মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
গাদীর খুম একটি কূপের নাম বা স্থানের নামও বলা জেতে পারে, যেখানে মহানবি ﷺ এর তাঁর জীবনের শেষ হজ শেষে ফিরবার পথে ১৮ই জিলহজ্জ্ব তারিখে মক্কা থেকে মদীনা যাওয়ার পথে বিশ্রাম নিয়ে ছিলেন এবং সাহাবিদের কিছু নসিয়ত করে ছিলেন। এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে সহিহ সনদে বর্ণিত আছে। গাদীরে খুম অবস্থান কালের কিছু সহিহ হাদিস এর বিকৃত উপস্থাপনাই হল শিয়া বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। শিয়া আকিদায় বিশ্বাসী যে কোন লোক কে গাদিরে খুম সম্পর্ক জিজ্ঞাসা করলেই বুঝতে পারবেন, এ সম্পর্কে তাদের আকিদা কত ভ্রান্ত। তারা ‘গাদীর খুম’ এর প্রতি এই আবেগ প্রবন যে, তারা এই ঘটনার দিনক্ষণ বের করে প্রতি চন্দ্র বছরের ১৮ই জিলহজ্জ্ব দিনটিকে ঈদের দিন হিসাবে পালন করে, যার নাম ‘ঈদে গাদির’। অসংখ্য শিয়া বিদ’আতের ভেতর ঈদে গাদিরও একটি বিদআত। আপনি শিয়া না হলে আপনি হয়ত ‘গাদীর খুম’ বা ‘ঈদে গাদির’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। রাসূল ﷺ এর কথার বিকৃতি ঘটিয়ে তারা নাটকের নতুন দৃশ্য দোওয়ার চেষ্টা করছে।
গাদীর খুম হলো সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য কয়েকটি হাদিস গ্রন্থে উল্লেখিত একটি কুপ বা কুয়ার নাম। এখানে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আলি (রা.) এর ব্যাপারে কিছু কথা বলেছিলেন। অনেকে গাদিরে খুমের আসল হাদিসটি না জানার জন্য, শিয়া আকিদায় বিশ্বাসিগণ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ মুসলিমকে বিভ্রান্ত করে থাকে এবং বিকৃত করে এমনভাবে গাদির খামের হাদিস শুনিয়ে দিবে, যদি আপনার হাদিটি জানা না থাকে তবে ভুল ধরার কোন সুযোগই পাবেন না। তাই গাদিরে খুম সম্পর্কিত হাদিসগুলো পাঠকের সামনে প্রকাশ করার পূর্বে জানা দরকার এই স্থানে রাসূলুল্লাহ ﷺ কেন গিয়েছেল? সেখানে তিনি কি বলেছিলেন? এই হাদিসের পূর্বকার প্রেক্ষাপট কি ছিল?
গাদীরে খুম হাদিসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরতের দশম বর্ষে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) কে ইয়েমনে একটি অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেন। আলি (রা.) সেখানে সফলভাবে অভিযান চালিয়ে যুদ্ধলব্ধ মাল ও গনিমত নিয়ে ফিরেন। তিনি খুমুস বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ সংরক্ষণ করেন, যার মধ্যে মূল্যবান লিলেন কাপড়ও ছিল। কিছু সাহাবি তা ব্যবহার করতে চাইলে আলি (রা.) তা দিতে অস্বীকার করেন এবং সরাসরি রাসূল ﷺ এর কাছে তা হস্তান্তরের ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপরে আলি (রা.) বাহিনীর দায়িত্ব খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) এর হাতে সোপর্দ করেন হজে অংশ নিতে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মক্কা পৌঁছে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে হজ সমাপন করেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.), আলি (রা.) এর অনুপস্থিতিতে সৈন্যদেরকে সাময়িকভাবে সেই কাপড় ব্যবহারের অনুমতি দেন।
হজ শেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আলি (রা.) পুরো দলের সঙ্গে গাদিরে খুম নামক স্থানে মিলিত হয়। কিন্তু আলি (রা.) তাদের পরনে সেই লিনেন কাপড় পড়তে দেখে অবাক হয় এবং সৈন্য দলকে কাপড় খুলে ফেলার কড়া নির্দেশ প্রদান করেন। এতে সৈন্যদের একাংশ, বিশেষ করে বুরাইদা (রা.) আলির আচরণে অসন্তুষ্ট হন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট অভিযোগ করেন। রাসূল ﷺ তাদের উদ্দেশ্যে এ স্থানে একটি বক্তব্য প্রদান করেন। এই ঘটনা গাদীরে খুম নামক স্থানে ঘটেছিল বিধায় স্থানটি বিখ্যাত হয়ে যায়। এ স্থানের এ বক্তব্য নিয়েই মতবিরোধ, শিয়াদের দাবি সেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ জনসমক্ষে আলির (রা.) কে পরবর্তী ইমাম বা খলিফার জন্য নির্বাচিত করেন। অপর পক্ষে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দাবি করে, এ বক্তব্যে আলি (রা.) এর মর্যাদা ও সম্মাদের কথা বললেও তাকে খলিফা বা ইমাম নির্বাচনের মত কোন বিষয় এখানে ছিল না। এ সম্পর্কিত কিছু সহিহ হাদিস-
