Category Archives: হজ

যে সকল সময় ও অবস্থায় দোয়া কবুল হয়

যে সকল সময় ও অবস্থায় দোয়া কবুল হয়

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

আজান ও তুমুল যুদ্ধের সময়ঃ

১.  সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দু’সময়ের দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না অথবা (তিনি বলেছেন) কমই ফিরিয়ে দেয়া হয়। আযানের সময়েরদু’আ ও যুদ্ধের সময়ের দু’আ, যখন পরস্পর কাটাকাটি, মারামারি আরম্ভ হয়ে যায়। আর এক বর্ণনায় আছে বৃষ্টি বর্ষণের সময়ে দু’আ।তবে দারিমীর বর্ণনায় “বৃষ্টির বর্ষণের” কথাটুকু উল্লেখ হয়নি। (মিসকাত ৬৭২, দারিমী ১২৩৬, সহীহ আল জামি‘ ৩০৭৮)

২. সাহ্‌ল ইবনে সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দুই সময়ের দু‘আ রদ হয় না, কিংবা কম রদ হয়। (এক) আযানের সময়েরদু‘আ। (দুই) যুদ্ধের সময়, যখন তা তুমুল আকার ধারণ করে। (রিয়াদুস সালেহীণ ১৩৩৩, আবূ দাঊদ ২৫৪০,

১৪.. আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়েঃ

 আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না। এই সময়ে কোন প্রকার দোয়াই ব্যর্থ হয় না।

১. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়ের দু’আ ফেরত দেয়া হয় না। (সুনানে তিরমিজি ২১২)

সিজদারত অবস্থায়ঃ

 সিজদারত অবস্থায় বান্দা তার প্রতিপালক মহান আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। এই সময় দোয়া করালে কবুল হওয়ার কথা সহিহ হাদিসে উল্লেখ আছে। কাজেই এই সময় বেশী থেকে বেশী দোয়া করতে হবে।

দলিলঃ

১. হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দা আল্লাহ তা’আলার অধিক নিকটবর্তী হয়, যে অবস্থায় সে সিজদারত থাকে। অতএব, তখন তোমরা অধিক দোয়া করতে থাক। (নাসাঈ ১১৪০)

২. আবু হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা সাজদার সময়ে মহান আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করে। কাজেই এ সময় তোমরা অধিক পরিমাণে দু‘আ পাঠ করবে। (আবু দাউদ ৮৭৫)

জুমার দিনের দোয়াঃ

জুমআর দিনের একটি সময় এমন যে, ঐ সময়ে কোন মুসলিম আল্লাহ তা‘আলার কাছে যা চায়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে তা দিয়েই দেন।

১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমু’আর দিন সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং বলেন, এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে কোন মুসলিম বান্দা যদি এ সময় সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্‌র নিকট কিছু প্রার্থনা করে, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দিয়ে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। (সহিহ বুখারি ৯৩৫, সুনানে নাসাই ১৪৩২)

২. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই জুমু’আর দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে কোন মুসলিম বান্দা উক্ত মুহূর্তটি পেয়ে আল্লাহ্‌র কাছে কোন কিছু প্রার্থনা করলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে তা নিশ্চয় দেবেন। (সুনানে নাসাই ১৪৩১)

৩. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুমু‘আহর দিনের বার ঘন্টার মধ্যে এমন একটি মুহুর্ত রয়েছে যদি কোন মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এ মুহুর্তটি তোমরা ‘আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান করো। (সুনানে আবু দাউদ ১০৪৮)

৪. আবূ বুর্দাহ ইবনে আবূ মুসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বললেন, ‘আপনি কি জুমআর দিনের বিশেষ মুহূর্ত সম্পর্কে আপনার পিতাকে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে বর্ণনা করতে শুনেছেন ?’ তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হ্যাঁ । আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, “সেই মুহূর্তটুকু ইমামের মেম্বারে বসা থেকে নিয়ে নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়ের ভিতরে ।” (রিয়াদুস সালহীন ১১৬৪, আবু দাউদ ১০৪৯)

রাতের শেষভাগে

মহান আল্লাহ প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং তার বান্দাতের আহবান করে বলেন, কেউ কি আমার নিকট দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব। কেউ কি আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে তা দান করবো। কেউ কি আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কাজেই মহান আল্লাহ আহবানে সাড়া দিয়ে প্রতি রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশ তার নিকট দোয়া করলে কবুলের আশা করা যায়।

১. আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারি ১১৪৫)

২. আবূ উমামাহ্ (রাযিঃ) বলেন, আমর ইবনু আবাসাহ (রাযিঃ) আমার কাছে রিওয়ায়াত করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিনি বলতে শুনেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা শেষ রাতে তার বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হন। অতএব যারা এ সময় আল্লাহর যিকর করে (নামায পড়ে ও দু’আ করে), তুমি পারলে তাদের দলভুক্ত হয়ে যাও। (সুনানে তিরমিজি ৩৫৭৯)

৩. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে আমাদের প্রভু দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। অতঃপর তিনি বলেন, “আমার কাছে যে দু’আ করবে তার দু’আ আমি কবুল করব। যে ব্যক্তি আমার নিকট (কিছু) প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে ব্যক্তি আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দিব। তিরমিজি ৩৪৯৮

৪. আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! কোন সময়ের দু’আ বেশী (শোনা) গ্রহণযোগ্য হয়? তিনি বললেন, শেষ রাতের মাঝ ভাগের এবং ফরয নামায গুলোর পরবর্তী দু’আ। (সুনানে তিরমিজি ৩৪৯৯)

মুসাফির, মাযলুম, সন্তানের জন্য পিতার দোয়াঃ

মুসাফির, মাযলুম, সন্তানের জন্য পিতার দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার বদদোয়া এই তিনটি দোয়া কবুল হওয়ার কথা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এদের দোয়া বা বদদোয়া কবুল হবেই।

দলিলঃ

১. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তিন ব্যক্তির দু‘আ নিঃসন্দেহে কবুল হয় : (এক) পিতার দু‘আ, (দুই) মুসাফিরেরদু‘আ, (তিন) মজলুমের দু‘আ। আবু দাউদ ১৫৩৬

২. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তিন জনের দু‘আ সন্দেহাতীতভাবে গৃহীত হয়ঃ (১) নির্যাতিত ব্যক্তির দুআ, (২) মুসাফিরের দুআ এবং (৩) ছেলের জন্য মাতা-পিতার বদ্দুআ।” (তিরমিযী ১৯০৫, ৩৪৪৮)

৩. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তিন ব্যক্তির দুআ’ নিঃসন্দেহে কবুল হয়। মজলুমের দুআ’, মুসাফিরেরদুআ’ ও সন্তানের জন্য পিতার দুআ’। (ইবনে মাজাহ ৩৮৬২)

৪. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ তিনটি দোয়া অবশ্যই কবুল হয়, এতে কোন সন্দেহ নাই। (১) মযলুম বা নির্যাতিতের দোয়া, (২) মুসাফিরের দোয়া এবং (৩) সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া। আদাবুল মুফরাত ৩২ হাদিসের মান সহিহ)

সিয়াম পালনকারীঃ

১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন ব্যক্তির দুআ রদ হয় নাঃ ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোযাদার যতক্ষণ না ইফতার করে এবং মজলুমের দুআ। কিয়ামাতের দিন আল্লাহ্‌ তার দুআ মেঘমালার উপরে তুলে নিবেন এবং তার জন্য আসমানের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং আল্লাহ্‌ বলবেনঃ আমার মর্যাদার শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো, একটু বিলম্বেই হোক না কেন। (ইবনে মাজাহ ১৭৫২)

২. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না- ১. রোজাদারের দোয়া ইফতার করা পর্যন্ত, ২. ন্যায়পরায়ণ বাদশার দোয়া ও ৩. মজলুমের দোয়া। আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে উঠিয়ে নেন এবং এর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। আর আল্লাহ বলেন, আমার ইজ্জতের কসম! বিলম্বে হলেও আমি অবশ্যই তোমাদের সাহায্য করব। (তিরমিজি ৩৫৯৮ ইসলামি ফাউন্ডেশণ)

৩. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি ইফতারের অর্থাৎ প্রতি রাতে বেশ সংখ্যক লোককে (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি দেন। (ইবনে মাজাহ : ১৬৪৩)।

৪. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমজান মাসের প্রতি দিবস ও রাতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দোয়া কবুল করেন। (মুসনাদে আহমদ ৭৪৫০)

অসহায় ও বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির দোয়াঃ

 আল্লাহ তা‘আলা অসহায় ও বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ أَمَّن يُجِيبُ ٱلۡمُضۡطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكۡشِفُ ٱلسُّوٓءَ ﴾

অর্থঃ বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহবানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন। (সুরা নামল ২৭:২৬)

