ হাদিস দ্বারা একসাথে তিন তালাকের হুকুর জারি করা যাবে না।

৮. একসাথে একশত তালাক প্রদান করা

 মালিক (রহ.) হতে বর্ণিত। তাঁর নিকট খবর এসেছে যে, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি স্বীয় স্ত্রীকে একশ’ তালাক দিয়েছি, এ সম্পর্কে আমার প্রতি আপনার অভিমত কি? উত্তরে তিনি বললেন, তিনটির মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে, বাকি সাতানব্বইটি দ্বারা তুমি আল্লাহর আয়াত (শারীআতের বিধান)-এর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছ। মিশকাত : ৩২৯৩, মুয়াত্তা মালিক : ১১৯৫, হাদিসের মান হাসান।

উবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) বলেন, আমার দাদা তার স্ত্রীকে একসঙ্গে ১০০০ তালাক দেন। তখন আমার আববা রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে গেলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তোমার দাদা তালাক দেওয়ার সময় আল্লাহকে ভয় করেনি। তার অধিকারে মাত্র তিনটি। বাকী ৯৯৭টি বাড়াবাড়ি ও যুলম হয়েছে। আল্লাহ চাইলে তাকে আযাব দিবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন’। সুনানে দারা কুতনী : ৪৬১০, মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ : ১৭৮৮৯, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ১১৭৫৩, কানজুল উম্মাল : ২৮৪২৩, হাদিসটি মান কেউ জঈফ আবার কেউ জাল বলেছেন।

নোট : এ দুটি হাদিসের প্রথমটি সহিহ হাদিস। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তিনটি তালাকের মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে। এখানে কিন্তু তিন তালাক একসাথে দেওয়া হয়েছে বলে আনুমেয়। ,

০৯. হানাফি মাজহাবের ফিকহি দলিল

হানাফি ফকিহগণ বলেন, ইসলামে তালাক দেওয়ার সুন্নতি পদ্ধতি হলো এক তালাক দেওয়া। কিন্তু যদি কোনো স্বামী এই পদ্ধতি না মেনে একসাথে তিন তালাক দেন, তাহলে এর জন্য তাকে গুনাহগার হতে হবে, কিন্তু তার তালাক কার্যকর হবে। কারণ, যদি একসাথে দেওয়া তিন তালাককে অকার্যকর ধরা হয়, তবে মানুষ শরিয়তের বিধানকে অবহেলা করবে এবং দায়িত্বহীনভাবে তালাক দেবে। তাই, শাস্তি হিসেবে হলেও এই তালাককে কার্যকর করা উচিত, যাতে মানুষ সতর্ক হয়। এই মতের পক্ষে তাদের ফিকহি গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন দলিল উল্লেখ করেছেন। নিচে কয়েকটি প্রসিদ্ধ ফিকহি গ্রন্থ থেকে এর কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. ফতোয়ায়ে আলমগীরি (ফাতাওয়া-ই-হিন্দিয়া) গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দেয়, তবে তিন তালাকই কার্যকর হবে, যদিও এটি বিদ’আতী (শরিয়ত-বিরুদ্ধ) পদ্ধতি। তারা এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূল (সা.)-এর সময়কাল থেকে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি ছিল যে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। ফতোয়ায়ে আলমগীরি (ফাতাওয়া-ই-হিন্দিয়া), প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৭৩-৩৭৪

২. বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দেয়, তবে তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে। এই বিধানটি একবারে তিন তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্রন্থটিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে, তিন তালাক মুখে উচ্চারণ করা হলে তা কার্যকর হবে, কারণ তালাকের বিষয়টি নির্ভর করে উচ্চারণের ওপর, নিয়তের ওপর নয়। আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭

৩. ইমাম আলাউদ্দীন আবু বকর ইবনে মাসউদ কাসানী হানাফী (রহ.) বলেছেন, এক সাথে তিন তালাক কার্যকর হওয়ার কারণ হিসেবে উমর (রা.)-এর আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফিকাহবিদগণ বলেন যে, উমর (রা.) যখন দেখলেন যে মানুষ এ বিষয়ে খেলাধুলা করছে, তখন তিনি সাহাবিদের উপস্থিতিতে এটিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সাহাবিদের ঐকমত্যের (ইজমা’) ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। তাই, এটি শরিয়তের একটি প্রতিষ্ঠিত বিধান হিসেবে গণ্য। বাদাই’উস সানাই, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৯৬

৪. মুহাম্মদ আমীন ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেছেন, যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে, “আমি তোমাকে তিন তালাক দিলাম,” তবে তা কার্যকর হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রন্থটিতে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই ধরনের তালাক যদিও হারাম, কারণ এটি শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতির পরিপন্থী, তবুও এটি কার্যকর হবে। ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার), তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৫৩

এক সাথে তিন তালাক দিলে, এক তালাক রজয়ি হবে

একসাথে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হবে—এই মতটি সালাফি ও আহলে হাদিস আলেমগণ দিয়ে থাকেন। তারা তাদের মতের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবিদের আমল থেকে বেশ কিছু শক্তিশালী দলিল পেশ করেন।

ক. কুরআন থেকে দলিল

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

এই আয়াতটি তালাকের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়, যা হলো ইদ্দতকাল অনুযায়ী ধাপে ধাপে তালাক দেওয়া। একসাথে তিন তালাক দিলে এই বিধান লঙ্ঘিত হয়। সালাফি আলেমদের মতে, যেহেতু এই পদ্ধতি কুরআনের নির্দেশের বিরোধী, তাই তা শরিয়তসম্মত নয় এবং তা এক তালাক হিসেবেই কার্যকর হবে।

সহিহ হাদিস থেকে দলিল

১. একসাথে তিন তালাকের পর স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণ করা যায়

ইবনু আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রুকানার পিতা আবদু ইয়াযীদ ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠী উম্মু রুকানাকে তালাক দেন এবং মুযাইনাহ গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেন। একদা ঐ মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললো, তার স্বামী সহবাসে অক্ষম। যেমন আমার মাথার চুল অন্য কোনো চুলের কোনো উপকারে আসে না। সুতরাং আপনি আমার ও তার মাঝে বিচ্ছেদ করিয়ে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে অসন্তুষ্ট হন এবং রুকানা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে ডেকে আনেন। এরপর তিনি সেখানে উপস্থিত সকল লোকজনকে বলেন, তোমরা কি লক্ষ করেছো যে, এদের মধ্যে অমুক অমুকের অঙ্গের মিল রয়েছে? তারা বললো, হ্যাঁ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আবদু ইয়াযীদকে বলেন, তুমি তাকে তালাক দাও। সুতরাং তিনি তাকে তালাক দিলেন। তিনি বলেন, তুমি রুকানার মা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে পুনরায় গ্রহণ করো। তিনি বলেন, আমি তো তাকে তিন তালাক দিয়েছি, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন, আমি তা জানি, তুমি তাকে গ্রহণ করো। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, ’’হে নবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে’’। সূরা তালাক : ০১

ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, নাফি ইবনু উজাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনু ’আলী ইবনু ইয়াযীদ ইবনু রুকানা থেকে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, রুকানা তার স্ত্রীকে তালাক দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে গ্রহণ করতে আদেশ দেন। এটা অধিকতর সঠিক।

সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৬

নোট : এ হাদিস থেকে জানা যায় যে, রুকানা (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এটিকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করে তাঁকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। সাধারণত, তিন তালাক দিলে তালাকটি বাইন (সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ) হয়ে যায় এবং স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, কেবল দ্বিতীয় বিয়ের পরই তা সম্ভব। কিন্তু এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী একসঙ্গে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই কার্যকর হয়েছিল, যা রাজ’ঈ (ফেরতযোগ্য) তালাক। এটি প্রমাণ করে যে, একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তা এক তালাকেই পরিণত হয়।

২. এক সাথে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষন রাগ করেছিল

মাহমুদ ইবনু লাবীদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কোন লোক সম্বন্ধে সংবাদ দেয়া হলো যে, লোকটি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছে। (এরূপ শুনে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগাম্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, অতঃপর বললেন-

«أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى, وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ». حَتَّى قَامَ رَجُلٌ, فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَلَا أَقْتُلُهُ رَوَاهُ النَّسَائِيُّ وَرُوَاتُهُ مُوَثَّقُونَ

