All posts by israfil625

কালি আর কলম হলো মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। লিখনির মাধ্যমে পাঠকদের অন্তরে ইমানের নূর জ্বালিয়ে দিতে চাই।

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৬. স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দাম্পত্য শুধু দু’জন মানুষের সম্পর্ক নয়; বরং দুটি পরিবার ও বংশের সংযোগও বটে। যখন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের পরিবারকে ছোট করে দেখে বা অপমান করে, তখন এর প্রভাব সরাসরি সংসারের ভেতরে পড়ে।

ক. ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়ে যায়

স্বামী বা স্ত্রী তার নিজের পরিবারকে নিজের মর্যাদার অংশ মনে করে। যখন কেউ তার পরিবারকে অপমান করে, তখন সে মনে করে, আসলে আমাকেই হেয় করা হলো। এতে ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়।

খ. স্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়

পরিবারকে অপমান করার কথা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। এতে অন্তরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

গ. পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ে

একে অপরের পরিবারকে খাটো করলে স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি দুই পরিবারের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এতে দাম্পত্য জীবনে চাপ আরও বেড়ে যায়।

ঘ. ছোট বিষয়কে বড় করে তোলে

যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের পরিবার নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে, তখন ক্ষুদ্র সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করে। এতে সমাধান না হয়ে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়।

ঙ. সন্তানদের মানসিক ক্ষতি

সন্তানরা যদি দেখে বাবা-মা সবসময় একে অপরের পরিবারকে অপমান করছে, তবে তাদের ভেতরে দ্বন্দ্বপূর্ণ ও নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। তারা সম্মান ও সৌজন্য শেখার পরিবর্তে ঝগড়া-মুখী হয়ে ওঠে।

চ. বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়ে

একে অপরের পরিবারকে অপমান করা অনেক সময় এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করে যে, তা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি। পরিবারকে অপমান করা আসলে ভালোবাসার মানুষটিকে অপমান করারই সমান। তাই দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। ইসলামে অন্যের পরিবারকে গালি বা অপমান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিজের পিতা-মাতাকে লা’নত করা। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপন পিতা-মাতাকে কোন লোক কীভাবে লা’নত করতে পারে? তিনি বললেনঃ সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়। সহিহ বুখারি : ৫৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ৯০, আহমাদ : ৬৫৪০

১৭. ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলা ও উপেক্ষা না করা

দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রী ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলে এবং তা উপেক্ষা করতে না পারে, তবে সংসার অশান্ত হয়ে যায়। এর ক্ষতিকর দিকগুলো হলো—

ক. প্রতিনিয়ত ঝগড়া সৃষ্টি হয়

প্রতিটি ত্রুটি নিয়ে আলোচনা বা অভিযোগ করলে সংসারে শান্তি হারিয়ে যায়। তুচ্ছ বিষয় নিয়েই বারবার ঝগড়া হতে থাকে।

খ. ভালোবাসা ও মমতা কমে যায়

যখন এক পক্ষের ভুল অন্য পক্ষ বারবার বড় করে তোলে, তখন তার মনে অপমান ও অভিমান জমে যায়। এতে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়।

গ. আস্থার সম্পর্ক ভেঙে যায়

সবসময় সমালোচনা শুনতে শুনতে মানুষ মনে করে, “সে আমাকে বুঝতে বা মানতে চায় না।” এতে পারস্পরিক আস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।

ঘ. নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়

ছোটখাটো ভুল বড় করে দেখার অভ্যাস একসময় স্বামী বা স্ত্রীকে অপরজনের শুধু খারাপ দিকগুলোই দেখতে বাধ্য করে। তখন আর কোনো ভালো দিক চোখে পড়ে না।

ঙ. সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব

যদি বাবা-মা সবসময় ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করে, সন্তানরা তা দেখে নেতিবাচক চরিত্র গড়ে তোলে এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে যায়।

চ. সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি

অবিরাম খুঁটিনাটি ভুল নিয়ে সমালোচনা দাম্পত্য জীবনে এক পর্যায়ে ক্লান্তি এনে দেয়। তখন বিচ্ছেদ বা দূরত্ব তৈরি হওয়া খুব সহজ হয়ে যায়।

ছ. তিক্ততা এবং রাগ বৃদ্ধি

ক্ষমা করার অভ্যাস না থাকলে এবং ছোট ভুলের জন্য অভিযোগ করতে থাকলে দুজনের মনেই তিক্ততা এবং রাগ জমা হয়। এই চাপা রাগ একসময় বড় ঝগড়া বা বিস্ফোরণের রূপ নেয়। সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা এই তিক্ততা বিষের মতো কাজ করে এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে শেষ করে দেয়।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একে অপরকে ক্ষমা করে দিলে এবং ছোটখাটো বিষয়গুলো সহজে মেনে নিলে সম্পর্ক অনেক বেশি মজবুত হয়। মনে রাখবেন, ভালোবাসার সম্পর্ক নিখুঁত হয় না, এটি ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়েই সুন্দর হয়ে ওঠে। ইসলাম আমাদেরকে ক্ষমাশীল হতে এবং ছোটখাটো ভুল এড়িয়ে চলতে শিখিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

خُذِ الۡعَفۡوَ وَاۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَاَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰہِلِیۡنَ

তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক। সুরা আরাফ : ১৯৯

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “একজন মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। কারণ, যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে তার অন্য কোনো স্বভাবের প্রতি সে সন্তুষ্ট হবে।” সহীহ মুসলিম : ১৪৬৯

১৮. পরকিয়া বা নিজ স্বামী-স্ত্রীর থেকে অন্য কাউকে প্রধান্য দেওয়া

পরকীয়া বা স্বামী/স্ত্রীর বদলে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। কারণ দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আনুগত্য ও একনিষ্ঠতা। যখন এই ভিত্তি নষ্ট হয়, তখন সংসার ভেঙে পড়তে শুরু করে। নিচে কয়েকটি দিক তুলে ধরছি—

ক. বিশ্বাসের চূড়ান্ত লঙ্ঘন

দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং পারস্পরিক আনুগত্য। যখন একজন সঙ্গী পরকীয়া করে বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়, তখন এই বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কের মূল স্তম্ভকে আঘাত করে এবং এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি ফাটল তৈরি হয় যা সহজে মেরামত করা যায় না। যে ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হন, তিনি আর কখনোই তার সঙ্গীকে বিশ্বাস করতে পারেন না, যা সম্পর্ককে অকার্যকর করে তোলে।

খ. ভালোবাসার মৃত্যু

পরকীয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও মমতা দ্রুত নষ্ট হয়। যিনি অবহেলিত হন, তার মনে প্রবল কষ্ট, ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্ম নেয়।

গ. পারিবারিক ভাঙন

পরকীয়া সংসার ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। এতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, বরং দুই পরিবার ও সন্তানের জীবনও নষ্ট হয়ে যায়।

ঘ. সন্তানদের উপর ভয়াবহ প্রভাব

যখন সন্তানরা দেখে বাবা-মার একজন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তখন তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং অনেক সময় বেপথু হয়ে পড়ে।

ঙ. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি

পরকীয়া শুধু দম্পতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পরিবার এবং সমাজে তাদের সম্মানও নষ্ট করে। যখন এই ধরনের সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তখন তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস এবং ঘৃণা তৈরি করে। এর ফলে সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৬. আল্লাহর গজব ও আখিরাতের শাস্তি

পরকীয়া (ব্যভিচার) কুরআন-হাদিসে মহাপাপ হিসেবে বর্ণিত।

আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। সূরা ইসরা :  ৩২

২৪৭৫. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০, সহিহ মুসলিম : ৫৭

প্রতিকারের উপায় :

পরকীয়া বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া একটি সম্পর্ককে কেবল ভেঙে দেয় না, বরং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। এটি ভালোবাসার সম্পর্ককে ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং ব্যথার সম্পর্কে পরিণত করে। তাই দাম্পত্য জীবন রক্ষা করতে হলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, আনুগত্য করা এবং পরকীয়া বা অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে বাঁচা অপরিহার্য। সাথে সাথে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির কথা মনে করলে পরকিয়া করা অসম্ভব হবে।

আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’ঊদ) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০

১৯. ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করার ফলে

ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয়। কারণ দাম্পত্যের প্রকৃত ভিত্তি হলো আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, এবং দ্বীনের অনুসরণ। যখন স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্বকে উপেক্ষা করে, তখন সংসার থেকে বরকত সরে যায় এবং নানা বিপদ ঘনিয়ে আসে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে দাম্পত্য জীবনের ক্ষতি তা হলো-

ক. আল্লাহর ভয় না থাকায় সম্পর্ক দুর্বল হয়

যদি স্বামী-স্ত্রী আল্লাহকে ভয় না করে, তবে তারা সহজেই একে অপরের প্রতি জুলুম, প্রতারণা বা অবহেলা করতে পারে। ফলে দাম্পত্যের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

খ. নামাজ-সিয়াম অবহেলা করলে বরকত চলে যায়

নামাজ, সিয়াম, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত অবহেলা করলে সংসার থেকে বরকত সরে যায়। ফলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও শান্তি থাকে না।

গ. হালাল-হারামের সীমা অমান্য করা

ধর্মীয় অবহেলার কারণে কেউ হারাম উপার্জনে লিপ্ত হয়, কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, কেউ অপচয় ও বিলাসিতায় মত্ত হয়। এসব সরাসরি সংসার ধ্বংস করে।

ঘ. সন্তানদের ঈমান নষ্ট হয়

স্বামী-স্ত্রীর দ্বীনহীনতা সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভবিষ্যত প্রজন্ম নষ্ট হয় এবং পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।

ঙ. পারস্পরিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা

ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর দায়িত্ব, আর স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে এগুলো অমান্য হয়, যা সংসার ভাঙনের পথ তৈরি করে।

চ. বিবেক ও নৈতিকতার অবক্ষয়

ধর্ম ছাড়া দাম্পত্য জীবন শুধুই জাগতিক স্বার্থে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে নৈতিকতা হারায়, সম্মান ও ভালোবাসা ক্ষয়ে যায়।

ছ. আখিরাতের ক্ষতি

সংসারে সুখ পেলেও যদি স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করে, তবে আখিরাতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا

যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, আমি তার জন্য সংকীর্ণ জীবন নির্ধারণ করব।” সুরা  ত্বাহা : ১২৪

প্রতিকারের উপায় :

দ্বীনহীন স্বামী বা স্ত্রী সংসারে শান্তি আনতে পারে না। তাই দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর, স্থায়ী ও বরকতময় করতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দ্বীনের প্রতি যত্নবান হওয়া, একে অপরকে ইবাদতে সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রাখা অপরিহার্য। প্রথমত দ্বীনদার ছেলে/মেয়ে বিবাহ করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সিহহ মুসলিম : ১৪৬৬, আহমাদ : ৯৫২৬

পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে একটি পরিবার আদর্শ মুসলিম পরিবার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং সদস্যরা একে অপরের জন্য সহায়ক হতে পারে। নিচে কিছু সহজ ও কার্যকরী উপায় দেওয়া হলো, যার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা সম্ভব। তাই নিয়মিত ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা। যেমন- জামাতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দুআ, দান সদগা ইত্যাদি। নিয়মিত ঘরে দ্বীনি আলোচনার ব্যবস্থা করা। পরিবারের সবাইকে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা। পরিবারের নারীদের মাহরাম রক্ষা করে চলাফেরা করা এবং পর্দার বিষয় কোন ছাড় না দেওয়া। এভাবের পরিবারে দ্বীন চলে আসলে আপনি অবশ্যি দাম্পত্য জীবনে সুখি হবেন।

২০. অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা

অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা দাম্পত্য জীবনে একটি ধ্বংসাত্মক আচরণ, যা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। এই ধরনের আচরণ দাম্পত্য জীবনে যে ক্ষতি করে তা হলো-

ক. পারস্পরিক সম্মান নষ্ট হওয়া

একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে গালি দেয় বা অশ্লীল কথা বলে, তখন সেই সম্মানবোধ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। এই আচরণ এমন একটি বার্তা দেয় যে, আপনি আপনার সঙ্গীকে সম্মান করেন না বা তার অনুভূতি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর ফলে সঙ্গী নিজেকে অপমানিত এবং মূল্যহীন মনে করে, যা সম্পর্কের মূল ভিত্তি ভেঙে দেয়।

খ. মানসিক আঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা

অশ্লীল কথা এবং গালাগালি শারীরিক আঘাতের মতো দৃশ্যমান না হলেও এটি মানসিক আঘাত তৈরি করে। এই ধরনের আচরণ একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তাকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে। যে ব্যক্তি এই ধরনের আচরণের শিকার হন, তিনি সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকেন যে কখন আবার তাকে অপমান করা হবে। এতে করে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না।

গ. ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা বৃদ্ধি

ভালোবাসা এবং গালাগালি একসঙ্গে চলতে পারে না। যখন একজন মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ক্রমাগত অসম্মান করে, তখন ভালোবাসার অনুভূতি ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। যে ব্যক্তি গালমন্দ করে, তার প্রতি অন্যজনের মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জমা হয়, যা একসময় সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়।

ঘ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব

যদি দম্পতির সন্তান থাকে, তবে তাদের বাবা-মায়ের অশ্লীল কথা এবং গালাগালি তাদের মানসিক বিকাশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরা এই ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে এবং নিজের জীবনেও এটি প্রয়োগ করতে শেখে। এর ফলে তাদের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।

ঙ. ঘনিষ্ঠতা ও আস্থা ভেঙে যায়

যখন স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে খারাপ ভাষায় সম্বোধন করে, তখন তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়, আস্থা হারিয়ে যায়।

প্রতিকারের উপায় :

অশ্লীল কথা এবং গালাগালি একটি সম্পর্কের উষ্ণতা, সম্মান এবং ভালোবাসা কেড়ে নেয়। এটি সম্পর্ককে একটি বিষাক্ত এবং অসহনীয় জায়গায় পরিণত করে, যেখানে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য এই ধরনের আচরণ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ

আর মানুষকে উত্তম কথা বল, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তোমরা সকলে উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিলে। সূরা বাকারা : ৮৩

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। সহিহ বুখারি : ৬০১৮, ৫১৮৫, সহিহ মুসলিম : ৪৭, আহমাদ : ৭৬৩০

তাই দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত অশ্লীলতা ও গালাগালি থেকে বিরত থাকা, সবসময় কোমল ও ভালোবাসাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা।

২১. স্ত্রী পক্ষের আত্মীয়দের বেশী গুরুত্ব দেওয়া

দাম্পত্য জীবন হলো দুজন মানুষের এক হওয়া এবং তাদের দুটি পরিবারকে একটি পরিবার হিসেবে গ্রহণ করা। যখন একজন স্ত্রী তার নিজের পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেন এবং স্বামীর পরিবারের প্রতি অবহেলা করেন, তখন স্বামীর মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে তার পরিবারকে সম্মান করা হচ্ছে না। এই অসম্মান থেকে পারস্পরিক আস্থার অভাব সৃষ্টি হয়। স্বামী ভাবতে শুরু করেন যে, তার স্ত্রী তার এবং তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক নন, যা সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। ইহার ফলে দাম্পত্য জীবনে যে সকল সমস্যা সৃষ্টি করে তা আলোচনা করা হলো-

ক. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি

স্ত্রীর অতিরিক্ত আত্মীয়প্রিয়তা স্বামীর পিতামাতা বা পরিবারের প্রতি অমনোযোগ বা অসম্মান হিসেবে ধরা দিতে পারে। এটি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি এবং দূরত্ব বৃদ্ধি করে।

খ. অর্থ ও দায়িত্বের অসামঞ্জস্য

যদি পরিবারিক অর্থনৈতিক বা দৈনন্দিন দায়িত্ব (যেমন রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবা) প্রধানত নারীর হাতে থাকে, আত্মীয়দের বেশি সাহায্য ও সহযোগিতা দেওয়া স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। স্বামীকে তার অধিকার ও দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হতে পারে।

গ. ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব

স্ত্রী যখন আত্মীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন এবং তাদের কথার বেশি গুরুত্ব দেন, তখন স্বামীর প্রতি তাঁর প্রাধান্য বা নেতৃত্বের ধারণা হ্রাস পেতে পারে। এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব বা কলহের কারণ হতে পারে।

ঘ. সংঘাত ও কলহের উদ্ভব

যদি স্বামী এই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে স্ত্রী-স্বামী মধ্যে তর্ক বা কলহ জন্মায়। আবার যদি স্বামী চুপচাপ থাকে, তাহলে ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ জমে যায়। এই ধরনের ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদি হলে সম্পর্কের মানসিক দিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঙ. সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা

দাম্পত্য জীবনে সবকিছুতে সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ—সময়, অর্থ, আবেগ, দায়িত্ব। আত্মীয়দের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা ও সম্পর্কের সৌহার্দ্য কমে যায়।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর উভয়েরই উচিত একে অপরের পরিবারকে সমান চোখে দেখা এবং উভয় পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই সকল পক্ষের আত্মীয়দের সদ্ব্যবহার ও ভালোবাসা দিতে হবে। স্বামী স্ত্রী উভয় পক্ষের আত্মীয়দের সাথে ভালো আচরন করা কুরআন সুন্নাহ নির্দেশ।

আল্লাহ তায়ারা বলেন-

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ

“তোমরা কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে দুনিয়ায় ফিতনা সৃষ্টি করবে না?” সূরা মুহাম্মদ : ২২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

‏ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ‏

যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৫

যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, মুসলিম ২৫৫৬, তিরমিযী ১৯০৯, আবূ দাউদ ১৬৯৬, আহমাদ ১৬২৯১, ১৬৩২২, ১৬৩৩১

২২. একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে

দাম্পত্য জীবনে একে অপরকে ছোট করা এবং অসম্মান করা সম্পর্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে কীভাবে একটি সুস্থ সম্পর্ক ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। , তা নিচে আলোচনা করা হলো। একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো-

ক. বিশ্বাসের অভাব ও দূরত্ব তৈরি হওয়া

যখন একজন সঙ্গী বারবার অন্যজনকে ছোট করে কথা বলেন বা অপমান করেন, তখন তাদের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। যার ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি, দুর্বলতা বা মনের কথা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতে পারেন না। এতে দুজনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।

খ. আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া

বারবার অপমানিত হলে একজন মানুষের আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এর ফলে তিনি নিজেকে অযোগ্য বা মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই ধরনের মানসিক চাপ সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গ. রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম

অপমানিত হতে হতে মনের মধ্যে রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম হয়। এই নেতিবাচক অনুভূতিগুলো সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একপর্যায়ে এই চাপা রাগ বা হতাশা বড় ধরনের ঝগড়া বা বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে।

ঘ. একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা হারানো

সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা। যখন একজন আরেকজনকে ছোট করে, তখন সেই শ্রদ্ধা ভেঙে যায়। শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে না।

ঙ. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি

নিয়মিত অপমান ও অসম্মান একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এর ফলে তিনি বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগতে পারেন।

চ. শিশু ও পরিবারিক পরিবেশে প্রভাব:

অবমাননার পরিবেশে বড় হওয়া সন্তান মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারা পরিবারকে ঘরের নিরাপদ স্থান মনে করতে পারে না, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।

প্রতিকারে উপায় :

একে অপরকে ছোট করা বা অসম্মান করা হলো একটি সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য। তাই এক অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। অপরের আত্ম মর্যাদারে প্রতি দৃষ্টি রেখে কথা বলেত হবে। কাউকে কোন প্রকারের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা চলবেনা। তাহলেউ দাম্পত্য জীবনে সুখ আসবে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, (ক্রয় করার ভান করে) মূল্য বৃদ্ধি করে ধোঁকা দিও না। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। একে অপরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন (অবজ্ঞা প্রকাশ) করবে না। তোমাদের একজনের সাওদা করা শেষ না হলে ঐ বস্তুর সাওদা বা কেনা-বেচার প্রস্তাব করবে না। হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ! তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, অসম্মান করবে না, তুচ্ছ ভাববে না। ‘ধর্ম ভীরুতা এখানে’-এটা বলার সময় তিনি স্বীয় বক্ষস্থলের প্রতি তিনবার ইঙ্গিত করেছিলেন। কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করাটা মন্দ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট (অর্থাৎ এরূপ তুচ্ছ জ্ঞান প্রদর্শন দ্বারা পাপ কার্য হওয়া সুনিশ্চিত।) এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে খুন করা, তাঁর মাল গ্রাস করা ও সম্মানে আঘাত দেয়া হারাম।  সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩, ২৫৬৪, সুনানে তিরমিযী : ১১৩৪, ১৯৮৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৯, ৪৪৯৬, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৪৩৮, ৩৪৪৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৭, ২১৭২,২১৭৪, আহমাদ : ৭৬৭০, ৭৮১৫, মালেক ১৩৯১, ১৬৮৪ ।

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২৩. স্বামীর গায়রতহীনতা

সাধারণভাবে, গায়রত হলো ইজ্জত, মর্যাদা ও নৈতিক সীমা রক্ষার চেতনাশীলতা, বিশেষ করে পরিবারের সুরক্ষা ও স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব। স্বামীর গায়রত হলো- স্ত্রীর প্রতি সম্মান, নৈতিক সীমা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করার চেতনা। গায়রত দাম্পত্য জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গায়রতের অভাব দাম্পত্য জীবনকে যে ক্ষতি হয় তা হলো-

ক. স্ত্রীর উপর সীমারক্ষা হারানো

গায়রতের অভাবে স্বামী স্ত্রীর আচরণ ও নৈতিক সীমা ঠিকমতো রক্ষা করতে পারে না। এতে স্ত্রী হয়তো পরিবার বা সমাজের প্রতি অশ্লীল বা অযাচিত আচরণ করবে, যা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে।

খ. সম্মান ও মর্যাদার অবনতি

গায়রতহীন স্বামী স্ত্রীকে তার মর্যাদা, সন্মান ও সামাজিক অবস্থান রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। এতে স্ত্রীর আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পর্কের মধ্যে ঘাটতি দেখা দেয়।

গ. বিশ্বাস ও নিরাপত্তার দুর্বলতা

স্বামী যদি গায়রতের প্রতি উদাসীন হয়, স্ত্রী আত্মবিশ্বাস হারায় এবং ঘরে নিরাপত্তা বোধ কমে যায়। এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে।

ঘ. সম্পর্কে প্রেম ও স্নেহের অবনতি

গায়রতহীনতা স্ত্রীর মনে হতাশা, অবজ্ঞা বা অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিকতা, প্রেম ও স্নেহ কমে যায়।

ঙ. সমাজ ও সন্তানদের ওপর প্রভাব

গায়রতের অভাবে স্ত্রীর আচরণে ঢিলা, পর্দাহীনতা বা সীমাহীন স্বাধীনতা দেখা দিতে পারে। শিশুরা এটি দেখে নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক সীমা ভুলভাবে শিখতে পারে, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রতিকারের উপায়

আল্লাহ তা’আলা এবং মুমিন উভয়ই ‘গায়রত’ বা আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন।  মুমিনের গায়রত হলো, যখন সে নিজের বা তার পরিবারের সম্মান ও মর্যাদার ওপর কোনো আঘাত আসে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের পর্দাহীনতা বা অন্যায় কাজ দেখলে তা তার কাছে অপছন্দনীয় হয়। এটি তার ঈমানের একটি অংশ। যদি স্বামী গায়রতহিণ হয় তবে পরিরাব দ্বীন ছেড়ে দিয়ে অন্য সংস্কৃতি অনুসরণ করবে। পরিবারে অশান্তি আসবে। যদি স্বামী গায়রত নিছে চলাফেরা হবে তবে দাম্পত্য জীবনে শান্তি আসতে বাধ্য।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার গাইরাত (সূক্ষ্ম আত্মমর্যাদাবোধ) আছে এবং মুমিনেরও গাইরাত আছে। আল্লাহ তা’আলা মুমিনের জন্য যা হারাম করে দিয়েছেন, সে তাতে লিপ্ত হলে আল্লাহ তা’আলার গাইরাতে আঘাত লাগে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬৮

২৪. পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা

দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে উপেক্ষা করলে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। যখন একজন সঙ্গী আরেকজনের মতামতকে গুরুত্ব দেন না, তখন ধীরে ধীরে সম্পর্কটা ভেঙে যেতে শুরু করে। পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তা হলো-

ক. বিশ্বাস ভেঙে যায়

স্বামী বা স্ত্রী যদি পরামর্শের মূল্য না দেয়, তবে অপরজন মনে করে তার মতামত অমূল্য। এতে বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং সম্পর্কে শীতলতা আসে।

খ. ভালোবাসা ও আন্তরিকতা কমে যায়

একজন যখন উপেক্ষিত হয়, তার ভেতরে অবহেলার কষ্ট জমে। ভালোবাসা ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপ নিতে পারে।

গ. ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়ে

পরিবার একটি দল। একজনের সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করলে ভুল বাড়ে এবং তার প্রভাব সংসারে পড়ে।

ঘ. অহংকার ও একনায়কতন্ত্র জন্ম নেয়

যখন স্বামী বা স্ত্রী কাউকে গুরুত্ব দেয় না, তখন পরিবারে একনায়কতন্ত্র তৈরি হয়। এতে অপরজন বিদ্বেষ অনুভব করে এবং সম্পর্ক দূরত্বে গড়িয়ে যায়।

ঙ. শিশুদের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়

শিশুরা দেখে শিখে। যদি তারা দেখে মা-বাবা একে অপরের মতামতকে উপেক্ষা করে, তারাও ভবিষ্যতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করবে।

চ. ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বৃদ্ধি

যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত (যেমন – আর্থিক পরিকল্পনা, সন্তানের ভবিষ্যৎ বা বাড়ি কেনা) নেওয়ার ক্ষেত্রে দুজনের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন একা সিদ্ধান্ত নেন, তখন ভুল করার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই ভুল সিদ্ধান্তের ফল পুরো পরিবারকে ভোগ করতে হয় এবং এর দায়ভার দুজনের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।

প্রতিকারের উপায় :

পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা একটি দাম্পত্য সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সম্পর্কে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্মান, এবং যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। তাই প্রতিকাজে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪  وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে। সুরা শুরা : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, অতঃপর তারা যদি পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুধ ছাড়াতে চায়, তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না। সুরা বাকারা : ২৩৩

ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করা মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য। যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের পারিবারিক বিষয়গুলো, যেমন – সন্তানের শিক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা বা কোনো বড় সিদ্ধান্ত, পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করেন, তখন তারা মূলত আল্লাহর নির্দেশই পালন করেন। এতে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। যার ফলে দাম্পত্য জীবনে কোন প্রকারে ভুল বুঝাবুঝি থাকবে না।

২৫. প্রতিটি ঝগড়ায় জিততে চাওয়ার প্রবণতা

প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস। এটি সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট করে দেয় এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসা ও সম্মানকে বিষাক্ত করে তোলে। প্রতিটি ঝগড়ায় জিততে চাওয়ার প্রবণতা দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি করে তা হলো-

ক. বিশ্বাসের অভাব ও মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি

যখন কোনো একজন সঙ্গী সব সময় জেতার মানসিকতা নিয়ে ঝগড়া করেন, তখন অপরজনের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে, তার মতামত বা অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার অভাব তৈরি হয়।

খ. ভালোবাসা ও সহমর্মিতা হারিয়ে যায়

দাম্পত্য জীবন হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহানুভূতির উপর দাঁড়ানো। কিন্তু যদি সব সময় একজন প্রমাণ করতে চায় যে সে-ই ঠিক, তবে অন্যজন অপমানিত ও অবহেলিত বোধ করে। এতে ভালোবাসার জায়গায় ক্ষোভ জন্মায়।

গ. পরস্পরের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়

প্রতিটি বিষয়কে তর্কে পরিণত করলে সঙ্গীর মনে হয় যে তার কথা কোনো গুরুত্ব পায় না। এতে আস্থা ও ভরসা নষ্ট হয়ে যায়।

ঘ. শান্তির পরিবেশ নষ্ট হয়

বাড়ি হওয়া উচিত শান্তি ও প্রশান্তির স্থান। কিন্তু প্রতিটি ঝগড়াকে জয়-পরাজয়ের লড়াই বানালে ঘরে ঝগড়া, দুঃখ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

ঙ. অহংকার ও জিদ বাড়ে

“আমি হারব না” এই মানসিকতা আসলে অহংকারের প্রতিফলন। এটি দাম্পত্য সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি বিনয়, ক্ষমা আর মমতা কমিয়ে দেয়।

চ. সমস্যা সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়

আসল সমস্যার সমাধান না হয়ে কে জিতল আর কে হারল—এই বিষয়টাই বড় হয়ে যায়। ফলে দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায় এবং সম্পর্ক দুর্বল হতে থাকে।

প্রতিকারের উপায় :

প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা দাম্পত্য সম্পর্ককে একটি প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত করে, যেখানে ভালোবাসার কোনো স্থান থাকে না। এর ফলে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং সুস্থ যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়। তাই প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা বাদ দিয় ঠকার প্রবণতা গ্রহণ করতে হবে।

আবূ উমামা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের যিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের যিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার। সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮০০, দারিমি : ২৭২২

২৬. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ আসলে কিভাবে

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ আসলে তা দাম্পত্য জীবনকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই তৃতীয় পক্ষ একজন বন্ধু, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, অথবা এমনকি অন্য একজন ব্যক্তি হতে পারে যার সাথে স্বামী বা স্ত্রী মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় পক্ষ দাম্পত্য জীবনকে যে সকল ক্ষতির শিকার হয় তা হলো-

ক. বিশ্বাস ও সততার অভাব :

দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। তৃতীয় পক্ষের আগমনে এই বিশ্বাস ভেঙে যায়। যখন একজন সঙ্গী অনুভব করেন যে তার স্বামী বা স্ত্রী অন্য কারো প্রতি বেশি মনোযোগ বা আবেগ দিচ্ছেন, তখন সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ফলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।

খ. যোগাযোগের দুর্বলতা: যখন তৃতীয় পক্ষ আসে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি ও খোলামেলা যোগাযোগ কমে যায়। তারা একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতি, চাহিদা এবং সমস্যা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেন। এর পরিবর্তে, তারা তৃতীয় পক্ষের সাথে তাদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করেন, যা তাদের নিজেদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

গ. মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব: তৃতীয় পক্ষের প্রভাবের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক এবং শারীরিক দূরত্ব বেড়ে যায়। তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন এবং একে অপরের সাথে সময় কাটানো বা আবেগ ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে দাম্পত্য সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।

ঘ. পারিবারিক কলহ ও অশান্তি: তৃতীয় পক্ষের কারণে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ এবং কলহ বৃদ্ধি পায়। ছোটখাটো বিষয় নিয়েও বড় ধরনের ঝগড়া হতে পারে, যা পুরো পরিবারের শান্তি নষ্ট করে দেয়। যদি সন্তান থাকে, তাহলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামী-স্ত্রীর উচিত সব সমস্যার বিষয়ে একে অপরের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা। নিজেদের মধ্যে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং কেন এমনটা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানতে চাওয়া জরুরি। যদি নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না হয়, তাহলে দুই জনের পরিবারের বয়স্ক একজনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে তিনি স্বামী-স্ত্রীকে তাদের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে বুঝতে এবং সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন।

২৭. অন্যের সামনে অপমান করা

অন্যের সামনে সঙ্গীকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এটি শুধু একটি সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। যখন একজন সঙ্গী অন্যের সামনে তার পার্টনারকে অপমান করেন, তখন এটি তাদের মধ্যেকার বিশ্বাস, সম্মান এবং নিরাপত্তাবোধকে নষ্ট করে দেয়।

যেভাবে অপমান দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে

১. বিশ্বাস ভঙ্গ:

দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন পার্টনার অন্যকে সবার সামনে অপমান করেন, তখন অপমানিত ব্যক্তি অনুভব করেন যে তার সঙ্গী তার প্রতি বিশ্বস্ত নন। এই ঘটনার ফলে বিশ্বাসে ফাটল ধরে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার দুর্বল হয়ে যায়।

২. আত্মসম্মানে আঘাত

: প্রকাশ্যে অপমান করলে অপমানিত ব্যক্তির আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি তাদের নিজেদের সম্পর্কে খারাপ অনুভূতি তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে তারা নিজেদেরকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই মানসিক আঘাত তাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৩. সম্পর্কের দূরত্ব বৃদ্ধি:

অপমানজনক ঘটনা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে। যে ব্যক্তি অপমানিত হন, তিনি তার সঙ্গীর থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। তারা একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, যার ফলে সম্পর্কের মধ্যে নীরবতা এবং বিচ্ছিন্নতা বেড়ে যায়।

৪. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি:

যখন একজন সঙ্গী অন্যদের সামনে তার পার্টনারকে অপমান করেন, তখন শুধু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানও ক্ষুণ্ন হয়। এর ফলে তারা অন্যদের সামনে নিজেদেরকে বিব্রত বোধ করেন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া এড়িয়ে চলেন।

প্রতিকারের উপায় :

যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে প্রথমেই খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি। যিনি অপমান করেছেন, তার উচিত তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না বলে অঙ্গীকার করা। আর যিনি অপমানিত হয়েছেন, তার উচিত তার অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সমস্যাটি নিয়ে কথা বলা। যদি নিজেদের মধ্যে সমাধান সম্ভব না হয়, তবে একজন পেশাদার কাউন্সিলরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।

১৯৭৭। আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজি ; ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০

২৮. একে অপরকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া

একে অপরকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি প্রধান কারণ। যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের কর্মব্যস্ততা বা অন্যান্য কারণে একে অপরের থেকে দূরে সরে যান, তখন সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। এটি ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয় এবং একসময় তা ভেঙেও যেতে পারে। পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার কারণে যা ঘটতে পারে তা হলো-

ক. অভাবে ভুল বোঝাবুঝি : সম্পর্কের ভিত্তি হলো খোলাখুলি যোগাযোগ। যখন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটান না, তখন তাদের মধ্যেকার কথোপকথন কমে যায়। তারা একে অপরের জীবনের ছোট ছোট বিষয়, অনুভূতি, বা সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন না। এই যোগাযোগের অভাবে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, যা দূরত্ব তৈরি করে।

খ. মানসিক দূরত্ব:

নিয়মিত একসঙ্গে সময় কাটানো মানসিক নৈকট্য বজায় রাখার জন্য জরুরি। যখন এই সময় কমে যায়, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। তারা একে অপরের কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, যার ফলে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্ব বোধ তৈরি হয়।

গ. আকর্ষণ কমে যাওয়া:

একসঙ্গে সময় না দিলে শারীরিক এবং মানসিক আকর্ষণ দুটোই কমে যায়। সম্পর্কটি তখন শুধু একটি দায়িত্বে পরিণত হয়, যেখানে ভালোবাসা বা আবেগ থাকে না। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি চলে আসে এবং একে অপরের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।

ঘ. তৃতীয় পক্ষের আগমন: যদি সম্পর্কের মধ্যে পর্যাপ্ত সময় এবং মনোযোগের অভাব থাকে, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণ করতে একজন সঙ্গী বাইরের কারো দিকে ঝুঁকতে পারেন। এটি একজন বন্ধু, সহকর্মী বা অন্য কেউ হতে পারে যার সাথে তারা নিজেদের মনের কথা ভাগ করে নেন। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে তৃতীয় পক্ষের আগমন ঘটে, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

ঙ. বিশ্বাসে ফাটল: একে অপরকে সময় না দেওয়া এবং তার ফলস্বরূপ যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা ধীরে ধীরে সম্পর্কের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। একজন সঙ্গী হয়তো ভাবেন যে অন্যজন তাকে এড়িয়ে চলছেন, বা তার জীবনে অন্য কেউ এসেছে। এই ধরনের সন্দেহ এবং অবিশ্বাস সম্পর্কের ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।

প্রতিকারের উপায়

দাম্পত্য জীবনকে বাঁচাতে হলে একে অপরের জন্য সময় বের করা খুব জরুরি। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, নিয়মিত ঘুরতে যাওয়া, অথবা শুধু বসে গল্প করা, এই ছোট ছোট বিষয়গুলো সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে প্রাণ ফেরাতে পারে। কাজের চাপ যতই থাকুক না কেন, সম্পর্কের জন্য সময়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, তখন আমি তাঁকে পেছনে ফেলে দিলাম। পরে যখন শরীরে কিছুটা মেদ হলো, তখন আবার তাঁর সাথে দৌড়ালাম, তিনি আমাকে পেছনে ফেলে দিলেন। তিনি হেসে বললেন: এ দৌড় সেই দৌড়ের বদলা।” সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮, মুসনাদ আহমদ : ২৬২৭৭

২৯. শারীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

শারীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়। এই সমস্যাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। সময়ের সাথে সাথে শারীরিক আকর্ষণ কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু একে উপেক্ষা করলে তা সম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

শারীরিক আকর্ষণ শুধু সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠন নিয়ে নয়, বরং এটি আবেগ, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এই আকর্ষণ কমে গেলে সম্পর্কের মধ্যে থাকা আবেগগুলোও দুর্বল হয়ে যায়। একসময় যে স্পর্শ, চুম্বন বা আলিঙ্গন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল, তা এখন যান্ত্রিক বা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। এর ফলস্বরূপ দাম্পত্য জীবনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, যা ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ এবং কলহের জন্ম দেয়।

প্রতিকারের উপায়

রীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়। এই সমস্যাটা খুব সাধারণ হলেও এর সমাধান করা সম্ভব। শারীরিক আকর্ষণ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং মানসিক সংযোগ এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর নির্ভরশীল। নিজের বাহ্যিক চেহারার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন, নিজেদের পছন্দের পোশাক পরুন। এটি শুধু আপনার পার্টনারের জন্য নয়, নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও সাহায্য করে। যখন আপনি নিজেকে আকর্ষণীয় মনে করবেন, তখন আপনার পার্টনারও আপনাকে আকর্ষণীয় দেখবে। দৈনন্দিন জীবনে স্পর্শ এবং আলিঙ্গনকে গুরুত্ব দিন। এই সাধারণ কাজগুলো সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা ধরে রাখে এবং বোঝায় যে আপনারা একে অপরের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। দাম্পত্য জীবনে শারীরিক আকর্ষণ ধরে রাখা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যদি এই সম্পর্ককে সজীব রাখার চেষ্টা করেন, তবে তা অবশ্যই সম্ভব।

৩০. স্ত্রী স্বামীর কাছে অন্য মহিলার দেহের বর্ণনা দিলে কিভাবে দাম্পত্য নষ্ট হয়?

