মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র ও দৃঢ় বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে মানব জীবনে সব সম্পর্ক সবসময় একইভাবে স্থায়ী হয় না। কখনো কখনো দাম্পত্য জীবনে এমন জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, একসাথে বসবাস করা দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ইসলাম সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে তালাকের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তালাক এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হলেও প্রয়োজনে বৈধ। তাই ইসলাম তালাককে সীমাহীন স্বাধীনতা হিসেবে দেয়নি; বরং এর প্রকৃতি, কার্যকারিতা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে স্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করেছে।
প্রকৃতি ও কার্যকারিতার দিক থেকে তালাককে মূলত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে—তালাক-এ-রজয়ি, তালাক-এ-বায়িন এবং তালাক-এ-খুলা। এসব শ্রেণীবিভাগ নির্ধারণ করে দেয় তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কীভাবে থাকবে এবং পুনরায় সংসার করার সুযোগ আছে কি না। অন্যদিকে, তালাক প্রদানের পদ্ধতিগত দিক থেকেও ইসলামে নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। কারণ, তালাক যেন তাৎক্ষণিক রাগ বা আবেগের বশে না হয়, বরং ভেবে-চিন্তে সঠিক নিয়মে সম্পন্ন হয়, সেটিই শরীয়তের উদ্দেশ্য। এ কারণে তালাকের চারটি প্রধান পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে—আহসান, হাসান, বিদআত এবং অশুদ্ধ পদ্ধতিতে তালাক।
এই শ্রেণীবিভাগ ও পদ্ধতিগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলাম তালাককে সহজ-সরলভাবে উৎসাহিত করেনি; বরং দাম্পত্য জীবনের মর্যাদা ও স্থিতি রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কেবল যখন সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখনই সঠিক নিয়মে তালাক দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই তালাকের বিভিন্ন প্রকার ও পদ্ধতি বোঝা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিচে তালারে ভিবিন্ন প্রকারে শ্রেণীতে ভাগ করে প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো:
প্রকৃতি এবং কার্যকারিতার ভিত্তিতে তালাকের শ্রেণীবিভাগ
ইসলামে তালাকের প্রকৃতি ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই শ্রেণীবিভাগ মূলত তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কতটুকু স্থায়ী হয় এবং সেই সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার সুযোগ আছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাক প্রধানত তিন প্রকার। এই শ্রেণীবিভাগগুলো ইসলামের মূলনীতি এবং বিবাহিত জীবনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে এই তিন প্রকার তালাক সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
১. তালাক-এ-রজয়ি
২. তালাক-এ-বায়িন
৩. তালাক-এ-খুলা
১. তালাক-এ-রজয়ি
‘রজয়ি’ (رجعي) শব্দের অর্থ হলো ‘প্রত্যাবর্তনযোগ্য’ বা ‘ফিরিয়ে নেওয়ার যোগ্য’। এটি আরবি ‘রুজু’ (رجوع) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ফিরে আসা’ বা ‘প্রত্যাবর্তন করা’।
তালাক-এ-রজয়ি হলো ইসলামের সবচেয়ে উদার ও মানবিক তালাক পদ্ধতি। যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক দেন, তখন সেই তালাকটি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না, বরং ইদ্দতকাল (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) পর্যন্ত স্থগিত থাকে। এই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয় না। তারা একই বাড়িতে থাকতে পারে এবং স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকেন। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী যেকোনো মুহূর্তে স্ত্রীকে মৌখিকভাবে বা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তালাকটি বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে। এই সুযোগ দেওয়ার কারণ হলো, স্বামী-স্ত্রীকে তাদের ভুল সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একটি সুযোগ দেওয়া।
এটি সুন্নাহসম্মত তালাকের প্রথম ধাপ। ইদ্দতকালে স্বামী স্ত্রীকে মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। ফিরিয়ে নিলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে যদি স্বামী ফিরিয়ে না নেন, তাহলে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাকে বাইনে সগির-এ পরিণত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯
২. তালাকে বায়িন (তালাক-এ-বায়িন)