তোমাদের মধ্যে আমি বিদ্যমান থাকা অবস্থাতেই কুরআন নিয়ে কি খেলা করা হচ্ছে? এমনকি এক ব্যক্তি (সাহাবী) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব না?  বুলূগুল মারাম : ১০৭২,  সুনানে নাসাই : ৩৪০১, গায়াতুল মারাম : ২৬১

নোট : রাসূল (সা.)-এর এই তীব্র প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই কাজটি এতটাই গুরুতর যে নবী (সা.) এটিকে আল্লাহর কিতাবের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ হিসেবে তুলনা করেছেন।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আবু বকর (রাঃ)-এর যুগে তিন তালাককে এক তালাক গন্য করা হতো

তাওস (রহ.) থেকে বর্ণিতখ। আবু সহবা ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বললেন-

هَاتِ مِنْ هَنَاتِكَ أَلَمْ يَكُنِ الطَّلاَقُ الثَّلاَثُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَاحِدَةً فَقَالَ قَدْ كَانَ ذَلِكَ فَلَمَّا كَانَ فِي عَهْدِ عُمَرَ تَتَايَعَ النَّاسُ فِي الطَّلاَقِ فَأَجَازَهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏

“তোমার কিছু বক্তব্য আমাদের শুনাও। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে এবং আবু বকর (রাঃ)-এর যুগে কি তিন তালাক (একসাথে দিলে) এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো না?” তিনি (ইবনে আব্বাস রাঃ) বললেন,

“হ্যাঁ, তা-ই ছিল। কিন্তু যখন উমর (রাঃ)-এর খেলাফতের যুগ এলো, মানুষ তালাকের ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে (অতিরিক্তভাবে) লিপ্ত হতে লাগল, তখন তিনি (উমর রাঃ) তা তাদের ওপর কার্যকর করে দিলেন (অর্থাৎ তিনকে তিন হিসেবেই গণ্য করলেন)।” সহিহ মুসলিম : ১৪৭২

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে, আবূ বকর (রাঃ)-এর খিলাফতে এবং উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হলে তা এক তালাক হিসেবেই গণ্য করা হতো। এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবীগণ একসাথে তিন তালাককে এক তালাকই গন্য করতেন, যা ছিল শরীয়তের মূল বিধান।

পরবর্তীতে, উমার (রাঃ) যখন দেখলেন যে মানুষেরা তালাকের ব্যাপারে হেলাফেলা করছে এবং ঘন ঘন একসাথে তিন তালাক দিয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি একটি কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি একসঙ্গে তিন তালাককে তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর করার নির্দেশ দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তালাকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে খেল-তামাশায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা। এটি কোনো শরয়ী বিধানের পরিবর্তন ছিল না, বরং একটি শিক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল, যা মানুষের অসাবধানতা ও বাড়াবাড়ি বন্ধ করার জন্য নেওয়া হয়েছিল।

এই হাদিসটি এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় যে, একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হলে তা মূলত এক তালাক হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত। উমার (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপ। যদি বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে একসাথে তিন তালাক দেওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে তার পেছনে সামাজিক, মানসিক এবং শিক্ষাগত কারণগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কোরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষা অনুযায়ী, তালাক একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ এবং এটি ধীরে ধীরে, সুন্নাহর নিয়ম মেনে হওয়া উচিত। একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়ার যে প্রবণতা, তা কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশে একসাথে তিন তালাক দেওয়ার কারণ

একসাথে তিন তালাক দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়, বরং বিদ’আত ও হারাম। এতদসত্ত্বেও আমাদের সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এর মূল কারণগুলো হলো:

ক. পূর্বপুরুষের অনুসরণ :

আমাদের সমাজে বহু যুগ ধরে এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, তালাক মানেই একবারে তিন তালাক। এর চেয়ে কম তালাক দিলে তা কার্যকর হয় না। এই বিশ্বাস এতটাই গভীর যে মানুষ সঠিক ধর্মীয় বিধান জানার পরও তা মানতে চায় না। বাপ-দাদার এই ভুল প্রথা অনুসরণ করে মানুষ সহজে একসাথে তিন তালাক দিয়ে বসে।

খ. ধর্মিয় জ্ঞানের অভাব :

প্রতিটি মুসলিমের ধর্মিয় প্রয়োজনীয় পরিমান জ্ঞান অর্জন ফরজ। কাজেই যিনি তালাক দিবেন তার তালাক সম্পর্কি সকল জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কিন্তু তালাকের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ অজ্ঞ। তারা জানে না যে, ইসলামে তালাকের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে, যা অনুসরণ করলে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও তা ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে। অজ্ঞতার কারণে তারা একসাথে তিন তালাক দিয়ে পারিবারিক জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।

গ. হঠাৎ রাগ ও আবেগ :

তালাকের ঘটনা সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর তীব্র ঝগড়া, রাগ এবং মানসিক চাপের কারণে ঘটে। চরম রাগের মুহূর্তে স্বামী তার রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে একবারে তিন তালাক উচ্চারণ করে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়। এই মুহূর্তে কী বলা হচ্ছে এবং তার পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে তার কোনো হুঁশ থাকে না।

ঘ. পারিবারিক চাপ :

অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে ছেলে বা মেয়ের ওপর বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়, বিশেষ করে যদি তারা নিজেরা বিবাহ করে থাকে বা পরিবার সম্পর্কটি মেনে নিতে না পারে। এই চাপের মুখে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী একসাথে তিন তালাক দিয়ে সম্পর্ককে চূড়ান্তভাবে শেষ করে দেয়। অনেক সময় বউ শাশুরি এক অপরকে মেন নিতে পারেনা বিধায় পারিবারিক তিব্র কলহের কারনে কোন কোন স্বামী এক সাথে তালাক দিতে বাধ্য হয়।

ঙ.  সামাজিক চাপ ও মর্যাদা :

অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় পরিবার বা সমাজ মনে করে যে, তালাক একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত। যদি স্বামী শুধুমাত্র এক তালাক দেন, তবে তার সম্মান কমে যাবে বলে মনে করা হয়। তাই, তারা সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার জন্য একবারে তিন তালাক দিয়ে থাকে। তাদের কাছে এটি যেন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা তাদের সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।

চ.  প্রক্রিয়াগত অজ্ঞতা :

অধিকাংশ মানুষ তালাকের আইনি ও শরীয়তসম্মত পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। তারা মনে করে, একবার মুখে তিনটি তালাক উচ্চারণ করলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। তারা জানে না যে, তালাকের নির্দিষ্ট সময় এবং পদ্ধতি রয়েছে। এই অজ্ঞতার কারণে তারা তালাকের সঠিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে না এবং একবারে তিন তালাক দেয়।

ছ.  দ্রুত সমাধান :

অনেকে মনে করে, সম্পর্ক যখন খারাপ হয়ে যায়, তখন দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে তা শেষ করাই ভালো। তারা ভাবে, ধীরে ধীরে এক বা দুই তালাক দিলে ঝামেলা বাড়তে পারে বা সম্পর্ক ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই, সব সমস্যা একবারে শেষ করতে তারা একবারে তিন তালাক দেয়।

জ. যৌতুক :

যৌতুক একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। যদি বিয়ের পর শর্তকৃত যৌতুক না দেওয়া হয়, তখন স্বামী এবং তার পরিবার স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এই নির্যাতনের চরম পর্যায়ে একবারে তিন তালাকের ঘটনা ঘটে।

আপনার এই আলোচনাটি থেকে বোঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের পরিপন্থী হলেও সামাজিক ও মানসিক কারণে এর প্রচলন রয়েছে। এই বিষয়ে আরও কিছু জানতে চাইলে আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি।

যিহারের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আরবি ‘যিহার’ (ظِهار) শব্দটি এসেছে ‘যাহর’ (ظَهْر) থেকে, যার অর্থ ‘পিঠ’। ইসলামী শরীয়াহতে এর অর্থ হলো, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে এমনভাবে তুলনা করে যা তাকে তার জন্য হারাম করে দেয়। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে বলে, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো”। এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মতো সম্মানের আসনে বসাতে চায়, কিন্তু একই সাথে তাদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ককে হারাম করে দেয়।

যিহারকারী ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত কাফফারা আদায় না করবে, ততক্ষণ তার জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সম্পূর্ণ হারাম। যদি সে কাফফারা আদায়ের আগে সহবাস করে, তাহলে তাকে পুনরায় কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন (যেমন একসাথে থাকা, কথা বলা, ইত্যাদি) নিষিদ্ধ নয়, শুধু শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষিদ্ধ।