স্ত্রী যখন অন্য কোনো নারীর দেহের বর্ণনা স্বামীর কাছে দেয়, তখন তা দাম্পত্য জীবনের জন্য ক্ষতিকর হবেই। এর কারনে দাম্পত্য জীবনের জন্য  যে ক্ষতি হবে তা হলো-

ক. দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষতির কারণ

মানসিক তুলনা ও কল্পনা: যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীর মুখে অন্য নারীর শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা শোনেন, তখন তার মনে সেই নারীর একটি চিত্র তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্বামী অজান্তেই নিজের স্ত্রীর সাথে সেই নারীকে তুলনা করতে শুরু করতে পারেন। এই তুলনা দাম্পত্য সম্পর্কে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি করে।

খ সন্দেহ ও অবিশ্বাস:

এই ধরনের বর্ণনা থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে। স্বামী ভাবতে পারেন যে, স্ত্রী কেন অন্য নারীর প্রশংসা করছেন বা তার সৌন্দর্যের প্রতি এতটা মনোযোগ দিচ্ছেন। এর ফলে, সম্পর্কে সন্দেহ ও অস্বস্তি সৃষ্টি হতে পারে।

ঘ. আকর্ষণ ও ফিতনার ঝুঁকি :

ইসলামে ফিতনা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। অন্য নারীর বর্ণনা শোনার কারণে স্বামীর মনে তার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বা ফিতনার সৃষ্টি হতে পারে, যা সম্পর্কের পবিত্রতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। এই বর্ণনা এক ধরনের প্রলোভন হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক ভালোবাসাকে রক্ষা করার জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা দেয়। তাই, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরনের আলোচনা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন নারী যেন তার দেখা অন্য নারীর দেহের বর্ণনা নিজ স্বামীর নিকট এমনভাবে না দেয়, যেন সে তাকে (ঐ নারীকে) চাক্ষুস দেখতে পাচ্ছে। সহিহ বুখারি : ৫২৪০, ৫২৪১

৩১. নিয়মিত অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পরিধান করে থাকলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

স্বামীর বা স্ত্রীর সব সময় অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পোশাক পরিধান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি নীরব বিষের মতো। এর ফলে ধীরে ধীরে আকর্ষণ ও ভালোবাসা কমে যেতে থাকে। দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ। যখন একজন সঙ্গী নিজেকে পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেন না, তখন অপরজনের মনে তার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ে, যা শারীরিক ঘনিষ্ঠতাকেও প্রভাবিত করে। একসময় এই অভ্যাস পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন সঙ্গী যদি অপরজনকে দেখে মনে করে যে তার নিজের প্রতি কোনো যত্ন নেই, তবে এটি তাদের সম্পর্কের প্রতিও উদাসীনতা সৃষ্টি করে। পরিচ্ছন্নতা একটি সম্পর্কের জন্য শুধু স্বাস্থ্যবিধিসম্মত দিকই নয়, বরং এটি পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং যত্নেরও প্রতিফলন। তাই সব সময় অপরিচ্ছন্ন থাকা ধীরে ধীরে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য ও মধুরতাকে নষ্ট করে দেয়।

৩২. অতীতকে টেনে আনার ফলে

অতীতকে টেনে আনা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের বর্তমান সম্পর্কের সমস্যাগুলো সমাধানের পরিবর্তে পুরোনো ভুল বা ঘটনা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তখন তা সম্পর্কের মধ্যে বিষাক্ততা সৃষ্টি করে। অতীতকে নিয়ে কথা বলা হয়তো কোনো সমস্যার সমাধান করে না, বরং এটি শুধুমাত্র নতুন করে ঝগড়ার জন্ম দেয়।

যখন একজন সঙ্গী অতীতের কোনো ভুল নিয়ে বারবার খোঁচা দেন, তখন অপর সঙ্গীর মনে ক্ষোভ এবং রাগ জন্ম নেয়। এটি বিশ্বাস এবং ভালোবাসাকে দুর্বল করে দেয়। সম্পর্ক তখন সামনে এগোতে পারে না, কারণ তারা সব সময় পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এর ফলে বর্তমানের ছোটখাটো সমস্যাগুলোও বড় হয়ে দেখা দেয়।

প্রতিকারের উপায় : অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না। ক্ষমা এবং সহনশীলতা তখন অর্থহীন হয়ে যায়, কারণ পুরোনো ক্ষতগুলো বারবার তাজা করা হয়। তাই অতীতকে ক্ষমা করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব এখানে ফুটে উঠেছে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮

৩৩. চরিত্রের ত্রুটির কারনে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

চরিত্রের ত্রুটি বলতে সাধারণত নৈতিক স্খলন, যেমন – পরকীয়া, অসৎ জীবনযাপন বা অন্য ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন সঙ্গী তার নৈতিকতা লঙ্ঘন করেন, তখন সেই বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে সম্পর্কটা শুধু কাগজে-কলমেই টিকে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের প্রাণ থাকে না। পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্ক শুধু শারীরিক নয়, বরং এটি অপর সঙ্গীকে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয়। অপমান, কষ্ট এবং বঞ্চনার এই অনুভূতি সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে।

৩৪. মিথ্যা বলা কারনে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

মিথ্যা হলো সম্পর্কের জন্য একটি নীরব বিষ। যখন একজন সঙ্গী বারবার মিথ্যা বলেন, তখন অন্যজনের মনে তার প্রতি আস্থা কমে যায়। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তখন স্বাভাবিক আলাপচারিতাতেও সন্দেহ ঢুকে পড়ে, যার ফলে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ থাকে না। বারবার মিথ্যা বলা ও তা লুকানোর চেষ্টা দুজনের ওপরই মানসিক চাপ তৈরি করে। যে মিথ্যা বলছে, সে সব সময় ধরা পড়ার ভয়ে থাকে, আর যাকে মিথ্যা বলা হচ্ছে, সে সব সময় সন্দেহে ভোগে। এই চাপ ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদর্শে সুখী দাম্পত্য জীবন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে দাম্পত্য জীবন কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহ প্রদত্ত এক পবিত্র সম্পর্ক, যা রহমত, ভালোবাসা ও প্রশান্তির উৎস। একজন মুসলিমের জীবনকে পূর্ণতা দিতে এই সম্পর্কের ভূমিকা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবন সকল মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, আর তাঁর দাম্পত্য জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাঁর প্রতিটি কর্ম, আচরণ ও সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি সুখী ও সুন্দর সংসার গড়ে তোলা যায়। রাসুল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কেবল একজন স্বামী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং সঙ্গী। এই মহান আদর্শ অনুসরণ করে একজন মুমিন তার দাম্পত্য জীবনকে মধুর ও আনন্দময় করে তুলতে পারেন।

ক. পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মান

স্ত্রীর মর্যাদা ও মান বোঝা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীর অনুভূতি ও চাহিদার প্রতি সদা যত্নশীল ছিলেন। তিনি তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না, যা আমাদের শেখায় যে ছোটখাটো বিষয়ে স্ত্রীর কষ্ট দেওয়া উচিত নয় এবং তার পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মুমিন স্বামী যদি স্ত্রীর কথা শুনে তাকে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা দেখায়, তবে ঘর-সংসারে শান্তি বজায় থাকে।

খ. ভালোবাসা ও আনন্দের প্রকাশ

দাম্পত্য সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখতে ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করা অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, হালকা ঠাট্টা-মশকরা করতেন এবং একসাথে আনন্দ উপভোগ করতেন। এ ধরনের খোলামেলা ও আনন্দময় সময় দাম্পত্য বন্ধনকে শক্তিশালী করে। তিনি স্ত্রীকে সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতেন, যা ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে। এই ধরনের ছোট ছোট আন্তরিক আচরণ ঘরে স্নেহ ও প্রেমের পরিবেশ তৈরি করে। তিনি সফরেও স্ত্রীকে সঙ্গে নিতেন এবং বাইরে যাওয়ার আগে স্ত্রীকে চুম্বন করতেন, যা ভালোবাসার গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।

গ. সহযোগিতা ও সহানুভূতি

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী। তিনি নিজের হাতে ঘরের কাজ করতেন, কাপড় সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন এবং স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করতেন। এটি পুরুষদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, ঘরের কাজ কেবল নারীদের দায়িত্ব নয়, বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যম। স্ত্রীর অসুস্থতা, দুঃখ বা সমস্যার সময় তিনি তাদের পাশে থাকতেন। কষ্টের সময় সান্ত্বনা দিতেন এবং তাদের জন্য উপহার কিনে দিতেন। একজন মুমিন স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের প্রতি এই সহানুভূতি ও সহযোগিতা বজায় রাখে, তবে সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পায়।

ঘ. আত্মিক ও মানসিক বন্ধন

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এমনকি তিনি স্ত্রীর চুল আঁচড়ে দিতেন, কোলের উপর মাথা রেখে ঘুমাতেন এবং স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। এসব ছোটখাটো কিন্তু আন্তরিক আচরণ সম্পর্কের মধ্যে গভীর আত্মিক ও মানসিক বন্ধন তৈরি করে। তিনি বাড়িতে প্রবেশের আগে মিসওয়াক করতেন, যা পরিচ্ছন্নতা ও আন্তরিকতার প্রতীক। স্ত্রীদের সাথে অবসর সময় কাটানো এবং একাধিকবার সহবাসের পর একবার গোসল করা, এসব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আচারগুলো পরিবারে শান্তি ও আন্তরিকতা বজায় রাখে।

ঙ. সমতা ও ন্যায্যতা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একাধিক স্ত্রীর সাথে সমতা বজায় রাখতেন। তিনি সকলের প্রতি সমান মনোযোগ ও সময় দিতেন, যা একাধিক বিবাহকারী মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি একজন আদর্শ পরিবারপ্রেমিক ছিলেন, যিনি তার পরিবারের সকল সদস্যের চাহিদা এবং অধিকারের প্রতি সর্বদা সচেতন ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দাম্পত্য জীবন আমাদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল আল্লাহর রাসূলই ছিলেন না, বরং একজন আদর্শ স্বামী ও পরিবারপ্রেমিকও ছিলেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা জানতে পারি, কিভাবে একজন মুসলিম স্বামী ও স্ত্রী সুখী ও সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারে। অতএব, একজন মুমিন যদি এই নীতি অনুসরণ করে—স্ত্রীর মর্যাদা বোঝা, আনন্দ ভাগাভাগি করা, সহানুভূতি দেখানো, সমতা বজায় রাখা ও মধুর আচরণ করা—তাহলে সে সহজেই সুখী দাম্পত্য অর্জন করতে পারে। দাম্পত্য কেবল শারীরিক সম্পর্ক নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক বন্ধনও। তাই সংসারে প্রেম, সম্মান ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে যে কোনো মুসলিম দম্পতি সুখী ও পরিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারবে। নিচে সরাসরি সহিহ হাদিসে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

০১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর মান অধিমান বুঝার চেষ্টা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ’’আমি জানি কখন তুমি আমার প্রতি খুশী থাক এবং কখন রাগান্বিত হও।’’ আমি বললাম, কী করে আপনি তা বুঝতে সক্ষম হন? তিনি বললেন, তুমি প্রসন্ন থাকলে বল, না! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রব-এর কসম! কিন্তু তুমি আমার প্রতি নারাজ থাকলে বল, না! ইব্রাহীম (’আ.)-এর রব-এর কসম! শুনে আমি বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! সে ক্ষেত্রে শুধু আপনার নাম উচ্চারণ করা থেকেই বিরত থাকি। সহিহ বুখারি : ৫২২৮, ৬০৭৮

০২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিজোগিতা করতেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম, তখনো মোটা তাজা হইনি। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, তখন তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, অত:পর আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম ও আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা হলাম ও ভারী হলাম, ও তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনে অগ্রসর হল: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন: আজকের জয় সেই দিনের প্রতিশোধ”। মুসনাদ আহমাদ : ২৬২৭৭, সুনানে নাসায়ি : ৮৯৩৮. ইমাম বায়হাকি : ৮৬২৫

৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের প্রসংশা করতেন

খাদীজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রশংসা করা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁকে সব সময় স্মরণ করতেন। একবার আয়েশা (রা.) খাদীজা (রা.) সম্পর্কে কিছু বললে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কোনো স্ত্রী দেননি। সে আমার ওপর ঈমান এনেছে যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছে; সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা বলেছে; সে আমাকে তার ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে যখন মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছে; এবং আল্লাহ আমাকে তার মাধ্যমেই সন্তান দিয়েছেন, যখন অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে দেননি। মুসনাদে আহমাদ : ২৪৮৬৪, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : 6857

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর মর্যাদা নারীদের উপর এমন যেমন সারীদের মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর। সহিহ বুখারি : ৩৭৭০, ৪৫১৯, ৫৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৪৪৬, আহমাদ : ১৩৭৮৭

০৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আবসর সময় কাটাতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাত শেষ করতেন, তখন স্বীয় স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কোন একজনের নিকট গমন করতেন। একদিন তিনি স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং সাধারণতঃ যে সময় কাটান তার চেয়ে বেশি সময় কাটালেন। সহিহ বুখারি : ৫২১৬

০৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে চুমু দিয়ে ঘরের বাহির বের হতেন

আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুমো দিলেন, অতঃপর সালাত আদায়ের জন্য বের হলেন, কিন্তু অযু করলেন না। ’উরওয়াহ বলেনঃ আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, ’সেই স্ত্রী আপনি নন কি? ফলে তিনি হেসে দিলেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫০২

০৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর চুল আচড়ে দিতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমি হায়েয অবস্থায় আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথা আঁচড়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ২৯৫, সহিহ মুসলিম : ৩০২

নবী সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে থাকাবস্থায় আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন আর আমি তা আঁচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি যখন ই‘তিকাফে থাকতেন তখন (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না। সহিহ বুখারি : ২০২৯, ২০৩৩, ২০৩৪, ২০৪১, ২০৪৫

০৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে প্রবেশের আগে মিসওয়াক করতেন

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বাইরে থেকে এসে) বাড়িতে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৩

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি পছন্দ করি যে, আমি আমার স্ত্রীর জন্য সুন্দর সাজসজ্জা করি, যেমন আমি চাই যে, আমার স্ত্রীও আমার জন্য সাজসজ্জা করুক। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘নারীদের জন্য তাদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের উপরও রয়েছে নারীদের অধিকার, স্বীকৃত রীতিনীতি অনুযায়ী।’ সূরা বাকারা : ২২৮। ইমাম ইবন আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ : ১২৪৭০

০৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতেন

আসওয়াদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। আর সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন। সহিহ বুখারি  :৬৭৬, ৫৩৬৩, ৬০৩৯

উরওয়াহ বলেন, আয়েশা (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ঘরে কাজ করতেন?’ তিনি বললেন, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোহাতেন এবং নিজের খেদমত নিজেই করতেন। অন্যনা্য পুরুষরা যেমন নিজেদের বাড়ীতে কাজ করে, অনুরূপ তিনিও তাঁর কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং জুতো সিলাই করতেন। হাদিস সম্ভার : ২৫৯০, আদাবুল মুফরাদ : ২১৫, সহীহুল জামে : ৯০৬৮

আয়েশা (রা.) বলেন: নবী ﷺ তাঁর জুতা মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং ঘরে কাজ করতেন, যেমন তোমাদের কেউ ঘরে কাজ করে।” মুসনাদ আহমাদ : ২৪৯০৩

৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে কুরাআন তিলওয়াত করতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম।

 করেছেন এ সম্পর্কিত ০২ টি হাদিস দিন। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১, সুনানে নাসায়ি : ২৭১, মুসনাদ আহমাদ : ২৪৩৮৪

১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিকবার সঙ্গমে একবার গোসল করতেন

আনাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীদের নিকট গেলেন এবং একবারই গোসল করলেন। সুনানে আবু দাউদ : ২১৮, সুনানে নাসায়ি : ২৬৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৫৮৯,  দারিমী : ৭৫৯) ও

১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করতেন

‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র (কাদাহ) হতে (পানি নিয়ে) গোসল করতাম। সেই পাত্রকে ফারাক বলা হতো। সহিহ বুখারি : ২৫০, ২৬১, ২৬৩, ২৭৩, ২৯৯, ৫৯৫৬, ৭৩৩৯, সহিহ মুসলিম : ৩১৯, আহমাদ : ২৫৮৯৪

১২. স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করেছে, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করা

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবশিষ্টটুকু প্রদান করলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও পাত্রের সে স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন। তবে যুহায়র কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে “পান করার” উল্লেখ নেই।  সহিহ মুসলিম : ৩০০

১৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সুন্দর নামে ডাকতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর স্ত্রীর সাথে মজার ছলে কথা বলতেন

আয়েশা (রাঃ) যখন ছোট ছিলেন, তখন কাপড়ের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তার মধ্যে ০২ টি ঘোড়া ছিল, যার দু’টি ডানা ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, ’এটা কী?’ আয়েশা বললেন, ’ঘোড়া।’ তিনি বললেন,

فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ قَالَتْ أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلاً لَهَا أَجْنِحَةٌ قَالَتْ فَضَحِكَ حَتّٰـى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ

ঘোড়ার আবার দু’টি ডানা?’ আয়েশা বললেন, ’আপনি কি শুনেননি, সুলাইমান (নবী)র ডানা-ওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং সে হাসিতে তাঁর চোয়ালের দাঁত দেখা গেল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৭, মিশকাত  : ৩২৬৫, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৮৬৪, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে হালকা ঠাট্টা-মশকরা করেতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা সাওদা বিনতে যামআ’ আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায় এলো। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও আমার মাঝখানে বসে গেলেন। তাঁর ০২ টি পা আমার কোলে, আর ০২ টি পা সাওদার কোলে ছিল। আমি তার (সাওদার) জন্য ’খাযীরা’ (গোশ্ত ছোট ছোট করে কেটে তাতে আটা মিশিয়ে রান্না করা খাবার) তৈরী করলাম। অতঃপর তাকে খেতে বললে সে খেতে অস্বীকার করল। আমি বললাম, ’তুমি অবশ্যই খাবে, নচেৎ আমি তোমার মুখে তা লেপে দেব।’ সে অস্বীকার করলে আমি প্লেট থেকে সামান্য পরিমাণ নিয়ে তার মুখে লেপে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোল থেকে স্বীয় পা সরিয়ে নিলেন, যাতে সে আমার কাছ থেকে বদলা নিতে পারে। অতঃপর আমি প্লেট থেকে আরো কিছু নিয়ে আমার মুখে লেপে নিলাম। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন। ইত্যবসরে উমার (রাঃ) উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, ’হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার! হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার!’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা উঠে তোমাদের মুখ ধুয়ে নাও, আমার মনে হয় উমার প্রবেশ না করে ছাড়বে না। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৮, নাসাঈ কুবরা : ৮৯১৭, সহীহাহ : ৩১৩১, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন খাবারের দোষ ধরতেন না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাবারের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করেননি। ভাল লাগলে তিনি খেতেন এবং খারাপ লাগলে রেখে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৫৬৩, ৫৪০৯, সহিহ মুসলিম : ৫৫০৪, হাদিস সম্ভার : ২৫৯৩

১৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সফর করতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের মনস্থ করলে স্ত্রীগণের মধ্যে কুরআর ব্যবস্থা করতেন। যার নাম আসত তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হতেন। এছাড়া প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একদিন এক রাত নির্দিষ্ট করে দিতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) নিজের দিন ও রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। সহিহ বুখারি : ২৫৯৩, ২৬৩৭, ২৬৬১, ২৬৮৮, ২৮৭৯, ৪০২৫, ৪১৪১, ৪৬৯০, ৪৭৪৯, ৪৭৫০, ৪৭৫৭, ৫২১২, ৬৬৬২, ৬৬৭৯, ৭৩৬৯, ৭৩৭০,৭৫০০, ৭৫৪৫

১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আনন্দ উপভোগ করতেন

উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হাবশীরা তাদের বর্শা নিয়ে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে পর্দা করে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন এবং আমি সেই খেলা দেখছিলাম। যতক্ষণ আমার ভাল লাগছিল ততক্ষণ আমি দেখছিলাম। এরপর আমি স্বেচ্ছায় সে স্থান ত্যাগ করলাম। সুতরাং তোমরা অনুমান করতে পার কোন্ বয়সের মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা

আমর ইবনু ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যাতুস্ সালাসিল যুদ্ধের সেনাপতি করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ’আয়িশাহ্। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা (আবূ বকর)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, ’উমার ইবনু খাত্তাব অতঃপর আরো কয়েকজনের নাম করলেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৬২, ৪৩৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৮৪, আহমাদ : ১৭৮৫৭

১৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমাতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১

২০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে খেলা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

২১. সূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক স্ত্রীর সাথে সমতা রেখে চলতেন

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী ’আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন স্ত্রীদের মধ্যে লটারী করতেন। লটারীতে যার নাম উঠতো তিনি তাকেই সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য পালাক্রমে রাত ও দিন ভাগ করে নিতেন। তবে যাম’আহর কন্যা সাওদাহ (রাযি.) তার পালার দিনটি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দিয়ে দেন। সুনানে আবু দাউদ : ২১৩৮

২২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতায় তার স্ত্রীর সুরা নাস ও ফালাক পড়ে ফু দিতেন

আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থ হতেন, তখন তিনি নিজের উপর সূরা নাস-ফালাক পাঠ করতেন এবং ফুঁক দিতেন। অতঃপর যখন তাঁর পীড়া প্রকট হয়ে যায়, তখন আমি তাঁর উপর এসব পড়তাম আর বরকতের আশায় তাঁর হাত দিয়ে তাঁকে বুলিয়ে দিতাম। সহহি বুখারি : ৪৪৩৯, ৫০১৬, সহীহ মুসলিম : ২১৯২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৯০২, সহীহাহ : ২৭৭৫, সহিহ ইবনে হিব্বান স: ২৯৫২

২৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর অবর্তমানে তার বান্ধবিদের উপহার পাঠান

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ (রাঃ)-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন। খাদীজাহ (রাঃ)-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদেশ করেন। কোন দিন বকরী যবহ হলে খাদীজাহ (রাঃ)-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মত গোশ্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৯১৬, ৩৮১৭, ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

২৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর পছন্দের গুরুত্ব দিতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

২৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের দুঃখে সান্ত্বনা দিতেন

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, সাফিয়্যাহ (রাযিঃ)-এর কানে পৌছে যে, হাফসাহ (রাযিঃ) তাকে ইয়াহুদীর মেয়ে বলে ঠাট্টা করেছেন। তাই তিনি কাঁদছিলেন। তার ক্ৰন্দনরত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি বললেনঃ তোমাকে কিসে কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, হাফসাহ আমাকে ইয়াহূদীর মেয়ে বলে তিরস্কার করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অবশ্যই তুমি একজন নবীর কন্য, তোমার চাচা অবশ্যই একজন নবী এবং তুমি একজন নবীর সহধর্মিণী। অতএব কিভাবে হাফসাহ তোমার উপরে অহংকার করতে পারে? তারপর তিনি বললেনঃ হে হাফসাহ আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৬৪, মিশকাত : ৬১৮৩

২৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর জন্য উপহার কিনে দিতেন

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বাজারে গিয়েছিলেন এবং দুটি জুতা কিনলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো সাওদা (রাঃ)-কে দিলেন।” মুসনাদে আহমাদ : ২৬৬৯৩

২৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন

…….উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তা হলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা এত হেয় হবো? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনিই আমার সাহায্যকারী।’ আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা‘বা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। ‘উমার (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, ‘হে আবূ বকর। তিনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন?’ আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তবে কেন এখন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে! নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন।’ আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তার তাওয়াফ করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে একথা কি তিনি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘তবে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।’ যুহরী (রহ.) বলেন যে, ‘উমার (রাঃ) বলেছেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফ্ফারা হিসেবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবাদেরকে বললেন, ‘তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল।’ রাবী বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল তিনবার তা বলার পরও কেউ উঠলেন না।’ তাদের কাউকে উঠতে না দেখে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর নিকট এসে লোকদের এই আচরণের কথা বলেন। উম্মু সালামাহ (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।’ সেই অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়ালেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন…….। সহিহ বুখারি : ২৭৩১ বিশাল হাদিসের প্রয়োজনীয় অংশ।

নোট : এই ঘটনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মে সালামা (রাঃ)-এর পরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর মতামতকে কতটা সম্মান করতেন। এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে, যেখানে সাহাবিরাও দ্বিধায় ছিলেন, উম্মে সালামা (রাঃ)-এর বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ সংকট সমাধান করেছিল।

২৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি এতটুকু অভিমান করিনি, যতটুকু খাদীজা (রা)-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা অধিক সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যবেহ করে মাংসের পরিমান বিবেচনায় হাড়-মাংসকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদিজা (রাঃ) এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোন সময় অভিমানের সুরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতাম, (আপনার অবস্থা দৃষ্টে) মনে হয়, খাদীজা (রাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন নারী নেই। প্রতি উত্তরে তিনি বলতেন, হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তান জন্মেছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

নোট : মৃত্যুর পরও খাদীজা (রা)-এর প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত ছিল।

২৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর কষ্টের সময় সান্তনা দিতেন

আয়িশা (রাঃ) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো জানাযা পড়ে বাকী’ (গোরস্থান) থেকে আমার নিকট এলেন। তখন আমার মাথায় ছিল যন্ত্রণা। আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা গেল! তিনি বললেন, বরং আমার মাথাও গেল! (হে আয়েশা!) তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও এবং আমি তোমাকে গোসল দিই, কাফনাই, অতঃপর তোমার উপর জানাযা পড়ে তোমাকে দাফন করি, তাহলে এতে তোমার নোকসান আছে কি? ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, ইবনে হিব্বান : ৬৫৮৬, দারাকুত্বনী : ১৯২, বাইহাক্বী : ৬৯০৪, ইরওয়াহ : ৭০০

ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলকে সামনে রেখে নির্ধারিত। পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ (contraception) বিষয়টিও মুসলিম সমাজে আলোচ্য হয়ে থাকে। অনেকেই এ ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা না জানার কারণে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তাই আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী আমরা তিনটি অংশে বিষয়টি ব্যাখ্যা করব।

১. ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম সন্তান জন্মদানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহা নিয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন-

لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنْ یَّشَآءُ  اِنَاثًا وَّ یَهَبُ  لِمَنْ  یَّشَآءُ   الذُّکُوْرَ ﴿ۙ۴۹﴾اَوْ یُزَوِّجُهُمْ ذُکْرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجْعَلُ مَنْ  یَّشَآءُ  عَقِیْمًا ؕ اِنَّہٗ  عَلِیْمٌ  قَدِیْرٌ ﴿۵۰﴾

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। সুরা আশ-শূরা : ৪৯-৫০

এ থেকে বোঝা যায়, সন্তান দান বা না দান করা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে।

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আযলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রত্যেক পানিতে সন্তান জন্ম হয় না। আর আল্লাহ তা’আলা যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন কোনো কিছুই তা প্রতিরাধ করার ক্ষমতা রাখে না। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৮, মিশকাত : ৩১৮৭, আহমাদ : ১১৪৬২, সহীহ আল জামি : ৩১০।

সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি স্ত্রীসহবাসের সময় ’আযল করি। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এটা কর? উত্তরে সে বলল, আমি তার সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় এটা করি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এতে যদি কোনো প্রকার ক্ষতি হতো তাহলে পারস্যবাসী (ইরান) ও রোমকগণও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সহিহ মুসলিম : ১৪৪৩, মিশকাত : ৩১৮৮, আহমাদ : ২১৭৭০

উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং অধিক সন্তান দানকারিনী নারীকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, মিশকাত : ৩০৯৭, সুনানে নাসায়ি : ৫৩৭৯

তবে ইসলামে মানুষকে কিছু বিষয়ে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন—চিকিৎসা গ্রহণ করা, খাদ্য গ্রহণ করা, নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি। এর ভিত্তিতে আলেমগণ বলেন, সন্তান জন্মদানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বা বিরতি নেওয়ার অনুমতি শরীয়তে কিছু শর্তসাপেক্ষে বৈধ হতে পারে।

কিন্তু স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট করা (যেমন—স্টেরিলাইজেশন, নর-নারীর প্রজনন অঙ্গ কেটে ফেলা বা স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ করা) সাধারণ অবস্থায় হারাম। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন এবং বংশধারা বন্ধ করে দেওয়ার সমান, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

২. আজল ও জন্মনিয়ন্ত্রণ

“আজল” (العزل) অর্থ হলো সহবাসের সময় বীর্যপাতের আগে পুরুষাঙ্গ বের করে নেওয়া, যাতে বীর্য স্ত্রীর গর্ভে না পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম নবিজির ﷺ যুগে এ কাজ করতেন।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’আযল করতাম। সে সময় কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল। সহিহ বুখারি : ৫২০৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৪০

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী মুসত্বালিক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম এবং এ যুদ্ধে আমরা অনেক ’আরাবীয় নারী বন্দীনীরূপে করায়ত্ত করি। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন নারীবিহীন থাকায় অস্বস্থিবোধ করছিলাম, ফলে আমরা নারী সঙ্গমের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমরা ’আযল করা পছন্দ করলাম এবং আমরা পরস্পরের মধ্যে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে সমুপস্থিত থাকতে তাঁকে জিজ্ঞেস না করে এরূপ করা কি ঠিক হবে? অতঃপর আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা ’আযল করবে না এমনটি নয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত (সৃষ্টিজীব পৃথিবীতে) যা হওয়ার আছে, তা অবশ্যই সৃষ্টি হবে। সহিহ বুখারী : ৪১৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৭২, মিশকাত : ৩১৮৬, আহমাদ : ১১৬৪৭।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, আজল মুলত সন্তান জন্মদানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি ছিল, যা নবিজি ﷺ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেননি। তবে তিনি এটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা শতভাগ কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেননি।

আজলের সাথে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির একটি মৌলিক মিল রয়েছে—দুটিই গর্ভধারণ ঠেকানোর প্রচেষ্টা। পার্থক্য হলো, আজল কেবল স্বাভাবিক যৌন মিলনের সময়কার একটি সাময়িক কৌশল, আর আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ নানা রকম হতে পারে—গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট, ইনজেকশন, কন্ডম, কপার-টি, ইত্যাদি।

আযল ও জন্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে পার্থক্য :

বৈশিষ্ট্যআযল (ঐতিহ্যবাহী কৌশল)আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
পদ্ধতিসহবাসের সময় পুরুষাঙ্গ বাইরে বের করে বীর্যপাত করা।কনডম, পিল, ইনজেকশন, আইইউডি (IUD), স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ ইত্যাদি।
কার্যকারিতাকম কার্যকর, গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা থাকে।তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।
শরয়ী বিধানশর্ত সাপেক্ষে জায়েজ (স্বামীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন)।সাময়িক ব্যবস্থা শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ; স্থায়ী ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তবে জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে বৈধ।
রাসূল (সাঃ)-এর যুগেপ্রচলিত ছিল এবং রাসূল (সাঃ) সরাসরি নিষেধ করেননি।প্রচলিত ছিল না।

অতএব, বলা যায় আজলও এক ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ, তবে এটি প্রাচীন পদ্ধতি। আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ তার বিকল্প ও সম্প্রসারিত রূপ। তবে একটি সহিহ হাদিসে আজল করাকেও হত্যা বলা হয়েছে।

জুযামাহ্ বিনতু ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কিছু সংখ্যক লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলছিলেন যে, আমি ’গীলাহ’ (স্তন্যদায়িনী নারীর সাথে সহবাস করা।) হতে নিষেধ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম; কিন্তু যখন পারস্য (ইরান) এবং রোমবাসীদের ব্যাপারে জানতে পারলাম যে, তারা (সন্তানের আশঙ্কায়) গীলাহ্ করে অথচ এটা তাদের কোনো প্রকার ক্ষতির কারণ নেই। অতঃপর লোকেরা তাঁকে ’আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা পরোক্ষভাবে জীবন্ত কন্যা পুঁতে দেয়া (সমাধিস্থ করা), যে সম্পর্কে কুরআন মাজীদের আয়াত আছে- ’’যখন জীবন্ত পুঁতে দেয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’’ সূরা তাকভীর  ৮-৯। সহিহ মুসলিম : ১৪৪২, আবূ দাঊদ : ৩৮৮২, নাসায়ী : ৩৩২৬, তিরমিযী : ২০৭৭, মিশকাত : ৩১৮৯, আহমাদ : ২৭০৩৪, দারিমী : ২৬৬৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪১৯৬, সহীহ আল জামি : ৫১৪৫।

আলেমগণ এ হাদিস ও জাবির (রাঃ) এর হাদিস দুটি সমন্বয় করে বলেন যে, যদিও রাসূল (সাঃ) আযলকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেননি, তবে তিনি এটিকে উৎসাহিতও করেননি; বরং সতর্ক করেছেন। তাঁর এই সতর্কবাণী থেকে বোঝা যায়, আযল মূলত মাকরুহ (অনুত্তম), তবে কিছু বৈধ কারণে স্ত্রী ও স্বামীর পারস্পরিক সম্মতিতে এটি সাময়িকভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩. ইসলামের দৃষ্টিতে কখন জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয আর কখন নাজায়েয?