বুরাইদা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলিকে ইয়েমেনে পাঠান এবং আমিও তাঁর সাথে ছিলাম। পরে সাহাবিরা তাঁকে কিছু উট ব্যবহারের অনুরোধ করেন, আলি (রা.) অনুমতি দেন। যখন হজ শেষ করে আমরা মদিনায় ফিরলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন
يَا بُرَيْدَةُ! أَبْغَضْتَ عَلِيًّا؟ قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: لَا تُبْغِضْهُ، فَإِنَّهُ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ، وَهُوَ وَلِيُّكُمْ بَعْدِي.
“বুরাইদা! তুমি কি আলিকে অপছন্দ করো?” আমি বললাম: “হ্যাঁ।” তখন তিনি বললেন: “তাকে ঘৃণা কোরো না, সে আমারই অংশ, আমিও তার অংশ, সে আমার পরে তোমাদের অভিভাবক।” মুসনাদ আহমদ : ২৯৯৬২
বুরাইদাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলি (রা.) কে গানীমাতের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ে আসার জন্য খালিদ (রা.) এর কাছে পাঠালেন। আমি (রাবি) আলি (রা.) এর প্রতি অসন্তুষ্ট, আর তিনি গোসলও করেছেন। তাই আমি খালিদ (রা.) কে বললাম, আপনি কি তার দিকে দেখছেন না? এরপর আমরা নবি ﷺ এর কাছে ফিরে আসলে আমি তাঁর কাছে বিষয়টি জানালাম। তখন তিনি বললেন, হে বুরাইদাহ! তুমি কি ‘আলির প্রতি অসন্তুষ্ট? আমি বললাম, জ্বী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার উপর অসন্তুষ্ট থেকে না। কারণ খুমুসে তার প্রাপ্য এর চেয়েও অধিক আছে। সহিহ বুখারি : ৪৩৫০
আবূ সারীহাহ অথবা যাইদ ইবনু আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“ مَنْ كُنْتُ مَوْلاَهُ فَعَلِيٌّ مَوْلاَهُ ”
আমি যার মাওলা (সাথী, অবিভাবক), আলিও তার মাওলা (সাথি, অভিভাবক)। সুনানে তিরমিজি : ৩৭১৩, সহিহাহ : ১৭৫০, মিশকাত : ৬০৮২, হাদিসের মান সহিহ
আলি (রা.) খোলা ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গাদিরে খুমের ভাষণ শুনেছে সে যেন উঠে দাঁড়ায়। এ কথা শুনে সাঈদের পক্ষ থেকে ছয় জন এবং জায়িদের পক্ষ থেকে ছয়জন উঠে দাঁড়ালো। তারা সাক্ষ্য দিল যে, তারা গাদিরে খুমে আলি (রা.) কে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছে, আল্লাহ কি মুমিনদের জন্য অধিকতর আপনজন নন? সবাই বললো, অবশ্যই। তিনি বললেন-
রাসূল ﷺ গাদীরে খুমে উপস্থিত মুসলিমদের উদ্দেশ্য করে বলেন-
مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَهَذَا عَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ، وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ، وَانْصُرْ مَنْ نَصَرَهُ، وَاخْذُلْ مَنْ خَذَلَهُ۔
“আমি যার বন্ধু, আলিও তার বন্ধু । হে আল্লাহ! যিনি আলিকে বন্ধু, মনে করে, তুমি তার বন্ধু হও; আর যিনি তার বিরুদ্ধে, তুমি তার বিরুদ্ধে হও; যিনি তার সাহায্য করে, তুমি তাকে সাহায্য করো; আর যে তাকে পরিত্যাগ করে, তুমি তাকে অপদস্থ করো। মুসনদে আহমদ : ৯৫০, ৯৬১, ৮৬৪
যায়দ বিন আরকাম বলেন, একদিন মক্কা-মদিনার মধ্যপথে ‘খুম’ নামক জলাশয়ের ধারে রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। সুতরাং তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে ওয়ায-নসিহত করার পর বললেন, ‘‘অতঃপর হে লোক সকল! শোনো, আমি একজন মানুষ মাত্র, শীঘ্রই (আমার নিকট) আমার প্রতিপালকের দূত আসবেন এবং আমি (আল্লাহর নিকট যাওয়ার জন্য) তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে একটি আল্লাহর কিতাব, যাতে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর এবং তা মজবুত ক’রে ধারণ কর।’। সহিহ মুসলিম : ৬৩৭৮; হাদিস সম্ভার : ১৫০৯