দোয়ার কিছু আদব কায়দাঃ

মহান সৃষ্ট কর্তার দরবারে চাইতে হলে কিছু আদাব লাগে। দুনিয়ার কোন রাজা বাদশার দরবারে কিছু চাইতে গেলে কত ফরমালিত রক্ষা করতে হয় তার কোন ইয়াত্তা নাই। অথচ মহান আল্লাহ হলেন রাজদের ও রাজা, রাজাদেরও সৃষ্ট কর্তা, রাজাদেরও জীবন দানকারী, রাজদেরও ভাগ্য নির্ধারণকারি। তার কাছে চাইতে হলে আপনাকে অবশ্যই কিছু আদব কায়দা প্রয়োগ করতে হবে। এই আদব কায়দাগুলো অনুসরণ করে দোয়া করলে কবুলের আশা করা যায়। নিম্নে দোয়ার কয়েকটি আদব উল্লেখ করা হলঃ

একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতে হবেঃ

একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতে হবে। গাইরুল্লাহ নিকট কোন কিছু চাইলে শির্কে আকবর হবে। যার ফলে ঈমান ও ইসলাম চলে যাবে। সরাসরি সব সময় তারই নিকট চাইব, কেননা তিনি ছাড়া আর কেউই বান্দার আবেদন নিবেদন পূরন করতে পারে না। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿ وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ  

অর্থঃ ‘এবং তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমার কাছে দোয়া কর, আমি তোমাদের দোয়ায় সাড়া দেব। (সুরা গাফির ৬০)।

মহান আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا

অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। (সুরা নূহ ৭১:১০)

একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করার ক্ষেত্র কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম করার প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ (١٨٦)

অর্থঃ আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা আমাকে ডাকে আমি তাদের ডাক শুনি এবং জবাব দেই। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। (সুরা বাকারা ২:১৮৬)

ঈমানের দাবি হল বিপদ বা সংকটমুক্ত এবং অভাব বা প্রয়োজন পূর্ণ  করার সব ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিহীত আছৈ। তাই একমাত্র তার কাছেই প্রর্থনা করা সঠিক ও যথার্থ সত্য বলে বিবেচিত। অন্যকে অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য আহবান করা পরিস্কার শির্ক। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَأَنَّ ٱلۡمَسَـٰجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدۡعُواْ مَعَ ٱللَّهِ أَحَدً۬ا (١٨) 

অর্থঃ আর মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য৷ তাই তোমরা আল্লাহর সাথে আর কাউকে আহবান করিও না। (সূরা জিন ৭২:১৮)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

 لَهُ ۥ دَعۡوَةُ ٱلۡحَقِّ‌ۖ وَٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ لَا يَسۡتَجِيبُونَ لَهُم بِشَىۡءٍ إِلَّا كَبَـٰسِطِ كَفَّيۡهِ إِلَى ٱلۡمَآءِ لِيَبۡلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَـٰلِغِهِۦ‌ۚ وَمَا دُعَآءُ ٱلۡكَـٰفِرِينَ إِلَّا فِى ضَلَـٰلٍ۬ (١٤)

অর্থঃ একমাত্র তাঁকেই আহবান করা সঠিক৷  আর অন্যান্য সত্তাসমূহ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে এ লোকেরা ডাকে, তারা তাদের প্রার্থনায় কোন সাড়া দিতে পারে না৷ তাদেরকে ডাকা তো ঠিক এমনি ধরনের যেমন কোন ব্যক্তি পানির দিকে হাত বাড়িয়ে তার কাছে আবেদন জানায়, তুমি আমার মুখে পৌঁছে যাও, অথচ পানি তার মুখে পৌঁছতে সক্ষম নয়৷ ঠিক এমনিভাবে কাফেরদের দোয়াও একটি লক্ষভ্রষ্ট তীর ছাড়া আর কিছু নয়৷ (সুরা রাদ-১৩:১৪)  

অজু সহকারে দোয়া করাঃ

দোয়ার সঙ্গে অজুর তেমন কোন সম্পর্ক নাই। মহান আল্লাহর নিকট কিছু চাইতে অজু শর্ত নয়, তবে অজুসহকারে চাইলে উত্তম বলে অনেক আলেম মতামত প্রদান করছেন। সালাতে, কাবাঘর তাওয়াফ এবং কুরআন তিরওয়াতের সময় অজু করা জরুরী করা হয়েছে। ঠিক তেমনি ষ্পর্শ ছাড়া কুরআন তিলওয়াত, আল্লাহর জিকির, তিলওয়াত ও শুকরানার সিজদা, আযান, সাফা মারওয়ার সাঈ, বিভিন্ন খোতবা পাঠ, দোয়া ইত্যাদির সময় ওযু করা মুস্তাহাব। ঘুমাতে ও সর্বাস্থায় অজুতে থাকা নেকীর কাজ বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। দোয়া যেহেতু একটি অন্যতম ইবাদাত তাই অজুসহকারে দোয়া করলে মহান আল্লাহ বেশী কবুল যোগ্য আমল হিসাবে বিবেচিত হবে।

১. উসমান ইবনু হুনাইফ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, এক অন্ধ ব্যক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর নাবী। আমার জন্য আল্লাহ তা’আলার নিকট দু’আ করুন, যেন আমাকে তিনি আরোগ্য দান করেন। তিনি বললেনঃ তুমি কামনা করলে আমি দুআ করব, আর তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ করতে পার, সেটা হবে তোমার জন্য উত্তম। সে বলল, তার নিকটে দু’আ করুন।

বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে উত্তমভাবে উযূ করার হুকুম করলেন এবং এই দুআ করতে বললেন, “হে আল্লাহ! তোমার নিকট আমি প্রার্থনা করি এবং তোমার প্রতি মনোনিবেশ করি তোমার নাবী, দয়ার নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর (দু’আর) মাধ্যমে। আমি তোমার দিকে ঝুঁকে পড়লাম, আমার প্রয়োজনের জন্য আমার প্রভুর দিকে ধাবিত হলাম, যাতে আমার এ প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়া হয়। হে আল্লাহ! আমার প্রসঙ্গে তুমি তার সুপারিশ কবুল কর”। (তিরমিজি ৩৫৭৮)

২। বারা ইবনে আ’যেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারা ইবনে আ’যেব (রাঃ)-কে বলেন, “যখন তুমি তোমার শয্যা গ্রহনের ইচ্ছা করবে, তখন নামাযের ন্যায় ওজু করে ডান কাত হয়ে শয়ন করবে।’’ (বুখারী ৬৩১১, মুসলিম ৬৮৮২)

৩। আয়িশাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপবিত্র হওয়ার পর ঘুমানোর ইচ্ছা করলে তার পূর্বে সলাতের ওজুর ন্যায় ওজু করে নিতেন। ইবনে মাজাহ ৫৮৪, ২৮৮,, তিরমিযী ১১৮, নাসায়ী ২৫৫-৫৮, আবূ দাঊদ ২২২, ২২৪;

৪। উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি উযূ করে এবং উত্তমভাবে উযূ করে, তার শরীর হতে তার সকল গুনাহ বের হয়ে যায়, এমনকি তার নখের নিচ হতেও তা বের হয়ে যায়। (মিসকাত ২৮৩, সহিহ মুসলিম ২৪৫)

হাত তুলে দোয়া করাঃ

অনেক মনে করে হাত তুলে দোয়া করতে নাই। আসলে বিষয়টি তা নয়। রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় দুই হাত তুলে দোয়া করছেন। তিনি এমনভাবে দুই হাত তুলে দোয়া করছেন যাতে তার বগলের শুভ্রতা দেখা যেত।

১. আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসতিস্কা ছাড়া অন্য কোথাও দু‘আর মধ্যে হাত উঠাতেন না। তিনি হাত এতটুকু উপরে উঠাতেন যে, তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যেত। (সহিহ বুখারি ১০৩১)

২. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃষ্টিপাতের জন্য দুআ’ করলেন, এমনি আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা (উপরে হাত তোলার কারণে) দেখতে পাই। অধস্তন রাবী মু’তামির (রাঃ) বলেন, আমার মতে তিনি ইসতিসকার সলাতে এভাবে দুআ’ করেন।(ইবনে মাজাহ ১২৭১)

৩. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃঅন্য এক সূত্রে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দু’ হাত এতটুকু তুলে দোয়া করেছেন যে, আমি তার বগলের শুভ্রতা দেখতে পেয়েছি। (সহিহ বুখারি ৬৩৪১)

হাতের তালু দিয়ে দোয়া না করাঃ

হাতের তালু চেহারার দিকে ফিরিয়ে দোয়া করা। এইভাবে দোয়ার দ্বারা বান্দার প্রয়োজন ও বিনয় প্রকাশের সর্বোত্তম পন্থা, যাতে একজন অভাবী কিছু পাবার আশায় দাতার দিকে বিনয়াবনত হয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়।

দলিলঃ

মালিক ইবনু ইয়াসার আস-সাকূনী আল-‘আওফী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর নিকট দোয়ার সময় হাতের তালুকে সম্মুখে রেখে দোয়া করবে, হাতের পৃষ্ঠ দিয়ে নয়। (সুনানে আবূ দাউদ ১৪৮৬)।

দোয়া শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর সালাত ও সালাম পেশ করাঃ

১. আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ যে সমস্ত লোক কোন দরবারে বসেছে অথচ তারা আল্লাহ তা‘আলার জিকির করেনি এবং তাদের নাবীর প্রতি দরূদও পড়েনি, তারা বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হবে। আল্লাহ তা‘আলা চাইলে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন কিংবা মাফও করতে পারেন। (সুনানে তিরমিজি ৩৩৮০)