জায়েয হওয়ার শর্ত

ইসলামী ফিকহের আলোকে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে বৈধ বলে গণ্য হয়। নিম্নলিখিত শর্ত ও উদ্দেশ্যে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েয বা বৈধ:

ক. মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে:

যদি মা শারীরিকভাবে দুর্বল হন অথবা অসুস্থতার কারণে গর্ভধারণ করলে তার স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতি বা জীবননাশের আশঙ্কা থাকে।

দলিল: রাসূল (সাঃ)-এর যুগে দাসীর গর্ভধারণে স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা একটি বৈধ কারণ ছিল (যা আধুনিক যুগে স্ত্রীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। এছাড়া ইসলামে ক্ষতিকর বিষয় এড়িয়ে চলার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেন,

“আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর তোমাদের দ্বীনে কোনো ক্ষতিকর বিষয় রাখেননি।” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)

খ. দুই সন্তানের মাঝে ব্যবধানের জন্য (Spacing):

যদি সদ্য ভূমিষ্ঠ দুগ্ধপোষ্য সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বা মায়ের যত্নের সুবিধার জন্য এক বা দুই বছর সন্তানদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিরতি (ব্যবধান) রাখার উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে তা জায়েয। তবে এর উদ্দেশ্য হবে পরিকল্পনা, সন্তান সীমিত করা নয়।

দলিল: সাহাবিরা আযল করতেন স্তন্যদানকারী শিশুর (غيلة) ক্ষতি এড়ানোর জন্য। যদিও পরে রাসূল (সাঃ) জানান যে এতে সামান্যই ক্ষতি হয়, তবে সাময়িক বিরতির ধারণাটি এতে প্রতিফলিত হয়।

গ. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে:

সাময়িক পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকা আবশ্যক। আযল বা অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করার সময় স্ত্রীর অনুমতি জরুরি। (ইবনু কুদামা, আল-মুগনি)

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি দাসী আছে, আমি তার সাথে ’আযল’ করে থাকি। আমি তার গর্ভবতী হওয়া পছন্দ করি না। আর আমি তাই (সঙ্গম) ইচ্ছা রাখি যা অন্যান্য পুরুষেরা (দাসীর সাথে) ইচ্ছা রাখে। ইয়াহুদীরা বলে থাকে, ’আযল’ নাকি গোপন হত্যা। তার কথা শুনে তিনি বললেনঃ ইয়াহুদীরা মিথ্যা বলেছে। যদি মহান আল্লাহ কোনো প্রাণীকে সৃষ্টি করা নির্ধারিত করেন তবে তা রোধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৭১

অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয নয়।

ঘ. স্থায়ীভাবে বংশধারা বন্ধ না করা

জন্মনিয়ন্ত্রণ সাময়িক হলে অনুমোদিত, কিন্তু স্থায়ীভাবে বন্ধ করা শরীয়তে নাজায়েয, বিশেষ কোনো চরম চিকিৎসাগত কারণে ছাড়া।

নাজায়েয বা হারাম হওয়ার কারণ

ক. আল্লাহর রিজিক নিয়ে সন্দেহ করা

ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অধিক সন্তান লাভে উৎসাহিত করা এবং আল্লাহ্‌র দেওয়া রিযিকের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা। জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে এই মৌলিক নীতির লঙ্ঘন হয় বলে আলেমরা সাধারণত একে নিরুৎসাহিত করেন। রিযিকের মালিক আল্লাহ্‌: ইসলাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি সন্তানের রিযিক (জীবিকা) আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিত। দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানকে হত্যা করা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُہُمۡ وَاِیَّاکُمۡ ؕ اِنَّ قَتۡلَہُمۡ کَانَ خِطۡاً کَبِیۡرًا

অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিয্ক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। সুরা আল-ইসরা : ৩১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দারিদ্র্যের ভয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা বা সন্তান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা হারাম বা মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি আল্লাহ্‌র রিযিকের ওয়াদার উপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে।

খ. স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদান বন্ধ করা

আল্লাহ্‌র সৃষ্টিতে পরিবর্তন: স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন- টিউবেকটমি বা ভ্যাসেকটমি) গ্রহণ করাকে কিছু আলেম আল্লাহ্‌র সৃষ্টি কাঠামোতে পরিবর্তন (তাগয়ীরুল খালক) হিসেবে গণ্য করেছেন, যা শয়তানের কাজ বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

وَّلَاُضِلَّنَّہُمۡ وَلَاُمَنِّیَنَّہُمۡ وَلَاٰمُرَنَّہُمۡ فَلَیُبَتِّکُنَّ اٰذَانَ الۡاَنۡعَامِ وَلَاٰمُرَنَّہُمۡ فَلَیُغَیِّرُنَّ خَلۡقَ اللّٰہِ ؕ  وَمَنۡ یَّتَّخِذِ الشَّیۡطٰنَ وَلِیًّا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ فَقَدۡ خَسِرَ خُسۡرَانًا مُّبِیۡنًا ؕ

‘আর অবশ্যই আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, মিথ্যা আশ্বাস দেব এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ দেব, ফলে তারা পশুর কান ছিদ্র করবে এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ করব, ফলে অবশ্যই তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবে’। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা তো স্পষ্টই ক্ষতিগ্রস্ত হল। সূরা নিসা : ১১৯

স্থায়ী বন্ধ্যাকরণকে অনেক আলেম এই পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, তবে কিছু আলেম বিশেষ স্বাস্থ্যগত কারণে এটিকে বৈধ বলেছেন। যেমন—বন্ধ্যাকরণ (Sterilization), টিউব কেটে ফেলা ইত্যাদি। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিতে স্থায়ী পরিবর্তন এবং মানবজাতির বংশধারা কেটে দেওয়া।

গ. স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ

ইসলাম দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ঘ. কোনো হারাম বা ক্ষতিকর উপায়ে গর্ভনিরোধ

যদি পদ্ধতিটি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয় অথবা শরীয়তবিরোধী হয়, তবে তা হারাম গণ্য হবে।

উপসংহার : ইসলামে সন্তান দান বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মূলনীতি হলো ভারসাম্য। সন্তান আল্লাহর নিয়ামত, তাই কেবল দারিদ্র্য বা ভোগবাদী কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে বৈধ কারণ,  স্ত্রীর স্বাস্থ্য, সন্তান পালনে সময় প্রয়োজন, কিংবা চিকিৎসাগত ঝুঁকি থাকলে—সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুমতি রয়েছে। আজল ছিল সাহাবাদের যুগের জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি, যা নবিজি ﷺ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেননি। তাই আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণও একইভাবে কিছু শর্তসাপেক্ষে জায়েয।  কিন্তু স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ, আল্লাহর রিজিক নিয়ে সন্দেহ, অথবা হারাম উপায়ে গর্ভনিরোধ ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না।

কবর বা বারযখী জীবন : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

প্রত্যেক প্রাণীর জন্য মৃত্যু অবধারিত। এই মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিই অমর নয়। জন্ম হয়েছে যার, মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবেই। এটি এমন এক অমোঘ বিধান, যা থেকে কেউ পালাতে পারবে না, তা সে যত শক্তিশালী, ধনী বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন। এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি অতি আসক্ত না হতে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেন। সকলকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে: মৃত্যুর পর জীবন শেষ হয়ে যায় না, বরং তা নতুন এক জীবনের দিকে যাত্রা। মৃত্যুর পর সকলকেই মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে প্রতিটি কর্মের হিসাব নেওয়া হবে। এটি পুনরুত্থান এবং বিচার দিবসের প্রতি ইঙ্গিত। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবনে যা কিছু করা হয়, তার সবকিছুর জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

کُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَۃُ الْمَوْتِ ۟ ثُمَّ اِلَیْنَا تُرْجَعُوْنَ

অর্থ : প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। সুনা আনকাবুত : ৫৭

মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর উর্দ্ধে নন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّکَ مَیِّتٌ وَّاِنَّہُمْ مَّیِّتُوْنَ ۫

অর্থ : নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। সুরা জুমার : ৩০

কাফেররা মুহম্মদসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবিদ্রূপ করতো যে তিনি যদি সত্য নবী হন তবে মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করবে না। এরই প্রেক্ষিতে উক্ত আয়াত নাজেল হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبْلِكَ ٱلْخُلْدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلْخَـٰلِدُونَ–. كُلُّ نَفْسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلْمَوْتِ‌ۗ وَنَبْلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلْخَيْرِ فِتْنَةً۬‌ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ

অর্থ : আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে? প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫

জম্মিলে মৃত্যু আছে, একথাটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য সে মানব শিশু হোক বা অন্য কিছু। যে দিন সে পৃথিবীতে জন্ম লাভ করে, তার পরের দিন থেকেই শুরু হয় তার মৃত্যুর দিকে পথযাত্রা। প্রতিটি জীবন মানেই মৃত্যু। নবী রসুলেরাও এর ব্যতিক্রম নয়। এর উর্দ্ধে নয় কোন অলী আওলিয়া বা কোন পূণ্যাত্মা মানুষ। পাপী ও পূণ্যাত্মা সকলেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে। জীবনের তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রত্যেক মানুষ এ তিনটি স্তর অতিক্রম করতে হবে।

ক. ইহকালীন জীবন

খ. বারযাখী জীবন

গ. পরকালীন জীবন বা চিরস্থায়ী জীবন, যার কোনো শেষ নেই।

ক. ইহকালীন জীবন (দুনিয়ার জীবন)

এটি আমাদের বর্তমান জীবন, যা আমরা এখন যাপন করছি। কুরআন ও সুন্নাহতে এই জীবনকে অস্থায়ী এবং পরীক্ষার স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِیْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَیٰوۃَ لِیَبْلُوَکُمْ اَیُّکُمْ اَحْسَنُ عَمَلًا ؕ  وَہُوَ الْعَزِیْزُ الْغَفُوْرُ ۙ

যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। সুরা মুলক : ২

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম।” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:২)।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষা। আয়াতে প্রথমেই “মৃত্যু” শব্দটি এসেছে, এরপর “জীবন” এতে আল্লাহর কুদরত ও পরিকল্পনার এক বিশেষ দিক রয়েছে। অনেক মুফাসসির বলেন, এখানে মৃত্যু আগে আনা হয়েছে, কারণ মানুষ দুনিয়াতে আসার আগেও একপ্রকার মৃত্যু বা অপ্রকাশিত অবস্থা ছিল। তারপর সে জন্মগ্রহণ করে। আবার মৃত্যুর পর আবার এক অনন্ত জীবন শুরু হবে। আল্লাহ মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন “পরীক্ষা করার জন্য”, এই দুনিয়া আসলে একটি ইমতিহানের ঘর। আমাদের কর্ম, চিন্তা, নিয়ত ও আচরণ এসবের মাধ্যমেই যাচাই হবে আমরা কতটুকু উত্তম বান্দা।

আল্লাহ দুনিয়ার জীবনকে ক্ষণস্থায়ী উপমা দিয়ে বলেছেন-

اِعْلَمُوْۤا اَنَّمَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَا لَعِبٌ وَّلَہْوٌ وَّزِیْنَۃٌ وَّتَفَاخُرٌۢ بَیْنَکُمْ وَتَکَاثُرٌ فِی الْاَمْوَالِ وَالْاَوْلَادِ ؕ کَمَثَلِ غَیْثٍ اَعْجَبَ الْکُفَّارَ نَبَاتُہٗ ثُمَّ یَہِیْجُ فَتَرٰىہُ مُصْفَرًّا ثُمَّ یَکُوْنُ حُطَامًا ؕ وَفِی الْاٰخِرَۃِ عَذَابٌ شَدِیْدٌ ۙ وَّمَغْفِرَۃٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرِضْوَانٌ ؕ وَمَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ

তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। সুরা হাদিদ : ২০

আমাদের পরকালের প্রস্তুতি নিতে হবে। এই জীবনে আমরা যে আমল করি, তাই আমাদের পরকালের পাথেয়। আবূ ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মন্য সেই ব্যক্তি যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৬০, সুনানে তিরমিযী : ২৪৫৯, মিশকাত : ৫২৮৯

খ. বারযাখী জীবন বা কবরের জীবন

মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সময়ের জীবনকে বারযাখী জীবন বলা হয়। এটি ইহকাল ও পরকালের মধ্যবর্তী একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَعَلِّیْۤ اَعْمَلُ صَالِحًا فِیْمَا تَرَکْتُ کَلَّا ؕ اِنَّہَا کَلِمَۃٌ ہُوَ قَآئِلُہَا ؕ وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ

যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সুরা মুমিনুন : ১০০

গ. পরকালীন জীবন :

এটি জীবনের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়, যার কোনো শেষ নেই। কিয়ামত বা পুনরুত্থানের পর এই জীবনের শুরু হবে। এই জীবনের শুরু হয় ইসরাফিলের শিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে। তখন সকল মৃত মানুষ জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে একত্রিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ

যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও এবং মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী। সূরা ইব্রাহিম : ৪৮

কিয়ামতের দিন সকলে একত্র হয়ে আল্লাহ সামনে সবাই যার যার হিসাব-নিকাশ দিবে। এ দিনকে বিচার দিবসও বলা হয়। এ দিন সকল মানুষকে তাদের ইহকালীন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلْیَوْمَ تُجْزٰی کُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا کَسَبَتْ ؕ لَا ظُلْمَ الْیَوْمَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ

আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জন অনুসারে প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কোন যুল্ম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী। সূরা গাফির  :১৭

চূড়ান্ত বিচারের পর মুমিনদের ঠিকানা হবে জান্নাত এবং কাফির ও পাপীদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এই জীবন চিরস্থায়ী। জান্নাতের সুখ-শান্তি এবং জাহান্নামের কষ্ট কখনোই শেষ হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَہُمْ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِہَا الْاَنْہٰرُ ۬ؕؑ  ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْکَبِیْرُ ؕ

যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের বাগানসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। এটাই মহা সফলতা।” সূরা আল-বুরুজ : ১১

আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম সম্পর্কে বলেছেন-

وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَہُمْ نَارُ جَہَنَّمَ ۚ  لَا یُقْضٰی عَلَیْہِمْ فَیَمُوْتُوْا وَلَا یُخَفَّفُ عَنْہُمْ مِّنْ عَذَابِہَا ؕ  کَذٰلِکَ نَجْزِیْ کُلَّ کَفُوْرٍ ۚ

আর যারা কুফরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোন ফয়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে, এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। সূরা ফাতির : ৩৬

এই তিনটি পর্যায় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। ইহকালীন জীবন হলো বারযাখী ও পরকালীন জীবনের সেতু। যে ব্যক্তি ইহকালে ভালোভাবে জীবন যাপন করবে, সে বারযাখ ও পরকালে সফলতা লাভ করবে।

মানুষ জীবনের ও তিনটি পর্যায় আমাদের আলোচ্য বিষয় শেষ দুটি অর্থাৎ বারজখ ও পরকালের জীবন।

বারযাখী জীবন

বারযাখী জীবন (الحياةُ البَرزَخِيَّةُ ) :

মানুষের জীবনচক্র তিনটি মূল স্তরে বিভক্ত- দুনিয়ার জীবন, বারযাখী জীবন, এবং আখিরাতের জীবন। এর মধ্যে “বারযাখী জীবন” সবচেয়ে রহস্যময় ও অদৃশ্য জগৎ। দুনিয়ার জীবন ও কিয়ামতের পরের স্থায়ী জীবনের মাঝে একটি অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা হলো বারযাখ—যেখানে প্রতিটি মানুষের আত্মা তার মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করবে। এটি কুরআন ও সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

বারযাখ (بَرْزَخٌ)  একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো- “আড়াল”, “প্রাচীর” বা “দ্ব্যর্থবোধক সীমারেখা”, যা দুটি ভিন্ন বাস্তবতার মাঝখানে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ

যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সুরা মুমিনুন : ১০০

এই আয়াতের আলোকে স্পষ্ট হয়, মৃত্যুর পর মানব আত্মা একটি অন্তরালের মধ্যে প্রবেশ করে, যেটি বারযাখ নামে পরিচিত। বারযাখী জীবন সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অবগত নই, কারণ এটি গায়েব বা অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত। তবে হাদীসের আলোকে কিছু বিষয় জানা যায় যার মাধ্যমে বুঝা যায় কবরের জীবনই বারযাখী জীবনের এক অংশ। বারযাখী জীবন হলো দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে এক গায়েবি জগত, যা দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পরই শুরু হয়। এটি যেমন মুমিনদের জন্য আরামদায়ক ও প্রশান্তিময় একটি আবাস, তেমনি গাফেল ও কুফরকারীদের জন্য ভয়াবহ এক শাস্তির জায়গা। মৃত্যুর পর কবরের আজাব বা শান্তি, প্রশ্ন-উত্তর, ফেরেশতা মুনকার-নাকীর আগমন—এসবই বারযাখী জীবনের অঙ্গ।

১. বারযখী জীবনের শুরুতে সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর আর তাওবা কবুল কবে না

মূলত মৃত্যুর পরই বারযাখী জীবন শুরু হয়। তাই আমরা এ পর্যায়ে মৃত্যু থেকে পুণরুত্থন পর্যন্ত দীর্ঘ বারযাখী জীবন (الحياةُ البَرزَخِيَّةُ) এর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরব।  কুরআন ও সহিহ হাদিসে বরজখি জীবনের কিছু সুখ ও তার শাস্তির বর্ণিত হয়েছে। এ জীবনের শুধুতে যখন মৃত্যু উপস্থিত হবে, তখন মানুষের চোখ খুলে যাবে। সে তখন ভালো কাজ সম্পাদন করার জন্য আরো সময় কামনা করবে। কিন্তু তাকে আর সময় দেওয়া হবে না। মৃত্যুর সময় এ ধরনের প্রার্থনা অনর্থক। এতে কোনো ফল বয়ে আনে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حَتّٰۤی اِذَا جَآءَ اَحَدَہُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ ۙ لَعَلِّیْۤ اَعْمَلُ صَالِحًا فِیْمَا تَرَکْتُ کَلَّا ؕ اِنَّہَا کَلِمَۃٌ ہُوَ قَآئِلُہَا ؕ وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ

অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, ‘হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান, যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সূরা মুমিনূন : ৯৯-১০০

পবিত্র কুরআনের ফেরাউনের ঈমান আনার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যখন ফেরাউন ও তার সৈন্য বাহিনীকে ডুবিয়ে মারার জন্য আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর আজাব নাজিল করেন, তখন ফেরাউন বুঝতে পারে যে, তার সামনে সত্য উন্মোচিত হয়েছে। সেই মুহূর্তে সে বলেছিল, তার সামনে যখন সত্য উন্মোচিত হয় তখন সে আল্লাহ উপর ঈমান এনেছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ঈমান গ্রহন করেন নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَجٰوَزْنَا بِبَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ الْبَحْرَ فَاَتْبَعَہُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُوْدُہٗ بَغْیًا وَّعَدْوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَدْرَکَہُ الْغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا الَّذِیْۤ اٰمَنَتْ بِہٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِیْلَ وَاَنَا مِنَ الْمُسْلِمِیْن آٰلْـٰٔنَ وَقَدْ عَصَیْتَ قَبْلُ وَکُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِیْنَ

আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। এখন ঈমান আনছ? অথচ পূর্ব (মুহুর্ত) পর্যন্ত তুমি নাফরমানী করছিলে এবং বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। সুরা ইউনুস : ৯০-৯০

২. মৃত্যুর যন্ত্রনার মাধ্যমে বারযখী জীবন শুরু হয়

বারযখী জীবন শুরুতে বান্দার রূহ কবজ করে তার মৃত ঘটান হয়। এ রূহ কবজের সময় বান্দা যন্ত্রনা অনুভব করে যাকে মৃত্যু যন্ত্রনা বলা হয়। এ মৃত্যুর যন্ত্রনা সকল বন্দাকেই ভোগ করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَجَآءَتْ سَکْرَۃُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ؕ ذٰلِکَ مَا کُنْتَ مِنْہُ تَحِیْدُ

মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই আসবে। যা থেকে তুমি পলায়ন করতে চাইতে। সুরা কাফ : ১৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 وَلَوْ تَرٰۤی اِذِ الظّٰلِمُوْنَ فِیْ غَمَرٰتِ الْمَوْتِ وَالْمَلٰٓئِکَۃُ بَاسِطُوْۤا اَیْدِیْہِمْ ۚ اَخْرِجُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ اَلْیَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْہُوْنِ بِمَا کُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ عَلَی اللّٰہِ غَیْرَ الْحَقِّ وَکُنْتُمْ عَنْ اٰیٰتِہٖ تَسْتَکْبِرُوْنَ

আর যদি তুমি দেখতে, যখন যালিমরা মৃত্যু কষ্টে থাকে, এমতাবস্থায় ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে আছে (তারা বলে), ‘তোমাদের জান বের কর। আজ তোমাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে লাঞ্ছনার আযাব, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তোমরা তার আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহঙ্কার করতে। সুরা আনাম : ৯৩

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَإِنَّهُ لَبَيْنَ حَاقِنَتِي وَذَاقِنَتِي فَلاَ أَكْرَهُ شِدَّةَ الْمَوْتِ لأَحَدٍ أَبَدًا بَعْدَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏

আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুকালীন সময়ে তার মাথা আমার থুতনি এবং গলদেশের মাঝখানে ছিল। তার মৃত্যু যন্ত্রণা দর্শনের পর আমি অন্য কারো মৃত্যু যন্ত্রণা খারাপ মনে করি না। সুনানে নাসায়ি : ১৮৩৩ ইফ:

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ফাতেমাহ (রাঃ) বললেন, উহ্! আমার পিতার উপর কত কষ্ট! তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আজকের পরে তোমার পিতার উপর আর কোন কষ্ট নেই। যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন তখন ফাতেমাহ (রাঃ) বললেন, হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর বাসস্থান। হায় পিতা! জিবরীল (আঃ)-কে তাঁর ইনতিকালের খবর শুনাই। যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সমাহিত করা হল, তখন ফাতিমাহ (রাঃ) বললেন, হে আনাস! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাটি চাপা দিয়ে আসা তোমরা কীভাবে বরদাশত করলে! সহিহ বুখারি : ৪৪৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬২৯, আহমাদ : ১৬০২৬, সহীহাহ : ১৬৩৮,

প্রতিটি মুসলামের বিশ্বাস মৃতবরণ করার পর তার সামনে কবর, মিজান, হাশর, ফুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম। কিন্তু দুনিয়ার কাজে আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে এসব নিয়ে চিন্তা করার ও সময় কোথায়। মহান আল্লাহ বলেন,

كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَما الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ

প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়। সুরা ইমরান :১৮৫

কাজেই কেউ মারা গেলই তার পরকালের যাত্রা শুরু। তখন মানুষ নিজের জন্য না হলে মৃত্যু ব্যক্তির জন্য আমল শুরু করে যাতে তার পরকালের যাত্রা শান্তিময় হয়ে জান্নাতে যেতে পারে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ও মৃত্যু

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে চামড়ার অথবা (বর্ণনাকারী উমরের সন্দেহ) কাঠের একপাত্রে কিছু পানি রাখা ছিল। তিনি তাঁর হাত ঐ পানির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন। এরপর নিজ চেহারা দু’ হাত দ্বারা মাসহ(মাসেহ) করতেন আর বলতেন ’লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ঃ নিশ্চয়ই মৃত্যুর অনেক যন্ত্রণা। এরপর দু’হাত তুলে বলতে লাগলেনঃ হে আল্লাহ্! উচ্চ মর্যাদা সম্পন্নদের সঙ্গে করে দেন। এ অবস্থাতেই তার (জান) কবয করা হলো। আর তাঁর হাত দু’টো এলিয়ে পড়ল। সহিহ বুখারি : ৬৫১০

মৃত্যুর পরে মাইয়াত কিবলা মুখি করা হবে

মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করা একটি মুস্তাহাব আমল বিধায় না করলেও সমস্যা নেই। কিন্তু সময় ও সুযোগ থাকলে মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করে দেয়া ভাল। তবে বাড়াবাড়ি অপছন্দনীয় কাজ।

উমাইর (রা.) সূত্রে বর্ণিত। যিনি সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোনগুলি কবীরাহ গুনাহ? তিনি বললেন, এর সংখ্যা নয়টি। অতঃপর উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত। এতে আরো রয়েছে, মুসলিম পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়া এবং তোমাদের জীবন-মরণের কিবলাহ কা’বা ঘরের চত্বরে নিষিদ্ধ কাজকে হালাল গণ্য করা। সুনানে আবু দাউদ : ২৮৭৫

এই হাদিসে আমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবল হিসাবে বাইতুল্লাহকে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই অনেক আলেম মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তবে মাইয়াতকে কেবলা মুখি করা সুন্নাহ। মাইয়াতকে ডান কাতে শোয়ানোর কোন স্পষ্ট কোন দলীল নাই তবে জীবিত মানুষের ডানকাতে ঘুমানোর সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও সহহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সম্ভবত, এই সহিহ হাদিসের উপর ভিত্তি করেই বিদ্বানগণ মাইয়েতকে ডান কাতে শোয়ানোকে উত্তম বলেছেন। আল-মুহাল্লা, তৃতীয় খণ্ড, পৃ-৪০৪, মাসআলা : ৬১৫

৩. মাইয়াতের গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফনের ব্যবস্থা করা

কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে চারটি কাজ দ্রুততার সাথে সম্পাদন জরুরি। মাইয়াতকে সামনে নিয়ে বেশী সময় অপেক্ষা করা সুন্নাহ বিরোধী। খুবই দ্রুততার সাথে নিম্নের চারটি কাজ সমাধা করতে হবে।

(১) মাইয়াতকে গোসল করান

(২) কাফনের কাপড় পরিধান করান

(৩) জানাযা সালাতের ব্যবস্থা করা

(৪) দাফনের ব্যবস্থা করা

(১) মাইয়াতকে গোসল করান-

সহিহ হাদিসের আলোকে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা যায়নাব (রা.) এর গোসলের বিবরণ-

উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা (যায়নাবকে) গোসল করাচ্ছিলাম। এ সময় তিনি আমাদের কাছে এলেন। তিনি বললেন, তোমরা তিনবার, পাঁচবার, প্রয়োজন বোধ করলে এর চেয়ে বেশী বার। পানি ও বরই পাতা দিয়ে তাকে গোসল দাও। আর শেষ বার দিকে ’কাফুর’। অথবা বলেছেন, কাফূরের কিছু অংশ পানিতে ঢেলে দিবে, গোসল করাবার পর আমাকে খবর দিবে। তাঁকে গোসল করাবার পর আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে খবর দিলাম। তিনি এসে তহবন্দ বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, এ তহবন্দটি তাঁর শরীরের সাথে লাগিয়ে দাও। আর এক বর্ণনার ভাষা হলো, তাকে বেজোড় তিন অথবা পাঁচ অথবা সাতবার (পানি ঢেলে) গোসল দাও। আর গোসল ডানদিক থেকে আজুর জায়গাগুলো দিয়ে শুরু করবে। তিনি (উম্মু আতিয়াহ) বলেন, আমরা তার চুলকে তিনটি বেনী বানিয়ে পেছনের দিকে ছেড়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ১২৫৩, ১২৫৪, ১২৫৮, ১২৬৩, সহিহ মুসলিম : ৯৩৯, মিশকাত : ১৬৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩১৪২, সুনানে তিরমিযী : ৯৯০, সুনানে নাসায়ী : ১৮৮১, ১৮৮৬, ইবনু মাজাহ : ১৪৫৮

এছাড়াও মাইয়াতের গোসল করানোর সময় নিম্নের বিধানগুলি অনুসরণ করতে হবে-

ক। মাইয়াতের গোসল ডান দিক ও অজুর অঙ্গ হতে আরম্ভ করা

উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ তাঁর মেয়ে (জয়নাব (রা.)  কে গোসল করানোর সময় তাঁদের বলেছিলেন, তোমরা তার ডান দিক হতে এবং অজুর অঙ্গ হতে আরম্ভ কর। সহিহ বুখারি : ১৬৭

খ। মহিলার চুল তিনটি বেনী করে তার পিছন দিকে রাখা :

উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ এর কন্যাগণের একজনের ইন্তিকাল হলে তিনি ﷺ আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা তাকে বরই পাতার পানি দিয়ে বিজোড় সংখ্যক তিনবার, পাঁচবার অথবা প্রয়োজনবোধ করলে আরও অধিকবার গোসল দাও। শেষবারে কর্পূর অথবা তিনি বলেছিলেন কিছু কর্পূর ব্যবহার করবে। তোমরা গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর ﷺ চাদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন, আমরা তাঁর মাথার চুলগুলো তিনটি বেনী করে পিছনের দিকে ছেড়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ১২৬৩

গ। মাইয়াতের কোন গোপনীয় বিষয় গোচরীভূত হলে তা প্রকার করা যাবে না

আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا وَكَفَّنَهُ وَحَنَّطَهُ وَحَمَلَهُ وَصَلَّى عَلَيْهِ وَلَمْ يُفْشِ عَلَيْهِ مَا رَأَى خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

অর্থ : যে ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলো, কাফন পরালো, সুগন্ধি মাখল, বহন করে নিয়ে গেলো, তার জানাজার সালাত পড়লো এবং তার গোচরীভূত হওয়া তার গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করলো না, তার থেকে তার গুনাহসমূহ তার জন্মদিনের মত বের হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬২ মান জঈফ।

ঘ। স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে বিনা দ্বিধায় গোসল দিতে পারবে

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন

رَجَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ الْبَقِيعِ فَوَجَدَنِي وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِي رَأْسِي وَأَنَا أَقُولُ وَا رَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِي فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ

অর্থ : রাসুলুল্লাহ ﷺ বাকি থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বলছিলাম, হে আমার মাথা! তিনি বলেন, হে আয়িশা! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হে আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হতো না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পরাতাম, তোমার জানাজার সালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, দারাকুৎনী : ১৮৩৩

ঙ। মৃতব্যক্তিকে পৃথকভাবে কুলুখ করানোর প্রয়োজন নাই, বরং পানি দ্বারাই সবকিছু করতে হবে।

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি (মহিলাদের) বললেন, তোমরা তোমাদের স্বামীদের পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করার নির্দেশ দাও। আমি (স্ত্রীলোক হিসাবে) তাদের (এ নির্দেশ দিতে) লজ্জাবোধ করছি। কেননা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও পানি দিয়ে ইস্তিনজা করতেন। সুনানে তিরমিজি : ১৯

আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا وَكَفَّنَهُ وَحَنَّطَهُ وَحَمَلَهُ وَصَلَّى عَلَيْهِ وَلَمْ يُفْشِ عَلَيْهِ مَا رَأَى خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

