দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৬. স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দাম্পত্য শুধু দু’জন মানুষের সম্পর্ক নয়; বরং দুটি পরিবার ও বংশের সংযোগও বটে। যখন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের পরিবারকে ছোট করে দেখে বা অপমান করে, তখন এর প্রভাব সরাসরি সংসারের ভেতরে পড়ে।

ক. ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়ে যায়

স্বামী বা স্ত্রী তার নিজের পরিবারকে নিজের মর্যাদার অংশ মনে করে। যখন কেউ তার পরিবারকে অপমান করে, তখন সে মনে করে, আসলে আমাকেই হেয় করা হলো। এতে ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়।

খ. স্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়

পরিবারকে অপমান করার কথা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। এতে অন্তরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

গ. পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ে

একে অপরের পরিবারকে খাটো করলে স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি দুই পরিবারের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এতে দাম্পত্য জীবনে চাপ আরও বেড়ে যায়।

ঘ. ছোট বিষয়কে বড় করে তোলে

যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের পরিবার নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে, তখন ক্ষুদ্র সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করে। এতে সমাধান না হয়ে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়।

ঙ. সন্তানদের মানসিক ক্ষতি

সন্তানরা যদি দেখে বাবা-মা সবসময় একে অপরের পরিবারকে অপমান করছে, তবে তাদের ভেতরে দ্বন্দ্বপূর্ণ ও নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। তারা সম্মান ও সৌজন্য শেখার পরিবর্তে ঝগড়া-মুখী হয়ে ওঠে।

চ. বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়ে

একে অপরের পরিবারকে অপমান করা অনেক সময় এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করে যে, তা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি। পরিবারকে অপমান করা আসলে ভালোবাসার মানুষটিকে অপমান করারই সমান। তাই দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। ইসলামে অন্যের পরিবারকে গালি বা অপমান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিজের পিতা-মাতাকে লা’নত করা। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপন পিতা-মাতাকে কোন লোক কীভাবে লা’নত করতে পারে? তিনি বললেনঃ সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়। সহিহ বুখারি : ৫৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ৯০, আহমাদ : ৬৫৪০

১৭. ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলা ও উপেক্ষা না করা

দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রী ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলে এবং তা উপেক্ষা করতে না পারে, তবে সংসার অশান্ত হয়ে যায়। এর ক্ষতিকর দিকগুলো হলো—

ক. প্রতিনিয়ত ঝগড়া সৃষ্টি হয়

প্রতিটি ত্রুটি নিয়ে আলোচনা বা অভিযোগ করলে সংসারে শান্তি হারিয়ে যায়। তুচ্ছ বিষয় নিয়েই বারবার ঝগড়া হতে থাকে।

খ. ভালোবাসা ও মমতা কমে যায়

যখন এক পক্ষের ভুল অন্য পক্ষ বারবার বড় করে তোলে, তখন তার মনে অপমান ও অভিমান জমে যায়। এতে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়।

গ. আস্থার সম্পর্ক ভেঙে যায়

সবসময় সমালোচনা শুনতে শুনতে মানুষ মনে করে, “সে আমাকে বুঝতে বা মানতে চায় না।” এতে পারস্পরিক আস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।

ঘ. নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়

ছোটখাটো ভুল বড় করে দেখার অভ্যাস একসময় স্বামী বা স্ত্রীকে অপরজনের শুধু খারাপ দিকগুলোই দেখতে বাধ্য করে। তখন আর কোনো ভালো দিক চোখে পড়ে না।

ঙ. সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব

যদি বাবা-মা সবসময় ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করে, সন্তানরা তা দেখে নেতিবাচক চরিত্র গড়ে তোলে এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে যায়।

চ. সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি

অবিরাম খুঁটিনাটি ভুল নিয়ে সমালোচনা দাম্পত্য জীবনে এক পর্যায়ে ক্লান্তি এনে দেয়। তখন বিচ্ছেদ বা দূরত্ব তৈরি হওয়া খুব সহজ হয়ে যায়।

ছ. তিক্ততা এবং রাগ বৃদ্ধি

ক্ষমা করার অভ্যাস না থাকলে এবং ছোট ভুলের জন্য অভিযোগ করতে থাকলে দুজনের মনেই তিক্ততা এবং রাগ জমা হয়। এই চাপা রাগ একসময় বড় ঝগড়া বা বিস্ফোরণের রূপ নেয়। সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা এই তিক্ততা বিষের মতো কাজ করে এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে শেষ করে দেয়।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একে অপরকে ক্ষমা করে দিলে এবং ছোটখাটো বিষয়গুলো সহজে মেনে নিলে সম্পর্ক অনেক বেশি মজবুত হয়। মনে রাখবেন, ভালোবাসার সম্পর্ক নিখুঁত হয় না, এটি ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়েই সুন্দর হয়ে ওঠে। ইসলাম আমাদেরকে ক্ষমাশীল হতে এবং ছোটখাটো ভুল এড়িয়ে চলতে শিখিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

خُذِ الۡعَفۡوَ وَاۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَاَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰہِلِیۡنَ

তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক। সুরা আরাফ : ১৯৯

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “একজন মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। কারণ, যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে তার অন্য কোনো স্বভাবের প্রতি সে সন্তুষ্ট হবে।” সহীহ মুসলিম : ১৪৬৯

১৮. পরকিয়া বা নিজ স্বামী-স্ত্রীর থেকে অন্য কাউকে প্রধান্য দেওয়া

পরকীয়া বা স্বামী/স্ত্রীর বদলে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। কারণ দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আনুগত্য ও একনিষ্ঠতা। যখন এই ভিত্তি নষ্ট হয়, তখন সংসার ভেঙে পড়তে শুরু করে। নিচে কয়েকটি দিক তুলে ধরছি—

ক. বিশ্বাসের চূড়ান্ত লঙ্ঘন

দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং পারস্পরিক আনুগত্য। যখন একজন সঙ্গী পরকীয়া করে বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়, তখন এই বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কের মূল স্তম্ভকে আঘাত করে এবং এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি ফাটল তৈরি হয় যা সহজে মেরামত করা যায় না। যে ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হন, তিনি আর কখনোই তার সঙ্গীকে বিশ্বাস করতে পারেন না, যা সম্পর্ককে অকার্যকর করে তোলে।

খ. ভালোবাসার মৃত্যু

পরকীয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও মমতা দ্রুত নষ্ট হয়। যিনি অবহেলিত হন, তার মনে প্রবল কষ্ট, ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্ম নেয়।

গ. পারিবারিক ভাঙন

পরকীয়া সংসার ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। এতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, বরং দুই পরিবার ও সন্তানের জীবনও নষ্ট হয়ে যায়।

ঘ. সন্তানদের উপর ভয়াবহ প্রভাব

যখন সন্তানরা দেখে বাবা-মার একজন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তখন তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং অনেক সময় বেপথু হয়ে পড়ে।

ঙ. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি

পরকীয়া শুধু দম্পতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পরিবার এবং সমাজে তাদের সম্মানও নষ্ট করে। যখন এই ধরনের সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তখন তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস এবং ঘৃণা তৈরি করে। এর ফলে সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৬. আল্লাহর গজব ও আখিরাতের শাস্তি

পরকীয়া (ব্যভিচার) কুরআন-হাদিসে মহাপাপ হিসেবে বর্ণিত।

আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। সূরা ইসরা :  ৩২

২৪৭৫. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০, সহিহ মুসলিম : ৫৭

প্রতিকারের উপায় :

পরকীয়া বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া একটি সম্পর্ককে কেবল ভেঙে দেয় না, বরং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। এটি ভালোবাসার সম্পর্ককে ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং ব্যথার সম্পর্কে পরিণত করে। তাই দাম্পত্য জীবন রক্ষা করতে হলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, আনুগত্য করা এবং পরকীয়া বা অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে বাঁচা অপরিহার্য। সাথে সাথে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির কথা মনে করলে পরকিয়া করা অসম্ভব হবে।

আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’ঊদ) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০

১৯. ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করার ফলে

ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয়। কারণ দাম্পত্যের প্রকৃত ভিত্তি হলো আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, এবং দ্বীনের অনুসরণ। যখন স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্বকে উপেক্ষা করে, তখন সংসার থেকে বরকত সরে যায় এবং নানা বিপদ ঘনিয়ে আসে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে দাম্পত্য জীবনের ক্ষতি তা হলো-

