Category Archives: হজ

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : দ্বিতীয় কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : দ্বিতীয় কিস্তি

হিজর বা হাতীম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হিজর বা হাতীম হচ্ছে, কাবার উত্তরদিকে অবস্থিত অর্ধেক বৃত্তাকার অংশ যার পরিমান প্রায় পাঁচ হাত। মক্কার কুরাইশগন কাবা নির্মাণের সময় অর্থাভাবের কারনে সম্পূর্ণ কাবা  নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়। এই অংশটুকু তারা ছেড়ে যায়। কাজেই কাবার উত্তর পার্শ্বের অর্ধ-বৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থান যা পূর্বে কাবাঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান ছাদহীন ফাঁকা পড়ে আছে তাই হাতীম বা হিজর নামে পরিচিত। হাতীম শব্দের অর্থ ভগ্নাংশ আর হিজর’ শব্দের অর্থ ‘পরিত্যক্ত’ তবে হিজরের অর্থ পাথর স্থাপন করা হয়ে থাকে। যাহোক বর্তমান কাবার যে ভিত্তি আমরা দেখছি তা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভিত্তির ওপর নির্মাণ হয় নাই। হাতীম বা হিজর ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভিত্তিতে কাবার ভীতরে ছিল। তাই যে এই স্থানে প্রবেশ করবে ও সালাত আদায় করবে তার জন্য কারায় প্রবেশ ও সালাত আদয়ে বলে বিবেচিত হবে।

কুরাইশগন অর্থাভাবের কারনে হাতীমের অংশ বাদ দেয়ঃ

১। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করলাম, (হাতীমের) দেয়াল কি বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত, তিনি বললেনঃ হাঁ। আমি বললাম, তাহলে তারা বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করল না কেন? তিনি বললেনঃ তোমার গোত্রের (অর্থাৎ কুরাইশের কাবা নির্মাণের) সময় অর্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। আমি বললাম, কাবার দরজা এত উঁচু হওয়ার কারণ কি? তিনি বললেনঃ তোমার কওম তা এ জন্য করেছে যে, তারা যাকে ইচ্ছা তাকে ঢুকতে দিবে এবং যাকে ইচ্ছা নিষেধ করবে। যদি তোমার কওমের যুগ জাহিলিয়্যাতের নিকটবর্তী না হত এবং আশঙ্কা না হত যে, তারা একে ভাল মনে করবে না, তা হলে আমি দেয়ালকে বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম এবং তার দরজা ভূমি বরাবর করে দিতাম। (সহিহ বুখারি ১৪৮৯ ইফাঃ)

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা ছিল হাতীমকে কাবার অন্তর্ভুক্ত করাঃ

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ তুমি কি জানো না! তোমার সম্প্রদায় যখন কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণ করেছিল তখন ইব্‌রাহীম (আঃ) কর্তৃক কাবাঘরের মূল ভিত্তি থেকে তা সংকুচিত করেছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি একে ইবরাহীমী ভিত্তির উপর পুনঃস্থাপন করবেন না? তিনি বললেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায়ের যুগ কুফরীর নিকটবর্তী না হত তা হলে অবশ্য আমি তা করতাম। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন, যদি ‘আয়িশা (রাঃ) নিশ্চিতরূপে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় যে, বায়তুল্লাহ হাতীমের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ইবরাহিমী ভিত্তির উপর নির্মিত না হওয়ার কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তওয়াফের সময়) হাতীম সংলগ্ন দু‘টি কোণ স্পর্শ করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৪৮৮ ইফাঃ)

২। ইবন জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ‘আয়শা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ যদি কুফরের সাথে মানুষের যুগ নিকটবর্তী না হতো, আর আমার কাছে এমন সম্পদও নেই যা আমাকে শক্তি যোগায়, (আর তা যদি থাকতো,) তাহলে আমি হিজরের ২ আরও পাঁচ হাত এতে মিলাতাম এবং এর একটি দরজা রাখতাম, যা দিয়ে লোক প্রবেশ করতো। আর একটি দরজা রাখতাম, যা দিয়ে লোক বের হতো। (সুনানে নাসাঈ ২৯১৩)

হিজর কাবারই অংশঃ

১। আবদুল হামিদ ইবন জুবায়র (রহঃ) তার ফুফু সফিয়া বিনত শায়বা সূত্রে বলেছেন, আমাদের কাছ আয়েশা (রাঃ) বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি কা’বায় প্রবেশ করবো না? তিনি ইরশাদ করলেন, তুমি হিজারে প্রবেশ কর। কেননা, তা কাবারই অংশ। (সুনানে নাসঈ ২৯১৪)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার ইচ্ছা হতো কাবায় প্রবেশ করে তাতে সালাত আদায় করতে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে হিজরে প্রবেশ করিয়ে বললেনঃ যখন তুমি কাবায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করেছ, তখন এখানে সালাত আদায় কর, কেননা এটি কাবারই এক অংশ। কিন্তু তোমার গোত্র যখন একে নির্মাণ করে, তখন তাকে সংক্ষিপ্ত করেন।(সুনানে (সুনানে নাসঈ ২৯১৪৫, সুনানে তিরমিজি ৮৭৬)

৩। অন্য এক বর্ণনায় আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! কাবা ঘরে প্রবেশ করব না কি?’ তিনি বললেন, “তুমি হিজরে প্রবেশ কর। তা কাবা ঘরেরই অংশ।” (নাসাঈ ২৯১৪)

হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবেঃ

সহিহ হাদিসের আলোকে জানতে পারছি যে, হাতিম বা হিজর কাবারই অংশ। আমাদের জানা আছে, তাওয়াফ করতে হয় কাবার চার পাশে। কাবার ভিতর দিয়ে তাওয়াফ হবে না। কাজেই কাবা ঘরের তাওয়াফকারী অবশ্যই হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবে। ব্যাপকভাবে প্রচারিত ভুলেরই একটি হচ্ছে এটাকে ‘হিজর ইসমাঈল’ করে নামকরণ করা। এ নামকরণটি সঠিক নয়। কিছু মানুষ মনে করে, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম অথবা অন্য অনেক নবীকে এখানে দাফন করা হয়েছে। এটি আরও জঘন্য ধারণা। (ড. আবদুল্লাহ দুমাইজী, আল-বালাদুল হারাম, ফাযাইল ওয়া আহকাম ৬৬)।


মন্তব্যঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরিমাণ স্থান বাইরে ছিল বলে নির্ধারণ করেছেন সেটুকুই কাবার অংশ। বর্তমানে উত্তর দিকের দেয়ালের ভেতরে যতটুকু স্থান ঢোকানো হয়েছে, তা সঠিক পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। যে এখানে সালাত আদায় করতে চায়, তার উচিত হাদীসে বর্ণিত সঠিক স্থানটুকু তালাশ করে বের করা।

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : তৃতীয় কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : তৃতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মাকামে ইবরাহীম ও যমযম  কূপ

মাকাম শব্দের আভিধানিক অর্থ, দন্ডায়মান হওয়ার জায়গা। আর মাকামে ইবরাহীম অর্থ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দন্ডায়মান হওয়ার জায়গা। এটি একটি বড় পাথর, যার ওপর দাঁড়িয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কাবাঘর নির্মাণ করেছিলেন। কাবা নির্মাণ করার সময় যখন দেয়ালটি হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের শারীরিক উচ্চতার উপরে উঠে যায় তখন তিনি একটি পাথরখণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার জন্য ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নিয়ে এসেছিলেন, যাতে পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কা‘বাঘর নির্মাণ করতে পারেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পাথর এনে দিতেন এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পবিত্র হাতে তা কা‘বার দেয়ালে রাখতেন। তাওয়াফের সুবিধার্থে পাথরটিকে মূল জায়গা থেকে খানিকটা পেছন দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে। তাওয়াফেল পর এর পেছনে দু’ রাকাত নামায পড়া মুস্তাহাব।

মাকামে ইবরাহীমের বৈশিষ্টঃ

মহান আল্লাহ একটি নির্দশনঃ

মাকামে ইবরাহীম হল মহান আল্লাহ একটি নির্দশন। এই পাথটির কথা মহান আল্লাহ কুরআনুর কারীমে উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কি বহু সহিহ হাদিসও বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ মাকামে ইবরাহীম সম্পর্কে এরশাদ করেন।

*وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ যখন আমি কাবা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। ( সুরা বাকারা ২:১২৫)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, কাবাঘরে আল্লাহর কুদরতের স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নিদর্শনাবলি রয়েছে, যার মধ্যে একটি হল, পাথর যার উপর দাঁড়িয়ে তিনি কাবাঘর নির্মণ করেছিলেন এবং আজও তার পদচিহ্ন বিদ্যমান।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর (রাঃ) বলেছেনঃ তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহর অহির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা যদি মাকামে ইবরাহীম কে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ

 (*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى* “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও” (২ : ১২৫)

*(দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যদি আপনার সহধর্মিনীগনকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়।

* (তৃতীয়) আর একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাদেরকে বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তোমাদের তালাক দেয়, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়।

  *(عَسَى رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا*

অর্থঃ যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবতঃ তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, এবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী। (৬৬:৫) (সহিহ বুখারী ৩৯৩ ইফাঃ)

এটি একটি জান্নাতী পাথরঃ

এই পাথরটি জান্নাত থেকে আগত ইয়াকূত পাথর। হাদিসের আলোকে যানা যায় হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম এই পাথর দু’খানি জান্নাতের ইয়াকুত পাথরগুলোর মধ্য থেকে দু’টি পাথর, আল্লাহ যেগুলোকে আলোহীন করে দিয়েছেন।

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, “হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের পদ্মরাগরাজির দুই পদ্মরাগ। আল্লাহ এ দুয়ের নূর (প্রভা) কে নিষ্প্রভ করে দিয়েছেন। যদি উভয়মণির প্রভাকে তিনি নিষ্প্রভ না করতেন, তাহলে উদয় ও অস্তাচল কে উভয়ে জ্যোতির্ময় করে রাখত।” (তিরমিযী ৮৭৮, সহীহুল জামে ১৬৩৩)

মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সালাত আদায় করাঃ

১. ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমরা করতে গিয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলেন ও মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাকাআত সালাত আদায় করলেন এবং তাঁর সাথে ঐ সকল সাহাবী ছিলেন যারা তাকে লোকদের থেকে আড়াল করে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবার ভিতর প্রবেশ করেছিলেন কি না – জনৈক ব্যাক্তি আবূ আওফা (রাঃ) এর নিকট তা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারী ১৫০৫ ইফাঃ)

২. আমর (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইবনু ‘উমর (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘উমরাকারীর জন্য সাফা ও মারওয়া সা‘য়ী করার পূর্বে স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে কি? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ সমাপ্ত করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করেন, তারপর সাফা ও মারওয়া সা‘য়ী করেন। এরপর ইবনু ‘উমর (রাঃ) তিলাওয়াত করেন, “তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (রাবী) ‘আমর (রহঃ) বলেন, আমি জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করার পূর্বে স্ত্রী সহবাস বৈধ নয়। (সহিহ বুখারি ১৫২৫ ইফাঃ)

৩.  ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বায়তুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সহিহ বুখারি ১৫২৮ ইফাঃ)

যমযম  কূপ

যমযম পৃথিবীতে মহান আল্লাহ এক অসাধারণ নিদর্শন। পৃথিবী আল্লাহ যত নিদর্শন আছে তার মধ্য অন্যতম নিদর্শন হলে এই কূপ। একটু ভাবুনতো মক্কার কোথাও ডিপ টিউবলে পানি উঠে না। লক্ষ লক্ষ লিটার পানি আরব সাগর থেকে পরিশোধন করে মক্কাবাসিকে দিতে হয়। কিন্তু এই যমযম কূপ শত শত বছর থেকে সেই পানিহীন মক্কাকে পানি সরবরাহ করছে। তার পানি সরবরাহে কোন প্রকার কমতি নাই। কোথা থেকে কিভাবে এই পানি আসে? এ সকল প্রশ্নের একটিই উত্তর মহান আল্লাহ কুদরত। যেখানে মসজিদে হারামের পাশে কুপ খনন করেও পানির সন্ধান মেলে নাই। সেখান প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ হাজ্জিদের পান করানোর জন্য লক্ষ লক্ষ লিটার পানি উত্তলন করা হয়। এই কূপের পানি কি শুধু হাজ্জিদের পান করান হয়? এই পানি মদীনাসহ সম্পূর্ণ সৌদি আবরে পান করার জন্য পাঠান হয়। এমন কি পৃথিবীর প্রতিটি দেশে লক্ষ লক্ষ লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে হজ্জে মৌসুমে প্রত্যক হাজ্জিকে পানি সরবরাহ করা হয়। আবার অনেক হাজ্জির নিজের উদ্দগ্যেও পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রশ্ন হল যেখানে ভূগর্বে পানিরই সন্দান পাওয়া যায়না। সেখানে থেকে আবার এত পানি কি করে উত্তলন করা সম্ভব। তাই এটাই পৃথিবী বাসির হিদায়াতের জন্য একটি অনুপম দৃষ্টান্ত। যার ইচ্ছা এখান থেকে শিক্ষা নিবে তিনি নিতে পারেন।

অবস্থানঃ

যমযম কুপটি মক্কায় মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত। এটি কাবা থেকে ২০ মি (৬৬ ফুট) পূর্বে অবস্থিত। অর্থাৎ সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের দিকে। বর্তমানে কুয়া কাবা চত্বরে দেখা যায় না। এটি ভূগর্ভস্থ অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং এখানে থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করা হয়। মসজিদুল হারামের বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করা হয়।

যমযম সৃষ্টির ইতিহাসঃ

ইসলামের ইতিহাসে যমযম  কুপের উৎপত্তি নিয়ে বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ খলিল ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা আলাইহিস সালাম  ও শিশুপুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম কে আল্লাহর আদেশে মক্কার বিরান মরুভূমিতের রেখে আসেন। তার রেখে যাওয়া খাদ্য পানীয় শেষ হয়ে গেলে হাজেরা আলাইহিস সালাম পানির সন্ধানে পার্শ্ববর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাতবার ছোটাছুটি করেছিলেন। এসময় জিবরাঈল (আ) এর পায়ের আঘাতে মাটি ফেটে পানির ধারা বেরিয়ে আসে। ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে হাজেরা আলাইহিস সালাম পাথর দিয়ে পানির ধারা আবদ্ধ করলে তা কুপের রূপ নেয়। এসময় হাজেরা আলাইহিস সালাম উদগত পানির ধারাকে যমযম বা থাম থাম বলায় এই কূপের নাম হয় যমযম।

যদি হাজেরা আলাইহিস সালাম থাম থাম বা যমযম না বলতেন, তবে এটি কূপ না হয়ে ঝর্ণায় পরিনত হত।

*** ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী‎ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ইসমাঈলের মায়ের প্রতি আল্লাহর রহম করুন। যদি তিনি তাড়াহুড়া না করতেন, তবে যমযম একটি প্রবহমান ঝরণায় পরিণত হত।(সহিহ বুখারি ৩২৬২)  বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়

সংস্কারঃ

সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, নবী‎ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানার পূর্বেই যমযম এর ব্যাপর পরিচিতি ছিল। এখানের পানি দ্বারাই মক্কার পানির চাহিদা মিটত।

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমি মক্কায় অবস্থানকালে ঘরের ছাদ ফাঁক করা হল এবং জিবরাঈল (‘আঃ) অবতরণ করলেন। এরপর তিনি আমার বক্ষ বিদারণ করলেন এবং তা যমযমের পানি দ্বারা ধুলেন, এরপর ঈমান ও হিক্‌মতে পরিপূর্ণ একটি সোনার পেয়ালা নিয়ে এলেন এবং তা আমার বুকে ঢেলে দিয়ে জোড়া লাগিয়ে দিলেন। অতঃপর আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে দুনিয়ার আসমানে গেলেন এবং জিবরাঈল (‘আঃ) এই আসমানের তত্ত্বাবধানকারী ফেরেশ্‌তাকে বললেন, (দরজা) খোল। তিনি বললেন কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। (সহিহ বুখারি ১৬৩৬)

এই হাদিসে প্রমান করে যমযমের পানি পূর্ন থেকেই ভালো পানি হিসাবে মক্কাবাসির নিকট কদর ছিল। কিন্তু তখনকার সংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তবে ১৫৪/১৫৫ হিজরীতে (৭৭১ খৃষ্টাব্দে) খলিফা আল মনসুরের সময় এটির উপর গম্বুজ এবং মার্বেল টাইলস বসানো হয়। এর আগে এটি বালি ও পাথর দিয়ে ঘেরা অবস্থায় ছিল। পরবর্তীতে খলিফা আল মাহদি এটি আরো সংস্কার করেন। সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ সালে সৌদি বাদশাহ সংস্কার করেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ জমজমের পূর্ব ও দক্ষিণে পানি পান করানোর জন্য দুটি স্থান নির্মাণ করেন। দক্ষিণ দিকে ৬টি এবং পূর্বদিকে ৩টি ট্যাপ লাগানো হয়। বর্তমানে কাবা ঘরের ২০ মিটার দূরে অবস্থিত এই কূপটি থেকে পাম্পের সাহায্যে প্রতিদিন ২০ লক্ষাধিক ব্যারেল পানি উত্তলিত হয়। এই কূপের পানি বণ্টনের জন্য ১৪০৩ হিজরিতে সৌদি বাদশাহের এক রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী হজ্জ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইউনিফাইড ‘জামাজেমা দফতর’ গঠিত হয়। এই দফতরে একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্টসহ মোট ১১ জন সদস্য ও ৫ শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। বাদশাহ আব্দুল্লাহ যমযম  পানি কমপ্লেক্সটি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ৭০০ মিলিয়ন রিয়াল ব্যয়ে মক্কাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা প্রতিদিন ২০০,০০০ বোতল পানি সরবরাহ করতে পারে।

যমযমের পানির খাদ্য উপদানঃ

যমযম কূপের পানির কোনও রং বা গন্ধ নেই, তবে এর বিশেষ একটি স্বাদ রয়েছে। বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় যমযম কূপের পানি পরীক্ষা করেছে এবং তারা এর পুষ্টি গুণ ও উপাদান সমূহ নির্ণয় করেছে।

যমযম  পানির উপাদানসমূহঃ

খনিজের ঘনীভবন বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত
খনিজঘনীভবন
mg/Loz/cu in
সোডিয়াম১৩৩৭.৭×১০−৫
ক্যালসিয়াম৯৬৫.৫×১০−৫
ম্যাগনেসিয়াম৩৮.৮৮২.২৪৭×১০−৫
পটাশিয়াম৪৩.৩২.৫০×১০−৫
বাইকার্বোনেট১৯৫.৪০.০০০১১২৯
ক্লোরাইড১৬৩.৩৯.৪৪×১০−৫
ফ্লোরাইড০.৭২৪.২×১০−৭
নাইট্রেট১২৪.৮৭.২১×১০−৫
সালফেট১২৪.০৭.১৭×১০−৫
মোট দ্রবীভূত কঠিন বস্তুর৮৩৫০.০০০৪৮৩

সহিহ হাদিসের আলোকে যমযম কুপের কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হলোঃ

ক। যমযমের পানি পানে উপকার হয়ঃ

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যমযমের পানি যে উপকার লাভের আশায় পান করা হবে, তা অর্জিত হবে। (ইবনে মাজাহ ৩০৬২)

খ। যমযমের পানিতে খাদ্যগুন ও রোগমুক্তি হয়ঃ

আবু যার্র (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় তা (যমযমের পানি) বরকতপূণ। তা তৃপ্তিকর খাদ্য এবং রোগনিরাময়ের ঔষধ।” (হাদিস সম্ভার ১২০১, ত্বাবারানীর ২৯৫, সহীহুল জামে ২৪৩৫)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হল যমযমের পানি। তাতে রয়েছে তৃপ্তির খাদ্য এবং ব্যাধির আরোগ্য।” (হাদিস সম্ভার ১২০২, ত্বাবারানীর ৩৯১২, ৮১২৯, সহীহুল জামে’ ৩৩২২)

আবূ জামরাহ যুবা’য়ী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মক্কায় ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট বসতাম। একবার আমি জ্বরাক্রান্ত হই। তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি তোমার গায়ের জ্বর যমযমের পানি দিয়ে ঠাণ্ডা কর।’ কারণ, আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এটা জাহান্নামের উত্তাপ হতেই হয়ে থাকে। কাজেই তোমরা তা পানি দিয়ে ঠাণ্ডা কর অথবা বলেছেন। যমযমের পানি দিয়ে ঠাণ্ডা কর। এ বিষয়ে বর্ণনাকারী হাম্মাম সন্দেহ পোষণ করেছেন। (সহিহ বুখারি ৩২৬১)

গ। যমযমের পানি দাড়িয়ে পান করা মু্স্তাহাবঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ানো অবস্থায় যমযমের পানি পান করতেন। (সামায়েলে তিরমিজি ১৫২, সহিহ মুসলিম ৫৪০০)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমযমের পানি দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় পান করেছেন। (ইবনে মাজাহ ১৮৮২)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যমযমের পানি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পেশ করলাম। তিনি তা দাঁড়িয়ে পান করলেন। (রাবী’) ‘আসিম বলেন, ‘ইকরিমা (রাঃ) হলফ করে বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন উটের পিঠে আরোহী অবস্থায়ই ছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৩৭)

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : চতুর্থ কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : চতুর্থ কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৭। বাইতুল্লাহ গিলাফঃ

বাইতুল্লাহকে কারুখচিত একটি কালো কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখা হয় যাকে আমরা গিলাফ বলা হয়। আরবের লোকেরা ইহাকে ‘কিসওয়া’ বলে থাকে। প্রতি বছর এই কাপড়টি পরিবর্তন করে আরেকটি কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয়। হজ্জের কয়েক দিন আগে থেকেই কাবা শরিফের গিলাফের নিচু অংশ উপরের দিকে তুলে দেওয়া হয়। এতে কাবা শরিফের দেয়ালের বাইরের অংশ দেখা ও ধরা যায়। কাবাঘরের দরজা ও বাইরের গিলাফ দুটোই মজবুত রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। গিলাফের মোট পাঁচটি টুকরো বানানো হয়। চারটি টুকরো চারদিকে এবং পঞ্চম টুকরোটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরোগুলো পরস্পর সেলাইযুক্ত।

প্রতিবছর আরাফার দিন ৯ জিলহজ্জ একটি নতুন গিলাফ দ্বারা কাবাঘরকে আবৃত করা হয়। তখন পুরাতন গিলাফটি খুলে ফেলা হয়। এই দিন হাজ্জিগন আরাফায় অবস্থান করে বিধায় বাইতুল্লাহ খালি থাকে। আর মসজিদে হামারের কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে গিলাফটি পরিবর্তন করে থাকেন। ১০ জিলহজ্জ হাজ্জিগণ মক্কায় ফিরে কাবাঘরের গায়ে নতুন গিলাফ দেখতে পান। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন রেশম দিয়ে তৈরি করা হয় কাবার গিলাফ। রেশমকে রং দিয়ে কালো করা হয়। পরে গিলাফে বিভিন্ন দোয়ার নকশা আঁকা হয়। গিলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। ওপরের তৃতীয়াংশে ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া বন্ধনীতে কোরআনের আয়াত লেখা। বন্ধনীতে ইসলামি কারুকাজ করা একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেওয়া রুপালি তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারি করা। এই বন্ধনীটা কাবা শরিফের চারদিকে পরিবেষ্টিত। ৪৭ মিটার লম্বা বন্ধনীটি ১৬টি টুকরায় বিভক্ত। বন্ধনীটির নিচে প্রতি কোনায় সূরা আল-ইখলাস লেখা। নিচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে লেখা হয় পবিত্র কোরআনের ৬টি আয়াত। এতে এমব্রয়ডারি করে ওপরে সোনা ও রুপার চিকন তার লাগানো হয়।

বাইতুল্লাহ গিলাফ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিসঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমাযানের সওম ফর্‌য হওয়ার পূর্বে মুসলিমগণ ‘আশূরার সওম পালন করতেন। সে দিনই কা‘বা ঘর (গিলাফে) আবৃত করা হত। অতঃপর আল্লাহ যখন রমাযানের সওম ফর্‌য করলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘আশূরার সওম যার ইচ্ছা সে পালন করবে আর যার ইচ্ছা সে ছেড়ে দিবে। (সহিহ বুখারি ১৫৯২)

নাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মক্কা বিজয়ের বছর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম লৌহ শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় (মক্কা) প্রবেশ করেছিলেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিরস্ত্রাণটি মাথা হতে খোলার পর এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললেন, ইব্‌নু খাতাল কা’বার গিলাফ ধরে আছে। তিনি বললেনঃ তাকে তোমরা হত্যা কর।(সহিহ বুখারি ১৮৪৬)

৮। রুকনে ইয়ামানীঃ

রুকনে ইয়ামানী এটি কাবাঘরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত। এটি ইয়ামান দেশের দিকে হওয়াতে একে রুকনে ইয়ামানী বলা হয়েছে থাকে। কাবা ঘরের এই অংশে কখনো  চুম্বন  করবেন না, তবে স্পর্শ করা মুস্তাহাব। মনে রাখতে হবে শুধু হাজরে আসওয়াদ পাথটি চুম্বন করব আর রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করব।  যা সহহি হাদিস দ্বারা প্রমানিত। ইহা ছাড়া অন্য কোন স্থান ষ্পর্শ বা চুম্বন কোন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত হয়। যা হয় শুধুই আবেগের ফল। বিষয়টি বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেই।

একবার হযরত মু‘আবিয়া ও ইবনু আববাস (রাঃ) একত্রে ত্বাওয়াফরত অবস্থায় মু‘আবিয়া (রাঃ) কাবাগৃহের সবগুলি রুকন (চারটি কোণ) স্পর্শ করলে ইবনু আববাস (রাঃ) তার প্রতিবাদ করে বলেন, কেন আপনি এ দু’টি রুকন স্পর্শ করছেন? অথচ রাসূল (ছাঃ) এ দু’টি স্পর্শ করেননি। জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বলেন, কা‘বাগৃহের কোন অংশই পরিত্যাগ করার নয়। তখন ইবনু আববাস আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে’ (আহযাব ২১) জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বললেন, আপনি সত্য বলেছেন’। (ত্বাবারাণী আওসাত্ব ২৩২৩, আহমাদ ৩৫৩২ হাদিসে সনদ সহহি)

আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়দ ইবন উমায়ার (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললো: হে আবু আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এই দু স্তম্ভ (দু’রুকনে ইয়ামানী) ব্যতীত অন্য কোন স্তম্ভ চুম্বন করতে দেখি না। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এদের স্পর্শ করা গুনাহ দূর করে দেয় এবং তাঁকে এও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সাতবার তাওয়াফ করে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে। (সুনানে নাসাঈ ২৯২২ হাদিসের মান সহিহ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সুন্নত হচ্ছে, এটিকে চুমু না দিয়ে শুধু স্পর্শ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে এ রুকনটিতে স্পর্শ করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দুই ইয়ামানী রুকন ব্যতীত বায়তুল্লাহর অন্য কিছু স্পর্শ করতে দেখিনি।  (সহিহ মুসলিম ২৯৫১)

উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ)-কে বললেন, হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখি, যা আপনার অন্য কোন সঙ্গীকে করতে দেখিনা। তিনি বললেন, ‘ইবনু জুরায়জ, সেগুলো কি?’ তিনি বললেন, আমি দেখি, (১) আপনি তাওয়াফ করার সময় রুকনে ইয়ামানী দু’টি ব্যতীত অন্য রুকন স্পর্শ করেন না। (২) আপনি ‘সিবতী’ (পশমবিহীন) চপ্পল পরিধান করেন; (৩) আপনি (কাপড়ে) হলুদ রং ব্যবহার করেন এবং (৪) আপনি যখন মক্কায় থাকেন লোকে চাঁদ দেখে ইহরাম বাঁধে; কিন্তু আপনি তারবিয়ার দিন (৮ ই যিলহাজ্জ) না এলে ইহরাম বাঁধেন না।

‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ রুকনের কথা যা বলেছ, তা এজন্য করি যে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইয়ামানী রুকনদ্বয় ছাড়া আর কোনটি স্পর্শ করতে দেখিনি। আর ‘সিবতী’ চপ্পল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পশমবিহীন চপ্পল পরতে এবং তা পরিহিত অবস্থায় অজু করতে দেখেছি, তাই আমি তা করতে ভালবাসি। আর হলুদ রং, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা দিয়ে কাপড় রঙিন করতে দেখেছি, তাই আমিও তা দিয়ে রঙিন করতে ভালবাসি। আর ইহরাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে তাঁর সওয়ারি রওনা না হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁকে ইহরাম বাঁধতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি ১৬৭ ইফাঃ)