ইয়াযীদ ইবনু হায়্যান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি, হুসায়ন ইবনু সাবুরা এবং উমার ইবনু মুসলিম, আমরা যায়দ ইবনু আরকাম (রা.) এর নিকট গেলাম। আমরা যখন তার কাছে বসি, তখন হুসায়ন বললেন, হে যায়দ! আপনি তো বহু কল্যাণ প্রত্যক্ষ করেছেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ কে দেখেছেন, তাঁর হাদিস শুনেছেন, তার পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছেন। আপনি বহু কল্যাণ লাভ করেছেন, হে যায়দ! আপনি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যা শুনেছেন, তা আমাদের বলুন না। যায়দ (রা.) বললেন, ভ্রাতূষ্পূত্র! আমার বয়স হয়েছে, আমি পুরানো যুগের মানুষ। সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছ থেকে যা আমি সংরক্ষণ করোছিলাম, এর কিছু অংশ ভুলে গিয়েছি। তাই আমি যা বলি, তা কবুল কর আর আমি যা না বলি, সে ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিও না।
তারপর তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী “খুম্ম” নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা শেষে ওয়াজ-নসিহত করলেন। তারপর বললেন, সাবধান, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষ, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফিরিশতা আসবে, আর আমিও তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং নূর রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অবলম্বন কর, একে শক্ত করে ধরে রাখো। এরপর কুরআনের প্রতি আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। তারপর বললেন, আর হলো আমার আহলে বাইত। আর আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। হুসায়ন বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ‘আহলে বাইত’ কারা, হে যায়দ? রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিবিগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?
যায়দ (রা.) বললেন, বিবিগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত; তবে আহলে বাইত তাঁরাই, যাদের উপর যাকাত গ্রহণ হারাম। হুসায়ন বললেন, এ সব লোক কারা? যায়দ (রা.) বললেন, এরা আলি, আকীল, জাফের ও আব্বাস (রা.) এর পরিবার-পরিজন। হুসায়ন বললেন, এদের সবার জন্য যাকাত হারাম? যায়দ (রা.) বললেন, হ্যাঁ। সহিহ মুসলিম : ২৪০৮, আহমাদ ১৮৭৮০, ১৮৮২৬, দারেমী ৩৩১৬
গাদীরে খুম সম্পর্কে শিয়াদের বর্ণিত হাদিস হল :
শিয়া ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, গাদিরে খুমের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (স.) আলি (রা.)-কে তার পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত (ইমাম ও খলিফা) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। শিয়া সূত্রে এই দাবির সমর্থনে বেশ কিছু তারা পেশ করে। নিচে তাদের প্রসিদ্ধ কয়েকটি গ্রন্থের রেফারেন্স সহ হাদিসগুলো উল্লেখ করা হলো:
শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -১
“قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ص): مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ.”
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘যার আমি মাওলা (নেতা), আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, তুমিও তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো এবং যে আলির শত্রুতা করবে, তুমিও তার শত্রুতা করো। শায়খ তুসী, আল-ইহতিজাজ, খণ্ড: ১, পৃ.-৫৮-৬২
শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -২
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন-৩
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ؟ قَالُوا: بَلَى. قَالَ: فَمَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ.”