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার (ظِهار) প্রথাটি প্রচলিত ছিল। এটি ছিল তালাকের একটি রূপ, যা দিয়ে স্বামী তার স্ত্রীকে চিরতরে হারাম করে দিত। ওই সময়ে কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলত, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো,” তবে এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মর্যাদায় উন্নীত করত এবং এর ফলে স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যেত। এর পরিণতি ছিল খুবই ভয়াবহ। স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে তালাকও পেত না, আবার স্ত্রী হিসেবেও বিবেচিত হতো না। ফলে তাদের জীবন এক কঠিন অনিশ্চয়তায় ডুবে যেত। তারা না পারত অন্য কোথাও বিয়ে করতে, না পারত স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করতে।

ইসলামের আগমনের পর এই প্রথাটি রহিত করা হয়। মহানবী (সা.)-এর সময়ে এক সাহাবি, আওস ইবনে সামিত তার স্ত্রী খাওলা বিনতে সালাবা-কে যিহার করেন। হাদিসে এসেছে-

’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেন, বরকতময় সেই সত্তা যাঁর শরবণশক্তি সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। আমি সালাবার কন্যা খাওলা (রাঃ)-এর কিছু কথা শুনলাম এবং কিছু কথা আমার অজ্ঞাত থেকে যায়। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আমার যৌবন উপভোগ করেছে এবং আমি আমার পেট থেকে তাকে অনেক সন্তান উপহার দিয়েছি। অবশেষে আমি যখন বার্ধক্যে উপনীত হলাম এবং সন্তানদানে অক্ষম হলাম, তখন সে আমার সাথে যিহার করেছে। হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকটে আমার অভিযোগ পেশ করছি। অতঃপর বেশি সময়ে অতিবাহিত না হতেই জিবরীল (আঃ) এ আয়াতগুলো নিয়ে অবতরণ করলেন-

قَدْ سَمِعَ  اللّٰهُ  قَوْلَ  الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ  اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ  تَحَاوُرَکُمَا………..

’আল্লাহ্ অবশ্যই শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে নিজের স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে……’’। সূরা মুজাদালা : ১-৪। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬০ হাদিসের মান সহিহ

এ হাদিসে দেখা যায়, আওস ইবনে সামিত (রা.) যিকার করার কারনে খাওলা বিনতে খাওলা এতে হতাশ হয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এর প্রতিকার চেয়ে বিচার দেন। তার এই করুণ আর্তি আল্লাহ তা’আলা শোনেন। ফলস্বরূপ, আল্লাহ তায়ালা যিহার প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে পবিত্র কুরআনের সূরা মুজাদালাহ-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল করেন। কুরআনে নাজিল হলো-

قَدْ سَمِعَ  اللّٰهُ  قَوْلَ  الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ  اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ  تَحَاوُرَکُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ  سَمِیْعٌۢ بَصِیْرٌ ﴿۱﴾  اَلَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْکُمْ مِّنْ  نِّسَآئِهِمْ مَّا هُنَّ  اُمَّهٰتِهِمْ ؕ اِنْ  اُمَّهٰتُهُمْ  اِلَّا الِّٰٓیْٔ وَلَدْنَهُمْ ؕ وَ اِنَّهُمْ  لَیَقُوْلُوْنَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَ زُوْرًا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَعَفُوٌّ غَفُوْرٌ ﴿۲﴾ وَ الَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْ نِّسَآئِهِمْ ثُمَّ یَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِیْرُ  رَقَبَۃٍ  مِّنْ قَبْلِ  اَنْ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمْ تُوْعَظُوْنَ بِہٖ ؕ وَ اللّٰهُ  بِمَا تَعْمَلُوْنَ  خَبِیْرٌ ﴿۳﴾  فَمَنْ  لَّمْ یَجِدْ فَصِیَامُ شَہْرَیْنِ مُتَتَابِعَیْنِ مِنْ قَبْلِ اَنْ یَّتَمَآسَّا ۚ فَمَنْ لَّمْ  یَسْتَطِعْ  فَاِطْعَامُ سِتِّیْنَ مِسْكِیْنًا ؕ ذٰلِكَ لِتُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ ؕ  وَ تِلْكَ حُدُوْدُ اللّٰهِ ؕ وَ لِلْکٰفِرِیْنَ  عَذَابٌ  اَلِیْمٌ ﴿۴﴾

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার* করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা মুজাদালা : ১-৪

এই আয়াতগুলোতে যিহারকে একটি গর্হিত কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে, আল্লাহ ইসলামপূর্ব যুগের এই কঠোর ও অন্যায় প্রথাকে সংশোধন করে স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করেন।

যিহারের বিধান করা একটি গর্হিত কাজ

প্রাচীন আরব সমাজে স্ত্রী সাথে যিহারের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হত। ইসলাম এসে এ বিধান বাতিল করে। তাই যিহারের মাধ্যামে সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে অসঙ্গত কথা বলার কারণে কাফ্ফারা দিতে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি গর্হিত ও মিথ্যা কথা। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِہِمۡ مَّا ہُنَّ اُمَّہٰتِہِمۡ ؕ اِنۡ اُمَّہٰتُہُمۡ اِلَّا الّٰٓیِٴۡ وَلَدۡنَہُمۡ ؕ وَاِنَّہُمۡ لَیَقُوۡلُوۡنَ مُنۡکَرًا مِّنَ الۡقَوۡلِ وَزُوۡرًا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ لَعَفُوٌّ غَفُوۡرٌ

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। সূরা মুজাদালা : ২

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, যিহার একটি মিথ্যা ও অন্যায় কাজ, যা আল্লাহ ঘৃণা করেন।

যিহারের কাফফারা বা  প্রায়শ্চিত্ত :

যদি কোনো ব্যক্তি যিহার করে ফেলে, তাহলে তার জন্য তার স্ত্রীর সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না সে নির্দিষ্ট কাফফারা আদায় করে। আল্লাহ তা’আলা এই কাফফারাকে পর্যায়ক্রমে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। ইসলামি শরীয়তের আলোকে যিহারের কারনে যে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয় তান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক. একজন দাস মুক্ত করা:

যিহারের কাফফারার প্রথম ধাপ হলো একজন দাস মুক্ত করা। এটি সবচেয়ে সহজ ও উত্তম পদ্ধতি। যদি কোনো ব্যক্তি একজন দাস মুক্ত করার সামর্থ্য রাখে, তবে তাকে এটাই করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ ثُمَّ یَعُوۡدُوۡنَ لِمَا قَالُوۡا فَتَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمۡ تُوۡعَظُوۡنَ بِہٖ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা মুজাদালা : ৩

এই আয়াত অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর পুনরায় মিলিত হওয়ার আগেই দাস মুক্ত করতে হবে। বর্তমানে দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় যিহারের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) আদায়ের ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার বিধানটি এখন আর প্রযোজ্য নয়। এর কারণ, এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দাসদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করা এবং সামাজিক কুপ্রথা দূর করা। ইসলামের এ প্রসস্ত বিধানে কারনেই পৃথিবীতে বর্তমানে দাস প্রথা ও তার বিধান অকার্যকর হয়েছে।

ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুসারে, যদি কোনো বিধানের প্রথম ধাপটি পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, যা মানুষের জন্য বিধানকে সহজ ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।

খ. ষাট দিন একটানা রোজা রাখা:

যদি কোনো ব্যক্তি দাস মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে তাকে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে হবে। এই রোজা রাখতে কোনো প্রকার বিরতি দেওয়া যাবে না। যদি কোনো কারণে একটি রোজাও ছুটে যায়, তাহলে আবার প্রথম থেকে ষাট দিন রোজা শুরু করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ شَہۡرَیۡنِ مُتَتَابِعَیۡنِ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ۚ

কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। সূরা মুজাদালা, : ৪

এই বিধান অত্যন্ত কঠোর, কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার এবং কষ্ট স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গ. ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো:

যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতা, দুর্বলতা বা অন্য কোনো কারণে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য দান করতে হবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ فَاِطۡعَامُ سِتِّیۡنَ مِسۡکِیۡنًا ؕ ذٰلِکَ لِتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ

 আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। সূরা মুজাদালা, : ৪

এই তিনটি ধাপের কাফফারা একটির পর আরেকটি অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ, যদি প্রথমটি সম্ভব না হয়, তবে দ্বিতীয়টি এবং দ্বিতীয়টি সম্ভব না হলে তৃতীয়টি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখেছেন এবং বিধানকে সহজ করেছেন।