অর্থ : যে ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলো, কাফন পরালো, সুগন্ধি মাখান, বহন করে নিয়ে গেলো, তার জানাজার সালাত পড়লো এবং তার গোচরীভূত হওয়া তার গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করলো না, তার থেকে তার গুনাহসমূহ তার জন্মদিনের মত বের হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬২ মান জঈফ।

(২) কাফরে কাপড় পরিধান করান

ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে তিনটি কাপড়ে কবর দেওয়া হয়। এগুলো ছিল নাজরানের তৈরি। যার একটি ছিল চাদর, একটি লুঙ্গি এবং অপরটি ছিল মৃত্যুশয্যায় তাঁর পরিহিত পোশাক। উসমান ইবনে আবু শাইবার বর্ণনায় রয়েছে। তাকে তিনটি কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল- যার দু’টি চাদর লাল বর্ণের এবং যে জামা পরিহিত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৩ মান যঈফ।

গাকীফ গোত্রের কাফিনের কন্যা লায়লা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা উম্মু কুলসুম (রা.) মারা গেলে যে মহিলা তাকে গোসল দেয় তার সাথে ’আমিও ছিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে (কাফনের জন্য) প্রথমে তহবন্দ, তারপর কামিজ, তারপর ওড়না, তারপর চাদর এবং অন্য একটি কাপড় দিলেন। যা দিয়ে লাশ পেঁচিয়ে দেয়া হলো। লায়লা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কাফনের কাপড়সহ দরজার পাশেই বসা ছিলেন। তিনি সেখান থেকে একটি একটি করে কাপড়গুলো আমাদেরকে প্রদান করেন।  সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৭ মান যঈফ

(৩) জানাযা সালাতের ব্যবস্থা করা

জানাযার সালাতের পদ্ধতি

ক। মাইয়াতকে সামনে রেখে কাতারে সোজা করে জানাযা সালাতের নিয়ত করবে।

খ। ইমাম আল্লাহু আকবার বলে প্রথম তাকবীর দিলে সবাই দু’হাত কাঁধের সমান উঠাবেন। তারপর হাত দুটি বুকের উপর রেখে পড়বেন ‘সুরা ফাতেহা’ পাঠ করা।  অবশ্য হানাফি মাজহাবের আলেমগণ ফাতিহার পরিবর্তে সানা পাঠ করে থাকেন। (বিস্তারিত আলোচনা পরে আছে)

গ। ইমাম সাহেব দ্বিতীয় তাকবীর দিলে নবি ﷺ এর উপর দরুদ পড়বেন। দুরুদে ইব্রাহিম পড়াই উত্তম। সহিহ বুখারি : ৩৩৭০, সহিহ মুসলিম, : ৪০৬। 

দুরুদটি হলো

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

ঘ। অতঃপর ইমাম সাহের তৃতীয় তাকবীর দিবেন। অতঃপর মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করবেন ঐকান্তিকতা ও ইখলাসের সাথে মাইয়াতের জন্য দুআ করবে।

প্রথম দুআ

আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ জানাযার সালাতে এ দুআ করতেনÑ

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا، وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا، وَصَغِيرِنَا وَكَبيرِنَا، وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا. اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ، اللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلاَ تُضِلَّنَا بَعْدَهُ

হে আল্লাহ! আমাদের জীবিতÑমৃত, ছোটÑবড়, পুরুষÑনারী এবং উপস্থিতÑঅনুপস্থিত সকলকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে আপনি যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখেন এবং আমাদের মধ্যে যাকে মৃত্যু দিবেন তাকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দিন। হে আল্লাহ! এর সাওয়াব থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং এর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করবেন না।’ আবু দাঊদ : ৩২০১; তিরমিযী : ১০২৪; নাসায়ি :  ১৯৮৫; ইবন মাজাহ :  ১৪৯৮

দ্বিতীয় দুআ

জুবায়ের ইবনে নুফায়র (রহ.) থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেন) আমি আওফ ইবনে মালিক (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ এক জানাযায় যে দুআ পড়লেন, আমি তার সে দুআ মনে রেখেছি। দুয়ায় তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَاراً خَيْراً مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلاً خَيْراً مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجَاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ [وَعَذَابِ النَّارِ]

হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করে দাও ও তার প্রতি দয়া কর। তাকে নিরাপদে রাখ ও তার ক্রটি মার্জনা কর। তাকে উত্তম সামগ্ৰী দান কর ও তার প্রবেশ পথকে প্রশস্ত করে দাও। তাকে পানি, বরফ ও বৃষ্টি দ্বারা মুছে দাও এবং পাপ থেকে এরূপভাবে পরিষ্কারÑপরিচ্ছন্ন করে দাও যেÑরূপ সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। তাকে তার ঘরকে উত্তম ঘরে পরিণত কর, তার পরিবার থেকে উত্তম পরিবার দান কর, তার স্ত্রীর তুলনায় উত্তম স্ত্রী দান কর। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচাও।

বর্ণনাকারী আওফ ইবনে মালিক বলেন, তার মূল্যবান দুআ শুনে আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগল, আমি যদি সে মৃত ব্যক্তি হতাম। সহিহ মুসলিম : ৯৬৩

তৃতীয় দুআ

ওয়াসিলা ইবনেল আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলিমদের এক ব্যক্তির জানাযার সালাত পড়লেন। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি

হে আল্লাহ! অমুকের পুত্র অমুক তোমার জিম্মায় এবং তোমার নিরাপত্তার বন্ধনে। তুমি তাকে কবরের বিপর্যয় ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো এবং তাকে দয়া করো। কেননা তুমিই কেবল ক্ষমাকারী পরম দয়ালু’’। ইবনে মাজাহ ১৪৯৯, সুনানে আবু দাউদ : ৩২০২, আহমাদ : ১৫৫৮৮ মিশকাত : ১৬৭৭।

আর যদি মৃতব্যক্তি শিশু হয়, তবে বলুন,

 اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطاً، وَسَلَفاً، وَأَجْراً

হে আল্লাহ, আমাদের জন্য তাকে অগ্রগামী প্রতিনিধি, অগ্রিম পুণ্য এবং সওয়াব হিসেবে নির্ধারণ করে দিন।  আব্দুর রায্যাক তার মুসান্নাফে : ৬৫ ৮৮।

ঙ। সর্বশেষ ইমাম সাহেব চতুর্থ তাকবীর দিয়ে ডানে বামে সালাম দিয়ে জানাযার সালাত শেষ করবে।

একটি পর্যালোচনা : জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা না ছানা পড়ত হবে।

জানাযার নামাযে সুরা ফাতিহা পড়ার ব্যাপারটি যদিও মতবিরোধ পূর্ণ। তবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত হল, জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়তে হবে। সহিহ বুখারিতে এসেছে-

ত্বলহাহ্ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আউফ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ

আমি ইবনে আব্বাস (রা.) এর পিছনে জানাযার সালাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সুরা ফাতিহা পাঠ করলেন এবং (সালাত শেষে) বললেন, (আমি সুরা ফাতিহা পাঠ করলাম) যাতে লোকেরা জানতে পারে যে, এটা সুন্নাত। সহিহ বুখারি : ১৩৩৫

প্রখ্যাত সাহাবী উবাদা বিন সামেত (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-

لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ.

যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করবে না তার সালাত হবে না। সহিহ বুখারি ৭৫৬, সহিহ মুসলিম : ৩৯৪, আহমাদ : ২২৮০৭

আর জানাযার সালাত একটি সালাত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَىَ قَبْرِهِ

আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও সালাত পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। সুরা তাওবা : ৮৪

আল্লাহ তায়ালা এখানে জানাযার সালাতকেও সালাত বলে উল্লেখ করেছেন। তাই ইমাম হোক আর মুসল্লী হোক। আস্ত হোক আর জোরে হোক ফাতিহা তো পড়তেই হবে।

যারা বলেন ফাতিহা পড়তে হবে না তাদের দলিল

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কোনো মাইয়াতের জানাযার নামাজ পড়তেন তখন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করতেন তারপর নবি কারীম ﷺ এর উপর দরুদ পড়তেন অতঃপর দুআ করতেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৪৯৪

নাফে রাহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. জানাযার নামাযে (কুরআন) পড়তেন না। মুয়াত্তা মালিক – : ৫২৩, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৫২২, এই আছরটি বিশুদ্ধতম সনদে বর্ণিত।

আবু সাঈদ মাকবুরী থেকে বর্ণিত। তিনি আবু হুরায়রা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কিভাবে জানাযার সালাত পড়েন?  আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি তোমাকে বলব। আমি মাইয়াতের (ঘর থেকে) পরিবারের সাথে রয়েছি। অতঃপর যখন মাইয়াতকে রাখা হয় আমি তাকবীর পড়ি এবং আল্লাহর প্রশংসা করি। তারপর নবির উপর দরুদ পড়ি। অতঃপর দুআ করি। মুয়াত্তা মালেক ৫২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৬৪২৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৪৯৫,

এই সকল হাদিসের আলোক তারা দাবি করেন জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া জরুরি নয়। তাদের অনেক বিশ্লেষন ধর্মী লেখা পড়েছি, তারা কোথাও কোন হাদিসের রেফারেন্স দিতে পাবেনী যে, জানাযার সালাতে ছানা পড়তে হবে। কিন্তু তাদের প্রতিটি হাদিস জানাযা সালাতে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ জানাযার সালাতে ছানা দিয়া শুরু করতে হবে। ফিকহি ক্ষেত্র সাহাবিদের যুগ থেকেই মতভেদ চলে আসছে। কিন্তু তারা এই নিয়ে মতবিরোধ করে নাই বা ঝগড়া বিবাদও করে নাই। আমাদের অবস্থান তাদের বিপরীত, আমরা আজ ফিকহি মাসায়েল নিয়ে মতবিরোধ করেছি বা ঝগড়া বিবাদ করছি। নিরপেক্ষ ভাবে বলতে গেলে সুরা ফাতিহায় মহান আল্লাহর প্রশংসা আছে। যদি জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় তবে মহান আল্লাহর প্রশংসা হবে আবার বুখারিতে বর্ণিত সহিহ হাদিসের উপরও আমল হবে। তাই জানাযার সালাতের শুরুতে সুরা ফাতিহা পড়া উত্তম। তবে একটি কথা পরিধান যোগ্য, যারা ফাতিহা না পড়ে সানা পাঠ করে, তাদের আমলকে অযোগ্য বলে, বিদআত বলে প্রচার করা ঠিক হবে না। কেননা মতভেদপূর্ণ মাসায়েল নিয়ে বিরোধে জড়ান বা ঝগড়া বিবাদ করা অবশ্যই বিদআতি কাজ।

কবর বা বারযখী জীবন : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৪. মৃতদেহ বহন করে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া :

মৃতদেহকে দাফন করার জন্য মৃতদের রাখার খাটে করে কাধে বহন করে গোরস্থানের নিয়ে যেতে হবে। মাইয়াতের মাথা সামনে দিকে রেখে কাধে বহন করা সুন্নাত। পরিবার ও নিকট অত্মীয় পুরুষ লাশ বহন করা ভাল তবে অন্য কেউ বহন করলে নাজায়েয নয়। জানাযার পিছে পিছে মেয়েদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ নয়। এই সময় সরবে কান্নাকাটি করা যাবে না। আগেই উল্লেখ করেছি সরবে যিকর, তাকবীর ও তেলাওয়াত বা অনর্থক কথাবার্তা বলা যাবে না। বরং মৃত্যুর চিন্তা করতে করতে চুপচাপ ভাবগম্ভীরভাবে মধ্যম গতিতে মাইয়েতের পিছে পিছে কবরের দিকে এগিয়ে যাবে। চলা অবস্থায় রাস্তায় (বিনা প্রয়োজনে) বসা যাবে না। অনেক স্থানে দেখা যায় জানাযা বহন কালে তিন বার মাইয়াতকে মাটিতে রাখা। কবর স্থানে নিকটে হওয়া সত্বেও তিন বার বিশ্রাম কে সুন্নাহ মনে করে বসা হয়। এইভাবে জরুরী মনে করে বসাই হল বিদআত। তবে হ্যা, কোন কারনে যদি জানাযার জন্য বা কবরে রাখান জন্য বেশ দুরে লাশ বহন করে নিতে হয় এবং বহনকারীদের বিশ্রামের জন্য লাশ বহনকারী খাট মাটিতে রেখে বিশ্রাম নিলে কোন অসুবিধা নেই। আমাদের সমাজে প্রচলিত, লাশ বহন কালে তিন বার বিশ্রাম নিতেই হবে। যদি কেউ এই কাজ জরুরী বা সুন্নাহ ভেবে করে থাকে তবে বিদআত হবে।

জানাযার পিছে পিছে উচ্চৈঃস্বরে যিকর করা কোন সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। এটি একটি বাদআতী কাজ। জানাযা বহনের সময় পরিপূর্ণ নীরবতাই সুন্নাত। মনের গভীরে শোক ও মৃত্যু চিন্তা নিয়ে নীরবে পথ চলতে হবে। পরস্পরে কথাবার্তা বলাও সুন্নাত বিরোধী। ইমাম নাবাবী বলেন, লাশ বহনের সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকাই হলো সুন্নাত সম্মত সঠিক কর্ম যা সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের মানুষদের রীতি ছিল। প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ আল্লামা কাসানী বলেন, ‘‘লাশের অনুগমনকারী তার নীরবতাকে প্রলম্বিত করবে। এ সময় সশব্দে যিকর করা মাকরূহ। কাইস ইবনু উবাদাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবীগণ তিন সময়ে শব্দ করতে অপছন্দ করতেন: যুদ্ধ, জানাযা এবং জিকির। এছাড়া লাশ বহনের সময় সশব্দে জিকির করা ইহূদী-নাসারাগণের অনুকরণ; এজন্য তা মাকরূহ। কাসানী, বাদাইউস সানাই ১/৩১০, হাদিসের নামে জালিয়াত

অনেক সময় দেখা যায় লাশ বহন করার সময় এত উচ্চ স্বরে জিকির করছে মনে হবে কোন রাজনৈতিক দলের মিছিল যাচ্ছে। সম্প্রতি কালে ইউটিউবে দেখলাম একটি মুসলিম ভাইয়ের লাশ ঢাকঢোল পিটিয়ৈ কবরে নেয়া হচ্ছে। এই সকল জাহের মুসলিমদের জন্য কষ্ট পাওয়া ছাড়া কিছু করার নাই।

৫. মাইয়াতকে অতিক্রম না করে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্নাত

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন

مَرَّتْ جَنَازَةٌ فَقَامَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَقُمْنَا مَعَهُ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهَا يَهُودِيَّةٌ ‏.‏ فَقَالَ ‏ “‏ إِنَّ الْمَوْتَ فَزَعٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُ الْجَنَازَةَ فَقُومُوا ‏

একটি জানাযা নিয়ে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ তার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন, আমরাও তার সঙ্গে দাঁড়ালাম এবং বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ জানাযা একজন ইয়াহুদী মহিলার। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, মৃত্যু হল ভীতিকর ব্যাপার। অতএব কোন জানাযা দেখলে দাঁড়িয়ে যেও। সহিহ মুসলিম : ২০৯৩ ইফা:

নাফি (রহ.) হতে উক্ত সনদে লায়স ইবনে সাদ (রহ.) এর হাদিসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে ইবনে জুরায়জের হাদিসে আছে যে, নাবি ﷺ বলেছেন, তোমরা যখন কোন জানাযা দেখ, তখন তোমরা জানাযার সঙ্গে না গেলে জানাযা এগিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকো। সহিহ মুসলিম : ২০৯০ ইফা:

কাজেই মাইয়াতকে দেখে দাঁড়িয়ে থাকাই সুন্নাহ। যখন শবদেহ অতিক্রম করবে তখন স্থান ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু জানাযার সাথে থাকলে বা অনুগামী হলে ভিন্ন কথা। জানাযার অনুগামী  মাইয়েতের পিছনে কাছাকাছি চলাই উত্তম। তবে প্রয়োজনে সম্মুখে ও ডানে-বামে চলা যাবে। কেউ গাড়িতে গেলে তাকে পিছে পিছেই যেতে হবে। শবদেহ দেখার পর আর তার আগে চলা উচিত হবে না। কিন্তু শবদেহে দেখে বসা থেকে দাঁড়ান সুন্নতটি রহিত হয়ে গেছে। শেষে দিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ আর শবদেহ দেখে বসা থেকে দাঁড়াতেন না।

ওয়াকিদ ইবনে আমর সাদ ইবনে মুয়াজ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একটি জানাযা উপলক্ষ্যে দাঁড়িয়েছিলাম। এমতাবস্থায় নাফি ইবনে জুবায়র (রহ 🙂 আমাকে দাঁড়ানো দেখতে পেলেন। জানাযা মাটিতে রাখার অপেক্ষায় তিনি বসে ছিলেন। আমাকে বললেন, দাঁড়িয়ে থাকছ কেন? আমি বললাম, আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণিত হাদিসটির কারণে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। তখন নাফি (রহ .) বললেন, মাসুদ ইবনেল হাকাম আমার কাছে আলী ইবন আবু তালিব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রথমে দাঁড়াতেন। পরে তিনি বসেছেন। সহিহ মুসলিম : ২০৯৮ ইফা:

৬. মাইয়াতকে তাড়াতাড়ি দাফন করা।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

أَسْرِعُوا بِالْجِنَازَةِ فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ تُقَدِّمُونَهَا وَإِنْ يَكُ سِوَى ذَلِكَ فَشَرٌّ تَضَعُونَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ

জানাযার কার্যক্রম সালাত তাড়াতাড়ি আদায় কর। কারণ মৃত ব্যক্তি যদি নেক মানুষ হয় তাহলে তার জন্য কল্যাণ। কাজেই তাকে কল্যাণের দিকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবে। সে এরূপ না হলে খারাপ হবে। তাই তাকে তাড়াতাড়ি নিজেদের ঘাড় থেকে নামিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ১৩১৫, সহিহ মুসলিম :৯৪৪, আবু দাঊদ ৩১৮১, আত্ তিরমিযী ১০১৫, নাসায়ি ১৯১০, ১৯১১, ইবনে মাজাহ্ ১৪৭৭

আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বলেন-

يَا عَلِيُّ ثَلاَثٌ لاَ تُؤَخِّرْهَا الصَّلاَةُ إِذَا آنَتْ وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ وَالأَيِّمُ إِذَا وَجَدْتَ لَهَا كُفْؤًا

হে আলী। তিনটি কাজে দেরি করবে না। সালাত যখন ওয়াক্ত হয়ে যায়; জানাযা যখন উপস্থিত হয় এবং বিধবাÑযখন তার যোগ্য পাত্র পাওয়া যায়। সুনানে তিরমিজি : ১০৭৫, মিশকাত : ১৪৮৬

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন কালো অথবা একজন যুবক মসজিদ ঝাড়ু দিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে কয়েক দিন না পেয়ে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা তাকে জানালেন, সে মারা গিয়াছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা আমাকে জানাওনি কেন? রাবী বলেন, তারা যেন তাঁর ব্যাপারটি তুচ্ছ মনে করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও। তারা (কবরটি) দেখিয়ে দিলেন। তিনি ঐ কবর সামনে রেখে জানাযার সালাত আদায় করলেন। তারপর বললেন, এ কবরগুলো তাদের জন্য অত্যন্ত অন্ধকার। আল্লাহ তায়ালা আমার সালাতের কারণে তাদের জন্য কবরকে আলোকোজ্জ্বল করে দেবেন। সহিহ মুসলিম : ২০৮৬ ইফা:

মৃত ব্যক্তি ভালো হোক আর মন্দ হোক জানাযা দ্রুত আদায় করা জরুরি। আমাদের দেশে দেখা যায় মৃত ব্যক্তির কোন নিকট আত্মীয়ের জন্য জানাযা ও দাফন কাজ এক দু দিন রেখে দেয়। শুধু আবেগের বশীভূত হয়ে বিদেশ থেকেও মৃত ব্যক্তির দেহ আনার জন্য কয়েক সপ্তাহ পরে দাফন করা হয়। কারণ অনেক সময় মৃত ব্যক্তির দেহ বিদেশে থেকে দেশে আনতে দুই তিন সপ্তাহ লেগে যায়। এ সব কাজ ইসলামি শরীয়া সমর্থ করে না।

৭. দাফনের ব্যবস্থা করা

মাইয়াতকে নিজ বাসস্থানের নিকটবর্তী মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা উচিত। তবে সঙ্গত কারণে অন্যত্র নেওয়া যাবে। মাইয়াতকে ডান কাতে কিবলামুখী করে শোয়াবে। এই সময় কাফনের কাপড়ের গিরাগুলি খুলে দেবে। কবরে রাখার সময় বলবে

بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ

‘আল্লাহর নামে ও আল্লাহর রাসুলের দ্বীনের উপরে।

‘মিল্লাতে’এর স্থলে ‘সুন্নাতে’ বলা যাবে। এই সময় কোনো সুগন্ধি বা গোলাপ পানি ছিটানো বিদআত।  ছালাতুর রাসূল (সা.),  ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিব

৮. লাশ কবরে রাখার সময়ের দোয়া প্রসংঙ্গে

একট যঈফ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ তাঁর মেয়ে উম্মে কুলসুম (রা.) কে কবরে রাখার সময় একটি দোয়া পড়েছিলেন।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূল ﷺ এর মেয়ে উম্মে কুলসুম (রা.) কে কবরে রাখা হয়,  তখন রাসূল ﷺ পড়েন-

مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى

উচ্চারণ : মিনহা খালকনাকুম ওয়াফীহা নুয়ীদুকুম ওয়ামিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা

অর্থ : এ মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃজন করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিব এবং পুনরায় এ থেকেই আমি তোমাদেরকে উত্থিত করব। । মুসনাদে আহমাদ : ২২১৮৭

অনেকগুলি হাদিসের গ্রন্থে এই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। সকল মুহাদ্দিসীগণ উক্ত হাদীসকে যঈফ বলে মন্তব্য করছে। তাই এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে রাসূল ﷺ থেকে সুনিশ্চিত প্রমাণিত সুন্নত মনে করে আমল করা যাবে না। কিছু আলেম এই আমলটি জায়েয বলেছেন আবার অনেক আলেম আমলটি বিদআত বলেছেন। আমলের ক্ষেত্র শর্তকতা অবলম্ভন করি এবং বিদআত পরিহার করে চলি।

আমল ছাড়া সবই পৃথিবীতে থেকে যায়

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি বস্ত্ত মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে। দু’টি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবারবর্গ, তার মাল ও তার ’আমল তার অনুসরণ করে। তার পরিবারবর্গ ও তার মাল ফিরে আসে, এবং তার ’আমল তার সঙ্গে থেকে যায়। সহিহ বুখারি : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম : ২৯৬০, আহমাদ : ১২০৮১

 ৯. মৃত থেকে শুরু করে বরজখি জীবনের একটি চিত্রঃ

বারা ইবন আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

এক আনসারী ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে বের হলাম। আমরা কবরের কাছে পৌঁছে গেলাম তখনও কবর খোঁড়া শেষ হয় নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেখানে বসলেন। আমরা তাঁর চার পাশে এমনভাবে বসে গেলাম যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসেছে। আর তাঁর হাতে ছিল চন্দন কাঠ যা দিয়ে তিনি মাটির উপর মৃদু পিটাচ্ছিলেন। তিনি তখন মাথা জাগালেন আর বললেন, তোমরা কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কথাটি তিনি দু’বার কিংবা তিন বার বললেন।

এরপর তিনি আরো বললেন, যখন কোনো ঈমানদার বান্দা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আখিরাতের দিকে যাত্রা করে তখন আকাশ থেকে তার কাছে ফিরিশতা আসে। তাদের চেহারা থাকবে সূর্যের মত উজ্জল। তাদের সাথে থাকবে জান্নাতের কাফন ও সুগন্ধি। তারা তার চোখ বন্ধ করা পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকবে। মৃত্যুর ফিরিশতা এসে তার মাথার কাছে বসবে। সে বলবে, হে সুন্দর আত্মা! তুমি আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা ও তার সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো। আত্মা বেরিয়ে আসবে যেমন বেড়িয়ে আসে পান-পাত্র থেকে পানির ফোটা। সে আত্মাকে গ্রহণ করে এক মুহুর্তের জন্যেও ছাড়বে না। তাকে সেই জান্নাতের কাফন পরাবে ও সুগন্ধি লাগাবে। পৃথিবিতে যে মিশক আছে সে তার চেয়ে বেশি সুগন্ধি ছড়াবে। তাকে নিয়ে তারা আসমানের দিকে যেতে থাকবে। আর ফিরিশতাদের প্রতিটি দল বলবে, কে এই পবিত্র আত্মা? তাদের প্রশ্নের উত্তরে তারা তার সুন্দর নাম নিয়ে বলবে যে, অমুক অমুকের ছেলে। এমনিভাবে প্রথম আসমানে চলে যাবে। তার জন্য প্রথম আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে। এমনি করে প্রতিটি আসমান অতিক্রম করে যখন সপ্তম আসমানে যাবে তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলবেন, আমার বান্দা আমলনামাটা ইল্লিয়ীনে লিখে দাও। আর আত্মাটা দুনিয়াতে তার দেহের কাছে পাঠিয়ে দাও। এরপর কবরে প্রশ্নোত্তরের জন্য দুজন ফিরিশতা আসবে। তারা প্রশ্ন করবে, তোমার প্রভূ কে? সে বলবে আমার প্রভূ আল্লাহ। তারা প্রশ্ন করবে, তোমার দীন কি? সে উত্তর দিবে, আমার দীন ইসলাম। তারা প্রশ্ন করবে এই ব্যক্তিকে চেন, যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে? সে উত্তরে বলবে, সে আল্লাহর রাসূল। তারা বলবে, তুমি কীভাবে জানলে? সে উত্তরে বলবে, আমি আল্লাহর কিতাব পাঠ করেছি। তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। তাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি। তখন আসমান থেকে একজন আহবানকারী বলবে, আমার বান্দা অবশ্যই সত্য বলেছে। তাকে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তার কবর থেকে জান্নাতের একটি দরজা খুলে দাও। জান্নাতের সুঘ্রাণ ও বাতাস আসতে থাকবে। যতদূর চোখ যায় ততদূর কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে। তার কাছে সুন্দর চেহারার সুন্দর পোশাক পরিহিত সুগন্ধি ছড়িয়ে এক ব্যক্তি আসবে। সে তাকে বলবে, তুমি সুসংবাদ নাও। সূখে থাকো। দুনিয়াতে এ দিনের ওয়াদা দেওয়া হচ্ছিল তোমাকে। মৃত ব্যক্তি সুসংবাদ দাতা এ ব্যক্তিকে সে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার নেক আমল (সৎকর্ম)। তখন সে বলবে, হে আমার রব! কিয়ামত সংঘটিত করুন! হে আমার রব! কিয়ামত সংঘটিত করুন!! যেন আমি আমার সম্পদ ও পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারি।

আর যখন কোনো কাফির দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে আখিরাত পানে যাত্রা করে তখন তার কাছে কালো চেহারার ফিরিশতা আগমন করে। তার সাথে থাকে চুল দ্বারা তৈরি কষ্ট দায়ক কাপর। তারা চোখ বুজে যাওয়া পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকে। এরপর আসে মৃত্যুর ফিরিশতা। তার মাথার কাছে বসে বলে, হে দুর্বিত্ত পাপিষ্ট আত্মা বের হয়ে আল্লাহর ক্রোধ ও গজবের দিকে চলো। তখন তার দেহে প্রচন্ড কম্পন শুরু হয়। তার আত্মা টেনে বের করা হয়, যেমন আদ্র রেশমের ভিতর থেকে লোহার ব্রাশ বের করা হয়। যখন আত্মা বের করা হয় তখন এক মুহুর্তের জন্যও ফিরিশতা তাকে ছেড়ে দেয় না। সেই কষ্টদায়ক কাপড় দিয়ে তাকে পেচিয়ে ধরে। তার লাশটি পৃথিবীতে পড়ে থাকে। আত্মাটি নিয়ে যখন উপরে উঠে তখন ফিরিশতারা বলতে থাকে কে এই পাপিষ্ট আত্মা? তাদের উত্তরে তার নাম উল্লেখ করে বলা হয় অমুক, অমুকের ছেলে। প্রথম আসমানে গেলে তার জন্য দরজা খোলার অনুরোধ করা হলে দরজা খোলা হয় না। এ সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এ আয়াতটি পাঠ করলেন-

لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدْخُلُونَ ٱلْجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلْجَمَلُ فِي سَمِّ ٱلْخِيَاطِۚ٤٠

তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে”। সূরা আরাফ : ৪০

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তার আমলনামা সিজ্জীনে লিখে দাও যা সর্ব নিম্ন স্তর। এরপর তার আত্মাকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হবে। এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এ আয়াতটি পাঠ করেন-

وَمَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَتَخْطَفُهُ ٱلطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ ٱلرِّيحُ فِي مَكَانٖ سَحِيق

“আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে দূরের কোনো জায়গায় নিক্ষেপ করল”। সূরা হজ্জ : ৩১

এরপর তার দেহে তার আত্মা চলে আসবে। দু’ফিরিশতা আসবে। তাকে বসাবে। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করবে, তোমার প্রভূ কে? সে বলবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তারা তাকে আবার জিজ্ঞেস করবে, তোমার ধর্ম কি? সে বলবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তারপর জিজ্ঞেস করবে, এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মধ্যে পাঠানো হয়েছিল? সে উত্তর দিবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তখন আসমান থেকে এক আহবানকারী বলবে, সে মিথ্যা বলেছে। তাকে জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। জাহান্নামের একটি দরজা তার জন্য খুলে দাও। জাহান্নামের তাপ ও বিষাক্ততা তার কাছে আসতে থাকবে। তার জন্য কবরকে এমন সঙ্কুচিত করে দেওয়া হবে যাতে তার হাড্ডিগুলো আলাদা হয়ে যাবে। তার কাছে এক ব্যক্তি আসবে যার চেহার বিদঘুটে, পোশাক নিকৃষ্ট ও দুর্গন্ধময়। সে তাকে বলবে, যে দিনের খারাপ পরিণতি সম্পর্কে তোমাকে বলা হয়েছিলো তা আজ উপভোগ করো। সে এই বিদঘুটে চেহারার লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার অসৎকর্ম। এরপর সে বলবে, হে প্রভূ! আপনি যেন কিয়ামত সংঘটিত না করেন”। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৫৩, মুসনাদে আহমদ : ১৮৫৩৪, মুসতাদরাক হাকেম : ১০৭, শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানী (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

একটি সংশোধন : মৃত্যুর ফিরিশতার নাম আজরাইল

আমাদের সমাজে মালাকুল মউত (মৃত্যুর ফিরিশতা), আজরাইল নামে পরিচিত। কুরআন ও সহিহ হাদিসে জান কবচকারী ফিরিশতাকে মালাকুল মউত (মৃত্যুর ফিরিশতা) বলা হয়েছে। কুরআনে ও সহিহ হাদিসে এই মৃত্যুর ফিরিশতার নাম কি, তা বলা হয় নি।  

মহান আল্লাহ বলেন-

قُلْ یَتَوَفّٰىکُمْ مَّلَکُ الْمَوْتِ الَّذِیْ وُکِّلَ بِکُمْ ثُمَّ اِلٰی رَبِّکُمْ تُرْجَعُوْنَ

বল, তোমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফিরিশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অবশেষে তোমরা তোমাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে। সুরা সিজদাহ : ১১

সম্ভব এটা ইহুদীদের থেকে এসেছে। তাই এ নামটি ব্যবহার না করাই ভালো।  উপরের হাদিসটিতেও মৃত্যুর ফিরিস্তাকে মালাকুল মাউত বলা হয়েছে।

১০. দাফনের পর মুনকার ও নাকীর নামে দুজন ফিরিশতার প্রশ্ন উত্তর পর্ব :

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তাকে পিছনে রেখে তার সাথীরা চলে যায় (এতটুকু দূরে যে,) তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, এমন সময় তার নিকট দু’জন ফেরেশ্তা এসে তাকে বসিয়ে দেন। অতঃপর তাঁরা প্রশ্ন করেন, এই যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাঁর সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্‌র বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গাটি দেখে নাও, যার পরিবর্তে আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার জন্য জান্নাতে একটি স্থান নির্ধারিত করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তখন সে দু’টি স্থান একই সময় দেখতে পাবে। আর যারা কাফির বা মুনাফিক, তারা বলবে, আমি জানি না। অন্য লোকেরা যা বলত আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, না তুমি নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। অতঃপর তার দু’ কানের মাঝখানে লোহার মুগুর দিয়ে এমন জোরে মারা হবে, যাতে সে চিৎকার করে উঠবে, তার আশেপাশের সবাই তা শুনতে পাবে মানুষ ও জ্বীন ছাড়া। সহিহ বুখারি : ১৩৩৮, ১৩৭৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৭০, আহমাদ : ১২২৭৩

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কোনো মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়া হয় তখন কালো ও নীল বর্ণের দু’জন ফিরিশতা আগমন করে। একজনের নাম মুনকার অন্যজনের নাম হলো নাকীর। তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, এই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা কী বলতে? সে বলবে, সে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তখন ফিরিশতাদ্বয় বলবে, আমরা আগেই জানতাম তুমি এ উত্তরই দিবে। এরপর তার কবরকে সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। সেখানে আলোর ব্যবস্থা করা হয়। এরপর তাকে বলা হয়, এখন তুমি নিদ্রা যাও। সে বলবে, আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যাবো, তাদেরকে (আমার অবস্থা সম্পর্কে) এ সংবাদ দেব। তখন ফিরিশতাদ্বয় তাকে বলে, তুমি ঘুমাও সেই নব বধুর মত যাকে তার প্রিয়জন ব্যতীত কেউ জাগ্রত করে না। এমনিভাবে একদিন আল্লাহ তাকে জাগ্রত করবেন। আর যদি সে ব্যক্তি মুনাফেক হয়, সে উত্তর দিবে আমি তাঁর (রাসূলুল্লাহ) সম্পর্কে মানুষকে যা বলতে শুনেছি তাই বলতাম। বাস্তব অবস্থা আমি জানি না। তাকে ফেরেশ্‌তাদ্বয় বলবে, আমরা জানতাম, তুমি এই উত্তরই দিবে। তখন মাটিকে বলা হবে তার উপর চাপ সৃষ্টি করো। মাটি এমন চাপ সৃষ্টি করবে যে, তার হাড্ডিগুলো আলাদা হয়ে যাবে। কিয়ামত সংঘটনের সময় তার উত্থান পর্যন্ত এ শাস্তি অব্যাহত থাকবে”। সুনানে তিরমিজি : ১০৭১,