‘বায়িন’ (بائن) শব্দের অর্থ হলো ‘চূড়ান্ত’, ‘স্পষ্ট’ বা ‘সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন’। এটি আরবি ‘বানা’ (بان) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিচ্ছিন্ন হওয়া’ বা ‘আলাদা হওয়া’।
তালাক-এ-বায়িন এমন এক ধরনের তালাক যা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে যায়। এই তালাক স্বামীর ‘রুজু’ বা স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়। তালাকে বায়িন-এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা ইদ্দতকালীন সময়েও একসাথে থাকতে পারে না। যদি তারা ভবিষ্যতে আবার একসাথে জীবনযাপন করতে চায়, তবে তা শুধুমাত্র নতুন করে কাবিন ও মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহের মাধ্যমেই সম্ভব। এই তালাক সাধারণত তখন ঘটে যখন স্বামী একবারে তিন তালাক দেন (তালাক-এ-বায়েন কুবরা) অথবা যখন ইদ্দতের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন না (তালাক-এ-বায়েন সুগরা), বা খোলা তালাকের মতো পরিস্থিতিতে।
তালাকে বায়িন সাধারণত দুটি কারণে হয়ে থাকে:
১. যখন স্বামী ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেয় এবং ইদ্দত শেষ হয়ে যায়।
২. যখন এক বা একাধিক তালাক প্রদান করা হয়, যা সরাসরি বায়িন তালাক হিসেবে গণ্য হয় (যেমন: খোলা তালাক, লি’আনের কারণে বিচ্ছেদ)।
তালাকে বায়িনের বিধান :
তালাকে বায়িনের বিধানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. তালাকে বায়িন-এ সগির (ছোট তালাক)
এটি এমন তালাক, যা এক বা দুটি তালাকের পর সংঘটিত হয় এবং ইদ্দত শেষ হয়ে যায়। অথবা, এমন তালাক যা সরাসরি বায়িন হিসেবে গণ্য হয় (খোলা বা মুবারাতের তালাক)। এই ধরনের তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় সংসার করতে চায়, তবে তাদেরকে নতুন করে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন মোহর নির্ধারণ এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯
এই ধরনের তালাক সংঘটিত হলে তা বাইনে সগীর হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী চাইলে আবার বিবাহ করতে পারবে।
২. তালাকে বায়িন-এ কবীর (বড় তালাক)
এটি তখনই ঘটে যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়, অথবা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিন তালাক সম্পন্ন করে। এই ধরনের তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। তাদের পুনরায় বিবাহ কেবল তখনই সম্ভব, যখন স্ত্রী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করবে এবং সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করার পর সে মারা যাবে অথবা তাকে তালাক দেবে। এরপর ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামী তাকে আবার বিবাহ করতে পারবে। এই প্রক্রিয়াকে হালালা বলা হয়, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও বিতর্কিত একটি প্রথা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ
অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০
এই আয়াতটি বাইনে কবীরের বিধানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। যেখানে একবার তিন তালাক হলে আর সরাসরি ফিরিয়ে আনা যাবে না।
৩. খোলা তালাক (তালাক-এ-খুলা)
খোলা তালাক বা خلع হলো এমন এক ধরনের বিবাহবিচ্ছেদ, যা স্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত হয় এবং স্বামী তা গ্রহণ করে। এই ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে কিছু আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা (যেমন: মোহরানা ফিরিয়ে দেওয়া) প্রদান করে তার থেকে তালাক গ্রহণ করে। এই তালাক মূলত স্বামীর স্বেচ্ছাচারীতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য স্ত্রীর একটি অধিকার। খোলা তালাক কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন-এর অন্তর্ভুক্ত।
সংজ্ঞা: যে তালাক স্ত্রী তার স্বামীর কাছে মোহরানা বা অন্য কোনো প্রতিদানের বিনিময়ে চেয়ে নেয়, তাকে খোলা তালাক বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭, মিশকাত : ৩২৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬৩, ইরওয়া : ২০৩৬
নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’সফিয়াহ বিনতু আবূ ’উবায়দ’-এর ক্রীতদাসী হতে বর্ণনা করেন, সফিয়া (রাঃ) তাঁর স্বামী (আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রা.) হতে নিজের সমস্ত সহায়-সম্পত্তির বিনিময়ে খুলা’ (তালাক) চান। অথচ আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) এতে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি। মিশকাত : ৩২৯১, মুয়াত্তা মালিক : ১২২
বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চাওয়া হারাম
সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণী বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চায়, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। মিশকাত : ৩২৭৯, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২২৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৫৫, দারিমী : ১৩১৬, আহমাদ : ২২৪৪০, ইরওয়া : ২০৩৫, সহীহ আল জামি : ২৭০৬, সহীহ আত্ তারগীব : ২০১৮
সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ খোলা তালাক দাবিকারিণী নারীরা মুনাফিক। সুনানে তিরমিজি : ১১৮৬, সহীহাহ : ৬৩৩, মিশকাত : ৩২৯০
মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে তালাক চার প্রকারঃ-
মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে তালাক চার প্রকার হতে পারে। নিচে প্রত্যেক প্রকারের বিস্তারিত আলোচনা ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত দলিল দেওয়া হলো।
১. হারাম তালাক
ইসলামে তালাক মূলত একটি অপছন্দনীয় কাজ। কিছু বিশেষ অবস্থায় তালাক দেওয়াকে হারাম হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এই ধরনের তালাক ইসলামের নীতির বিরোধী।
১. ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া।
২. যে পবিত্র অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, সেই অবস্থায় তালাক দেওয়া।
৩. একবারে তিন তালাক দেওয়া। এই পদ্ধতিগুলো শরিয়তের স্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
কুরআনের দলিল: সূরা তালাক, আয়াত ১-এ আল্লাহ বলেন, “তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও।” এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঋতুকালীন অবস্থায় বা সহবাসের পর তালাক দেওয়া এই নির্দেশনার পরিপন্থী।
হাদিসের দলিল: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিসটি এর প্রধান দলিল। তিনি তার স্ত্রীকে ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। নবী (সা.) এই কথা শুনে অসন্তুষ্ট হন এবং তাকে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া হারাম।
২. মাকরুহ তালাক
মাকরুহ তালাক হলো সেই তালাক, যা শরীয়তসম্মত হলেও কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া বা তুচ্ছ কারণে দেওয়া হয়। এই ধরনের তালাক দেওয়া উচিত নয়, যদিও এটি কার্যকর হয়। এটি হারাম নয়, তবে অপছন্দনীয়।
ক. কোনো গুরুতর কারণ ছাড়া, যেমন: তুচ্ছ বিষয়ে মতবিরোধ বা সামান্য মনোমালিন্যের কারণে তালাক দেওয়া।
খ. যখন স্ত্রীর মধ্যে কোনো অনৈতিক বা ধর্মীয় দুর্বলতা নেই, তবুও স্বামী তাকে তালাক দিতে চায়।
হাদিসের দলিল: নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে হালাল কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ হলো তালাক।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, কোনো কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, তাই এটি মাকরুহ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. মুস্তাহাব তালাক
মুস্তাহাব তালাক হলো সেই তালাক, যা কোনো বিশেষ কারণে দেওয়া হলে স্বামী একটি ভালো কাজের সওয়াব পেতে পারেন।
গ. যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলতে পারে না এবং একত্রে থাকলে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
খ. স্ত্রী যদি কোনো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয় এবং এই বিষয়ে স্বামী তাকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হন।
কুরআনের দলিল: সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২৯-এ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “…যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাদের উভয়ের জন্য তাতে কোনো দোষ নেই যে, স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীকে মুক্ত করে নেবে।” এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে এবং আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করার আশঙ্কা থাকলে তালাক দেওয়া মুস্তাহাব হতে পারে।
৪. ওয়াজিব তালাক
ওয়াজিব তালাক হলো সেই তালাক, যা দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক বা অবশ্যকরণীয় হয়ে যায়।
যদি স্বামী তার স্ত্রীকে ‘ঈলা’ করে অর্থাৎ চার মাসের জন্য তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার শপথ করে। যদি চার মাসের মধ্যে সে এই শপথ থেকে ফিরে না আসে, তবে আদালতের নির্দেশে তালাক দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যদি আদালতের নির্দেশে কোনো কারণে তালাক দেওয়ার আদেশ হয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা বাক্বারাহ : ২২৬
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, যদি স্বামী চার মাসের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে আদালতের নির্দেশে তালাক দেওয়া হয়, যা ওয়াজিব।
পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাকের প্রকারভেদ
ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন হলেও, কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে, চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে তালাকের অনুমতি রয়েছে। তবে, এই তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলামে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। এই পদ্ধতিগুলো তালাকের সিদ্ধান্তকে তাড়াহুড়ো থেকে রক্ষা করে, সম্পর্কের তিক্ততা কমিয়ে আনে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়কে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ দেয়। এই নিয়মগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক একটি অপছন্দনীয় কাজ, যা কেবল তখনই প্রয়োগ করা উচিত যখন সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাক চার প্রকার। যথা-
১. তালাকে আহসান (আহসান বা সর্বোত্তম তালাক)
২. তালাকে হাসান (হাসান বা উত্তম তালাক)
৩. তালাকে বিদআত (বিদআতি বা নব আবিস্কৃত তালাক)
৪. অশুদ্ধ পদ্ধতিতে তালাক
তালাকে আহসান (সর্বোত্তম তালাক)
তালাকে আহসান হলো তালাকের সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তালাক দিলে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সর্বোচ্চ সুযোগ থাকে।
তালাকে আহসানের পদ্ধতি :
সুন্নাতী তালাক হলো তালাক প্রদানের এমন একটি পদ্ধতি যা ইসলামের বিধান অনুযায়ী উত্তম এবং অনুমোদিত। এই পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে এসেছে। প্রথমে কুরআনের তিনটি আয়াত লক্ষ করি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا
হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ
অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০
আল্লাহ তা’আলার উপরোক্ত তিনটি আয়াতের আলোকে তালাকের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। ইসলামে তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপছন্দনীয় বিষয়, যা শুধুমাত্র চরম প্রয়োজনের মুহূর্তে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হয়। কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী তালাকের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তালাকের পর সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগ থাকে এবং উভয় পক্ষের অধিকার নিশ্চিত হয়।
প্রথম ধাপ : এক তালাক প্রদান (তালাক-এ-আহসান)
প্রথমত, তালাক দিতে হবে ইদ্দতের সময়কাল বিবেচনায় রেখে। সূরা তালাকের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে।” এর অর্থ হলো, স্বামী তার স্ত্রীকে এমন অবস্থায় তালাক দেবেন যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়েছেন এবং ঐ পবিত্র অবস্থায় তাদের মধ্যে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। এই অবস্থাকে ‘তুহর’ বলা হয়। এই সময়ে স্বামী তার স্ত্রীকে শুধুমাত্র একটি তালাক (যেমন- “আমি তোমাকে তালাক দিলাম”) প্রদান করবেন। এই তালাকের পর স্ত্রী তার ইদ্দতকাল (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) পালন করবেন। এই সময়ে তারা একই বাড়িতে বসবাস করতে পারেন, তবে স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ করবেন না। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী যেকোনো মুহূর্তে চাইলে তার স্ত্রীকে মৌখিকভাবে অথবা দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদি ইদ্দত শেষে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়।
দ্বিতীয় ধাপ: ইদ্দতকালে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন
প্রথম তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতকালীন সময়ের মধ্যে স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। যদি স্বামী মনে করেন যে, তারা পুনরায় আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলতে পারবেন, তাহলে তিনি মৌখিক বা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনকে বলা হয় ‘রুজু’। যদি ইদ্দতের মধ্যে রুজু করা হয়, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। যদি ইদ্দত শেষেও স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে এবং এটি তালাকে বায়িন সগির হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ ঐ স্বামী তালাক দেওয়া স্ত্রীকে পুণরায় বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে পারবে।
আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
فِي طَلَاقِ السُّنَّةِ يُطَلِّقُهَا عِنْدَ كُلِّ طُهْرٍ تَطْلِيقَةً فَإِذَا طَهُرَتْ الثَّالِثَةَ طَلَّقَهَا وَعَلَيْهَا بَعْدَ ذَلِكَ حَيْضَةٌ.