হাদিসে যিহারের কাফফারা

হাদিসে যিহারের কাফফারার ধারাবাহিকতা ও এর প্রয়োগকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। যেমন-

সালামা ইবনু সাখর আল-বায়াদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নারীদের প্রতি অধিক আসক্ত ছিলাম। অন্য পুরুষের তুলনায় আমি তাদের সাথে বেশি সহবাসে লিপ্ত হতাম। রমযান মাস শুরু হলে আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করলাম। রমযান মাস প্রায় শেষ হতে যাচ্ছে। একদা রাতের বেলা সে আমার সাথে কথাবার্তা বলছিল। তখন তার দেহের একটি অংশ আমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেলো। আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং তার সাথে সহবাস করলাম। ভোর হলে আমি সকাল সকাল আমার সম্প্রদায়ের লোকেদের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদেরকে আমার ঘটনাটি জানালাম।

আমি তাদের বললাম, তোমরা আমার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করো। তারা বললো, আমরা তা করতে পারবো না। হয়ত বা আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে কিতাব (কুরআনের আয়াত) নাযিল করবেন অথবা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন কিছু বলবেন, যা আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে থাকবে। বরং আমরা তোমার অপরাধসহ তোমাকে সোপর্দ করবো। তুমি নিজেই গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তোমার ঘটনাটি বলো।

রাবী বলেন, আমি রওয়ানা হয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আমার বিষয়টি তাঁকে জানালাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি এটা করেছো? আমি বললাম, আমিই এটা করেছি। আমি এখানে আছি হে আল্লাহর রসূল! আমার প্রতি আল্লাহর যে হুকুম হয় তাতে আমি ধৈর্য ধারণ করবো তিনি বলেন, একটি গোলামকে দাসত্বমুক্ত করো। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি আমার দেহটি ছাড়া আর কিছুর মালিক নই। তিনি বলেন, তাহলে একাধারে দু’ মাস রোযা রাখো।

আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমার উপর যে বিপদ এসেছে, তা তো এই রোযার কারণেই। তিনি বলেন, তাহলে দান-খয়রাত করো অথবা ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও। রাবী বলেন, আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমরা এ রাতটি নিরন্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেছি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি বনু যুরাইক-এর যাকাত বণ্টনকারীর নিকট যাও এবং তাকে বলো, সে যেন তোমাকে যাকাতের কিছু মাল দান করে। তা দিয়ে তুমি ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও এবং অবশিষ্ট যা থাকে তা নিজের উপকারে লাগাও। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৬২, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৮, ১২০০, ৩২৯৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২১৩, মিশকাত : ৩২৯৯, আহমাদ : ৩১৮৮, দারেমী : ২২৭৩, ইরওয়াহ : ২০৯১

উপসংহার

যিহার একটি গুরুতর বিষয়, যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। ইসলাম এর জন্য কঠিন কাফফারা নির্ধারণ করে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেছে। একইসাথে, কাফফারার তিনটি ধাপ নির্ধারণ করে আল্লাহ তা’আলা এই বিধানকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের ভুল থেকে ফিরে আসতে পারে এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে পারে।

লিআন এর বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

লিআন (لعان) শব্দটি আরবি ‘লা’ন’ (لعن) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘আল্লাহর অভিশাপ’। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, লি’আন হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি বিশেষ শপথ ও অভিশাপের প্রক্রিয়া, যা কোনো স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনলে কিংবা স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করলে অনুষ্ঠিত হয়।

ইসলামের প্রথম যুগে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনত এবং তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারত, তাহলে তাকে ‘ক্বযফ’ (মিথ্যা অপবাদ) এর শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাত করা হতো। কিন্তু এতে একটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল: স্বামী যদি সত্যিই তার স্ত্রীর ব্যভিচার দেখেও প্রমাণ করতে না পারত, তাহলে তাকে হয় মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে হতো, নয়তো চুপ করে থাকতে হতো, যা তার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। এই সমস্যার সমাধানেই আল্লাহ তাআলা নতুন বিধান নাজিল করেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট শরীক বিন সাহমার সাথে যেনায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, প্রমাণ পেশ করো অন্যথায় তোমার পিঠে হদ্দ কার্যকর হবে। হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) বলেন, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই সত্যবাদী এবং আল্লাহ্‌ আমার অভিযোগের ব্যাপারে এমন বিধান নাযিল করবেন, যা আমার পিঠকে হদ্দ থেকে রক্ষা করবে। তখন এই আয়াত নাযিল হলো-

﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। সূরা নূর : ৬-৭।

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ ফিরিয়ে তাদের দু’জনকে ডেকে পাঠান। তারা উপস্থিত হলে প্রথমে হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) দাড়িয়ে শপথ করেন এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ অবশ্যই জানেন যে, তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী। অতএব কেও তওবা করবে কি? অতঃপর স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলো। পঞ্চমবারে সে যখন বলতে যাচ্ছিল যে, সে (স্বামী) সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহ্‌র গযব পতিত হোক, তখন লোকেরা তাকে বলল, এটি কিন্তু অবধারিতকারী বাক্য। বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন, সেই নারী তখন আর কিছু না বলে থেমে গিয়ে পিছনে হটে গেলো। শেষে আমরা মনে করলাম সে হয়তো ফিরে যাবে (বিরত থাকবে)। কিন্তু সে বললো, আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আমার সম্প্রদায়কে চিরদিনের জন্য কালিমালিপ্ত করতে পারি না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা তার প্রতি লক্ষ্য রেখো। সে যদি সুরমাদীপ্ত চোখ, মাংসল নিতম্ব ও মাংসল পদযুগলবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তবে এটি শরীক বিন সাহমার। অতঃপর সে এই ধরণের সন্তানই প্রসব করলো। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্‌র কিতাবে আগেই যদি (লিআনকারীর) বিধান না দেয়া থাকতো, তাহলে তার ও আমার মধ্যে কিছু একটা ঘটে যেতো (তাকে শাস্তি দিতাম)। সহিহ বুখারী ২৬৭১, ৪৭৪৭, ৫৩০৭,সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৭, সুনানে তিরমিযী : ৩১৭৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৪, ২২৫৫, ২২৫৬, আহমাদ : ২৪৬৪, ইরওয়াহ : ২০৯৮, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

লিআনের বিধান সম্পর্ক সুরা নুরের আয়াতগুলো হলো-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ یَاْتُوْا بِاَرْبَعَۃِ  شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمٰنِیْنَ جَلْدَۃً  وَّ لَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَۃً  اَبَدًا ۚ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ  الْفٰسِقُوْنَ ۙ﴿۴﴾ اِلَّا الَّذِیْنَ تَابُوْا مِنْۢ بَعْدِ ذٰلِكَ وَ اَصْلَحُوْا ۚ فَاِنَّ  اللّٰهَ  غَفُوْرٌ  رَّحِیْمٌ ﴿۵﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾  وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾  وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক। তবে যারা এরপরে তাওবা করে এবং নিজদের সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৪-৯

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এই ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য লি’আন (لعان)-এর বিধান প্রবর্তন করেন। লি’আনের মাধ্যমে স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে তার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করবে এবং পঞ্চমবারে মিথ্যা হলে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করবে। একইভাবে, স্ত্রীও যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তাকেও চারবার শপথ করে স্বামীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে এবং পঞ্চমবারে সত্য হলে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ কামনা করবে। এভাবে, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে এমন একটি সমস্যার সমাধান দিয়েছেন, যা সমাজ ও পরিবারের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করত। একই সাথে, এটি মিথ্যা অপবাদ থেকে নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।

কুরআন সুন্নাহর আলোকে লিআন (لعان) এর বিধান

লি’আন একটি গুরুতর বিষয়, যা সরাসরি দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুজতাহীদ আলেমগণ নিআনের বিস্তরিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাদের মতে নিআন সাধারণত দুটি কারণে সংঘটিত হয়:

১. স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে।

২. স্বামী যদি স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে, যদি স্বামীর কাছে তার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী না থাকে, তবে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই বিচারকের সামনে লি’আন করতে হয়। লি’আনের প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

ক. স্বামীর শপথ :

স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ মাধ্যমে দাবি করবে যে তিনি যে অভিযোন এনেছেন তা সত্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চম বারে বলবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর লা’নত। সুরা নুর : ৬-৭