১১. বরজখি জীবনে সুখ-নিদ্রায় বিভোর থাকবে :

কুরআনও এই কথার সাক্ষ্য বহন করে। ঈমানদার ব্যক্তি বরযখের জীবনে সুখ-নিদ্রায় বিভোর থাকবে। যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন তার নিদ্রা ভেঙ্গে যাবে ফলে সে অনেকটা বিরক্তির স্বরে বলবে-

قَالُواْ يَٰوَيْلَنَا مَنۢ بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَاۜ ۗ هَٰذَا مَا وَعَدَ ٱلرَّحْمَٰنُ وَصَدَقَ ٱلْمُرْسَلُونَ

হায়! কে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো? এটা তো তা যার ওয়াদা পরম করুণাময় করেছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন। সূরা ইয়াসীন : ৫২

করবে প্রান ফিরলে সালাত পড়তে চাইবে

আবূ সুফিয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

‏ إِذَا أُدْخِلَ الْمَيِّتُ الْقَبْرَ مُثِّلَتِ الشَّمْسُ لَهُ عِنْدَ غُرُوبِهَا فَيَجْلِسُ يَمْسَحُ عَيْنَيْهِ وَيَقُولُ ‏:‏ دَعُونِي أُصَلِّي ‏

মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হলে সে সূর্যকে অস্তমিত দেখতে পায়। তখন সে উঠে বসে এবং তার চক্ষুদ্বয় মলতে মলতে বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি নামায পড়বো। এবং তার চক্ষুদ্বয় মলতে মলতে বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি নামায পড়বো। সুনানে ইবনু মাজাহ ৪২৭২, তাহকীক আলবানি মান হাসান।

১২. বারজখি জীবনের আজাব বা কবরের আজাব হবে :

উসমান (রাঃ) এর মুক্তদাস হানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উষমান ইবনে আফফান (রাঃ) যখন কোন কবরের পাশে দাঁড়াতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তার দাড়ি ভিজে যেতো। তাকে বলা হলো, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করেন তখন তো এভাবে কান্নাকাটি করেন না, অথচ কবর দেখলেই কাঁদেন! তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় কবর হলো আখেরাতের মনযিলসমূহের মধ্যকার সর্বপ্রথম মনযিল। কেউ যদি এখান থেকে রেহাই পায়, তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো কবরের চেয়েও সহজতর হবে। আর সে যদি এখান থেকে রেহাই না পায়, তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো আরো ভয়াবহ হবে। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কখনও এমন কোন দৃশ্য অবলোকন করিনি যার তুলনায় কবর অধিক ভয়ংকর নয়। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৬৭, মিশকাত : ১৩২

১৩. কবরে সকাল সন্ধ্যা জাহান্নামের আগুন সামনে পেশ করা হবে :

কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোক কবর আজাব প্রমানিত। আল্লাহ রাব্বিল আলামীন বলেন-

فَوَقَىٰهُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِ مَا مَكَرُواْۖ وَحَاقَ بِ‍َٔالِ فِرْعَوْنَ سُوٓءُ ٱلْعَذَابِ ٤٥ ٱلنَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوْمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدْخِلُوٓاْ ءَالَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ ٱلْعَذَابِ

অতঃপর তাদের ষড়যন্ত্রের অশুভ পরিণাম থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করলেন আর ফিরআউনের অনুসারীদেরকে ঘিরে ফেলল কঠিন আজাব। আগুন, তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়, আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, ফিরআউনের অনুসারীদেরকে কঠোরতম আজাবে প্রবেশ করাও। সূরা গাফির : ৪৫-৪৬

হাফেজ ইবন হাজার রহ. এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, ফিরআউন এবং তার অনুসারীদের রূহসমূহ কিয়ামত পর্যন্ত সকাল-সন্ধায় আগুনের সম্মুখীন করা হবে, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন তাদের রূহ এবং শরীর গুলো আগুনে একত্রিত করা হবে।

১৪. মৃত ব্যক্তির সম্মুখে সকাল ও সন্ধ্যায় জান্নাত ও জাহান্নামে পেশ করা হয়

আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

তোমাদের কেউ মারা গেলে অবশ্যই তার সামনে সকাল ও সন্ধ্যায় তার অবস্থান স্থল উপস্থাপন করা হয়। যদি সে জান্নাতী হয়, তবে (অবস্থান স্থল) জান্নাতীদের মধ্যে দেখানো হয়। আর সে জাহান্নামী হলে, তাকে জাহান্নামীদের (অবস্থান স্থল দেখানো হয়) আর তাকে বলা হয়, এ হচ্ছে তোমার অবস্থান স্থল, ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) দিবসে আল্লাহ্ তোমাকে পুনরুত্থিত করা অবধি। সহিহ বুখারি : ১৩৭৯, ৩২৪০, ৬৫১৫, সহিহ মুসলিম : ২৬৮৮, আহমাদ : ৫১১৯

১৫. কাফির, মুশরিক, ইহুদী, খৃষ্টানসহ সকলেরই কবর আজাব হয়ঃ

আবূ আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ وَجَبَتْ الشَّمْسُ فَسَمِعَ صَوْتًا فَقَالَ يَهُودُ تُعَذَّبُ فِي قُبُورِهَا

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন। তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে বলেন, ইয়াহূদীদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে। সহিহ মুসলিম : ১৩৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৯

১৬. গীবত এবং পেশাবে অসাবধানতার কারণে কবরের আজাব হয়

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ مِنْ كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَسْعَى بِالنَّمِيمَةِ وَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ قَالَ ثُمَّ أَخَذَ عُودًا رَطْبًا فَكَسَرَهُ بِاثْنَتَيْنِ ثُمَّ غَرَزَ كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا عَلَى قَبْرٍ ثُمَّ قَالَ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন ঐ দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে আর কোন কঠিন কাজের কারণে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ (আযাব দেয়া হচ্ছে) তবে তাদের একজন পরনিন্দা করে বেড়াত, অন্যজন তার পেশাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত না। (রাবী বলেন) অতঃপর তিনি একটি তাজা ডাল নিয়ে তা দু’খন্ডে ভেঙ্গে ফেললেন। অতঃপর সে দু’ খন্ডের প্রতিটি এক এক কবরে পুঁতে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ আশা করা যায় যে এ দু’টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ‘আযাব হালকা করা হবে। সহিহ বুখারি : ২১৬, ১৩৭৮

১৭.  কবরের আজাব সম্পর্কিত বিখ্যাত একটি হাদিসঃ

সামুরাহ ইবনু জুনদাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? রাবী বলেন, যাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা, তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত। তিনি একদিন সকালে আমাদেরকে বললেনঃ গত রাতে আমার কাছে দু’জন আগন্তুক আসল। তারা আমাকে উঠাল। আর আমাকে বলল, চলুন। আমি তাদের সঙ্গে চললাম। আমরা কাত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে আসলাম। দেখলাম, অন্য এক লোক তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নিচে গিয়ে পড়ছে। এরপর আবার সে পাথরটি অনুসরণ করে তা আবার নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত আবার ভাল হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার তেমনি আচরণ করে, যা পূর্বে প্রথমবার করেছিল। তিনি বলেন, আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম, সুবহান্নাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন।

তিনি বলেন, আমরা চললাম, এরপর আমরা চিৎ হয়ে শোয়া এক লোকের কাছে আসলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক লোক লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমণ্ডল ের একদিক মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র,চোখ ও মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। আওফ (রহ.) বলেন, আবূ রাজা (রহ.) কোন কোন সময় ’ইয়ুশারশিরু’ শব্দের পরিবর্তে ’ইয়াশুক্কু’ শব্দ বলতেন। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছে তেমনি আচরণই অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মত ভাল হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মত আচরণ করে। তিনি বলেনঃ আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম।

রাবী বলেন, আমার মনে হয় যেন তিনি বলেছিলেন, আর তথায় শোরগোলের শব্দ ছিল। তিনি বলেন, আমরা তাতে উঁকি মারলাম, দেখলাম তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে বের হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। তিনি বলেন, আমরা চললাম এবং একটা নদীর (তীরে) গিয়ে পৌঁছলাম। রাবী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন, নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, এই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অন্য এক লোক আছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতারকারী লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সে লোক কাছে এসে পৌঁছে যে নিজের নিকট পাথর একত্রিত করে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে; আবার তার কাছে ফিরে আসে, যখনইসে তার কাছে ফিরে আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বলল, চলুন, চলুন। তিনি বরৈন, আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে এসে পৌঁছলাম, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ঐ লোকটি কে? তারা বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে হাজির হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চারপাশে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত অধিক আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি কে? এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌঁছলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি আর কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এর ওপরে চড়ুন। আমরা ওপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রূপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা হাজির হলাম।

আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল, আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক এমনই কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী মনে হয়। তিনি বলেন, সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়। আর সেটা ছিল প্রশস্ত প্রবাহিত নদী, যার পানি ছিল দুধের মত সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর এরা আমাদের কাছে ফিরে এল, দেখা গেল তাদের এ শ্রীহীনতা দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান। তিনি বলেন, আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মত একটি প্রাসাদ আছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা আপনার বাসগৃহ। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, আল্লাহ্ তোমাদের মাঝে বরকত দিন! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এতে প্রবেশ করি।

তারা বলল, আপনি অবশ্য এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়। তিনি বলেন, আমি এ রাতে অনেক বিস্ময়কর বিষয় দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী? তারা আমাকে বলল, আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যক্তি যে কুরআন গ্রহণ করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরজ সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে। আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে দেখেছেন যে, তার মুখের এক ভাগ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল সে হল ঐ ব্যক্তি, যে সকালে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে এমন কোন মিথ্যা বলে যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা চুলা সদৃশ গর্তের ভিতর আছে তারা হল ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।

আর ঐ ব্যক্তি, যার কাছে পৌঁছে দেখেছিলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে সে হল সুদখোর। আর ঐ কুশ্রী ব্যক্তি, যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর সে এর চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, সে হল জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশ্তা। আর এ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন, তিনি হলেন, ইবরাহীম (আঃ)। আর তাঁর আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিত্রাতের (স্বভাবধর্মের) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি বলেন, তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও কি? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ঃ মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও। আর ঐসব লোক যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী তারা হল ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সহিহ বুখারি ৭০৪৭, সহিহ মুসলিম : ২২৭৫, আহমাদ : ২০১১৫

১৮। করব আজাব থেকে পরিত্রানের উপায়

ক. বিশুদ্ধভাবে ঈমানদার আনতে হবে

আল্লাহ রাব্বিল আলামীন বলেন-

وَحَاقَ بِ‍َٔالِ فِرْعَوْنَ سُوٓءُ ٱلْعَذَابِ ٤٥ ٱلنَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوْمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدْخِلُوٓاْ ءَالَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ

ফির‘আউন গোত্রকে শোচনীয় আজাব গ্রাস করল, সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সম্মুখে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সে দিন আদেশ করা হবে, ফিরআউন গোত্রকে কঠিনতম ‘‘আযাবে পেশ করাও। সূরা গাফির  : ৪৫-৪৬

আবূ আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ وَجَبَتْ الشَّمْسُ فَسَمِعَ صَوْتًا فَقَالَ يَهُودُ تُعَذَّبُ فِي قُبُورِهَا

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন। তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে বলেন, ইয়াহূদীদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে। সহিহ মুসলিম : ১৩৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৯

কুরআন ও সহিহ হাদিসের দেখা যায় ফিরাউন ও এক জন ইহুদীর কবর আজাব হচ্ছে। অর্থাত কাফির, মুশরিক, ইহুদী, খৃষ্টানসহ সকলেরই কবর আজাব হবে। কাজেই বিশুদ্ধ ঈমান ছাড়া কবর আজাব থেকে পরিত্রানের উপায় নাই।

খ. আল্লাহর পথে শহীদ  হতে হবে

মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শহীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ছয়টি পুরস্কার বা সুযোগ আছে। তার প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করা হয়, তাকে তার জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হয়, কবরের আযাব হতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, সে কঠিন ভীতি হতে নিরাপদ থাকবে, তার মাথায় মর্মর পাথর খচিত মর্যাদার টুপি পরিয়ে দেওয়া হবে। এর এক একটি পাথর দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছু হতে উত্তম। তার সাথে টানা টানা আয়তলোচনা বাহাত্তরজন জান্নাতী হুরকে বিয়ে দেওয়া হবে এবং তার সত্তরজন নিকটাত্মীয়ের জন্য তার সুপারিশ কুবুল করা হবে। সুনানে তিরমিযী ১৬৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৯৯, আহমাদ : ১৬৭৩০, মিশকাত : ৩৮৩৪, সহিহাহ : ৩২১৩

শহীদ কারা-

জাবির ইবনে আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। জাবির (রাঃ) এর পরিবারের কেউ বললো, আমরা আশা করতাম যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা তো খুব কম হয়ে যাবে। (১) আল্লাহর পথে নিহত হলে শহীদ, (২) মহামারীতে নিহত হলে শহীদ, (৩) যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদ, (৪) পানিতে ডুবে, (৫) আগুনে পুড়ে ও (৬) ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৮০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৮৪৬, ৩১৯৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩১১১, আহমাদ : ২৩২৪১, মুয়াত্তা মালেক : ৫৫২।

গ. গীবত এবং পেশাবে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ مِنْ كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَسْعَى بِالنَّمِيمَةِ وَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ قَالَ ثُمَّ أَخَذَ عُودًا رَطْبًا فَكَسَرَهُ بِاثْنَتَيْنِ ثُمَّ غَرَزَ كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا عَلَى قَبْرٍ ثُمَّ قَالَ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন ঐ দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে আর কোন কঠিন কাজের কারণে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ (আযাব দেয়া হচ্ছে) তবে তাদের একজন পরনিন্দা করে বেড়াত, অন্যজন তার পেশাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত না। (রাবী বলেন) অতঃপর তিনি একটি তাজা ডাল নিয়ে তা দু’খন্ডে ভেঙ্গে ফেললেন। অতঃপর সে দু’ খন্ডের প্রতিটি এক এক কবরে পুঁতে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ আশা করা যায় যে এ দু’টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ‘আযাব হালকা করা হবে। সহিহ বুখারি : ২১৬, ১৩৭৮

ঘ. করব আজাব থেকে বাচতে সব সময় দোয়া করতে হবেঃ

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আ করতেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

হে আল্লাহ্! আমি আপনার সমীপে পানাহ চাচ্ছি কবরের শাস্তি হতে, জাহান্নামের শাস্তি হতে, জীবন ও মরণের ফিতনা হতে এবং মাসীহ্ দাজ্জাল এর ফিতনা হতে। সহিহ বুখারি : ১৩৭৭, সহিহ মুসলিম : ৫৮৮, আহমাদ : ৯৪৭০

কিয়ামত দিবস ও শিংগা ফুত্কার

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের জীবন কেবল দুনিয়ার কয়েকদিনের ক্ষণস্থায়ী সফরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর রয়েছে চিরস্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ এক পরবর্তী ধাপ, যা “পরকালীন জীবন” নামে পরিচিত। মৃত্যুর পর একজন মানুষের ভৌত অস্তিত্ব মাটির নিচে চলে গেলেও তার আত্মা প্রবেশ করে এক অন্তর্বর্তী জগতে, যাকে ‘বারযাখ’ বলা হয়। এটি আখেরাতের সূচনা পর্ব, যেখানে মানুষ কিয়ামতের আগপর্যন্ত অবস্থান করবে। অত:পর, ইসরাফিল (আ.) আল্লাহর আদেশে শিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। এর ফলে আকাশ-বাতাস, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষ পুনরায় মৃত অবস্থায় কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে—যাকে বলা হয় ‘নশর’ বা পুনরুত্থান। তখন এক বিশাল ও ভয়াবহ দিন শুরু হবে, যার নাম ‘ইয়াওমুল কিয়ামাহ’ বা কিয়ামতের দিন। কুরআনে একে “৫০ হাজার বছরের সমান দীর্ঘ” দিন বলা হয়েছে।

বান্দাকে এ দিনে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে। সেখানে শুরু হবে মহান হিসাব-নিকাশের পর্ব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রত্যেককে তাঁর দুনিয়াবি কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন করবেন। কারো আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, আর কারো বাম হাতে। বিচার হবে পূর্ণ ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, যেখানে কণামাত্র অন্যায় করা হবে না। এমনকি কারো পায়ে ছোট কাঁটা ফুটানোর মতো সামান্য যন্ত্রণাও হিসাবের খাতায় লেখা থাকবে।

হিসাব-নিকাশের পরে মানুষের সামনে উপস্থিত হবে একটি সংকীর্ণ ও ভয়ানক সেতু যার নাম ‘পুল সিরাত’। এই সেতুটি জাহান্নামের উপর স্থাপিত থাকবে এবং সকলকে এটি অতিক্রম করতে হবে। কেউ এটি বিজলি গতিতে পার হবে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে, আবার কেউ পিছলে পড়ে জাহান্নামে নিপতিত হবে। কেবল ঈমানদার, সৎকর্মশীল ও তাকওয়াবানরাই সফলতার সঙ্গে পার হতে পারবে।

সবশেষে প্রত্যেক মানুষকে তার চিরস্থায়ী আবাসস্থলে প্রেরণ করা হবে—জান্নাত অথবা জাহান্নাম। জান্নাত হবে পরম শান্তি ও পুরস্কারের স্থান, আর জাহান্নাম হবে শাস্তি ও নিদারুণ কষ্টের জায়গা। জান্নাত লাভ হবে আল্লাহর রহমত ও বান্দার ঈমান ও আমলের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে জাহান্নাম হবে সেইসব কাফির, মুনাফিক ও পাপাচারীদের গন্তব্য, যারা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অমান্য করেছে।

সারকথা, পরকালীন জীবন একটি চরম বাস্তবতা, যা আমাদের বর্তমান জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিতার একটি চূড়ান্ত পরিণতি বহন করে। এই বিশ্বাস একজন মুসলিমকে দুনিয়াবি জীবনে সচেতন, আত্মনিয়ন্ত্রণকারী ও সৎকর্মপরায়ণ করে তোলে।

পাঠকদের নিকটি বারযক বা কবরের জীবনের পরবর্তি পরকালীন জীবনের ধাপগুলো ফুটিয়ে তুলতে ৬ ভাগে ভাগ করে উপস্থাপন করা চেষ্টা করব। বান্দাকে পরকালে নিচের ৬ টি ধাপের সম্মূখিত হবে তবে।

১. কিয়ামত দিবস ও শিংগা ফুত্কারের

২. হাশরের ময়দান

৩. হাশরের ময়দানের হিসেব নিকাশ

৪. পুল সিরাত পার হওয়া

৪. জান্নাত ও

৬. জাহান্নাম

শিংগা ফুত্কার

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্ধারিত এক সময় পৃথিবীর শেষ দিন নির্ধারণ করেছেন, যাকে বলা হয় কিয়ামত। যখন সেই সময় উপস্থিত হবে, তখন তিনি কিয়ামত সংঘটনের জন্য নিয়োজিত বিশেষ ফেরেশতা ইসরাফিল (আ.) কে শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার আদেশ দিবেন। একমাত্র আল্লাহই জানেন সেই মুহূর্ত কখন আসবে। ফেরেশতা শিঙ্গায় প্রথমবার ফুঁ দেবার সঙ্গে সঙ্গে আসমান ও যমীন কাঁপতে থাকবে। পাহাড়গুলো গুড়িয়ে বালুর পাহাড়ের মতো উড়ে যাবে, ভূমি উল্টে যাবে। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে পড়বে, গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ বিছিন্ন হয়ে তা খসে পড়বে। সূর্য ও চাঁদের আলো নিভে যাবে, সমুদ্র অগ্নিসদৃশ উত্তাল হয়ে উঠবে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে প্রাণীকুল হতবিহবল হয়ে পড়বে। এই সময় দুনিয়াতে শুধু সেই সব মানুষই জীবিত থাকবে, যারা হবে সবচেয়ে মন্দ, পাপাচারী ও অবাধ্য। কিয়ামত তাদেরই ওপর সংঘটিত হবে। এই দৃশ্য হবে এতটাই ভয়াবহ যে, কেউ রক্ষা পাবে না যতক্ষণ না আল্লাহ চান। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্যার কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে তুল ধরা হয়েছে। নিচে কুরআন এ সহিহ হাদিসের আলোকে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

১. কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই সংরক্ষিত

কিয়ামত কখন হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেন না—এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনে একাধিক আয়াত রয়েছে। এই আয়াতগুলোতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই সংরক্ষিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ۚ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً ۗ

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তা কখন ঘটবে? বলো, এর জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে। তিনিই তার নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমান ও যমীনে তা এক কঠিন বিষয়। তোমাদের কাছে তা হঠাৎ করেই আসবে। সূরা আরাফ : ১৮৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন যা কিছু জরায়ুতে আছে। আর কোনো ব্যক্তি জানে না যে, সে আগামী কাল কী উপার্জন করবে। কোনো ব্যক্তি জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে খবর রাখেন।” সূরা লুকমান : ৩৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ اللَّهِ ۚ وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا

“লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, ‘তার জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে।তুমি কি জানো, সম্ভবত কিয়ামত অতি নিকটবর্তী।” সূরা আহযাব : ৬৩

ক. আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا . فِيمَ أَنتَ مِن ذِكْرَاهَا . إِلَىٰ رَبِّكَ مُنتَهَاهَا

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তা কখন ঘটবে? এর আলোচনায় তোমার কী বলার আছে? এর চূড়ান্ত জ্ঞান তোমার প্রতিপালকের কাছেই।” সূরা নাযিয়াত : ৪২-৪৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِلَيْهِ يُرَدُّ عِلْمُ السَّاعَةِ ۚ وَمَا تَخْرُجُ مِن ثَمَرَاتٍ مِّنْ أَكْمَامِهَا وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَىٰ وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ ۚ وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ أَيْنَ شُرَكَائِي قَالُوا آذَنَّاكَ مَا مِنَّا مِن شَهِيدٍ

কিয়ামতের জ্ঞান তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়। তাঁর অজ্ঞাতসারে আবরণ হতে ফলসমূহ বের হয় না, কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসবও করে না এবং সেদিন যখন তিনি তাদেরকে আহবান করে বলবেন, ‘আমার শরীকরা কোথায়?’ তারা বলবে, ‘আমরা আপনাকে জানাচ্ছি যে, এ ব্যাপারে আমাদের থেকে কোন সাক্ষী নেই।’ সূরা ফুসসিলাত : ৪৭

ইস্রাফিল (আ.) সর্বক্ষন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কিভাবে নিশ্চিন্তে আরাম করতে পারি, অথচ শিঙ্গাওয়ালা (ফিরিশতা ইসরাফীল আঃ) মুখে শিঙ্গা নিয়ে অধীর আগ্রহে কান পেতে শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার নির্দেশ শোনার অপেক্ষায় আছেন, কখন ফুঁ দেয়ার নির্দেশ প্রদান করা হবে, আর অমনি তিনি ফুঁ দিবেন। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের নিকট অত্যন্ত ভীতিকর মনে হলো। তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ তোমরা বল যে, আমাদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধানকারী। আমরা আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করলাম। সুনানে তিরমিজ : ২৪৩১, মিশকাত : ৫৫২৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২০৭৯, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ : ২৯৫৮৭, মুসনাদে আহমাদ : ৩০১০, আবূ ইয়া’লা : ১০৮৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৮২৩, ত্ববারানী : ৪৯৩২, তারহীব : ৪৫।

শিঙ্গাটি দেখতে একটি শিং এর মত

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শিঙ্গা একটি শিং এর ন্যায়, তাতে ফুঁ দেয়া হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪২, মিশকাত : ৫৫২৮, সুনানে তিরমিজি : ৩৪৭২, সহীহুল জামি : ৩৮৬৩, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৮০।

২. শিংগা ফুত্কারের মাধ্যমে কিয়ামত শুরু হবে

ক. আল্লাহ হুকুমে কিয়ামতের দিন শিংগার ফুঁক দেওয়া হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ ؕ ذٰلِکَ یَوْمُ الْوَعِیْدِ

আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। এটাই হল প্রতিশ্রুত দিন। সুরা কাফ : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا نُفِخَ فِی الصُّوْرِ نَفْخَۃٌ وَّاحِدَۃٌ ۙ

অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে- একটি মাত্র ফুঁক। সুরা হাক্কাহ : ১৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَوْمَ یَقُوْلُ کُنْ فَیَکُوْنُ ۬ؕ قَوْلُہُ الْحَقُّ ؕ وَلَہُ الْمُلْکُ یَوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ ؕ عٰلِمُ الْغَیْبِ وَالشَّہَادَۃِ ؕ وَہُوَ الْحَکِیْمُ الْخَبِیْرُ

যেদিন তিনি বলবেন. ‘হাশর হও‘ সেদিন হাশর হয়ে যাবে। তাঁর কথা খুবই যথার্থ বাস্তবানুগ। যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন একমাত্র তাঁরই হবে বাদশাহী ও রাজত্ব। গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তাঁর জ্ঞানায়ত্বে। তিনি হচ্ছেন প্রজ্ঞাময়, সর্ববিদিত। সুরা আনাম : ৭৩

খ. শিংগায় ফুঁক দেয়া হলে অপরাধীরা দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِیْنَ یَوْمَئِذٍ زُرْقًا ۚۖ

যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, আর সেদিন আমি অপরাধীদেরকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব। সুরা ত্বহা : ১০২

গ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ হাশরের ময়দানে তরঙ্গমালার মত আছড়ে পড়বে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَتَرَکْنَا بَعْضَہُمْ یَوْمَئِذٍ یَّمُوْجُ فِیْ بَعْضٍ وَّنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَجَمَعْنٰہُمْ جَمْعًا ۙ

আর সেদিন আমি তাদেরকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেব যে, তারা একদল আরেক দলের উপর তরঙ্গমালার মত আছড়ে পড়বে এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সকলকে একত্র করব। সুরা কাহফ : ৯৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَاِذَا ہُمْ مِّنَ الْاَجْدَاثِ اِلٰی رَبِّہِمْ یَنْسِلُوْنَ

আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা কবর থেকে তাদের রবের দিকে ছুটে আসবে। সুরা ইয়াসিন : ৫১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ فَتَاْتُوْنَ اَفْوَاجًا ۙ

সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। সুরা নাবাহ : ১৮

ঘ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ আত্ম কেন্দ্রিক হয়ে পড়বে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا نُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَلَاۤ اَنْسَابَ بَیْنَہُمْ یَوْمَئِذٍ وَّلَا یَتَسَآءَلُوْنَ

অতঃপর যে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবেনা, এবং একে অপরের খোঁজ খবর নিবেনা। সুরা মুমিনুন : ১০১

ঙ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ فَفَزِعَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ اِلَّا مَنْ شَآءَ اللّٰہُ ؕ وَکُلٌّ اَتَوْہُ دٰخِرِیْنَ

আর যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন আল্লাহ যাদেরকে চান তারা ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সবাই ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে এবং সবাই তাঁর নিকট আসবে বিনীত অবস্থায়। সুরা নামল : ৮৭

চ. শিংগায় প্রথম ফুৎকারে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে এবং দ্বিতীয় ফুত্কারে দাঁড়িয়ে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَصَعِقَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ اِلَّا مَنْ شَآءَ اللّٰہُؕ ثُمَّ نُفِخَ فِیْہِ اُخْرٰی فَاِذَا ہُمْ قِیَامٌ یَّنْظُرُوْنَ

আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া আসমানসমূহে যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। সুরা যুমান : ৬৮

ছ. শিঙ্গায় ফুৎকারের পর আকাশ পাতাল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِذَا نُفِخَ فِى ٱلصُّورِ نَفْخَةٌ۬ وَٲحِدَةٌ۬ (١٣) وَحُمِلَتِ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ (١٤) فَيَوْمَٮِٕذٍ۬ وَقَعَتِ ٱلْوَاقِعَةُ (١٥) وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِىَ يَوْمَٮِٕذٍ۬ وَاهِيَةٌ۬ (١٦) وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآٮِٕهَا‌ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَٮِٕذٍ۬ ثَمَـٰنِيَةٌ۬ (١٧)

তারপর যখন একবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা তোলা হবে এবং এক আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে,  তখন সেই দিন সংঘটিত হবে সেই মহাদিবস। এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, কেননা সেদিন তা দুর্বল হয়ে পড়বে। এবং ফিরিশতাগণ থাকবে তার প্রান্তসীমায় এবং তোমার রবের আরশকে সে দিন আটজন ফিরিশতা বহন করবে তাদের ওপর। সুরা হাক্কাহ : ১৩-১৭

৩. দ্বিতীয় ফুৎকারের মাধ্যামে সকল মানুষ পূনরুত্থিত হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু’বার ফুঁৎকারের মাঝে ব্যবধান চল্লিশ। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবূ হুরাইরাহ! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। তারপর তারা জিজ্ঞেস করল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। এরপর তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি চল্লিশ মাস। তিনি বললেন, আমার জানা নেই এবং বললেন, শিরদাঁড়ার হাড় বাদে মানুষের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দ্বারাই সৃষ্টি জগত আবার সৃষ্টি করা হবে। সহিহ বুখারি : ৪৮১৪, ৪৯৩৫, সহিহ মুসলিম : ৯৫৫, মিশকাত : ৫৫১, সহীহুল জামি : ৫৫৮৫, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৫৭৪ আহমাদ : ৯৫৩৩

৪. মেরুদন্ডের হাড় থেকে পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে  

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

قَالَ: كُلَّ ابْنِ آدَمَ تَأْكُلُ الْأَرْضُ، إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يُرَكَّبُ

প্রতিটি আদম সন্তানকে মাটি খেয়ে ফেলবে, শুধু মেরুদন্ডের নীচের হাড়টুকু বাকী থাকবে। এ থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ থেকেই তাকে পুনর্গঠন করা হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪৩

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কতিপয় হাদীস উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীস হচ্ছে এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের শরীরে এমন একটি হাড় আছে, যা জমিন কখনো ভক্ষণ করবে না। কিয়ামতের দিন এর দ্বারাই পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এ আবার কোন হাড্ডি? তিনি বললেন, এ হলো, মেরুদণ্ডের হাড্ডি। সহিহ মুসলিম : ২৯৫৫

৫. কিয়ামতের ফুৎকারের মাঝে ব্যবধান হবে চল্লিশ বছর বা দিন

ইয়াকুব ইবনু আসিম ইবনু উরওয়াহ ইবনু মাসউদ আস্ সাকাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, একদা জনৈক লোক তার কাছে এসে বললেন, এ কেমন হাদীস আপনি বর্ণনা করছেন যে, এতো এতো দিনের মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ কথা শুনে তিনি বললেন, “সুবহানাল্লাহ অথবা ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ অথবা অবিকল কোন শব্দ। তারপর তিনি বললেন, আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম যে, অচিরেই তোমরা এমন ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে যা ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দিবে। এ ঘটনা কায়িম হবেই হবে।

এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যেই দাজ্জালের আবির্ভাব হবে এবং সে চল্লিশ পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমি জানি না চল্লিশ দিন, না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর। এ সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারইয়াম তনয় ঈসা (আঃ) কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি উরওয়াহ ইবনু মাসউদ এর অবিকল হবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করে তাকে ধ্বংস করে দিবেন। তারপর সাতটি বছর লোকেরা এমনভাবে অতিবাহিত করবে যে, দু’ ব্যক্তির মধ্যে কোন শত্রুতা থাকবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা সিরিয়ার দিক হতে শীতল বাতাস প্রবাহিত করবেন। ফলে যার হৃদয়ে কল্যাণ বা ঈমান থাকবে, এ ধরনের কোন লোকই এ দুনিয়াতে আর বেঁচে থাকবে না। বরং এ ধরনের প্রত্যেকের জান আল্লাহ তা’আলা কবয করে নিবেন। এমনকি তোমাদের কোন লোক যদি পর্বতের গভীরে গিয়ে আত্মগোপন করে তবে সেখানেও বাতাস তার কাছে পৌছে তার জান কবয করে নিবে।

আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তখন খারাপ লোকগুলো পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। দ্রুতগামী পাখী এবং জ্ঞানশূন্য হিংস্রপ্রাণীর ন্যায় তাদের স্বভাব হবে। তারা কল্যাণকে অকল্যাণ বলে জানবে না এবং অকল্যাণকে অকল্যাণ বলে মনে করবে না। এ সময় শয়তান এক আকৃতিতে তাদের কাছে এসে বলবে, তোমরা কি আহবানে সাড়া দিবে না? তারা বলবে, আপনি আমাদেরকে কোন বিষয়ের আদেশ করছেন? তখন সে তাদেরকে মূর্তি পূজার নির্দেশ দিবে। এমতাবস্থায়ও তাদের জীবনোপকরণে প্রশস্ততা থাকবে এবং তারা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন-যাপন করবে। তখনই শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। যে এ আওয়াজ শুনবে সে তার ঘাড় একদিকে অবনমিত করবে এবং অন্যদিকে উত্তোলন করবে। এ আওয়াজ সর্বপ্রথম ঐ লোকই শুনতে পাবে, যে তার উটের জন্য হাওয সংস্করণের কাজে নিযুক্ত থাকবে।

আওয়াজ শুনামাত্রই সে অজ্ঞান হয়ে লুটে পড়বে। সাথে সাথে অন্যান্য লোকেরাও অজ্ঞান হয়ে যাবে। অতঃপর মহান আল্লাহ শুক্র ফোটার অথবা ছায়ার ন্যায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বর্ণনাকারী নুমান (রহ.) সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এতে মানুষের শরীর পরিবর্ধিত হবে। আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। অকস্মাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। অতঃপর আহবান করা হবে যে, হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আসো। অতঃপর (ফেরেশতাদের বলা হবে) তাদেরকে থামাও, কারণ তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। তারপর আবারো বলা হবে, জাহান্নামী দল বের করো। জিজ্ঞেস করা হবে, কত জন? উত্তরে বলা হবে, প্রত্যেক হাজার থেকে নয়শ’ নিরানব্বই জন। অতঃপর তিনি বললেন, এ-ই তো ঐদিন, যেদিন কিশোরকে পরিণত করবে বৃদ্ধে এবং এ-ই চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থার দিন। সহিহ মুসলিম : ২৯৪০