তালাক-ই-সুন্নাহতে হলো- সে (স্বামী) তাকে (স্ত্রীকে) প্রতিটি পবিত্রতার সময় (ঋতুস্রাব শেষে) একটি করে তালাক দেবে। যখন সে তৃতীয়বার পবিত্র হবে, তখন তাকে তালাক দেবে এবং এরপর সে এক হায়েজ কাল ইদ্দাত পালন করবে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০২১, ২০২০, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৯৪, ৩৩৯৫
রুকানাহ্ ইবনু ’আব্দ ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি স্বীয় স্ত্রী সুহায়মাহ্-কে নিশ্চিত তালাক দিলেন। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি অবহিত করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এক তালাকের নিয়্যাত করেছি, অন্য কিছু নয়। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি কি এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করনি? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করিনি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, রুকানাহ্ তার স্ত্রীকে উমার (রাঃ)-এর যুগে দ্বিতীয় এবং উসমান (রাঃ)-এর যুগে তৃতীয় তালাক দেন। মিশকাত : ৩২৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২০৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৫১, দারিমী : ২২৭৭
সুন্নানি তালাকের বৈশিষ্ট্য :
১. মাসিক ঋতুস্রাব শেষ হওয়ার পর পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া।
২. পবিত্র অবস্থায় শুধুমাত্র একটি তালাক উচ্চারণ করা।
৩. এক সাথে তিন তালাক না দেওয়া।
৪. শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকবে।
৫. ইদ্দতকাল গণনা করে এক বা দুই তালাক দেয়া, তৃতীয় তালাক না দেওয়া।
৬. পুনর্বিবেচনা ও সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে।
তালাকে হাসান (উত্তম তালাক)
তালাকে হাসান হলো তালাকের এমন একটি পদ্ধতি, যা তালাকে আহসানের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, তবে এটিও শরীয়তসম্মত। তালাকের উত্তম পদ্ধতি হিসেবে তালাকে হাসান-এর মূল উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীকে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিটি ধাপে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ রাখা। এটি কোনো তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়া।
তালাক-এ-হাসান পদ্ধতিটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিটি ধাপেই পবিত্রতা ও ধৈর্যের শর্ত রয়েছে।
প্রথম তালাক: এই পদ্ধতির শুরু হয় যখন স্বামী তার স্ত্রীকে প্রথমবার তালাক দেন। এই তালাক অবশ্যই এমন সময় দিতে হবে, যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র অবস্থায় রয়েছেন এবং ওই পবিত্র অবস্থায় তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এই প্রথম তালাকের পর স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবেন না, বরং তারা ইদ্দতকাল (প্রথম মাসিক চক্র শেষ হওয়া) পর্যন্ত আলাদা থাকবেন।
দ্বিতীয় তালাক: প্রথম ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ স্ত্রীর দ্বিতীয়বারের মতো পবিত্র অবস্থায় আসার পর, স্বামী তাকে দ্বিতীয়বার তালাক দেবেন। এই সময়েও তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। এই দ্বিতীয় তালাকের পরও তারা ইদ্দতকাল (দ্বিতীয় মাসিক চক্র শেষ হওয়া) পর্যন্ত আলাদা থাকবেন।
তৃতীয় তালাক : একইভাবে, তৃতীয়বারের পবিত্র অবস্থায় স্বামী তার স্ত্রীকে তৃতীয় ও চূড়ান্ত তালাক দেবেন।
এই তিনটি তালাক পৃথক পৃথক পবিত্র অবস্থায় দেওয়া হয়। যদি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের পর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু যদি স্বামী তিনবার তালাক দেন, তাহলে বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন কুবরা হিসেবে গণ্য হয়। এই ক্ষেত্রে, স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করতে হলে হিলা নামক জটিল প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে হয়।
এই পদ্ধতিটি কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলে, যা ধীরে ধীরে তালাক দেওয়ার কথা বলে এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি ধাপে সুযোগ দেয়। সূরা বাক্বারাহর ২:২২৯-২৩০ আয়াতে পর্যায়ক্রমে দুই তালাক এবং এরপর তৃতীয় তালাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি।
সারকথা : স্বামী পবিত্র অবস্থায় এবং কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে একবার তালাক দেবেন। ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকবেন এবং স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবেন না। এরপর পরবর্তী পবিত্র অবস্থায় এবং কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে স্বামী দ্বিতীয়বার তালাক দেবেন। একইভাবে তৃতীয়বারের পবিত্র অবস্থায়ও স্বামী তৃতীয়বার তালাক দেবেন। এভাবে তিনবার তালাক দেওয়া হলে বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন কুবরা হিসেবে গণ্য হয়। এ পদ্ধতির দলিল উপরে বর্ণনা করা হয়ছে। সুরা বাকারা : ২২৯-২৩০, সুরা তালাক : ০১।