ক. আল্লাহর ভয় না থাকায় সম্পর্ক দুর্বল হয়

যদি স্বামী-স্ত্রী আল্লাহকে ভয় না করে, তবে তারা সহজেই একে অপরের প্রতি জুলুম, প্রতারণা বা অবহেলা করতে পারে। ফলে দাম্পত্যের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

খ. নামাজ-সিয়াম অবহেলা করলে বরকত চলে যায়

নামাজ, সিয়াম, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত অবহেলা করলে সংসার থেকে বরকত সরে যায়। ফলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও শান্তি থাকে না।

গ. হালাল-হারামের সীমা অমান্য করা

ধর্মীয় অবহেলার কারণে কেউ হারাম উপার্জনে লিপ্ত হয়, কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, কেউ অপচয় ও বিলাসিতায় মত্ত হয়। এসব সরাসরি সংসার ধ্বংস করে।

ঘ. সন্তানদের ঈমান নষ্ট হয়

স্বামী-স্ত্রীর দ্বীনহীনতা সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভবিষ্যত প্রজন্ম নষ্ট হয় এবং পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।

ঙ. পারস্পরিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা

ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর দায়িত্ব, আর স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে এগুলো অমান্য হয়, যা সংসার ভাঙনের পথ তৈরি করে।

চ. বিবেক ও নৈতিকতার অবক্ষয়

ধর্ম ছাড়া দাম্পত্য জীবন শুধুই জাগতিক স্বার্থে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে নৈতিকতা হারায়, সম্মান ও ভালোবাসা ক্ষয়ে যায়।

ছ. আখিরাতের ক্ষতি

সংসারে সুখ পেলেও যদি স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করে, তবে আখিরাতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا

যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, আমি তার জন্য সংকীর্ণ জীবন নির্ধারণ করব।” সুরা  ত্বাহা : ১২৪

প্রতিকারের উপায় :

দ্বীনহীন স্বামী বা স্ত্রী সংসারে শান্তি আনতে পারে না। তাই দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর, স্থায়ী ও বরকতময় করতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দ্বীনের প্রতি যত্নবান হওয়া, একে অপরকে ইবাদতে সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রাখা অপরিহার্য। প্রথমত দ্বীনদার ছেলে/মেয়ে বিবাহ করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সিহহ মুসলিম : ১৪৬৬, আহমাদ : ৯৫২৬

পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে একটি পরিবার আদর্শ মুসলিম পরিবার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং সদস্যরা একে অপরের জন্য সহায়ক হতে পারে। নিচে কিছু সহজ ও কার্যকরী উপায় দেওয়া হলো, যার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা সম্ভব। তাই নিয়মিত ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা। যেমন- জামাতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দুআ, দান সদগা ইত্যাদি। নিয়মিত ঘরে দ্বীনি আলোচনার ব্যবস্থা করা। পরিবারের সবাইকে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা। পরিবারের নারীদের মাহরাম রক্ষা করে চলাফেরা করা এবং পর্দার বিষয় কোন ছাড় না দেওয়া। এভাবের পরিবারে দ্বীন চলে আসলে আপনি অবশ্যি দাম্পত্য জীবনে সুখি হবেন।

২০. অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা

অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা দাম্পত্য জীবনে একটি ধ্বংসাত্মক আচরণ, যা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। এই ধরনের আচরণ দাম্পত্য জীবনে যে ক্ষতি করে তা হলো-

ক. পারস্পরিক সম্মান নষ্ট হওয়া

একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে গালি দেয় বা অশ্লীল কথা বলে, তখন সেই সম্মানবোধ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। এই আচরণ এমন একটি বার্তা দেয় যে, আপনি আপনার সঙ্গীকে সম্মান করেন না বা তার অনুভূতি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর ফলে সঙ্গী নিজেকে অপমানিত এবং মূল্যহীন মনে করে, যা সম্পর্কের মূল ভিত্তি ভেঙে দেয়।

খ. মানসিক আঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা

অশ্লীল কথা এবং গালাগালি শারীরিক আঘাতের মতো দৃশ্যমান না হলেও এটি মানসিক আঘাত তৈরি করে। এই ধরনের আচরণ একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তাকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে। যে ব্যক্তি এই ধরনের আচরণের শিকার হন, তিনি সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকেন যে কখন আবার তাকে অপমান করা হবে। এতে করে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না।

গ. ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা বৃদ্ধি

ভালোবাসা এবং গালাগালি একসঙ্গে চলতে পারে না। যখন একজন মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ক্রমাগত অসম্মান করে, তখন ভালোবাসার অনুভূতি ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। যে ব্যক্তি গালমন্দ করে, তার প্রতি অন্যজনের মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জমা হয়, যা একসময় সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়।

ঘ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব

যদি দম্পতির সন্তান থাকে, তবে তাদের বাবা-মায়ের অশ্লীল কথা এবং গালাগালি তাদের মানসিক বিকাশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরা এই ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে এবং নিজের জীবনেও এটি প্রয়োগ করতে শেখে। এর ফলে তাদের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।

ঙ. ঘনিষ্ঠতা ও আস্থা ভেঙে যায়

যখন স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে খারাপ ভাষায় সম্বোধন করে, তখন তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়, আস্থা হারিয়ে যায়।

প্রতিকারের উপায় :

অশ্লীল কথা এবং গালাগালি একটি সম্পর্কের উষ্ণতা, সম্মান এবং ভালোবাসা কেড়ে নেয়। এটি সম্পর্ককে একটি বিষাক্ত এবং অসহনীয় জায়গায় পরিণত করে, যেখানে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য এই ধরনের আচরণ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ

আর মানুষকে উত্তম কথা বল, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তোমরা সকলে উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিলে। সূরা বাকারা : ৮৩

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। সহিহ বুখারি : ৬০১৮, ৫১৮৫, সহিহ মুসলিম : ৪৭, আহমাদ : ৭৬৩০

তাই দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত অশ্লীলতা ও গালাগালি থেকে বিরত থাকা, সবসময় কোমল ও ভালোবাসাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা।

২১. স্ত্রী পক্ষের আত্মীয়দের বেশী গুরুত্ব দেওয়া

দাম্পত্য জীবন হলো দুজন মানুষের এক হওয়া এবং তাদের দুটি পরিবারকে একটি পরিবার হিসেবে গ্রহণ করা। যখন একজন স্ত্রী তার নিজের পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেন এবং স্বামীর পরিবারের প্রতি অবহেলা করেন, তখন স্বামীর মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে তার পরিবারকে সম্মান করা হচ্ছে না। এই অসম্মান থেকে পারস্পরিক আস্থার অভাব সৃষ্টি হয়। স্বামী ভাবতে শুরু করেন যে, তার স্ত্রী তার এবং তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক নন, যা সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। ইহার ফলে দাম্পত্য জীবনে যে সকল সমস্যা সৃষ্টি করে তা আলোচনা করা হলো-

ক. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি

স্ত্রীর অতিরিক্ত আত্মীয়প্রিয়তা স্বামীর পিতামাতা বা পরিবারের প্রতি অমনোযোগ বা অসম্মান হিসেবে ধরা দিতে পারে। এটি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি এবং দূরত্ব বৃদ্ধি করে।

খ. অর্থ ও দায়িত্বের অসামঞ্জস্য

যদি পরিবারিক অর্থনৈতিক বা দৈনন্দিন দায়িত্ব (যেমন রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবা) প্রধানত নারীর হাতে থাকে, আত্মীয়দের বেশি সাহায্য ও সহযোগিতা দেওয়া স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। স্বামীকে তার অধিকার ও দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হতে পারে।

গ. ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব

স্ত্রী যখন আত্মীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন এবং তাদের কথার বেশি গুরুত্ব দেন, তখন স্বামীর প্রতি তাঁর প্রাধান্য বা নেতৃত্বের ধারণা হ্রাস পেতে পারে। এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব বা কলহের কারণ হতে পারে।