৯। মুলতাযাম স্পর্শ করাঃ

মুলতাযাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ এঁটে থাকার জায়গা। হাজরে আসওয়াদ থেকে কা‘বা শরীফের দরজা পর্যন্ত জায়গাটুকুকে মুলতাযাম বলে। বিদায়ি তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফের নিয়মে বায়তুল্লাহ সাত বার প্রদক্ষিণ করবেন। তাওয়াফ শেষে ইচ্ছে হলে মুলতাযামে চেহারা, বুক ও দুই বাহু ও দুই হাত রেখে আল্লাহর কাছে যা খুশি চাইতে পারেন। এই কাজটি অবশ্য মুস্তাহাব।

১. আমর ইবনে শু‘আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ‘ইবনে আমর (রাঃ) এর সাথে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করলাম। আমরা সাতবার তাওয়াফ শেষে কা‘বার পশ্চাতে নামায পড়লাম। অতঃপর আমি বললাম, আমরা কি আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবো না? তিনি বলেন, আমি আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি অগ্রসর হয়ে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন, অতঃপর হাজরে আসওয়াদ ও কা‘বার দরজার মাঝ বরাবর দাঁড়ান, অতঃপর তার নিজের বুক, হস্তদ্বয় ও গাল তার সাথে লাগান এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ করতে দেখেছি। (সুনানে ইবন মাজাহ ২৯৬২)

২. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কা‘বা গৃহের দরজা এবং রুকনের মাঝামাঝি স্থানটি মুলতাযাম। মালিক (র) থেকে বর্ণিত, আমি জেনেছি, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলতেন, হাজরে আসওয়াদ এবং কা’বা শরীফের দরজার মধ্যবর্তী স্থানটি হল মুলতাযাম। (হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) একক ভাবে বর্ণনা করেছেন)। (মুয়াত্তা মালিক ৯৪৬)

৩. আবদুর রহমান ইবন সাফওয়ান বলেন, ‘আমি মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীদের কা‘বাঘর থেকে বের হতে দেখলাম। অতঃপর তারা কা‘বাঘরের দরজা থেকে নিয়ে হাতীম পর্যন্ত স্পর্শ করলেন এবং তাঁরা তাঁদের গাল বাইতুল্লাহ্‌র সাথে লাগিয়ে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদের মাঝে ছিলেন। (সুনানে আবূ দাঊদ ১৮৯৮।

মন্তব্যঃ এই হাদীসের সনদে দুর্বলতা আছে। কিন্তু উপরে আবদুল্লাহ ইবন আমর থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি রুকন ও দরজার মাঝখানে দাঁড়ালেন। তিনি তার বক্ষ, দু’বাহু ও দু’হাতের তালু সম্প্রসারিত করে কা‘বাঘরের ওপর রাখলেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে এমনটি করতে দেখেছি। শায়খ আলবানী বলেন, রুকনে ইয়ামেনী ও দরজার মাঝখানে লেগে থাকার অংশটুকু প্রমাণিত আছে। সাহাবায়ে কিরাম মক্কায় এসে মুলতাযামে যেতেন এবং সেখানে দু’হাতের তালু, দু’হাত, চেহারা ও বক্ষ রেখে দোয়া করতেন। বিদায়ী তাওয়াফের পূর্বে বা পরে অথবা অন্য যেকোনো সময় মুলতাযামে গিয়ে দো‘আ করা যায়।

ইবন তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, ‘যদি সে ইচ্ছা করে হাজরে আসওয়াদ ও দরজার মধ্যবর্তী স্থান মুলতাযামে আসবে। অতপর সেখানে তার বক্ষ, চেহারা, দুই বাহু ও দুই হাত রাখবে এবং দোয়া করবে, আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজনগুলো চাইবে, তবে এরূপ করা যায়। বিদায়ী তাওয়াফের পূর্বেও এরূপ করতে পারবে। মুলতাযাম ধরার ক্ষেত্রে বিদায়ী অবস্থা ও অন্যান্য অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর সাহাবীগণ যখন মক্কায় প্রবেশ করতেন তখন এরূপ করতেন। (ইবন তাইমিয়া, মাজমু‘ ফাতাওয়া ২৬/১৪২)।

লক্ষণীয়ঃ বর্তমান যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে মুলতাযামে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই সুযোগ পেলে সেখানে যাবেন। অন্যথায় যাওয়ার দরকার নেই। কেননা মুলতাযামে যাওয়া তাওয়াফের অংশ নয়। তাওয়াফের সময় তা করা যাবে না। তাওয়াফ শেষে এই মুস্তাহাব আমল করা যেতে পারে, তবে হজ্জের মৌসুমে এত ভীড় থাকে যে এই কাজ করা খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যাপার।

১০। মাতাফঃ 

কাবাঘরের চারদিকে অবস্থিত তওয়াফের স্থানকে ‘মাতাফ’ বা চত্বর বলা হয়। মূলত তাওয়াফের জন্য ব্যবহৃত হলেও জামাতের সময় হলে এই স্থানে সালাত আদায় করা হয়। সালত শেষে পুনরায় তাওয়াফ শুরু হয়। পূর্বে যমযম  কূপ মাতাফেই অবস্থিত ছিল। পরে ভূপৃষ্ঠ থেকে কূপের অংশ সরিয়ে নেয়া হয় এবং পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে এই ব্যবস্থা রয়েছে।

১১। মিযাবে রহমতঃ

কাবাঘর ধোওয়া হলে বা বৃষ্টি বর্ষিত হলে, ছাদের পানি এ জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হয়। বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের ছাদে (হাতিমের মাঝ বরাবর) যে নালা বসানো আছে, তাকে ‘মিযাবে রহমত’ বলা হয়। সাধারণত এই নালা দিয়ে ছাদের বৃষ্টির পানি পড়ে।

১২. রুকনঃ

রুকনের অর্থ হলো, স্তম্ভ। হজ্জের রুকনের অর্থ হজ্জের স্তম্ভগুলো। যার ওপর হজ্জের ভিত্তি। এর কোনোটি বাদ গেলে হজ্জ আদায় হয় না।

১৩। . শাযারওয়ানঃ

ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সময় কাবার দুটি দরোজা ছিল। কুরাইশ গোত্র যখন কাবা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তখন তারা হালাল অর্থের সংকটের কারণে একটি দরজা নির্মাণ করে। কিছু অংশ রেখে দেয়। সেই অংশটাই হজ্জরে ইসমাঈল নামে পরিচিত। অনির্মিত অংশের খানিকটা মূল ভিত্তিমূলের মাঝেও রয়েছে। যা বর্তমানে শাযারওয়ান নামে পরিচিত। কা‘বার ভিত্তিমূলের কাছাকাছি, দেয়াল লাগোয়া অংশটাই শাযারওয়ান।

১৪ বাইতুল্লাহর চারটি কোনার চারটি নামঃ

ক। রুকনে হজ্জরে আসওয়াদঃ কাবার যে কোনায় হজ্জরে আসওয়াদ বা কালো পাথর পাথর আছে, সেই কোনাকে রুকনে হজ্জরে আসওয়াদ বলা হয়। এই কোনা থেকেই তাওয়াফ  শুরু ও শেষ করতে হয়।

খ। রুকনে ইরাকিঃ হজ্জরে আসওয়াদ পর তাওয়াফ শুরু করলে প্রথম যে কোনা পড়বে তাকে রুকনে ইরাকি বলে। অর্থাৎ বাইতুল্লাহর পূর্ব-উত্তর কোনাকে রুকনে ইরাকি বলা হয়। এর পরই কাবার অনির্মিত অংশ হাতিম।

গ। রুকনে শামিঃ হাতিম অতিক্রমের পর যে কোনা সামনে আসবে তাই হলো রুকনে শামি। অর্থাৎ বাইতুল্লাহর উত্তর-পশ্চিম কোনাকে রুকনে শামি বলা হয়।

রুকনে ইয়ামানিঃ বাইতুল্লাহর পশ্চিম-দক্ষিন কোনাকে রুকনে ইয়ামানি বলা হয়। এই সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

হজ্জ সংক্রান্ত কিছু পরিভাষা

হজ্জ সংক্রান্ত কিছু পরিভাষা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিশ্বের নানা প্রান্তের, নানা ভাষার মানুষ হজ্জ পালনের জন্য সৌদি আরব গমন করেন। হজ্জ ও উমরার সময় ব্যবহৃত হয় কিছু আরবি পরিভাষা, যেগুলি জানা থাকলে হজ্জ পালন অনেকটাই সহজ্জ হয়, হজ্জের বিধীবিধান পালনে সহজ্জ হয়। যেহেতু পরিভাষাগুলো আরবি এবং বহুল ব্যবহৃত, তাই সেসব পরিভাষা সম্পর্কে আজকে আলোচনা করা হলো। আশা করি, অনুসন্ধানী হজ্জযাত্রীদের এগুলো উপকারে আসবে।

১. হজ্জঃ

হজের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা।  শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জ অর্থ নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়, নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক নির্দিষ্ট কিছু কর্ম সম্পাদন করা। (হজ্জ উমরা ও জিয়ারত, ইসলামহাউজ.কম)

২. উমরাঃ

উমরার আভিধানিক অর্থ যিয়ারত করা। শরীয়তের পরিভাষায় উমরা অর্থ, নির্দিষ্ট কিছু কর্ম অর্থাৎ ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার মাধ্যমে বায়তুল্লাহ শরীফের যিয়ারত করা। (হজ্জ উমরা ও জিয়ারত, ইসলামহাউজ.কম)

৩. মীকাতঃ

হজ্জ বা উমরার নিয়তে মক্কার কাবাঘরেরউদ্যশ্যেগমনকারীদেরকেকাবাহতেএকটিনির্দিষ্টপরিমাণ দূরত্বে থেকে ইহরাম বাঁধতে হয় যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এই স্থানগুলোকে মীকাত বলা হয়। হারাম শরীফের চর্তুদিকেই মীকাত রয়েছে।

৪. তালবীয়াঃ

উমরা বা হজ্জের নিয়ত করার পর যে তাওহীদের বাক্য বলে সর্বক্ষন মহান আল্লাহ স্মরণ করা হয় তাকে তালবিয়া বলা হয়। সহিহ হাদিসের তালবীয়া নিম্মের বাক্যে এসেছে।

 *لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

(লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্‌ক লা শারি-কা লাকা)।

৫. ইহরামঃ

হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেওয়া। হজ্জ ও ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু কথা ও কাজ নিজের ওপর নিষিদ্ধ করে নেওয়ার সংকল্প করা। বানানভেদে অনেকেই এটাকে এহরামও বলেন।

৬. তাওয়াফঃ

প্রদক্ষিণ করা। পবিত্র কাবার চারপাশে প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলে।

৭. ইযতিবাঃ

ডান বগলের নিচ দিয়ে চাদরের প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর উঠিয়ে রাখা। এভাবে ডান কাঁধ খালি রেখে উভয় প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে রাখা। যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে পুরুষের জন্য সে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করা সুন্নত। আর ওই তাওয়াফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইজতিবা অবস্থায় থাকা পৃথক একটি সুন্নত।

৮. রমলঃ

ঘন পদক্ষেপে দ্রুত হাঁটা। হজ্জ বা ওমরার প্রথম তাওয়াফের সময় প্রথম তিন চক্কর ডান কাঁধ খোলা রেখে বীরের বেশে দ্রুততার হাঁটতে হয়, এটাকে রমল বলে।

৯. তাওয়াফে কুদুমঃ

কুদুম অর্থ আগমন করা। সুতরাং এর অর্থ আগমনি তাওয়াফ। মিকাতের বাইরের লোকেরা যখন হজ্জ বা ওমরার উদ্দেশ্যে কাবা শরিফে আসেন, তখন তাদের বায়তুল্লাহ তথা কাবার সম্মানার্থে এ তাওয়াফটি করতে হয়, এটি সুন্নত।

১০. তালবীয়াঃ

সাড়া দেওয়া। আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে আগমনকারীকে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকৃ’ বলে যে কথাগুলো পাঠ করতে হয় তাকে তালবিয়া বলে।

১১. হলকঃ

হজ্জ বা উমরার কাজ সম্পন্ন হলে মাথার চুল কামাতে বা ছোট করতে হয়। মাথা কামানোকে হলক এবং চুল ছোট করাকে কসর বলা হয়।

১২. কসরঃ

কসর অর্থ সংক্ষিপ্ত করা। চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজগুলো দুই রাকাত করে আদায় করা।

১৩. সাফা ও মারওয়াঃ

সাফা ও মারওয়া কাবার পাশে দুটি পাহাড়। বর্তমানে মসজিদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এগুলোকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর স্ত্রী হাজেরা আলাইহিস সালাম তার শিশুপুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম এর জন্য পানির সন্ধানে এই দুই পাহাড়ে সাতবার ছোটাছুটি করেছিলেন। তার অনুকরণে এই দুই পাহাড়ে হজ্জ ও উমরার সময় সায়ি করা হয়। পবিত্র কুরআনে এই পাহাড় দুটিকে আল্লাহ তার নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

(٢) إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّهِۖ فَمَنْ حَجَّ ٱلْبَيْتَ أَوِ ٱعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَاۚ وَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ ٱللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ

অর্থঃ নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মুল্য দেবেন। (সূরা বাকার ২:১৫৮)

১৪. মাসআঃ

সাঈ করার স্থান। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গা। অর্থাৎ হজ্জ বা উমরারা সময় যে স্থানে সাঈ করা হয়, সেই স্থানকে মাস’আ বলা হয়। মাস’আ দীর্ঘে ৩৯৪.৫ মিটার ও প্রস্থে ২০ মিটার। মাসআ’র গ্রাউন্ড ফ্লোর ও প্রথম তলা সুন্দরভাবে সাজানো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভিড় হলে প্রথম তলায় গিয়েও সাঈ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে ছাদে গিয়েও সাঈ করা যাবে তবে খেয়াল রাখতে হবে আপনার সাঈ যেন মাসআ’র মধ্যেই হয়। মাসআ থেকে বাইরে দূরে কোথাও সাঈ করলে সাঈ হয় না।

সাঈঃ সাঈয়ের অর্থ দৌঁড়ানো। এখানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার যাওয়া আসা করাকে সাঈ বলা হয়।

১৫. জাবালে আরাফাঃ

আরাফায় অবস্থিত পাহাড়, যাকে সাধারণ মানুষ জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড় বলে থাকে।

১৬. তাওয়াফে যিয়ারাঃ

১০ জিলহজ্জ কোরবানি ও হলক-কসরের পর থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে কাবা শরিফের তাওয়াফ করাকে তাওয়াফে ইফাজা বা তাওয়াফে জিয়ারা বলে। এ তাওয়াফ ফরজ।

১৭. আইয়ামে তাশরিকঃ

জিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়।

১৮. ইয়াওমুত তালবিয়াঃ

জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখ মিনায় যাওয়ার দিন।

১৯. ইয়াওমুল আরাফাঃ

আরাফা দিবস। জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূযাস্ত পর্যন্ত ফরজ হিসেবে আরাফায় অবস্থান করতে হয়। এ দিনকে ইয়াওমু আরাফা বলে।

২০. উকুফঃ

অবস্থান করা। আরাফা ও মুজদালিফায় অবস্থান করাকে যথাক্রমে উকুফে আরাফা ও উকুফে মুজদালিফা বলা হয়।

২১. জামারাঃ

শাব্দিক অর্থ পাথর। মিনায় অবস্থিত তিনটি জামারা আছে। এই জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। অনেকে এই জামারাকে প্রতীকী শয়তানের স্তম্ভ মনে করে কঙ্কর নিক্ষেপ করে। তাদের ধারনা ভুল, মহান আল্লাহ জিকির বুলন্দ করাই হলো জামারায় পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য।

২২. দমঃ

হজ্জ ও উমরা আদায়ে ওয়াজিব ছুটে যাওয়া, ভুলত্রুটি হলে তার কাফফারাস্বরূপ একটি পশু জবাই করে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়; এই পশু জবাইকে বলে দম দেওয়া।

২৩. ফিদইয়াঃ

সাধারণ কোনো অপরাধ হয়ে গেলে তিনটি কাজের যে-কোনো একটি করতে হয়। ছয়জন মিসকিনকে এক কেজি দশ গ্রাম পরিমাণ খাবার প্রদান কিংবা তিন দিন রোজা পালন করা অথবা ছাগল জবাই করে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া।

মাবরুরঃ হাদিসে কবুল হজ্জকে মাবরুর হজ্জ বলা হয়েছে।

২৪. হারামঃ

নিষিদ্ধ বস্তুকে হারাম বলে। আবার সম্মানিত স্থানকেও হারাম বলে। মক্কা ও মদিনার নির্দিষ্ট সীমারেখাকে হারাম বলে।

২৫. হালালঃ

ইহরাম শেষ হওয়ার পর মুক্ত অবস্থাকে হালাল হওয়া বলে।

২৬. রওজাঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজ মিম্বর ও ঘরের মাঝখানের অংশকে রওজাতুম মিন রিয়াজিল জান্নাত বা জান্নাতের একটি বাগান বলে অভিহিত করেছেন। নবী করিম (সা.) তার ঘরের মাঝে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

২৭. হজ্জে আকবরঃ

জিলহজের ১০ তারিখের দিনকে কোরআনে কারিমে ‘ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার’ তথা বড় হজের দিন বলা হয়েছে। জিলহজের ৯ তারিখ তথা আরাফা দিবস যদি শুক্রবারে হয় তাহলে আরাফা দিবস ও জুমাবার- উভয়ের ফজিলত লাভ হয়। তবে এটি আকবরি হজ্জ নামে যে লোকমুখে প্রচলিত- ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই, এগুলো মানুষের বানানো কথা।

২৮. কিলাদাঃ

কিলাদা অর্থ গলার মালা। আরবি অর্থ নেকলেস, মালা। হজ্জের সময় হাদির গলায় যে মালা ঝুলান হয় তাকে কিলাদা বলা হয়।

২৯. জান্নাতুল মুয়াল্লাহঃ

মসজিদে হারামের পূর্ব দিকে মক্কা শরিফের বিখ্যাত কবরস্থান।  এখানে মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (বাঃ), দাদা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে। এই নামে শুধু উপমহাদের লোকে চেনে। মক্কাবাসী এখানে বলে গারকে মুয়াল্লাহ।

৩০. হেরা পাহারঃ

এই হেরা পাহার কে অনেক জাবালে নুর বলে থাকে। মক্কার সর্বাধিক উঁচু পাহাড়। এখানে হজ্জরত মুহাম্মদ (সাঃ) ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এখানে ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় সর্ব প্রথম অহি নাজিল হয়।

৩১. গারে সাওরঃ

মসজিদুল হারামের পশ্চিমে হিজরতের সময় এই প্রকাণ্ড সুউচ্চ পাহাড়ে হজ্জরত মুহাম্মদ (সাঃ) তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। ইহাকে জাবালে সাওর ও বলা হয়।

৩২. জাবালে রহমাতঃ

আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত। এ পাহাড়ে সর্ব প্রথম নবী হজ্জরত আদম (আঃ)-এর দোয়া কবুল হয়। এখানে তিনি বিবি হাওয়া (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পান। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হজ্জরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিদায় হজের খুতবাও এখান থেকে দিয়েছিলেন।

৩৩। ওয়াদি মুহাস্সারঃ

এটি মুযদালিফা ও মিনার মাঝামাঝি একটি জায়গার নাম, যেখানে আবরাহা ও তার হস্তী বাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছিল। স্থানটি হেরেমের ভেতরে অবস্থিত কিন্তু ইবাদতের স্থান নয়। এখানে পৌঁছলে আল্লাহর গজব নাযিল হওয়ার স্থান হিসেবে তা দ্রুত অতিক্রম করা উচিত।

৩৪। ওয়াদি উরনাহঃ

আরাফার মাঠের পাশে বিস্তৃত উপত্যকা, যা মুযদালিফার দিক থেকে আরাফায় প্রবেশের ঢোকার সময় প্রথম সামনে পড়ে।

৩৫। কিরানঃ

মিলিয়ে করা। হজ ও উমরাকে একই সাথে আদায় করার নাম কিরান করা। এটি তিন প্রকার হজের অন্যতম।

৩৬। তামাত্তুঃ উপকৃত হওয়া, উপকার নেয়া, ভোগ করা। একই সফরে প্রথমে উমরা আর পরে হজ আলাদাভাবে আদায় করাকে তামাত্তু বলে। এটি তিন প্রকার হজের অন্যতম।

৩৭। বাতনে ওয়াদীঃ  বাতন অর্থ পেট বা মধ্যভাগ। আর ওয়াদী অর্থ উপত্যকা। তাই বাতনে ওয়াদী শব্দদু’টির অর্থ উপত্যকার মধ্যভাগ। সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে নিচু উপত্যকা এলাকা ছিল। সে উপত্যকাটিকেই বাতনে ওয়াদী বলে।

৩৮। তাওহীদঃ

আল্লাহর একত্ববাদ।

৩৯। তাকবীরঃ

বড় করা। ইসলামী পরিভাষায় ‘আল্লাহু আকবার’ বলাকে তাকবীর বলে।

৪০। তাহলীলঃ

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলাকে তাহলীল বলা হয়।

৪১। নহরঃ

নহর অর্থ কুরবানী করা। উট কুরবানী করার জন্য দাঁড়ানো অবস্থায় তার গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এ প্রক্রিয়াকে নহর বলে।

৪২। মাবরুরঃ

মাবরুর অর্থ মকবুল বা কবুলযোগ্য। হাদীসে কবুলযোগ্য হজ্জকে হজ্জে মাবরূর বলা হয়েছে।

৪৩। মাশ‘আরঃ

নিদর্শন সম্বলিত স্থান। আর মাশ‘আরুল হারাম বলতে মুযদালিফাকে বুঝানো হয়েছে।

৪৪। সাঈঃ

দৌড়ানো। এখানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার যাওয়া আসা করাকে বুঝায়।

হজ্জ ও উমরার ফজিলত

হজ্জ ও উমরার ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হজ্জ ইসলামি শরীয়তে অন্যতম ফরজ ইবাদাত। ইহার মাধ্যমে একজন পাপিষ্ট মুসলিম নিস্পাপ মুসলিমে রুপান্তরিত হয়। এমন মুসলিম সদ্যভুমিষ্ট শিশুর মত নিস্পাপ হয়ে যায়। যদি হজ্জের কোন প্রকার ফজিলত না থাকত, তবু ফরজ হিসাবে প্রতিটি ঈমানের দাবিদার মুসলিম হজ্জ করতে বাধ্য থাকত। মহান আল্লাহর অপরিসীম করুনা যে তিনি তার হুকুম পালনের মাধ্যমে বান্দাকে ভালবান করবেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 (٩) لِّيَشْهَدُوا مَنَٰفِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا ٱسْمَ ٱللَّهِ فِىٓ أَيَّامٍ مَّعْلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلْأَنْعَٰمِۖ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا ٱلْبَآئِسَ ٱلْفَقِيرَ

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। (সূরা হজ্জ ২২:২৮)

হজ্জ একটি ফরজ ইবাদত। মহান আল্লাহর নেকট্য লাভের প্রধার উপায় হল ফরজ কাজ যথাযথভাবে আদায় করা। হজ্জের মাধ্যমে যে বান্দা মহান আল্লাহ নৈকট্য ভাল করবে তাতে কোন প্রতার সংশয় নাই। তারপরও বহু সহিহ হাদিসে আলাদা আলাদাভাবে হজ্জের ফজিলত বর্ণনা করেছে। নিম্মে এমনই কিছু সহিহ হাদিস উপস্থাপন করছি।

হজ্জ সর্বোত্তম আমলঃ

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে জিজ্ঞেস করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞেস করা হল , অতঃপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞেস করা হল, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেনঃ হজ্জ-ই-মাবরূর (মাকবূল হজ্জ)। (সহিহ বুখারী ১৫১৯ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬২৬ ইফাঃ) )

হজ্জের প্রতিদানে জান্নাতঃ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হজ্জে মাবরূরের জান্নাত ব্যতীত কোন প্রতিদান নেই। আর এক উমরাহ অন্য উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ের জন্য গুনাহের কাফফারা হয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৪ ইফাঃ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৫ ইফাঃ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক উমরাহ অন্য উমরাহ্ পর্যন্ত কাফফারা হয় উভয়ের মধ্যবর্তী পাপের। আর হজ্জে মাবরূর এর বিনিময় জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬৩১ ইফাঃ)

মহিলাদের জিহাদ হলো মাবরূর হজ্জঃ

উম্মুল মু‘মিনীন ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম ‘আমল মনে করি। কাজেই আমরা কি জিহাদ করবো না? তিনি বললেনঃ না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হল, হজ্জে মাবরূর। (সহিহ বুখারী ১৫২০ তাওহীদ প্রকাশনী)

আয়েশা বিনত তালহা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি আপনার সাথে জিহাদে যোগদান করবো না? আমি কুরআনে জিহাদ আপেক্ষা উত্তম কোন আমলই দেখছি না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, বরং অতি উত্তম জিহাদ হলো বায়তুল্লাহর হজ্জ অর্থাৎ হজ্জে মাবরূর।(সুনানে নাসাঈ ২৬৩০ ইফাঃ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বৰ্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, দুর্বল এবং নারীদের জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ করা। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৮ ইফাঃ)

হজ্জের কারনে গুনাহ মাফঃ

১. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ  তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হজ্জ হতে ফিরে আসবে যে দিন তার মা জন্ম দিয়েছিল। (সহিহ বুখারী ১৫২১ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬২৮ ইফাঃ)

২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ‘উমরাহ’র পর আর এক ‘উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা। আর জান্নাতই হলো হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান । (সহিহ বুখারী ১৭৭৩)

হজ্জ দরিদ্রতা দুর করে দেয়ঃ

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। কেননা, এ হজ্জ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি ক্ববূল হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে তিরমিজ ৮১০ ও ইবনু মাজাহ ২৮৮৭)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা হজ্জ ও উমরা পালন কর। কেননা হজ্জ ও উমরা উভয়টি দারীদ্রতা ও পাপরাশিকে দূরীভূত করে যেমনিভাবে রেত স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহার মরিচা দূর করে দেয়। আর মাবরূর হজ্জের বদলা হল জান্নাত।” (সুনানে তিরমিযী ৮১০, সুনানে নাসাঈ ২৬৩৩ ইফাঃ)

আমর ইবন দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ সমাপনের পর উমরা এবং উমরার পর হজ্জ করবে, কেননা তা অভাব অনটন ও পাপকে দূর করে দেয়। যেমন হাপর লোহার মরিচ দূর করে থাকে।(সুনানে নাসাঈ ২৬৩২ ইফাঃ)

হজ্জযাত্রীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেনঃ

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর পথের সৈনিক, হজ্জযাত্রী ও উমরা যাত্রীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি। তারা আল্লাহর নিকট দোয়া করলে, তিনি তা কবুল করেন এবং কিছু চাইলে তা তাদের দান করেন।  (ইবনে মাজাহ ২৮৯৩ হাদিসের মান হাসান)

হজ্জযাত্রী আল্লাহর প্রতিনিধিঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি, গাযী, হাজী ও উমরাহ্ আদায়কারী। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৭ ইফাঃ)

হজ্জে জন্য খরচের নেকী সাতশ গুন বৃদ্ধি পায়ঃ

বুরাইদা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হজ্জে খরচ করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) খরচ করার সমতূল্য সাওয়াব। হজ্জে খরচকৃত সম্পদকে সাতশত গুণ বাড়িয়ে এর প্রতিদান দেয়া হবে। (মসনদে আহমাদ ২২৪৯১)

রমাজানের উমরা হজ্জের সমানঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি এক আনসারী মহিলাকে বললেন যার নাম ইবনু আব্বাস (রাঃ) উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু আমি তার নাম ভুলে গেছি- আমাদের সাথে হাজ্জ (হজ্জ) করতে তোমাকে কিসে বাঁধা দিল? মহিলা বলল, আমাদের পানি বহনকারী মাত্র দুটি উট আছে। আমার ছেলের বাপ (স্বামী) ও তার ছেলে এর একটিতে চড়ে হাজ্জ (হজ্জ) করেন এবং অপরটি আমাদের জন্য রেখে যান পানি বহনের উদ্দেশ্যে। তিনি বললেন, রমযান মাস এলে তুমি উমরা কর। কারণ এ মাসের উমরা একটা হজ্জের সমান। (সহিহ মুসলিম ২৯০৮ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সিনান এক আনসারী মহিলাকে বললেনঃ আমাদের সাথে হাজ্জ (হজ্জ) করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? মহিলা বলল, অমুকের পিতা- অর্থাৎ তার স্বামীর দুটি পানি বহনকারী উট আছে। এর একটি নিয়ে সে ও তার ছেলে হজ্জে গিয়েছে। অপরটির সাহায্যে আমাদের গোলাম পানি বহন কর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে রমযান মাসের উমরা-হজ্জের সমান কিংবা তিনি বলেছেন, আমাদের সঙ্গে একটি হজ্জের সমান। (সহিহ মুসলিম ২৯০৯ ইফাঃ)