২. ফাযালাহ্‌ ইবনু ‘উবাইদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মাসজিদে) বসা অবস্থায় ছিলেন। সে সময় জনৈক লোক মাসজিদে প্রবেশ করে নামায আদায় করল, তারপর বলল, “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি দয়া কর”। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে নামাযী! তুমি তো তড়িঘড়ি করলে। যখন তুমি নামায শেষ করে বসবে সে সময় শুরুতে আল্লাহ তা’আলার যথোপযুক্ত প্রশংসা করবে এবং আমার উপর দরূদ ও সালাম প্রেরণ করবে, তারপর আল্লাহ তা’আলার নিকটে দু’আ করবে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর অপর লোক এসে নামায আদায় করে প্রথমে আল্লাহর তা’আলার প্রশংসা করল, তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর দরূদ ও সালাম পেশ করল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন, হে নামাযী! এবার দু’আ কর ক্ববূল করা হবে। (সুনানে তিরমিজি ৩৪৭৬, আবূ দাঊদ ১৩৩১)।

দোয়া কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রাখাঃ

দোয়া কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এভাবে না বলেঃ ‘‘হে আল্লাহ তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করো। বরং সে যেন পূর্ণ দৃঢ়তা সহকারে কামনা করে। কেননা কোন কাজই আল্লাহর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। (ইবনে মাজাহ ৩৮৫৪, তিরমিযী ২৪৯৭, আবূ দাউদ ১৪৮৩)

২. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ এভাবে দু‘আ করো না, হে আল্লাহ্! তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি চাইলে আমার প্রতি রহম কর। তুমি চাইলে আমাকে রিযক দাও। বরং দু‘আ প্রার্থী খুবই দৃঢ়তার সঙ্গে দু‘আ করবে কেননা, তিনি যা চান তাই করেন। তাকে বাধ্য করার কেউ নেই।(সহিহ বুখারি ৭৪৭৭)

৩. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমাকে আমার বান্দা যেভাবে ধারণা করে আমি (তার জন্য) সে রকম। যখন সে আমাকে মনে করে সে সময় আমি তার সঙ্গেই থাকি। সুতরাং সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করলে তাকে আমিও মনে মনে স্মরণ করি। আমাকে সে মাজলিসে স্মরণ করলে আমিও তাকে তাদের চাইতে ভাল মজলিসে (ফেরেশতাদের মাজলিসে) মনে করি। সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে এলে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। যদি সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, তবে তার দিকে আমি এক বাহু এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেটে অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দৌড়িয়ে এগিয়ে যাই। (তিরমিজি ৩৬০৩, ইবনু মাজাহ ৩৮২২),

৪. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ দোয়া করলে দোয়ার সময় দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দোয়া করবে এবং এ কথা বলবে না হে আল্লাহ! আপনার ইচ্ছে হলে আমাকে কিছু দিন। কারণ আল্লাহ্‌কে বাধ্য করার কেউ নেই। (সহিহ বুখারি ৬৩৩৮)

দোয়ার সময় বিনয় প্রকাশ ও কাকুতিমিনতি করাঃ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَٱذۡكُر رَّبَّكَ فِي نَفۡسِكَ تَضَرُّعٗا وَخِيفَةٗ وَدُونَ ٱلۡجَهۡرِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ بِٱلۡغُدُوِّ وَٱلۡأٓصَالِ﴾

অর্থঃ আর তুমি নিজ মনে আপন রবকে স্মরণ কর সকাল-সন্ধ্যায় অনুনয়-বিনয় ও ভীতি সহকারে এবং অনুচ্চ স্বরে। (সুরা আলাফ ৭:২০৫)

হাদিসে বর্ণিত ব্যাপক অর্থবোধক ভাষায় দোয়া করাঃ

ব্যাপক অর্থবোধক ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন তা জামে‘ তথা পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক। একটি সহিহ হাদিসে এসেছে,

আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিপূর্ণ বাক্যে দু‘আ করা পছন্দ করতেন (যে দু‘আয় দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কথা থাকে), এছাড়া অন্যান্য দু‘আ ত্যাগ করতেন। (আবূ দাউদ : ১৪৮২)

আল্লাহ তাআলার নাম ও গুনাবলীল অসীলা দিয়ে দোয়া করাঃ

 সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর সুমহান গুণাবলির উসীলা দিয়ে দোয়া করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ ﴾

অর্থঃ আল্লাহর রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সেগুলোর মাধ্যমে তোমরা তাঁর নিকট দোয়া কর। (সুরা আরাফ ৭:১৮০)

১. কাসিম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর ইসমে আযম, যার উল্লেখ করে দোয়া করলে তা কবুল হয়, তা তিনটি সূরায় রয়েছেঃ সূরা বাকারা, সূরা আল ইমরান ও সূরা তাহা। (ইবনে মাজাহ ৩৮৫৬)

২. আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর মহান নাম (ইসমে আযম) এই দু’ আয়াতের মধ্যে নিহিত আছে (অনুবাদ): ‘‘আর তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি দয়াময় অতি দয়ালু। (২:১৬৩) এবং সূরা আল ইমরানের প্রথম আয়াত। (ইবনে মাজাহ ৩৮৫৫, তিরমিযী ৩৪৭৮, আবূ দাউদ ১৪৯৬)

ঈমান ও আমলের উসীলা দিয়ে দোয়া করাঃ

বান্দা তার নিজের ঈমান ও আমলেস সালেহ তথা নেক কাজের উসীলা দিয়ে দোয়া করলে দোয়া কবুল হওয়া আশা করা যায়। ঈমানের আনার উসীলা দ্বারা দোয়ার কথার কথা মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। নিম্মের আয়াত ও হাদিসটি লক্ষ করুন।

ক. ঈমানের উসীলা দিয়ে দোয়া করার উদাহরণ কুরআনুল কারীমে উল্লিখিত হয়েছে,

﴿ رَّبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِيٗا يُنَادِي لِلۡإِيمَٰنِ أَنۡ ءَامِنُواْ بِرَبِّكُمۡ فَ‍َٔامَنَّاۚ رَبَّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرۡ عَنَّا سَيِّ‍َٔاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ ٱلۡأَبۡرَارِ ١٩٣ ﴾

 অর্থঃ হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমরা শুনেছিলাম একজন আহবানকারীকে, যে ঈমানের দিকে আহবান করে যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আন। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং বিদূরিত করুন আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি, আর আমাদেরকে মৃত্যু দিন নেককারদের সাথে। (সুরা আল ইমরান ৩:১৯৩)

খ. আমলে সালেহ তথা নেক কাজের উসীলা দিয়ে দোয়া করার উদাহরণ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। নিম্মে সহিহ বুখারির বিখ্যাত হাদিসটি উল্লেখ করা হলোঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা তিন ব্যক্তি হেঁটে চলছিল। এমন সময় প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তারা এক পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করে। হঠাৎ একটি পাথর গড়িয়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। তাদের একজন আরেকজনকে বলল; তোমরা যে সব ‘আমল করেছ, তার মধ্যে উত্তম আমলের ওয়াসীলা করে আল্লাহর কাছে দু‘আ কর। তাদের একজন বলল, ইয়া আল্লাহ! আমার অতিবৃদ্ধ পিতামাতা ছিলেন, আমি (প্রত্যহ সকালে) মেষ চরাতে বের হতাম। তারপর ফিরে এসে দুধ দোহন করতাম এবং এ দুধ নিয়ে আমার পিতা-মাতার নিকট উপস্থিত হতাম ও তাঁরা তা পান করতেন। তারপরে আমি শিশুদের, পরিজনদের এবং স্ত্রীকে পান করতে দিতাম। একরাত্রে আমি আটকা পড়ে যাই। তারপর আমি যখন এলাম তখন তাঁরা দু’জনে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সে বলল, আমি তাদের জাগানো পছন্দ করলাম না। আর তখন শিশুরা আমার পায়ের কাছে (ক্ষুধায়) চীৎকার করছিল। এ অবস্থায়ই আমার এবং পিতা-মাতার ফজর হয়ে গেল। ইয়া আল্লাহ! তুমি যদি জান তা আমি শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টি লাভের আশায় করেছিলাম তা হলে তুমি আমাদের গুহার মুখ এতটুকু ফাঁক করে দাও, যাতে আমরা আকাশ দেখতে পারি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন একটু ফাঁকা হয়ে গেল। আরেকজন বলল, ইয়া আল্লাহ! তুমি জান যে, আমি আমার এক চাচাতো বোনকে এত ভালবাসতাম, যা একজন পুরুষ নারীকে ভালবেসে থাকে। সে বলল, তুমি আমা হতে সে মনস্কামনা সিদ্ধ করতে পারবে না, যতক্ষণ আমাকে একশত দ্বীনার না দেবে। আমি চেষ্টা করে তা সংগ্রহ করি। তারপর যখন আমি তার পদদ্বয়ের মাঝে উপবেশন করি, তখন সে বলে ‘‘আল্লাহকে ভয় কর’’। বৈধ অধিকার ছাড়া মাহরকৃত বস্তুর সীল ভাঙবে না। এতে আমি তাকে ছেড়ে উঠে পড়ি। (হে আল্লাহ) তুমি যদি জান আমি তা তোমারই সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে করেছি, তবে আমাদের হতে আরো একটু ফাঁক করে দাও। তখন তাদের হতে (গুহার মুখের) দুই-তৃতীয়াংশ ফাঁক হয়ে গেল। অপরজন বলল, হে আল্লাহ! তুমি জান যে, এক ফারাক (পরিমাণ) শস্য দানার বিনিময়ে আমি একজন মজুর রেখেছিলাম। আমি তাকে তা দিতে গেলে সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। তারপর আমি সে এক ফারাক শস্য দানা দিয়ে চাষ করে ফসল উৎপন্ন করি এবং তা দিয়ে গরু ক্রয় করি এবং রাখাল নিযুক্ত করি। কিছুকাল পরে সে মজুর এসে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি বললাম, এই গরুগুলো ও রাখাল নিয়ে যাও। সে বলল, তুমি কি আমার সাথে উপহাস করছ? আমি বললাম, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না বরং এসব তোমার। হে আল্লাহ! তুমি যদি জান আমি তা তোমারই সন্তুষ্টির উদ্দেশে করেছি, তবে আমাদের হতে (গুহার মুখ) উন্মুক্ত করে দাও। তখন তাদের হতে গুহার মুখ উন্মুক্ত হয়ে গেল। (সহিহ বুখারি ২২১৫, ২২৭২, ২৩৩৩, ২৪৬৫, ৫৯৭৪)