হে লোকসকল! তোমরা কি এ কথা স্বীকার করো না যে, মুমিনদের উপর তাদের নিজেদের চেয়ে আমার অধিকার বেশি? তারা বলল, হ্যাঁ, তিনি বললেন: ‘তাহলে যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। আল্লামা আমিনী, আল-গাদীর, খণ্ড: ১, পৃ.-১৪-২০
শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৪
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ (ص) قَالَ فِي غَدِيرِ خُمٍّ: مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ.
রাসূলুল্লাহ (স.) গাদিরে খুমে বলেছেন, যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে আলির শত্রুতা করে, তুমিও তার শত্রুতা করো।
আল্লামা মাজলিসী (র.) বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড: ৩৭,পৃষ্ঠা: ১১০-১৩০
শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৫
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন-
“عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ص) بِغَدِيرِ خُمٍّ: أَلَا إِنَّ عَلِيًّا مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ، وَهُوَ وَلِيُّ كُلِّ مُؤْمِنٍ بَعْدِي.”
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (স.) গাদিরে খুমে বলেছেন, জেনে রাখো, আলি আমার থেকে এবং আমি তার থেকে। সে আমার পর প্রত্যেক মুমিনের অভিভাবক (ওয়ালী)। শায়খ সাদুক (র.) কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নিআম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭০-২৭৫
শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৬
عَنِ النَّبِيِّ (ص) أَنَّهُ قَالَ: مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ
নবি (স.) বলেছেন: ‘যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে আলির শত্রুতা করে, তুমিও তার শত্রুতা করো। আল-কুন্দুজী আল-হানাফী ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪২
আব্দুল হুসাইন আল-আমিনী ও তার গ্রন্থ আল-গাদীরের ভাষ্য :
শিয়া আলিমগণ এ ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছুসংখ্যক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘আল গাদীর’ গ্রন্থ সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ, যা বিখ্যাত শিয়া লেখক আব্দুল হুসাইন আল‑আমিনী (১৪০০ হি.) বিশাল ২০ খণ্ডে সমাপ্ত করেছেন। তিনি তার গ্রন্থে গাদীরে খুমের দিন ঘটেছে এবং এটি আলির (রা.) ইমামত ও নেতৃত্ব ঘোষণার সাথে সম্পর্কিত বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আল‑আমিনী বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় শেষ করে ১০ হিজরির ১৮ জিলহজ নয়মাসে গাদীর‑খুম নামক স্থানে অবস্থান করেন, তখন জিব্রাঈল (আ.) তাঁর কাছে নিম্নলিখিত বার্তা নিয়ে আসে। আল্লাহ বানী-
یٰۤاَیُّہَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَہٗ ؕ
হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও আর যদি তুমি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত পৌঁছালে না। সুরা মায়েদা : ৬৭
এরপর নিজে মঞ্চে উঠে তাকবীর-ধ্বনি উচ্চারণ করেন, অতঃপর তিনি বললেন, “মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, তিনি তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা প্রদান করেছেন এবং তাঁর নেয়ামত চূড়ান্ত করেছেন এবং আমার পর আলির ওয়াসায়াত এবং বেলায়েতের এবং ইমামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন ” এরপর মহানবি ﷺ উঁচু স্থান থেকে নিচে নেমে এসে আলি (আঃ) কে একটি তাঁবুর নীচে বসার জন্য বললেন, যাতে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাঁর সাথে মুসাফাহা করে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