খ. স্ত্রীর শপথ:

স্বামীর শপথ শেষ হওয়ার পর স্ত্রী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে যে স্বামী তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেসে তা মিথ্যা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾ وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৮-৯

এই আয়াতে আল্লাহর গজবের কথা উল্লেখ করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এখানে শুধু একটি অভিযোগের সমাধান করা হচ্ছে না, বরং এটি একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের পবিত্রতা ও বিশ্বাসকে চিরতরে ভেঙে দেয়। এই শপথের পর, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

লি’আনের ফলাফল

লি’আনের পর নিম্নলিখিত ফলাফলগুলো কার্যকর হয়:

১. চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ :

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তারা আর কোনো দিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এটি সাধারণ তালাকের মতো নয়, যেখানে পুনরায় বিবাহ সম্ভব।

ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি বলেন-

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে, এ বিষয়ে প্রায় সব ফিকহ কিতাবই একমত। এই বিচ্ছেদ এমন যে, তারা আর কোনো দিন পুনরায় বিবাহ করতে পারবে না, এমনকি যদি তারা তওবাও করে। এটি ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালিক এবং অন্যান্য অধিকাংশ ফিকহবিদের মত। কিতাব: আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৯৮

২. ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল:

স্বামীর করা ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম) কার্যকর হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَدۡرَؤُا عَنۡہَا الۡعَذَابَ اَنۡ تَشۡہَدَ اَرۡبَعَ شَہٰدٰتٍۭ بِاللّٰہِ ۙ  اِنَّہٗ لَمِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ۙ

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা নুর : ৮

আলাউদ্দিন আল-কাসানী বলেন-

লি’আনের পর স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম বা বেত্রাঘাত) কার্যকর হয় না। এটি তার শপথের ফলেই ঘটে। কিতাব: বাদাই’উস সানাই, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৩০৯

৩. সন্তানের বংশ বাতিল :

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তবে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের দিকটিই প্রাধান্য পায়।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে লিআন করায় এবং তার গর্ভের সন্তানকে অস্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন এবং সন্তানটি উক্ত নারীর সাথে যুক্ত করেন। সহিহ বুখারী ৪৭৪৮, ৫৩০৬, ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩১৩, ৫৩১৪, ৫৩১৫, ৫৩৪৯, ৬৭৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪৯৩, ১৪৯৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৯ সুনানে তিরমিযী : ১২০৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৭৩, ৩৪৭৪, ৩৪৭৫, ৩৪৭৬, ৩৪৭৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৮, ২২৫৯, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে দেখতে পায় এবং সে যদি তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? তবে সে (স্বামী) কি করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম।

অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪২৩, ৪৭৪৫, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৪০২, দারিমী : ২২৭৫।

আবু ইসহাক আশ-শিরাজি বলেছেন-

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তাহলে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। এর ফলে সন্তানের বংশপরিচয় তার মায়ের দিক থেকেই নির্ধারিত হয়। আল-মুহাজ্জাব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৫৫

৪. লি‘আনকারিণীর মোহর ফেরত দিতে হবে না

সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমারকে জিজ্ঞেস করলাম, এক লোক তার স্ত্রীকে অপবাদ দিল (বিধান কী?), তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ ’আজলানের স্বামী-স্ত্রীর দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা’আলা জানেন তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাচারী। কাজেই তোমাদের কেউ তওবা করতে রাযী আছ কি? তারা দু’জনেই অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী, সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল।

এরপর তিনি তাদেরকে পৃথক করে দেন। আইয়ুব বলেন, আমাকে আমর ইবনু দ্বীনার (রহ.) বললেন, এ হাদীসে আরও কিছু কথা আছে, তোমাকে তা বর্ণনা করতে দেখছি না কেন? তিনি বলেন, লোকটি বলল, আমার (দেয়া) মালের কী হবে? তাকে বলা হল, তোমার মাল ফিরে পাবে না। যদি তুমি সত্যবাদী হও, (তবুও পাবে না)। (কেননা) তুমি তার সঙ্গে সহবাস করেছ। আর যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে তা পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার। সহিহ বুখারি : ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩৪৯, ৫৩৫০, সহহি মুসলিম : ১৪৯৩, মিশকাত : ৩৩০৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৫৭, সুনানে  নাসায়ী : ৩৪৭৬, আহমাদ : ৪৫৮৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪২৮৭।

৫. স্ত্রীক অন্য পুরুষের সাথে দেখলে হত্যা করা যাবে না

মুগীরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) বললেন, আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে যদি দেখি, তাকে সরাসরি তরবারি দিয়ে হত্যা করব। এ কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা কি সাদের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ! আমি তার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আর আল্লাহ্ আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ্ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হবার কারণে প্রকাশ্য ও গোপনীয় (যাবতীয়) অশ্লীলতাকে হারাম করে দিয়েছেন। অক্ষমতা প্রকাশকে আল্লাহর চেয়ে অধিক পছন্দ করেন এমন কেউই নেই। আর এজন্য তিনি ভীতি প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতাদেরকে পাঠিয়েছেন। আত্মপ্রশংসা আল্লাহর চেয়ে অধিক কারো কাছে প্রিয় নয়। তাই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৬৮৪৬, ৭৪১৬, সহিহ  মুসলিম : ১৪৯৯, মিশকাত : ৩৩০৯, আহমাদ : ১৮১৬৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৭৭৩

৬. সন্দেহের কারনে সন্তানের পিতৃপরিচয় অস্বীকরা করা যাবে না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান জন্ম দিয়েছে। আর আমি তাকে (আমার সন্তান হিসাবে) অস্বীকার করছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি উট আছে? সে বলল, হ্যাঁ আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,সেগুলোর কী রঙ? সে বলল, লাল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলোর মাঝে সাদা কালো মিশ্রিত রঙের কোন উট আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ, সাদা কালো মোশানো রঙের অনেকগুলো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ রং কিভাবে এল বলে তুমি মনে কর? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বংশ সূত্রের প্রভাবে এমন হয়েছে। তিনি বললেনঃ সম্ভবত তোমার সন্তানও বংশ সূত্রের প্রভাবে (পূর্বপুরুষের কেউ কালো ছিল বলে) এমন হয়েছে। এবং তিনি এ সন্তানটিকে অস্বীকার করার অনুমতি লোকটিকে দিলেন না। সহিহ বুখারি : ৫৩০৫, ৭৩১৪, মুসলিম ১৫০০, আবূ দাঊদ ২২৬২, নাসায়ী ৩৪৭৮, তিরমিযী ২১২৮, ইবনু মাজাহ ২০০২, আহমাদ ৭২৬৪

লি’আনের বিধানটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মিথ্যা অভিযোগের হাত থেকে স্ত্রীকে সুরক্ষা দেয় এবং একই সাথে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করে। এটি একটি গুরুতর পদক্ষেপ, যা কেবল চরম পরিস্থিতিতেই শরঈ বিচারকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।

ঈলার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামী শরীয়তে ঈলা (الإيلاء) একটি বিশেষ পরিভাষা, যা আরবি আল্‌ই (أَلْي) শব্দ থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ শপথ করা। মহাগ্রন্থ কুরআনে (یُؤۡلُوۡنَ) ইউলুনা হিসেবে এসেছে। যার অর্থ শপথ (সম্পর্ক না রাখার) করে।

শরীয়তের পরিভাষায়, ঈলা হলো এমন একটি শপথ, যেখানে কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে চার মাস বা তার বেশি সময় ধরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করার প্রতিজ্ঞা করে। এই ধরনের শপথের ক্ষেত্রে, স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে তার স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে এবং শপথ ভঙ্গ করে, তাহলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকবে। তবে শপথ ভঙ্গের জন্য তাকে কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) দিতে হবে। যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তাহলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে তালাক হয়ে যাবে। অবশ্য কোন কোন মুজতাহিদ আলেম তালাক না হওয়ার পক্ষেও মতামত দিয়েছেন।

উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কতক স্ত্রীর সংস্পর্শে না আসার জন্য এক মাসের ঈলা করেছিলেন। উনতিরিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিকালে অথবা সকালে তিনি (স্ত্রীদের নিকট) আসেন। বলা হলো, হে আল্লাহ্‌র রসূল! ঊনতিরিশ দিন তো অতিবাহিত হয়েছে? তিনি বললেন, মাস ঊনতিরিশ দিনেও হয়। সহীহুল বুখারী ১৯১০, সহিহ মুসলিম : ১০৮৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬১, আহমাদ : ২৬১৪৩