নিজের গুনাহের কথা স্বীকার করে দোয়া করাঃ

১. সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার নাবী যুন-নূন ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে থাকাকালে যে দু’আ করেছিলেন তা হলঃ

 ﴾لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ﴿

(লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ্ জালিমীন)। তুমি ব্যতীত কোন মা’বূদ নেই, তুমি অতি পবিত্র। আমি নিশ্চয় যালিমদের দলভুক্ত”, (সূরা আম্বিয়া ৮৭)। যে কোন মুসলিম লোক কোন বিষয়ে কখনো এ দু’আ করলে অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা তার দু’আ কবুল করেন। (তিরমিজ ৩৫০৫)

উচ্চ স্বরে দোয়া না করাঃ

অনুচ্চ স্বরে দোয়া করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ٱدۡعُواْ رَبَّكُمۡ تَضَرُّعٗا وَخُفۡيَةًۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِينَ ٥٥ ﴾

অর্থঃ তোমরা তোমাদের রবকে ডাক অনুনয় বিনয় করে ও চুপিসারে। নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন না সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে। (সুরা আরফ ৭:৫৫)।

১. আবূ মূসা আল-আশ’আরী ( রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখন কোন উপত্যকায় আরোহণ করতাম, তখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলতাম। আর আমাদের আওয়াজ অতি উঁচু হয়ে যেত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা তো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। বরং তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন, তিনি তো শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী।

আল্লাহর কাছে বারবার চাওয়াঃ

আল্লাহর কাছে বারবার চাওয়া উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ার বাক্যগুলো তিনবার করে বলতে এবং তিনি তিনবার করে ইস্তেগফার করতে পছন্দ করতেন।

দলিলঃ

১. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন শয়ন করতেন তখন তাঁর ডান হাত গালের নীচে রেখে তিনবার বলতেনঃ “আল্লাহুম্মা ক্বিনী ‘আযাবাকা ইয়াওমা তাব’আসু ইবাদাকা”

অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি যেদিন আপনার বান্দাদেরকে কবর হতে উঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার ‘আযাব হতে রক্ষা করবেন। (আবু দাউদ ৫০৪৫)

২. হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমানোর ইচ্ছা করলে ডান হাত গালের নীচে রাখতেন, অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনবার বলতেন, ‘‘আল্ল-হুম্মা কিনী ‘আযা-বাকা ইয়াওমা তাব্‘আসু ‘ইবা-দাকা’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি যেদিন তোমার বান্দাদেরকে কবর হতে উঠাবে, তোমার ‘আযাব হতে আমাকে রক্ষা করবে)। (মিসকাত ২৪০২)

৩. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আকাশের কোন দিক থেকে মেঘ ভেসে আসতে দেখলে তাঁর হাতের কাজ ছেড়ে দিতেন, এমনকি নামাযে রত থাকলেও, অতঃপর মেঘমালার দিকে মুখ করে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! এই মেঘমালাকে যে অনিষ্টসহ পাঠানো হয়েছে তা থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি”। মেঘমালা বৃষ্টি বর্ষণ করলে তিনি দু’বার বা তিনবার বলতেনঃ “হে আল্লাহ! লাভজনক পর্যাপ্ত বৃষ্টি বর্ষণ করুন”। মহান আল্লাহ যদি মেঘমালা সরিয়ে নিতেন এবং বৃষ্টি না হতো তবে সেজন্যও তিনি আল্লাহর প্রশংসা করতেন। (ইবনে মাজাহ ৩৮৮৯)

কিবলামুখী হয়ে দোয়া করাঃ

১. আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা’বার দিকে মুখ করে কুরাইশের কতিপয় লোকের তথা- শায়বাহ্ ইবনু রাবী’আহ, ‘উত্বাহ ইবনু রাবী‘আ, ওয়ালীদ ইবনু ‘উত্বাহ এবং আবূ জাহ্ল ইবনু হিশামের বিরুদ্ধে দু’আ করেন। আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি, অবশ্যই আমি এ সমস্ত লোকদেরকে (বাদরের ময়দানে) নিহত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখেছি। প্রচন্ড রোদ তাদের দেহগুলোকে বিকৃত করে দিয়েছিল। দিনটি ছিল প্রচন্ড গরম। (সহিহ বুখারি ৩৯৬০)

দোয়া কবুর না হওয়ার কারন

দোয়া কবুর না হওয়ার কারন

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহর কাছে প্রার্থনাকারীর কিছু কিছু অন্যায় ও ত্রুটি এমন রয়েছে, যার ফলে তার দোয়া কবুল করা হয় না।

১। হারাম পন্থায় উপর্যানকারির দোয়া কবুল হয় নাঃ

আল্লাহ তাআলা রাসূলগণকে যে নির্দেশ প্রদান করেছেন পবিত্র বস্তু থেকে আহার করতে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلرُّسُلُ كُلُواْ مِنَ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَٱعۡمَلُواْ صَٰلِحًاۖ إِنِّي بِمَا تَعۡمَلُونَ عَلِيمٞ ٥١ ﴾

‘হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র ও ভাল বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর সে সর্ম্পকে আমি সম্যক জ্ঞাত। (সুরা মুমিনূন ২৩:৫১)।

মন্তব্যঃ মহান আল্লাহর এই নির্দেশ শুধু রাসূলগনদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং সকল মুমিন বান্দাদের জন্য এই নির্দেশই প্রযোজ্য।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

* يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُلُواْ مِن طَيِّبَٰتِ مَا رَزَقۡنَٰكُمۡ وَٱشۡكُرُواْ لِلَّهِ إِن كُنتُمۡ إِيَّاهُ تَعۡبُدُونَ ١٧٢ *

অর্থঃ হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে। (সুরা বাকারা ২:১৭২)

যতি কোন প্রার্থনাকারির পানিয় হারাম, খাবার হারাম, পোশাক হারাম হয় তবে তার কোন দোয়াই কবুল হয় না।

১. উসামাহ বিন উমায়র আল-হুযালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ পবিত্রতা ব্যতীত সলাত কবূল করেন না এবং হারাম পন্থায় উপার্জিত মালের দান-খয়রাত কবূল করেন না। (ইবনে মাজাহ ২৭১, নাসায়ী ১৩৯, আবূ দাঊদ ৫৯)। 

২. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কুবুল করেন না। আল্লাহ তার রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেসব বিষযের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত। (মুমিনূন ২৩:৫১)।

তিনি আরো বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর”। (বাকারাহ ২:১৭২)।

বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে কুবুল হতে পারে। (সুনানে তিরমিজ ২৯৮৯)

। দোয়া কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করাঃ

১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবূল হয়ে থাকে। যদি সে তাড়াহুড়া না করে আর বলে যে, আমি দোয়া করলাম। কিন্তু আমার দোয়া তো কবূল হলো না। সহিহ বুখারি ৬৩৪০

২. আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের যে কোন ব্যক্তির দু‘আই ক্ববূল হয়ে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলতে থাকে, দু‘আ তো করলাম অথচ আমার দু‘আ ক্ববূল হয়নি। তিরমিজি ৩৩৮৭আবূ দাঊদ (হাঃ ১৩৩৪)

। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য দোয়া করাঃ

১. আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘বান্দার দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার দোয়া করে অথবা যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে। বলা হলো, তাড়াহুড়া কী ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একথা বলা যে, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু কবুল হতে দেখছি না। অতপর আক্ষেপ করতে থাকে এবং দোয়া করা ছেড়ে দেয়। (মিসকাত ২২২৭, সহিহ বুখারি ৪০৬৩, মুসলিম ২৭৩৫)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি, কোন ব্যক্তি (আল্লাহ তা‘আলার কাছে) কোন কিছু দু‘আ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে তা দান করেন কিংবা তার পরিপ্রেক্ষিতে তার হতে কোন অকল্যান প্রতিহত করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে কোন গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য প্রার্থনা না করে। (তিরমিজি ৩৩৮১,  মিশকাত ২২৩৬)।