সবার আগে আবু বকর ও উমর আলিকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন এবং শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁকে তাঁদের ‘মাওলা’ (নেতা) বলে অভিহিত করেন। হাসসান ইবনে সাবিত এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মহানবি ﷺ এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনা করেন এবং তা মহানবি ﷺ এর সামনে আবৃত্তি করেন। আমরা এখানে এ কবিতার মাত্র দু’টি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি দিচ্ছি- “অতঃপর তিনি তাঁকে বললেন, হে আলি ! উঠে দাঁড়াও।
কারণ আমি তোমাকে আমার পরে ইমাম (নেতা) ও পথপ্রদর্শক মনোনীত করেছি।
অতএব, আমি যার মাওলা (অভিভাবক), সেও তার ওয়ালী ।
তাই তোমরা সবাই তার সত্যিকার সমর্থক ও অনুসারী হয়ে যাও।”
আল‑আমিনী আরও লিখেন, এ হাদিস সকল যুগে ও সবসময় মহানবি ﷺ এর সকল সাহাবির ওপর মাওলা আলি (আঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সবচেয়ে বড় দলিল। এমনকি আমীরুল মুমিনীন আলি (আঃ) দ্বিতীয় খলীফার ইন্তেকালের পর নতুন খলীফা নিযুক্তকারী পরামর্শ বা শুরা সভার অধিবেশনে, উসমানের খিলাফতকালে এবং তাঁর নিজের খিলাফতকালে এ হাদিসের দ্বারা খিলাফত সংক্রান্ত তাঁর দাবী উত্থাপন এবং এ সংক্রান্ত যুক্তি পেশ করেছিলেন। এছাড়াও বড় বড় মুসলিম মনীষী, আলি (আঃ) এর রিরোধী ও খিলাফত সংক্রান্ত তাঁর অধিকার অস্বীকারকারীদের বিপক্ষে এ হাদিসের মাধ্যমে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন। (‘চিরভাস্বর মহানবি ﷺ দ্বিতীয় খণ্ড ।
তারা এর সাথে আরও একটি জাল হাদিস বেশ ঘটা করে প্রচার করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার সময় গাদিরে খুম নাম স্থানে এক লক্ষও অধিক সাহাবি সামনে আলি (রা.) কে খেলাফত দান করেন। (এই জাল হাদিস সম্পর্কে নাসির উদ্দির আলবানি বলেন, এই হাদিস টি এক লক্ষেরও অধিক সাহাবি সামনে বলা হয়েছে অথচ বর্ণনা কারি ঐ একজন সাহাবি ছাড়া আর কেহই হাদিসটি বর্ণনা করে নাই। যঈফ ও মওজু হাদিসের সংকলন, পৃষ্ঠা ৩৮
গাদিরে খুম সম্পর্কে শিয়াদের দাবি
শিয়াদের দাবি গাদিরে খুমের ভাষণে মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা ছিল। তার মাঝে প্রথমটি ছিল ‘কুরআন ও আহলে বাইতের’ অনুসরণের আদেশ। দ্বিতীয়টি ছিল আলি (রা.) এর ‘অভিষেক’, অর্থাৎ আলি (রা.) কে মুসলিম জাতির মওলা (অভিভাবক) ঘোষণা করা। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওফতের পর মুসলিম উম্মার খেলাফতের এক মাত্র উত্তারাধীকারি আলি (রা.)। তাদের বিশ্বাস আলি (রা.) এর আগের তিনজন মুসলীম খলীফাগণ অবৈধ এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। (নাউজুবিল্লাহ)
তাদের দাবির যৌক্তিকতা :
উপরদের আলোচিত সহিহ হাদিসগুলো থেকে এ কথা সত্য যে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পথে গাদীরে খুম নামক স্থানে ভাষণ দিয়েছিলেন এবং যা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মসনদে আহম্মদ সহ অনেক হাদিস গ্রন্থে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদিস দ্বারা আহলে বাইত তথা আলি (রা.) মর্যাদা প্রমাণিত এবং কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। হাদিসগুলো মন দিয়ে অধ্যায় করলে দেখা যাবে সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের বর্ণিত অন্যান্য হাদিসের মাঝে সামান্য পার্খক্য আছে। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিসটির মাঝে অতিরিক্ত অংশ টুকু নেই যা অন্য হাদিস গ্রন্থে এসেছে। এই হাদিসগুলো অনেক মুহাদ্দিস সহিহ বলে রায় প্রদান করছেন। যদিও ইবন তাইমিয়াহ সহ কিছু প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এর বাইরের কোন বর্ণনাকে সহিহ বলেননি। অপর পক্ষে শিয়া আলেমদের বর্ণিত প্রথম হাদিটিতে অনেক মনগড়া কথা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। হাদিসগুলোর শেষের দিকে অতিরিক্ত কথাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বলে আলি (রা.) এর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।