ঘ. সংঘাত ও কলহের উদ্ভব

যদি স্বামী এই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে স্ত্রী-স্বামী মধ্যে তর্ক বা কলহ জন্মায়। আবার যদি স্বামী চুপচাপ থাকে, তাহলে ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ জমে যায়। এই ধরনের ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদি হলে সম্পর্কের মানসিক দিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঙ. সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা

দাম্পত্য জীবনে সবকিছুতে সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ—সময়, অর্থ, আবেগ, দায়িত্ব। আত্মীয়দের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা ও সম্পর্কের সৌহার্দ্য কমে যায়।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর উভয়েরই উচিত একে অপরের পরিবারকে সমান চোখে দেখা এবং উভয় পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই সকল পক্ষের আত্মীয়দের সদ্ব্যবহার ও ভালোবাসা দিতে হবে। স্বামী স্ত্রী উভয় পক্ষের আত্মীয়দের সাথে ভালো আচরন করা কুরআন সুন্নাহ নির্দেশ।

আল্লাহ তায়ারা বলেন-

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ

“তোমরা কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে দুনিয়ায় ফিতনা সৃষ্টি করবে না?” সূরা মুহাম্মদ : ২২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

‏ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ‏

যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৫

যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, মুসলিম ২৫৫৬, তিরমিযী ১৯০৯, আবূ দাউদ ১৬৯৬, আহমাদ ১৬২৯১, ১৬৩২২, ১৬৩৩১

২২. একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে

দাম্পত্য জীবনে একে অপরকে ছোট করা এবং অসম্মান করা সম্পর্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে কীভাবে একটি সুস্থ সম্পর্ক ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। , তা নিচে আলোচনা করা হলো। একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো-

ক. বিশ্বাসের অভাব ও দূরত্ব তৈরি হওয়া

যখন একজন সঙ্গী বারবার অন্যজনকে ছোট করে কথা বলেন বা অপমান করেন, তখন তাদের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। যার ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি, দুর্বলতা বা মনের কথা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতে পারেন না। এতে দুজনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।

খ. আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া

বারবার অপমানিত হলে একজন মানুষের আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এর ফলে তিনি নিজেকে অযোগ্য বা মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই ধরনের মানসিক চাপ সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গ. রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম

অপমানিত হতে হতে মনের মধ্যে রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম হয়। এই নেতিবাচক অনুভূতিগুলো সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একপর্যায়ে এই চাপা রাগ বা হতাশা বড় ধরনের ঝগড়া বা বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে।

ঘ. একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা হারানো

সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা। যখন একজন আরেকজনকে ছোট করে, তখন সেই শ্রদ্ধা ভেঙে যায়। শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে না।

ঙ. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি

নিয়মিত অপমান ও অসম্মান একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এর ফলে তিনি বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগতে পারেন।

চ. শিশু ও পরিবারিক পরিবেশে প্রভাব:

অবমাননার পরিবেশে বড় হওয়া সন্তান মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারা পরিবারকে ঘরের নিরাপদ স্থান মনে করতে পারে না, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।

প্রতিকারে উপায় :

একে অপরকে ছোট করা বা অসম্মান করা হলো একটি সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য। তাই এক অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। অপরের আত্ম মর্যাদারে প্রতি দৃষ্টি রেখে কথা বলেত হবে। কাউকে কোন প্রকারের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা চলবেনা। তাহলেউ দাম্পত্য জীবনে সুখ আসবে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, (ক্রয় করার ভান করে) মূল্য বৃদ্ধি করে ধোঁকা দিও না। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। একে অপরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন (অবজ্ঞা প্রকাশ) করবে না। তোমাদের একজনের সাওদা করা শেষ না হলে ঐ বস্তুর সাওদা বা কেনা-বেচার প্রস্তাব করবে না। হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ! তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, অসম্মান করবে না, তুচ্ছ ভাববে না। ‘ধর্ম ভীরুতা এখানে’-এটা বলার সময় তিনি স্বীয় বক্ষস্থলের প্রতি তিনবার ইঙ্গিত করেছিলেন। কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করাটা মন্দ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট (অর্থাৎ এরূপ তুচ্ছ জ্ঞান প্রদর্শন দ্বারা পাপ কার্য হওয়া সুনিশ্চিত।) এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে খুন করা, তাঁর মাল গ্রাস করা ও সম্মানে আঘাত দেয়া হারাম।  সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩, ২৫৬৪, সুনানে তিরমিযী : ১১৩৪, ১৯৮৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৯, ৪৪৯৬, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৪৩৮, ৩৪৪৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৭, ২১৭২,২১৭৪, আহমাদ : ৭৬৭০, ৭৮১৫, মালেক ১৩৯১, ১৬৮৪ ।

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২৩. স্বামীর গায়রতহীনতা

সাধারণভাবে, গায়রত হলো ইজ্জত, মর্যাদা ও নৈতিক সীমা রক্ষার চেতনাশীলতা, বিশেষ করে পরিবারের সুরক্ষা ও স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব। স্বামীর গায়রত হলো- স্ত্রীর প্রতি সম্মান, নৈতিক সীমা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করার চেতনা। গায়রত দাম্পত্য জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গায়রতের অভাব দাম্পত্য জীবনকে যে ক্ষতি হয় তা হলো-

ক. স্ত্রীর উপর সীমারক্ষা হারানো

গায়রতের অভাবে স্বামী স্ত্রীর আচরণ ও নৈতিক সীমা ঠিকমতো রক্ষা করতে পারে না। এতে স্ত্রী হয়তো পরিবার বা সমাজের প্রতি অশ্লীল বা অযাচিত আচরণ করবে, যা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে।

খ. সম্মান ও মর্যাদার অবনতি

গায়রতহীন স্বামী স্ত্রীকে তার মর্যাদা, সন্মান ও সামাজিক অবস্থান রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। এতে স্ত্রীর আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পর্কের মধ্যে ঘাটতি দেখা দেয়।

গ. বিশ্বাস ও নিরাপত্তার দুর্বলতা

স্বামী যদি গায়রতের প্রতি উদাসীন হয়, স্ত্রী আত্মবিশ্বাস হারায় এবং ঘরে নিরাপত্তা বোধ কমে যায়। এটি দাম্পত্য জীবনে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে।

ঘ. সম্পর্কে প্রেম ও স্নেহের অবনতি

গায়রতহীনতা স্ত্রীর মনে হতাশা, অবজ্ঞা বা অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিকতা, প্রেম ও স্নেহ কমে যায়।

ঙ. সমাজ ও সন্তানদের ওপর প্রভাব

গায়রতের অভাবে স্ত্রীর আচরণে ঢিলা, পর্দাহীনতা বা সীমাহীন স্বাধীনতা দেখা দিতে পারে। শিশুরা এটি দেখে নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক সীমা ভুলভাবে শিখতে পারে, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রতিকারের উপায়

আল্লাহ তা’আলা এবং মুমিন উভয়ই ‘গায়রত’ বা আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন।  মুমিনের গায়রত হলো, যখন সে নিজের বা তার পরিবারের সম্মান ও মর্যাদার ওপর কোনো আঘাত আসে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের পর্দাহীনতা বা অন্যায় কাজ দেখলে তা তার কাছে অপছন্দনীয় হয়। এটি তার ঈমানের একটি অংশ। যদি স্বামী গায়রতহিণ হয় তবে পরিরাব দ্বীন ছেড়ে দিয়ে অন্য সংস্কৃতি অনুসরণ করবে। পরিবারে অশান্তি আসবে। যদি স্বামী গায়রত নিছে চলাফেরা হবে তবে দাম্পত্য জীবনে শান্তি আসতে বাধ্য।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার গাইরাত (সূক্ষ্ম আত্মমর্যাদাবোধ) আছে এবং মুমিনেরও গাইরাত আছে। আল্লাহ তা’আলা মুমিনের জন্য যা হারাম করে দিয়েছেন, সে তাতে লিপ্ত হলে আল্লাহ তা’আলার গাইরাতে আঘাত লাগে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬৮

২৪. পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা

দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে উপেক্ষা করলে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। যখন একজন সঙ্গী আরেকজনের মতামতকে গুরুত্ব দেন না, তখন ধীরে ধীরে সম্পর্কটা ভেঙে যেতে শুরু করে। পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তা হলো-