হজ্জে মাবরূরঃ

সহিহ হাদিসসমূহে হজ্জের ফজিলত বর্ণনায় ‘হজ্জে মাবরুর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হজ্জে মাবরূর অর্থ মকবুল হজ্জ বা কবুলযোগ্য হজ্জ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় শব্দটির বিভিন্ন অর্থ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বটে কিন্তু সব কথার সার একটিই আর তা হলোঃ হজ্জে যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থেকে পাপমুক্ত হজ্জ সম্পাদিত হওয়াকে ‘হজ্জে মাবরুর’ বলে। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত বিধানকে সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে আদায় করলে কবুল হওয়া আশা করা যায়। কাজে যে হজ্জ পরিপূর্ণভাবে আদায় করার ফলে কবুল হবে তাকে হজ্জে মাবরুর বলা হয়। তাই অনেকে কবুলযোগ্য হজ্জকেও হজ্জে মাবরূর বলেছেন। এই হজ্জের প্রতিদার একমাত্র জান্নাত।

১. আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ্জ ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। কেননা, এ হজ্জ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি ক্ববূল হজ্জের প্রতিদান জান্নাতব্যতীত আর কিছুই নয়। (তিরমিজ ৮১০,  ইবনু মাজাহ ২৮৮৭)।

২. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ এক উমরা অপর উমরা পর্যন্ত সংঘটিত গুনাহসমূহের কাফফারা স্বরূপ। ক্ববূল হজ্জ্জের প্রতিদান জান্নাতছাড়া আর কিছু নেই। (তিরমিজ ৯৩৩, ইবনে মাজাহ ২৮৮৮)

৩. আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলঃ সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ কাজ কোনটি এবং উত্তম বা কল্যাণকর কোন ধরণের কাজ? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা। আবার প্রশ্ন করা হল, এরপর কোন জিনিস উত্তম? তিনি বললেনঃ জিহাদ হচ্ছে সকল কাজের চূড়া বা শিখর। আবার প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এরপর কোন জিনিস উত্তম? তিনি বললেনঃ (আল্লাহ্ তা’আলার নিকট) হজ্জে মাবরুর বা কবুলযোগ্য হজ্জ। (সহিহ বুখারি ২৬, তিরমিজি ১৬৫৮)

মাবরুর হজ্জের জন্য যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবেঃ

আমাদের সকলের উচিৎ মাবরূর হজ্জ বা কবুলযোগ্য হজ্জ আদায়ের চেষ্টা করা। হজ্জে সফরের সাথে আর্থিক ও শারীরিক সম্পর্ক থাকে বিধায় আমলটি কঠিন। তাই শ্রম দিয়ে অর্থ দিয়ে যদি কবুলযোগ্য হজ্জজ্ আদায় করেতে না পাবি তবে বিষয়টি খুবই পরিতাপের। তাই হজ্জে মাবরুল বা কবুলযোগ্য হজ্জ আদায়ের জন্য নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিত।

ঈমান থাকাঃ

কাফির ও মুশরিক কোন আমল মহান আল্লাহ নিকট গ্রহনীয় নয়। যদি ইমান এসে মুসলিম হয়, তখন তার ইবাদাত মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এমন কি কেউ ইমান আনার পর ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ করলেও তার কোন ভাল কাজ বা ইবাদাত গৃহীত হবে না।

ইখলাসঃ 

আল্লাহ সন্ত্ব্ষ্টি অর্জনের জন্য ভাল কাজ বা ইবাদাত করাই হল ইখলাস। আমাদের সকর ইবাদাতের একমাত্র উপাশ্য হলেন মহান আল্লাহ। তাই আল্লাহ ছাড়া কোন গাইরুল্লাহে খুশি করার জন্য ইবাদাত করলে তা গ্রহণ যোগ্য হবে না। প্রতিটি কাজ বা আমলের এক মাত্র উদ্দেশ্য হবে মহান আল্লাহ সন্ত্ব্ষ্টি। সকল প্রকার ইবাদাত ও ভাল কাজ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে খুশী করার নিয়তে করতে হবে। এটাকেই বলা হয় ইখলাস।


সুন্নাত তরীকাঃ 

ইবাদাত কবুলের অন্যতম শর্ত হলো, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত তরীকায় আমল করা। সালাত, সিয়াম, জিকির, দান সদগা ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদাত যখন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত তরীকায় করা হবে তখন ইবাদাত। আর যখন সুন্নাহ তরীকার বাহিরে মনগড়া পদ্ধতিতে করা হবে তখন বিদআত। সকল প্রকার বিদআত পরিত্যাজ্য। তাই সুন্নাহ সম্মত কাজ বা আমলই ইবাদাত বলে গণ্য হবে। তাই সহিহ সুন্নাহ সম্মত দলিল ছাড়া বা মনগড়া কিছুই করা যাবে না।

শির্কমুক্ত থাকাঃ

 মহান আল্লাহ শির্ক যুক্ত ইবাদাত গ্রহন করে না। তার কোন অংশিদার নাই। তাই তিনি সকল প্রকার শির্কি আমল প্রত্যাখান করে থাকেন এবং তার সকল ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

* وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ *

অর্থঃ ‘‘আপনার ও আপনার  পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর সাথে শির্ক করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন বলে গণ্য হবেন। (সুরা যুমার ৩৯৬৫)

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:

ذَٲلِكَ هُدَى ٱللَّهِ يَہۡدِى بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ‌ۚ وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ (٨٨)

অর্থঃ এটি হচ্ছে আল্লাহর হেদায়াত, নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে তিনি যাকে চান তাকে এর সাহায্যে হেদায়াত দান করেন৷ কিন্তু যদি তারা কোন শির্ক করে থাকতো তাহলে তাদের সমস্ত কৃতকর্ম ধ্বংস হয়ে যেতো৷ (আনআম:৮৮)

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলেন: শরীকদের মধ্যে অংশীদারির অংশ (শির্ক) থেকে আমিই অধিক অমুখাপেক্ষী। যে কেউ এমন আমল করল যাতে আমার সাথে অপরকে শরিক করেছে, আমি তাকে ও তার শির্ককে প্রত্যাখ্যান করি”। (সহহি মুসলিম)।

মন্তব্যঃ কাজেই কবুল তথা হজ্জে মাবরুর আদায় করতে হলে অবশ্য এই তারটি শর্ত পূরন সাপেক্ষে হজ্জের যাবতীয় বীধি বিধন যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

ঙ. বৈধ উপার্জন

হজের সফর দো‘আ কবুলের সফর। তারপরও যদি হারাম মাল দিয়ে তা করে তবে তা কবুল না হওয়ার বিষয়টি এসেই যায়। হাদীসে এসেছে

২৯৮৯। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কুবুল করেন না। আল্লাহ তার রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেসব বিষযের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত”- (সূরাঃ আল-মু’মিনূন ৫১)।

তিনি আরো বলেনঃ “হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর” (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে কুবুল হতে পারে। (সুনানে তিরমিজ ২৯৮৯ হাদিসের মান হাসান)

চ। হজ্জ হতে হবে শুধুই আল্লাহ জন্যঃ

যদি হজ্জ আল্লাহর জন্য না হয়ে লোক দেখানো কিংবা সুনাম কুড়ানোর জন্য হয় থাকে তবে সেই হজ্জ মহান আল্লাহ নিকটি কবুলযোগ্য হজ্জ হবে না। তাই লোক দেখান হজ্জ করার মানসিকতা বর্জন করা উচিৎ।

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উটের পিঠে) একটি পুরাতন জিন ও পালানে উপবিষ্ট অবস্থায় হজ্জ করেন। তাঁর পরিধানে ছিল একটি চাদর যার মূল্য চার দিরহাম বা তারও কম। অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! এ এমন হজ্জ, যাতে কোন প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারেচ্ছা নেই। (ইবন মাজাহ ২৮৯০)

ছ। আহার করানো ও ভালো কথা বলা

জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ কাজ হজ্জকে মাবরূর করে? তিনি বললেন, ‘আহার করানো এবং ভালো ও সুন্দর কথা বলা। (মুস্তাদরাক ১/১৭৭৮)

খাল্লাদ ইবন আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবন যুবাইরকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ হাজী উত্তম? তিনি বললেন, যে আহার করায় এবং তার জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বলেন, আমাকে ছাওরী বলেছেন, আমরা শুনেছি, এটিই মাবরূর হজ্জ। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৫/৮৮১৬)

জ। সালাম বিনিময়

জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সা. কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ কাজের দ্বারা হজ্জ মাবরূর হয়? তিনি বললেন, ‘খাবার খাওয়ানো এবং বেশি বেশি সালাম বিনিময়ের দ্বারা’। (মুসনাদে আহমদ ৩/৩২৫)

ঝ। তালবিয়া পাঠ ও কুরবানী করা

১. আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল, কোন প্রকার হাজ্জ সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেনঃ চিৎকার করা (উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ) ও রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানী দেওয়া)। (সুনানে তিরমিজ ৮২৭, ইবনু মাজাহ ২৯২৪)

২. খাল্লাদ ইবনুল সাইব (রাঃ) হতে তাঁর পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ জিবরাঈল (আ) আমার নিকট এসে বলেন যে, আমার সাহাবীদেরকে যেন আমি উচ্চস্বরে তালবিয়াপাঠের নির্দেশ প্রদান করি। (ইবনু মাজাহ ২৯২২)

মাবরুর হজ্জে সম্পাদনের লক্ষনঃ

একজন হাজ্জি উপরের বিষয়গুলি খেয়াল রেখে হজ্জ আদায় করলেন। হজ্জ সম্পাদনের পর যথাযত নিজ দেশে ফিরেও আসলেন। যদি দেখা যায় ঐ হাজ্জির মধ্য আমলগত ও আচরণগত পরিবর্ত ঘটছে তবে বুঝতে হবে তার হজ্জ কবুলযোগ্য বা মাবরুর হজ্জ হয়েছে। অর্থাৎ যদি তাকে পর্যবেক্ষন করে দেখা যায় তার সালাত, জাকাত, আচার-আচরণ, লেনদেন, আমানতদারী, অন্যের হক আদায় এবং ইবাদতের ওপর অবিচলতায় তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে তবে বুঝতে হবে, তার হজ্জ মাবরূর হয়েছে।

সমাজে বহুল প্রচারিত একটি যঈফ হাদিস হলোঃ

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি এতটুকু পাথেয় ও সফর সংক্রান্ত্রের অধিকারী হয়, যা তাকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, এরপরও যদি সে হজ্জ পালন না করে তবে সে ইয়াহুদী হয়ে মরল বা নাসারা হয়ে মরল এই বিষয়ে (আল্লাহর) কোন পরওয়া নেই। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র কিতাবে ইরশাদ করেনঃ ( ‏وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً) ‏ ‘‘মানুষের মাঝে যার সেখানে যাবার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য’’। (সুনানে তিরমিজ ৮১০ হাদিসের মান যঈফ)

হজ্জের প্রকারভেদ এবং বদলী হজ্জের বিধান

হজ্জের প্রকারভেদ এবং বদলী হজ্জের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হজ্জের প্রকারভেদ আলোচনা পূর্বে নিম্মের হাদিসগুলো মনযোগ দিয়ে পড়ি। হাদিসের  আলোকেই হজ্জের শ্রেণীভিবাগ করা হবে।

১. আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কী প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? ‘আলী (রাঃ) বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুরূপ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমার সঙ্গে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি হালাল হয়ে যেতাম। (সহিহ বুখারি ১৫৫৮ তাওহীদ)

২. আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ইয়ামানে আমার গোত্রের নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি (হজ্জ-এর সফরে) বাতহা নামক স্থানে অবস্থানকালে আমি (ফিরে এসে) তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ তুমি কোন্‌ প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? আমি বললাম, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইহরামের অনুরূপ আমি ইহ্‌রাম বেঁধেছি। তিনি বললেনঃ তোমার সঙ্গে কুরবানীর পশু আছে কি? আমি বললাম, নেই। তিনি আমাকে বায়তুল্লাহ-এর তাওয়াফ করতে আদেশ করলেন। আমি বায়তুল্লাহ-এর তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়ার সা’য়ী করলাম। পরে তিনি আদেশ করলে আমি হালাল হয়ে গেলাম। অতঃপর আমি আমার গোত্রীয় এক মহিলার নিকট আসলাম। সে আমার মাথা আঁচড়িয়ে দিল অথবা বলেছেন, আমার মাথা ধুয়ে দিল। এরপর ‘উমর (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে এক উপলক্ষে আসলেন। (আমরা তাঁকে বিষয়টি জানালে) তিনি বললেনঃ কুরআনের নির্দেশ পালন কর। কুরআন তো আমাদেরকে হজ্জ ও ‘উমরাহ পৃথক পৃথকভাবে যথাসময়ে পূর্ণরূপে আদায় করার নির্দেশ দান করে। আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা হজ্জ ও ‘উমরাহ আল্লাহ’র উদ্দেশে পূর্ণ কর” (২:১৯৬)। আর যদি আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে অনুসরণ করি, তিনি তো কুরবানীর পশু যবহ্‌ করার আগে হালাল হননি। (সহিহ বুখারি ১৫৫৯ তাওহীদ)

৩. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে বের হলাম এবং একে হজ্জের সফর বলেই আমরা জানতাম। আমরা যখন (মক্কায়) পৌঁছে বাইতুল্লাহ-এর তাওয়াফ করলাম তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিলেনঃ যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে আসেনি তারা যেন ইহ্‌রাম ছেড়ে দেয়। তাই যিনি কুরবানীর পশু সঙ্গে আনেননি তিনি ইহ্‌রাম ছেড়ে দেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ তাঁরা ইহ্‌রাম ছেড়ে দিলেন। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি ঋতুবতী হয়েছিলাম বিধায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারিনি। (ফিরতি পথে) মুহাসসাব নামক স্থানে রাত যাপনকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই ‘উমরাহ ও হজ্জ উভয়টি সমাধা করে ফিরছে আর আমি কেবল হজ্জ করে ফিরছি। তিনি বললেনঃ আমরা মক্কা পৌঁছলে তুমি কি সে দিনগুলোতে তওয়াফ করনি? আমি বললাম, জ্বীনা। তিনি বললেন, তোমার ভাই-এর সাথে তান্‌’ঈম চলে যাও, সেখান হতে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধবে। অতঃপর অমুক স্থানে তোমার সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ কী বললে! তুমি কি কুরবানীর দিনগুলোতে তাওয়াফ করনি! আমি বললাম, হ্যাঁ করেছি। তিনি বললেনঃ তবে কোন অসুবিধা নেই, তুমি চল। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এমতাবস্থায় আমার সাক্ষাৎ হলো যখন তিনি মক্কা ছেড়ে উপরের দিকে উঠছিলেন, আর আমি মক্কার দিকে অবতরণ করছি। অথবা ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি উঠছি ও তিনি অবতরণ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৬১ তাওহীদ)


৪. মারওয়ান ইবনু হাকাম (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উসমান ও ‘আলী (রাঃ)-কে (উসফান নামক স্থানে) দেখেছি, ‘উসমান (রাঃ) (তামাত্তু হজ্জ আদায় করতেন) হাজ্জ ও ‘উমরাহ একত্রে আদায় করতে নিষেধ করতেন। ‘আলী (রাঃ) এ অবস্থা দেখে হাজ্জ ও উমরার ইহরাম একত্রে বেঁধে তালবিয়া পাঠ করেন (لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ )  হে আল্লাহ! আমি ‘উমরাহ ও হাজ্জ-এর ইহরাম বেঁধে হাযির হলাম। এবং বললেন, কারো কথায় আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাত বর্জন করতে পারব না। (সহিহ বুখারি ১৫৬৩ তাওহীদ)

৫. নবী সহধর্মিণী হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকদের কী হল, তারা ‘উমরাহ শেষ করে হালাল হয়ে গেল, অথচ আপনি ‘উমরাহ হতে হালাল হচ্ছেন না? তিনি বললেনঃ আমি মাথায় আঠালো বস্তু লাগিয়েছি এবং কুরবানীর জানোয়ারের গলায় মালা ঝুলিয়েছি। কাজেই কুরবানী করার পূর্বে হালাল হতে পারি না। (সহিহ বুখারি ১৫৬৬ তাওহীদ)

৬. আবূ শিহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধে হজ্জে তামাত্তু’র নিয়্যতে তারবিয়্যাহ দিবস (আট তারিখ)-এর তিন দিন পূর্বে মক্কায় প্রবেশ করলাম, মক্কাবাসী কিছু লোক আমাকে বললেন, এখন তোমার হজ্জের কাজ মক্কা হতে শুরু হবে। আমি বিষয়টি জানার জন্য ‘আত্বা (রহঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর উট সঙ্গে নিয়ে হজ্জে আসেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সাহাবীগন ইফরাদ হজ্জ-এর নিয়্যাতে শুধু হজ্জের ইহ্‌রাম বাধেঁন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কায় পৌছে) তাদেরকে বললেনঃ বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ সমাধা করে তোমরা ইহ্‌রাম ভঙ্গ করে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট কর। এরপর হালাল অবস্থায় থাক। যখন জিলহজ্জ মাসের আট তারিখ হবে তখন তোমরা হজ্জ-এর ইহ্‌রাম বেঁধে নিবে, আর যে ইহ্‌রাম বেঁধে এসেছ তা তামাত্তু‘ হজ্জের ‘উমরাহ বানিয়ে নিবে। সাহাবীগন বললেন, এ ইহ্‌রামকে আমরা কিরূপে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বানাব? আমরা হজ্জ-এর নাম নিয়ে ইহ্‌রাম বেঁধেছি। তখন তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা আদেশ করছি তাই কর। কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে না আসলে তোমাদেরকে যা করতে বলছি, আমিও সেরূপ করতাম। কিন্তু কুরবনী করার পূর্বে (ইহরামের কারনে) নিষিদ্ধ কাজ (আমার জন্য) হালাল নয়। সাহাবীগন সেরূপ পশু যবহ করলেন। আবূ ‘আবদুল্লাহ্‌ (ইমাম বুখারী) (রহঃ) বলেন, আবূ শিহাব (রহঃ) হতে মারফূ’ বর্ণনা মাত্র এই একটিই পাওয়া যায়। (সহিহ বুখারি ১৫৬৬ তাওহীদ)

৭. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে ( হজ্জের উদ্দেশ্যে) মদীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা’দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। জিলহজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহ্‌রাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা’বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয। (সহিহ বুখারি ১৫৪৫ তাওহীদ)

৮. জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে আমরা হজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে (মক্কায়) উপনীত হলাম। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নির্দেশ দিলেন, আমরা হজ্জকে ‘উমরাহ’তে পরিণত করলাম।(সহিহ বুখারি ১৫৭০ তাওহীদ)

৯. জাবির ইব্‌নু ‘আব্দুল্লাহর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ হজ্জ-এর ইহ্‌রাম বাঁধেন, তাঁদের মাঝে কেবল নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল না। ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে আগমন করে, তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি [আলী (রাঃ)] বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেরূপ ইহ্‌রাম বেঁধেছেন, আমি ও সেরূপ ইহ্‌রাম বেঁধেছি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণের মধ্যে যাদের নিকট কুরবানীর পশু ছিল না, তাদের ইহ্‌রামকে ‘উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন, তারা যেন তাওয়াফ করে, চুল ছেঁটে অথবা মাথা মুণ্ডিয়ে হালাল হয়ে যায়। তারা বলাবলি করতে লাগলেন, (যদি হালাল হয়ে যাই তা হলে) স্ত্রীর সাথে মিলনের পরপরই আমাদের পক্ষে মিনায় যাওয়াটা কেমন হবে! তা অবগত হয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমি পরে যা জানতে পেরেছি তা যদি আগে জানতে পারতাম, তাহলে কুরবানীর পশু সাথে আনতাম না। আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকলে অবশ্যই ইহ্‌রাম ভঙ্গ করতাম। (হজ্জ এর সফরে) ‘আয়েশা (রাঃ) ঋতুবতী হওয়ার কারণে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ব্যতীত হজ্জ-এর অন্য সকল কাজ সম্পন্ন করে নেন। পবিত্র হওয়ার পর তাওয়াফ আদায় করেন, (ফিরার পথে) ‘আয়েশা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই হজ্জ ও ‘উমরাহ উভয়টি আদায় করে ফিরছে, আর আমি কেবল হজ্জ আদায় করে ফিরছি, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবদুর রহমান ইব্‌নু আবূ বকর (রাঃ) -কে নির্দেশ দিলেন, যেন ‘আয়েশা (রাঃ) -কে নিয়ে তান’ঈমে চলে যান, সেখানে গিয়ে ‘উমরাহর ইহ্‌রাম বাঁধবেন)। ‘আয়েশা রাঃ হজ্জের পর উমরা আদায় কর নিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫১)

১০. নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ইব্‌নু যুবাইরের খিলাফতকালে খারিজীদের হজ্জ আদায়ের বছর ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) হজ্জ পালন করার ইচ্ছা করেন। তখন তাঁকে বলা হল, লোকেদের মাঝে পরস্পর লড়াই সংঘটিত হতে যাচ্ছে, আর তারা আপনাকে বাধা দিতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বললেন, (আল্লাহ তা’আলা বলেছেন) “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে উত্তম আদর্শ”- (আল-আহযাবঃ ২১)। কাজেই আমি সেরূপ করব যেরূপ করেছিলেন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী করে বলছি, আমি আমার উপর ‘উমরাহ ওয়াজিব করে ফেলেছি। এরপর বায়দার উপকণ্ঠে পৌঁছে তিনি বললেন, হজ্জ এবং ‘উমরাহ’র ব্যাপার তো একই। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী করে বলছি, ‘উমরাহ’র সাথে আমি হজ্জকেও একত্রিত করলাম। এরপর তিনি কিলাদা পরিহিত কুরবানীর জানোয়ার নিয়ে চললেন, যেটি তিনি আসার পথে কিনেছিলেন। অতঃপর তিনি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা’ঈ করলেন। তাছাড়া অতিরিক্ত কিছু করেননি এবং সে সব বিষয় হতে হালাল হননি যেসব বিষয় তাঁর উপর হারাম ছিল- কুরবানীর দিন পর্যন্ত। তখন তিনি মাথা মুড়ালেন এবং কুরবানী করলেন। তাঁর মতে প্রথম তাওয়াফ দ্বারা হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে। এ সব করার পর তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপই করেছেন। (১৬৩৯)

       উপরের হাদিসের আলোকে দেখা যায় হজ্জ সম্পাদন করার বেশ কয়েকটি পদ্ধতি চাল আছে। হাদিসগুলোর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, হজ্জযাত্রী ব্যক্তি মীকাত থেকে শুধু হজ্জে নিয়ত করছে। আবার অনেকে মীকাত থেকে উমরা এবং হজ্জ দুটোরই নিয়ত। যারা হাদি না নিয়ে হজ্জে গমন করেছেন তারা উমরা পর হালাল হয়ে হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করে আবার নতুন কর হজ্জে নিয়ত করে হজ্জ কবছেন। আর যারা হাদি সঙ্গে নিয়ে আসেন, তারা উমরার পর হালাল না হয়ে হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করে একই ইহরানে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে। হাদিসের ভাষ্য মতে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদি নিয়ে হজ্জে আসেন, তাই তিনি হালাল না হয়ে একই ইহরামে হজ্জ সম্পাদন করে কিন্তু তিনি বলেছিলেন হাদি সঙ্গে না থাকলে তিনি হালাল হয়ে যেতেন। সাহবী (রাঃ) আমল থেকে দেখা যায় কেউ উমরার পর হালাল হয়েছেন (উসমান রাদিঃ ও আবূ মূসা আশ’আরী রাদিঃ) আবার কেউ হালাল হন নাই (আলী রাদিঃ)। তাই হাদিসের আলোকে বলা যায় হজ্জ তিন প্রকার। যথাঃ

১। তামাত্তু হজ্জ

২। কিরান হজ্জ

৩। ইফরাদ হজ্জ

ক। তামাত্তু হজ্জঃ

সাধারণ যারা হজ্জের নিয়তে ইহরাম বেধে মক্কায় প্রবেশ করে কিন্তু তাদের সাথে হাদী থাকে না। তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে। অর্থাৎ একই সফরে পৃথকভাবে প্রথমে উমরা ও পরে হজ্জ আদায় করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে। তামাত্তু হজ্জের সময় হলো পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। ৯ জিলহজ্জের পূর্বে যে কোন মুহূর্তে উমরা আদায় করে হালাল হয়ে গিয়ে আবার উকুফে আরাফার পূর্বে নতুন করে হজ্জের ইহরাম বাঁধা। এরপর ধারাবাহিকভাবে হজ্জের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করা। হজ্জের নিমিত্তে যারা মক্কার বাহির থেকে আসেন এবং আসার সময় হাদী সঙ্গে নিয়ে আসে না, তাদের জন্য তামাত্তু হজ্জই উত্তম।  কারও কারও মতে সর্বাবস্থায় তামাত্তু হজ্জ উত্তম।

দলিলঃ আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কী প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? ‘আলী (রাঃ) বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুরূপ। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমার সঙ্গে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি হালাল হয়ে যেতাম। (সহিহ বুখারি ১৫৫৮ তাওহীদ)

তামাত্তু হজ্জ দুটি পদ্ধতিতে আদায় করা যায়ঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জের সময় আরম্ভ হতে যদি বেশী দেরী থাকে তবে এর ফাঁকে, হজ্জের পূর্বেই মদিনায় গিয়ে জিয়ারত করে আসা। পরে মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে আবার উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করে উমরা সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

যারা সরাসরি মদিনা গমন করবে, তারাও এই পদ্ধতিতে মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করে উমরা সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাবে এবং ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

খ। কিরান হজ্জঃ

সাধারণ যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন, তারা একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন। এই ভাবে একই ইহরামে ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করা কে কিরান হজ্জ বলে। আমরা জানি তামাত্তু হজ্জের ক্ষেত্রে প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং পরে ইহরাম বেধে হজ্জ করে। কিন্তু কিরান হজ্জের ক্ষেত্রে প্রথমে উমরা কিন্তু হালাল হবে না। অর্থাৎ ইহরাম ত্যাগ করবে না। এই একই ইহরামে হজ্জের যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করবে। কিরান হজ্জের সময় হলো পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। তবে হজ্জ শুরুর ২/৪ দিন আগে আসলে এই কিরান করা সম্ভব। শাওয়ার মাসে কিরান হজ্জের নিয়তে মক্কা এসে এক দেড় মাস ইহরামে থাকে খু্বই কষ্ট কর। তাছাড়া এখন মক্কার বাজারে হাদি পাওয়া খুবই সহজ্জ লভ্য তাই হাদি সঙ্গে না এসে হজ্জে তামাত্তু করাই ভাল।

যদিও রাসুল সাঃ কিরান হজ্জ করেছিলেন কিন্তু তিনি তামাত্তু হজ্জের জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি উমরার পর মাত্র কয়েক দিন মক্কায় ইহরাম অবস্থায় ছিলেন।

কেরন হজ্জের দুটি পদ্ধতিঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে একত্রে হজ্জ ও উমরা উভয়টার নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা। মক্কায় পৌঁছে প্রথমে উমরা আদায় করা ও ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। হজ্জের সময় হলে এই একই ইহরামে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা। পবিত্র মক্কায় পৌঁছার পর উমরার তাওয়াফ শুরু করার পূর্বে হজ্জের নিয়ত উমরার সাথে যুক্ত করে নেয়া। উমরার তাওয়াফ-সাঈ শেষ করে, এহরাম অবস্থায় হজ্জের অপেক্ষায় থাকা ও ৮ জিলহজ্জ একই এহরামে মিনায় গমন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পাদন করা।