যদি আলোচনার স্বার্থে আমরা উপরের হাদিসের অতিরিক্ত বর্ণনাকে সহিহ ধরে নেই, তা হলে তাদের বক্তব্য সার কথা হবে- আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা। এই কথাটুকু সহিহ বুখারি ও মুসলিম বাদে অন্য হাদিসের উল্লেখ আছে। তাদের হাদিসে দেখতে পেয়েছি এই অতিরিক্ত বর্ণনার বাইরেও আরো অনেক বাড়তি বর্ণনা রয়েছে যার সবই শিয়াদের তৈরি বা জাল করা। অধিকাংশ শিয়া স্কলার রেফারেন্স হিসাবে এই দুই বর্ণনার অতিরিক্ত অতিরঞ্জিত বর্ণনাগুলো বলেন না। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো যে, গাদির খুমের হাদিসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা বুখারী ও মুসলিমের রেফারেন্স উল্লেখ করলেও প্রায় সকল ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বর্ণনাগুলি একই সাথে চালিয়ে দেয় যদিও সেগুলো বুখারী-মুসলিমে নেই।
শিয়া আলেমগণ প্রায়ই বলে থাকে, গাদিরে খুমের এ মহান ঐতিহাসিক ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ১১০ জন সাহাবি বর্ণনা করেছেন। তাবেয়ীগণের যুগেও ৮৯ জন তাবেয়ী এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী শতকসমূহে হাদিসে গাদীরের রাবিগণ সবাই আহলে সুন্নাতের আলেম। তাঁদের মধ্য থেকে ৩৬০ জন এ হাদিস তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন ও উল্লেখ করেছেন। হিজরী তৃতীয় শতকে ৯২ জন আলেম, চতুর্থ শতকে ৪৩ জন, পঞ্চম শতকে ২৪ জন, ষষ্ঠ শতকে ২০ জন, সপ্তম শতকে ২১ জন, অষ্টম শতকে ১৮ জন, নবম শতকে ১৬ জন, দশম শতকে ১৪ জন, একাদশ শতকে ১২ জন, দ্বাদশ শতকে ১৩ জন, ত্রয়োদশ শতকে ১২ জন এবং চতুর্দশ শতকে ২০ জন আলেম এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
মজার ব্যাপার হল তাদের এই কথা সত্য হলেও এর মাঝে সূক্ষ্ম কারচুপি আছে। সাহাবি বা মুহাদ্দিসগনের বর্ণিত সকল হাদিসের মূল কথাগুলো এই গ্রন্থের উপরে বর্ণিত হাদিসের মত। কিন্তু শিয়া আলেমগণ প্রতিটি হাদিসে অতিরিক্ত অংশ যোগ করে আলি (রা.) কে খেলাফতের উত্তারাধীকারি প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।
যাহোক আলি (রা.) এর খেলাফতের উত্তারাধীকারি অংশ টুকু মিথ্যা হলেও তাদের এ (আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা) কথাটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনেক মুহাদ্দস উল্লখ করছেন। এখান হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ মাওলা শব্দটি ব্যবহার করছেন।
‘মাওলা’ একটা আরবি শব্দটি। মাওলা শব্দটি মহান আল্লাহ কুরআনে কয়েক স্থানে উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াতে তিনি (আল্লাহ) নিজে মাওলা বা প্রভু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আরবি ভাষায় অনেক শব্দেরই একাধিক অর্থ থাকে ঠিক তেমনি মাওলা শব্দটিরও একাধিক অর্থ আছে। আর এই বহু অর্থেরই সুযোগ গ্রহণ করেছে শিয়ারা অন্যায়ভাবে। যেমন ‘মাওলা’ এর অর্থ হতে পারে কর্তা, মালিক, বন্ধু, অভিভাবক, ভালোবাসার মানুষ, আযাদকৃত দাস, দাস, কাজিন ইত্যাদি। মাওলা দিয়ে যেমন বন্ধু বুঝায় একই শব্দ দিয়ে এমনকি আল্লাহকেও বুঝায় বাক্যের গতি অনুসারে। এখানে মাওলা শব্দের অর্থ ‘ভালোবাসার মানুষ’ হিসাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ ব্যবহার করেছেন, যা শিয়ারা না মেনে বরং ‘ইমাম’, ‘খলিফা’ কিংবা ‘ক্ষমতার উত্তরাধিকারী’ হিসাবে এর অর্থ করে।