৩. উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ পৃথিবীর বক্ষে যে মুসলিম লোকই আল্লাহ তা’আলার নিকটে কোন কিছুর জন্য দুআ করে, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তাকে তা দান করেন কিংবা তার হতে একই রকম পরিমাণ ক্ষতি সরিয়ে দেন, যতক্ষণ না সে পাপে জড়িত হওয়ার জন্য অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দু’আ করে। সমবেত ব্যক্তিদের একজন বলল, তাহলে আমরা অত্যধিক দুআ করতে পারি। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তাআলা তার চাইতেও বেশী ক্ববূলকারী। (তিরমিজি ৩৫৭৩),  

৪। অমনোযোগীর দোয়া কবুল হয় নাঃ

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে আল্লাহ তা’আলার কাছে দুআ কর। তোমরা জেনে রাখ যে, আল্লাহ তা’আলা নিশ্চয় অমনোযোগী ও অসাড় মনের দুআ কবুল করেন না। (তিরমিজি ৩৪৭৯)

হজ্জ সংশ্লিষ্ট দোয়াসমূহ

হজ্জ সংশ্লিষ্ট দোয়াসমূহ

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

হজ্জ সংশ্লিষ্ট বেশী দোয়া নেই। তবে যে কতগুলো দোয়া আছে তা মুল আলোচনায় সময় উল্লেখ করেছি। কিন্তু তা এলোমেলভাবে ছড়ান ছিটান আছে। পাঠকদের সুবিধান জন্য তাই সকল দোয়াগুলো এখানে একত্র করে তুল ধরছি।

১। সফর সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো যথাসময় পাঠ করাঃ সফরের শুরু থেকে সফর শেষ করা পর্যান্ত বহু মাসনুন দোয়া সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সফর শুরুর আগে এই সকল দোয়া মুখন্ত করা চেষ্টা করি এবং সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যান্ত এই সুন্নাহ সম্মত দোয়াগুলো পাঠ করার চেষ্টা করি।  তবে সময় সময় দোয়াগুলো পাঠ করার সময় অর্থের দিকে খেয়াল রাখি। কি করছি আর বলছি তা যদি নিজেই না যানি তাহলে ভারী অন্যায় হবে।

ক। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়াঃ

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিম্মের দোয়া পড়তে হয়ঃ

দোয়াঃ-১

«بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَاَ حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ».

উচ্চারণঃ বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

অর্থঃ আল্লাহর নামে, আল্লাহর উপর ভরসা করে (বের হচ্ছি)। আল্লাহ ছাড়া কোন উপায় ও শক্তি নাই।

দোয়াঃ-২

 «اللّٰـهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ».

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা আন আদ্বিল্লা, আও উদ্বাল্লা, আও আযিল্লা, আও উযাল্লা, আও আযলিমা, আও উযলামা, আও আজহালা, আও ইয়ুজহালা ‘আলাইয়্যা।

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই যেন নিজেকে বা অন্যকে পথভ্রষ্ট না করি, অথবা অন্যের দ্বারা পথভ্রষ্ট না হই; আমার নিজের বা অন্যের পদস্খলন না করি, অথবা আমায় যেন পদস্খলন করানো না হয়; আমি যেন নিজের বা অন্যের উপর যুলম না করি অথবা আমার প্রতি যুলম না করা হয়; আমি যেন নিজে মুর্খতা না করি, অথবা আমার উপর মূর্খতা করা না হয়।

দলীলঃ

১. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবেঃ

«بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَاَ حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ».

উচ্চারণঃ বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

অর্থঃ আল্লাহর নামে, আল্লাহর উপর ভরসা করে (বের হচ্ছি)। আল্লাহ ছাড়া কোন উপায় ও শক্তি নাই। তখন তাকে বলা হয়, তুমি হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছো, রক্ষা পেয়েছো ও নিরাপত্তা লাভ করেছো। সুতরাং শয়তানরা তার থেকে দূর হয়ে যায় এবং অন্য এক শয়তান বলে, তুমি ঐ ব্যক্তিকে কি করতে পারবে যাকে পথ দেখানো হয়েছে, নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫)।

২. উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর হতে বাইরে রাওয়ানা হতেন তখন বলতেন,

 «اللّٰـهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ».

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা আন আদ্বিল্লা, আও উদ্বাল্লা, আও আযিল্লা, আও উযাল্লা, আও আযলিমা, আও উযলামা, আও আজহালা, আও ইয়ুজহালা ‘আলাইয়্যা।

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই যেন নিজেকে বা অন্যকে পথভ্রষ্ট না করি, অথবা অন্যের দ্বারা পথভ্রষ্ট না হই; আমার নিজের বা অন্যের পদস্খলন না করি, অথবা আমায় যেন পদস্খলন করানো না হয়; আমি যেন নিজের বা অন্যের উপর যুলম না করি অথবা আমার প্রতি যুলম না করা হয়; আমি যেন নিজে মুর্খতা না করি, অথবা আমার উপর মূর্খতা করা না হয়। (সুনানে তিরমিজ ৩৪২৭)

খ। সফরে বের হলে যে দোয়া পড়তে হয়ঃ

আবুয যুবাইর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। ‘আলী-আযদী (রাঃ) তাকে জানিয়েছেন, ইবনু ‘উমার তাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হওয়ার সময় উটের পিঠে সোজা হয়ে বসে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে এ আয়াত পড়তেনঃ

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا، وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

অর্থঃ ‘‘মহান পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন, তা না হলে একে বশ করতে ‘আমরা সক্ষম ছিলাম না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে।’’(সূরা –যুখরুফ ১৩-১৪) অতঃপর এ দু‘আ পাঠ করতেনঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنِ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الْبُعْدَ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ

তিনি যখন ফিরে আসতেন, এ দু‘আই পাঠ করতেন, শুধু এটুকু বাড়িয়ে বলতেনঃ

* آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ*

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সেনাবাহিনী কোনো উঁচু স্থানে উঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং নীচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ বলতেন। অতঃপর এভাবেই (শুকরিয়া) সালাতে নির্ধারণ হয়। সুনানে আবু দাইদ ২৫৯৯)

** আলী ইবনু রবী‘আহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে আরোহণের একটি পশু আনা হলে তিনি এর পা-দানিতে পা রাখতেই বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’ এবং এর পিঠে চড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, আল-হামদুলিল্লাহ।’’ অতঃপর তিনি এ আয়াত পড়লেন,‘‘মহান পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন, তা না হলে একে বশ করতে ‘আমরা সক্ষম ছিলাম না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে।’’ (সূরা যুখরুক ১৩-১৪)। পুনরায় তিনি তিনবার ‘আলহামদু লিল্লাহ’ এবং তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন। অতঃপর বললেন, ‘‘(হে আল্লাহ!) আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমিই আমার উপর যুলুম করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আপনি ছাড়া কেউই গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।’’ অতঃপর তিনি হেসে দিলেন।

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি কেন হাসলেন? তিনি বললেন, আমি যেরূপ করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও এরূপ করতে দেখেছি। তিনি তখন হেসেছিলেন তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি হাসলেন কেন? তিনি বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট হন যখন সে বলেঃ ‘‘(হে আমার রব!) আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।’’ আর বান্দা তো জানে যে, আমি (আল্লাহ) ছাড়া কেউই গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। (আবু দাউদ ২৬০২)

গ। সফরের সময় উঁচু নিচু অতিক্রমকালে পাঠ করবেঃ

সফরের সময় উঁচু জায়গায় উঠার সময় তাকবীর পাঠ করবে এবং কোন নীচু জায়গায় অবতরণের সময় তাসবীহ পাঠ করবেন।

দলিলঃ

১. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন কোন উঁচু স্থানে আরোহণ করতাম, তখন তাকবীর তাকবীর (اَللهُ أَكْبَرُ – আল্লাহু আকবার) ধ্বনি উচ্চারণ করতাম আর যখন কোন উপত্যকায় অবতরণ করতাম, সে সময় তাসবীহ (سُبْحَانَ اللهِ সুবহানাল্লাহ বলতাম। (সহিহ বুখারি ২৯৯৩)

ঘ। সফরে কোন স্থানে যাত্রা বিরতীতে পাঠ করবেঃ

যাত্রা বিরতিতে পড়বেঃ

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণঃ আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত্ তা-ম্মা-তি মিন শার্‌রি মা খলাক্ব।

অর্থঃ আমি আল্লাহ পাকের কল্যাণকর বাক্যাবলীর উসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

দলিলঃ

১. খাওলা বিনতে হাকীম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউ কোন গন্তব্যে পৌঁছে যদি এই দোয়া পড়েঃ

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণঃ আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত্ তা-ম্মা-তি মিন শার্‌রি মা খলাক্ব।