গ। ইফরাদ হজ্জঃ

সাধারণ যারা হজ্জের সফলে উমরা করার সময় সুযোগ পান না, তারা ইফরাদ হজ্জ করেন। অর্থাৎ হজ্জের মাসগুলোয় উমরা না করে শুধু হজ্জ করাকে ইফরাদ হজ্জ বলে। এ ক্ষেত্রে মীকাত থেকে শুধু হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধতে হয়। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম (আগমনি তাওয়াফ) করা। ইচ্ছা হলে এ তাওয়াফের পর সাঈও করা যায়। সে ক্ষেত্রে হজ্জের ফরজ তাওয়াফের পর আর সাঈ করতে হবে না। তাওয়াফে কুদুমের পর ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। ৮ জিলহজ্জ একই ইহরামে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে মিনার দিকে রওয়ানা হওয়া। ইফরাদ হজ্জকারীকে হাদী জবেহ করতে হয় না। তাই ১০ জিলহজ্জ কঙ্কর নিক্ষেপের পর মাথা মুন্ডন করে ইফরাদ হজ্জকারী প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যেতে পারে।

এই তিন প্রকারের মধ্যে কোন প্রকার হজ্জ আদায় করা উত্তমঃ

প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করছি। হাদিস পড়েই আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কোন প্রকারের হজ্জ উত্তম।

১. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫)

২. আবূ জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে তামাত্তু‘ হাজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে তা আদায় করতে আদেশ দিলেন। এরপর আমি তাঁকে কুরবানী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তামাত্তু‘র কুরবানী হলো একটি উট, গরু বা বকরী অথবা এক কুরবানীর পশুর মধ্যে শরীকানা এক অংশ। আবূ জামরাহ (রহ.) বলেন, লোকেরা তামাত্তু‘ হাজ্জকে যেন অপছন্দ করত। একদা আমি ঘুমালাম তখন দেখলাম, একটি লোক যেন (আমাকে লক্ষ্য করে) ঘোষণা দিচ্ছে, উত্তম হাজ্জ এবং মাকবূল তামাত্তু‘। এরপর আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এসে স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করে বললেন, এটাই তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। আদম, ওয়াহাব ইবনু জারীর এবং গুনদার (রহ.) শু‘বাহ্ (রহ.) হতে মাকবূল ‘উমরাহ এবং উত্তম হাজ্জ বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৮)

মন্তব্যঃ এইদুটি সহিহ হাদিসের আলোকে ষ্পষ্টভাবে বুঝা যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিরান হজ্জ আদায় করে ছিলেন কিন্তু তিনি তামাত্তু হজ্জেই উত্তম বলেছেন। যদি তিনি আল্লাহ তরফ থেকে আগেই জানতে পারতেন তবে তিনি তামাত্তু হজ্জ আদায় করতেন।

উমরার ফরজ আমল ও ওয়াজিব আমলঃ

উমরার ফরজ তিনটি।উমরার ওয়াজিব তিনটি
১. ইহরাম বাঁধা। ২. তাওয়াফ করা ৩. সাঈ করা।  ১. ইহরামের কাপড় পরে উমরার নিয়ত করার কাজটি মীকাত পার হওয়ার আগেই করা। ২. ‘সাফা ও মারওয়া’ এ দু’টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করা। কিছু আলেম একে রুকন অর্থাৎ ফরয বলেছেন। ৩. চুল কাটা (মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা)।

হজ্জের ফরজ আমল ও ওয়াজিব আমলঃ

হজ্জের ফরজ তিনটি।হজ্জের ওয়াজিব নয়টি
১. ইহরাম বাঁধা
২. আরাফাতে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে ইফাদা  
১. সাঈ করা। (অনেকের মতে এটা হজ্জের ফরজ আমল)
২. মীকত থেকে ইহরাম বাঁধা
৩. আরাফাতে অবস্থান সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা।
৪. মুযদালিফায় রাত্রি যাপন।
৫. মুযদালিফার পর কমপক্ষে দুই রাত্রি মিনায় যাপন করা।
৬. কঙ্কর নিক্ষেপ করা।
৭. হাদী (পশু) জবাই করা (তামাত্তু ও কিরান হাজীদের জন্য।)
৮. চুল কাটা।
৯. বিদায়ী তাওয়াফ।

এক নজরে তিন প্রকার হজ্জের ধারাবাহিক আমলগুলোঃ

তামাত্তু হজ্জের ধারাবাহিক আমলকিরান হজ্জের ধারাবাহিক আমলইফরাত হজ্জের ধারাবাহিক আমল
১। উমরার জন্য ইহরাম বাধা
২। উমরার জন্য তাওয়াফে কুদুম করা (মক্কায় পৌছার পরই)
৩। উমরার সাঈ করা ৪। উমরার জন্য মাথা মুন্ডানো (এর মাধ্যমে সে হালাল হলো) ৫। হজ্জের জন্য ইহরাম বাধা (৮ তারিখ মক্কায়) ৬। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৭। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা (১০, ১১ অথবা ১২ জিলহজ্জ যে কোন দিন) ৮। হজ্জের সায়ী
৯। বড় জামারাতে ৭টি পাথর মারা (১০ জিলহজ্জ সকালে মারা সুন্নত)
১০। কুরবানী করা (হালাল হতে হলে কুরবানী করতে হবে)
১১। কুরবানীর পর মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ১২।  ১১ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১৩। ১২ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১৪। ১২ জিলহজ্জ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১৫। বিদায়ী তাওয়াফ করা এর মাঝেঃ  
১। হজ্জ ও উমরার জন্য ইহরাম বাধা
২। উমরার জন্য তাওয়াফে কুদুম করা  (মক্কায় পৌছার পরই) ৩। উমরার সাঈ করা ৪। ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৫। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা (১০, ১১ অথবা ১২ জিলহজ্জ একবার) ৬। হজ্জের সায়ী
৭। বড় জামারাতে ৭টি পাথর মারা (১০ জিলহজ্জ সকালে মারা সুন্নত)
৮। কুরবানী করা (হালাল হতে হলে কুরবানী করতে হবে)
৯। কুরবানীর পর মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ১০।  ১১ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১১। ১২ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১২। ১২ তারিখ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১৩। বিদায়ী তাওয়াফ করা  
১। শুধু হজ্জ ইহরাম বাধা ২। ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৩। বড় জামারাতে ৭টি পাথর (মারা ১০ জিলহজ্জ সকালে) ৩। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা ৫। হজ্জের সায়ী
৬। মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ৭।  ১১ তারিখ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ৮। ১২ তারিখ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ৯। ১২ তারিখ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১০। বিদায়ী তাওয়াফ করা  

এক নজরে তারিখ অনুসারে হজ্জের ধারাবাহিক কাজগুলোঃ

তারিখস্থানকরনীয় ইবাদত
৮ই জিলহজ্জ  এবং এর আগে যারা বাহির থেকে মক্কায় প্রবেশ করবেন)মীকাত১) মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধবেন।
মক্কা২) কাবা ঘরে উমরার তাওয়াফ করবেন। ৩) সাঈ করবেন। ৪) চুল কেটে হালাল হয়ে যাবেন।
৮ই জিলহজ্জনিজ বাসস্থান  এবং মিনানিজ বাসস্থান থেকে ইহরাম বেঁধে হজ্জের নিয়ত করে সূর্যোদয়ের পর মিনায় রওয়ানা হবেন। সেখানে যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের সালাত আদায় করবেন।
৯ জিলহজ্জআরাফা ময়দান১) সূর্যোদয়ের পর মিনা অথবা নিজ বাসস্থান থেকে আরাফাতে রওয়ানা হবেন। ২) যুহরের প্রথম ওয়াক্তে যুহর ও আসর পড়বেন একত্রে পরপর দুই দুই রাকআত করে। ৩) আরাফায় দোয়া, দুরুদ ও জিকির করে সময় পার করতে হবে। ৪) সূর্যাস্ত পর্যান্ত অবস্থান করতে হবে। সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করলে হজ্জ শুদ্ধ হবে না।
১০ জিলহজ্জ (৯ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর)মুজদালীফা১) সূর্যাস্তের পর আরাফার ময়দান থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা করবেন। মুযদালিফার পৌছে মাগরিব এশা জমা করে একত্রে পড়বেন। ২) সেখানে রাত্রি যাপন করে প্রথম ওয়াক্তে অন্ধকার থাকতেই ফজর পড়বেন। ৩) আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত কেবলামুখী হয়ে হাত তুলে দীর্ঘ সময় দোয়া ও মোনাজাতে মশগুল থাকবেন। ৪) বড় জামারায় নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর এখান থেকে কুড়াতে পারেন।
১০ ই জিলহজ্জমিনা১) বড় জামরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করবেন। ২) কুরবানী করবেন, সমস্যা হলে পরে করা যাবে। ৩) চুল কাটাবেন। (কুরবানি না হলে চুল কাটা যাবে না)। ৪) চুল কাটার পর ইহরামের কাপড় বদলিয়ে হালাল হতে হবে।
মক্কা১) তাওয়াফে ইফাদা করবেন। এই দিন না পারলে এটি ১১ বা ১২ তারিখেও করতে পারবেন। ২। তাওয়াফের পর সাথে সাথে সাঈও করবেন।
১১ জিলহজ্জ (আইয়ামে তাশরীকের প্রথম দিন)মিনা১) দুপুরের পর সিরিয়াল ঠিক রেখে প্রথমে ছোট, মধ্যম ও এর পরে বড় জামরায় প্রত্যেকটিতে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করবেন। ২) মিনায় রাত্রি যাপন করবেন।
১২ জিলহজ্জ (আইয়ামে শরীকের দ্বিতীয় দিন)মিনা১) পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী ৩টি জামরায় ৭+৭+৭=২১টি কংকর নিক্ষেপ করবেন। দুপুরের আগে কংকর নিক্ষেপ করবেন না। ২) সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করবেন। তা না পারলে আজ দিবাগত রাতও মিনায় কাটাবেন।
১৩ জিলহজ্জ (আইয়ামে শরীকের তৃতীয় দিন)মিনা১) যারা গত রাত মিনায় কাটিয়েছেন তারা আজ দুপুরের পর পূর্ব দিনের নিয়মেই ৭টি করে মোট ২১ টি কংকর মারবেন। অতঃপর মিনা ত্যাগ করবেন।
১৪ জিলহজ্জ বা তার পরের যে কোন দিনমক্কাদেশে ফেরার পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন।

বদলী হজ্জঃ

যদি কোন ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরজ এবং উমরা ওয়াজিব হয় কিন্তু ওজরের কারনে তার পক্ষে সশরীরে তা আদায় করা সম্বব নয়। এই ক্ষেত্রে, তার পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে অন্য কোন ব্যক্তিকে দিয়ে হজ্জ বা উমরা আদায় করা কে বদলী হজ্জ বা বদলী উমরা বলে। বেশ কিছু সহিহ হাদিস দ্বারা বদলী হজ্জ ও বদলী উমরার বিধান প্রমাণিত হয়। নীচে হাদিসগুলো উল্লেখ করা হল।

১. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ফযল ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) একই বাহনে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে আরোহণ করেছিলেন। এরপর খাশ‘আম গোত্রের জনৈক মহিলা উপস্থিত হল। তখন ফযল (রাঃ) সেই মহিলার দিকে তাকাতে থাকে এবং মহিলাটিও তার দিকে তাকাতে থাকে। আর আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফযলের চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে থাকে। মহিলাটি বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আল্লাহ্‌র বান্দার উপর ফরজকৃত হজ্জ আমার বয়োঃবৃদ্ধ পিতার উপর ফরজ হয়েছে। কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, আমি কি তাঁর পক্ষ হতে হজ্জ আদায় করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ (আদায় কর)। ঘটনাটি বিদায় হজ্জের সময়ের। (সহিহ বুখারী ১৫১৩ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬৪৩ ইফাঃ, আবু দাউদ ১৮০৯)

মন্তব্যঃ পুরুষের পক্ষ থেকে নারী হজ্জ আদায় করতে পারে।

২. আবু রুযাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা একজন বয়োবৃদ্ধ লোক, হজ্জ ও উমরাহ করার ক্ষমতা তার নেই এবং বাহনে আরোহণেরও। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে তুমি তোমার পিতার পক্ষ খেকে হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৩ ইফাঃ)

৩. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, বিদায় হজ্জের বছর খাস‘আম গোত্রের একজন মহিলা এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর তরফ হতে বান্দার উপর যে হাজ্জ ফরজ হয়েছে তা আমার বৃদ্ধ পিতার উপর এমন সময় ফরজ হয়েছে যখন তিনি সওয়ারীর উপর ঠিকভাবে বসে থাকতে সক্ষম নন। আমি তার পক্ষ হতে হাজ্জ আদায় করলে তার হাজ্জ আদায় হবে কি? তিনি বললেনঃ হাঁ (নিশ্চয়ই আদায় হবে)। (সহিহ বুখারি ১৮৫৪)

কার জন্য বদলী হজ্জ করান ওয়াজিবঃ

যে ব্যক্তি অতি বার্ধক্যে উপনীত অথবা যার সুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন রোগের কারণে হজ্জ-উমরা আদায়ে অক্ষম এ অবস্থায় যদি সে আর্থিকভাবে সক্ষম হয় তবে তার ওপর হজ্জ ফরয হবে না। কেননা হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত তার উপর আরোপিত হয় নাই। হজ্জ ফরজের অন্যতম শর্ত হলো, সফরের আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা। অপর পক্ষে কোন ব্যক্তি যদি বর্তমানে শারীরিকভাবে অক্ষম কিন্তু অক্ষম  হওয়ার আগেই তার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছিল। অর্থাৎ সে শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম ছিল। তার কর্তব্য হল, তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায়ের জন্য একজনকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা। এমনকি যার ওপর হজ্জ ফরয সে যদি হজ্জ না করেই মারা যায় আর তার সম্পদ থাকে, তাহলে তার সে সম্পদ থেকে হজ্জের খরচ পরিমাণ অর্থ নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে তার বদলী হজ্জ আদায় করাতে হবে।

দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আমার আম্মা হাজ্জের মানৎ করেছিলেন তবে তিনি হাজ্জ আদায় না করেই ইন্তিকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ হতে হাজ্জ করতে পারি? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার পক্ষ হতে তুমি হাজ্জ আদায় কর। তুমি এ ব্যাপারে কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তা হলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহর হক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহ্‌র হকই সবচেয়ে বেশী আদায়যোগ্য।(সহিহ বুখারি ১৮৫২, ৬৬৯৯, ৭৩১৫, নাসাঈ ২৬৩৩)

বদলী হজ্জের পূর্বে নিজের হজ্জ করা জরুরীঃ

বিশুদ্ধ মতানুসারে হজ্জ ও উমরার প্রতিনিধি হওয়ার আগে তার নিজের হজ্জ করা জরুরী। তবে ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এর মতে, বদলী হজ্জ করার জন্য তার পূর্বে হজ্জ করা জরুরী নয়। তবে যিনি পূর্বে হজ্জ করেছেন তাকে দিয়ে বদলী হজ্জ করানো উত্তম।

এর বিপরীতে মুজতাহীদ আলেমগন মনে করেন যে, যারা নিজের ফরজ হজ্জ করেন নাই, তাদের জন্য অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করা যাবে না। কোন মুসলিম যদি অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করতে চায় তাহলে আগে তাকে নিজের হজ্জ করতে হবে। এই কথার দলিল হলোঃ

দলিলঃ ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনেন, ‘‘লাব্বায়েক আন্ শুবরুমা’’ (আমি শুবরুমার পক্ষে হাযির)। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ শুবরুমা কে? সে ব্যক্তি বলে, আমার ভাই অথবা আমার বন্ধু। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ আচ্ছা তুমি কি হজ্জ করেছ? সে বলে, না। তিনি বলেনঃ প্রথমে তুমি নিজের হজ্জ আদায় কর, পরে শুবরুমার হজ্জ সম্পন্ন কর। (সুনানে আবু দাউদ ১৮১১ ইফাঃ)

বদলী হজ্জ প্রকারণঃ

উপরে আলোচিত তিন প্রকার হজের মধ্যে বদলী হজ্জ কোন্ প্রকারের হবে, তা যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ করা হচ্ছে তিনি নির্ধারণ করে দেবেন। যদি ইফরাদ করতে বলেন, তাহলে ইফরাদ করতে হবে। যদি কিরান করতে বলেন, তাহলে কিরান করতে হবে। আর যদি তামাত্তু করতে বলেন, তাহলে তামাত্তু করতে হবে। এর অন্যথা করা যাবে না। মনে রাখবেন, বদলী হজ্জ ইফরাদই হতে হবে, এমন কোন কথা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে বলেছিলেন,

তাহলে তুমি তোমার পিতার পক্ষ খেকে হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৩ ইফাঃ)

এই হাদীসে হজ্জ ও উমরা উভয়টার কথাই আছে। এতে প্রমাণিত হয়, বদলী হজ্জকারী তামাত্তু ও কিরান হজ্জ করতে পারবে। বদলি হজ্জকারী ইফরাদ ভিন্ন অন্য কোনো হজ্জ করলে তার হজ্জ হবে না, হাদিসে এমন কোনো বাধ্য বাধকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘হজ্জ’ শব্দ উচ্চারণ করলে শুধুই ইফরাদ বোঝাবে, এর পেছনেও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। বদলি-হজ্জ কেবলই ইফরাদ হজ্জ হতে হবে, ফেকাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবেও এ কথা লেখা নেই। ফেকাহশাস্ত্রের কিতাবে যা লেখা আছে, তা হল, বদলি-হজ্জ যার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে তিনি যে ধরনের নির্দেশ দেবেন সে ধরনের হজ্জই করতে হবে। সার কথা হল, যিনি হজ্জ করাবেন তিনি ইফরাদ বা তামাত্ত যে হজ্জ আদায়ের কথা বলবেন, সেই হজ্জই আদায় করা উত্তম।  (হজ্জ উমরা ও যিয়ারতের গাইড, ইসলাম হাউজ.কম)

বদলী হজ্জ সম্পর্কে কয়েকটি মাসায়েলঃ

ক। বদলী হজে প্রেরণকারীর উচিত একজন সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে তার পক্ষে হজ্জ করতে পাঠানো, যিনি হজ্জ-উমরার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত এবং যার অন্তরে রয়েছে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়।

খ। বদলী হজ্জকারির কর্তব্য আপন নিয়ত পরিশুদ্ধ করা। তার নিয়ত হবে, আমি মুসলিম ভাই বা আত্মীয় হিসাবে মৃত ব্যক্তিকে তার হজ্জের দায় থেকে মুক্ত করতে যাই। এর মাধ্যমে হয়ত তিনি আল্লাহর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে তার উপকার করতে।

গ। যতটুকু অর্থ খরচ হবে তাই গ্রহণ করবে। অবশিষ্টগুলো ফেরত দেবে।

ঘ। যে ব্যক্তি হজ্জ করতে এবং হজের নিদর্শনাবলি দেখতে ভালোবাসে অথচ সে হজের খরচ যোগাতে অক্ষম। অতএব সে তার প্রয়োজন পরিমাণ অর্থ নেবে এবং তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে হজের ফরয আদায় করবে। বদলী হজ্জকারী হজের জন্য টাকা নেবে কিন্তু টাকার জন্য হজে যাবে না। আশা করা যায়, এ ব্যক্তি বিশাল নেকির অধিকারী হবে এবং তাকে প্রেরণকারীর মতো সেও পূর্ণ হজের সওয়াব পাবে ইনশাআল্লাহ।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মানতের হজ্জ আদায়ঃ

যাদের উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং হজ্ব আদায়ের সক্ষমতাও ছিল, কিন্তু শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করেনি। অতপর হজ্ব আদায়ের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, এমন ব্যক্তি পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানো যায়। কোন ব্যক্তির হজ্জ ফরজ কিন্তু তিনি হজ্জ আদায়ের পূর্বেই মৃত্যু বরণ করেছেন বা কোন ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানোর অসিয়ত করে গিয়েছেন তার পক্ষ থেকেও বদলী হজ্জ করার যাবে।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আমার আম্মা হাজ্জের মানৎ করেছিলেন তবে তিনি হাজ্জ আদায় না করেই ইন্তিকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ হতে হাজ্জ করতে পারি? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার পক্ষ হতে তুমি হাজ্জ আদায় কর। তুমি এ ব্যাপারে কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তা হলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহর হক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহ্‌র হকই সবচেয়ে বেশী আদায়যোগ্য। (সহিহ বুখারী ১৮৫২ তাওহীদ, সুনানে নাসাঈ ২৬৩৪)

২. মূসা ইবন সালামা হুযালী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সিনান ইবন সালামা জুহানী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাকে বললেন, যেন তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেন যে, তার মাতা হজ্জ না করেই ইনতিকাল করেছেন। তার মাতার পক্ষ থেকে সে হজ্জ করলে তা যথেষ্ট হবে কি ? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, যদি তার কোন দেনা থাকতো আর তার পক্ষ হতে সে আদায় করতো, তা হলে কি তার মাতার পক্ষ থেকে তা আদায় হতো না। অতএব সে যেন তার মাতার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করে। সুনানে নাসাঈ ২৬৩৫)

৩. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর পিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করল যে, তিনি হজ্জ না করে ইনতিকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬৩৬)

৪. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, খাছ’আম গোত্রের একজন মহিলা মুযদালফায় সকালে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পিতার অতি বৃদ্ধাবস্থায় তার উপর হজ্জ ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, এমতাবস্থায় আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। সুনানে নাসাঈ ২৬৩৭)

৫. আবু রাযীন উকায়লী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা একজন অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি, হজ্জ ও উমরাহ করার মত ক্ষমতা নেই এবং আরোহণেরও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ এবং উমরাহ আদায় কর।সুনানে নাসাঈ ২৬৩৯)

এই সফরে বার বার উমরা করাঃ

এক সফরে একাধিক বার উমরা করা ইসলামি শরীয়ত সম্মত কোন ইবাদাত নয়। কারন এই উমরা আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবী (রাঃ) থেকে প্রমানিত নয়। সময় সুযোগ থাকার সত্বেও আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবী (রাঃ) এমন আমল করেন নাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে মোট চারবার উমরা পালন করেছেন। তারার উমরাগুলো হলোঃ

হুদাইবিয়ার উমরা, উমরাতুল কাযা, হুনাইনের যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় এবং শেষ উমরাটি করের বিদায় হজের সাথে। সাহাবীদের (রাঃ) কেউ বিদায় হজ্জের সফরে এক বারের বেশি উমরা করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ‘উমরাহ পালন করেছেন। তিনি হাজ্জের সঙ্গে যে ‘উমরাটি পালন করেন সেটি ব্যতীত সবকটিই যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর ‘উমরাটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর পরের বছরের ‘উমরাটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে এবং হুনাইনের প্রাপ্ত গানীমাত যে জিঈরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখানের ‘উমরাটিও ছিল যুলকাদাহ্ মাসে, আর তিনি হাজ্জের সঙ্গে একটি ‘উমরাহ্ পালন করেন। (সহিহ বুখারি ৪১৪৮ তাওহীদ প্রকাশনি)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত বার উমরা করেছেন, তিনি মক্কার বাহির থেকে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মীকাত থেকে ইহরাম বেঁধে উমরা করেছেন। কিন্তু মক্কায় প্রবেশের পর মক্কা থেকে বের হয়ে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে, তিনি কখনো উমরা করেন নি। এমনকি হিজরতের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেরো বছর মক্কায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি কখনো মক্বার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে উমরা করেন নি।

হজ্জের সময় দেখা যায় অনেক হাজিগন মক্কার বাইরে তান‘ঈম গিয়ে মসজিদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা করে থাকে। যারা মসজিদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা করে তাদের যুক্তি বিদায় হজ্জের সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তান‘ঈম থেকে ইহরাম বেঁধে উমরা পালন করেছেন। তাই তারা এই স্থান থেকে ইহবাম বেধে বার বার উমরা করে থাকে।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫ তাওহীদ প্রকাশনি)

মন্তব্যঃ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর উপরা পালনের সাহ্যয্য করেত তার সাথে ছিল তার ভাই আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। সময় সুযোগ সব কিছু থাকা সত্বেও তিনি তার বোন আয়েশার সাথ উমরা করেন নাই। বরং আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু যদি তার বোন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর সাথে উমরা করতে তবে তার আরও বেশী সাহায্য হত। এই থেকে বুঝ যায়, তান‘ঈম থেকে উমরা করার প্রচলনটি ছিল বিশেষ একটি প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে। অন্যথায় হজের সফরে বা একই সফরে বার বার উমরা করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত নয়।

সাহাবীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা একবার উমরা আদায় করার পর তাদের মাথার চুল কালো না হওয়া পর্যন্ত পূণরায় উমরা পালন করতেন না। চুল কালো হওয়ার পর উমরা করতেন।

সুন্নাত হচ্ছে হাজীগণ হজের সময় উমরা শেষ করে, হালাল অবস্থায় মক্কা অবস্থান করবেন। আর যারা হাদি সংঙ্গে নিয়েছেন তারা হালাল হবেন না। তাই হজ্জের সফরে একাধিক বার উমরা না করে, বার বার কারা ঘর তাওয়াফ করাই হল অধিক উত্তম। তবে যখন উমরাকারীদের খুব ভীড় থাকবে তখন বেশি বেশি তাওয়াফ না করে বেশি বেশি সালাত, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরে ব্যস্ত থাকা। তাওয়াফ শেষে মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, মুরব্বীদের জন্য দো‘আ করুন। কারো নামে উমরা করা বা কারো জন্য উমরা করা ইত্যাদি পরিহার করুন। আপনি কত বেশি আমল করলেন, এটি আল্লাহর নিকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আপনি কতটুক আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করলেন।

হজ্জের মীকাত

হজ্জের মীকাত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মীকাত :

হজ্জ বা উমরার নিয়তে মক্কার কাবা ঘরের উদ্যশ্যে গমনকারীদেরকে কাবা হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বে থেকে ইহরাম বাঁধতে হয় যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এই স্থানগুলোকে মীকাত বলা হয়। হারাম শরীফের চর্তুদিকেই মীকাত রয়েছে। হজ্জের সময় নির্দষ্ট দিন ক্ষন থাকলেও উমরা জন্য কোন নির্দিষ্ট দিন ক্ষন নাই। তাই সময়ের হিসাবে ও হজ্জের সময়ের মীকার আছে। এই হিসাবে মীকাত দুই প্রকার। যথাঃ 

১। সময়ের মীকাত

২। স্থানের মীকাত

সময়ের মীকাত :

হজ্জের জন্য সময় নির্দিষ্ট করা আছে। মহান আল্লাহই হজ্জের তারিখ নির্দষ্ট করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُوْلِي الأَلْبَابِ

অর্থঃ হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الأهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ

“নতুন চাঁদ সম্পর্কে লোকেরা আপনাকে প্রশ্ন করে, বলুন, তা মানুষ এবং হজ্জের জন্য সময় নির্দেশক।

(সুরা বাকারাঃ ২:১৮৯)।

১. ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, হজ্জ-এর মাসগুলো হলঃ শাওয়াল, যিলক্বাদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুন্নাত হল, হজ্জের মাসগুলোতেই যেন হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা হয়। কিরমান ও খুরাসান হতে ইহ্‌রাম বেঁধে বের হওয়া ‘উসমান (রাঃ) অপছন্দ করেন।

২. ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারবিয়ার দিন (৮ যিলহজ্জ) মিনায় যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামায পড়েন, অতঃপর ভোরবেলা আরাফাতে রওয়ানা হন। (ইবনে মাজাহ ৩০০৪, তিরমিজি ৮৮০ ইফাঃ)

হজ্জের সময়ের মীকাত দুই মাস দশ দিন। সময়ের মীকাত হল শাওয়াল মাস থেকে যিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত এ সময়গুলোকে হজ্জের মাস বলা হয়। অপরদিকে উমরা জন্য কোন সময় নির্দিষ্ট নেই। বছরের যে কোন সময় উমরার নিয়ত করা যাবে, শুধু জিলহজ্জের ৮ থেকে ১৩ পর্যান্ত যে কয় দিন হজ্জের কার্যক্রম চলে এই কয় দিন বাদ দিতে হবে।

১. ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, হজ্জ-এর মাসগুলো হলঃ শাওয়াল, যিলক্বাদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুন্নাত হল, হজ্জের মাসগুলোতেই যেন হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা হয়।

২. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বলেনঃ যদি কেউ হজ্জের মাসে অর্থাৎ শাওয়াল, যিলকা’দা, যিলহজ্জ মাসে হজ্জের পূর্বে উমরা আদায় করিয়া মক্কায় এতদিন অবস্থান করে, যতদিনে সে হজ্জই আদায় করিতে পারে, তাহার এই হজ্জ তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাহার উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। যদি কুরবানী করার সামর্থ্য তাহার না থাকে তবে মক্কায় অবস্থানকালে তিনদিন এবং বাড়ি ফিরিয়া আর সাতদিন তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ উক্ত হুকুম তখনই প্রযোজ্য হইবে যখন উমরা সমাপন করিয়া হজ্জ পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানরত থাকিবে এবং হজ্জও করিবে।