গাদির খুমের হাদিস নিয়ে শিয়া বাড়া বাড়ির ভয়াবহতা সত্য থেকে তাদের অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে। খিলাফতের উত্তরাধিকারের মতো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন কুয়াশাচ্ছন্ন কথা দিয়ে মুড়িয়ে রাখবেন তা হতে পারে না এবং তা রাসুল ﷺ এর ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। গাদির খুমের ঘটনাটি যখন ঘটেছে তখন সেখানে ছিল মদীনাবাসী সাহাবাগণ। এর সামান্য কিছুদিন আগে বিদায় হজে তিনি মক্কা, মদীনা নির্বিশেষে সকল সাহাবাকে কাছে পেয়েছেন। সে হিসাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার জন্য বিদায় হজ্জের ভাষণ ছিল সেরা সময়, কিন্তু তিনি তখন এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। এই সময়ের আগে কিংবা পরে অসংখ্যবার মুহাজির ও আনসার শীর্ষস্থানীয় সাহাবগণ রাসুলের সাথে বিভিন্ন সময় বসেছেন এবং পরামর্শ করেছেন। আলি (রা.) এর খলিফা হওয়ার মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা রাসুল ﷺ কাউকে বলেননি।
গাদির খুমের ঘটনায় রাসুল ﷺ আলি সম্পর্কে যেভাবে বলেছেন, একইভাবে কিংবা এর চেয়ে জোরালোভাবে তিনি অন্য সাহাবাদের প্রসঙ্গেও অনেকবার বলেছেন। আবু বকরের কথা সরাসরি কুরআনে এসেছে। উমার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আল্লাহর শপথ উমার, তুমি যে পথে হাঁটো, শয়তান সে পথে আসেনা” (বুখারী)। উমার (রা.) প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, “আমার পর যদি কোন নবি হতো তা হতো উমার।। তিনি আরো বলেছেন, “উমারের সাথে যদি কেউ রাগান্বিত হলো সে যেন আমার উপর রাগান্বিত হলো এবং উমারকে যে ভালোবাসলো, সে যেনো আমাকেই ভালোবাসলো। উমার (রা.) এই হাদিসগুলো জানার পরও এগুলোকে তার প্রথম খলিফা হিসাবে মনোনয়নের জন্য ব্যবহার করেননি বা করতে দেননি।
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “প্রত্যেক নবির উম্মাহর মধ্যে একজন থাকে যে হয় ওই উম্মাহর সবচেয়ে বিশ্বস্ত। আমার উম্মাতের ভেতর সেই লোকটি হলো আবুউবাইদাহ। মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) কে তিনি বলেছেন, “ওহে মুয়াজ, তুমি হলে আমার ভালোবাসার একজন। আবু জর আল গিফারী (রা.) প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আকাশের নিচে এবং মাটির উপর আবু জরের চেয়ে সত্যবাদী আর কেউ নেই।
এভাবে সাহাবিদের মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। তাই বলে কি, তাদের নামে আলাদা আলাদা দল গঠন করতে হবে। সকল সাহাবি আল্লাহ এবং তার রাসুল ﷺ এর নিকট প্রিয়। কারও প্রশংসা করতে গিয়ে অন্য জন কে ছোট করা হারাম কাজ। এই কাজটিই করেছে শিয়ারা। ইসলামের অন্যতম খাদেম ও খলীফা আলি (রা.) এর মর্জানা বাড়াতে গিয়ে প্রথম তিন খলীফাসহ সকল সাহাবি (রা.) এর উপর মুনাফিকের মত টাইটেল লাগিয়ে দিয়েছেন। যা তাদের ইসলাম থেকে বের করে দিয়েছে। আলি (রা.) রাসুল ﷺ এর আপন চাচার ছেলে, তার কলিজার টুকরা ফাতিমা (রা.) স্বামী, তার আদরের দুলাল হাসান, হুসাইলের পিতা সর্বপুরী তিনি আহলে বাইয়াত এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তার মর্জানাকে ছোট করার সাহস কোন মুসলীম দেখাবে না। কিন্তু তাকে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে কেন অন্য সাহাবিদের প্রতি মিথ্যা দুর্নাম দিব? শিয়াদের এই কাজ ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবিদের সাথে চরম বেয়াদবি ছাড়া কিছু নয়। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।