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্মে শপথ করেন, একমাস যাবত তার স্ত্রীদের সংস্পর্শে যাবেন না। তিনি একাধারে উনত্রিশ দিন এভাবে কাটিয়ে দিলেন। অবশেষে তিরিশ দিনের সন্ধ্যা হলে তিনি আমার নিকট আসেন। আমি বললাম, আপনি তো শপথ করেছিলেন যে, আপনি একমাস আমাদের সংস্পর্শে আসবেন না। তিনি বলেন, মাস এভাবেও হয়। তিনি তাঁর দু’হাতের আঙ্গুলসমূহ তিনবার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখে ইশারায় বলেন, মাস এভাবেও হয়, তিনি পুনরায় (দু’বার পূর্বোক্ত নিয়মে দেখান) কিন্তু তিনি তৃতীয় বারে তিনি একটি আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ রাখেন (অর্থাৎ মাস উনতিরিশ দিনেও হয়)। সহিহ বুখারি : ৫২৬৯, ৫২৯৯, ১৯১১, সহিহ মুসলিম : ১৪৫৬ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৯,  আহমাদ : ২৩৫৩০, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে নেওয়া হয়েছে।

ঈলার বিধান

স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে ঈলা (অর্থাৎ, সহবাস না করার শপথ) করে, তবে স্ত্রীকে চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়কালে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার বা শপথ ভাঙার জন্য অপেক্ষা করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২২৬

এই আয়াতে মূলত ‘ঈলা’র বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। ‘ঈলা’ হলো এমন একটি শপথ, যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে না বলে কসম খায়। জাহিলিয়াতের যুগে এমন শপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য করা হতো, যার ফলে স্ত্রীরা এক প্রকার অনিশ্চিত ও কষ্টকর অবস্থায় জীবনযাপন করত। ইসলাম এই প্রথার অবসান ঘটিয়ে এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

১. ঈলার সময়সীমা:

আল্লাহ তা’আলা এমন শপথের জন্য চার মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করে, তবে এই শপথ সর্বোচ্চ চার মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীর অধিকার খর্ব করা হয় না, বরং তাকে এই সময়ের মধ্যে ফিরে আসার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

২. চার মাসের মধ্যে ফিরে আসা

চার মাসের সময়সীমার মধ্যে যদি স্বামী তার শপথ থেকে ফিরে আসে, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারণ এই ধরনের শপথ একটি অন্যায় কাজ এবং এর থেকে ফিরে আসাই সঠিক কাজ। যদি কোনো স্বামী চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তার শপথ ভঙ্গ

জকরে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে শপথ ভাঙার জন্য তাকে কাফফারা দিতে হবে। কসমের কাফফারা সম্পর্কে ইসলামি শরীয়তেন স্পষ্ট বিধান আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَا یُؤَاخِذُکُمُ اللّٰہُ بِاللَّغۡوِ فِیۡۤ اَیۡمَانِکُمۡ وَلٰکِنۡ یُّؤَاخِذُکُمۡ بِمَا عَقَّدۡتُّمُ الۡاَیۡمَانَ ۚ فَکَفَّارَتُہٗۤ اِطۡعَامُ عَشَرَۃِ مَسٰکِیۡنَ مِنۡ اَوۡسَطِ مَا تُطۡعِمُوۡنَ اَہۡلِیۡکُمۡ اَوۡ کِسۡوَتُہُمۡ اَوۡ تَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ ؕ فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ ؕ ذٰلِکَ کَفَّارَۃُ اَیۡمَانِکُمۡ اِذَا حَلَفۡتُمۡ ؕ وَاحۡفَظُوۡۤا اَیۡمَانَکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ

আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হল দশ জন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সিয়াম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফ্ফারা, যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসম হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।

সুরা মায়েদা : ৮৯

৩. শপথের সীমা চার মাস অতিক্রম করলে

যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী তার শপথ না ভাঙে, তবে স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারেন। হাদিসে বর্ণিত সাহাবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিচারক তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলবেন:

ক. শপথ ভেঙে স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন পুনরায় শুরু করা।

খ. স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

৪. ঈলা চার মাস পূর্ণ হলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে?

যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে বা শপথ ভঙ্গ না করে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যাবে কি না, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ক. হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব:

এই তিনটি মাযহাব অনুযায়ী, চার মাস পূর্ণ হওয়ার পর যদি স্বামী স্ত্রীর কাছে ফিরে না আসে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি তালাকে বায়েন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক) পতিত হয়। এই তালাকের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

হানাফি মাযহাব :

আল-জাসসাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ আহকামুল কুরআন-এ বলেছেন, “যদি চার মাস অতিবাহিত হয় এবং সে ফিরে না আসে, তবে তালাক হয়ে যাবে।” আহকামুল কুরআন, প্রথম খণ্ড,পৃ. ৩৫৫-৩৫৬

মালিকি মাযহাব :

ইমাম মালিক তার আল-মুয়াত্তা-এ বলেছেন, “যদি চার মাস পূর্ণ হয় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তবে তা তালাক।” ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আল-মুয়াত্তা, তালাক অধ্যায় হাদিস : ১১৭২

হাম্বলি মাযহাব :

ইবনে কুদামা তার আল-মুগনি-তে উল্লেখ করেছেন, “ঈলাকারী যদি চার মাস পার হওয়ার পরও ফিরে না আসে, তাহলে তালাক পতিত হবে।” ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ.-১৮৮-১৯১

খ. শাফেয়ি মাযহাব:

শাফেয়ি মাযহাবের মতে, চার মাস পার হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয় না। বরং স্ত্রী চাইলে বিচারকের কাছে অভিযোগ করবে এবং বিচারক তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দেবেন। যদি সে ফিরে না আসে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।

ইমাম শাফেয়ি তার কিতাবুল উম্ম-এ এই মত তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি বলেন, “চার মাস পূর্ণ হলে বিচারক তাকে (স্বামী) ডেকে বলবেন, হয় ফিরে আসো, অথবা তালাক দাও। যদি সে কোনোটিই না করে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।” ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.- ১৫২-১৫৪

এই মতভেদের মূল কারণ হলো সূরা বাকারার ২২৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, যেখানে বলা হয়েছে, “আর যদি তারা তালাকের সংকল্প করে, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

 শাফেয়ি মাযহাবের আলেমরা মনে করেন, ‘সংকল্প’ কথাটি তালাকের জন্য ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যা আদালতের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কার্যকর হয়।

ইদ্দতের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইদ্দত’ (عدة) হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়, যা কোনো নারী তার স্বামী থেকে তালাক বা মৃত্যু পর পালন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো নারীর গর্ভাশয়ের পবিত্রতা নিশ্চিত করা, যাতে তার বংশপরিচয় নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।

ইদ্দত হলো এমন একটি সময়সীমা, যা তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পালন করতে হয়। ইদ্দতের মাধ্যমে ইসলাম নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে, পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এবং বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ইদ্দতেত প্রধান প্রধান উপকারি দিক হলো—

১. ইদ্দত নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে

মানসিক প্রশান্তি : তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীদের জন্য ইদ্দত একটি মানসিক প্রশান্তির সুযোগ দেয়। এই সময়টুকুতে তারা শোক কাটাতে পারে এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে। জোর করে দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়ানো থেকে এটি নারীকে রক্ষা করে।

ভরণপোষণ : তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার স্বামীর ঘরেই থাকবে এবং তার ভরণপোষণ স্বামীকেই বহন করতে হবে। এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কারণ এই সময়ে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং জীবিকা অর্জনের জন্য প্রস্তুত নয়।

শোভনতা ও সম্মান : বিধবা নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা তার স্বামীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায়। এটি সমাজে তাকে একটি সম্মানজনক অবস্থান দেয় এবং তার দুঃখের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে।

২. পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে

সমঝোতার সুযোগ : তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতকাল সাধারণত তিন মাসিক। এই সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার সুযোগ পায়। যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে আবার সম্পর্ক ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা সহজেই করতে পারে। এটি অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সংসারকে নতুন করে জোড়া লাগাতে সাহায্য করে।

নতুন সম্পর্কের প্রস্তুতি : ইদ্দত শেষ হওয়ার পর নারী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এটি সমাজে এক ধরনের শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। নতুন সম্পর্কের আগে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা নারী ও তার সম্ভাব্য নতুন পরিবারের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