ক. বিশ্বাস ভেঙে যায়

স্বামী বা স্ত্রী যদি পরামর্শের মূল্য না দেয়, তবে অপরজন মনে করে তার মতামত অমূল্য। এতে বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং সম্পর্কে শীতলতা আসে।

খ. ভালোবাসা ও আন্তরিকতা কমে যায়

একজন যখন উপেক্ষিত হয়, তার ভেতরে অবহেলার কষ্ট জমে। ভালোবাসা ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপ নিতে পারে।

গ. ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়ে

পরিবার একটি দল। একজনের সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করলে ভুল বাড়ে এবং তার প্রভাব সংসারে পড়ে।

ঘ. অহংকার ও একনায়কতন্ত্র জন্ম নেয়

যখন স্বামী বা স্ত্রী কাউকে গুরুত্ব দেয় না, তখন পরিবারে একনায়কতন্ত্র তৈরি হয়। এতে অপরজন বিদ্বেষ অনুভব করে এবং সম্পর্ক দূরত্বে গড়িয়ে যায়।

ঙ. শিশুদের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়

শিশুরা দেখে শিখে। যদি তারা দেখে মা-বাবা একে অপরের মতামতকে উপেক্ষা করে, তারাও ভবিষ্যতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করবে।

চ. ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বৃদ্ধি

যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত (যেমন – আর্থিক পরিকল্পনা, সন্তানের ভবিষ্যৎ বা বাড়ি কেনা) নেওয়ার ক্ষেত্রে দুজনের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন একা সিদ্ধান্ত নেন, তখন ভুল করার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই ভুল সিদ্ধান্তের ফল পুরো পরিবারকে ভোগ করতে হয় এবং এর দায়ভার দুজনের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।

প্রতিকারের উপায় :

পারস্পরিক পরামর্শ উপেক্ষা করা একটি দাম্পত্য সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সম্পর্কে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্মান, এবং যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। তাই প্রতিকাজে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪  وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে। সুরা শুরা : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, অতঃপর তারা যদি পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুধ ছাড়াতে চায়, তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না। সুরা বাকারা : ২৩৩

ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করা মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য। যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের পারিবারিক বিষয়গুলো, যেমন – সন্তানের শিক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা বা কোনো বড় সিদ্ধান্ত, পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করেন, তখন তারা মূলত আল্লাহর নির্দেশই পালন করেন। এতে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। যার ফলে দাম্পত্য জীবনে কোন প্রকারে ভুল বুঝাবুঝি থাকবে না।

২৫. প্রতিটি ঝগড়ায় জিততে চাওয়ার প্রবণতা

প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস। এটি সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট করে দেয় এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসা ও সম্মানকে বিষাক্ত করে তোলে। প্রতিটি ঝগড়ায় জিততে চাওয়ার প্রবণতা দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি করে তা হলো-

ক. বিশ্বাসের অভাব ও মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি

যখন কোনো একজন সঙ্গী সব সময় জেতার মানসিকতা নিয়ে ঝগড়া করেন, তখন অপরজনের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে, তার মতামত বা অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার অভাব তৈরি হয়।

খ. ভালোবাসা ও সহমর্মিতা হারিয়ে যায়

দাম্পত্য জীবন হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহানুভূতির উপর দাঁড়ানো। কিন্তু যদি সব সময় একজন প্রমাণ করতে চায় যে সে-ই ঠিক, তবে অন্যজন অপমানিত ও অবহেলিত বোধ করে। এতে ভালোবাসার জায়গায় ক্ষোভ জন্মায়।

গ. পরস্পরের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়

প্রতিটি বিষয়কে তর্কে পরিণত করলে সঙ্গীর মনে হয় যে তার কথা কোনো গুরুত্ব পায় না। এতে আস্থা ও ভরসা নষ্ট হয়ে যায়।

ঘ. শান্তির পরিবেশ নষ্ট হয়

বাড়ি হওয়া উচিত শান্তি ও প্রশান্তির স্থান। কিন্তু প্রতিটি ঝগড়াকে জয়-পরাজয়ের লড়াই বানালে ঘরে ঝগড়া, দুঃখ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

ঙ. অহংকার ও জিদ বাড়ে

“আমি হারব না” এই মানসিকতা আসলে অহংকারের প্রতিফলন। এটি দাম্পত্য সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি বিনয়, ক্ষমা আর মমতা কমিয়ে দেয়।

চ. সমস্যা সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়

আসল সমস্যার সমাধান না হয়ে কে জিতল আর কে হারল—এই বিষয়টাই বড় হয়ে যায়। ফলে দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায় এবং সম্পর্ক দুর্বল হতে থাকে।

প্রতিকারের উপায় :

প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা দাম্পত্য সম্পর্ককে একটি প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত করে, যেখানে ভালোবাসার কোনো স্থান থাকে না। এর ফলে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং সুস্থ যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়। তাই প্রতিটি ঝগড়ায় জেতার প্রবণতা বাদ দিয় ঠকার প্রবণতা গ্রহণ করতে হবে।

আবূ উমামা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের যিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের যিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার। সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮০০, দারিমি : ২৭২২

২৬. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ আসলে কিভাবে

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ আসলে তা দাম্পত্য জীবনকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই তৃতীয় পক্ষ একজন বন্ধু, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, অথবা এমনকি অন্য একজন ব্যক্তি হতে পারে যার সাথে স্বামী বা স্ত্রী মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় পক্ষ দাম্পত্য জীবনকে যে সকল ক্ষতির শিকার হয় তা হলো-

ক. বিশ্বাস ও সততার অভাব :

দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। তৃতীয় পক্ষের আগমনে এই বিশ্বাস ভেঙে যায়। যখন একজন সঙ্গী অনুভব করেন যে তার স্বামী বা স্ত্রী অন্য কারো প্রতি বেশি মনোযোগ বা আবেগ দিচ্ছেন, তখন সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ফলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।

খ. যোগাযোগের দুর্বলতা: যখন তৃতীয় পক্ষ আসে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি ও খোলামেলা যোগাযোগ কমে যায়। তারা একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতি, চাহিদা এবং সমস্যা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেন। এর পরিবর্তে, তারা তৃতীয় পক্ষের সাথে তাদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করেন, যা তাদের নিজেদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

গ. মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব: তৃতীয় পক্ষের প্রভাবের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক এবং শারীরিক দূরত্ব বেড়ে যায়। তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন এবং একে অপরের সাথে সময় কাটানো বা আবেগ ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে দাম্পত্য সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।

ঘ. পারিবারিক কলহ ও অশান্তি: তৃতীয় পক্ষের কারণে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ এবং কলহ বৃদ্ধি পায়। ছোটখাটো বিষয় নিয়েও বড় ধরনের ঝগড়া হতে পারে, যা পুরো পরিবারের শান্তি নষ্ট করে দেয়। যদি সন্তান থাকে, তাহলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামী-স্ত্রীর উচিত সব সমস্যার বিষয়ে একে অপরের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা। নিজেদের মধ্যে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং কেন এমনটা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানতে চাওয়া জরুরি। যদি নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না হয়, তাহলে দুই জনের পরিবারের বয়স্ক একজনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে তিনি স্বামী-স্ত্রীকে তাদের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে বুঝতে এবং সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন।

২৭. অন্যের সামনে অপমান করা

অন্যের সামনে সঙ্গীকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এটি শুধু একটি সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। যখন একজন সঙ্গী অন্যের সামনে তার পার্টনারকে অপমান করেন, তখন এটি তাদের মধ্যেকার বিশ্বাস, সম্মান এবং নিরাপত্তাবোধকে নষ্ট করে দেয়।

যেভাবে অপমান দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে

১. বিশ্বাস ভঙ্গ:

দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন পার্টনার অন্যকে সবার সামনে অপমান করেন, তখন অপমানিত ব্যক্তি অনুভব করেন যে তার সঙ্গী তার প্রতি বিশ্বস্ত নন। এই ঘটনার ফলে বিশ্বাসে ফাটল ধরে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার দুর্বল হয়ে যায়।

২. আত্মসম্মানে আঘাত

: প্রকাশ্যে অপমান করলে অপমানিত ব্যক্তির আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি তাদের নিজেদের সম্পর্কে খারাপ অনুভূতি তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে তারা নিজেদেরকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই মানসিক আঘাত তাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৩. সম্পর্কের দূরত্ব বৃদ্ধি:

অপমানজনক ঘটনা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে। যে ব্যক্তি অপমানিত হন, তিনি তার সঙ্গীর থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। তারা একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, যার ফলে সম্পর্কের মধ্যে নীরবতা এবং বিচ্ছিন্নতা বেড়ে যায়।

৪. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি:

যখন একজন সঙ্গী অন্যদের সামনে তার পার্টনারকে অপমান করেন, তখন শুধু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানও ক্ষুণ্ন হয়। এর ফলে তারা অন্যদের সামনে নিজেদেরকে বিব্রত বোধ করেন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া এড়িয়ে চলেন।

প্রতিকারের উপায় :

যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে প্রথমেই খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি। যিনি অপমান করেছেন, তার উচিত তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না বলে অঙ্গীকার করা। আর যিনি অপমানিত হয়েছেন, তার উচিত তার অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সমস্যাটি নিয়ে কথা বলা। যদি নিজেদের মধ্যে সমাধান সম্ভব না হয়, তবে একজন পেশাদার কাউন্সিলরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।

১৯৭৭। আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজি ; ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০

২৮. একে অপরকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া

একে অপরকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি প্রধান কারণ। যখন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের কর্মব্যস্ততা বা অন্যান্য কারণে একে অপরের থেকে দূরে সরে যান, তখন সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। এটি ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয় এবং একসময় তা ভেঙেও যেতে পারে। পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার কারণে যা ঘটতে পারে তা হলো-

ক. অভাবে ভুল বোঝাবুঝি : সম্পর্কের ভিত্তি হলো খোলাখুলি যোগাযোগ। যখন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটান না, তখন তাদের মধ্যেকার কথোপকথন কমে যায়। তারা একে অপরের জীবনের ছোট ছোট বিষয়, অনুভূতি, বা সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন না। এই যোগাযোগের অভাবে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, যা দূরত্ব তৈরি করে।

খ. মানসিক দূরত্ব:

নিয়মিত একসঙ্গে সময় কাটানো মানসিক নৈকট্য বজায় রাখার জন্য জরুরি। যখন এই সময় কমে যায়, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। তারা একে অপরের কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, যার ফলে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্ব বোধ তৈরি হয়।

গ. আকর্ষণ কমে যাওয়া:

একসঙ্গে সময় না দিলে শারীরিক এবং মানসিক আকর্ষণ দুটোই কমে যায়। সম্পর্কটি তখন শুধু একটি দায়িত্বে পরিণত হয়, যেখানে ভালোবাসা বা আবেগ থাকে না। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি চলে আসে এবং একে অপরের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।

ঘ. তৃতীয় পক্ষের আগমন: যদি সম্পর্কের মধ্যে পর্যাপ্ত সময় এবং মনোযোগের অভাব থাকে, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণ করতে একজন সঙ্গী বাইরের কারো দিকে ঝুঁকতে পারেন। এটি একজন বন্ধু, সহকর্মী বা অন্য কেউ হতে পারে যার সাথে তারা নিজেদের মনের কথা ভাগ করে নেন। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে তৃতীয় পক্ষের আগমন ঘটে, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

ঙ. বিশ্বাসে ফাটল: একে অপরকে সময় না দেওয়া এবং তার ফলস্বরূপ যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা ধীরে ধীরে সম্পর্কের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। একজন সঙ্গী হয়তো ভাবেন যে অন্যজন তাকে এড়িয়ে চলছেন, বা তার জীবনে অন্য কেউ এসেছে। এই ধরনের সন্দেহ এবং অবিশ্বাস সম্পর্কের ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।

প্রতিকারের উপায়

দাম্পত্য জীবনকে বাঁচাতে হলে একে অপরের জন্য সময় বের করা খুব জরুরি। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, নিয়মিত ঘুরতে যাওয়া, অথবা শুধু বসে গল্প করা, এই ছোট ছোট বিষয়গুলো সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে প্রাণ ফেরাতে পারে। কাজের চাপ যতই থাকুক না কেন, সম্পর্কের জন্য সময়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, তখন আমি তাঁকে পেছনে ফেলে দিলাম। পরে যখন শরীরে কিছুটা মেদ হলো, তখন আবার তাঁর সাথে দৌড়ালাম, তিনি আমাকে পেছনে ফেলে দিলেন। তিনি হেসে বললেন: এ দৌড় সেই দৌড়ের বদলা।” সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮, মুসনাদ আহমদ : ২৬২৭৭

২৯. শারীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

শারীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়। এই সমস্যাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। সময়ের সাথে সাথে শারীরিক আকর্ষণ কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু একে উপেক্ষা করলে তা সম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

শারীরিক আকর্ষণ শুধু সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠন নিয়ে নয়, বরং এটি আবেগ, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এই আকর্ষণ কমে গেলে সম্পর্কের মধ্যে থাকা আবেগগুলোও দুর্বল হয়ে যায়। একসময় যে স্পর্শ, চুম্বন বা আলিঙ্গন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল, তা এখন যান্ত্রিক বা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। এর ফলস্বরূপ দাম্পত্য জীবনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়, যা ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ এবং কলহের জন্ম দেয়।

প্রতিকারের উপায়

রীরিক আকর্ষণ কমে গেলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়। এই সমস্যাটা খুব সাধারণ হলেও এর সমাধান করা সম্ভব। শারীরিক আকর্ষণ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং মানসিক সংযোগ এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর নির্ভরশীল। নিজের বাহ্যিক চেহারার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন, নিজেদের পছন্দের পোশাক পরুন। এটি শুধু আপনার পার্টনারের জন্য নয়, নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও সাহায্য করে। যখন আপনি নিজেকে আকর্ষণীয় মনে করবেন, তখন আপনার পার্টনারও আপনাকে আকর্ষণীয় দেখবে। দৈনন্দিন জীবনে স্পর্শ এবং আলিঙ্গনকে গুরুত্ব দিন। এই সাধারণ কাজগুলো সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা ধরে রাখে এবং বোঝায় যে আপনারা একে অপরের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। দাম্পত্য জীবনে শারীরিক আকর্ষণ ধরে রাখা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যদি এই সম্পর্ককে সজীব রাখার চেষ্টা করেন, তবে তা অবশ্যই সম্ভব।

৩০. স্ত্রী স্বামীর কাছে অন্য মহিলার দেহের বর্ণনা দিলে কিভাবে দাম্পত্য নষ্ট হয়?

স্ত্রী যখন অন্য কোনো নারীর দেহের বর্ণনা স্বামীর কাছে দেয়, তখন তা দাম্পত্য জীবনের জন্য ক্ষতিকর হবেই। এর কারনে দাম্পত্য জীবনের জন্য  যে ক্ষতি হবে তা হলো-

ক. দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষতির কারণ

মানসিক তুলনা ও কল্পনা: যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীর মুখে অন্য নারীর শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা শোনেন, তখন তার মনে সেই নারীর একটি চিত্র তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্বামী অজান্তেই নিজের স্ত্রীর সাথে সেই নারীকে তুলনা করতে শুরু করতে পারেন। এই তুলনা দাম্পত্য সম্পর্কে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি করে।

খ সন্দেহ ও অবিশ্বাস:

এই ধরনের বর্ণনা থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে। স্বামী ভাবতে পারেন যে, স্ত্রী কেন অন্য নারীর প্রশংসা করছেন বা তার সৌন্দর্যের প্রতি এতটা মনোযোগ দিচ্ছেন। এর ফলে, সম্পর্কে সন্দেহ ও অস্বস্তি সৃষ্টি হতে পারে।

ঘ. আকর্ষণ ও ফিতনার ঝুঁকি :

ইসলামে ফিতনা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। অন্য নারীর বর্ণনা শোনার কারণে স্বামীর মনে তার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বা ফিতনার সৃষ্টি হতে পারে, যা সম্পর্কের পবিত্রতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। এই বর্ণনা এক ধরনের প্রলোভন হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক ভালোবাসাকে রক্ষা করার জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা দেয়। তাই, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরনের আলোচনা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন নারী যেন তার দেখা অন্য নারীর দেহের বর্ণনা নিজ স্বামীর নিকট এমনভাবে না দেয়, যেন সে তাকে (ঐ নারীকে) চাক্ষুস দেখতে পাচ্ছে। সহিহ বুখারি : ৫২৪০, ৫২৪১