৩. মালিক (রহঃ) বলেনঃ মক্কার বাসিন্দা কোন ব্যক্তি অন্য কোথাও গিয়া বসতি স্থাপন করিল। হজ্জের মাসে সে উমরা করিতে আসিয়া মক্কায় অবস্থান করিয়া হজ্জ সমাধা করিল। তাহার এই হজ্জ হজ্জে তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে। এই ব্যক্তির উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। কুরবানী করিতে না পারিলে তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মক্কার অপরাপর স্থায়ী বাসিন্দার মত তাহার হুকুম হইবে না। (মুয়াত্তা মালিক ৭৬০, হজ্জ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ১৯, রেওয়াত ৬৫ ইফাঃ)

৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজের মাসসমূহ ছাড়া অন্য মাসে উমরা পালনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি রমাজান মাসে হজ্জ করার ফজিলত বর্ণনা করেছেন।

৫. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারী মহিলাকে বললেনঃ আমাদের সঙ্গে হাজ্জ করতে তোমার বাধা কিসের? ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) মহিলার নাম বলেছিলেন কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। মহিলা বলল, আমাদের একটি পানি বহনকারী উট ছিল। কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (অর্থাৎ মহিলার স্বামী ও ছেলে) আরোহণ করে চলে গেছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন পানি বহনকারী আরেকটি উট যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আচ্ছা, রমাযান এলে তখন ‘উমরাহ করে নিও। কেননা, রমযানের একটি ‘উমরাহ একটি হাজ্জের সমতুল্য। অথবা এরূপ কোন কথা তিনি বলেছিলেন। (সহিহ বুখারী ১৭৮২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ হজ্জের মাস শুরু হওয়ার আগে হজ্জের ইহরাম সহীহ নয়। আল্লাহ তা‘আলা হজের মাসসমূহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই হজ্জের মাস শুরু হওয়ার আগে (শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের আগে) হজ্জের ইহরাম বাঁধা বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সঠিক নয়। অর্থাৎ শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের আগে ইহরাম বাধলে তান উমরার ইহরাম হিসেবে গণ্য হবে। ঠিক তেমনিভাবে হজ্জের কোন আমল উযর ছাড়া যিলহজ্জ মাসের পরে পালন করা জায়েয নয়। তবে নিফাসবতী মহিলা যিলহজ্জ মাসে পবিত্র না হলে তিনি ফরয তাওয়াফ যিলহজ্জ মাসের পরে আদায় করতে পারবেন।

স্থানের মীকাত :

পূর্বেই বলেছি, হজ্জের উদ্দেশ্য মক্কা (বাইতুল্লহ) গমনকারীদেরকে বাইতুল্লাহ হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বে থেকে ইহরাম বাঁধতে হয়, যে স্থানগুলো নবীজির হাদীস দ্বারা নির্ধারিত তাকে স্থানের মীকাত বলে।

মিকাত সম্পর্কিত নিম্মের হাদিসগুলো লক্ষ করি।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহ্‌রাম বাঁধার স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, মদিনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহফা, নজদবাসীদের জন্য কারনুল-মানাযিল, ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম। উল্লেখিত স্থানসমূহ হাজ্জ (হজ্জ) ও ‘উমরার নিয়্যাতকারী সেই অঞ্চলের অধিবাসী এবং ঐ সীমারেখা দিয়ে অতিক্রমকারী অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ইহরাম বাঁধার স্থান এবং মীকাতের ভিতরে স্থানের লোকেরা নিজ বাড়ি থেকে ইহ্‌রাম বাঁধবে। এমনকি মক্কাবাসীগণ মক্কা থেকেই ইহ্‌রাম বাঁধবে। (সহিহ বুখারী ১৪৩৬ ইফাঃ, ১৫৩০ তাওহীদ সুনানে নাসাঈ ২৬৬০))

২. আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনাবাসীরা ইহরাম বাঁধবে যুলহুলাইফ থেকে, আর সিরিয়াবাসীগণ জুহফা নামক স্থান থেকে, নজদবাসীগণ কারন’ নামক স্থান হতে। আমর নিকট বর্ণনা পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আর ইয়ামানবাসীগণ তালবিয়া পাঠ করবে ইয়ালামালাম থেকে। (সুনানে নাসাঈ ২৬৫৩)

২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদের জন্য ‘যুল হুলায়াফা’ কে মীকাত নির্ধারণ করেছেন এবং সিরিয়া ও মিশরবাসীদের জন্য ‘জুহফা’, ইরাকীদের জন্য ‘যাতি ইরক’-কে আর ইয়ামানবাসীদের জন্য ‘ইয়ালামালাম’ কে। (সুনানে নাসাঈ ২৬৫৫)

৪. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ শহর দু’টি (কূফা ও বসরা) বিজিত হল, তখন সে স্থানের লোকগন ‘উমর (রাঃ) এর নিকট এসে নিবেদন করল, হে আমীরুল মু’মিনীন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদবাসীগণের জন্য (মীকাত হিসাবে) সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন কারন, কিন্তু তা আমাদের পথ থেকে দূরে। কাজেই আমরা কারন-সীমায় অতিক্রম করতে চাইলে তা হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ‘উমর (রাঃ) বললেন, তা’ হলে তোমরা লক্ষ্য কর তোমাদের পথে কারন-এর সম দূরত্ব-রেখা কোন স্থানটি? তারপর তিনি যাতু’ইরক মীকাতরূপে নির্ধারণ করেছেন। (সহিহ বুখারী ১৪৪০ ইফাঃ)

৫. আবদুল্লাহ ‘ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, যখন এ শহর দু’টি (কূফা ও বস্‌রা) বিজিত হলো, তখন সে স্থানের লোকগণ ‘উমর (রাঃ) এর নিকট এসে নিবেদন করলো, হে আমীরুল মু’মিনীন ! আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাজদবাসীগণের জন্য (মীকাত হিসেবে) সীমা নির্ধারন করে দিয়েছেন ক্বারণ, কিন্তু তা আমাদের পথ হতে দূরে। কাজেই আমরা ক্বারণ-সীমা অতিক্রম করতে চাইলে তা হবে আমদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ‘উমর (রাঃ) বললেন, তা হলে তোমরা লক্ষ্য কর তোমাদের পথে ক্বারণ-এর সম-দূরত্বরেখা কোন স্থানটি? অতঃপর “যাতু ইরক্ব” মীকাতরূপে নির্ধারন করেছেন। (সহিহ বুখারী ১৫৩১ তাওহীদ প্রকাশনী)

৬. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরাকবাসীদের জন্য ‘যাতু ইরক’ কে মীকাত নির্ধারণ করেছেন। (আবু দাউদ ১৭৩৯ ইফাঃ)

উপরের হাদিসগুলো ষ্পষ্টভাবে মীকাতের স্থানগুলোর নাম উল্লেখ করছেন। হাদিসসমূহে উল্লেখ থাকার কারনে হজ্জের মীকাত নিয়ে মুসলিমদের মাঝে কোন প্রকার মতভেদ নাই। হাদিসগুলির আলোকে যে কেউ তার মীকাত সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমরাও হাদিসেগুলোর আলোকে বলেত পারি সব মিলিয়ে মীকাতের স্থানগুলো নিম্মরুপঃ

১। মদ্বীনাবাসীদের জন্য যুল হুলাইফা

২। সিরিয়াবাসীদের জন্য আল-জুহফা

৩। নজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল

৪। ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম

৫। ইরাকবাসীদের জন্য যাতুইরক

৬। মীকাতে অবস্থানকারীগণ নিজ বাড়ি

৭। মক্কাবাসীদের মীকাত মক্কা

মন্তব্যঃ মক্কাবাসি বাদে পৃথিবীর সকল মুসলিদের জন্য মীকত পাঁচটি। এই জন্য অনেকে মীকাতের স্থান পাঁচ হিসাবে উল্লেখ করে থাকে। আমি এখানে বুঝার জন্য সাতটি উল্লেখ করছি।

ক। যুল-হুলাইফাঃ

যুলহুলাইফা স্থানটি এখন ‘আবইয়ারে আলী’ নামে পরিচিত। এটি মসজিদে নববী থেকে ১৩ কিলোমিটার এবং মক্কা শহর থেকে ৪২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মদ্বীনাবাসী এবং এ পথ দিয়ে যারা আসে তারা এখান থেকে ইহরাম বাধবে। মক্কা শহর থেকে এটাই সবচেয়ে দূরতম মীকাত।

খ। আলজুহফাঃ

আলজুহফা স্থানটি লোহিত সাগর থেকে ১০ কিলোমিটার ভিতরে ‘রাবেগ’ শহরের কাছে। জুহফাতে চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ‘রাবেগ’ নামক স্থান থেকে এখন লোকেরা ইহরাম পরে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এখন এটি একটি বড় শহর। জম্মুম উপত্যকার পথ ধরে মক্কা শহর থেকে এ স্থানটি ১৮৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যেসব দেশের লোকেরা এখান থেকে ইহরাম পরিধান করে তা হলঃ

(ক) সিরিয়া, (খ) লেবানন, (গ) জর্দান, (ঘ) ফিলিস্তীন, (ঙ) মিশর, (চ) সূদান, (ছ) মরক্কো, (জ) আফ্রীকার দেশসমূহ (ঝ) সৌদী আরবের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু এলাকা এবং (ঞ) মদ্বীনার পথ ধরে যারা আসে না তারাও এখান থেকে ইহরাম বাঁধে।

গ। কারনুল মানাযিলঃ

কারনুল মানাযিল স্থানটি এখন “সাইলুল কাবীর” নামে প্রসিদ্ধ। সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতসহ এটি এখন একটা বড় গ্রাম। মক্কা থেকে এর দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার। যেসব এলাকা ও দেশের লোকেরা এখান থেকে ইহরাম বাঁধে সেগুলো হলঃ (ক) রিয়াদ, দাম্মাম ও তায়েফ (খ) কাতার (গ) কুয়েত (ঘ) আরব আমীরাত (ঙ) বাহরাইন (চ) ওমান (ছ) ইরাক, (জ) ইরানসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং এ পথ দিয়ে যারা আসে।

ঘ। ওয়াদী মুহরিমঃ

এই স্থানটি তায়েফ-মক্কা রোডে ‘হাদা’ এলাকা হয়ে মক্কা শরীফ গমনের পথে মক্কা থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটা নতুন কোন মীকাত নয়, এটি কারনুল মানাযিলেরই অংশ বিশেষ। অর্থাৎ কারনুল মানাযিলের অনর্ভুক্ত “ওয়াদী মুহরিম” আরেকটি স্থান থেকে লোকেরা ইহরাম বাঁধে।

ঙ। ইয়ালামলামঃ

এটি কোন স্থান নয়। ইহা একটি একটি পাহাড়ের নাম বলে জানা যায়। এ জায়গাটি মক্কা শরীফ থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এলাকাটি ‘সাদীয়া’ নামেও পরিচিত। যেসব দেশের লোকেরা এখান থেকে ইহরাম বাঁধে সেগুলো হলঃ (ক) ইয়ামেন, (খ) বাংলাদেশ, (গ) ভারতবর্ষ, (ঘ) চীন, (ঙ) ইন্দোনেশিয়া, (চ) মালয়েশিয়া, (ছ) দক্ষিণ এশিয়াসহ পূর্বের দেশসমূহ।

চ। যাতুইরকঃ

যাতুইরক স্থানটি মক্কা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে। প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট না থাকায় এটি এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। এটা ছিল ইরাকবাসীদের মীকাত ছিল। তারা এখন তৃতীয় মীকাত ‘সাইলুল কাবীর’ ব্যবহার করে।

এই মীকাতগুলো হারাম শরীফের চর্তুদিকেই রয়েছে। যিনি হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্য মক্কায় আসবেন তাকে অবশ্যই মীকাত অতিক্রম করার আগে ইহরাম বাধতে হবে। মক্কাবাসিদের হজ্জের ইহরাম হলে নিজ নিজ ঘর থেকে, আর উমরার ইহরাম হলে মসজিদে তানয়ীমে যাবে অথবা হারামের সীমানার বাইরে যে কোন স্থানে গিয়ে বাঁধবে। মক্কায় চাকরীরত বিদেশীরাও তাই করবে।

যদি মীকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম বাধতে ব্যর্থ হয় তবে তাকে অবশ্যই আবার মীকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে, নতুবা একটি দম দিতে হবে অর্থাৎ একটি ছাগল, বকরী বা দুম্বা জবাই করে মক্কায় গরীবদের মধ্যে এর গোশত বিলি করে দিতে হবে। নিজে খেতে পারবে না।

মীকাত সম্পর্কিত একটি ত্রুটিঃ

আমাদের দেশে যারা হজ্জে গমন করে তাদের অধিকাংশই বয়স্ক ও ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। মীকতের পূর্বে ইহরাম বাধা ওয়াজিব বিষটি সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নাই। যারা শহরে সাথের বা শিক্ষতি তারা বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে বা বই পড়ে যেনে নেন। ফলে তার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু গ্রামের বয়স্ক, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ চাচা যিনি হজ্জে যাচ্ছেন কিন্তু কোন সেমিনারের অংশ গ্রহন করেন নাই বা বই পড়েও শিখেন নাই। তিনি সব কাজের গাইডের উপর নির্ভরশীল তার জন্য বিষয়টি খুবই কষ্টকর। তাই তাকে বার বার বুঝিয়ে দিতে হবে মীকাত কি? কোথায় গিয়ে কখন ইহরাম বাধতে হবে। এ ব্যাপার গাইডের একটি বড় ভুমিকা আছে। গাইডকে একটু সচেতান হতে হবে। তার অধীনে যত জন হজ্জযাত্রী আছেন, তাদের মধ্য যারা বিষয়টি সম্পর্কে বলার পরও আদায় করেত পারবেন বলে মনে হবে, তাদের প্রতি একটু আলাদা খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া হজ্জযাত্রী তার নিজের বাড়ি থেকে কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে গোসল করে আসবেন এবং বিমানে বসে ইহরামের প্রস্তুতি নিবেন। বিমানে উঠার আগেও ইহরামের কাপড় পরে নিতে পারেন। এরপর যখন বিমান মীকাত বরাবর আসবে ঠিক তখন নিয়দ করে ইহরাম বাঁধবেন এবং সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ করবেন। তার জন্য মীকাত থেকে ইহরাম না বেঁধে জেদ্দা থেকে বাঁধা জায়েয হবে না। বিমানে অনেক হজ্জযাত্রী ঘুমিয়ে থাকের তারা বিমানে ঘোষনা শুনতে পান না। যার হলে মীকাত অতিক্রম করার সময় ইহরান বাধতে পারেনা। এই জন্য দেখা যায় আমাদের দেশে অনেক হজ্জযাত্রী এয়ারপোর্টেই ইহরাম বেধে ফেলেন। বিষয়টি সুন্নাহ সম্মত না হলেও অনেক আলেম জায়েয বলেছেন। 

ইহরাম এবং ইহরামের ধারাবাহিক কাজ

ইহরাম এবং ইহরামের ধারাবাহিক কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। ইহরাম কি?

আবরী ইহরাম (اَلْاِحْرَامُ) শব্দটি (حَرَامٌ) হারাম শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ হলো কোনো জিনিসকে নিজের ওপর হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেয়া। আর এই ইহরাম বাঁধাই হলো, হজ্জ ও উরার প্রথম ফরজ কাজ। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে হাজ্জ বা উমরার মত ফরজ ইবাদাতের সুচনা হয়। এর মাধ্যমেই উরমা বা হজ্জের ইবাদাতে প্রবেশ করা হয়। হজ্জযাত্রী যখন হজ্জ বা উমরা কিংবা উভয়টি পালনের উদ্দেশ্যে নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ওপর কতিপয় হালাল ও জায়েয বস্তুও হারাম হয়ে যায়। এ কারণেই এ প্রক্রিয়াটিকে ইহরাম বা নিষিদ্ধ করে নেয়া। তাই বলা যায়, যে কার্যাবলীর মাধ্যমে হাজ্জ বা উমরার ইবাদাত শুরু করা হয় তাকেই ইহরাম বলা হয়।

অন্যভাবে বলা যায়ঃ- পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় আর মহিলাগন স্বাচ্ছন্দ্যময় শালীন পোশাক পরিধান করে, তালবিয়া পাঠ করে, আনুষ্ঠানিকভাবে হাজ্জ বা উমরার আদায়ের উদ্দেশ্য কাবা অভিমুখে রওয়ানা দেয়াই হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম বাঁধার মাধ্যমের একজন হজ্জ ও উমরা আদায়কারী যাত্রী তার নিজের উপর স্ত্রী সহবাস, মাথার চুল, হাতের নখ, গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের ক্ষৌর কর্যাদি, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা পোশাক পরিধান এবং শিকার করাসহ কিছু বিষয়কে হারাম করে নেয়। শুধু হজ্জ বা উমরার সংকল্প করলেই কেউ মুহরিম হবে না। যদিও সে নিজ দেশ থেকে সফর শুরুর সময় হজ্জের সংকল্প করে। তেমনি শুধু সুগন্ধি ত্যাগ অথবা তালবিয়া পাঠ আরম্ভ করলেই মুহরিম হবে না। এ জন্য বরং তাকে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করার নিয়ত করতে হবে। এই লক্ষে তাকে হজ্জ ও উমরা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি গোসল ও পবিত্রতা অর্জন সম্পন্ন করে ইহরামের কাপড় পরিধান করবেন, অতঃপর হজ্জ অথবা উমরা কিংবা উভয়টি শুরুর নিয়ত করবেন।

২। ইহরামের ওয়াজিব তিনটি যথাঃ

১। মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা

২। সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করা

৩। তালবিয়াহ পাঠ করা (নিয়ত করার পর তালবিয়া পাঠ করা ওয়াজিব)

মীকাত অতিক্রম করার আগেই, মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধাতে হবে। এই কাজটি ওয়াজিব বিধায় বাদ দিলে হজ্জ হবে না। তবে ফিদইয়া বা গুনাহ হতে মুক্তিপণ দিয়ে করে ক্ষতি পূরণ আদায় করা যায়। ইহরামের সময় বা আগে পরে কয়েটি ওয়াজির কাজ আছে আবার অনেকগুল সুন্নাহ সম্মত কাজ আছে। সবগুলি কাজ ধারা বাহিকভাবে আদায় করলে ভুল হওয়ার সম্বাবনা থাকে না। তাই এ পর্যায় ইহরামের কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে আলোচন করা হলো। এর মাধ্যমে ওয়াজ বা সুন্নাহ কোনটিই বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

৩। ইহরামের ধারাবাহিক কাজগুলো হলোঃ

১। গোসল করা

২। সুগন্ধি লাগান

৩। ইহরামের পোশাক পরা

৪। সালাত আদায় করা (ইহরামের জন্য বিশেষ কোন সালাত নাই)

৫। নিয়ত করা

৬। তালবিয়া পড়া

৭। ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম

১। গোসল করাঃ

আর ইহরামের পূর্বে গোসল করা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সুন্নাত। এমনকি ঋতুবতি এবং নিফাস অবস্থায় থাকা মহিলাও গোসল করবে। কেননা, আবূ বাকর সিদ্দীক (রা.) এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমায়স বিদায় হাজ্জের বছর যুলহুলাইফা নামক স্থানে মুহাম্মাদ বিন আবু বাকর ভূমিষ্ট করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে গোসল করা নির্দেশ প্রদান করেন।

১. যাইদ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তিনি ইহরামের উদ্দেশ্যে (সেলাই করা) পোশাক খুলতে ও গোসল করতে দেখেছেন। (সুনানে তিরমিজ ৮৩০ হাদিসের মান সহহি)

২. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আসমা বিনতে উমায়স (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন যুল হুলায়ফা নামক স্থানে নিফাসগ্রস্ত হলেন, তখন রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ) কে বললেনঃ তাকে (আসমা বিনতে উমায়স) গোসল করে ইহরাম বাঁধতে বল। (সহিহ মুসলিম ২৭৯৯, সুনান নাসাঈ ২১৫)

৩. জা’ফর ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমাকে আমার পিতা বলেছেন, আমরা জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিদায় হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলূল্লাহ (স) যুলক্বা’দা মাসের পাঁচ দিন অবশিষ্ট থাকতে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমরাও তাঁর সাথে বের হলাম। যখন তিনি যুল-হুলায়ফা পৌঁছলেন, তখন আসমা বিন্তে উমায়স (রাঃ) মুহাম্মদ ইব্ন আবূ বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করে পাঠালেনঃ আমি এখন কি করব? তিনি বললেনঃ তুমি গোসল কর তারপর পট্টি পরে নাও এবং ইহরাম বাঁধ। (সুনান নাসাঈ ২৯১)

৪. আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন তাঁর সাথে তার সহধর্মিণী আসমা বিনীত উমায়স খাছ’আমীয়্যাও ছিলেন। যখন তাঁরা যুলহুলায়ফায় ছিলেন, তখন আসমা মুহাম্মদ ইবন আবু বকরকে প্রসব করেন। আবু বকর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ সংবাদ দিলে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বলেন, তাকে গোসল করে হজের ইহরাম বাঁধতে আদেশ করুন। এরপর অন্যান্য লোক যা করে সেও তা করবে। কিন্তু সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। (সুনান নাসাঈ ২৬৬৬, ইবনে মাজাহ ২৯১২)

৫. আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা করবে, তখন তার জন্য গোসল করা সুন্নত। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং: ১৫৮৪৭)

মন্তব্যঃ ইহরামের পূর্বে গোসল করা একটি মুস্তাহাব আমল। অনেক আলেম ইহাকে সুন্নাহও বলছেন। তবে, সময় সুযোগ না হলে হলে গোসল করা জরুরী নয়। এই ক্ষেত্র পবিত্র থেকে অজু করে দুই রাকাত তাইহিয়্যাতুল অজুর সালাত আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু ঋতুবতি এবং নিফাস অবস্থায় থাকা মহিলা গোসল করে, নিজেদের প্রস্তত করেই ইহরাম বাঁধবে।

ক। ইহরাম বাঁধার পরও গোসল করা যাবেঃ

আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তারা উভয়ে আবওয়া নামক স্থানে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। ইবন আব্বাস বললেনঃ মুহরিম ব্যক্তি তার মাথা ধুইবে, আর মিসওয়ার বললেনঃ সে মাথা ধুইবে না। এরপর আবদুল্লাহ ইবদ আব্বাস আমাকে আবু আইয়ুব আনসরী বাঃ এর নিকট পাঠালেন যেন, আমি তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। আমি তাকে পেলাম, তিনি কূপের পার্শ্বে দু’টি কাঠের মধ্যস্থলে গোসল করছিলেন। আর তিনি ছিলেন এক কাপড়ের পর্দার আড়ালে। আমি তাঁকে সালাম দিয়ে বললামঃ কিরূপে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মাথা ধৌত করতেন, তা আপনার নিকট জিজ্ঞাসা করার জন্য আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। আমার কথা শুনে আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) কাপড়ের উপর হাত রেখে তা সরিয়ে দিলেন, তাতে তার মাথা দৃশ্যমান হলো। তিনি একজন লোককে তার মাথায় পানি ঢালতে বললেন, তারপর দু’হাত দ্বারা তিনি মাথা ঝাড়া দিলেন, পরে উভয় হাতকে একবার সামনের দিকে একবার পেছনের দিকে নিলেন, তারপর তিনি বললেনঃ এভাবে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গোসল করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৮৪০, সুনানে নাসাঈ ২৬৬৭, ইবনে মাজাহ ২৯৩৪)

২। সুগন্ধি লাগানঃ

গোসল করার পর ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি মাখা যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমল থেকে তার প্রমান পাওয়া যায়। কিন্তু ইহরামের কাপড় পরিধানের পর সুগন্ধি মাখা চলবে না। ইহরামের নিয়ত করার পূর্বে মাখা সুগন্ধি মুহরিমের চেহারায় দৃশ্যমান হতে পারে বা তা থেকে সুগন্ধ আসতে পারে। এরপর যখন আবার ইহরাম থেকে মুক্ত হবে, তখন আবার সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে। 

দলিলঃ

১. আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহরাম বাধার সময় এবং (হজ্জ সমাপনান্তে) ইহরামমুক্ত হওয়ার পর বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পুর্বেও আমি তাঁকে সুগন্ধি মেখে দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ২৬৯৫ ইফাঃ)

২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা করিলেন, তখন তঁর ইহরামের সময় আমি তাঁর গায়ে নিজ হাতে সুগন্ধি লাগিয়েছি। আর যখন তিনি ইহরাম খুলছিলেন, তাঁর ইহরাম খোলার পূর্বে আমার নিজ হাতে সুগন্ধি মাখিয়েছি। সুনানে নাসাঈ ২৬৮৬)

৩. আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথার সিঁথিতে কস্তুরীর ঔজ্জ্বল্য দেখতে পাচ্ছি, তিনি তখন তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ মুসলিম (২৭০৪ ইফাঃ)

৪. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সিঁথিতে যে সুগন্ধি তেল চকচক করছিল তা যেন আজও আমি দেখতে পাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ১৫৩৮ তাওহীদ)

৩। ইহরামের জন্য পোশাক পরাঃ

গোসল করে সুগন্ধী লাগানোর পর ইহরামের কাপড় পরিধান করবে। আর তা হলো পুরুষদের জন্য সেলাই বিহীন লুঙ্গী ও চাদর। আর মহিলারা সাজ সজ্জা ব্যতীত যে কোন রকম কাপড় পরিধান করতে পারবে। এই কথার দলিল হল নিম্মের হাদিসসমূহঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুহরিম ব্যক্তি কী প্রকারের কাপড় পরবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ সে জামা, পাগড়ী, পায়জামা, টুপি ও মোজা পরিধান করবে না। তবে কারো জুতা না থাকলে সে টাখ্‌নুর নিচ পর্যন্ত মোজা কেটে (জুতার ন্যায়) পরবে। তোমরা জা’ফরান বা ওয়ার্‌স (এক প্রকার খুশবু) রঞ্জিত কোন কাপড় পরবে না। [আবূ ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, মুহরিম ব্যক্তি মাথা ধুতে পারবে। চুল আঁচড়াবে না, শরীর চুলকাবে না। মাথা ও শরীর হতে উকুন যমীনে ফেলে দিবে। (সহিহ বুখারি ১৫৪২ তাওহীদ)

মন্তব্যঃ জুতা না পেলে মোজাকে টাখনুর নীচ থেকে কেটে তা পরার বিধানটি রহিত হয়ে গেছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোজা কাটার কথা পূর্বে বলেছিলেন এবং এটা তিনি বলেছিলেন মদীনায় থাকাকালীন। নিচের হাদিসটি লক্ষ করুনঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃএক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলোঃ হে আল্লাহ্‌র রসূল! মুহ্‌রিম কি কাপড় পরবে? নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুহ্‌রিম জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে না। তবে যদি সে জুতা না পায়, তা হলে পায়ের গোড়ালির নীচে পর্যান্ত (মোজা) পরতে পারবে। (সহিহ বুখারী ৫৭৯৪ তাওহীদ, সহিহ মুসলিম ২৬৮২)

২. ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট জানতে চাইল যে, মুহরিম ব্যক্তি কী ধরনের পোশাক পরবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলছেন, মুহরিম ব্যক্তি জামা, পাগড়ী, পায়জামা, টুপি ও মোজা পরিধান করতে পারবে না। তবে কোন ব্যক্তি চপ্পলের অভাবে মোজা পরিধান করলে তাকে পায়ের গোছার নীচ বরাবর মোজার উপরিভাগ কেটে ফেলতে হবে। তোমরা এমন কাপড় পরিধান কর না যা জাফরান বা ওয়ারস রঙ্গে রঞ্জিত করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮১, সুনানে নাসাঈ ২৬৭১)

৩. ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একদা এক ব্যক্তি বললোঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ্! আমরা যখন ইহরাম অবস্থায় থাকি তখন আমরা কোন কোন কাপড় পরিধান করবো? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা জামা পরিধান করবে না। আমাদের আরো বললেন, তোমরা জামা পাগড়ী পায়জামা পরিধান করবে না এবং মোজা, ওড়না কিন্তু যদি তোমাদের কারো জুতা না থাকে, তাহলে তা গ্রস্থির নীচ থেকে কেটে নেবে। আর পরিধান করবে না এমন কাপড় যাতে ওয়ারস ও জাফরান রং লেগেঝে। (সুনানে নাসাঈ ২৬৭২)

৪. সালিম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হ‘ল যে, মুহরিম ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় কী পরিধান করবে? তিনি বললেন, মুহরিম ব্যক্তি জামা, পাগড়ী, টুপী, পায়জামা, জাফরান বা ওয়ারস দ্বারা রঞ্জিত কাপড় এবং মোজা পরিধান করবে না। কিন্তু তার চপ্পল না থাকলে সে পায়ের গোছার নিম্নাংশ বরাবর মোজার উপরিভাগ কেটে ফেলে তা পরিধান করতে পারবে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮২)