কিয়ামত বিদস

কিয়ামত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দাঁড়িয়ে যাওয়া, পুনরুত্থান বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। ইসলামি পরিভাষায়কিয়ামত বলতে এমন এক মহাদিবসকে বোঝানো হয়, যেদিন পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাআলা সকল মৃত মানুষকে পুনরায় জীবিত করে বিচারের জন্য দাঁড় করাবেন। কিয়ামতের এই দিনটিই হলো আখেরাত বা পরকালের প্রথম ধাপ, যেখানে মানুষের দুনিয়ার জীবনের সকল কাজের চূড়ান্ত হিসাব নেওয়া হবে।

কিয়ামত দিবস হলো এক ভয়ংকর ও অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, যা মানবজাতির ইতিহাসকে চূড়ান্ত পরিণতি দেবে। সেদিন পৃথিবী তার সমস্ত ভার নির্গত করবে এবং পাহাড়-পর্বত তুলাধুনার মতো উড়ে যাবে। মানুষ ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, কারণ সেদিন কোনো আশ্রয় থাকবে না এবং প্রত্যেকে নিজের কর্মফল নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সেদিন আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে পুনরায় জীবিত করে এক বিশাল ময়দানে সমবেত করবেন, যেখানে প্রতিটি ছোট-বড় কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে। এটি হলো চূড়ান্ত বিচার ও কর্মফল প্রাপ্তির দিন, যখন মানুষের পার্থিব জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হবে এবং প্রত্যেকের ভাগ্য নির্ধারিত হবে জান্নাত অথবা জাহান্নামে।

কুরআনে বহু স্থানে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হলেও সুরা হাক্কাহ, সুরা তাকভীর, সুরা কিয়ামাহ, সুরা ইনফিতার, সুরা ইনশিকাক, সুরা যিলজাল, সুরা গাশিয়াহ এই সূরাগুলোতে কিয়ামতের ভয়াবহতা ও দৃশ্যমান বর্ণনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব সূরা পাঠ করলে একজন মানুষের হৃদয়ে ভয়, অনুশোচনা ও আত্মশুদ্ধির অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। নিচে কুরআন হাদিসের আলোকে এ দিবস সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

১. মা নিজের শিশুকে ভুলে যাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى ٱلنَّاسَ سُكَٰرَىٰ وَمَا هُم بِسُكَٰرَىٰ وَلَٰكِنَّ عَذَابَ ٱللَّهِ شَدِيد

অর্থ : যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নারী তার স্তন্যপানরত শিশুকে ভুলে যাবে, এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারী গর্ভপাত করবে, আর তুমি মানুষকে মনে করবে মাতাল, অথচ তারা মাতাল নয়, বরং আল্লাহর শাস্তিই অত্যন্ত কঠিন। সূরা হজ্জ : ২

২. মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَبْصِرُونَهُمْ ۚ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍۢ بِبَنِيهِ

অর্থ: তারা একে অপরকে দেখতে পাবে। সে দিন অপরাধী চায় যে, যদি সে ঐ দিনের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারত, তাহলে সে নিজের সন্তানদের কোরবানি দিত। সূরা মায়ারিজ : ১১

৩. আপন জন থেকে মানুষ পালিয়ে বেড়াবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ يَفِرُّ ٱلْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِۦ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَٰحِبَتِهِۦ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ ٱمْرِئٖ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٖ شَأْنٌ يُغْنِيهِ (٣٧)

অর্থ: সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই থেকে, তার মা ও পিতা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই এমন এক অবস্থা থাকবে যা তাকে ব্যস্ত রাখবে। সূরা আবাসা : ৩৪–৩৭

৪. কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসিদের চেহারা কালো হবে। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَّوْمَ تَبْیَضُّ وُجُوْہٌ وَّتَسْوَدُّ وُجُوْہٌ ۚ فَاَمَّا الَّذِیْنَ اسْوَدَّتْ وُجُوْہُہُمْ ۟ اَکَفَرْتُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ فَذُوْقُوا الْعَذَابَ بِمَا کُنْتُمْ تَکْفُرُوْنَ

সে দিন কতক চেহারা সাদা হবে এবং কতক চেহারা হবে কালো। আর যাদের চেহারা কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে) ‘তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা আযাব আস্বাদন। সুরা আল ইমরান : ১০৬

৫. কিয়ামতের দিন সবার আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَئِذٍ یَّتَّبِعُوْنَ الدَّاعِیَ لَا عِوَجَ لَہٗ ۚ وَخَشَعَتِ الْاَصْوَاتُ لِلرَّحْمٰنِ فَلَا تَسْمَعُ اِلَّا ہَمْسًا

সেদিন তারা আহবানকারীর (ফেরেশতার) অনুসরণ করবে। এর কোন এদিক সেদিক হবে না এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না। সুরা ত্বহা : ১০৮

৬. পাপীরা তাদের দুর্ভোগের জন্য হাত কামড়াবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ يَعَضُّ ٱلظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيْهِ يَقُولُ يَٰلَيْتَنِي ٱتَّخَذْتُ مَعَ ٱلرَّسُولِ سَبِيلٗا . يَٰوَيْلَتَىٰ لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلٗا . لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ ٱلذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَآءَنِيۗ وَكَانَ ٱلشَّيْطَٰنُ لِلْإِنسَٰنِ خَذُولٗا

অর্থ : আর সেদিন যালিম নিজের হাত দু’টো কামড়িয়ে বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম’! হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’। আমাকেতো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌঁছার পর; শাইতানতো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক। সূরা ফুরকান: ২৭–২৯

৭. সেদিন মুখগুলো হবে আতঙ্কিত

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وُجُوهٞ يَوْمَئِذٖ نَّاضِرَةٌ  . إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٞ . وَوُجُوهٞ يَوْمَئِذِۭ بَاسِرَةٞ . تَظُنُّ أَن يُفْعَلَ بِهَا فَاقِرَةٞ

অর্থ: সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আর কিছু মুখ হবে বিমর্ষ, তারা ধারণা করবে তাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসবে। সূরা কিয়ামাহ : ২২–২৫

৮. আল্লাহ সামনে সকলেই অবনত হয়ে থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَنَتِ ٱلْوُجُوهُ لِلْحَيِّ ٱلْقَيُّومِۖ وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمٗا ١١١ وَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَهُوَ مُؤْمِنٞ فَلَا يَخَافُ ظُلْمٗا وَلَا هَضْمٗا ١١٢

আর চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত সত্তার সামনে সকলেই অবনত হবে। আর সে অবশ্যই ব্যর্থ হবে যে যুলুম বহন করবে। এবং যে মুমিন অবস্থায় ভালো কাজ করবে সে কোনো যুলুম বা ক্ষতির আশংকা করবে না”। সূরা ত্বাহা : ১১১-১১২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

خَاشِعَۃً اَبْصَارُہُمْ تَرْہَقُہُمْ ذِلَّۃٌ ؕ  ذٰلِکَ الْیَوْمُ الَّذِیْ کَانُوْا یُوْعَدُوْنَ 

অবনত চোখে। লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে! এটিই সেদিন যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। সুরা মায়ারিজ : ৪৪

৯. কিয়ামতর দিন সূর্য ও চন্দ্র গুটিয়ে নেয়া হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

إِذَا ٱلشَّمْسُ كُوِّرَتْ (١) وَإِذَا ٱلنُّجُومُ ٱنكَدَرَتْ (٢) وَإِذَا ٱلْجِبَالُ سُيِّرَتْ (٣) وَإِذَا ٱلْعِشَارُ عُطِّلَتْ (٤) وَإِذَا ٱلْوُحُوشُ حُشِرَتْ (٥) وَإِذَا ٱلْبِحَارُ سُجِّرَتْ (٦)

যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, আর যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে এবং যখন পর্বতসমূহকে সঞ্চালিত করা হবে, আর যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলো পরিত্যক্ত হবে, এবং যখন বন্য পশুদের একত্রিত করা হবে,  আর যখন সমুদ্রসমূহকে অগ্নিতে উত্তপ্ত করা হবে। সূরা তাকভীর : ১-৬

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি কিয়ামতের দৃশ্যটি এমনভাবে দেখতে পছন্দ করে যে, তা তার চোখের সামনে উপস্থিত সে যেন (إِذا الشَّمسُ كُوِّرَتْ) “যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে”। সূরাতাকভীর: ১ এবং (إِذا السَّماءُ انفطرَتْ)“যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে”। সূরা ইনফিত্বার : ১, ও (إِذا السَّماءُ انشقَّتْ) “যখন আকাশ ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। সূরা ইনশিক্বাক : ১, এ সূরা কয়েকটি (মর্ম বুঝে) পাঠ করে। সুনানে তিরমিযী : ৩৩৩৩, মিশকাত : ৫৫৪৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ ১০৮১, মুসনাদে আহমাদ ৪৮০৬, সহীহুল জামি ৬২৯৩, আল মুসতাদরাকলিল হাকিম ৮৭১৯।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্র দু’টিকেই গুটিয়ে নেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৩২০০, মিশকাত : ৫৫৩৬,  সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১২৪।

১০. কিয়ামদের দিন আকাশ পৃথিবী উলট পালট হয়ে যাবে

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

فَإِذَا نُفِخَ فِي ٱلصُّورِ نَفْخَةٞ وَٰحِدَةٞ ١٣ وَحُمِلَتِ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةٗ وَٰحِدَةٗ ١٤ فَيَوْمَئِذٖ وَقَعَتِ ٱلْوَاقِعَةُ ١٥ وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٖ وَاهِيَةٞ ١٦ وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآئِهَاۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٖ ثَمَٰنِيَةٞ ١٧ يَوْمَئِذٖ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَىٰ مِنكُمْ خَافِيَةٞ

অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে- একটি মাত্র ফুঁক। আর যমীন ও পর্বতমালাকে সরিয়ে নেওয়া হবে এবং মাত্র একটি আঘাতে এগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সে দিন মহাঘটনা সংঘটিত হবে। আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেদিন তা হয়ে যাবে দুর্বল বিক্ষিপ্ত। ফিরিশতাগণ আসমানের বিভিন্ন প্রান্তে থাকবে। সেদিন তোমার রবের আরশকে আটজন ফিরিশতা তাদের উর্ধ্বে বহন করবে। সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো গোপনীয়তাই গোপন থাকবে না”। সূরা হাক্কাহ : ১৩-১৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

إِذَا ٱلسَّمَآءُ ٱنفَطَرَتْ ١ وَإِذَا ٱلْكَوَاكِبُ ٱنتَثَرَتْ ٢ وَإِذَا ٱلْبِحَارُ فُجِّرَتْ ٣ وَإِذَا ٱلْقُبُورُ بُعْثِرَتْ ٤ عَلِمَتْ نَفْسٞ مَّا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ

যখন আসমান বিদীর্ণ হবে। আর যখন নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে। আর যখন সমুদ্রগুলোকে একাকার করা হবে। আর যখন কবরগুলো উন্মোচিত হবে। তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে, সে যা আগে পাঠিয়েছে এবং যা পিছনে রেখে গেছে”। সূরা ইনফিতার : ১-৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

 إِنَّمَا تُوعَدُونَ لَوَٰقِعٞ ٧ فَإِذَا ٱلنُّجُومُ طُمِسَتْ ٨ وَإِذَا ٱلسَّمَآءُ فُرِجَتْ ٩ وَإِذَا ٱلْجِبَالُ نُسِفَتْ ١٠ وَإِذَا ٱلرُّسُلُ أُقِّتَتْ ١١ لِأَيِّ يَوْمٍ أُجِّلَتْ ١٢ لِيَوْمِ ٱلْفَصْلِ ١٣ وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا يَوْمُ ٱلْفَصْلِ ١٤ وَيْلٞ يَوْمَئِذٖ لِّلْمُكَذِّبِينَ ١٥

তোমাদেরকে যা কিছুর ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তা অবশ্যই ঘটবে। যখন তারকারাজি আলোহীন হবে, আর আকাশ বিদীর্ণ হবে, আর যখন পাহাড়গুলি চূর্ণবিচূর্ণ হবে, আর যখন রাসূলদেরকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত করা হবে; কান দিনের জন্য এসব স্থগিত করা হয়েছিল? বিচার দিনের জন্য। আর কিসে তোমাকে জানাবে বিচার দিবস কি? মিথ্যারোপকারীদের জন্য সেদিনের দুর্ভোগ! সূর মুরসালাত: ৭-১৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

وَيَسْ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلْجِبَالِ فَقُلْ يَنسِفُهَا رَبِّي نَسْفٗا ١٠٥ فَيَذَرُهَا قَاعٗا صَفْصَفٗا ١٠٦ لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجٗا وَلَآ أَمْتٗا ١٠٧ يَوْمَئِذٖ يَتَّبِعُونَ ٱلدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُۥۖ وَخَشَعَتِ ٱلْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَٰنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسٗا

“আর তারা তোমাকে পাহাড় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, আমার রব এগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন, তারপর তিনি তাকে মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন তাতে তুমি কোনো বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সদিন তারা আহ্বানকারীর (ফেরেশতার) অনুসরণ করবে। এর কোনো এদিক সেদিক হবে না এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না”। সূরা ত্বাহা : ১০৫-১০৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

﴿ يَوْمَ تَرْجُفُ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ وَكَانَتِ ٱلْجِبَالُ كَثِيبٗا مَّهِيلًا ١٤

দিন যমীন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পাহাড়গুলো চলমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে”। [সূরা আল-মুযযাম্মমিল : ১৪

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

وَيَوْمَ نُسَيِّرُ ٱلْجِبَالَ وَتَرَى ٱلْأَرْضَ بَارِزَةٗ وَحَشَرْنَٰهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدٗا ٤٧ وَعُرِضُواْ عَلَىٰ رَبِّكَ صَفّٗا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْنَٰكُمْ أَوَّلَ مَرَّةِۢۚ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدٗا ٤٨ وَوُضِعَ ٱلْكِتَٰبُ فَتَرَى ٱلْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَٰوَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا  لْكِتَٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةً إِلَّآ أَحْصَىٰهَاۚ وَوَجَدُواْ مَا عَمِلُواْ حَاضِرٗاۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدٗا

আর যেদিন আমি পাহাড়কে চলমান করব এবং তুমি যমীনকে দেখতে পাবে দৃশ্যমান, আর আমি তাদেরকে একত্র করব। অতঃপর তাদের কাউকেই ছাড়ব না। আর তাদেরকে তোমার রবের সামনে উপস্থিত করা হবে কাতারবদ্ধ করে। (আল্লাহ তায়ালা বলবেন) তোমরা আমার কাছে এসেছ তেমনভাবে, যেমন আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম; বরং তোমরা তো ভেবেছিলে আমি তোমাদের জন্য কোনো প্রতিশ্রুত মুহূর্ত রাখি নি। আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, হায় ধ্বংস আমাদের! কী হলো এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে এবং তারা যা করেছে, তা হাজির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহাফ : ৪৭-৪৯

১১. কিয়ামতের দিন আল্লাহ দুনিয়াকে তার মুষ্ঠিতে ধারণ করবেন

কিয়ামতের দিনে আল্লাহর মহত্ব, সর্বময় কর্তৃত্ব ও সৃষ্টিজগতের ক্ষুদ্রতা ফুটে উঠেছে। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর কব্জায় থাকবে, আর যারা দুনিয়াতে অহংকার করেছে, তাদের অপমান ও বিচার হবে চরমভাবে।

وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدْرِہٖ ٭ۖ وَالْاَرْضُ جَمِیْعًا قَبْضَتُہٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطْوِیّٰتٌۢ بِیَمِیْنِہٖ ؕ سُبْحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشْرِکُوْنَ

আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে। সুরা যুমার : ৬৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন

یَوْمَ نَطْوِی السَّمَآءَ کَطَیِّ السِّجِلِّ لِلْکُتُبِ ؕ کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ

সে দিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সুরা আম্বিয়া : ১০৪

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলা যমীনকে নিজ মুষ্ঠিতে নিবেন এবং আকাশমন্ডলীকে ভাঁজ করে তাঁর ডান হাতে নিবেন, তারপর বলবেন, আমিই মালিক, দুনিয়ার বাদশারা কোথায়? সহিহ বুখারি : ৪৮১২, ৬৫১৯, ৭৩৮২, ৭৪১৩, সহিহ মুসলিম : ২৭৮৭, মিশকাত : ৫৫২২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৮, সহীহুল জামি : ৮০০৯, মুসনাদে বাযযার : ৬১০৫, মুসনাদে আহমাদ : ৮৮৫০, ৮৮৭২, আবূ ইয়ালা : ৫৫৫৮, দারিমী : ২৭৯৯, তবারানী : ১৩১৪৬

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ইয়াহূদী পাদ্রি নবী (সা.) -এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাতে) পেয়েছি যে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন আকাশমণ্ডলীকে এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন। জমিনকে এক আঙ্গুলের উপর, পর্বতমালা ও গাছসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর, পানি এবং কাদা-মাটিকে এক আঙ্গুলের উপর, আর অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টিজগতকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন। অতঃপর এ সমস্ত কিছুকে নাড়া দিয়ে বলবেন, আমিই বাদশাহ, আমিই আল্লাহ! ইয়াহুদী পাদ্রির কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিস্ময়ে হয়ে হেসে ফেললেন, তিনি যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। অতঃপর তিনি (সা.) কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন- وَ مَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِهٖ ٭ۖ وَ الْاَرْضُ جَمِیْعًا قَبْضَتُهٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَ السَّمٰوٰتُ مَطْوِیّٰتٌۢ بِیَمِیْنِهٖ ؕ سُبْحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰی عَمَّا یُشْرِکُوْنَ

আল্লাহ তা’আলার যতটুকু সম্মান করা দরকার ছিল তারা ততটুকু সম্মান করেনি, অথচ কিয়ামতের দিন সম্পূর্ণ পৃথিবী তাঁর মুষ্টিতে থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী ডান হাতে গুটানো থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে”। সূরা আয যুমার : ৬৭

সহিহ বুখারি : ৪৮১১, ৭৪১৪, ৭৪৫১, ৭৫১৩, সহিহ মুসলিম : ২৭৮৬, সুনানে তিরমিযী : ৩২৩৮, আহমাদ : ৪০৮৭, আবূ ইয়ালা : ৫৩৮৭, তবারানী : ১০১৮১

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আকাশমণ্ডলী পেচিয়ে নিবেন। তারপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে ডান হস্তে ধরে বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় শক্তিশালী লোকেরা! কোথায় অহংকারীরা? এরপর তিনি বাম হস্তে গোটা পৃথিবী গুটিয়ে নিবেন এবং বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় অত্যাচারী লোকেরা, কোথায় বড়ত্ব প্রদর্শনকারীরা? সহিহ মুসলিম : ২৭৮৮, মিশকাত : ৫৫২৩, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩২, ইবনু মাজাহ : ১৯৮, সহীহুল জামি : ৮০০৯, আবূ ইয়ালা : ৫৫৫৮, তবারানী : ৩৭

১২.  কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুস হয়ে প্রথম মুসা (আ.) দেখতে পাবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ ব্যক্তি একে অপরকে গালি দিয়েছিল। তাদের একজন ছিল মুসলিম, অন্যজন ইয়াহূদী। মুসলিম লোকটি বলল, তাঁর কসম, যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত প্রদান করেছেন। আর ইয়াহূদী লোকটি বলল, সে সত্তার কসম, যিনি মূসা (আঃ)-কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত দান করেছেন। এ সময় মুসলিম ব্যক্তি নিজের হাত উঠিয়ে ইয়াহূদীর মুখে চড় মারল। এতে ইয়াহূদী ব্যক্তিটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গিয়ে তার এবং মুসলিম ব্যক্তিটির মধ্যে যা ঘটেছিল, তা তাঁকে অবহিত করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমাকে মূসা (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তাদের সাথে আমিও বেহুঁশ হয়ে পড়ব। তারপর সকলের আগে আমার হুঁশ আসবে, তখন (দেখতে পাব) মূসা (আঃ) আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন অথবা আল্লাহ তা‘আলা যাঁদেরকে বেহুঁশ হওয়া হতে রেহাই দিয়েছেন, তিনি তাঁদের মধ্যে ছিলেন। সহিহ বুখারি : ২৪১১, ৩৪০৮, ৩৪১৪, ৪৮১৩, ৬৫১৭, ৬৫১৮, ৭৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৭৩, আহমাদ : ৭৫৮৯

হাশরের ময়দা : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দান হবে এক মহাবিস্ময়কর ও ভয়ংকর স্থান। পৃথিবী তখন তার বর্তমান রূপ হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক সমতল ভূমি হয়ে যাবে, যেখানে কোনো পাহাড়, পর্বত বা অসমতা থাকবে না। সেদিন সকল মানুষ, প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত, সেই ময়দানে একত্রিত হবে। এটি হবে এমন এক সমাবেশ, যার কোনো তুলনা নেই।

সূর্য সেদিন মানুষের খুব কাছে চলে আসবে, ফলে প্রচণ্ড গরমে সবাই অস্থির হয়ে পড়বে। পাপের পরিমাণ অনুযায়ী মানুষের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকবে। কেউ কেউ হাঁটুর সমান ঘামে, আবার কেউ কেউ বুক পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মানুষ কেবলই নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। সেদিন কোনো আপনজন কাউকে সাহায্য করতে পারবে না।

অপেক্ষা করতে করতে মানুষের ধৈর্য যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন তারা নবীদের কাছে শাফায়াতের জন্য যাবে। অবশেষে শাফায়াতের দায়িত্ব দেওয়া হবে শেষ নবীকে, যিনি আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। এরপরই শুরু হবে চূড়ান্ত বিচার। এটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আদালত, যেখানে প্রতিটি কাজের নিখুঁত হিসাব নেওয়া হবে এবং কোনো জুলুম করা হবে না। সেই দিনটি হবে বিশ্বাসীদের জন্য সুসংবাদ এবং অবিশ্বাসীদের জন্য চরম হতাশার দিন।

১. কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দানের অবস্থা

ক. হাশরের ময়দানের হবে সমতল ও মসৃণ ভূমি মত

কুরআনে আরও বলা হয়েছে যে, বিচার দিবসে পৃথিবী একটি সমতল, মসৃণ ও ধূসর ময়দানে পরিণত হবে। এতে কোনো বক্রতা বা উঁচু-নিচু জায়গা থাকবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَیَذَرُہَا قَاعًا صَفْصَفًا ۙ لَّا تَرٰی فِیْہَا عِوَجًا وَّلَاۤ اَمْتًا ؕ

‘তারপর তিনি তাকে মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন’। ‘তাতে তুমি কোন বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না’। সূরা ত্বাহা : ১০৬-১০৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ

যেদিন এ যমীন ভিন্ন যমীনে রূপান্তরিত হবে এবং আসমানসমূহও। আর তারা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাযির হবে। সূরা ইবরাহিম : ৪৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَوْمَ نُسَیِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَی الْاَرْضَ بَارِزَۃً ۙ  وَّحَشَرْنٰہُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْہُمْ اَحَدًا ۚ

স্মরণ কর সেদিনের কথা যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কেহকেও অব্যাহতি দিব না। সূরা কাহফ : ৪৭

সাহল ইবন সাআদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ، كَقُرْصَةِ النَّقِيِّ، لَيْسَ فِيهَا عَلَمٌ لِأَحَدٍ»

কিয়ামতের দিবসে মানুষকে সাদা পোড়ামাটি রংয়ের উদ্ভিদহীন একটি জমিনে একত্র করা হবে। যেখানে কারো জন্য কোনো আলামত থাকবে না”। সহিহ বুখারী : ৬৫২১, সহিহ মুসলিম : ২৭৯০, মিশকাত : ৫৫৩২,  সহীহুল জামি : ৮০৪৪, আবূ ইয়া’লা : ৭৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩২০, শুআবূল ঈমান : ৩৫৭।

২. হাশরের ময়দানে সবাইকে একত্র করার দৃশ্য

ক. কিয়ামতের দিন মানুষকে তাড়িয়ে হাশরের ময়দানে হাজির করা হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্রিত করা হবে তিন প্রকারে। একদল হবে আল্লাহর প্রতি আসক্ত ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত। দ্বিতীয় দল হবে দু’জন, তিনজন, চারজন বা দশজন এক উটের ওপর আরোহণকারী। আর অবশিষ্ট যারা থাকবে অগ্নি তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। যেখানে তারা থামবে আগুনও তাদের সঙ্গে সেখানে থামবে। তারা যেখানে রাত্রি কাটাবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে রাত্রি কাটাবে। তারা যেখানে সকাল করবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে সকাল করবে। যেখানে তাদের সন্ধ্যা হবে আগুন সেখানেও তাদের সাথে অবস্থান করবে। সহিহ বুখারি : ৬৫২২, সহিহ মুসলিম : ২৮৬১, মিশকাত : ৫৫৩৪, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৪৩৯৮, সুননে নাসায়ী : ২২১২, তবারানী : ১২৯০

খ. কিয়ামতে দিন কিছু মানুষ মুখে ভর দিয়ে হাশরের ময়দানে হাজির হবে

কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা এসেছে, যা থেকে বোঝা যায়, জালেম ও কাফেরদের কী অবমাননাকরভাবে জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে। এটি তাদের শাস্তির এক রূপ, দুনিয়ার গর্ব ও অহংকারের জবাব, যে দিন তারা লাঞ্ছিত হবে মুখ থুবড়ে। তারা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَّذِیْنَ یُحْشَرُوْنَ عَلٰی وُجُوْہِہِمْ اِلٰی جَہَنَّمَ ۙ  اُولٰٓئِکَ شَرٌّ مَّکَانًا وَّاَضَلُّ سَبِیْلًا 

যাদেরকে মুখে ভর দিয়ে দিয়ে চলা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে একত্র করা হবে, তাদেরই স্থান হবে অতি নিকৃষ্ট এবং তারাই পথভ্রষ্ট। সুরা ফুরকান : ৩৪

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর নবী! কিয়ামতের দিন কাফেরদের মুখে ভর করে চলা অবস্থায় একত্রিত করা হবে? তিনি বললেন, যিনি এ দুনিয়ায় তাকে দু’পায়ের উপর চালাতে পারছেন, তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখে ভর করে তাকে চালাতে পারবেন না? ক্বাতাদাহ (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই, আমার রবের ইজ্জতের কসম! সহিহ বুখারি : ৪৭৬০, ৬৫২৩, সহিহ মুসলিম : ২৮০৬, মিশকাত : ৫৫৩৭, আহমাদ : ১৩৪১৬, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৫০৭, আবূ ইয়া’লা:  ৩০৪৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩২৩,

বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে তার বাবা, অতঃপর তার দাদার সুত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ (কিয়ামত দিবসে) তোমাদের পায়ে হাটিয়ে, সাওয়ারী হিসাবে এবং কিছু সংখ্যককে মুখের উপর উপুড় করে টেনে হাযির করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৪২৪ হাদিসের মান সহিহ

গ. কাফিরের অন্ধ হয়ে উপস্থিত হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

﴿ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحْشُرُهُۥ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ أَعْمَىٰ ١٢٤ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِيٓ أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرٗا ١٢٥ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلْيَوْمَ تُنسَىٰ ١٢٦

আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো”। সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ عُمْيٗا وَبُكْمٗا وَصُمّٗاۖ مَّأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُۖ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَٰهُمْ سَعِيرٗ

“আর আমরা কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম, যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব। সূরা ইসরা : ৯৭

ঘ. হাশরের ময়দানে ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَلَّآۖ إِذَا دُكَّتِ ٱلْأَرْضُ دَكّٗا دَكّٗا ٢١ وَجَآءَ رَبُّكَ وَٱلْمَلَكُ صَفّٗا صَفّٗا ٢٢ وَجِاْيٓءَ يَوْمَئِذِۢ بِجَهَنَّمَۚ يَوْمَئِذٖ يَتَذَكَّرُ ٱلْإِنسَٰنُ وَأَنَّىٰ لَهُ ٱلذِّكْرَىٰ ٢٣ يَقُولُ يَٰلَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي ٢٤

কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে পরিপূর্ণভাবে। আর তোমার রব ও ফিরিশতাগণ উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। আর সেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু সেই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে? সে বলবে, হায়! যদি আমি কিছু আগে পাঠাতাম আমার এ জীবনের জন্য! সূরা ফাজর : ২১-২৪

ঙ. হাশরের মাঠে সকলে নগ্ন পদে নগ্ন দেহে পায়ে হেঁটে ও খাতনা বিহীন অবস্থায় হাজির হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ

যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সুরা আম্বিয়া : ১০৪

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন-

إِنَّكُمْ مُلاَقُو اللهِ حُفَاةً عُرَاةً مُشَاةً غُرْلاً قَالَ سُفْيَانُ هَذَا مِمَّا نَعُدُّ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ سَمِعَهُ مِنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

নিশ্চয়ই তোমরা নগ্ন পদে নগ্ন দেহে পায়ে হেঁটে ও খাতনা বিহীন অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। সুফ্ইয়ান বলেন, এ হাদীসকে ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) এর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে স্বয়ং শুনা হাদীসসমূহের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। সহিহ বুখারি : ৬৫২৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৬০, আহমাদ : ১৯১৩

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষকে হাশরের মাঠে উঠানো হবে নগ্ন পদ, নগ্ন দেহ ও খাতনাবিহীন অবস্থায়। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তাহলে পুরুষ ও নারীগণ একে অপরের দিকে তাকাবে। তিনি বললেন: এরকম ইচ্ছে করার চেয়ে তখনকার অবস্থা হবে অতীব সংকটময়। সহিহ বুখারি : ৩৪৪৭, ৬৫২৭, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৯, সুনানে তিরমিযী : ২৪২৩, সুনানে নাসায়ী : ২০৮৩, সহীহুল জামি : ৫২৩৫,  সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৬৯, মুসনাদে বাযযার : ২০২৩, মুসনাদে আহমাদ : ২৪৩১০, আবূ ইয়া’লা : ২৫৭৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩১৬, শুআবূল ঈমান : ৩৫৯, , দারিমী : ২৮০০, ত্ববারানী : ১২১৪৩, হাকিম : ৮৭১৫।

চ. সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আ.) কে কাপড় পরানো হবে

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে হাশর ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-

کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ

যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। আম্বিয়াঃ ১০৪

আর কিয়ামতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহীম (আ.)। আর আমার অনুসারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে পাকড়াও করে বাম দিকে অর্থাৎ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী, এরা তো আমার অনুসারী। এ সময় আল্লাহ বললেন, যখন আপনি এদের নিকট হতে বিদায় নেন, তখন তারা পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়। কাজেই তারা আপনার সাহাবী নয়। তখন আল্লাহর নেক বান্দা [ঈসা (আঃ)] যেমন বলেছিলেন, তেমন আমি বলব, হে আল্লাহ! আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক। আপনি ক্ষমতাধর হিকমত ওয়ালা। সুরা মায়িদা : ১১৭। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৯, ৪৩৩৭, ৪৬২৫, ৪৬২৬, ৪৬৪০, ৬৫২৬, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৯, সুনানে তিরমিযী : ২৪২৩, সুনানে নাসায়ী : ২০৮১, মিশকাত : ৫৫৩৫, সহীহুল জামি : ৭৮৭০ সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৬৯, মুসনাদে বাযযার : ২০২৩, মুসনাদে আহমাদ : ১৯৫০।

ছ. কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন একটি রুটি হয়ে যাবে

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন একটি রুটি হয়ে যাবে। আর আল্লাহ তা’আলা বেহেশতীদের মেহমানদারীর জন্য তাকে বেহেশতে তুলে নেবেন। যেমন তোমাদের মাঝে কেউ সফরের সময় তার রুটি হাতে তুলে নেয়। এমন সময় একজন ইহুদী এলো এবং বলল, হে আবূল কাসিম! দয়াময় আপনাকে বরকত প্রদান করুন। কিয়ামতের দিন বেহেশতিদের আতিথেয়তা সম্পর্কে আপনাকে কি জানাব না? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। লোকটি বলল, (সেই দিন) সমস্ত ভূ-মণ্ডল একটি রুটি হয়ে যাবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন (লোকটিও সেইরূপই বলল)। এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকালেন এবং হাসলেন। এমনকি তার চোয়ালের দাঁতসমূহ প্রকাশ পেল। এরপর তিনি বললেনঃ তবে কি আমি তোমাদেরকে (সেই রুটির) তরকারী সম্পর্কে বলব না? তিনি বললেনঃ তাদের তরকারী হবে বালাম এবং নূন। সাহাবাগন বললেনঃ সে আবার কি? তিনি বললেনঃ ষাড় এবং মাছ। এদের কলিজার গুরদা থেকে সত্তর হাজার লোক খেতে পারবে। সহিহ বুখারি : ৬৫২০, সহিহ মুসলিম : ২৭৯২, মিশকাত : ৫৫৩৩ সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ১৪৩৮, সহীহুল জামি : ২৯৮৮।

জ. হাশরের ময়দানের মানুষ ঘামে হাবুডুবু খাবে।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«يَعْرَقُ النَّاسُ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتَّى يَذْهَبَ عَرَقُهُمْ فِي الأَرْضِ سَبْعِينَ ذِرَاعًا، وَيُلْجِمُهُمْ حَتَّى يَبْلُغَ آذَانَهُمْ»

কিয়ামতের দিন মানুষ ঘর্মাক্ত হবে। এমনকি যমীনের সত্তর হাত ঘামে ডুবে যাবে। তাদের ঘামে তারা কান পর্যন্ত ডুবে যাবে”। সহিহ বুখারী : ৬৫৩২, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৩, মিশকাত : ৫৫৩৯, মুসনাদে আহমাদ : ৯৪১৬, সহীহুল জামি : ১৬৭৯।