অর্থঃ আমি আল্লাহ পাকের কল্যাণকর বাক্যাবলীর উসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাহলে সে স্থান থেকে বিদায় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সহিহ মুসলিম ২৭০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৫৪৭, তিরমিযী ৩৪৩৭)

ঙ। ঘরে প্রবেশের দোয়াঃ

 ঘরে প্রবেশের সময় পড়বেঃ

«بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا»

উচ্চারণঃ বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়াবিস্‌মিল্লাহি খারাজনা, ওয়া ‘আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।

অর্থঃ আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহ্‌র নামেই আমরা বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহর উপরই আমরা ভরসা করলাম।

১. আবূ মালিক আল-আশ‘আরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কেউ নিজ ঘরে প্রবেশ কররে তখন সে যেন বলে,

«بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا»

(বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়াবিস্‌মিল্লাহি খারাজনা, ওয়া ‘আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা)

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহ্‌র নামেই আমরা বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহ্‌র উপরই আমরা ভরসা করলাম”। অতঃপর সে যেন তার পরিবারের লোকদের সালাম দেয়। (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৬)

২। হজ্জের নিয়ত করার সাথের জিকিরঃ

ক। তামাত্তু হাজ্জির নিয়তের সাথের জিকিরঃ

যদি তামাত্তুকারী হন, তাহলে বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً**

উচ্চারণঃ লাব্বাইকা উমরাতান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ তামাত্তু হজ্জের নিয়তকারী যেহেতু উমরা করা পর হালাল হয়ে যায়। তাই তার মনে মনে এই সংকল্প থাকতে হবে যে, এই সফরে উমরা থেকে হালাল হবার পর আবার ইহরাম বেঁধে হজ্জ আদায় কবর।

খ। কিরান হাজ্জির নিয়তের সাথের জিকিরঃ

যদি কিরান হজ্জযাত্রী হন, তাহলে বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا**

উচ্চারণঃ লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা ও হজ্জের উদ্দেশ্যে।

দলীলঃ আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এভাবে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরা উভয়ের তালবিয়া  পাঠ করতে শুনেছিঃ (তিনি বলেছেন)

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا**

উচ্চারণঃ লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা ও হজ্জের উদ্দেশ্যে। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৮ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কিরান হজ্জ কারীর সাথে হাদি থাকে তাই সে উমরার পর হালাল হতে পারে। এই কারনে কিরান হজ্জের নিয়তকারী কে একই ইহরামে হজ্জও উমরা আদায় করতে হয় বিধায় তিনি একই সাথে হজ্জ ও উমরার নিয়ত করবেন।

গ। ইফরাদ হাজ্জির নিয়তের সাথের জিকিরঃ

যদি ইফরাদকারী হন, অর্থাৎ যিনি শুধু হজ্জ্জের নিয়ত করবেন তিনি বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ َحَجًّا. **

উচ্চারণঃ লাব্বাইকা হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি হজ্জের উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ ইফরাত হজ্জের নিয়তকারী উমরা করার সুযোগ পায় না, তিনি সরাসরি হজ্জ্জ আদায় করে থাকেন। তাই ইফরাতের হজ্জ্জের জন্য গমন কারী হজ্জ্জযাত্রী শুধু হজ্জ্জের নিয়ত কবরে।

ঘ। শুধু উমরার করার নিয়তের সাথের জিকিরঃ

পক্ষান্তরে যদি উমরা পালনকারী হন, অর্থাৎ যিনি শুধু উমরার নিয়ত করবেন তিনি বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً. **

উচ্চারণঃ লাব্বাইকা উমরাতান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরার উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ ইহরামের নিয়ত মনে মনে করার পর এই চার প্রকারের কালিমা মৌখিকভাবে বলতে হবে। তার পর হাদিসে বর্ণিত তাবলিয়া পড়তে হবে।

ঙ। ওজরের কারণে শর্ত সাপেক্ষে নিয়তঃ

হজ্জ পালনকারী ব্যক্তি যদি অসুখ কিংবা শত্রু অথবা অন্য কোন কারণে হজ্জ সম্পন্ন করার ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করেন, তাহলে নিজের ওপর শর্তারোপ করে বলবেন,

**اللَّهُمَّ مَحِلِّي حَيْثُ حَبَسْتَنِي **

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা মাহিল্লী হাইছু হাবাসতানী

অর্থঃ হে আল্লাহ আপনি আমাকে যেখানে রুখে দেবেন, সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাব।

এই কথার দলীলঃ

১. আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবা‘আ বিনতে যুবায়র-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তোমার হাজ্জে যাবার ইচ্ছে আছে কি? সে উত্তর দিল, আল্লাহর কসম! আমি খুবই অসুস্থবোধ করছি (তবে হাজ্জে যাবার ইচ্ছে আছে)। তার উত্তরে বললেন, তুমি হাজ্জের নিয়্যতে বেরিয়ে যাও এবং আল্লাহর কাছে এই শর্তারোপ করে বল, হে আল্লাহ্! যেখানেই আমি বাধাগ্রস্ত হব, সেখানেই আমি আমার ইহরাম শেষ করে হালাল হয়ে যাব। সে ছিল মিকদাদ ইবনু আসওয়াদের সহধর্মিণী। (সহিহ বুখারী ৫০৮৯ তাওহীদ)

অথবা বলবে,

**لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، وَمَحِلِّي مِنَ الأَرْضِ حَيْثُ تَحْبِسُنِي.**

উচ্চারণঃ লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ওয়া মাহিল্লী মিনাল আরদি হাইছু তাহবিসুনী।

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, যেখানে তুমি আমাকে আটকে দেবে, সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাব।

এই কথার দলীলঃ

১. ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন ও দুবা’আ বিনত যুবায়র ইবন আবদুল মুত্তালিব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হজ্জের ইচ্ছা করেছি। এখন আমি কি বলবো? তিনি বললেনঃ তুমি বলবেঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ وَمَحِلِّي مِنَ الأَرْضِ حَيْثُ تَحْبِسُنِي*

লাব্বায়ক আল্লাহুম্মা লাব্বায়ক, ‘অমাহিল্লি মিনাল আরদী হাইছু তাহবিসুনী” (অর্থঃ আপনি যেখানে আমাকে আটকে রাখেন আমি সেখানে হালাল হয়ে যাব)। কারণ তোমার জন্য তোমার রবের নিকট তাই রয়েছে, যা তুমি শর্ত করেছ। (সুনানে নাসাঈ ২৭৬৮ ইফাঃ)

৩। হজ্জের সমগ্র পথেই তালবিয়া পাঠ করেত থাকবেনঃ

সমগ্র হজ্জের সফরে থাকাকালীন সময় সর্বক্ষন তালবিয়া পাঠ করতে থাকতে হবে। যখন মিনার বড় জামারায় পৌছাবে ঠিক তখন তালবিয়া পড়া বদ্ধ করে দিতে হবে। আমাদের প্রিয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

উচ্চারণঃ লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্‌ক লা শারি-কা লাকা।

অর্থঃ আমি হাযির হে আল্লাহ, আমি হাযির, আমি হাযির; আপনার কোন অংশীদার নেই, আমি হাযির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নি’আমত আপনার এবং কর্তৃত্ব আপনারই, আপনার কোন অংশীদার নেই।

মন্তব্যঃ ইহাছাড়াও তিনি অন্যবাক্যেও তালবিয়া পাঠ করেছেন।

দলীলঃ

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

(লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্‌ক লা শারি-কা লাকা)।

অর্থঃ আমি হাযির হে আল্লাহ, আমি হাযির, আমি হাযির; আপনার কোন অংশীদার নেই, আমি হাযির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নি’আমত আপনার এবং কর্তৃত্ব আপনারই, আপনার কোন অংশীদার নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৯ তাওহীদ)

৩. উপরের বর্ণিত তালবিয়াই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া। তবে কখনো কখনো কিছু অতিরিক্ত বলতেন। যেমনঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তালবিয়ায় বলেনঃ

* لَبَّيْكَ إِلَهَ الْحَقِّ لَبَّيْكَ*

(লাব্বাইকা ইলাহাল হাক্কি লাব্বাইক)

আমি হাজির হয়েছি, হে সত্য মাবূদ! আমি হাজির হয়েছি। (ইবনে মাজাহ ২৯২০)

৪. উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া ছিলঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ

ইবন উমর (রাঃ) তাতে আরও বাড়িয়ে বলেছেনঃ

لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ وَالرَّغْبَاءُ إِلَيْكَ وَالْعَمَلُ

(সুনান নাসাঈ ২৭৫২ হাদিসের মান সহিহ)

৫. আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া ছিলঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ

(সুনান নাসাঈ ২৭৫৩ হাদিসের মান সহিহ)

৪। তাওয়াফের সময়ের জিকিরঃ

ক। মসজিদে হারামে প্রবেশের দোয়াঃ

তাওয়াফ করার জন্য বা অন্য কোন কারনে কাবাগৃহে প্রবেশ কালে মসজিদে হারামের ভিতর দিয়া প্রবেশ করতে হয় বিধায়। মসজিদে হারামে প্রবেশকালে উত্তম হলো ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশ করা এবং নীচের দোয়াটি পড়া। এই দোয়া শুধু মসজিদে হারাম নয়। বরং পৃথিবীর সকল মসজিদে এই দোয়া পাঠকরে ডান পা দিয়ে ঢুকতে হয়।  

«أَعُوذُ بِاللَّهِ العَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» [بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ] [وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ] «اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ».