৫. ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল ! আমাদেরকে ইহরাম অবস্থায় আপনি কি ধরণের পোশাক পরার নির্দেশ দেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ জামা, পাজামা, টুপি, পাগড়ী ও মোজা পরবে না। তবে কোন লোকের জুতা না থাকলে সে চামড়ার মোজা পরবে যা পায়ের গোছার নিচে থাকে। যাফরান ও ওয়ারাস রং-এ রঙ করা কোন পোশাক তোমরা পরবে না। ইহরামধারী মহিলারা মুখ ঢাকবে না এবং হাতে দস্তানা (হাত মোজা) পরবে না। (সুনানে তিরমিজি ৮৩৩)

৬. ‘আয়েশা (রাঃ) ইহ্‌রাম অবস্থায় কুসুমীর রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরেন এবং তিনি বলেন, নারীগণ ঠোঁট মুখমন্ডল আবৃত করবে না। ওয়ার্‌স ও জাফরান রঙে রঞ্জিত কাপড়ও পরবে না। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি উসফুরী (কুসুমী) রঙকে সুগন্ধি মনে করি না। ‘আয়েশা (রাঃ) (ইহ্‌রাম অবস্থায়) নারীদের জন্য অলংকার পরা এবং কালো ও গোলাপী রং-এর কাপড় ও মোজা পরা দূষণীয় মনে করেননি। ইব্রাহীম (নাখ্‌’য়ী) (রহঃ) বলেন, (ইহ্‌রাম অবস্থায়) পরনের কাপড় পরিবর্তন করায় কোন দোষ নেই। সহিহ বুখারি ১৫৪৪ তাওহীদ)

৭. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে ( হজ্জের উদ্দেশ্যে) মদীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা’দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। যিলহজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহ্‌রাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা’বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয। (সহিহ বুখারি ১৫৪৫ তাওহীদ)

৮.  ইয়ালা ইবনু উমাইয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক বেদুঈনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় জুব্বা পরিহিত দেখলেন। তিনি তাকে তা খুলার নির্দেশ দিলেন।(সুনানে তিরমিজি ৮৩৫ হাদিসের মান সহিহ)

৯. ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহরিমকে যা’ফরান ও ওয়ারস দ্বারা রঞ্জিত কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ২৬৬৮)

১০. ইবন উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা ইহরাম অবস্থায় জামা, পায়জামা, পাগড়ী, বুরনুস এবং মোজা পরিধান করবে না। (সুনানে নাসাঈ ২৬৮০)

ক। মহিলাগন নিকাব ও হাত মোজা পরিধান করবে নাঃ

ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইহরাম অবস্থায় আমাদেরকে কাপড় পরিধান করতে আদেশ করেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জামা,পায়জামা, পাগড়ী এবং বুরনুস পরবে না, আর মোজা পরিধান করবে না। কিন্তু যদি কারো জুতা না থাকে, তবে সে পায়ের গ্রস্থির নিম্ন পর্যন্ত মোজা পরিধান করতে পারে। আর যে কাপড়ে যাফরান বা ওয়ারস রং লেগেছে ঐ সকল কাপড় তোমরা পরিধান করবে না, আর মুহরিম নারী নিকাব পরিধান করবে না। আর হাত মোজাও পরিধান করবে না। (সুনানে নাসাঈ ২৬৭৫ এবং ২৬৮৩)

খ। হাদিসের আলোকে ইহরাম বাধার পর পোশাক পরিধান হবে নিম্মরূপঃ

১। মুহরিম ব্যক্তি জামা এবং পায়জামা পরিধান করতে পারবে না।

২। মুহরিম ব্যক্তি মাথায় পাগড়ী বা টুপি পরিধান করতে পারবে না।

৩। হাতে ও পায়ে মুজা ব্যবহার করতে পাবরে না তবে চপ্পল ব্যবহার করতে পারবে।

৪।  মুহরিম নারী মুখ ঢাকবে না এবং হাত মোজাও পরবে না।

৫।  মুহরিম নারীদের বুরনুস (টুপির মত এক প্রকার কাপড় যা মহিলারা পরিধান করে) পরিধান করতে পারবে না।

৬। জাফরান বা ওয়ারস রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরিধান করা যাবে না

৭। মুহরিম চুল আঁচড়াবে না, শরীর চুলকাবে না।

মন্তব্যঃ এই সকল বিষয় বিবেচনা করে হজ্জযাত্রীগন সেলাই বিহীন দুটি সাদা চাদরের মত কাপড় ব্যবহার করে। আর মহিলাগন সুবিধামত সাবলিল পোশাক পরিধান করে থাকে।

৪। সালাত আদায় করাঃ

আমদের সমাজের অনেকের বিশ্বাস ইহরাম বাঁধার প্রাক কালে দুই রাকাত সালাত আদায় করা ওয়াজিব। ইবনে তাইমিয়ার মতে, ইহরামের বিশেষ কোন নামায নেই। কেননা, এ ধরণের কোন নামায নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়নি। ইহরামকালে দুই রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব নয়।

       হজ্জযাত্রীগন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে গোসল করার পর ইহরামের কাপড় পরে ইহরাম বাঁধবে। এই সময় কোন প্রকার সালাত আদায় জরুরী নয়। তবে, যদি কোন নামাযের ওয়াক্ত হয়, যেমনঃ ফরয নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে, কিংবা ওয়াক্ত হওয়ার সময় কাছাকাছি এবং সে ব্যক্তি নামায পড়া পর্যন্ত মীকাতে অবস্থান করতে চায় এক্ষেত্রে উত্তম হচ্ছে, নামাযের পর ইহরাম বাঁধা। কাজেই ঋতুবতী এবং নিফাস অবস্থায় থাকা মহিলা ব্যতীত অন্যরা ফরয সলাতের সময় হলে (মীক্বাতে) ফরয সলাত আদায় করবে। যদি ফরয সলাতের সময় না হয়, সে ক্ষেত্রে কোন কোন আলেম ইহরানের নিয়ত না করে, তাহইয়্যাতুল উযূর নিয়তে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার কথা বলেছেন।

৫। নিয়ত করাঃ

সকল ইবাদতের আগে নিয়ত ঠিক করা ফরজ। নিয়তে কারনেই আমলটি কবুল হয়ে থাকে। আবার ভুল নিয়তের কারনে আমলটি শির্কে পরিনত হয়। এই জন্য হয়তো ইমাম বুখারী তার গ্রন্থের প্রথম হাদিসটি নিয়ত সম্পর্কে লিখেছেন। হজ্জ একটি অন্যতাম ফরজ ইবাদাত শুধু নিয়তের কারনেই হজ্জ বাতিল হয়ে যায়। এই ইবাদতের সাথে আর্থিক ও শারীরিক সম্পর্ক থাকার করানে অনেকেরই ফরজ হয় না। যাদের ফরজ হয় তারা কষ্ট স্বীকার করে আদায় করে অথচ নিয়তের কারনে বাতিল হয়ে যায়। প্রথমত না জানার কারনে নিয়তের পদ্ধতিতে ভুল ভুল করে। অশুদ্ধ নিয়তের করার মধ্য অন্যতম হলো, লোক দেখান হজ্জ করা,  মক্কা মদিনা দেখার জন্য, অর্থের লোভে হজ্জ করা, সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, হাজ্জি উপাধী গ্রহনের জন্য, খ্যাতি অর্জনের জন্য, মদিন রাসূল (সাঃ) কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য করে হজ্জে গমন করা ইত্যাদি।

ক। নিয়তের সঠিক পদ্ধতি হলোঃ

নিয়ত আরবী শব্দ। যার অর্থ হল, ইচ্ছা বা সংকল্প। আর ইচ্ছার স্থান হচ্ছে অন্তর। তা মুখে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন,

*قُلْ إِن تُخْفُواْ مَا فِي صُدُورِكُمْ أَوْ تُبْدُوهُ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَيَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأرْضِ وَاللّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

অর্থঃ বলে দিন, তোমরা যদি মনের কথা গোপন করে রাখ অথবা প্রকাশ করে দাও, আল্লাহ সে সবই জানতে পারেন। আর আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সেসব ও তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। (সুরা ইমরান ৩:২৯)

উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে- সেই উদ্দেশ্যেই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর -১)

একজন বিবেকবান, সুস্থ মস্তিষ্ক, বাধ্য করা হয়নি, এমন লোক কোনো কাজ করবে আর সেখানে তার কোনো নিয়ত বা ইচ্ছা থাকবে না সেটা সম্ভব নয়। হজ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, সুতরাং হজ্জে যাত্রা করার পূর্বে সঠিক নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত হল অন্তরের সাথে দৃঢ় সংকল্প, শব্দের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে হজ্জ ও উমরার শুরুতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উচ্চৈঃস্বরে হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তালবিয়া পাঠ করছেন। এই জন্য অনেক আলেম মনে করে, ইহ্‌রাম ব্যতীত অন্য কোন ইবাদাতে মৌখিক নিয়তে শব্দ উচ্চারণ করা শরীয়তে বৈধ নয়। কেননা কেবল ইহরামের সময়ই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ওভাবে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করার কথা বর্ণিত আছে। অবশ্য তা প্রচলিত নাওয়াইতু আন…… বলে গদ বাধা নিয়মে নয়। আমাদের দেশে সালাতে যে গদবাধা নিয়ত বলে সালাত শুরু হয় তা একটি বিদআতি আমল। এমনিভাবে অনেক হজ্জের সময়ও নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে জোরে জোরে বলতে থাকে। তাদের এই আমল সঠিক নয় কারন মনে মনে ওমরাহ বা হজ্জের সংকল্প করা ও তালবিয়াহ পাঠ করাই যথেষ্ট। এই কথার দলিল হলো, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই হাদিস।

আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যোহরের সালাত মদীনায় চার রাক’আত আদায় করলেন এবং ‘আসরের সালাত যুল-হুলাইফায় দু’রাক’আত আদায় করেন। আমি শুনতে পেলাম তাঁরা সকলে উচ্চৈঃস্বরে হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তালবিয়া পাঠ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৮ তাওহীদ)

** সালাত শেষে অন্তরে হজ্জ বা উমরার নিয়ত করে ইহরাম বাঁধবে আর মুখে বলবেঃ

১। যদি তামাত্তুকারী হন, তাহলে বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً**

লাব্বাইকা উমরাতান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ তামাত্তু হজ্জের নিয়তকারী যেহেতু উমরা করা পর হালাল হয়ে যায়। তাই তার মনে মনে এই সংকল্প থাকতে হবে যে, এই সপরে উমরা থেকে হালাল হবার পর আবার ইহরাম বেঁধে হজ্জ আদায় কবর।

 ২। যদি কিরানকারী হন, তাহলে বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا**

লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা ও হজ্জের উদ্দেশ্যে।

দলিলঃ আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এভাবে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরা উভয়ের তালবিয়া  পাঠ করতে শুনেছিঃ (তিনি বলেছেন)

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا**

লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা ও হজ্জের উদ্দেশ্যে। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৮ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কিরান হজ্জ কারীর সাথে হাদি থাকে তাই সে উমরার পর হালাল হতে পারে। এই কারনে কিরান হজ্জের নিয়তকারী কে একই ইহরামে হজ্জও উমরা আদায় করতে হয় বিধায় তিনি একই সাথে হজ্জ ও উমরার নিয়ত করবেন।

৩। আর যদি ইফরাদকারী হন, অর্থাৎ যিনি শুধু হজ্জের নিয়ত করবেন তিনি বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ َحَجًّا. **

লাব্বাইকা হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি হজ্জের উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ ইফরাত হজ্জের নিয়তকারী উমরা করার সুযোগ পায় না, তিনি সরাসরি হজ্জ আদায় করে থাকেন। তাই ইফরাতের হজ্জের জন্য গমন কারী হজ্জযাত্রী শুধু হজ্জের নিয়ত কবরে।

৪। পক্ষান্তরে যদি উমরা পালনকারী হন, অর্থাৎ যিনি শুধু উমরার নিয়ত করবেন তিনি বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً. **

লাব্বাইকা উমরাতান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরার উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ ইহরামের নিয়ত মনে মনে করার পর এই চার প্রকারের কালিমা মৌখিকভাবে বলতে হবে। তার পর হাদিসে বর্ণিত তাবলিয়া পড়তে হবে।

খ। ওজরের কারণে শর্ত সাপেক্ষে নিয়তঃ

হজ্জ পালনকারী ব্যক্তি যদি অসুখ কিংবা শত্রু অথবা অন্য কোন কারণে হজ্জ সম্পন্ন করার ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করেন, তাহলে নিজের ওপর শর্তারোপ করে বলবেন,

**اللَّهُمَّ مَحِلِّي حَيْثُ حَبَسْتَنِي **

আল্লাহুম্মা মাহিল্লী হাইছু হাবাসতানী

অর্থঃ হে আল্লাহ আপনি আমাকে যেখানে রুখে দেবেন, সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাব।

এই কথার দলিলঃ

১. আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবা‘আ বিনতে যুবায়র-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তোমার হাজ্জে যাবার ইচ্ছে আছে কি? সে উত্তর দিল, আল্লাহর কসম! আমি খুবই অসুস্থবোধ করছি (তবে হাজ্জে যাবার ইচ্ছে আছে)। তার উত্তরে বললেন, তুমি হাজ্জের নিয়্যতে বেরিয়ে যাও এবং আল্লাহর কাছে এই শর্তারোপ করে বল, হে আল্লাহ্! যেখানেই আমি বাধাগ্রস্ত হব, সেখানেই আমি আমার ইহরাম শেষ করে হালাল হয়ে যাব। সে ছিল মিকদাদ ইবনু আসওয়াদের সহধর্মিণী। (সহিহ বুখারী ৫০৮৯ তাওহীদ)

অথবা বলবে,

**لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، وَمَحِلِّي مِنَ الأَرْضِ حَيْثُ تَحْبِسُنِي.**

(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ওয়া মাহিল্লী মিনাল আরদি হাইছু তাহবিসুনী)

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, যেখানে তুমি আমাকে আটকে দেবে, সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাব।

এই কথার দলিলঃ

ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন ও দুবা’আ বিনত যুবায়র ইবন আবদুল মুত্তালিব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হজ্জের ইচ্ছা করেছি। এখন আমি কি বলবো? তিনি বললেনঃ তুমি বলবেঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ وَمَحِلِّي مِنَ الأَرْضِ حَيْثُ تَحْبِسُنِي*

লাব্বায়ক আল্লাহুম্মা লাব্বায়ক, ‘অমাহিল্লি মিনাল আরদী হাইছু তাহবিসুনী” (অর্থঃ আপনি যেখানে আমাকে আটকে রাখেন আমি সেখানে হালাল হয়ে যাব)। কারণ তোমার জন্য তোমার রবের নিকট তাই রয়েছে, যা তুমি শর্ত করেছ। (সুনানে নাসাঈ ২৭৬৮ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ ইহরাম বাধার সময় যদি ব্যাধি বা অন্য কোন বাধার কারণে নিজ হাজ্জের বা উমরার কার্যাবলী সম্পূর্ণ করতে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা করে, তাহলে তার জন্য ইহরামের নিয়্যাত করার পূর্বে শর্ত লাগিয়ে নেয়া সুন্নাত। যেমনটি উপরের হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এখানে মৌখিক উচ্চারণের বিষয়টি এসেছে যেহেতু হজ্জটা মানতের মত। মানত মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। কেননা কোন লোক যদি অন্তরে মানতের নিয়ত করে তাহলে সে মানত সংঘটিত হবে না। যেহেতু হজ্জ পরিপূর্ণ করার দিক থেকে মানতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ শুরু করার সময় এই বাক্য বলে মৌখিকভাবে শর্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসে যে এসেছে, “আমার নিকটে জিব্রাইল এসে বলেন, আপনি এই মোবারকময় উপত্যকায় নামায আদায় করুন এবং বলুন, “উমরাতান ফি হাজ্জা” (উমরাসহ হজ্জ) কিংবা “উমরাতান ওয়া হাজ্জা” (হজ্জ ও উমরা)। এর মানে এ নয় যে, তিনি নিয়ত উচ্চারণ করেছেন। বরং এর অর্থ হচ্ছে, তিনি তাঁর তালবিয়ার মধ্যে হজ্জের প্রকারটি উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ত উচ্চারণ করেননি। (ইসলামী ফতোয়াসমগ্র ২/২১৬)। আল্লাহই ভাল জানেন।

কিন্তু মনে রাখতে হবে যারা হাজ্জ বা উমরা সম্পূর্ণ করতে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা নেই, তার জন্য শর্ত করা ঠিক নয়। কারণ, নাবী (সা.) ইহরাম করার সময় কোন শর্ত করেননি। তিনি সকল সাহাবীকে সাধারণভাবে শর্ত করার নির্দেশ দেননি, বরং একমাত্র যুবাইরের-এর মেয়ে যুবাআ’হ-কে তাঁর ব্যধিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হাজ্জ সম্পাদনে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা থাকায় শর্ত করার নির্দেশ দেন।

গ। নাবালকের ইহরামঃ

মুহরিম ব্যক্তি যদি ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী ও বোধসম্পন্ন বালক হয়, তাহলে সে সেলাইযুক্ত কাপড় পরিহার করে ইহরামের কাপড় পরিধান করে নিজেই ইহরাম বাঁধবে। হজ্জ বা উমরার যেসব আমল সে নিজে করতে পারে, নিজে করবে। অবশিষ্টগুলো অভিভাবক তার পক্ষ থেকে আদায় করবেন।

বালক যদি ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী বা বোধসম্পন্ন না হয়, তাহলে অভিভাবক তার শরীর থেকে সেলাইযুক্ত কাপড় খুলে ইহরামের কাপড় পরিধান করাবেন। অতপর তার পক্ষ থেকে ইহরাম বাঁধবেন এবং তাকে নিয়ে হজের সকল আমল সম্পন্ন করবেন।

মন্তব্যঃ মুখে ‘নাওয়াইতুল উমরাতা’ বা ‘নাওয়াইতুল হজ্জা’  বলা বিদ‘আত।  উল্লেখ্য যে, হজ্জ বা উমরাহর জন্য ‘তালবিয়াহ’ পাঠ করা ব্যতীত অন্য কোন ইবাদতের জন্য মুখে নিয়ত পাঠের কোন দলিল নেই। নিয়তের স্থান হচ্ছে, কলব বা অন্তর। নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীবর্গ থেকে সাব্যস্ত হয়নি যে, তারা কোন ইবাদতের পূর্বে নিয়ত উচ্চারণ করেছেন। হজ্জ ও উমরার তালবিয়া নিয়ত নয়। শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেনঃ

নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত। সজোরে নিয়ত পড়া কঠিন গুনাহ। সুন্নাহ হচ্ছে, মনে মনে নিয়ত করা। কারণ আল্লাহ তাআলা গোপন ও সঙ্গোপনের সবকিছু জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

*قُلْ أَتُعَلِّمُونَ اللَّهَ بِدِينِكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ*

অর্থঃ বলুন, তোমরা কি তোমাদের ধর্ম পরায়ণতা সম্পর্কে আল্লাহকে অবহিত করছ? অথচ আল্লাহ জানেন যা কিছু আছে ভূমন্ডলে এবং যা কিছু আছে নভোমন্ডলে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। (সুরা হুজুরাত ৪৯:১৬)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কিংবা তাঁর সাহাবীবর্গ কিংবা অনুসরণযোগ্য ইমামদের থেকে ‘নিয়ত উচ্চারণ করা’ সাব্যস্ত হয়নি। সুতরাং জানা গেল যে, এটি শরিয়তে সিদ্ধ নয়। বরং নবপ্রচলিত বিদআত। আল্লাহই তাওফিকদাতা। (ইসলামী ফতোয়াসমগ্র (২/৩১৫)

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নামায, তাহারাত (পবিত্রতা), রোজা কিংবা অন্য কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়ত উচ্চারণ করা বর্ণিত হয়নি। এমনকি হজ্জ-উমরার ক্ষেত্রেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন না যে, ‘আল্লাহু্ম্মা ইন্নি উরিদু কাযা ওয়া কাযা…,,,,(অর্থে …হে আল্লাহ, আমি অমুক অমুক আমল করার সংকল্প করেছি…)।

৬। হজ্জের নিয়তে ভুলত্রুটিঃ

যারা হজ্জ করতে যান তাদের নিয়তে অনেক সমস্যা থাকে তার মধ্য নিম্মের ভুলত্রুটিগুলো অন্যতম।

ক।  লোক দেখান হজ্জ করা

খ। মক্কা মদিনা দেখার জন্য

গ। অর্থের লোভে হজ্জ করা

সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে

ক। লোক দেখান হজ্জ করাঃ

আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির বা লোক দেখান হজ্জ করলে তার কখনও করুল হবে না। বরং লোক দেখান হজ্জ করা একটি গুনাহের কাজ। এর পরিনতিও খুবই খারাপ। লোক দেখান কাজের পরিণতি কি হবে? এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক কোরআনুল কারীমে এরশাদ করেন,

وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا (٢٣) 

অর্থ: (আমি ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য) আর তারা যে কাজ করেছে, আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। (সুরাহ আল-ফুরকান ২৫:২৩)।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ননা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের চেহারা ও দেহের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তোমাদের অন্তর ও কর্মের প্রতি লক্ষ্য আরোপ করেন। (সহহি মুসলিম, রিয়াযুস স্ব-লিহীন-৭)

আর এক শ্রেণীর লোকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল নামের পিছনে আলহাজ্ব লাগাবে। যদি আলহাজ্ব লাগানোর ইচ্ছায় হজ্জ্ব হয় তবে ছোট শির্কে হবে, এতে কোন সন্ধেহে নাই। কাজেই যারা লোক দেখান হজ্জ করেন। তাদের উচিত বার বার নিজের নিয়তকে সঠিক করে এক মাত্র মহান আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য হজ্জ করা।

খ। মক্কা মদিনা দেখার জন্যঃ

অনেক বিধর্মী পৃথিবীতে আনাচে কানাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা তারা জানা বা দেখার নেষা থেকেই করছে। কেউ তাদের বাধ্য করছে না। অনেক ভ্রমন পাগল মুসলিমও আছে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে গমন করে জানা বা দেখার জন্য। এমন ভ্রমন পাগল বা সাধারণ যে কোন মুসলিম যদি মনে মনে এই নিয়ত করে যে, পৃথিবীল বিভিন্ন স্থানে তো বহু ভ্রমন করলাম কিন্তু আজও মক্কা মদিন ঘুরে আসতে পারলাম না। আগামি বছর মক্ক মদিনা দেখার জন্য হজ্জ গমন করব। এতে দুটি লাভ হবে প্রথমত মক্কা মনিদা দেখা। আর দ্বিতীয়ত হজ্জ ফরজ ছিল তাও আদায় হয়ে গেল। দেখুন আল্লাহর বান্দার নিয়ত কেমন? তার নিয়তই হল মক্কা মদিনার দেখা সাথে বাড়তি হজ্জ। সে মক্কা মদিনা গিয়েছিল জানা ও দেখান উদ্যেশ্য। যদি সে নিয়ত করত আমি মহান আল্লাহকে রাজি খুসি করার জন্য হজ্জে যাব। তালে তার হজ্জে যাওয়া ইবাদাত হত। কিন্তু তার সমান্য নিয়তের জন্য তার অসামান্য ক্ষতি হল। কাজেই যারা মক্কা মদিয়া দেখার উদ্দেশ্য হজ্জে যাবেন তাদের হজ্জ হবে না।

গ। অর্থের লোভে হজ্জ করাঃ

অনেকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল ব্যবসা করা। হজ্জ্ব করবে সাথে সাথে স্বর্ন নিয়ে দেশে ফিরবে। এতে হজ্জ্ব ও হল আবার লাভও হল। বেশ তো একই সাথে দু্‌ই কাজ। কাজ দুটিই হল কিন্তু ছোট শির্ক হল নেকি পাবেন না। এসব আলম আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি লোকর নিকট ন্যায় পরায়ন সাজার জন্য বা স্বনামধন্য হবার জন্য হজ্জ্ব পারন করল সে শির্ক করল। (মুসনাদে আহম্মদ)।

ঘ। সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়েঃ

আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে হজ্জ্ব পালন করে। আল্লাহর রহমতে বান্দা যখন হজ্জ্ব করার যোগ্যতা অর্জন করে। অর্থাৎ যখন টাকা পয়সার মালিক হয়, তখন সে কার্পন্য করতে থাকে। মনে মনে ভাবে এত টাকা খরচ করে হজ্জ আদায় করব! পরক্ষণে আবার ভাবে, টাকা পয়সার মালিক হলাম কিন্তু হজ্জ আদায় না করলে সমাজে লোক ভারাপ চোখে দেখবে। সবাই ভাববে আমি কৃপণ। এই সকল ভাবতে ভাবতে এক সময় সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, সে অনেকটা বাধ্য হয়েই হজ্জ্বে গমন করে। বলুন এটা কি বিয়া নয়? তার প্রমান, হজ্জ্ব পালন করার পরও তাহার মুখে দাড়ি উঠেনি, সালাতে গর হাজির, অন্যান্য ইবাদাতের কথা না হয় বাদই দিলাম।

৬.৩.৭ তালবিয়া পড়াঃ

তালবিয়া’ শব্দটি ‘লাব্বা’ (لَبَّى) এর ক্রিয়ামূল। আর ‘লাব্বা’ অর্থ হচ্ছে, মুহরিম ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরাতে ‘লাব্বাইক’ বলল। ইতোপূর্বে আমরা বলেছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ইহরাম বাঁধার সময় বলেছিলেন, ‘লাব্বাইক উমরাতান ওয়া হাজ্জাতান’। ‘লাব্বাইক’ (لَبَّيْكَ) শব্দটি কারো ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য সুন্দর একটি শব্দ। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় ছাহাবীকে ডেকেছেন এবং তাঁরা ‘লাব্বাইক’ বলে সাড়া দিয়েছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডাকে তাঁদের কেউ কেউ বলতেন, ‘লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ! (لَبَّيْكَ يَا رَسُوْلَ الله), আবার কেউ কেউ বলতেন, ‘লাব্বাইকা ওয়া সাদাইক’ (لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ)।

যে ব্যক্তি ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় লাব্বাইক বলবে। আর স্বয়ং মহান আল্লাহ মানুষদেরকে হজ্জ করতে ডেকেছেন। তিনি তাঁর নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কে বলেন,

*وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ*

‘আর মানুষের মধ্যে হজ্জের জন্য ঘোষণা দিয়ে দাও। তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার হালকা-পাতলা উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তোমার কাছে আসবে। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৭)

মন্তব্যঃ অতএব, কোন মুসলিম যখন মীক্বাতে এসে ইহরাম বেঁধে ফেলবে, তখন তালবিয়া পড়বে।

ক। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া কেমন ছিল?