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। আল্লাহ বলেন-

یَّوْمَ یَقُوْمُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ؕ

যেদিন মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের জন্য দাঁড়াবে। সূরা মুতাফ্ফিফীন : ৬ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তির কানের লতা পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯৩৮, ৬৫৩১, সহিহ মুসলিম : ২৮৬২, আহমাদ : ৬০৭২

মিকদাদ ইবন আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামত দিবসে সূর্য মানুষের খুব নিকটবর্তী হবে। এমনকি এর দুরত্ব এক মাইল পরিমাণ হবে। এ সম্পর্কে সুলাইম ইবন আমের বলেন, আল্লাহর শপথ! মাইল বলতে এখানে কোনো মাইল তিনি বুঝিয়েছেন আমি তা জানি না। জমির দূরত্ব পরিমাপের মাইল বুঝিয়েছেন, না সুরমা দানির মাইল (শলাকা) বুঝিয়েছেন? মানুষ তার আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে থাকবে। কারো ঘাম হবে পায়ের গিরা বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে হাটু বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে কোমর বরাবর। আবার কারো ঘামের পরিমাণ হবে তার মুখ বরাবর” সহিহ মুসলিম : ২৮৬৪।

ঝ. মুত্তাকীরা আল্লাহর মেহমানরূপে হাজির হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا، وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَىٰ جَهَنَّمَ وِرْدًا

সেদিন আমরা মুত্তাকীদেরকে দয়াময় আল্লাহর কাছে সম্মানিত মেহমানরূপে একত্র করব। আর অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারয়াম: ৮৫-৮৬)

ঞ. কেউ উজ্জ্বল আবার কেউ কালো মুখমণ্ডল নিয়ে হাজির হবে

ঈমানদার ও নেককারদের মুখ সেদিন হবে উজ্জ্বল ও হাস্যোজ্জ্বল, আর অবিশ্বাসীদের মুখ হবে মলিন ও কালো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ، ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ، وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ، تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ، أُوْلَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ

সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, হাস্যোজ্জ্বল, আনন্দিত। আর কিছু মুখ হবে ধুলোমলিন, সেগুলোকে আচ্ছন্ন করে থাকবে কালিমা। এরাই হলো কাফির ও পাপিষ্ঠরা।”সূরা আবাসা: ৩৮-৪২

ট. কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে।

মিকদাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে। এমনকি তা প্রায় এক মাইলের ব্যবধানে হয়ে যাবে। অতএব তখন তার তাপে মানব সম্প্রদায় আপন আপন ’আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। কারো ঘাম টাখনু পর্যন্ত হবে। কারো হাঁটু অবধি। কারো কোমর অবধি আর কারো জন্য এ ঘাম লাগাম পর্যন্ত হয়ে যাবে (অর্থাৎ তার মুখের ভিতরে লাগামের ন্যায় ঢুকে যাবে) এ কথাটি বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের মুখের দিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। সহিহ মুসলিম : ২৮৬৪, মিশকত : ৫৫৪০, সহীহুল জামি : ২৯৩৩, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব:  ৩৫৮৭, শু’আবূল ঈমান : ২৫৮, তবারানী : ১৬৯৯০

রিয়াকারী ও সালাত ত্যাগ হাশরে আল্লাহ দেখে সিজদা দিতে পারবেনা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ یُکْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَّیُدْعَوْنَ اِلَی السُّجُوْدِ فَلَا یَسْتَطِیْعُوْنَ ۙ

সে দিন পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, (কিয়ামতের দিন) যখন আমাদের প্রভু পায়ের নলা বা গোছা উন্মোচিত করবেন, তখন ঈমানদার নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই তাঁকে সিজদাহ্ করবে। আর বিরত থাকবে ঐ সকল লোক যারা দুনিয়াতে রিয়া (লোক দেখানো) ও শুনানোর জন্য সিজদাহ্ করত, তারা সিজদাহ করতে চাইবে কিন্তু তাদের পৃষ্ঠদেশ ও কোমর একটি কাষ্ঠফলকের মতো শক্ত হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯১৯, মিশকাত : ৫৫৪২, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৫৮৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৭।

৩. মানুষ তাদের নির্বাচিত গাইরুল্লাহ প্রত্যাখ্যান করবে

দুনিয়াতে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত বা অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন সেই অনুসারী এবং তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিরা একে অপরের থেকে দায়মুক্ত হতে চাইবে। কিয়ামতের দিন যখন সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে, তখন মানুষেরা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করবে।

ক. ইবাদতের অংশীদাররা প্রত্যাখ্যান করবে:

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, দুনিয়াতে যাদেরকে আল্লাহর অংশীদার হিসেবে ইবাদত করা হয়েছে, কিয়ামতের দিন তারাই এই ইবাদতকারীদের থেকে নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعٗا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُواْ مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَآؤُكُمْۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْۖ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ ٢٨

আর যেদিন আমরা তাদের সকলকে একত্র করব, অতঃপর যারা শির্‌ক করেছে, তাদেরকে বলব, থাম, তোমরা ও তোমাদের শরীকরা। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাব। আর তাদের শরীকরা বলবে, তোমরা তো আমাদের ইবাদাত করতে না”। সূরা ইউনূস : ২৮

এই আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন শিরককারীরা তাদের উপাস্যদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাবে না, বরং তারাই তাদের অস্বীকার করবে।

খ. শয়তান তার অনুসারীদের প্রত্যাখ্যান করবে:

শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সব সময় চেষ্টা করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন ফলাফল প্রকাশ পাবে, তখন শয়তান নিজেই তার অনুসারীদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالَ الشَّیْطٰنُ لَمَّا قُضِیَ الْاَمْرُ اِنَّ اللّٰہَ وَعَدَکُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُّکُمْ فَاَخْلَفْتُکُمْ ؕ وَمَا کَانَ لِیَ عَلَیْکُمْ مِّنْ سُلْطٰنٍ اِلَّاۤ اَنْ دَعَوْتُکُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِیْ ۚ فَلَا تَلُوْمُوْنِیْ وَلُوْمُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ مَاۤ اَنَا بِمُصْرِخِکُمْ وَمَاۤ اَنْتُمْ بِمُصْرِخِیَّ ؕ اِنِّیْ کَفَرْتُ بِمَاۤ اَشْرَکْتُمُوْنِ مِنْ قَبْلُ ؕ اِنَّ الظّٰلِمِیْنَ لَہُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ

আর যখন যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন সত্য ওয়াদা, তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্য ছিল না, তবে আমিও তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, এখন আমি তা ভঙ্গ করলাম। তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, আর তোমরা আমার দাওয়াতে সাড়া দিয়েছ। সুতরাং তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না, বরং নিজদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, আর তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা আমাকে যার সাথে শরীক করেছ, নিশ্চয় আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। সূরা ইবরাহিম : ২২

গ. নেতারা অনুসারীদের থেকে দায়মুক্ত হবে

ইসলামে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে কোনো নেতা বা গোষ্ঠীর মনগড়া নিয়ম অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন তারাও চরম হতাশার মধ্যে পড়বে। সেই নেতারা তাদের অনুসারীদের অস্বীকার করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَٱتَّخَذُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ ءَالِهَةٗ لِّيَكُونُواْ لَهُمْ عِزّٗا ٨١ كَلَّاۚ سَيَكْفُرُونَ بِعِبَادَتِهِمْ وَيَكُونُونَ عَلَيْهِمْ ضِدًّا ٨

আর তারা আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ গ্রহণ করেছে, যাতে ওরা তাদের সাহায্যকারী হতে পারে। কখনো নয়, এরা তাদের ইবাদাতের কথা অস্বীকার করবে এবং তাদের বিপক্ষ হয়ে যাবে। সূরা মারইয়াম : ৮১-৮২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّاۤ اَطَعْنَا سَادَتَنَا وَکُبَرَآءَنَا فَاَضَلُّوْنَا السَّبِیْلَا رَبَّنَاۤ اٰتِہِمْ ضِعْفَیْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْہُمْ لَعْنًا کَبِیْرًا

তারা আরো বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল’। হে আমাদের রব, আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দিন এবং তাদেরকে বেশী করে লা‘নত করুন’। সূরা আহযাব: ৬৭-৬৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِذْ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ ٱلْأَسْبَابُ ١٦٦ وَقَالَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةٗ فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُواْ مِنَّاۗ كَذَٰلِكَ يُرِيهِمُ ٱللَّهُ أَعْمَٰلَهُمْ حَسَرَٰتٍ عَلَيْهِمْۖ وَمَا هُم بِخَٰرِجِينَ مِنَ ٱلنَّارِ ١٦٧

“যখন অনুসরনীয় ব্যক্তিরা অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং তারা আযাব দেখতে পাবে। আর তাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যারা অনুসরণ করেছে, তারা বলবে, যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন তাদের আক্ষেপের জন্য, আর তারা আগুন থেকে বের হতে পারবে না”। সূরা বাকারা : ১৬৬-১৬৭

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সেদিন দুনিয়ার সব সম্পর্ক, প্রভাব এবং আনুগত্য ভেঙে যাবে। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইবাদত বা অনুসরণ করেছে, তারা চরম হতাশ হবে। তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি বা শক্তি, তা সে শয়তান হোক, কোনো নেতা হোক, বা কোনো মূর্তি হোক—কেউই তাদের পাশে দাঁড়াবে না, বরং সবাই নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে। এই কারণে ইসলামে শিরক থেকে দূরে থাকার ওপর এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৪. হাশরের মাঠে পরকাল অস্বীকারকারীদের ধ্বংশ

পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে শাস্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই শাস্তিগুলো কেবল পরকালের জন্যই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে কবরের জীবন থেকেও শুরু হয়। কুরআনের আলোকে পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য কিছু প্রধান শাস্তি নিচে তুলে ধরা হলো:

ক. অন্ধ ও হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় হাশর

হাশরের ময়দানে পরকাল অস্বীকারকারীদের অন্ধ অবস্থায় উঠানো হবে। তারা কোনো কিছু দেখতে পাবে না এবং তাদের মধ্যে থাকবে গভীর হতাশা ও অনুশোচনা।

وَمَنْ اَعْرَضَ عَنْ ذِکْرِیْ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیْشَۃً ضَنْکًا وَّنَحْشُرُہٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ اَعْمٰی

‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সূরা ত্ব-হা : ১২৪

খ. আমলনামা বাম হাতে দেওয়া

কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির আমলনামা (জীবনের হিসাব) দেওয়া হবে। যারা পরকাল অস্বীকারকারী, তাদের আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে। এতে তারা অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হবে।

وَاَمَّا مَنْ اُوْتِیَ کِتٰبَہٗ بِشِمَالِہٖ ۬ۙ  فَیَقُوْلُ یٰلَیْتَنِیْ لَمْ اُوْتَ کِتٰبِیَہْ ۚ

কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, ‘হায়, আমাকে যদি আমার আমলনামা দেয়া না হত’! সূরা আল-হাক্কাহ : ২৫

গ. চেহারার মলিনতা এবং কালিমা

কেয়ামতের দিন পরকাল অস্বীকারকারীদের চেহারা কালো ও মলিন হয়ে যাবে, যা তাদের অপমান ও পাপের পরিচায়ক হবে।

وَیَوْمَ الْقِیٰمَۃِ تَرَی الَّذِیْنَ کَذَبُوْا عَلَی اللّٰہِ وُجُوْہُہُمْ مُّسْوَدَّۃٌ ؕ اَلَیْسَ فِیْ جَہَنَّمَ مَثْوًی لِّلْمُتَکَبِّرِیْنَ

আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে। অহঙ্কারীদের বাসস্থান জাহান্নামের মধ্যে নয় কি? সূরা আয-যুমার: ৬০

ঘ. কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি

কুরআন স্পষ্টভাবে বলে যে, পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য এক কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এই শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না এবং এর তীব্রতা হবে কল্পনাতীত।

بَلْ کَذَّبُوْا بِالسَّاعَۃِ ۟  وَاَعْتَدْنَا لِمَنْ کَذَّبَ بِالسَّاعَۃِ سَعِیْرًا ۚ

বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে আর কিয়ামতকে যে অস্বীকার করে তার জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুন। সূরা ফুরকান : ১১

ঙ. যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে

পরকাল অস্বীকারকারীদের প্রধান পরিণতি হলো জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান। এই জাহান্নাম থেকে তাদের কোনোদিন মুক্তি দেওয়া হবে না এবং তাদের কষ্ট কখনো শেষ হবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَلِقَآئِہٖۤ اُولٰٓئِکَ یَئِسُوْا مِنْ رَّحْمَتِیْ وَاُولٰٓئِکَ لَہُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ

আর যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর সাক্ষাত অস্বীকার করে তারা আমার রহমত থেকে হতাশ হবে এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা আনকাবুত : ২৩

এই শাস্তিগুলো পরকাল অস্বীকারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে এবং বিশ্বাসীদেরকে সঠিক পথে চলার জন্য উৎসাহিত করে। এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, পরকালকে অস্বীকার করা কেবল একটি চিন্তাভাবনা নয়, বরং এর জন্য কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

চ. কিয়ামতের দিন কাফিরদের জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন খুব মোটাতাজা একজন বড় লোক আসবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা একটি মশার পাখার সমানও হবে না। অতঃপর তিনি এর প্রমাণস্বরূপ বললেন, তোমরা এই আয়াতটি পাঠ কর-

 فَلَا نُقِیْمُ لَهُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَزْنًا

“আমি কিয়ামতের দিন কাফিরদের (নেক ’আমলের) জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না। সূরা কাহফ : ১০৫। সহিহ বুখারি : ৪৭২৯, সহহি মুসলিম : ২৭৮৫), মিশকাত : ৫৫৪৩, সহীহুল জামি : ২৪০৭, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩২০১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ৩৫৮১

হাশরের ময়দা : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৫. ইবরাহীম আ. এর পিতাকে ক্ষমা করা হবে না

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তার পিতা আযর-এর সাক্ষাৎ পাবেন। তখন আযর-এর চেহারা হবে কালো ধুলাবালি মিশ্রিত। তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তাকে বলবেন, আমি কি আপনাকে (দুনিয়াতে) বলেছিলাম না যে, আপনি আমার কথা অমান্য করবেন না? তখন তার পিতা তাকে বলবেন, আজ আমি তোমার অবাধ্যতা করব না। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম বলবেন, হে প্রতিপালক! আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, হাশরের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না। অথচ আজ আমার পিতা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত, অতএব এর চেয়ে অধিক লাঞ্ছনা ও অপমান আর কি হতে পারে? তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত অবৈধ করে রেখেছি। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে বলা হবে, তুমি তোমার পায়ের তলার দিকে দেখ। তিনি সে দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই হঠাৎ দেখবেন যে, তার সামনে কাদা গোবরে লণ্ডভণ্ড শিয়াল আকৃতি একটি নিকৃষ্ট পশু দাঁড়িয়ে আছে। তখনি তাকে চার পা ধরে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৩৩৫০, মিশকাত : ৫৫৩৮, সহীহুল জামি : ৮১৫৮, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম : ২৯৩৬।

৬. কিয়ামতের দিন কিছু মানুষকে আরশের ছায়ায় স্থান দেওয়া হবে

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: «أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي، الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي»

আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমারই জন্য পরস্পরকে ভালোবেসেছে তারা আজ কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় ছায়া দান করবো। আজ এমন দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই”। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৬।

আবু ইয়াসার কা‘আব ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا أَوْ وَضَعَ عَنْهُ، أَظَلَّهُ اللهُ فِي ظِلِّهِ»

“যে কোনো ঋণগ্রস্ত বা অভাবী ব্যক্তিকে সুযোগ দিবে অথবা তাকে ঋণ আদায় থেকে অব্যাহতি দিবে আল্লাহ তায়ালা তাকে নিজ ছায়ায় আশ্রয় দিবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৩০২

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

কিয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ‘আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোনো ছায়া থাকবে না- ন্যায়পরায়ন বাদশাহ, এমন যুবক যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে, ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা সংশি­ষ্ট থাকে মসজিদের সাথে, এমন দু ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য, এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী নেতৃস্থানীয়া এক রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের প্রতি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি, এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দু-চোখ বেয়ে বয়ে যায় অশ্রুধারা” সহিহ বুখারি ৬৬০, সহিহ  মুসলিম : ১০৩১।

৭. কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠি মুমিনগণ আল্লাহকে দেখতে পাবে

আবূ রযীন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাবো এবং তাঁর সৃষ্টির মাঝে এর নিদর্শন কী? তিনি বলেনঃ হে আবূ রযীন! তোমাদের প্রত্যেকে কি চাঁদকে পৃথকভাবে দেখতে পায় না? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ আল্লাহ অতীব মহান এবং এটাই হল তাঁর সৃষ্টির মাঝে (তাঁর) নিদর্শন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮০, মিশকাত : ৫৬৫৮, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩১, ইবনু মাজাহ : ১৮০, মুসনাদে আহমাদ : ১৬২৩১, ত্ববারানী : ১৫৭৯৬।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামত দিবসে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আচ্ছা দুপুর বেলা যখন মেঘ না থাকে তখন সূর্যকে দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন, না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন: পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে মেঘ না থাকে তখন চাঁদ দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন: না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমাদের প্রতিপালককে দেখার জন্য সেদিন তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হবে না। যেমন সূর্য ও চন্দ্র দেখার জন্য তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হয় না। আল্লাহ এক বান্দার সাথে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাইনি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাইনি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর দ্বিতীয় এ ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাই নি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাই নি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর তৃতীয় এক ব্যক্তিকে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অপর দুজনের মত করেই প্রশ্ন করবেন। সে বলবে, আমি আপনার প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। আপনার কিতাব, আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। সালাত পড়েছি, রোযা রেখেছি, দান-সদকা করেছি। সাধ্যমত আপনার প্রশংসা করেছি। তার উত্তর শুনে আল্লাহ বলবেন, তাই নাকি? তাহলে এখনই তোমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী উপস্থিত করি। তারপর (তোমার উত্তর সম্পর্কে) তুমি ভেবে দেখবে। বলা হবে, কে আছে তার সম্পর্কে স্বাক্ষ্য দিবে? এরপর তার মুখ সীল করে দেওয়া হবে। তার রান, তার মাংস, তার হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। এরা তাদের জানা মতে তথ্য দিতে শুরু করবে। এভাবে আল্লাহ নিজে স্বাক্ষ্য দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। আসলে এ ব্যক্তিটি ছিল দুনিয়ার জীবনে মুনাফিক। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন”। সহীহ বুখারী : ৭৪৩৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৭৯১৪, আবূ ইয়া’লা : ৬৬৮৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪৬৪২. হাকিম : ৮৭৩৬।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন যে, কয়েকজন সাহাবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত দিবসে আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের মাঝে কষ্ট হয়? সাহাবাগণ বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের কষ্টবোধ হয়? তারা বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তদ্রুপ তোমরা তাকেও দেখবে। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ সকল মানুষকে জমায়েত করে বলবেন, পৃথিবীতে তোমাদের যে যার ইবাদাত করেছিলে আজ তাকেই অনুসরণ কর।

তখন যারা সূর্যের উপাসনা করতো, তারা সূর্যের সাথে থাকবে। যারা চন্দ্রের উপাসনা করতো, তারা চন্দ্রের সাথে থাকবে। আর যারা আল্লাহদ্রোহীদের (তাগুতের) উপাসনা করতো, তারা আল্লাহদ্রোহীদের সাথে জমায়েত হয়ে যাবে। কেবল এ উম্মত অবশিষ্ট থাকবে। তন্মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট এমন আকৃতিতে উপস্থিত হবেন যা তারা চিনে না। তারপর (আল্লাহ তা’আলা) বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক (সুতরাং তোমরা আমার পিছনে চল)। তারা বলবে, নাউযুবিল্লাহ। আমাদের প্রভু না আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই দাড়িয়ে থাকবো। আর তিনি যখন আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারবো।

এরপর আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট তাদের পরিচিত আকৃতিতে আসবেন, বলবেনঃ আমি তোমাদের প্রভু। তারা বলবে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের প্রতু। এ বলে তারা তাকে অনুসরণ করবে। এমন সময়ে জাহান্নামের উপর দিয়ে সিরাত (সাকো) বসানো হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আর আমি ও আমার উম্মতই হব প্রথম এ পথ অতিক্রমকারী। সেদিন রাসূলগণ ব্যতীত অন্য কেউ মুখ খোলারও সাহস করবে না। আর রাসূলগণও কেবল এ দু’আ করবেন। হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দাও, নিরাপত্তা দাও। আর জাহান্নামে থাকবে সা’দান বৃক্ষের কাটার মত অনেক কাটাযুক্ত লৌহদণ্ড। তোমরা সাদান বৃক্ষটি দেখেছ কি? সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তা সাদান বৃক্ষের কাটার মতই, তবে সেটা যে কত বিরাট তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। পাপ কাজের জন্য কাটার আংটাগুলো ছোবল দিতে থাকবে। তাদের কেউ কেউ মু’মিন (যারা সাময়িক জাহান্নামী) তারা রক্ষা পাবে, আর কেউ তো শাস্তি ভোগ করে নাযাত পাবে।

এরপর আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা হতে অবসর হলে স্বীয় রহমতে কিছু সংখ্যক জাহান্নামীদের (জাহান্নাম হতে) বের করতে দেয়ার ইচ্ছা করবেন তখন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন যারা কালিমায় বিশ্বাসী ও শিরক করেনি যাদের উপর আল্লাহ তা’আলা রহম করতে চাইবেন যে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসো। আর যাদের উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করতে চেয়েছেন তারা ঐ সকল লোক যারা ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলত। অতঃপর ফেরেশতাগণ তাদের সনাক্ত করবেন। তারা সিজদা চিহ্নের সাহায্যে তাদের চিনবেন। কারণ, অগ্নি মানুষের দেহের সবকিছু জ্বালিয়ে ফেললেও সাজদার স্থান অক্ষত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা সাজদার চিহ্ন নষ্ট করা হারাম (নিষিদ্ধ) করে দিয়েছেন। মোটকথা, ফেরেশতাগণ এদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে এমন অবস্থায় যে, তাদের দেহ আগুনে দগ্ধ। তাদের উপর ’মাউল-হায়াত’ (সঞ্জীবনী পানি) ঢেলে দেয়া হবে। তখন তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে যেমনভাবে শস্য অঙ্কুর পানিসিক্ত উর্বর জমিতে সতেজ হয়ে উঠে।

তারপর আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের বিচার সমাপ্ত করবেন। শেষে এক ব্যক্তি থেকে যাবে। তার মুখমণ্ডল হবে জাহান্নামের দিকে। এই হবে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী। সে বলবে, হে আমার প্রভু! (অনুগ্রহ করে) আমার মুখটি জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিন। কারণ জাহান্নামের দুর্গন্ধ আমাকে অসহনীয় কষ্ট দিচ্ছে; এর লেলিহান অগ্নিশিখা আমাকে দগ্ধ করে দিচ্ছে। আল্লাহ যতদিন চান ততদিন পর্যন্ত সে তার নিকট দু’আ করতে থাকবে। পরে আল্লাহ বলবেন, তোমার এ দু’আ কবুল করলে তুমি কি আরো কিছু কামনা করবে? সে বিভিন্ন ধরনের ওয়াদা ও অঙ্গীকার করে বলবে যে, জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিবেন।

তার চেহারা যখন জান্নাতের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, আর সে জান্নাত দেখবে, তখন আল্লাহ যতদিন চান সে নীরব থাকবে। পরে আবার বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেবল জান্নাতের দরজা পর্যন্ত আমাকে পৌছে দিন। আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি না অঙ্গীকার দিয়েছিলে যে, আমি তোমাকে যা দিয়েছি তা ছাড়া আর কিছু চাইবে না। হে আদম সন্তান! তুমি হতভাগা ও তুমি সাংঘাতিক ওয়াদাভঙ্গকারী। তখন সে বলবে, হে আমার রব! এই বলে আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকবে। আল্লাহ বলবেন, তুমি যা চাও তা যদি দিয়ে দেই তবে আর কিছু চাইবে না তো? সে বলবে, আপনার ইজ্জতের কসম! আর কিছু চাইব না। এভাবে সে তার অক্ষমতা (আল্লাহর কাছে) পেশ করতে থাকবে যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা হয়।

তারপর তাকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া হবে। এবার যখন সে জান্নাতের দরজায় দাঁড়াবে, তখন জান্নাত তার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সে জান্নাতের সমৃদ্ধি ও সুখ দেখতে থাকবে। সেখানে আল্লাহ যতক্ষণ চান সে ততক্ষণ চুপ করে থাকবে। পরে বলবে, হে আমার রব! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, তুমি না সকল ধরনের ওয়াদা ও অঙ্গীকার করে বলেছিলে, আমি যা দান করেছি এর চাইতে বেশি আর কিছু চাইবে না? হে হতভাগা আদম সন্তান! তুমি তো ভীষণ ওয়াদাভঙ্গকারী। সে বলবে, হে আমার রব। আমি যেন আপনার সৃষ্টির সবচেয়ে দুর্ভাগা না হই। সে বার বার দু’আ করতে থাকবে। পরিশেষে তার অবস্থা দেখে আল্লাহ তা’আলা হেসে ফেলবেন। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। (জান্নাতে প্রবেশের পর) আল্লাহ তাকে বলবেন, (যা চাওয়ার) চাও। তখন সে তার সকল কামনা চেয়ে শেষ করবে। এরপর আল্লাহ নিজেই স্মরণ করায়ে বলবেন, অমুক অমুকটা চাও। এভাবে তার কামনা শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ বলবেন, তোমাকে এ সব এবং এর সমপরিমাণ আরো দেয়া হল। সহিহ মুসলিম : ১৮২

৮. ফিরিশতাগণ মুশরিকদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দিবে

আরবের মুশরিকরা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহ তায়ালার কন্যা বলে জ্ঞান করতো। তাই তারা ফিরিশতাদের পূজা করতো। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, অবিশ্বাসীরা কি তাদের পূজা করত? ফিরিশতারা সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেদের পবিত্র ঘোষণা করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعٗا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَٰٓئِكَةِ أَهَٰٓؤُلَآءِ إِيَّاكُمْ كَانُواْ يَعْبُدُونَ ٤٠ قَالُواْ سُبْحَٰنَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِمۖ بَلْ كَانُواْ يَعْبُدُونَ ٱلْجِنَّۖ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ ٤١

আর স্মরণ কর, যেদিন তিনি তাদের সকলকে সমবেত করবেন তারপর ফেরেশতাদেরকে বলবেন, ‘এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?’ তারা (ফেরেশতারা) বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা নয়। বরং তারা জিনদের পূজা করত। এদের অধিকাংশই তাদের প্রতি ঈমান রাখত’। সূরা সাবা : ৪০-৪১

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সকল প্রকার শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্বের মিথ্যাকে প্রকাশ করে দেবেন। যারা ফিরিশতা, নবী-রাসূল বা জিনদের পূজা করত, তাদের উপাসনার এই দাবি সেদিন বাতিল প্রমাণিত হবে। তারা কেউ কারো কোন উপকার করেত পারবে না।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

فَٱلْيَوْمَ لَا يَمْلِكُ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٖ نَّفْعٗا وَلَا ضَرّٗا وَنَقُولُ لِلَّذِينَ ظَلَمُواْ ذُوقُواْ عَذَابَ ٱلنَّارِ ٱلَّتِي كُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ

ফলে আজ তোমাদের একে অপরের কোনো উপকার কিংবা অপকার করার ক্ষমতা কেউ রাখবে না। আর আমি যালিমদের উদ্দেশ্যে বলব, তোমরা আগুনের আযাব আস্বাদন কর যা তোমরা অস্বীকার করতে”। সূরা সাবা : ৪২

৯. মুশরিকদের মূর্তিগুলো পুজারীদের সাহায্য করতে অক্ষমতা প্রকাশ করবে

দুনিয়াতে যারা মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজা করেছে, কিয়ামতের দিন সেই পূজিত বস্তুগুলো তাদের পূজারীদের কোনো রকম সাহায্য করতে পারবে না। বরং তারা হয় পূজারীদের বিপক্ষে সাক্ষী দেবে অথবা তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে। কুরআনে বেশ কয়েকটি আয়াতে এই সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذَا حُشِرَ النَّاسُ کَانُوْا لَہُمْ اَعْدَآءً وَّکَانُوْا بِعِبَادَتِہِمْ کٰفِرِیْنَ

আর যখন মানুষকে একত্র করা হবে, তখন এ উপাস্যগুলো তাদের (পূজারীদের) শত্রু হবে এবং তারা তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে। সূরা আহকাফ: ৬

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন পূজিত উপাস্যগুলো তাদের পূজারীদের ইবাদত অস্বীকার করবে। অর্থাৎ, তারা বলবে যে, “আমরা তোমাদের ইবাদত সম্পর্কে অবগত নই এবং আমাদের ইবাদত করার জন্য আমরা তোমাদেরকে নির্দেশও দেইনি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُوا مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَاؤُكُمْ ۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ ۖ وَقَالَ شُرَكَاؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ

আর যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব, তারপর যারা শির্ক করেছিল, তাদের বলব, তোমরা এবং তোমাদের অংশীদাররা নিজ নিজ স্থানে থাকো। অতঃপর আমি তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেব এবং তাদের অংশীদাররা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ইবাদত করতে না’। সূরা ইউনুস: ২৮

এই আয়াতটিতে আরও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, পূজিত উপাস্যগুলো কেবল অসহায়ত্বই প্রকাশ করবে না, বরং তাদের পূজারীদের ইবাদত অস্বীকার করে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أَتَدْعُونَ مَن لَّا يَسْمَعُ دُعَاءَكُمْ وَلَا يَضُرُّكُمْ وَلَا يَنفَعُكُمْ

তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছুকে ডাকো, যা তোমাদের কোনো ডাকে সাড়া দিতে পারে না, তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারে না?” সূরা আরাফ: ১৯২

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মূর্তিপূজার ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেছেন। এই মূর্তিগুলো এতটাই ক্ষমতাহীন যে, তারা তাদের পূজারীদের প্রার্থনা শুনতে বা কোনো সাহায্য করতে পারে না।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, ‘যে যার পূজা করত, সে তার অনুসরণ করুক।’ তখন যারা সূর্যের পূজা করত, তারা সূর্যের সঙ্গে, যারা চন্দ্রের পূজা করত, তারা চন্দ্রের সঙ্গে এবং যারা প্রতিমার পূজা করত, তারা তাদের প্রতিমার সঙ্গে চলে যাবে। সহিহ বুখারী, হাদিস: ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ৪৫১

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন এই উপাস্যগুলো তাদের পূজারীদের কোনো উপকারে আসবে না, বরং তাদের সঙ্গে জাহান্নামের দিকে চলে যাবে।

সুতরাং, কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে, দুনিয়াতে যারা মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজা করেছে, কিয়ামতের দিন সেই মূর্তিগুলো তাদের কোনো কাজে আসবে না। বরং তারা তাদের পূজারীদের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দেবে এবং তাদের অসহায়ত্বের চরম প্রমাণ হবে।

১০. কিয়ামতের দিনে ঈসা (আ.) খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (Trinity) এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন

খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (Trinity) হলো একটি ধর্মীয় বিশ্বাস যা বলে যে ঈশ্বর এক, কিন্তু তিনি তিনটি সত্তায় বিদ্যমান- পিতা (God the Father), পুত্র (God the Son বা যিশু খ্রিস্ট) এবং পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)। এই তিনটি সত্তা সমানভাবে ঐশ্বরিক এবং তারা তিনজন মিলে এক ঈশ্বর।

এই বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রিত্বের প্রতিটি সত্তা সম্পূর্ণ ঈশ্বর। যেমন-

পিতা: তিনি হলেন স্রষ্টা, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

পুত্র: তিনি হলেন যিশু খ্রিস্ট, যিনি মানব রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছেন, মানুষকে পাপ থেকে মুক্ত করার জন্য।

পবিত্র আত্মা: তিনি হলেন ঈশ্বরের সেই শক্তি বা প্রভাব, যা বিশ্বাসীদের হৃদয়ে কাজ করে এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে।

ত্রিত্ববাদকে বোঝার জন্য প্রায়শই একটি উপমা ব্যবহার করা হয়, যেমন একটি ডিমের তিনটি অংশ (শেল, সাদা অংশ, কুসুম) বা পানির তিনটি রূপ (তরল, বরফ, বাষ্প)। যদিও এই উপমাগুলো ত্রিত্বের ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না, তবে এটি বোঝাতে সাহায্য করে যে কীভাবে একজন ঈশ্বর তিনটি ভিন্ন সত্তায় প্রকাশিত হতে পারেন।

ত্রিত্ববাদ হলো খ্রিস্টধর্মের অন্যতম মৌলিক একটি মতবাদ। এটি প্রধানত ক্যাথলিক, অর্থোডক্স এবং প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের বেশিরভাগ শাখা দ্বারা গৃহীত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে ত্রিত্ববাদ (Trinity) হারাম ও শিরক কারণ এটি ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহীদ-এর পরিপন্থী। তাওহীদ মানে হলো আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং তিনি কোনো কিছু বা কারো ওপর নির্ভরশীল নন। আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা অপরিহার্য। ত্রিত্ববাদের ধারণা, যেখানে ঈশ্বরকে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা এই তিনটি সত্তায় বিভক্ত করা হয়, তা এই মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসিদের সাথে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَإِذْ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ءَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ ٱتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَٰهَيْنِ مِن دُونِ ٱللَّهِۖ قَالَ سُبْحَٰنَكَ مَا يَكُونُ لِيٓ أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّۚ إِن كُنتُ قُلْتُهُۥ فَقَدْ عَلِمْتَهُۥۚ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَآ أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلْغُيُوبِ ١١٦ مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَآ أَمَرْتَنِي بِهِۦٓ أَنِ ٱعْبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْۚ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدٗا مَّا دُمْتُ فِيهِمْۖ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيْهِمْۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٖ شَهِيدٌ