৩১. নিয়মিত অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পরিধান করে থাকলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

স্বামীর বা স্ত্রীর সব সময় অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা পোশাক পরিধান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি নীরব বিষের মতো। এর ফলে ধীরে ধীরে আকর্ষণ ও ভালোবাসা কমে যেতে থাকে। দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ। যখন একজন সঙ্গী নিজেকে পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেন না, তখন অপরজনের মনে তার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ে, যা শারীরিক ঘনিষ্ঠতাকেও প্রভাবিত করে। একসময় এই অভ্যাস পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন সঙ্গী যদি অপরজনকে দেখে মনে করে যে তার নিজের প্রতি কোনো যত্ন নেই, তবে এটি তাদের সম্পর্কের প্রতিও উদাসীনতা সৃষ্টি করে। পরিচ্ছন্নতা একটি সম্পর্কের জন্য শুধু স্বাস্থ্যবিধিসম্মত দিকই নয়, বরং এটি পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং যত্নেরও প্রতিফলন। তাই সব সময় অপরিচ্ছন্ন থাকা ধীরে ধীরে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য ও মধুরতাকে নষ্ট করে দেয়।

৩২. অতীতকে টেনে আনার ফলে

অতীতকে টেনে আনা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের বর্তমান সম্পর্কের সমস্যাগুলো সমাধানের পরিবর্তে পুরোনো ভুল বা ঘটনা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তখন তা সম্পর্কের মধ্যে বিষাক্ততা সৃষ্টি করে। অতীতকে নিয়ে কথা বলা হয়তো কোনো সমস্যার সমাধান করে না, বরং এটি শুধুমাত্র নতুন করে ঝগড়ার জন্ম দেয়।

যখন একজন সঙ্গী অতীতের কোনো ভুল নিয়ে বারবার খোঁচা দেন, তখন অপর সঙ্গীর মনে ক্ষোভ এবং রাগ জন্ম নেয়। এটি বিশ্বাস এবং ভালোবাসাকে দুর্বল করে দেয়। সম্পর্ক তখন সামনে এগোতে পারে না, কারণ তারা সব সময় পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এর ফলে বর্তমানের ছোটখাটো সমস্যাগুলোও বড় হয়ে দেখা দেয়।

প্রতিকারের উপায় : অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না। ক্ষমা এবং সহনশীলতা তখন অর্থহীন হয়ে যায়, কারণ পুরোনো ক্ষতগুলো বারবার তাজা করা হয়। তাই অতীতকে ক্ষমা করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব এখানে ফুটে উঠেছে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮

৩৩. চরিত্রের ত্রুটির কারনে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

চরিত্রের ত্রুটি বলতে সাধারণত নৈতিক স্খলন, যেমন – পরকীয়া, অসৎ জীবনযাপন বা অন্য ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন সঙ্গী তার নৈতিকতা লঙ্ঘন করেন, তখন সেই বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। এর ফলে সম্পর্কটা শুধু কাগজে-কলমেই টিকে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের প্রাণ থাকে না। পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্ক শুধু শারীরিক নয়, বরং এটি অপর সঙ্গীকে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয়। অপমান, কষ্ট এবং বঞ্চনার এই অনুভূতি সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে।

৩৪. মিথ্যা বলা কারনে দাম্পত্য জীবন নষ্ট

মিথ্যা হলো সম্পর্কের জন্য একটি নীরব বিষ। যখন একজন সঙ্গী বারবার মিথ্যা বলেন, তখন অন্যজনের মনে তার প্রতি আস্থা কমে যায়। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তখন স্বাভাবিক আলাপচারিতাতেও সন্দেহ ঢুকে পড়ে, যার ফলে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ থাকে না। বারবার মিথ্যা বলা ও তা লুকানোর চেষ্টা দুজনের ওপরই মানসিক চাপ তৈরি করে। যে মিথ্যা বলছে, সে সব সময় ধরা পড়ার ভয়ে থাকে, আর যাকে মিথ্যা বলা হচ্ছে, সে সব সময় সন্দেহে ভোগে। এই চাপ ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর আদর্শে সুখী দাম্পত্য জীবন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে দাম্পত্য জীবন কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহ প্রদত্ত এক পবিত্র সম্পর্ক, যা রহমত, ভালোবাসা ও প্রশান্তির উৎস। একজন মুসলিমের জীবনকে পূর্ণতা দিতে এই সম্পর্কের ভূমিকা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবন সকল মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, আর তাঁর দাম্পত্য জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাঁর প্রতিটি কর্ম, আচরণ ও সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি সুখী ও সুন্দর সংসার গড়ে তোলা যায়। রাসুল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কেবল একজন স্বামী ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং সঙ্গী। এই মহান আদর্শ অনুসরণ করে একজন মুমিন তার দাম্পত্য জীবনকে মধুর ও আনন্দময় করে তুলতে পারেন।

ক. পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মান

স্ত্রীর মর্যাদা ও মান বোঝা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীর অনুভূতি ও চাহিদার প্রতি সদা যত্নশীল ছিলেন। তিনি তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না, যা আমাদের শেখায় যে ছোটখাটো বিষয়ে স্ত্রীর কষ্ট দেওয়া উচিত নয় এবং তার পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মুমিন স্বামী যদি স্ত্রীর কথা শুনে তাকে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা দেখায়, তবে ঘর-সংসারে শান্তি বজায় থাকে।

খ. ভালোবাসা ও আনন্দের প্রকাশ

দাম্পত্য সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখতে ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করা অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, হালকা ঠাট্টা-মশকরা করতেন এবং একসাথে আনন্দ উপভোগ করতেন। এ ধরনের খোলামেলা ও আনন্দময় সময় দাম্পত্য বন্ধনকে শক্তিশালী করে। তিনি স্ত্রীকে সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতেন, যা ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে। এই ধরনের ছোট ছোট আন্তরিক আচরণ ঘরে স্নেহ ও প্রেমের পরিবেশ তৈরি করে। তিনি সফরেও স্ত্রীকে সঙ্গে নিতেন এবং বাইরে যাওয়ার আগে স্ত্রীকে চুম্বন করতেন, যা ভালোবাসার গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।

গ. সহযোগিতা ও সহানুভূতি

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী। তিনি নিজের হাতে ঘরের কাজ করতেন, কাপড় সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন এবং স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করতেন। এটি পুরুষদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, ঘরের কাজ কেবল নারীদের দায়িত্ব নয়, বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যম। স্ত্রীর অসুস্থতা, দুঃখ বা সমস্যার সময় তিনি তাদের পাশে থাকতেন। কষ্টের সময় সান্ত্বনা দিতেন এবং তাদের জন্য উপহার কিনে দিতেন। একজন মুমিন স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের প্রতি এই সহানুভূতি ও সহযোগিতা বজায় রাখে, তবে সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পায়।

ঘ. আত্মিক ও মানসিক বন্ধন

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এমনকি তিনি স্ত্রীর চুল আঁচড়ে দিতেন, কোলের উপর মাথা রেখে ঘুমাতেন এবং স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। এসব ছোটখাটো কিন্তু আন্তরিক আচরণ সম্পর্কের মধ্যে গভীর আত্মিক ও মানসিক বন্ধন তৈরি করে। তিনি বাড়িতে প্রবেশের আগে মিসওয়াক করতেন, যা পরিচ্ছন্নতা ও আন্তরিকতার প্রতীক। স্ত্রীদের সাথে অবসর সময় কাটানো এবং একাধিকবার সহবাসের পর একবার গোসল করা, এসব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আচারগুলো পরিবারে শান্তি ও আন্তরিকতা বজায় রাখে।