সহিহ হাদিসের আলোকে তালবিয়ার বাক্যগুলো হল নিম্ম রূপঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

(লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্‌ক লা শারি-কা লাকা)।

অর্থঃ আমি হাযির হে আল্লাহ, আমি হাযির, আমি হাযির; আপনার কোন অংশীদার নেই, আমি হাযির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নি’আমত আপনার এবং কর্তৃত্ব আপনারই, আপনার কোন অংশীদার নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৯ তাওহীদ)

২. উপরের বর্ণিত তালবিয়াই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া। তবে কখনো কখনো কিছু অতিরিক্ত বলতেন। যেমনঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তালবিয়ায় বলেনঃ

* لَبَّيْكَ إِلَهَ الْحَقِّ لَبَّيْكَ*

(লাব্বাইকা ইলাহাল হাক্কি লাব্বাইক)

আমি হাজির হয়েছি, হে সত্য মাবূদ! আমি হাজির হয়েছি। (ইবনে মাজাহ ২৯২০)

৩. উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া ছিলঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ

ইবন উমর (রাঃ) তাতে আরও বাড়িয়ে বলেছেনঃ

لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ وَالرَّغْبَاءُ إِلَيْكَ وَالْعَمَلُ

(সুনান নাসাঈ ২৭৫২ হাদিসের মান সহিহ)

৪. আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া ছিলঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ

(সুনান নাসাঈ ২৭৫৩ হাদিসের মানসহিহ)

খ। তালবিয়ার ফজিলতঃ

১. সাহল ইবনে সাদ আস-সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তিই তালবিয়া পাঠ করে, সাথে সাথে তার ডান ও বাম দিকের পাথর, গাছপালা অথবা মাটি, এমনকি দুনিয়ার সর্বশেষ প্রান্ত উভয় দিকের সবকিছু তালবিয়া পাঠ করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯২১)

২. আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কোন ধরণের হজ্জ সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেনঃ “আল আজ্জু ওয়াচ্ছাজ্জু’’ উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ আর উট কুরবানী দেওয়া। (সুনানে তিরমিজি ৮২৮)

৩. সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কোন মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডান ও বামে পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি সবকিছুই তার সাথে তালবিয়া পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়। ( মিশকাত ২৫৫০)।

৪. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে আরাফাতে ওয়াকূফ কালে অকস্মাৎ সে তার সওয়ারী হতে পড়ে যান। যার ফলে তাঁর ঘাড় মটকে গেল অথবা রাবী বলেন, ঘাড় মটকে দিল। (যাতে তিনি মারা গেলেন)। তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাঁকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও এবং দু’ কাপড়ে তাঁকে কাফন দাও; তাঁকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তাঁর মস্তক আবৃত করবে না। কেননা, আল্লাহ্‌ তা’আলা কিয়ামতের দিন তাঁকে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উত্থিত করবেন। (সহিহ বুখারি ১২৬৬)

তালবিয়াহ পাঠের সুন্নাহ ও ভুলসমূহ 

তালবিয়াহ পাঠের সুন্নাহ ও ভুলসমূহ 

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। ইহরাম বাধার সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ ওয়াজিবঃ

২। উচ্চস্বরে পাঠ করবে।

৩। মহিলাগন নীচু স্বরে পাঠ করবে

৪। কিবলামুখী হয়ে তালবিয়াহ পড়া

৫। তালবিয়া বেশী বেশী পাঠ করা

৬। তালবিয়ার সাথে অন্যান্য জিকির করা

৭। নীচে নামা ও উঁচু স্থানে উঠার সময় তালবিয়া পাঠ করা

৮। ইহরাম বাধা থেকে জামারায় পাথর মারা পর্যান্ত পাঠ করা

৯। ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম

তালবিয়ার ভুলসমূহঃ

১।  ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তালবিয়াহ পাঠ না করাঃ

২। দলবদ্ধভাবে তালবিয়া পাঠ করা

১। ইহরাম বাধার সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ ওয়াজিবঃ

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে তাঁর সওয়ারী সোজা দাঁড়িয়ে গেলে তিনি তালবিয়া পাঠ করেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫২তাওহীদ)

আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উচ্চস্বরে হাজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা মক্কায় পৌছলে তিনি আমাদের তা উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন। তালবিয়ার দিন এলে আমরা হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে রওনা হলাম। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৩ ইফাঃ)

আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উচ্চস্বরে হাজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা মক্কায় পৌছলে তিনি আমাদের তা উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন। তালবিয়ার দিন এলে আমরা হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে রওনা হলাম। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৩ ইফাঃ)

২। উচ্চস্বরে পাঠ করবে।

আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যোহরের সালাত মদীনায় চার রাক’আত আদায় করলেন এবং ‘আসরের সালাত যুল-হুলাইফায় দু’রাক’আত আদায় করেন। আমি শুনতে পেলাম তাঁরা সকলে উচ্চৈঃস্বরে হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তালবিয়া পাঠ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৮ তাওহীদ)

খাল্লাদ ইবনুস সাইব (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার নিকট জিবরীল (আঃ) এসে আমাকে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন আমার সাহাবীগণকে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠের আদেশ দেই। (ইবনে মাজাহ ২৯২২, তিরমিযী ৮২৯, নাসায়ী ২৭৫৩, আবূ দাউদ ১৮১৪)

৩। মহিলাগন নীচু স্বরে পাঠ করবেঃ

তবে মহিলারা তালবিয়া মহিলাগন নীচু স্বরে পাঠ করবে। মহিলাদের কন্ঠ পর্দার অন্তরভুক্ত। তাই তারা অন্যান্য যিকির, দোয়া ও কুরআন তিলওয়াত উচ্চস্বরে আদায় করে না। সুতারং তালবিয়াও তারা আস্তে আস্তে পাঠ করবে, এই ক্ষেত্রে পর্দাই হচ্ছে শারঈ বিধান।

মালিক (র) থেকে বর্ণিতঃ, বিজ্ঞ আলিমগণের নিকট শুনেছি, তাঁরা বলতেন, উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করা মহিলাদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। মহিলাগণ আস্তে পড়িবেন যেন কেবল নিজেরাই আওয়ায শুনতে পান।

মালিক (র) বলেন, মসজিদের ভিতরে তালবিয়ার আওয়ায খুব বেশি উঁচু করবে না। বরং এতটুকু শব্দে পড়িবে যেন নিজে এবং পাশের লোকটি কেবল শুনতে পায়। তবে মিনা মসজিদ এবং মসজিদুল হারামে উচ্চৈঃস্বরে ‘লাব্বায়কা’ পাঠ করবে। মালিক (র) বলেন, কতিপয় আলিমের নিকট শুনেছি, প্রত্যেক নামাযের পর এবং চড়াই উতরাই-এর সময় লাব্বায়কা পাঠ করা মুস্তাহাব। (মুয়াত্তা মালিক ৭৩৯)

৪। কিবলামুখী হয়ে তালবিয়াহ পড়াঃ

নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) যুল-হুলাইফায় ফজরের সালাত শেষ করে সওয়ারী প্রস্তুত করার নির্দেশ দিতেন, প্রস্তুত হলে আরোহণ করতেন। সওয়ারী তাঁকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে তিনি সোজা কিবলামুখী হয়ে হারাম শরীফের সীমারেখায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতে থাকতেন। এরপর বিরতি দিয়ে যূতুওয়া নামক স্থানে পৌঁছে ভোর পর্যন্ত রাত যাপন করতেন এবং অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করে গোসল করতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপই করে ছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৩তাওহীদ)

৫। তালবিয়া বেশী বেশী পাঠ করাঃ

আর মুহরিম ব্যক্তির বেশী বেশী তালবিয়া পাঠ করা উচিত; কারণ, তালবিয়াই হচ্ছে হাজ্জ ও উমরার বাচনিক নিদর্শন। বিশেষ করে অবস্থা ও কালের পরিবর্তনের সময় অধিক মাত্রায় তালবিয়া পাঠ করবে। যেমন, উঁচু স্থানে উঠা বা নীচু স্থানে অবতরণের সময়, কিংবা রাত বা দিনের আগমনের সময়, অথবা কখনো ইহরামের নিষিদ্ধ কাজের মনস্থঃ হওয়ার সময় বা কোন অবৈধ কাজের খেয়াল আসার সময় ইত্যাদি।

৬। তালবিয়ার সাথে অন্যান্য জিকির করাঃ

মুহাম্মদ ইব্‌নু আবূ বাকার সাকাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁরা উভয়ে সকাল বেলায় মিনা হতে ‘আরাফার দিকে যাচ্ছিলেন, আপনারা এ দিনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে থেকে কিরূপ করতেন? তিনি বললেন, আমাদের মধ্যে যারা তালবিয়া পড়তে চাইত তারা পড়ত, তাতে বাধা দেয়া হতো না এবং যারা তাকবীর পড়তে চাইত তারা তাকবীর পড়ত, এতেও বাধা দেওয়া হতো না। (সহিহ বুখারি ১৬৫৯ তাওহীদ)

৭। নীচে নামা ও উঁচু স্থানে উঠার সময় তালবিয়া পাঠ করাঃ

১. মুজাহিদ (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর নিকটে ছিলাম, লোকেরা দাজ্জালের আলোচনা করে বলল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর দু’ চোখের মাঝে (কপালে) কা-ফি-র লেখা থাকবে। রাবী বলেন, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, এ সম্পর্কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কিছু শুনিনি। অবশ্য তিনি বলেছেনঃ আমি যেন দেখছি মূসা (‘আ.) নীচু ভূমিতে অবতরণকালে তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৫, ৩৩৫৫, ৫৯১৩)

২. মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমরা ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। উপস্থিত সবাই দাজ্জালের আলোচনা উঠালেন। তখন কোন একজন বললেন, তার (দাজ্জালের) দু’ চোখের মাঝামাঝিতে “কাফির” শব্দ খচিত আছে। তখন ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কিছু বলেছেন বলে আমি শুনিনি। তবে এতটুকু বলতে শুনেছি যে, ইবরাহীম (‘আঃ) এর আকৃতি জানতে হলে তোমাদের এ সাথীরই (নিজের দিকে ইঙ্গিত) দিকে তাকাও। (তিনি অনুরুপই ছিলেন) আর মূসা (‘আঃ) ছিলেন গন্দুমী বর্ণের সুঠামদেহী। তাকে লাল বর্ণের একটি ঊটের পিঠে আরোহিত দেখেছি। আমি যেন তাকে এখনো তালবিয়াহ পাঠ করা অবস্থায় উপত্যকার ঢালু দিয়ে নামতে দেখেছি। (সহিহ মুসলিম ৩১১)

৩. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মাদীনাহয়) যুহরের সলাত আদায় করে সওয়ারীতে চড়েন। অতঃপর তিনি আল-বায়দার উচ্চভূমিতে আরোহণের সময় ‘তালবিয়া’ পাঠ করেন। (আবু দাউদ ১৭৭৪)

৮। ইহরাম বাধা থেকে জামারায় পাথর মারা পর্যান্ত পাঠ করাঃ

ইহরামের কাপড় পরার পর যখনই নিয়ত করা শেষ করবেন তখন থেকে তালবিয়াহ পাঠ শুরু করবেন, আর শেষ করবেন হারাম শরীফে পৌঁছে তাওয়াফ শুরুর পূর্বক্ষণে। আর হজ্জের বেলায় ১০ই যিলহজ্জে বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকবেন।

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ফযলকে বাহনে তার পিছনে বসালেন। রাবী বলেন, এরপর ইবনু আব্বাস (রাঃ) আমাকে অবহিত করলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল আকাবায় পাথর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত অনবরত তালবিযা পাঠ করতে থাকেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৫৮ ইফাঃ)

২. আরাফা হতে মুযদালিফা আসার পথে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সওয়ারীর পেছনে উসামাহ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনার পথে তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাযলকে সওয়ারীর পেছনে বসালেন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তারা উভয়েই বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামারায়ে ‘আকাবাতে কঙ্কর না মারা পর্যন্ত অনবরত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৭)

৩. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুল-হুলাইফার মাসজিদের নিকট হতে ইহ্‌রাম বেঁধেছেন।  (সহিহ বুখারি ১৫৪৩ তাওহীদ)

৪. ‘ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪ তাওহীদ)

৫. কুরাইব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) ফযল (রাঃ) হতে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতেন।(সহিহ বুখারি ১৬৭০ তাওহীদ)

মন্তব্যঃ হজ্জে ইহরাম বাঁধার সময় থেকে শুরু করে ঈদের দিন জামরা আক্বাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া অব্যাহত রাখবে হলেও উমরায় তালবিয়া পাঠ করা ইহরাম বাঁধার সময় থেকে শুরু করে তাওয়াফ আরম্ভ করার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত।

৯। ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম

উমরার ইহরাম বাঁধার পর যদি কেউ ঋতুবতী হয়ে পড়লে তাকে গোসল করতে হবে এবং উমরার ইহ্‌রাম ছেড়ে দিয়ে হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধাতে হবে। হজ্জের পর পাক-সাফ অবস্থায় আর একটি উমরা করতে হবে। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ঋতুর কারণে বাতিল হয়ে যাওয়া উমরার পরিবর্তে নতুনভাবে ‘উমরাহ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন।

১. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা বিদায় হজ্জের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বের হয়ে ‘উমরাহ’র নিয়্যাতে ইহ্‌রাম বাঁধি। নবী বললেনঃ যার সঙ্গে কুরবানীর পশু আছে সে যেন ‘উমরাহ’র সাথে হজ্জের ইহ্‌রামও বেঁধে নেয়। অতঃপর সে ‘উমরাহ ও হজ্জ উভয়টি সম্পন্ন না করা পর্যন্ত হালাল হতে পারবে না। [‘আয়েশা (রাঃ) বলেন] এরপর আমি মক্কায় ঋতুবতী অবস্থায় পৌঁছলাম। কাজেই বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী কোনটিই আদায় করতে সমর্থ হলাম না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমার অসুবিধার কথা জানালে তিনি বললেনঃ মাথার চুল খুলে নাও এবং তা আঁচড়িয়ে নাও এবং হজ্জের ইহ্‌রাম বহাল রাখ এবং ‘উমরাহ ছেড়ে দাও। আমি তাই করলাম, হজ্জ সম্পন্ন করার পর আমাকে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবদুর রহমান ইব্‌নু আবূ বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে তান’ঈম-এ প্রেরণ করেন। সেখান হতে আমি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ এ তোমার (ছেড়ে দেয়া) ‘উমরাহ’র স্থলবর্তী। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, যাঁরা ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধেছিলেন, তাঁরা বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা’য়ী সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যান এবং মিনা হতে ফিরে আসার পর দ্বিতীয়বার তাওয়াফ করেন আর যাঁরা হজ্জ ও ‘উমরাহ উভয়ের ইহ্‌রাম বেঁধেছিলেন তাঁরা একটি মাত্র তাওয়াফ করেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৬)

২. জা’ফর ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমাকে আমার পিতা বলেছেন, আমরা জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিদায় হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলূল্লাহ (স) যুলক্বা’দা মাসের পাঁচ দিন অবশিষ্ট থাকতে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমরাও তাঁর সাথে বের হলাম। যখন তিনি যুল-হুলায়ফা পৌঁছলেন, তখন আসমা বিন্তে উমায়স (রাঃ) মুহাম্মদ ইব্ন আবূ বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করে পাঠালেনঃ আমি এখন কি করব? তিনি বললেনঃ তুমি গোসল কর তারপর পট্টি পরে নাও এবং ইহরাম বাঁধ। (সুনান নাসাঈ ২৯১)

৩. আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন তাঁর সাথে তার সহধর্মিণী আসমা বিনীত উমায়স খাছ’আমীয়্যাও ছিলেন। যখন তাঁরা যুলহুলায়ফায় ছিলেন, তখন আসমা মুহাম্মদ ইবন আবু বকরকে প্রসব করেন। আবু বকর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ সংবাদ দিলে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বলেন, তাকে গোসল করে হজের ইহরাম বাঁধতে আদেশ করুন। এরপর অন্যান্য লোক যা করে সেও তা করবে। কিন্তু সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। সুনানে নাসঈ ২৬৬৬, ইবনে মাজাহ ২৯১২)

তালবিয়ার ভুলসমূহ

১।  ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তালবিয়াহ পাঠ না করাঃ

ইহরাম বাধার সাথে সাথে তালবিয়াহ পাঠ করা সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‌এবং তার সাথীগনও ইহরামের প্রাককালে তালবিয়া পাঠ করছেন। সালফে  সালেহীদের আমলও অনুরূপ। কিন্তু অনেক অজ্ঞতার কারনে ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তালবিয়া পড়ে না। অনেক হাজী সাহেব মক্কায় প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া পাঠ করতে ভুলে যান। অথচ ইহরাম বাঁধার পরই বেশি বেশি করে তালবিয়া পাঠ করা উচিত। আবার অনেকে মনে করে তালবিয়া মক্কা গিয়ে পড়তে হয়। তাদের এই ধারনা ভুল। আমাদের সকল মুজতাহীদ আলেমগন যারা হজ্জ পালন করেছেন তারাও তালবীয়া পাঠ করেছেন। তারা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়তেন।

২। দলবদ্ধভাবে তালবিয়া পাঠ করাঃ

অনেকে দলবদ্ধভাবে একই স্বরে তালবিয়া পাঠ করে থাকেন। বিশেষ করে ইন্দোনেশীয়ার হাজীগন দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করে থাকে। তাদের প্রতি দলে একজন করে লীডার গোছের লোক থাকে। যিনি বলার পর সবাই এক থাকে সমস্বরে তারবিয়া বলেন। এরূপ করা ভুল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবাগণ এভাবে তালবিয়া পাঠ করেননি। তবে যদি কারও তালবিয়া মুখস্ত না থাকে সে শুধু শিক্ষার জন্য অন্যের সহযোগিতা নিয়ে তালবিয়া পাঠ করতে পারে। তবে সবার উচিত হজ্জ যাত্রার আগেই গুরুত্ব দিয়ে তালবিয়া মুখস্থ করতে হবে ও বিশুদ্ধভাবে পাঠ করা।

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

উচ্চারণঃ (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্‌দা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল্‌মুলক, লা শারীকা লাকা)

অর্থঃ তোমার নিকট আমি হাজির হয়েছি, হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি, আমি হাজির হয়েছি, তোমার কোন অংশীদার নেই। আমি হাজির হয়েছি, নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামাত এবং রাজত্ব তোমারই। তোমার কোন অংশীদার নেই।

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ হলো :

১। মাথার চুল মুন্ডন করা বা ছোট করা যাবে  না

২। স্ত্রী সম্ভোগ বা যৌন আকর্ষণে স্পর্শ যাবে নাঃ

৩। স্ত্রীর সাথে সহবাস করা যাবে নাঃ

৪। ইহরাম অবস্থায শিকার করা যাবে নাঃ

৫। অশোভন কাজ বা ঝাগড়া বিবাদ করা যাবে নাঃ

৬। সেলাই যুক্ত জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে নাঃ

৭। নখ কাটা যাবে নাঃ

৮। ইহরাম অবস্থায় মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকা যাবে নাঃ

৮। ইহরাম অবস্থায় মাথা মুন্ডল করা যাবে নাঃ

৯। ইহরাম অবস্থায় মহিলারা হাত মুজা ও নেকাপ পরবে নাঃ

১০। সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে নাঃ

১১। বিবাহ করা বা করানো বা বিবাহের পয়গাম পাঠানো যাবে নাঃ

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজগুলির বিস্তরিত বিবরণঃ

১। মাথার চুল মুন্ডন করা বা ছোট করা যাবে  নাঃ

মুহরিম অবস্থায় মাথার চুল মুন্ডন বা ছোট করা যাবে না। এই কথার দলিল মহান আল্লহ কালাম।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ

অর্থঃ আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। ( সুরা বাকারা ২:১৯৬ )

মন্তব্যঃ এই আয়াতে মাথা মুণ্ডনকে ইহরাম ভঙ্গ করার নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ইহরাম অবস্থায় চুল ছাটা বা কাটা অথবা মাথা মুণ্ডন করা নিষিদ্ধ।

ক। কোন কারনে মাথা মুন্ডন করলে ফিদয়া দিতে হবেঃ

তবে অসুস্থতা কিংবা ওযরের কারণে ইহরাম অবস্থায় মাথার চুল ফেলতে বাধ্য হলে কোন পাপ হবে না, তবে তার ওপর ফিদয়া ওয়াজিব হবে।

দলিলঃ মহান আল্লাহ বলেন,

 فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضاً أَوْ بِهِ أَذًى مِّن رَّأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِّن صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍ فَإِذَا أَمِنتُمْ فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থঃ যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন। (সুরা বাকারা ২:১৯৬)

১. কা‘ব ইবনু ‘উজরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বোধ হয় তোমার এই পোকাগুলো (উকুন) তোমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে? তিনি বললেন, হাঁ, ইয়া আল্লাহর রাসূল! এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি মাথা মুন্ডন করে ফেল এবং তিন দিন সিয়াম পালন কর অথবা ছয়জন মিসকীনকে আহার করাও কিংবা একটা বকরী কুরবানী কর। (সহিহ বুখারি ১৮১৪-১৮১৮)

২. আবদুল্লাহ ইবনু মা‘কিল (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কা‘ব ইবনু উজরা-এর নিকট এই কূফার মসজিদে বসে থাকাকালে সওমের ফিদ্য়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আনা হয়। তিনি তখন বললেন, আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরী সংগ্রহ করতে পার? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি তিনদিন সওম পালন কর অথবা ছয়জন দরিদ্রকে খাদ্য দান কর। প্রতিটি দরিদ্রকে অর্ধ সা‘ খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেল। তখন আমার ব্যাপারে বিশেষভাবে আয়াত অবতীর্ণ হয়। তবে তোমাদের সকলের জন্য এই হুকুম। (সহিহ বুখারি ৪৫১৭)

মন্তব্যঃ  মাথা মুণ্ডনের ফিদয়া তিনভাবে দেয়া যায়, (১) ছাগল যবেহ করা (২) তিনটি রোজা রাখা (৩) ছয়জন মিসকীনকে পেট পুরে খাওয়ানো। প্রত্যেক মিসকীনের জন্য অর্ধ সা‘ (এক কেজি ২০ গ্রাম) খাবার। মোট সদকার পরিমাণ হবে ছয় জন মিসকীনের জন্য তিন সা‘ (সাত কেজি ৩০ গ্রাম)। আর পশু যবেহের ইচ্ছা করলে ছাগল বা তার চেয়ে বড় যেকোনো পশু যবেহ করতে হবে। শরীয়ত বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তবে পশু যবেহ করার মাধ্যমে ফিদয়ার ক্ষেত্রে এমন ছাগল হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা কুরবানীর উপযুক্ত; যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যাবতীয় ত্রুটি থেকে মুক্ত। 

খ। মাথার কিছু অংশ মুন্ডন করলে ফিদয়া ওয়াজিব নয়ঃ

বিশুদ্ধ মতানুসারে পরিপূর্ণরূপে মাথা মুণ্ডন করা ছাড়া উল্লেখিত ফিদয়া ওয়াজিব হবে না। কেননা পরিপূর্ণ মাথা মুণ্ডন ছাড়া হলক বলা হয় না। তাই মাথার কিছু অংশ মুন্ডন করলে ফিদয়া ওয়াজিব হবে না।

দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরামের অবস্থায় আধ কপালির কারণে তাঁর মাথায় শিঙ্গা লাগান। (সহিহ বুখারি ৫৭০১)

ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত যে, মাথার ব্যথায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ‘লাহয়ী জামাল’ নামের একটি কুয়োর ধারে মাথায় শিঙ্গা লাগান।  (সহিহ বুখারি ৫৭০০)

মন্তব্যঃ মাথায় শিঙ্গা লাগানোর স্থান থেকে অবশ্যই চুল ফেলে দিতে হয়েছে। কিন্তু একারণে তিনি ফিদয়া দিয়েছেন এরকম কোন প্রমাণ নেই।

গ। দেহের অন্য কোন স্থানের লোম বিধানঃ

মাথা ছাড়া দেহের অন্য কোন স্থানের লোম মুণ্ডন করলে অধিকাংশ আলিম তা মাথার চুলের ওপর কিয়াস করে উভয়টিকে একই হুকুমের আওতাভুক্ত করেছেন। কারণ মাথা মুণ্ডন করার ফলে যেমন পরিচ্ছন্নতা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভূত হয়, তেমনি দেহের লোম ফেললেও এক প্রকার স্বস্তি অনুভূত হয়। তবে তারা কিছু ক্ষেত্রে ফিদয়ার কথা বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে দমের কথা বলেছেন। বস্তুত এ ক্ষেত্রে দম বা ফিদয়া দেয়া আবশ্যক হওয়ার সপক্ষে কোন শক্তিশালী প্রমাণ নেই। কিন্তু হাজীদের উচিত ইহরাম অবস্থায় শরীরের কোন অংশের চুল বা লোম যেন ছেড়া বা কাটা না হয়। তারপরও যদি কোন চুল পড়ে যায়, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। (হজ উমরা ও জিয়ারত ইসলাম হাউজ.কম)

২। স্ত্রী সম্ভোগ বা যৌন আকর্ষণে স্পর্শ যাবে নাঃ

ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সম্ভোগ করা, নির্লজ্জ কথাবার্তা বলা, যৌন আকর্ষণে স্পর্শ করা বা শরীরের সঙ্গে শরীর লাগানো যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ

অর্থঃ হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থঃ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭ )

সুতরাং কোন ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তির জন্য নিজ স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া, কামভাব নিয়ে স্পর্শ করা বা খোঁচা দেয়া বা রসিকতা করা জায়েয নয়। আর মহিলা যদি ইহরাম অবস্থায় থাকে তাহলে তার জন্য স্বামীকে এ ধরণের সুযোগ দেয়াও জায়েয নয়। এমন কি কামভাব নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের দিকে তাকানোও হালাল নয়। কারণ, ইহাও স্পর্শের মতই সম্ভোগের অন্তর্ভুক্ত।

৬.৪.৩। স্ত্রীর সাথে সহবাস করা যাবে নাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ

অর্থঃ হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থঃ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭ )

আর স্বামী-স্ত্রী মিলন হচ্ছে হাজ্জ ও উমরাহ অবস্থায় সর্বাধিক বড় নিষিদ্ধ কাজ। যার তিনটি অবস্থা হতে পারেঃ

ক। প্রথম অবস্থাঃ আরাফায় অবস্থানের পূর্বে সহবাসঃ

উকুফে আরাফা বা আরাফায় অবস্থানের পূর্বে মুহরিম ব্যক্তির স্ত্রী-সম্ভোগে লিপ্ত হওয়া। এমতাবস্থায় সমস্ত আলিমের মতেই তার হজ বাতিল হয়ে যাবে। তবে তার কর্তব্য হচ্ছে, হজের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীকালে তা কাজা করা। তাছাড়া তাকে দম (পশু কুরবানী) দিতে হবে। পশুটি কেমন হবে এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, তিনি একটি ছাগল যবেহ করবেন। (খালেছুল জুমান ১১৪)। তবে, অন্য ইমামগণের মতে, একটি উট যবেহ করবেন।

ইমাম মালেক রহ. বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি যে, উমর, আলী ও আবূ হুরায়রা রা.-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে মুহরিম থাকা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়েছে। তাঁরা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, সে আপন গতিতে হজ শেষ করবে। তারপর পরবর্তী বছর হজ আদায় করবে এবং হাদী যবেহ করবে। ( মুআত্তা মালেক : ১৩০৭/১)

তিনি বলেন, আলী রা. বলেছেন, পরবর্তী বছর যখন তারা হজের ইহরাম বাঁধবে, তখন হজ শেষ করা অবধি স্বামী-স্ত্রী একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। (প্রাগুক্ত।)

মোটকথা, সর্বসম্মত মত হল, আরাফায় অবস্থানের পূর্বে স্ত্রী সহবাস করলে হজ বাতিল হয়ে যায়।

খ। দ্বিতীয় অবস্থাঃ আরাফায় অবস্থান ও বড় জামরায় পাথর মারার পর সহবাস করলেঃ

আরাফায় অবস্থানের পরে, বড় জামরায় পাথর মারা এবং হজের ফরয তাওয়াফের পূর্বে যদি সহবাস সংঘটিত হয়, তবে ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, তার হজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু তার ওপর একটি উট যবেহ করা কর্তব্য। এ ব্যাপারে তিনি হাদীসের বাহ্যিক ভাষ্য থেকেই তিনি দলীল গ্রহণ করেছেন। হাদীসে এসেছে الحَجُّ عَرَفَةُ (আল-হাজ্জু আরাফাতু) অর্থাৎ হজ হচ্ছে আরাফা। (আবূ দাউদ ১৯৪৯

পক্ষান্তরে ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমদসহ অধিকাংশ ফকীহর মতে তার হজ ফাসেদ। এ অবস্থায় তাকে দু’টি কাজ করতে হবে।

১. তার ওপর ফিদয়া ওয়াজিব হবে। আর সে ফিদয়া আদায় করতে হবে একটি উট বা গাভি দ্বারা, যা কুরবানী করার উপযুক্ত এবং তার সব গোশত মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে; নিজে কিছুই গ্রহণ করতে পারবে না।

২. সহবাসের ফলে হজটি ফাসিদ বলে গণ্য হবে। তবে এ হজটির অবশিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করা তার কর্তব্য এবং বিলম্ব না করে পরবর্তী বছরেই ফাসিদ হজটির কাযা করতে হবে।

গ। তৃতীয় অবস্থাঃ বড় জামরায় পাথর মারা ও মাথা মুণ্ডনের পরঃ

বড় জামরায় পাথর মারা ও মাথা মুণ্ডনের পর এবং হজের ফরয তাওয়াফের পূর্বে সহবাস সংঘটিত হলে, হজটি সহীহ হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রসিদ্ধ মতানুসারে তার ওপর দু’টি বিষয় ওয়াজিব হবে।

১. একটি ছাগল ফিদয়া দেবেন, যার সব গোশত গরীব-মিসকীনদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। ফিদয়া দানকারী কিছুই গ্রহণ করবে না।

২. হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে নতুন করে ইহরাম বাঁধবেন এবং মুহরিম অবস্থায় হজের ফরয তাওয়াফের জন্য লুঙ্গি ও চাদর পরে নেবেন