৩. বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে

গর্ভধারণ নিশ্চিত করা: ইদ্দতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নিশ্চিত করে যে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী গর্ভবতী কি না। যদি কোনো নারীর গর্ভে তার প্রাক্তন স্বামীর সন্তান থাকে, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে সে অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারে না।

ইদ্দতের কারণে বংশের পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। যদি নারীটি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই নতুন বিবাহ করে এবং গর্ভবতী হয়, তাহলে কার সন্তান তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইদ্দত এই ধরনের জটিলতা দূর করে এবং সন্তানের পিতৃত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এটি সন্তানের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে।

সুতরাং, ইদ্দতকে শুধু একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে, এটি নারী, পরিবার এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এটি ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।

ইদ্দত পালনের বিধান

ইদ্দত পালন করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব, যদি তার মাসিক হয়। যাদের মাসিক হয় না, তাদের জন্য এই সময়কাল তিন মাস। গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। অন্যদিকে, স্বামীর মৃত্যুর পর কোনো নারীর জন্য ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। তবে, যদি তিনি গর্ভবতী হন, তবে তার ইদ্দতকালও সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইদ্দতের এই সময়কালে নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না। ইদ্দতের সময়কাল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়। নিচে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো–

১. তালাকের ইদ্দত

তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল নির্ভর করে নারীর শারীরিক অবস্থার উপর।

ক. মাসিক হয় এমন নারীর জন্য :

তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব। এই সময়ের মধ্যে যদি তার তিনবার মাসিক হয়, তাহলে তার ইদ্দত পূর্ণ হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ 

এবং তালাক প্রাপ্তাগণ তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। সুরা বাকারা : ২২৮

খ. মাসিক হয় না এমন নারীর জন্য :

যে সকল নারীর মাসিক হয় না (বয়সের কারণে বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে), তাদের জন্য ইদ্দত হলো তিন মাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  وَالّٰٓیِٴۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓیِٴۡ لَمۡ یَحِضۡنَ ؕ

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। সুরা তালাক : ৪

গ. গর্ভবতী নারীর জন্য :

গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের পর পরই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, এমনকি যদি তা তালাকের এক মুহূর্ত পরেই হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

 আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪

২. স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত

যদি কোনো নারীর স্বামী মারা যায়, তবে তার ইদ্দতকাল হলো:

ক. সাধারণ নারীর জন্য :

স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। এই সময়কালে তাকে শোক পালন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَیَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّعَشۡرًا ۚ فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا فَعَلۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদেরকে রেখে যাবে, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর যখন তারা ইদ্দতকাল পূর্ণ করবে, তখন তারা নিজদের ব্যাপারে বিধি মোতাবেক যা করবে, সে ব্যাপারে তোমাদের কোন পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক অবগত। সূরা বাকারা : ২৩৪

যায়নাব বিনতু আবূ সালামা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী হাবীবাহ (রাযিঃ) এর কাছে তার পিতা আবূ সুফইয়ানের ইনতিকালের খবর পৌঁছল তখন তৃতীয় দিনে তিনি হলুদ বর্ণের সুগন্ধি চেয়ে পাঠালেন এবং তার দু’হাতে গায়ে ভাল করে তা মেখে নিলেন। আর বললেন, আমার এর কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, যে মহিলা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তার পক্ষে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা হালাল নয়। তবে স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। কেননা সে তার স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশদিন শোক পালন করবে। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৬, সুনানে আবু দাউদ : ২৩১৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৭, আহমাদ : ২৬৭৫৪, সহীহ আত্ তারগীব : ৩৫৩৭।

খ. গর্ভবতী নারীর জন্য:

যদি কোনো নারী তার স্বামীর মৃত্যুর সময় গর্ভবতী থাকে, তাহলে তার ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত, ঠিক তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর মতোই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪

মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সুবায়’আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে।সহিহ বুখারি : ৫৩২০, মিশকাত : ৩৩২৮, সুনানে নাসায়ী : ৩৫০৬

আবূ সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এলেন এবং বললেন, এক মহিলা তাঁর স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর বাচ্চা প্রসব করেছে। সে এখন কীভাবে ইদ্দত পালন করবে, এ বিষয়ে আমাকে ফতোয়া দিন। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বললেন, ইদ্দত সম্পর্কিত হুকুম্ দু’টির যেটি দীর্ঘ, তাকে সেটি পালন করতে হবে। আবূ সালামাহ (রহ.) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর হুকুম তো হলঃ গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র অর্থাৎ আবূ সালামাহর সঙ্গে আছি। তখন ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) তাঁর ক্রীতদাস কুরায়বকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর কাছে পাঠালেন। তিনি বললেন, সুবায়’আ আসলামিয়া (রাঃ)-এর স্বামীকে হত্যা করা হল, তিনি তখন গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করলেন। এরপরই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। যারা তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবুস্ সানাবিল তাদের মধ্যে একজন। সহিহ বুখারি : ৪৯০৯, ৫৩১৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪

নোট : ইদ্দত পালন করা আল্লাহর স্পষ্ট হুকুম, তাই এটি প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। এক কথায় বলেতে গেলে -তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দত ৩ হায়েজ/৩ মাস। স্বামী মারা গেলে ইদ্দত ৪ মাস ১০ দিন কিন্তু গর্ভবতী হলে ইদ্দত সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত।

ইদ্দত পালনের সময় করণীয়

ইদ্দত পালনকারী নারীকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়:

১. বাড়িতে অবস্থান:

ইদ্দতকালীন সময়ে নারীকে তার স্বামীর বাড়ি বা যেখানে বিচ্ছেদ হয়েছে, সেখানেই অবস্থান করতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

২০৩১। ফুরাইআ বিনতে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার স্বামী তার (পলাতক) গোলামের খোঁজে রওয়ানা হয়ে কাদূম নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলেন। তারা আমার স্বামীকে হত্যা করে। যখন আমার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমি আমার পরিবার-পরিজন থেকে অনেক দূরে আনসারদের বসতিতে অবস্থান করছিলাম। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যখন আমার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এলো তখন আমি আমার পরিজন ও ভাইদের বাড়ি থেকে দূরে বসবাস করছিলাম। তিনি আমার ভরণপোষণের জন্য কোন মাল রেখে যাননি এবং তার এমন কোন মালও নেই, আমি যার ওয়ারিস হতে পারি, এমনকি তার মালিকানাভুক্ত কোন ঘরও নাই। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি আমার পরিবার ও ভাইদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি। আর এটা আমার জন্য অধিক প্রিয় এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে সুবিধাজনকও। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি চাইলে তা করতে পারো। মহিলাটি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে আমার জন্য আল্লাহর এই ফায়সালা শুনে খুশি মনে ফিরে যেতে লাগলাম।আমি মসজিদে অথবা তাঁর কোন এক হুজরার নিকটে পৌঁছতেই, তিনি আমাকে ডেকে বলেন, তুমি জানি কী বলেছিলে? মহিলাটি বললো, আমি পুনরায় তাকে আমার বিবরণ শুনালাম। তিনি বলেনঃ তুমি ঐ ঘরেই অবস্থান করো, যেখানে তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েছো, যতক্ষণ না তোমার ইদ্দাত পূর্ণ হয়। ফুরাইআ (রাঃ) বলেন, এরপর আমি সেখানেই চার মাস দশ দিন ইদ্দাত পালন করলাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৩১, সুনানে তিরমিযী : ১২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৮, ৩৫২৯, ৩৫৩০, ৩৫৩২, সুনানে আবূ দাউদ : ২৩০০, আহমাদ : ২৬৫৪৭, ২৬৮১৭, মুয়াত্তা মালেক : ১২৫৪, দারেমী : ২২৮৭, ইরওয়াহ : ২১৩১।

তবে জরুরি প্রয়োজনে ইদ্দাত পালনকালে দিনের বেলায় ঘরের বাইরে যাওয়া জায়িয। যেমন সহিহ হাদিস এসেছে-

উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মারওয়ানের নিকট প্রবেশ করে তাকে বললাম, আপনার পরিবারের এক মহিলাকে তালাক দেয়া হয়েছে। আমি তার ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম যে, সে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। সে বললো, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) আমাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইদ্দত পালনকালে) স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছেন। মারওয়ান বলেন, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) তাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! ’আয়িশাহ্ (রাঃ) তা আপত্তিকর বলেছেন। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, ফাতেমাহ হিংস্র পশুর উৎপাতের এলাকায় বাস করতেন বলে তার জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। আর এ কারণেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বেলায় এরূপ অনুমতি দিয়েছিলেন। সুনানে [MIH1] ২০৩২