অর্থঃ আমি মহান আল্লাহ্‌র কাছে তাঁর সম্মানিত চেহারা ও প্রাচীন ক্ষমতার ওসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ্‌র নামে (প্রবেশ করছি), সালাত ও সালাম আল্লাহ্‌র রাসূলের উপর। “হে আল্লাহ আপনি আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।

দলিলঃ

১. আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু গোসলের পবিত্রতা অর্জন করতে, চুল আঁচড়ানোর সময় এবং জুতা পরার সময় ডান দিক থেকে শুরু করতে ভালবাসতেন। (সহিহ মুসলিম ৫০৪ হাদিস ফাউন্ডেশন)

২. হাইওয়াহ ইবনু শুরায়িহ (রহঃ) বলেন, আমি ‘উক্ববাহ্ ইবনু মুসলিমের সাথে সাক্ষাত করে বলি, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার নিকট ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) এর মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ হাদীস বর্ণনা করা হয়েছেঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশের সময় বলতেনঃ ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অতীব মর্যাদা ও চিরন্তন পরাক্রমশালীর অধিকারী মহান আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হতে। ‘উক্ববাহ্ (রাঃ) বললেন, এতটুকুই? আমি বললাম, হ্যাঁ। ‘উক্ববাহ্ (রাঃ) বললেন, কেউ এ দু‘আ পাঠ করলে শয়তান বলে, এ লোকটি আমার (অনিষ্ট ও কুমন্ত্রণা) থেকে সারা দিনের জন্য বেঁচে গেল। (আবু দাউদ ৪৬৬)

৩. আবদুল মালিক ইবনু সাঈদ ইবনু সুওয়াইদ বলেন, আমি আবূ হুমাইদ (রাঃ) বা আবূ উসাইদ আনসারী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশকালে যেন সর্বপ্রথম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর সালাম পাঠ করে, অতঃপর যেন বলেঃ ‘হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন।’ আর বের হওয়ার সময় যেন বলেঃ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করি।’ (আবু দাউদ ৪৬৫)

খ। মসজিদ হারাম থেকে বের হওয়ার দোয়াঃ

বাম পা দিয়ে শুরু করবে এবং বলবে,

«بِسْمِ اللَّهِ وَالصّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِك، اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ».

উচ্চারণঃ বিস্‌মিল্লা-হি ওয়াস্‌সালা-তু ওয়াস্‌সালা-মু ‘আলা রাসূলিল্লাহ, আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদ্বলিকা, আল্লা-হুম্মা আ‘সিমনি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম।

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে (বের হচ্ছি)। আল্লাহ্‌র রাসুলের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাসমূহ মাফ করে দিন এবং আমার জন্য আপনার দয়ার দরজাগুলো খুলে দিন। হে আল্লাহ, আমাকে বিতাড়িত শয়তান থেকে হেফাযত করুন।

দলিলঃ

১. আবূ হুমাইদ আস-সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের যে কেউ মসজিদে প্রবেশকালে যেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি সালাম পেশ করে, তারপর যেন বলেঃ হে আল্লাহ্! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিন এবং বের হওয়ার সময় যেন বলেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করি। (ইবনে মাজাহ ৭৭২)

মন্তব্যঃ এই দোয়াটি শুধু মসজিদে হারামের জন্যই খাস নয়। পৃথিবীর যে কোন মসজিদ থেকে বাহির হওয়ার সময় এই দোয়া পড়তে হবে।

গ। তাওয়াফ শুরুর দোয়াঃ

প্রথমে ‘হাজারে আসওয়াদ (কাল পাথরের) কাছে গিয়ে, ‘‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’’  বলতে হবে এবং এই পাথরকে চুমু দিয়ে তাওয়াফ কার্য শুরু করতে হবে। যদি সরাসরি চুমু দেয়া সম্বব না হয় তবে ঈশারায় চুমু দিবে।  তাওয়াফের করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নীচের দোয়াটি পড়তেন। তাই তাওয়াফের সময় নিম্মের দোয়াটি পড়লে ভাল। কারন আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন। দোয়াটি হলঃ

**اَللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ وَتَصْدِيْقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مَحَمَّدٍ -صلى الله عليه وسلم**-

অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রতি ঈমান এনে, তোমার কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণের জন্য তোমার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করে এ তাওয়াফ কার্যটি করছি।

রেফারেন্স কিতাবঃ প্রশ্নোত্তরে হজ্জ ও উমরা, লেখকঃ অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম

গ। মাকমে ইব্রাহীমের সামনে জিকিরঃ

তাওয়াফ শুরু সাথে সাথে নজরে আসবে মাকামে ইবরাহীম। এই স্থানে স্থানে এসে কুরআন এই আয়াতটি তিলওয়াত করা মু্স্তাহাব। আয়াতটি হলো,

(*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও। (সুরা বাকারাহ ২:১২৫)

ঘ। রুকনে ইয়ামীনি থেকে হজ্জরে আসওয়াদ পর্যান্ত দোয়াঃ

রুকনে ইয়ামেনী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নের এ দোয়াটি পড়া মুস্তাহাবঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ্ ইবনুস সায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু’ রুকনের মাঝখানে বলতে শুনেছিঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯০ ইফাঃ)

ঙ। তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত সালাত আদায় করে জিকিরঃ

তাওয়াফের সাত চক্কর শেষ হলে দু’কাঁধ এবং বাহু ইহরামের কাপড় দিয়ে আবার ঢেকে ফেলবেন এবং ‘‘মাকামে ইব্রাহীমের’’ কাছে গিয়ে পড়বেনঃ

* وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلّىً*

অর্থঃ ইব্রাহীম (পয়গাম্বর)-এর দন্ডায়মানস্থলকে সালাত আদায়ের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।

অতঃপর তাওয়াফ শেষে এ মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে এসে দু’রাকআত সালাত আদায় করবেন।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘উমরাহ করতে গিয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করলেন ও মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করলেন এবং তাঁর সাথে এ সকল সাহাবী ছিলেন যারা তাঁকে লোকদের হতে আড়াল করে ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন কিনা? এক ব্যক্তি আবূ আওফা (রাঃ)-এর নিকট তা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারি ১৬০০)

৫। সাঈয়ের সময় জিকিরঃ

ক। সাফা পাহাড়ের দোয়াঃ

১. সাফা পাহাড় দেখার সাথে সাথে তাকবির বলবে। দলিলঃ

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় আরোহণ করে যখন তিনি বায়তুল্লাহ্‌ দেখতে পান তখন তাকবীর বলেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭১ হাদিসের মান সহিহ)

২. সাফা পাহাড়ে পৌছে এই আয়াতটি তিলওয়াত করবেন। এখানে এই আয়াতটি শুধু প্রথমবার সাঈয়ের শুরুতে পড়ুন। আয়াতটি হলোঃ

«إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ»

উচ্চারণঃ‘‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আয়িরিল্লাহ, আবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহি। (২:১৫৮)

অর্থঃ ‘‘অবশ্যই ‘সাফা’ এবং ‘মারওয়া’ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনসমূহের অন্যতম।’’ আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন আমিও সেভাবে শুরু করছি।

৩. যতটুকু সম্ভব সাফা পাহাড়ে উঠুন। একেবারে চূড়ায় আরোহণ করা জরুরী নয়। তারপর কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাত তুলে নীচের দোয়াটি পড়ুনঃ

اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَه لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَـه، أَنْجَزَ وَعْدَه، وَنَصَرَ عَبْدَه، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَه.

উচ্চারণঃ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ্, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমিতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শায়য়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহু, আনজাযা ওয়া‘দাহু ওয়ানাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।

অর্থঃ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আসমান যমীনের সার্বভৌম আধিপত্য একমাত্র তাঁরই। সকল প্রশংসা শুধু তাঁরই প্রাপ্য। তিনিই প্রাণ দেন এবং তিনিই আবার মৃত্যুবরণ করান। সবকিছুর উপরই তিনি অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরীক নেই। যত ওয়াদা তাঁর আছে তা সবই তিনি পূরণ করেছেন। স্বীয় বান্দাকে তিনি সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রুদলকে পরাস্ত করেছেন। (আবূ দাউদঃ ১৯০৫)

মন্তব্যঃ এখানে দোয়ার সময় দুহাত উঠিয়ে যত পারেন দোয়া করুন, আরবীতে বা নিজের ভাষায় দুনিয়া ও আখেরাতের অসংখ্যকল্যাণ চাইতে থাকুন। একই দোয়া বার বার করে করলেও অসুবিধা নাই।

খ। মারওয়া পাথারে দোয়াঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় (পাহাড়ে) আরোহণ করে তিনবার তাকবীর (আল্লাহু আকবর) বলেন। এরপর তিনি বলেন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

অর্থঃ আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।

তিনি এইরূপ তিনবার বলেন, পরে দু’আ করেন। মারওয়া পাহাড়েও তিনি এইরূপ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭২ হাদিসের মান সহিহ)

২. জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারওয়ায় এসে তার উপর আরোহণ করেন। তারপর বায়তুল্লাহ্‌ তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। তখন তিনি তিনবার বলেন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

(আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।) এরপর তিনি আল্লাহ্‌কে স্মরণ (যিকির) করেন, সুবহানাল্লাহ ও আল-হামদুলিল্লাহ বলেন। তারপর তিনি আল্লাহ্‌র ইচ্ছা অনুযায়ী দু’আ করেন এবং এভাবে তিনি তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ সাফা ও মারওয়ার দোয়া একই ধরনের। আল্লাহু আলাম। খুব মনসংযোগ দিয়ে বিনয়ের সাথে বোধগম্য আরবি ভাষায় ও  নিজ ভাষায় নিজের চাহিদা মত, দেশ-জাতি, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, অফিস সহকর্মী ইত্যাদি সবার জন্য দোয়া করি।

গ। সবুজ চিহ্নিত দুই দাগের মধ্যবর্তী স্থানে দোয়াঃ

সাফা পাহাড় থেকে কিছু দূর এগুলেই উপরে ও ডানে-বামে সবুজ আলোর বাতি আপনার নজরে আসবে।  সা‘ঈ করার সময় যতবারই এ সবুজ আলোর জায়গার মধ্য দিয়ে যাবেন ততবারই জগিং করার মতো দৌড়াবেন। কিন্তু মহিলারা এখানে দৌড়াবেন না, স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবেন। এবং নিম্মের দোয়াটি পাঠ করতে থাকবে। দোয়াটি হলোঃ

«رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ»

উচ্চারণঃ রাবিবগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ‘আযযুল আকরাম

অর্থঃ হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন রহম করুন। নিশ্চয় আপনি সমধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত।

৬। আফাতের ময়দানের দোয়াঃ

আরাফাতের মসয়দানে কোন সফর সালাত নাই। তাই তালবিয়ার পাশি পাশি বিভিন্ন জিকির ও দোয়া করার মাধ্যমেই সময় কাটাতে হবে। হাদিসে কিতাবে আরাফাতের ময়দানে নিম্মের জিকিরটি পড়ার করা আছে। জিকিরটি হলোঃ

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

অর্থঃ আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।

দলিলঃ

১. আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) কর্তৃক পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সনদে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আরাফাতের দিনের দু’আই উত্তম দুআ। আমি ও আমার আগের নাবীগণ যা বলেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্তম কথাঃ

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

অর্থঃ আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, সার্বভৌমত্ব তারই এবং সমস্ত কিছুর উপর তিনি সর্বশক্তিমান। (সুনানে তিরমিজ ৩৫৮৫)

৭। মাশআরুল হারাম বা মুজদালিফায় জিকিরঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘কাসওয়া’ নামক উষ্ট্রীতে আরোহণ করলেন, অবশেষে তিনি যখন মাশ‘আরুল হারামে (মুযদালিফার একটি স্থানে) আসেন, তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে দোআ করেন এবং তাকবীর বলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করেন এবং তাঁর তাওহীদ বা একত্ব ঘোষণা করেন। তারপর তিনি (আকাশ) পূর্ণ ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। অতঃপর সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই তিনি মুযদালিফা ত্যাগ করেন।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তু আদায়কারী ‘উমরাহ আদায়ের পর যদ্দিন হালাল অবস্থায় থাকবে তদ্দিন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তারপর হাজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এরপর যখন ‘আরাফাতে যাবে তখন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি যা মুহরিমের জন্য সহজ্জলভ্য হয় তা মীনাতে কুরবানী করবে। আর যে কুরবানীর সঙ্গতি রাখে না সে হাজ্জের দিনসমূহের মধ্যে তিনদিন সওম পালন করবে। আর তা ‘আরাফার দিনের আগে হতে হবে। আর তিনদিনের শেষ দিন যদি ‘আরাফার দিন হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর ‘আরাফাত ময়দানে যাবে এবং সেখানে ‘আসরের সালাত হতে সূর্যাস্তের অন্ধকার পর্যন্ত ‘ওকুফ (অবস্থান) করবে। এরপর ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুযদালাফায় পৌঁছে সেখানে পুণ্য অর্জনের কাজ করতে থাকবে আর সেখানে আল্লাহ্কে অধিক অথবা (রাবীর সন্দেহ) সবচেয়ে অধিক স্মরণ করবে। সেখানে ফাজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করবে। এরপর (মীনার দিকে) প্রত্যাবর্তন করবে যেভাবে অন্যান্য লোক প্রত্যাবর্তন করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘এরপর প্রত্যাবর্তন কর সেখান হতে, যেখান হতে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’’ তারপর জামরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। (সহিহ বুখারি ৪৫২১)

২. সালিম ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) তার সাথের দুর্বল লোকদেরকে মুযদালিফার নিকটবর্তী স্থান মাশ‘আরুল হারামে রাতে অবস্থানের জন্য আগে ভাগেই পাঠিয়ে দিতেন। অতএব তারা রাতের বেলা যতক্ষণ ইচ্ছা আল্লাহর যিকির করত। ইমামের অবস্থান ও ফিরে আসার পূর্বেই তারা (এখান থেকে) রওনা হতো। অতএব তাদের মধ্যে কেউ ফজরের সলাতের সময় মিনায় পৌঁছত এবং কেউ ফজরের সলাতের পরে। তারা এখানে পৌঁছে জামরায় পাথর নিক্ষেপ করত। ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলতেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুর্বল ও বৃদ্ধদের এ অনুমতি প্রদান করেছেন। (সহিহ মুসলিম ৩০২১)

৩. বিলাল বিন রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মুযদালিফার দিন ভোরে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেনঃ হে বিলাল! লোকেদের চুপ করতে বল। আতঃপর তিনি বলেনঃ এই মুযদালিফায় আল্লাহ তাআ’লা তোমাদের প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ করেছেন, তোমাদের উত্তম লোকেদের ওয়াসীলায় তোমাদের গুনাহগারদের ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীল ব্যক্তি যা প্রার্থনা করেছে তিনি তাকে তা দিয়েছেন। অতএব তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে প্রত্যাবর্তন কর। (ইবনে মাজাহ ৩০২৪)

৮। জামারাতে দোয়াঃ

জামারাতে প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের বলবে।

*اللهُ أَكْبَرُ* আল্লাহু আকবার (আল্লাহ মহান)

দলিলঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এরূপ করতে দেখেছি।

 

৯। পশু যবেহ করার জিকির বা দোয়াঃ

পশু জবেহ করার সময় বলবেঃ

«بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ ».

অথবা বলবে,

«بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي».

অথরা বলবে,

«بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ [اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ] اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي».

উচ্চারণঃ বিসমিল্লা-হি ওয়াল্লা-হু আকবার, [আল্লা-হুম্মা মিনকা ওয়ালাকা], আল্লা-হুম্মা তাকাব্বাল মিন্নী।

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে, আর আল্লাহ সবচেয়ে বড়। [হে আল্লাহ! এটা আপনার নিকট থেকে প্রাপ্ত এবং আপনার জন্যই।] হে আল্লাহ! আপনি আমার তরফ থেকে তা কবুল করুন।

১. মহান আল্লাহ বলেন,

فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ بِآيَاتِهِ مُؤْمِنِينَ

অতঃপর যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তা থেকে ভক্ষণ কর যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও। (সুরা আন’য়াম ৬:১১৮)

২. মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَلاَ تَأْكُلُواْ مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَآئِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ

অর্থঃ যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় না, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করো না। এ ভক্ষণ করা গোনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে-যেন তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে। (সুরা আন’য়াম ৬:১২১)

৩. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’ শিং বিশিষ্ট সাদা-কালো ধুসর রংয়ের দু’টি দুম্বা স্বহস্তে যাবাহ করেন। তিনি ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লহু আকবার’ বলেন এবং (যাবাহ্‌কালে) তাঁর একখানা পা দুম্বা দু’টির ঘাড়ের পাশে রাখেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮১, আবু দাউদ ২৭৯৪)

৪. আয়িশাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানী করার জন্য শিংওয়ালা দুম্বাটি আনতে নির্দেশ দেন- যেটি কালোর মধ্যে চলাফেরা করতো (অর্থাৎ- পায়ের গোড়া কালো ছিল), কালোর মধ্যে শুইতো (অর্থাৎ- পেটের নিচের অংশ কালো ছিল) এবং কালো মধ্য দিয়ে দেখতে (অর্থাৎ- চোখের চারদিকে কালো ছিল)। সেটি আনা হলে তিনি ‘আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, ছোরাটি নিয়ে এসো। অতঃপর বলেন, ওটা পাথরে ধার দাও। তিনি তা ধার দিলেন। পরে তিনি সেটি নিলেন এবং দুম্বাটি ধরে শোয়ালেন। তারপর সেটা যাবাহ করলেন এবং বললেন,

** بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ‏”‏ **

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার ও তাঁর উম্মাতের পক্ষ হতে এটা ক্ববূল করে নাও। তারপর এটা কুরবানী করেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৫, আবু দাউদ ২৮১০)