আর আল্লাহ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?’ সে বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য সম্ভব নয়। যদি আমি তা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, আর আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি গায়েবী বিষয়সমূহে সর্বজ্ঞাত’। আমি তাদেরকে কেবল তাই বলেছি, যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আললাহর ইবাদাত কর। আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী। সূরা মায়েদা : ১১৬-১১৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَہْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الْحَقَّ ؕ  اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللّٰہِ وَکَلِمَتُہٗ ۚ  اَلْقٰہَاۤ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْہُ ۫  فَاٰمِنُوْا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖ ۚ۟  وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلٰثَۃٌ ؕ  اِنْتَہُوْا خَیْرًا لَّکُمْ ؕ  اِنَّمَا اللّٰہُ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ  سُبْحٰنَہٗۤ اَنْ یَّکُوْنَ لَہٗ وَلَدٌ ۘ  لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الْاَرْضِ ؕ  وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیْلًا 

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন’। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ১৭১

এই দুটি আয়াতের মূল সারকথা হলো, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক বা সন্তান নেই। নবী ঈসা (আ.) একজন সম্মানিত রাসূল ছিলেন, কোনোভাবেই আল্লাহর পুত্র বা ইলাহ নন। ত্রিত্ববাদ এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার এই ধারণা ইসলামের তাওহীদের মূলনীতির পরিপন্থী। কিয়ামতের দিনেও নবী ঈসা (আ.) নিজে এই সত্যের সাক্ষী হবেন।

১১. হাশরের মাঠের অন্যতম আকর্ষন ‘হাউজে কাউসার

ক. কিয়ামতের দিন বিদআতিদের হাউজে কাউসারের পানি পান করতে দেওয়া হবে না

আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি হাউজে কাউসারে থাকব আর দেখব তোমাদের কে কে আসছে। কিন্তু কিছু মানুষকে আমার অনুমতি ব্যতীত নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব! এরা আমার অনুসারী, আমার উম্মতের অংশ। আমাকে বলা হবে, আপনি কি জানেন, আপনার পরে এরা কি কাজ করেছে? আল্লাহর শপথ! তারা পিছনে ফিরে যাবে”। সহিহ বুখারী : ৬৫৯৩,  সহিহ মুসলিম : ২৭।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাউজে কাউসারে আমার উম্মত সমবেত হবে। আমি অনেক মানুষকে এমনভাবে তাড়িয়ে দেব যেমন একজনের উট অন্য জনের উটের পাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাদের তখন চিনবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যা, তোমাদের এমন কিছু আলামত আছে যা অন্যদের নেই। তোমরা আমার কাছে উপস্থিত হবে আর তোমাদের অজুর স্থানগুলো চকমক করতে থাকবে। তোমাদের একটি দলকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে, তারা হাউজের কাছে পৌছতে পারবে না। সে সময় আমি বলব, হে আমার প্রভূ এরা আমার অনুসারী। তখন এক ফিরিশতা উত্তর দিবে, আপনি কি জানেন আপনার পরে তারা কি প্রচলন করেছে? সহিহ মুসলিম : ২৪৭

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ তার উপর অচৈতন্য ভাব চেপে বসল। অতঃপর তিনি মুচকি হেসে মাথা তুললেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাসির কারণ কি? তিনি বললেনঃ এ মাত্র আমার উপর একটি সূরাহ অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি পাঠ করলেন-

بِسْمِ ٱللهِ ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ

إِنَّآ أَعْطَيْنَـٰكَ ٱلْكَوْثَرَ (١) فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنْحَرْ (٢) إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلْأَبْتَرُ (٣)

পরম করুনাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ নামে শুরু করছি।  নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় কর এবং কুরবানী দাও। তোমার কুৎসা রটনাকারীরাই মূলত শিকড়কাটা, নির্মূল।

অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান কাওসার কি? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা একটা ঝর্ণা। আমার মহান প্রতিপালক আমাকে তা দেয়ার জন্য ওয়া’দা করেছেন। এর মধ্যে অশেষ কল্যাণ রয়েছে, আমার উম্মতের লোকেরা কিয়ামতের দিন এ হাওযের পানি পান করতে আসবে। এ হাওযে রয়েছে তারকার মত অসংখ্য পানপাত্র।

এক ব্যক্তিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। আমি তখন বলব, প্রভু! সে আমার উম্মতেরই লোক। আমাকে তখন বলা হবে, তুমি জান না, তোমার মৃত্যুর পর এরা কী অভিনব কাজ (বিদ’আত) করেছে। ইবনু হুজরের বর্ণনায় আরো আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে আমাদের কাছে এসেছেন এবং আল্লাহ বলবেন, এ ব্যক্তি আপনার পরে বিদ’আত চালু করেছে। সহিহ মুসলিম : ৪০০

১২. হাশররের ময়দানে হাউজে কাউসারের পাশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে নেককারের সাক্ষাত হবে

ইবন যায়েদ ইবন আসেম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আমার পরে তোমরা অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে শাসকদের অগ্রাধিকার দেখতে পাবে। তোমরা তখন ধৈর্য ধারণ করবে হাউজে কাউসারে আমার কাছে সাক্ষাত লাভ পর্যন্ত”। সহিহ বুখারী : ৪৩৩০,  সহিহ মুসলিম : ১৮৪৫।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সা.) -এর নিকটে আবেদন করলাম, কিয়ামতের দিন আপনি অনুগ্রহপূর্বক আমার জন্য বিশেষভাবে শাফা’আত করবেন। তিনি (সা.) বললেন, আচ্ছা আমি তা করব। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে কোথায় অনুসন্ধান করব? তিনি (সা.) বললেন, সর্বপ্রথম তুমি আমাকে পুলসিরাতের উপর অনুসন্ধান করবে। বললাম, যদি আমি আপনাকে পুলসিরাতের সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে মীযানের কাছে খোঁজ করে বললাম, যদি আমি আপনাকে মীযানের কাছেও সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে হাওযে কাওসারের কাছে অনুসন্ধান করব। স্মরণ রাখ, আমি এ তিন জায়গা থেকে অনুপস্থিত থাকব না। সুনানে তিরমিযী : ২৪৩৩, মিশকাত : ৫৫৯৫, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ : ২৬৩০।

১২. হাশরে কেউ একবার এ পানি পান করবে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না

সাহল ইবনু সাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের কাছে পৌছব। যে ব্যক্তি আমার কাছে পৌছবে, সে তার পানি পান করবে। আর যে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। আমার কাছে এমন কিছু লোক আসবে যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। অতঃপর আমার ও তাদের মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে। তখন আমি বলব, তারা তো আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে তারা যে কি সকল নতুন নতুন মত পথ তৈরি করেছে। তা শুনে আমি বলব, যারা আমার অবর্তমানে আমার দীনকে পরিবর্তন করেছে, তারা দূর হোক (অর্থাৎ এ ধরনের লোক আমার শাফা’আত ও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। সহীহ বুখারী : ৬৫৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২৯৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৪৪, মিশকাত : ৫৫৭১,  সহীহুল জামি : ২৪৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৩৮১২, আবূ ইয়া’লা : ৭৪৭৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৯৮৫, শু’আবূল ঈমান : ৩৬০, তবারানী : ১৬৭৩

১৩. হাউজে কাউসার পরিচিত :

ক. হাউজে কাউসারের পানি হবে দুধের চেয়েও সাদা

আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার হাউজের প্রশস্ততা হবে এক মাসের সমান দূরত্ব। তার পানি দুধের চেয়েও সাদা, সুঘ্রান মেশকের চেয়ে উত্তম। আর তার পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের মতো। যে তা থেকে পান করবে কখনো পিপাসিত হবে না”। সহিহ বুখারী : ৬৫৭৯, সহিহ মুসলিম : ২২৯২

খ. পানি মিশকের মতো সুগন্ধময়।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (মি’রাজের রাত্রে) জান্নাত ভ্রমণকালে অকস্মাৎ আমি একটি নহরের কাছে উপস্থিত হলাম, যার উভয় পার্শ্বে শূন্যগর্ভ মুক্তার গুম্বুজ সাজানো রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটাই সেই কাওসার যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তার পানি মিশকের মতো সুগন্ধময়। মিশকাত : ৫৫৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৭৪, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৭২০, আবূ ইয়ালা : ২৮৭৬

গ. পানপাত্রের (গ্লাসের) সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত

সাওবান (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমার হাওয ’আদান থেকে বালকা’র ’উম্মানের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাণ হবে। তার পানি দুগ্ধ অপেক্ষা সাদা ও মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত। যে তা থেকে এক ঢোক পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। উক্ত হাওযের কাছে সর্বপ্রথম ঐ সকল গরীব মুহাজিরীনগণ আসবে, যাদের মাথার চুল অগোছালো, পরনের কাপড়-চোপড় ময়লা, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাগণকে যাদের সাথে বিবাহ দেয়া হয় না এবং তাদের জন্য (গৃহের) দরজা খোলা হয় না। মিশকাত : ৫৫৯২, সুনানে তিরমিযী : ২৪৪৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩০৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১০৮২, আহমাদ : ২২৪২১, সহীহুল জামি : ২০৬০, শুআবূল ঈমান : ১০৪৮৫

হাশরের ময়দানের বিচার : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাশরের ময়দান হলো পরকালের এমন এক বিশাল স্থান, যেখানে মানবজাতির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকে একত্রিত করা হবে। এই স্থানটি এক মহাবিচারের মঞ্চ, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার পার্থিব জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব দেবে। সেদিন কোনো মানুষই এই বিচার থেকে রেহাই পাবে না—রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সবাই সেখানে উপস্থিত থাকবে।

পার্থিব জীবনকে যেভাবে কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, হাশরের ময়দান হলো তার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের স্থান। সেদিন মানুষের সকল কর্ম—প্রকাশ্য কিংবা গোপন, ছোট কিংবা বড়—একেবারে নিখুঁতভাবে সামনে আনা হবে। কোনো কিছু গোপন থাকবে না, কোনো কিছু হারিয়ে যাবে না। এমনকি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে। সেদিন সব মানুষের জন্য দু’টি পাল্লা স্থাপন করা হবে, যেখানে তাদের ভালো এবং মন্দ আমল ওজন করা হবে। যাদের ভালো কাজের পাল্লা ভারী হবে, তারা পাবে এক অনাবিল শান্তি ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। আর যাদের মন্দ কাজের পাল্লা ভারী হবে, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন পরিণতি।

এই বিচারের দিনটি হবে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং কঠিন। মানুষ সেদিন যার যার নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। তবে যারা নিজেদের জীবনে সৎ কাজ করেছে, মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে এবং স্রষ্টার প্রতি অনুগত ছিল, তাদের জন্য সেদিন থাকবে এক বিশেষ প্রশান্তি ও নিরাপত্তা। তাদের আমলনামা তাদের হাতে দেওয়া হবে, যা দেখে তারা বুঝতে পারবে তাদের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে। এটি কেবল কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়, বরং এটি মানবজীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যের এক অনিবার্য বাস্তবতার চিত্র।

১. হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিচার

কিয়ামতের দিন মানুষ পুনরুত্থিত হবে, সকল আমলের হিসাব নেওয়া হবে এবং চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হবে। এই বিচার এমন একটি কঠিন মুহূর্ত, যার ভয়াবহতা কুরআন ও হাদীসে গভীরভাবে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ সেখানে নগ্ন, অচল, আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করবে এবং এক এক করে সকলকে আল্লাহর আদালতে উপস্থিত করা হবে। সেই মহামহিম আদালতের বিচার দুইটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হবে-

ক. হক্কুল্লাহ সম্পর্কিত বিচার

খ. হক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিচার

ক. হক্কুল্লাহ সম্পর্কিত বিচার

হক্কুল্লাহ অর্থ হলো- আল্লাহর অধিকার বা বান্দার উপর আল্লাহর যে সমস্ত হক (অধিকার) রয়েছে। এটি ইসলামী বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক দিক, যা কিয়ামতের দিন বিচারকার্যের প্রথম ভাগে অন্তর্ভুক্ত হবে। একজন বান্দার জীবনের প্রধান দায়িত্ব হলো— আল্লাহর হক আদায় করা। আর আল্লাহর হক হচ্ছে— তিনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন, ঠিক সেইভাবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।

এককথায় হক্কুল্লাহ বলতে সেই সকল দায়িত্ব ও কর্তব্যকে বোঝায়, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার উপর ফরজ করেছেন, তাঁর প্রতি বান্দার আনুগত্য, ইবাদত, বিশ্বাস ও আচরণের ক্ষেত্রে।

তাওহিদ হলো সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক। আল্লাহ চান, বান্দা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। আল্লাহ বলেন:

وَمَا خَلَقْتُ ٱلْجِنَّ وَٱلْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমারই ইবাদতের জন্য। সূরা যারিয়াত : ৫৬

আল্লাহর সবচেয়ে বড় হক সম্পর্কে সহিহ হাদিসে এসেছে-

মু‘আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উফাইর নামক একটি গাধার পিঠে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পেছনে আরোহী ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মু‘আয, তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কী? এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, বান্দা তাঁর ‘ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, তাঁর ‘ইবাদাতে কাউকে শরীক না করলে আল্লাহ্ তাকে শাস্তি দিবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি কি লোকদের এ সুসংবাদ দিব না? তিনি বললেন, তুমি তাদের সুসংবাদটি দিও না, তাহলে লোকেরা এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। সহিহ বুখারি : ২৮৫৬, ৫৯৬৭, ৬২৬৭, ৬৫০০, ৭৩৭৩, সহিহ মুসলিম : ৩০, আহমাদ : ২২০৫২

তাওহীদ ও শিরকের বিচার

কিয়ামতের দিনের বিচারপদ্ধতির ভিত্তি হলো তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ। তাওহীদ ইসলামের মূল স্তম্ভ। যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে ইবাদত করেছে, তাদের কোনো আমলই গৃহীত হবে না। অর্থাৎ তাওহিদের বিশ্বাসের কারনে মানুষ হিসেব প্রদানে জন্য উপযুক্ত হবে। যারা মুশরিক তাদের তাদের হিসেব থেকে বাদ দেওয়া হবে। শিরককারির গুনাহ ক্ষমা করা হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِکَ لِمَنْ یَّشَآءُ ۚ وَمَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰہِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অন্য বর্ণনায় রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ হাদিসের মান হাসান

আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ যাকারিয়া বর্ণনা করেছেন, আমি উম্মু দারদাকে বলতে শুনেছি, আমি আবূ দারদা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে। সুনানে কখআবু দাউদ : ৪২৭০

যারা তাওহীদ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে বিচারের দ্বিতীয় ধাপে গমন সম্ভব। আর যারা শিরকে লিপ্ত ছিল, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন-

وَلَقَدْ اُوْحِیَ اِلَیْکَ وَاِلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکَ ۚ لَئِنْ اَشْرَکْتَ لَیَحْبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہْدِیْ بِہٖ مَنْ یَّشَآءُ مِنْ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوْ اَشْرَکُوْا لَحَبِطَ عَنْہُمْ مَّا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ

এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمْنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰہُ ہَبَآءً مَّنْثُوْرًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

মুআবিয়া বিন হায়দা বিন মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯

যারা শিরক করেছে, তারা কোনো প্রশ্নোত্তর ছাড়াই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

নেক বা বদ আমলের হিসাব

যারা তাওহিদের পরিক্ষায় পাশ করবে তাদের নেক আমল বা বদ আমলের হিসেবের মুখোমিখি করা হবে। কিন্তু যারা শিরকে লিপ্ত ছিল, কুফরি করেছিল, পরকার অস্বীকার করছিল তারা তাওহিদের পরীক্ষায় ফেল করে দ্বিতীয় পর্যায়ে (হিসেব নিকেশ) উত্তির্ণ হতে পারবেনা। অর্থাৎ তাওহীদের ভিত্তিতে যারা ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে আল্লাহ হক সম্পর্কে বিচার করা হবে। এ পর্যায়ে প্রধান্য পারে ঈমান আনার পর আল্লাহ প্রদত্ত ইবাদত, আদেশ নিষেধ, হালাল হারামের সীমা সম্পর্কিত বিষয়। এক কথায় বলা যায়, ইসলামে সকল হুকুম আহকাম সম্পর্কিত বিষয় যা সরাসরি আল্লাহ হকের সাথে জড়িত। যেমন-

১. প্রতি দিন পাঁচবার সালাত আদায় করা ফরজ। সুরা বাকারা : ৪৩, ৮৩, ২৭৭, সুরা নিসা : ১০৩, সুরা মায়েদা : ৫৫, সুরা আনআম : ৭২, সুরা আরাফ : ১৭০, সুরা আনফাল : ৩, সুরা তাওবা : ১৮, ৭১, সুরা রাদ : ২২, সুরা ইব্রাহিম : ৩১, সুরা নুর : ৫৬ ইত্যাদি

২. রমাজান মাসে সিয়াম আদায় করা ফরজ। সূরা বাকারা : ১৮৩-১৮৫, সহিহ বুখারি : ০৮, ৪৫১৪, সহিহ মুসলিম : ১৬, মিশকাত : ১৯৬২, সুনানে নাসায়ি : ২১০৬, সহিহ আত্ তারগীব : ৯৯৯, সহিহ আল জামি : ৫৫

৩. সামর্থ্যবাদ উপর আল্লাহর জন্য হজ ফরজ করেছেন। সুরা ইমরান : ৯৭, সুরা হাজ :২৭, সহিহ বুখারি ৮, সহিহ মুসলিম ১৬,

৫. নিসাব পরিমান মালের উপর জাকাত ফরজ করেছেন।  সুরা বাকারা : ৪৩, সুরা বাইয়িনা : ৫, সহিহ বুখারি : ৫৭, ৫২৪, ১৪০১, ২১৫৭, ২৭১৪, ২৭১৫, ৭২০৪, সহিহ মুসলিম : ৫৬, আহমাদ : ৩২৮১

৬. অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করা না করা। সুরা নিসা : ২৯, সুরা বাকারা : ১৮৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৩৩

৭. প্রকাশ্য ও গোপন সকল অশ্লীলতার থেকে দুরে থাকা ফরজ। সূরা আনআম : ১৫১

৮. হারাম কাজ পরিহার করা, সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করা । সূরা হাশর : ৭

৯.  সূদ পরিহার করে চলা অ সুরা বাকারা : ২৭৫. ২৭৬, ২৭৮, সুরা ইমরান : ১৩০, সুনানে নাসাঈ : ৫১০২, ইরনে মাজাহ ২২৭৪, মিসকাত ২৮২৬, শুয়াবুল ঈমান ৫১৩৩

১০. হারাম মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত ভক্ষন না করা। সুরা মায়েদা : ৩, সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৮৫

আল্লাহর শত শত আদেশ নিষেদ থেকে মাত্র ১০ টি উদাহরণ তুলে ধরলাম। এগুলো সম্পর্কে কিয়ামতে দিন জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তালায়া এ সকল আমলের জন্য শাস্তির ঘোষণা করেছেন। যেমন-

১. সালাত আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে।

 সুরা মারিয়াম : ৫৯, সুরা রূম : ৩১, সহিহ মুসলিম : ৮২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬৭৮, সুনানে নাসায়ী : ৪৬৪, সুনানে তিরমিযী ২৬২০, সুনানে ইবনু মাজাহ্ ১০৭৮, মিশকাত : ৫৬৯

২. জাকাত আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে।

সুরা তাওবা : ৩৪-৩৫, সহিহ বুখারি : ১৪০৩, ১৪৬০, ৪৫৬৫, ৬৬৩৮, ৪৬৫৯, ৬৯৫৭, সহিহ মুসলিম : ৯৯০, আহমাদ : ২১৪০৯

৩. সিয়াম আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে। সহিহ বুখারি : ২৮৪০, সহিহ মুসলিম : ১১৫৩, তিরমিযী ১৬২৩, নাসায়ী : ২২৫১-২২৫৩, ইবনু মাজাহ : ১৭১৭

একটিভাবে প্রতিটি ফরজ, ওয়াজিব, হারাম, অন্যায় অসত্য কাজের শাস্তির ঘোষণা আছে। এ শাস্তি প্রদান আল্লাহ তায়ালা শতভাগ সক্ষম। কিন্তু বড় আশার কথা হলো তিনি ইচ্ছা করলে তার সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আল্লাহ হক্কুল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন :

হক্কুল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহ ক্ষমাশীল। এটি একটি আশার কথা, যে হক্কুল্লাহ যদি কেউ লঙ্ঘন করে, তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি শিরক ব্যতিত সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আশা করা যায় বান্দা তার যে সকল হক (শিরক করা ব্যতিত) আদায় করতে পাবে নাই, তা ক্ষমা করা হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِکَ لِمَنْ یَّشَآءُ ۚ وَمَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰہِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সূরা নিসা: ৪৮

খ. হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক

হক্কুল ইবাদ” (حَقُّ الْعِبَاد) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো বান্দার হক বা মানুষের হক। অর্থাৎ, এক মানুষের প্রতি অন্য মানুষের যে অধিকার ও দায়িত্ব, যেমন – মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার, আমানতের হেফাজত, সম্মান রক্ষা করা, ইত্যাদি।

ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো “হক্কুল ইবাদ” বা বান্দার হক। এটি এমন এক নীতি যা একজন মুসলিমকে কেবল আল্লাহর ইবাদতকারী হিসেবেই নয়, বরং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।

হক্কুল ইবাদের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি এবং ন্যায়পরায়ণতা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। এর মধ্যে রয়েছে অন্যের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও স্বাধীনতাকে সম্মান করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হয়। এটাই মহা সাফল্য।” এখানে সৎকর্মের মধ্যে হক্কুল ইবাদ একটি অপরিহার্য অংশ। হক্কুল ইবাদ একটি বিস্তৃত ধারণা এবং এর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত। কিছু প্রধান দিক নিচে তুলে ধরা হলো-

১. পিতা মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা লোকমান : ১৪, সুরা বনিইসরাইল : ২৩, সুরা আনাম : ১৫১, সুরা আহকাফ : ১৫, সুরা বাকারা : ২১৫

২. পুরুষ ও স্ত্রী একে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।মুসলিম ১৪৬৯, রিয়াদুস সালেহীন : ২৭৫, আহমাদ ৮১৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫১, সুনানে তিরমিযী ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ ১৯৯৭-২০২০, রিয়াদুস সালেহীন : ২৭৬

৩. আত্মীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সুরা বাকারা : ৮৩, ১৭৭, ১৮০, সুরা মুহাম্মদ : ২২-২৩, সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৫৬, সুনানে তিরমিজি ১৯০৯, আবু দাউদ ১৬৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩২৫১, সুনানে তিরমিযি : ২৪৮৫, দারিমী ১৪৬০।

৪. প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার নির্দেশ দেওয়া হয়েছ।

সুরা নিসা : ৩৬, সহিহ বুখারি : ১২৪০, ২৫৬৬, ৬০৪৭, সহিহ মুসলিম : ১০৩০, ২১৬০, সুনানে তিরমিজি ২১৩০, ২৭৩৭, সুনানে নাসায়ি ১৯৩৮, সুনানে আবু দাউদ ৫০৩০, ইবনে মাজাহ ১৪৩৫, রিয়াদুস সালেহীন : ৩০৬,

৫. সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা।

সুরা মায়েদা : ২, সুরা হুজুরাত : ১০, সুরা ফুসসিলাত : ৩৪, সহিহ বুখারি : ৬০১১, ৬০১৩, ৭৩৭৬, সহিহ মুসলিম ২৩১৯, ২৫৮৬, সুনানে তিরমিযী : ১৯২২, , রিয়াদুস সালেহীন : ২২৪,  আহমাদ ১৮৭০৭, ১৮৭২১, ১৮৭৫৬, ১৮৭৭৭

৬. শ্রমিকের শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, তাদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের জুলুম না করা ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা। সূরা আল-মায়েদা : ১, সহিহ বুখারি : ২০৭২,  ২২২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩

৭. এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। সূরা বাকারা : ১৭৭, সূরা আন-নিসা : ৩৬, সূরা আল-ইনসান : ৮, সূরা ফজর : ১৭-১৮, সহিহ বুখারি :  ৫০০২, সহিহ মুসলিম: ৯৯৬ ১০৫৮, সুনানে তিরমিজি: ১৯১৮

হক্কুল ইবাদ এর গুনাহ ক্ষমা করা হবে না

হক্কুল্লাহর ক্ষেত্রে, আল্লাহ চাইলে তার বান্দার কোনো গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন, শিরক (আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা) ছাড়া। তবে হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক নষ্ট করার গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত যার হক নষ্ট করা হয়েছে, সে নিজে ক্ষমা না করে। এর মূল কারণ হলো, আল্লাহ অত্যন্ত ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবেন।

হক্কুল ইবাদ সংক্রান্ত গুনাহের মধ্যে রয়েছে অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, গালিগালাজ করা, কারও সম্মানহানি করা, ঋণ পরিশোধ না করা, ইত্যাদি। এ ধরনের গুনাহের বিচার এতটাই কঠোর হবে যে, হাদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি সবচেয়ে নিঃস্ব হবে, যে দুনিয়াতে অনেক নেক আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু একই সাথে মানুষের হক নষ্ট করেছে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হাক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সহিহ মুসলিম : ২৫৮১

হাদিস অনুযায়ী, বিচার দিবসে যখন পাওনাদাররা তাদের পাওনা দাবি করবে, তখন তাদের পাওনাদারকে পরিশোধ করার জন্য সেই হক নষ্টকারী ব্যক্তির নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে দেওয়া হবে। যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তখন পাওনাদারের গুনাহ তার কাঁধে চাপানো হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সুতরাং, বান্দার হক সম্পর্কিত গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে জীবিত থাকতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে এবং তার পাওনা পরিশোধ করে দিতে হবে। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করার পাশাপাশি যার হক নষ্ট করেছেন তা পরিশোধের পর তার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। এটি বিচারকার্যের সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন পর্যায়। বান্দার সাথে বান্দার যে সম্পর্ক, অন্যায়-অবিচার, গীবত, ধোঁকা, হক্ব নষ্ট করা, অপমান এসবের বিচার এই পর্যায়ে হবে। এই বিষয়ে ক্ষমার সুযোগ নেই। আল্লাহ তাঁর নিজের হক মাফ করতে পারেন। কিন্তু বান্দার হক তখনই মাফ হবে, যদি হকদার নিজে তা ক্ষমা করে দেয়।

২. কিয়ামতের দিন প্রথম আদম আলাইহিস সালাম কে ডাকা হবে

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

«أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى يَوْمَ القِيَامَةِ آدَمُ، فَتَرَاءَى ذُرِّيَّتُهُ، فَيُقَالُ: هَذَا أَبُوكُمْ آدَمُ، فَيَقُولُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ بَعْثَ جَهَنَّمَ مِنْ ذُرِّيَّتِكَ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ كَمْ أُخْرِجُ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ ” فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِذَا أُخِذَ مِنَّا مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ، فَمَاذَا يَبْقَى مِنَّا؟ قَالَ: «إِنَّ أُمَّتِي فِي الأُمَمِ كَالشَّعَرَةِ البَيْضَاءِ فِي الثَّوْرِ الأَسْوَدِ»

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-কে ডাকা হবে। তিনি তাঁর সন্তানদেরকে দেখতে পাবেন। তখন তাদেরকে বলা হবে, ইনি তোমাদের পিতা আদম (আঃ)। তখন তারা বলবে لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ আমরা তোমার খিদমাতে হাযির! এরপর তাঁকে আল্লাহ্ বলবেন, তোমার জাহান্নামী বংশধরকে বের কর। তখন আদম (আঃ) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ্ বলবেনঃ প্রতি একশ’ তে নিরানব্বই জনকে বের কর। তখন সাহাবাগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি একশ’ থেকে যখন নিরানব্বই জনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের কে বাকী থাকবে? তিনি ﷺ বললেন,  নিশ্চয়ই অন্যান্য সকল উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মাত হল কাল ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মত। সহিহ বুখারি : ৬৫২৯

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। [আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন] আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখাই : ৩৩৪৮, ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২২, মিশকাত : ৫৫৪১, সহীহুল জামি : ১৪১০২, হাকিম : ৮০।

৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর সুপারিশে হিসাব গ্রহণের শুরু হবে

কিয়ামতের পর জান্নাতকে ঈমানদারদের নিকটে নিয়ে আসা হবে। তারা তাতে প্রবেশ করার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। অপরদিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিচার, হিসাব নিকাশে দেরী করবেন। তখন মানুষেরা নবী ও রাসূলদের কাছে যাবে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য। তখন প্রত্যেক নবীই বলবে, আমি আমার জন্য চিন্তিত তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী ﷺ-এর সঙ্গে এক খানার দা’ওয়াতে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর সামনে (রান্না করা) ছাগলের বাহু আনা হল, এটা তাঁর নিকট পছন্দনীয় ছিল। তিনি সেখান হতে এক খন্ড খেলেন এবং বললেন, আমি কিয়ামতের দিন সমগ্র মানব জাতির সরদার হব। তোমরা কি জান? আল্লাহ কিভাবে (কিয়ামতের দিন) একই সমতলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্র করবেন? যেন একজন দর্শক তাদের সবাইকে দেখতে পায় এবং একজন আহবানকারীর আহবান সবার নিকট পৌঁছায়। সূর্য তাদের অতি নিকটে এসে যাবে। তখন কোন কোন মানুষ বলবে, তোমরা কি লক্ষ্য করনি, তোমরা কী অবস্থায় আছ এবং কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ। তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের নিকট সুপারিশ করবেন? তখন কিছু লোক বলবে, তোমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) আছেন। তখন সকলে তাঁর নিকট যাবে এবং বলবে, হে আদম! আপনি সমস্ত মানব জাতির পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার পক্ষ হতে রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকেছেন। তিনি ফেরেশতাদেরকে (আপনার সম্মানের) নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী সকলে আপনাকে সিজদাও করেছেন এবং তিনি আপনাকে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছেন। আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? আপনি দেখেন না, আমরা কী অবস্থায় আছি এবং কী কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি। তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন এর পূর্বে এমন রাগান্বিত হননি আর পরেও এমন রাগান্বিত হবেন না। আর তিনি আমাকে বৃক্ষটি হতে নিষেধ করেছিলেন। তখন আমি ভুল করেছি। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা আমাকে ছাড়া অন্যের নিকট যাও। তোমরা নূহের নিকট চলে যাও। তখন তারা নূহ (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং বলবে, হে নূহ! পৃথিবীবাসীদের নিকট আপনিই প্রথম রাসূল এবং আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞ বান্দা। আপনি কি লক্ষ্য করছেন না, আমরা কী ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে আছি? আপনি দেখছেন না আমরা কতই না দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে আছি? আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়ে আছেন, যা ইতোপূর্বে হন নাই এবং এমন রাগান্বিত পরেও হবেন না। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা নবী [মুহাম্মাদ ﷺ]-এর নিকট চলে যাও। তখন তারা আমার নিকট আসবে আর আমি আরশের নীচে সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার মাথা উঠান এবং সুপারিশ করুন। আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে আর আপনি যা চান, আপনাকে তাই দেয়া হবে। মুহাম্মাদ ইবনু ‘উবাইদ (রহ.) বলেন, হাদীসের সকল অংশ মুখস্থ করতে পারিনি। সহিহ বুখারি : ৩৩৪০, ৩৩৬১, সহিহ মুসলিম : ১৯৪, আহমাদ : ৯২২৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গোশ্ত আনা হল এবং তাঁকে সামনের রান পরিবেশন করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড়ে খেলেন। এরপর বললেন, আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের নেতা। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? কিয়ামতের দিন আগের ও পরের সকল মানুষ এমন এক ময়দানে জমায়েত হবে, যেখানে একজন আহবানকারীর আহবান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর করবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদমের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাঁকে বলবে, আপনি আবুল বাশার

আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে নিজ হস্ত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন এবং মালায়িকাহ্কে হুকুম দিলে তাঁরা আপনাকে সিজদা করেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি। তখন আদম (আঃ) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের নিকট যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, (আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী) তোমরা অন্যের কাছে যাও, তোমরা নূহ (আঃ)-এর কাছে যাও। তখন সকলে নূহ্ (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে নূহ্ (আঃ)! নিশ্চয়ই আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রথম রাসূল।

আর আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এত ভীষণ রাগান্বিত যে, আগেও এমন রাগান্বিত হননি আর পরে কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমার একটি গ্রহণযোগ্য দু’আ ছিল, যা আমি আমার কওমের ব্যাপারে করে ফেলেছি, (এখন) নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও তোমরা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে। তখন তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে ইব্রাহীম (আঃ)! আপনি আল্লাহর নবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহর বন্ধু[3]। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি তাদের বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ রাগান্বিত, যার আগেও কোন দিন এরূপ রাগান্বিত হননি, আর পরেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। রাবী আবূ হাইয়ান তাঁর বর্ণনায় এগুলোর উল্লেখ করেছেন- (এখন) নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মূসার কাছে।

তারা মূসার কাছে এসে বলবে, হে মূসা (আঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ্ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দিয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে সমস্ত মানবকূলের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আজ আমার রব ভীষণ রাগান্বিত আছেন, এরূপ রাগান্বিত আগেও হননি এবং পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এখন নফ্সী, নফসী, নফসী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও ঈসা (আঃ)-এর কাছে।

তখন তারা ঈসা (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে ঈসা (আঃ)! আপনি আল্লাহররাসূল এবং কালিমাহ, যা তিনি মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি ’রূহ’। আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন ঈসা (আঃ) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত যে, এর আগে এরূপ রাগান্বিত হননি এবং এর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কোন গুনাহর কথা বলবেন না। নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্য কারও কাছে যাও- যাও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে।

তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ তা’আলা আপনার আগের, পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সিজদা দিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তোমার মাথা উঠাও। তুমি যা চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবূল করা হবে।

এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার উম্মাতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ব্যতীত অন্যদের সঙ্গে অন্য দরজায় ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ! জান্নাতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা যেমন মক্কা ও হামীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বস্রার মাঝে দূরত্বের সমতুল্য। সহিহ বুখারি : ৪৭১২; সহিহ মুসলিম : ১৯৪