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার খালা ত্বলাক (তালাক) প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি তার (খেজুর বাগানের) খেজুর পাড়ার ইচ্ছা করলেন। এক ব্যক্তি তাকে বাইরে যেতে বাধা দিলেন। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ তুমি তোমার বাগানের খেজুর পাড়ার জন্য বাইরে যেতে পার। কারণ সম্ভবত তা থেকে অন্যদের সাদাকা করবে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৩৪, দারিমী : ২৩৩৪, ইরওয়া : ২১৩৪।

২. সাজসজ্জা ত্যাগ করা :

স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দতের সময় নারীকে কোনো ধরনের সাজসজ্জা, সুগন্ধি, রঙিন পোশাক এবং অলঙ্কার পরিধান থেকে বিরত থাকতে হয়। এটি শোক প্রকাশের অংশ।

যাইনাব (রাঃ) বলেনঃ আমি উম্মু সালামাহকে বলতে শুনেছি: এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে। তার চোখে অসুখ। তার চোখে কি সুরমা লাগাতে পারবে? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ অথবা তিন বার বললেন, না। তিনি আরও বললেনঃ এতো মাত্র চার মাস দশ দিনের ব্যাপার। অথচ জাহিলী যুগে এক মহিলা এক বছরের মাথায় বিষ্ঠা নিক্ষেপ করত। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৬, ৫৩৩৮, ৫৭০৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৩

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণীর স্বামী মারা গেছে, সে (’ইদ্দতকালে লাল বা) হলুদ রংয়ের কাপড় এবং গেরুয়া রঙের কাপড় পরবে না, অলঙ্কার পরবে না, চুলে বা হাতে মেহেদী লাগাবে না এবং চোখে সুরমা লাগাবে না। মিশকাত : ৩৩৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৩০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৫, আহমাদ : ২৬৫৮১, সহীহ আল জামি : ৬৬৭৭।

উম্মু আতিয়্যাহ ( হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মহিলার জন্য স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশী শোক পালন করা হালাল হবে না।। সুরমা ও রঙিন কাপড়ও ব্যবহার করতে পারবে না। তবে সূতাগুলো একত্রে বেঁধে হালকা রং লাগিয়ে তা দিয়ে কাপড় বুনলে তা ব্যবহার করা যাবে। সহিহ বুখারি : ১৩১৩, ৫৩৪২, সহিহ মুসলিম ৯৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ ২৩০২, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৮৭, ইরওয়া : ২০১৪, সহীহ আল জামি : ৭৬৪৯

৩. অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ:

ইদ্দত চলাকালীন সময়ে কোনো নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না।

ইদ্দতের এই বিধানগুলো পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যার মাধ্যমে নারীর মর্যাদা ও বংশের পবিত্রতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিধান। ইসলামে তালাকের পর নারীর ভরণ-পোষণ এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই বিধানগুলো নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

১. ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ:

ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়, যা একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করার আগে অবশ্যই পালন করতে হয়। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে স্বাভাবিক ভরণ-পোষণ প্রদান করা।

১. তালাকে রজঈ (প্রত্যাবর্তনীয় তালাক)

যদি কোনো নারীকে তালাকে রজঈ (অর্থাৎ এক বা দুই তালাক) দেওয়া হয় এবং সে ইদ্দত পালন করে, তবে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্বামী তার ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না, বরং স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তাই, এই সময়ে নারীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা খরচ স্বামীর ওপরই থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ 

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সুরা তালাক : ০৬

আয়াতে গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।

২. তালাকে বায়িন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক)

যদি তালাকপ্রাপ্তা নারী গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার স্বামী তার ভরণ-পোষণের খরচ বহন করতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ  فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ

আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। আর তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পাওনা তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা তালাক : ০৬

আর যদি যদি নারী গর্ভবতী না হয় তবে বায়িন তালাক এর ক্ষেত্রে এই বিধানটি কিছুটা জটিল। বেশিরভাগ ফিকাহবিদ ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের সাধারণ বিধানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিছু ফিকহবিদদের মতে, তালাকে বায়িনের পর নারীকে কেবল বাসস্থান দেওয়া হবে, তবে তার খাদ্য, বস্ত্র বা অন্যান্য খরচ স্বামীর ওপর বর্তায় না। কারণ এই তালাকের মাধ্যমে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের পক্ষের দলিল হলো-

আবূ বকর বিন আবী জাহম বিন সুখাইর আদাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ্ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষের নির্দেশ দেননি। সুনানে ইবনে মাজাহ :২০৩৫, ২০৩৬, সহিহ মুসলিম ১৪৮০, আবী দাউদ : ১৯৭৬-১৯৮০

ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল এমন যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। তিন তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার কারণে তিনি তার স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করবেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে তার স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার অধিকার দেননি।

বিষয়টি ব্যতিক্রমের কারণ- তালাকে বাইন। যদি স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দেন, তাহলে সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবে ও সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই, ইসলামী আইন অনুযায়ী, এই ধরনের তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীর আর স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করার বা খোরপোষ পাওয়ার অধিকার থাকে না।

ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল তিন তালাকের। যেহেতু এটি একটি তালাকে বাইন ছিল, তাই রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার নির্দেশ দেননি। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার স্বামীর থেকে কোনো খোরপোষ বা বাসস্থান পাবেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত : এই হাদীসটি নিয়ে কিছু সাহাবা এবং ফকীহদের মধ্যে ভিন্নমত ছিল। যেমন, উমর (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ) এর মতো কিছু সাহাবা মনে করতেন যে, স্ত্রী রাজঈ তালাকপ্রাপ্তা হোক বা বাইন তালাকপ্রাপ্তা হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তার খোরপোষের অধিকার রয়েছে। তবে, অনেক সাহাবা এবং ফকীহ এই হাদীসটিকে সমর্থন করেছেন এবং তালাকে বাইনের ক্ষেত্রে স্ত্রীর খোরপোষ ও বাসস্থানের অধিকার না থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

২. ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ

ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এই ভরণ-পোষণকে ‘মুতা’আ’ বলা হয়। মুতা’আ হলো এমন একটি উপহার বা আর্থিক সহায়তা, যা স্বামী তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে দেবে, যা তার আর্থিক সামর্থ্য এবং স্ত্রীর সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এটি তালাকের কারণে সৃষ্ট মানসিক ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের একটি রূপ। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَلِلۡمُطَلَّقٰتِ مَتَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ

আর তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য থাকবে বিধি মোতাবেক ভরণ-পোষণ। মুত্তাকীদের উপর আবশ্যক। সূরা বাকারা : ২৪১

/২০৩৭। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। জাওন-কন্যা ’আমরাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পেশ করা হলে সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে (আল্লাহর) আশরয় প্রার্থনা করে। তিনি বলেনঃ তুমি এক মহান সত্তার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করেছো। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিলেন এবং উসামাহ অথবা আনাস (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলে তদনুযায়ী তিনি তাকে (উপঢৌকনস্বরূপ) তিনখানা সাদা লম্বা কাপড় দেন।

সহীহুল বুখারী ৫২৫৪, নাসায়ী ৩৪১৭, বায়হাকী ৭/৩১৮, ইরওয়াহ ৭/১৪৬।

মুতা’আর মূল উদ্দেশ্য হলো তালাকের পর নারীর প্রতি সহানুভূতি ও মানবিকতা প্রদর্শন করা। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে একটি সদয় কাজ, যা তালাকের তিক্ততা কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ

বাংলাদেশের আইনও এই ইসলামী বিধানকে সমর্থন করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, তালাকের পর একজন নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী। এই আইন অনুসারে, ইদ্দতকাল হলো তিন মাস।

২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেয়, যেখানে বলা হয় যে একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ইদ্দতকালের পরেও ভরণ-পোষণ দাবি করতে পারে, যদি সে জীবিকা নির্বাহে অক্ষম হয়। এই রায়টি ইসলামী বিধানের ‘মুতা’আ’র নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং নারীর অধিকার রক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ।

ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ প্রদান করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক। ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ যা ‘মুতা’আ’ নামে পরিচিত। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এটি স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী একটি আর্থিক সহায়তা বা উপহার হিসেবে গণ্য হবে।


 [MIH1]