ঙ. সমতা ও ন্যায্যতা

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একাধিক স্ত্রীর সাথে সমতা বজায় রাখতেন। তিনি সকলের প্রতি সমান মনোযোগ ও সময় দিতেন, যা একাধিক বিবাহকারী মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি একজন আদর্শ পরিবারপ্রেমিক ছিলেন, যিনি তার পরিবারের সকল সদস্যের চাহিদা এবং অধিকারের প্রতি সর্বদা সচেতন ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দাম্পত্য জীবন আমাদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল আল্লাহর রাসূলই ছিলেন না, বরং একজন আদর্শ স্বামী ও পরিবারপ্রেমিকও ছিলেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা জানতে পারি, কিভাবে একজন মুসলিম স্বামী ও স্ত্রী সুখী ও সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারে। অতএব, একজন মুমিন যদি এই নীতি অনুসরণ করে—স্ত্রীর মর্যাদা বোঝা, আনন্দ ভাগাভাগি করা, সহানুভূতি দেখানো, সমতা বজায় রাখা ও মধুর আচরণ করা—তাহলে সে সহজেই সুখী দাম্পত্য অর্জন করতে পারে। দাম্পত্য কেবল শারীরিক সম্পর্ক নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক বন্ধনও। তাই সংসারে প্রেম, সম্মান ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে যে কোনো মুসলিম দম্পতি সুখী ও পরিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারবে। নিচে সরাসরি সহিহ হাদিসে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

০১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর মান অধিমান বুঝার চেষ্টা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ’’আমি জানি কখন তুমি আমার প্রতি খুশী থাক এবং কখন রাগান্বিত হও।’’ আমি বললাম, কী করে আপনি তা বুঝতে সক্ষম হন? তিনি বললেন, তুমি প্রসন্ন থাকলে বল, না! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রব-এর কসম! কিন্তু তুমি আমার প্রতি নারাজ থাকলে বল, না! ইব্রাহীম (’আ.)-এর রব-এর কসম! শুনে আমি বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! সে ক্ষেত্রে শুধু আপনার নাম উচ্চারণ করা থেকেই বিরত থাকি। সহিহ বুখারি : ৫২২৮, ৬০৭৮

০২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিজোগিতা করতেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম, তখনো মোটা তাজা হইনি। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, তখন তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, অত:পর আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম ও আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা হলাম ও ভারী হলাম, ও তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনে অগ্রসর হল: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন: আজকের জয় সেই দিনের প্রতিশোধ”। মুসনাদ আহমাদ : ২৬২৭৭, সুনানে নাসায়ি : ৮৯৩৮. ইমাম বায়হাকি : ৮৬২৫

৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের প্রসংশা করতেন

খাদীজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রশংসা করা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁকে সব সময় স্মরণ করতেন। একবার আয়েশা (রা.) খাদীজা (রা.) সম্পর্কে কিছু বললে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কোনো স্ত্রী দেননি। সে আমার ওপর ঈমান এনেছে যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছে; সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা বলেছে; সে আমাকে তার ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে যখন মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছে; এবং আল্লাহ আমাকে তার মাধ্যমেই সন্তান দিয়েছেন, যখন অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে দেননি। মুসনাদে আহমাদ : ২৪৮৬৪, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : 6857

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর মর্যাদা নারীদের উপর এমন যেমন সারীদের মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর। সহিহ বুখারি : ৩৭৭০, ৪৫১৯, ৫৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৪৪৬, আহমাদ : ১৩৭৮৭

০৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আবসর সময় কাটাতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাত শেষ করতেন, তখন স্বীয় স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কোন একজনের নিকট গমন করতেন। একদিন তিনি স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং সাধারণতঃ যে সময় কাটান তার চেয়ে বেশি সময় কাটালেন। সহিহ বুখারি : ৫২১৬

০৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে চুমু দিয়ে ঘরের বাহির বের হতেন

আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুমো দিলেন, অতঃপর সালাত আদায়ের জন্য বের হলেন, কিন্তু অযু করলেন না। ’উরওয়াহ বলেনঃ আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, ’সেই স্ত্রী আপনি নন কি? ফলে তিনি হেসে দিলেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫০২

০৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর চুল আচড়ে দিতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমি হায়েয অবস্থায় আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথা আঁচড়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ২৯৫, সহিহ মুসলিম : ৩০২

নবী সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে থাকাবস্থায় আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন আর আমি তা আঁচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি যখন ই‘তিকাফে থাকতেন তখন (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না। সহিহ বুখারি : ২০২৯, ২০৩৩, ২০৩৪, ২০৪১, ২০৪৫

০৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে প্রবেশের আগে মিসওয়াক করতেন

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বাইরে থেকে এসে) বাড়িতে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৩

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, “আমি পছন্দ করি যে, আমি আমার স্ত্রীর জন্য সুন্দর সাজসজ্জা করি, যেমন আমি চাই যে, আমার স্ত্রীও আমার জন্য সাজসজ্জা করুক। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘নারীদের জন্য তাদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের উপরও রয়েছে নারীদের অধিকার, স্বীকৃত রীতিনীতি অনুযায়ী।’ সূরা বাকারা : ২২৮। ইমাম ইবন আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ : ১২৪৭০

০৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতেন

আসওয়াদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। আর সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন। সহিহ বুখারি  :৬৭৬, ৫৩৬৩, ৬০৩৯

উরওয়াহ বলেন, আয়েশা (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ঘরে কাজ করতেন?’ তিনি বললেন, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোহাতেন এবং নিজের খেদমত নিজেই করতেন। অন্যনা্য পুরুষরা যেমন নিজেদের বাড়ীতে কাজ করে, অনুরূপ তিনিও তাঁর কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং জুতো সিলাই করতেন। হাদিস সম্ভার : ২৫৯০, আদাবুল মুফরাদ : ২১৫, সহীহুল জামে : ৯০৬৮

আয়েশা (রা.) বলেন: নবী ﷺ তাঁর জুতা মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং ঘরে কাজ করতেন, যেমন তোমাদের কেউ ঘরে কাজ করে।” মুসনাদ আহমাদ : ২৪৯০৩

৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে কুরাআন তিলওয়াত করতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম।

 করেছেন এ সম্পর্কিত ০২ টি হাদিস দিন। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১, সুনানে নাসায়ি : ২৭১, মুসনাদ আহমাদ : ২৪৩৮৪

১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিকবার সঙ্গমে একবার গোসল করতেন

আনাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীদের নিকট গেলেন এবং একবারই গোসল করলেন। সুনানে আবু দাউদ : ২১৮, সুনানে নাসায়ি : ২৬৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৫৮৯,  দারিমী : ৭৫৯) ও

১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করতেন

‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র (কাদাহ) হতে (পানি নিয়ে) গোসল করতাম। সেই পাত্রকে ফারাক বলা হতো। সহিহ বুখারি : ২৫০, ২৬১, ২৬৩, ২৭৩, ২৯৯, ৫৯৫৬, ৭৩৩৯, সহিহ মুসলিম : ৩১৯, আহমাদ : ২৫৮৯৪

১২. স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করেছে, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করা

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবশিষ্টটুকু প্রদান করলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও পাত্রের সে স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন। তবে যুহায়র কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে “পান করার” উল্লেখ নেই।  সহিহ মুসলিম : ৩০০

১৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সুন্দর নামে ডাকতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর স্ত্রীর সাথে মজার ছলে কথা বলতেন

আয়েশা (রাঃ) যখন ছোট ছিলেন, তখন কাপড়ের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তার মধ্যে ০২ টি ঘোড়া ছিল, যার দু’টি ডানা ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, ’এটা কী?’ আয়েশা বললেন, ’ঘোড়া।’ তিনি বললেন,

فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ قَالَتْ أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلاً لَهَا أَجْنِحَةٌ قَالَتْ فَضَحِكَ حَتّٰـى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ

ঘোড়ার আবার দু’টি ডানা?’ আয়েশা বললেন, ’আপনি কি শুনেননি, সুলাইমান (নবী)র ডানা-ওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং সে হাসিতে তাঁর চোয়ালের দাঁত দেখা গেল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৭, মিশকাত  : ৩২৬৫, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৮৬৪, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে হালকা ঠাট্টা-মশকরা করেতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা সাওদা বিনতে যামআ’ আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায় এলো। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও আমার মাঝখানে বসে গেলেন। তাঁর ০২ টি পা আমার কোলে, আর ০২ টি পা সাওদার কোলে ছিল। আমি তার (সাওদার) জন্য ’খাযীরা’ (গোশ্ত ছোট ছোট করে কেটে তাতে আটা মিশিয়ে রান্না করা খাবার) তৈরী করলাম। অতঃপর তাকে খেতে বললে সে খেতে অস্বীকার করল। আমি বললাম, ’তুমি অবশ্যই খাবে, নচেৎ আমি তোমার মুখে তা লেপে দেব।’ সে অস্বীকার করলে আমি প্লেট থেকে সামান্য পরিমাণ নিয়ে তার মুখে লেপে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোল থেকে স্বীয় পা সরিয়ে নিলেন, যাতে সে আমার কাছ থেকে বদলা নিতে পারে। অতঃপর আমি প্লেট থেকে আরো কিছু নিয়ে আমার মুখে লেপে নিলাম। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন। ইত্যবসরে উমার (রাঃ) উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, ’হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার! হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার!’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা উঠে তোমাদের মুখ ধুয়ে নাও, আমার মনে হয় উমার প্রবেশ না করে ছাড়বে না। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৮, নাসাঈ কুবরা : ৮৯১৭, সহীহাহ : ৩১৩১, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন খাবারের দোষ ধরতেন না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাবারের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করেননি। ভাল লাগলে তিনি খেতেন এবং খারাপ লাগলে রেখে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৫৬৩, ৫৪০৯, সহিহ মুসলিম : ৫৫০৪, হাদিস সম্ভার : ২৫৯৩

১৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সফর করতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের মনস্থ করলে স্ত্রীগণের মধ্যে কুরআর ব্যবস্থা করতেন। যার নাম আসত তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হতেন। এছাড়া প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একদিন এক রাত নির্দিষ্ট করে দিতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) নিজের দিন ও রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। সহিহ বুখারি : ২৫৯৩, ২৬৩৭, ২৬৬১, ২৬৮৮, ২৮৭৯, ৪০২৫, ৪১৪১, ৪৬৯০, ৪৭৪৯, ৪৭৫০, ৪৭৫৭, ৫২১২, ৬৬৬২, ৬৬৭৯, ৭৩৬৯, ৭৩৭০,৭৫০০, ৭৫৪৫

১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আনন্দ উপভোগ করতেন

উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হাবশীরা তাদের বর্শা নিয়ে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে পর্দা করে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন এবং আমি সেই খেলা দেখছিলাম। যতক্ষণ আমার ভাল লাগছিল ততক্ষণ আমি দেখছিলাম। এরপর আমি স্বেচ্ছায় সে স্থান ত্যাগ করলাম। সুতরাং তোমরা অনুমান করতে পার কোন্ বয়সের মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা

আমর ইবনু ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যাতুস্ সালাসিল যুদ্ধের সেনাপতি করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ’আয়িশাহ্। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা (আবূ বকর)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, ’উমার ইবনু খাত্তাব অতঃপর আরো কয়েকজনের নাম করলেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৬২, ৪৩৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৮৪, আহমাদ : ১৭৮৫৭

১৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমাতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১

২০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে খেলা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

২১. সূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক স্ত্রীর সাথে সমতা রেখে চলতেন

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী ’আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন স্ত্রীদের মধ্যে লটারী করতেন। লটারীতে যার নাম উঠতো তিনি তাকেই সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য পালাক্রমে রাত ও দিন ভাগ করে নিতেন। তবে যাম’আহর কন্যা সাওদাহ (রাযি.) তার পালার দিনটি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দিয়ে দেন। সুনানে আবু দাউদ : ২১৩৮

২২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতায় তার স্ত্রীর সুরা নাস ও ফালাক পড়ে ফু দিতেন

আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থ হতেন, তখন তিনি নিজের উপর সূরা নাস-ফালাক পাঠ করতেন এবং ফুঁক দিতেন। অতঃপর যখন তাঁর পীড়া প্রকট হয়ে যায়, তখন আমি তাঁর উপর এসব পড়তাম আর বরকতের আশায় তাঁর হাত দিয়ে তাঁকে বুলিয়ে দিতাম। সহহি বুখারি : ৪৪৩৯, ৫০১৬, সহীহ মুসলিম : ২১৯২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৯০২, সহীহাহ : ২৭৭৫, সহিহ ইবনে হিব্বান স: ২৯৫২

২৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর অবর্তমানে তার বান্ধবিদের উপহার পাঠান

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ (রাঃ)-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন। খাদীজাহ (রাঃ)-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদেশ করেন। কোন দিন বকরী যবহ হলে খাদীজাহ (রাঃ)-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মত গোশ্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৯১৬, ৩৮১৭, ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

২৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর পছন্দের গুরুত্ব দিতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

২৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের দুঃখে সান্ত্বনা দিতেন

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, সাফিয়্যাহ (রাযিঃ)-এর কানে পৌছে যে, হাফসাহ (রাযিঃ) তাকে ইয়াহুদীর মেয়ে বলে ঠাট্টা করেছেন। তাই তিনি কাঁদছিলেন। তার ক্ৰন্দনরত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি বললেনঃ তোমাকে কিসে কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, হাফসাহ আমাকে ইয়াহূদীর মেয়ে বলে তিরস্কার করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অবশ্যই তুমি একজন নবীর কন্য, তোমার চাচা অবশ্যই একজন নবী এবং তুমি একজন নবীর সহধর্মিণী। অতএব কিভাবে হাফসাহ তোমার উপরে অহংকার করতে পারে? তারপর তিনি বললেনঃ হে হাফসাহ আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৬৪, মিশকাত : ৬১৮৩

২৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর জন্য উপহার কিনে দিতেন

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বাজারে গিয়েছিলেন এবং দুটি জুতা কিনলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো সাওদা (রাঃ)-কে দিলেন।” মুসনাদে আহমাদ : ২৬৬৯৩

২৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন

…….উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তা হলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা এত হেয় হবো? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনিই আমার সাহায্যকারী।’ আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা‘বা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। ‘উমার (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, ‘হে আবূ বকর। তিনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন?’ আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তবে কেন এখন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে! নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন।’ আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তার তাওয়াফ করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে একথা কি তিনি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘তবে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।’ যুহরী (রহ.) বলেন যে, ‘উমার (রাঃ) বলেছেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফ্ফারা হিসেবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবাদেরকে বললেন, ‘তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল।’ রাবী বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল তিনবার তা বলার পরও কেউ উঠলেন না।’ তাদের কাউকে উঠতে না দেখে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর নিকট এসে লোকদের এই আচরণের কথা বলেন। উম্মু সালামাহ (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।’ সেই অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়ালেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন…….। সহিহ বুখারি : ২৭৩১ বিশাল হাদিসের প্রয়োজনীয় অংশ।

নোট : এই ঘটনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মে সালামা (রাঃ)-এর পরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর মতামতকে কতটা সম্মান করতেন। এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে, যেখানে সাহাবিরাও দ্বিধায় ছিলেন, উম্মে সালামা (রাঃ)-এর বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ সংকট সমাধান করেছিল।

২৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি এতটুকু অভিমান করিনি, যতটুকু খাদীজা (রা)-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা অধিক সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যবেহ করে মাংসের পরিমান বিবেচনায় হাড়-মাংসকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদিজা (রাঃ) এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোন সময় অভিমানের সুরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতাম, (আপনার অবস্থা দৃষ্টে) মনে হয়, খাদীজা (রাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন নারী নেই। প্রতি উত্তরে তিনি বলতেন, হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তান জন্মেছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

নোট : মৃত্যুর পরও খাদীজা (রা)-এর প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত ছিল।

২৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর কষ্টের সময় সান্তনা দিতেন

আয়িশা (রাঃ) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো জানাযা পড়ে বাকী’ (গোরস্থান) থেকে আমার নিকট এলেন। তখন আমার মাথায় ছিল যন্ত্রণা। আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা গেল! তিনি বললেন, বরং আমার মাথাও গেল! (হে আয়েশা!) তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও এবং আমি তোমাকে গোসল দিই, কাফনাই, অতঃপর তোমার উপর জানাযা পড়ে তোমাকে দাফন করি, তাহলে এতে তোমার নোকসান আছে কি? ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, ইবনে হিব্বান : ৬৫৮৬, দারাকুত্বনী : ১৯২, বাইহাক্বী : ৬৯০৪, ইরওয়াহ : ৭০০