মন্তব্যঃ এই মাসায়েলটি “কুরআন ও হাদীছের আলোকে হজ্জ, উমরাহ ও মদীনা যিয়ারত”  শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) কিতার থেকে নকল করা হইয়াছে।

৪। ইহরাম অবস্থায শিকার করা যাবে নাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا وَاتَّقُواْ اللّهَ الَّذِيَ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও সুমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে তোমাদের উপকারার্থে এবং তোমাদের ইহরামকারীদের জন্যে হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার যতক্ষণ ইহরাম অবস্থায় থাক। আল্লাহকে ভয় কর, যার কাছে তোমরা একত্রিত হবে। (সুরা মায়েদা ৫:৯৬)

সুতরাং কোন মুহরিম ব্যক্তির জন্য আয়াতে বর্ণিত শিকারী পশু শিকার করা জায়েয নয়, তা সরাসরি হত্যা করা হোক, অথবা তার হত্যার কারণ হওয়া কিংবা ইশারা-ইংগীতের মাধ্যমে হত্যার জন্য সহায্য-সহযোগিতা করা হোক বা তা হত্যার জন্য নিজ অস্ত্র অপর ব্যক্তিকে প্রদান করাই হোক। তবে ইহরাম মুক্ত ব্যক্তি যদি নিজে খাওয়ার জন্য শিকার করে তবে সেই গোশ্ত ইহরাম অবস্থায় খাওয়া যাবে।

১. আবূ কাতাদাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম, এমনকি ‘ক্বাহাহ্’ নামক স্থানে গিয়ে পৌছলাম। আমাদের কতক ইহরাম অবস্থায় এবং কতক ইহরামবিহীন অবস্থায় ছিল। আমি লক্ষ্য করলাম, আমার সঙ্গীরা একটা কিছুর দিকে তাকাচ্ছে। আমি তাকিয়ে দেখলাম, তা একটি বন্য গাধা। অতএব আমি আমার ঘোড়ার জীন বাঁধলাম এবং বল্লম তুলে নিলাম। এরপর ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলাম। এ অবস্থায় আমার চাবুক নিচে পড়ে গেল। আমি আমার সঙ্গীদের তা তুলে দিতে বললাম, তারা ইহরাম অবস্থায় ছিল। তাই তারা আল্লাহর শপথ করে বলল, আমরা তোমাকে এ ব্যাপারে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারব না। অতঃপর আমি নিচে নেমে এসে তা তুললাম। অতঃপর ঘোড়ায় চড়ে গাধার পশ্চাদ্ধাবন করলাম। তা ছিল একটি টিলার আড়ালে। আমি বল্লমের আঘাতে এটাকে হত্যা করলাম। অতঃপর আমার সঙ্গীদের কাছে নিয়ে এলাম। তাদের কতক বলল, তা খাও, আর কতক বলল, খেও না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সম্মুখভাগে ছিলেন। আমি ঘোড়া হাকিয়ে তার নিকট উপস্থিত হলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তা হালাল, অতএব তোমরা তা খাও। (সহিহ মুসলিম ২৭৪১)

২. আবদুল্লাহ ইবনু আবূ কাতাদাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি ছাড়া আর সকলেই উমরাহ করার জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। আমি একটি বন্য গাধা শিকার করলাম এবং আমার মুহরিম সঙ্গীদের এর গোশত খাওয়ালাম। অতঃপর আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে অবহিত করলাম যে, শিকারের অবশিষ্ট গোশত আমাদের সাথে আছে। তিনি বললেন, “তোমরা তা খাও”; তখন তারা ছিলেন মুহরিম।আবদুল্লাহ ইবনু আবূ কাতাদাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি ছাড়া আর সকলেই উমরাহ করার জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। আমি একটি বন্য গাধা শিকার করলাম এবং আমার মুহরিম সঙ্গীদের এর গোশত খাওয়ালাম। অতঃপর আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে অবহিত করলাম যে, শিকারের অবশিষ্ট গোশত আমাদের সাথে আছে। তিনি বললেন, “তোমরা তা খাও”; তখন তারা ছিলেন মুহরিম। (সহিহ মুসলিম ২৭৪৭)

৩. আবদুল্লাহ ইবনু আবূ কতাদাহ্ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত যে, তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে (সফরে) রওনা হলেন। তারা সবাই ইহরাম অবস্থায় ছিলেন, কিন্তু আবূ কতাদাহ (রাযিঃ) হালাল অবস্থায় ছিলেন। হাদীসের অবশিষ্ট বর্ণনা পূর্ববৎ। তবে এ বর্ণনায় আরও আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এর কিছু গোশত তোমাদের সাথে আছে কি? তারা বললেন, এর পায়ের গোশত আমাদের সাথে আছে। রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিয়ে আহার করলেন। (সহিহ মুসলিম ২৭৪৮)

৪. সা’ব ইবনু জাসসামাহ আল লায়সী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বন্য গাধা (গোশত) হাদিয়্যাহ (হাদিয়া/উপহার) স্বরূপ দিলেন। আর তিনি তখন আবওয়া অথবা ওয়াদান নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তিনি তার কাছে তা ফেরত পাঠালেন। সা‘ব (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার চেহারা মলিন দেখে বললেন, আমি তোমাকে তা ফেরত দিতাম না, শুধু ইহরামের কারণেই তা ফেরত দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ২৭৩৫)

৫. জাবির ইবন অবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, স্থলভাগের শিকার করা জন্তুর গোশত তোমাদের জন্য ভক্ষণ করা হালাল, যদি তা তোমরা নিজেরা শিকার না করে থাক অথবা তোমাদের জন্য শিকার না করা হয়। (আবু দাউদ ১৮৫১ ও সুনানে নাসাঈ ২৮২৭, হাদিসের মান যঈফ)

হাদিসটি যঈফ হলেও সুনানে তিরমিজির ৮৪৬ নম্বর সহিহ হাদিসটির সার কথা সাথে এই হাদিসটির মিল আছে। কাজেই হুকুমের দিক থেকে হাদিসটি গ্রহনীয়।

আর যদি কোন মুহরিম ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত কোন শিকারী পশুকে হত্যা করে তাহলে তাকে তার বিনিময় দিতে হবে। এর দলিল হলো কুরআনের আয়াত। মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَقْتُلُواْ الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامُ مَسَاكِينَ أَو عَدْلُ ذَلِكَ صِيَامًا لِّيَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ عَفَا اللّهُ عَمَّا سَلَف وَمَنْ عَادَ فَيَنتَقِمُ اللّهُ مِنْهُ وَاللّهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامٍ

অর্থঃ মুমিনগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না। তোমাদের মধ্যে যে জেনেশুনে শিকার বধ করবে, তার উপর বিনিময় ওয়াজেব হবে, যা সমান হবে ঐ জন্তুর, যাকে সে বধ করেছে। দু’জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এর ফয়সালা করবে-বিনিময়ের জন্তুটি উৎসর্গ হিসেবে কাবায় পৌছাতে হবে। অথবা তার উপর কাফফারা ওয়াজেব-কয়েকজন দরিদ্রকে খাওয়ানো অথবা তার সমপরিমাণ রোযা রাখতে যাতে সে স্বীয় কৃতকর্মের প্রতিফল আস্বাদন করে। যা হয়ে গেছে, তা আল্লাহ মাফ করেছেন। যে পুনরায় এ কান্ড করবে, আল্লাহ তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবেন। আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম। ( সুরা মায়েদা ৫:৯৫ )

 *** এ সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) বলেনঃ

কেউ যদি কোন পায়রাকে হত্যা করে তাহলে তার অনুরূপ হচ্ছে ছাগল। সুতরাং সে ব্যক্তি নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি আদায় করতে পারবে।

(১) একটি ছাগল যবহ করে পায়রার ফিদয়া স্বরূপ গরীব-দরিদ্রদের মাঝে তা বিতরণ করে দিবে,

(২) ছাগলের মূল্য ধরে টাকা দিয়ে খাদ্য দ্রব্য ক্রয় করে প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা’ করে প্রদান করবে। অথবা

(৩) প্রত্যেক মিসকীনের অন্নদানের বিনিময়ে একটি করে সিয়াম রাখবে।

আর গাছ কাটার বিষয়টি ইহরামের কারণে কোন মুহরিম ব্যক্তির প্রতি হারাম হয় না। কেননা ইহা ইহরাম সংক্রান্ত বিধান নয়। তবে যে ব্যক্তি হারামের সীমানার ভিতরে অবস্থান করবে তার প্রতি গাছ কাটা হারাম, সে ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় থাক বা নাই থাক। অতএব আরাফায় মুহরিম ও যে মুহরিম নয় উভয় ব্যক্তির জন্য গাছ কাটা জায়েয। কিন্তু মুজদালিফা এবং মিনায় উভয় শ্রেণীর মানুষের জন্য গাছ কাটা হারাম। (** কিতাবঃ কুরআন ও হাদীছের আলোকে হজ্জ, উমরাহ ও মদীনা যিয়ারত) 

তার এই ফতওয়ার দলিল হলোঃ

কারণ, আরাফা হচ্ছে হারাম সীমানার বাইরে পক্ষান্তরে মুয্দালিফা এবং মিনা হচ্ছে হারাম সীমানার ভিতরে।

ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ (মক্কা) শহরকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, এর একটি কাঁটাও কর্তন করা যাবে না, এতে বিচরণকারী শিকারকে তাড়া করা যাবে না, এখানে প্রচারের উদ্দেশ্য ব্যতীত পড়ে থাকা কোন বস্তু কেউ তুলে নিবে না। (সহিহ বুখারি ১৫৮৭ তাওহীদ)

ব্যতিক্রমঃ

১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ এমন চার প্রকার দুষ্ট জন্তু হারাম এবং হারামের বাইরে নিধন করা যায়ঃ চিল (এবং শকুন), কাক, ইঁদুর এবং হিংস্র কুকুর। তিনি (উবায়দুল্লাহ) বলেন, আমি কাসিমকে জিজ্ঞেস করলাম, সাপের বিষয়ে আপনার মত কী? তিনি বললেন, তা হীনভাবে হত্যা করতে হবে। (সহিহ মুসলিম ২৭৫১)

২. আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচটি অনিষ্টকর প্রাণীকে হারামের ভিতর হত্যা করা যায় বিচ্ছু, ইঁদুর, কাক, চিল ও হিংস্ৰ কুকুর। (সহিহ মুসলিম ২৭৫৩)

৩. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পাঁচটি অনিষ্টকর প্রাণী আছে যা হারামের বাইরে ও ভেতরে হত্যা করা বৈধ, সাপ, বুকে বা পিঠে সাদা চিহ্নযুক্ত কাক, ইঁদুর, হিংস্র কুকুর ও চিল। (সুনানে আবু দাউদ ৩০৮৭, তিরমিজি ৮৩৭, নাসাঈ ২৮২৯ হাদিসের মান সহিহ)

যায়দ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইবনু উমর (রাযিঃ) এর নিকট জিজ্ঞেস করল, মুহরিম ব্যক্তি কোন কোন জন্তু হত্যা করতে পারে? তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জনৈকা সহধর্মিণী বলেছেন যে, তিনি হিংস্র কুকুর, ইঁদুর, বিচ্ছু, চিল, কাক ও সাপ হত্যা করার নির্দেশ দিতেন।এমনকি সালাতরত অবস্থায়ও তা হত্যা করা যায়। (সহিহ মুসলিম ২৭৬১)

অশোভন কাজ বা ঝাগড়া বিবাদ করা যাবে নাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ

অর্থঃ অর্থঃ হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থঃ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়।  (সুরা বাকারা ২:১৯৭ )

১. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হাজ্জ হতে ফিরে আসবে যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল। সহিহ বুখারি ১৫২১, ১৮১৯)

২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এ ঘরের (বাইতুল্লাহর) হাজ্জ আদায় করল, অশ্লীলতায় জড়িত হল না এবং আল্লাহর অবাধ্যতা করল না, সে মায়ের পেট হতে সদ্য প্রসূত শিশুর ন্যায় (হাজ্জ হতে) প্রত্যাবর্তন করল। (সহিহ বুখারি ১৮২০)

সেলাই যুক্ত জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে নাঃ

সেলাই যুক্ত জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে না, এই সম্পর্কি বিস্তারিত পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনার শেষে একটি সারসংক্ষেপও তুলে ধরেছিলাম। এখান আর আলোচনা না করে, সেই সারসক্ষেপ কথাগুলোই তুলে ধরলাম।

ইহরাম বাধার পর যে নিয়মে পোশাক পরিধান হবে তা নিম্মরূপঃ

১। মুহরিম ব্যক্তি জামা এবং পায়জামা পরিধান করতে পারবে না।

২। মুহরিম ব্যক্তি মাথায় পাগড়ী বা টুপি পরিধান করতে পারবে না।

৩। হাতে ও পায়ে মুজা ব্যবহার করতে পাবরে না তবে চপ্পল ব্যবহার করতে পারবে।

৪।  মুহরিম নারী মুখ ঢাকবে না এবং হাত মোজাও পরবে না।

৫।  মুহরিম নারীদের বুরনুস (টুপির মত এক প্রকার কাপড় যা মহিলারা পরিধান করে) পরিধান করতে পারবে না।

৬। জাফরান বা ওয়ারস রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরিধান করা যাবে না

৭। মুহরিম চুল আঁচড়াবে না, শরীর চুলকাবে না।

মন্তব্যঃ এই সকল বিষয় বিবেচনা করে হজ্জযাত্রীগন সেলাই বিহীন দুটি সাদা চাদরের মত কাপড় ব্যবহার করে। আর মহিলাগন সুবিধামত সাবলিল পোশাক পরিধান করে থাকে।

নখ কাটা যাবে নাঃ

ইহরাম নখ কাটা যাবে না বিষয়টি সরাসরি কুর্‌আন সুন্নাহে উল্লেখ নাই। ইহরামের অবস্থায় নখ কাটা বা নখ উঠিয়ে ফেলার বিষয়টি মুজতাহীদ আলেমগণের প্রসিদ্ধ মতে মাথা মুণ্ডনের উপর ক্বিয়াস করা হয়েছে। (যা সূরাহ্ বাক্বারার আয়াত নং ১৯৬ তে উল্লেখিত হয়েছে)। হাতের নখ এবং পায়ের নখের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে যদি কোন একটি নখ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে কষ্ট অনুভব হয় তাহলে কষ্টদায়ক অংশটুকু কেটে ফেলে দিলে কোন অসুবিধা নেই এবং তাতে কোন ফিদয়াও লাগবে না।

তবে শুধু হাজ্জি নয় যারা সাধারণ কুরাবানীর নিয়ত করবে তারাও নখ কাটবে। এই মর্ম বহু সহিহ হাদিস আছে। যেমনঃ

১. উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

২. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

৮। ইহরাম অবস্থায় মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকা যাবে নাঃ

১. ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক (মুহরিম) ব্যক্তি মারা গেল। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (সাহাবাদেরকে) বললেনঃ তাকে কুল পাতার পানি দ্বারা গোসল করাও এবং তার কাপড়েই তাকে কাফন দাও। তার মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকবে না। কেননা তাকে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠানো হবে। (সুননে নাসাঈ ২৭১৪ হাদিসের মান সহিহ)

২. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক মুহরিম ব্যক্তি উট থেকে পড়ে যাওয়ায় তার ঘাড় ভেঙ্গে গেল এবং সে মারা গেল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেনঃ তাকে কুল পাতার পানি দ্বারা গোসল দাও এবং ( ইহরামের) দু’কাপড় দিয়েই তাকে দাফন দাও। এরপর তিনি বলেনঃ তার মাথা কাফনের বাইরে থাকবে। আর তার গায়ে খুশবু লাগাবে না। কেননা সে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে। শুবা (রাঃ) বলেনঃ আমি দশ বছর পর তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ঐ হাদীস বর্ণানা করলেন, যেমন পূর্বে তিনি বর্ণনা করতেন। কিন্তু তাতে তিনি বললেন; তার চেহারা এবং মাথা ঢাকবে না। (সুননে নাসাঈ ২৮৫৪ হাদিসের মান সহিহ)

. ইহরাম অবস্থায় মহিলারা হাত মুজা ও নেকাপ পরবে নাঃ

মহিলারা তাদের মাথা আবৃত রাখবে। তাছাড়া তারা ইহরাম অবস্থায় যেকোনো ধরনের পোশাকই পরতে পারবে। তবে অত্যধিক সাজ-সজ্জা করবে না। ইহরাম অবস্থায় তাদের জন্য যা নিষিদ্ধ তা হচ্ছে হাত মুজা ও নেকাপ।

দলিলঃ

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইহরাম অবস্থায় আপনি আমাদেরকে কী ধরনের কাপড় পরতে আদেশ করেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জামা, পায়জামা, পাগড়ী ও টুপী পরিধান করবে না। তবে কারো যদি জুতা না থাকে তাহলে সে যেন মোজা পরিধান করে তার গিরার নীচ হতে এর উপরের অংশটুকু কেটে নিয়ে তোমরা যাফরান এবং ওয়ারস্ লাগানো কোন কাপড় পরিধান করবে না। মুহরিম মহিলাগণ মুখে নেকাব এবং হাতে হাত মোজা পরবে না। মূসা ইবনু ‘উকবাহ, ইসমা‘ঈল ইবনু ইবরাহীম ইবনু ‘উকবাহ, জুওয়ায়রিয়া এবং ইবনু ইসহাক (রহ.) নিকাব এবং হাত মোজার বর্ণনায় লায়স (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। ‘উবাইদুল্লাহ (রহ.) وَلاَ الْوَرْسُ এর স্থলে وَلاَ وَرْسُ বলেছেন এবং তিনি বলতেন, ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব ও হাত মোজা ব্যবহার করবে না। মালিক (রহ.) নাফি‘ (রহ.)-এর মাধ্যমে ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব ব্যবহার করবে না। লায়স ইবনু আবূ সুলায়ম (রহ.) এ ক্ষেত্রে মালিক (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৮৩৮)

মন্তব্যঃ এমনভাবে মুখ ঢাকবে যাতে সহজেই সে আবরণ উঠানো যায় এবং নামানো যায়। পর পুরুষের সামনে মুখ ঢেকে রাখবে। কারণ, মাহরাম ছাড়া পর-পুরুষের সামনে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করা মহিলাদের জন্য বৈধ নয়।

১০সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে নাঃ

ইহরামের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকালে গোসল করা, সুগন্ধি মাখার নিয়মগুলি পালন করতে হবে। ইহরামের কাপড় পরিধানের পর সুগন্ধি মাখা চলবে না। ইহরামের নিয়ত করার পূর্বে মাখা সুগন্ধি মুহরিমের চেহারায় দৃশ্যমান হতে পারে বা তা থেকে সুগন্ধ আসতে পারে। ইহ্‌রাম থেকে মুক্ত হওয়ার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা চলবে। পূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাই দলিল হিসাবে মাত্র তিনটি হাদিস উল্লেখ করেছি।

১। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহরাম বাধার সময় এবং (হজ্জ সমাপনান্তে) ইহরামমুক্ত হওয়ার পর বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পুর্বেও আমি তাঁকে সুগন্ধি মেখে দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ২৬৯৫ ইফাঃ)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সিঁথিতে যে সুগন্ধি তেল চকচক করছিল তা যেন আজও আমি দেখতে পাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ১৫৩৮ তাওহীদ)

৩। নবী সহধর্মিণী ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইহ্‌রাম বাঁধার সময় আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গায়ে সুগন্ধি মেখে দিতাম এবং বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পূর্বে ইহ্‌রাম খুলে ফেলার সময়ও। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সিঁথিতে যে সুগন্ধি তেল চকচক করছিল তা যেন আজও আমি দেখতে পাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ১৫৩৯ তাওহীদ)

১১বিবাহ করা বা করানো বা বিবাহের পয়গাম পাঠানো যাবে নাঃ

১. উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহরাম অবস্থায় কোন ব্যক্তি নিজে বিবাহ করবে না, অন্যকেও বিবাহ করাবে না এবং বিবাহের প্রস্তাবও দিবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৬৬)

২. নুবাইহ ইবনু ওয়াহব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ইবনু মামার তার (ইহরামধারী) ছেলেকে বিয়ে করাতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি আমাকে আমীরুল হজ্জ আবান ইবনু উসমানের নিকট পাঠালেন। তাঁর নিকট এসে আমি বললাম, আপনার ভাই তাঁর ছেলেকে বিয়ে করাতে চান। এই বিষয়ে তিনি আপনাকে সাক্ষী রাখতে চান। তিনি বললেন, আমি দেখছি সে তো এক মূৰ্খ বেদুঈন! ইহরামধারী ব্যক্তি না নিজে বিয়ে করতে পারে আর না অন্যকে বিয়ে করাতে পারে, অথবা এরকমই বলেছেন। নুবাইহ বলেন, এরপর তিনি হাদীসটিকে উসমান (রাঃ)-এর মারফতে মারফূভাবে বর্ণনা করেছেন।(তিরমিজ ৮৪০, আবু দাউদ ১৮৪১)

৩. ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত একটি শায হাদিসে আছে তিনি বলেন, মায়মূনা বিনতুল হারিস কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় বিবাহ কলেন। এটি একটি শায হাদিস এর বিপরীতে একাধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনায় দেখা যায় তিনি ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করেন নাই।

মাইমূনা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তাকে বিয়ে করেন তিনি তখন ইহরামমুক্ত অবস্থায় ছিলেন এবং একই অবস্থায় তিনি তার সাথে বাসর যাপন করেন। পরবর্তী কালে মাইমূনা (রাঃ) সারিফেই মারা যান এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাথে যে ঝুপড়িতে (কুঁড়ে ঘরে) বাসর যাপন করেন আমরা তাকে সেই স্থানেই দাফন করি। তিরমিজি ৮৪৫, সহীহ, ইবনু মা-জাহ (১৯৬৪)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করেন। (ইবনু মাজাহ ১৯৬৪)

মায়মূনা বিনতুল হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হালাল (ইহরামমুক্ত) অবস্থায় বিবাহ করেন। রাবী ইয়াযীদ ইবনু আসম্ম বলেন, মায়মূনা (রাঃ) ছিলেন আমার ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর খালা। (ইবনে মাজাহ ২৯৬৪, আবূ দাউদ ১৮৪৩)

মন্তব্যঃ কাজেই ইহরামে থাকা কালে মুহরিম কোন অবস্থায়‌ই বিবাহ করতে পারবে না।

১২ইহরামের ফিদয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়াঃ


ক। ভুলে বা বাধ্য হয়ে কিংবা নিদ্রিত অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজে গুনাহ হবে নাঃ

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজে যদি ভুলে বা বাধ্য হয়ে কিংবা নিদ্রিত অবস্থায় করে তবে কোন গুনাহ হবে না। তার ওপর কোন কিছু ওয়াজিবও হবে না।

দলিলঃ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٞ فِيمَآ أَخۡطَأۡتُم بِهِۦ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوبُكُمۡۚ﴾

‘আর এ বিষয়ে তোমরা কোন ভুল করলে তোমাদের কোন পাপ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে (পাপ হবে)।(সুরা আহযাব ৩৩:৫)

অন্য এক আয়াতে এসেছে,

﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ﴾

‘হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।’(সুরা বাকারা ২:২৮৬)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿ مَن كَفَرَ بِٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِهِۦٓ إِلَّا مَنۡ أُكۡرِهَ وَقَلۡبُهُۥ مُطۡمَئِنُّۢ بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِٱلۡكُفۡرِ صَدۡرٗا فَعَلَيۡهِمۡ غَضَبٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ١٠٦ ﴾

অর্থঃ যে ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে এবং যারা তাদের অন্তর কুফরী দ্বারা উন্মুক্ত করেছে, তাদের ওপরই আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা আযাব। ওই ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরী করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত। (সুরা নাহল ১৬:১০৬)

১. আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, (২) অসুস্থ (পাগল) ব্যক্তি, যতক্ষণ না আরোগ্য লাভ করে এবং (৩) অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না বালেগ হয়।(সুনানে আবু দাউদ ৪৩৯৮)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা যেনার অপরাধে জনৈকা উম্মাদিনীকে ধরে এনে উমার (রাঃ)-এর নিকট হাযির করা হয়। তিনি এ ব্যাপারে লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ সময় আলী (রাঃ) তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন এর কি হয়েছে? উপস্থিত লোকেরা বললো, সে অমুক গোত্রের উম্মাদিনী (পাগল মহিলা), সে যেনা করেছে। উমার (রাঃ) তাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি বললেন, তোমরা তাকে নিয়ে ফিরে যাও। অতঃপর তিনি উমারের নিকট এসে বললে, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি কি জানেন না, তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়, (২) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং (৩) নাবালেগ শিশু, যতক্ষণ না বালেগ হবে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আলী (রাঃ) বলেন, তাহলে তাকে পাথর মারা হবে কেন? তিনি বলেন, কোনো কারণ নেই। আলী (রাঃ) বলেন, তবে তাকে ছেড়ে দিন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন এবং ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারণ করলেন। (সুনানে আবু দাউদ ৪৩৯৯)

মন্তব্যঃ উপরের আয়াত ও হাদীস থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মাণ হয় যে, উপর্যুক্ত অবস্থায় যদি কারো ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয় সংঘটিত হয়ে যায়, তবে তা হুকুম ও শাস্তির আওতাভুক্ত হবে না। বরং তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। তবে যখন উযর দূর হবে এবং অজ্ঞাত ব্যক্তি জ্ঞাত হবে, বিস্মৃত ব্যক্তি স্মরণ করতে সক্ষম হবে, নিদ্রিত ব্যক্তি জাগ্রত হবে, তৎক্ষণাৎ তাকে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে হবে এবং দূরে রাখতে হবে। উযর দূর হওয়ার পরও যদি সে ওই কাজে জড়িত থাকে, তবে সে পাপী হবে এবং যথারীতি তাকে ফিদয়া প্রদান করতে হবে।

খ। নিষিদ্ধ বিষয় উযর সাপেক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত করলে ফিদয়া দিতে হবেঃ

 নিষিদ্ধ বিষয় উযর সাপেক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত করা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে পাপী হবে না, তবে তাকে ফিদয়া প্রদান করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَلَا تَحۡلِقُواْ رُءُوسَكُمۡ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ ٱلۡهَدۡيُ مَحِلَّهُۥۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوۡ بِهِۦٓ أَذٗى مِّن رَّأۡسِهِۦ فَفِدۡيَةٞ مِّن صِيَامٍ أَوۡ صَدَقَةٍ أَوۡ نُسُكٖۚ ﴾

‘আর তোমরা তোমাদের মাথা মুণ্ডন করো না, যতক্ষণ না পশু তার যথাস্থানে পৌঁছে। আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ কিংবা তার মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে তবে সিয়াম কিংবা সদাকা অথবা পশু জবাইয়ের মাধ্যমে ফিদয়া দেবে।(সুরা বাকারা ২:১৯৬।

গ। নিষিদ্ধ বিষয় বৈধ কোন উযর ছাড়া সংঘটিত করলে হজ্জ বাতিল বা ফিদয়া ওয়াজিব হবেঃ

নিষিদ্ধ বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে বৈধ কোন উযর ছাড়া সংঘটিত করা। এ ক্ষেত্রে তাকে ফিদয়া প্রদান করতে হবে এবং সে পাপীও হবে। কোন অপরাধের দরুণ কী ফিদয়া দিতে হবে, এ সম্পর্কিত শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়া উল্লেখ করছি।  তিনি লিখেন, ফিদয়ার ক্ষেত্রে ইহরামের নিষিদ্ধ কাজসমূহ চার ভাগে বিভক্তঃ

ক। এমন নিষিদ্ধ কাজ যা করে ফেললে তাতে কোন ফিদয়া ওয়াজিব হবে না। আর তা হল নিজে বিবাহ করা কিংবা অপরের বিবাহের ওলী (অভিভাবক) বা উকীল হয়ে বিবাহ করানো।

খ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যার ফিদয়া হচ্ছে উঁটের কুরবানী করা। আর তা হাজ্জের অবস্থায় প্রাথমিক হালাল হওয়ার পূর্বে সহবাসের কারণে ওয়াজিব হয়।

গ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যার ফিদয়া হচ্ছে তার বিনিময় বা বিনিময়ের মূল্য। আর তা হলো, ইহরাম অবস্থায় শিকার করা।

গ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যার ফিদয়া হচ্ছে সিয়াম পালন করা বা মিসকীনকে সাদকাহ করা কিংবা কুরবানী করা। যেমন উপরে মাথামুণ্ডনের ফিদয়ার বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আর আলিমগণ উপরোক্ত তিনটি নিষিদ্ধ কাজ ছাড়া অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজগুলিকে মাথামুণ্ডনের ফিদয়ার উপর কিয়াস করেছেন।